ভারতবর্ষে সমাজতন্ত্র : শতবর্ষের শ্রদ্ধাঞ্জলি
ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি গঠনের ১০০ বছর অতিক্রান্ত । এই আন্দোলন সম্বন্ধে বলা হয় শ্রেণি থেকে সমাজতান্ত্রিক সমাজ এবং সেই শোষণহীন সমাজকে শ্রেণহীন সাম্যবাদী সমাজের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যে-কোনো কমিউনিস্ট পার্টির লক্ষ্য।
ব্রিটিশ শাসিত ভারতবর্ষকে যখন কমিউনিস্ট আন্দোলন মাথাচাড়া দিচ্ছে তখন আমাদের পাশের রাষ্ট্র বাংলাদেশ এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়বে আরো বেশ কিছুদিন পরে । যদিও তখন সে ভারত রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত ।
কমিউনিস্ট আন্দোলনের প্রথম পর্ব থেকে যদি আমরা আরও দু-তিন দশক এগিয়ে যাই তাহলে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের মূলভিত্তি খুজে পাব স্বাধীনতার পরে পূর্বপাকিস্তানে বামপন্থী আন্দোলন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে দেশভাগ ও উদ্বাস্তু সমস্যা দাঙ্গা দুর্ভিক্ষ নিপীড়িত মানুষের অবস্থান বামপন্থী আন্দোলন কে মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে লড়াই করার সুযোগ করে দেয়। একটি তথ্য বলছে , " ১৯৪৮ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত কলকাতায় ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির দ্বিতীয় কংগ্রেসের সিদ্ধান্ত অনুসারে কংগ্রেসে আগত পাকিস্তানের প্রতিনিধিরা স্বতন্ত্রভাবে এক বৈঠকে মিলিত হয়ে ৯ সদস্য বিশিষ্ট পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করেন।" সেদিন এই কমিটিতে যারা ছিলেন, তারা হলেন , সাজ্জাদ জহির , খোকা রায়, নেপাল নাগ ,জামাল উদ্দিন বুখারি, মণি সিংহ, আতা মোহাম্মদ , কৃষ্ণবিনোদ রায় , মনসুর হাবীবউল্লা । সাজ্জাদ জহির কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন । ভবানী সেনকে পাঠানো হয়েছিল পার্টিকে পরিচালনা করার দায়িত্ব দিয়ে ।
এই সময় পূর্ববঙ্গের কমিউনিস্ট আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন কমরেড বিষ্ণু চ্যাটার্জি , মোহাম্মদ ফরহাদ , জিতেন ঘোষ , জ্ঞান চক্রবর্তী , রতন সেন প্রমুখরা। বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ । এখানে ইউরোপের মতো কল-কারখানা নেই , ফলে কেউ যদি মনে করেন এদেশে ইউরোপের মতো শ্রমিক আন্দোলন হবে তা ভুল । বরং কৃষকদের সঙ্গে নিয়েই এদেশের আন্দোলন দানা বাঁধবে সেটাই স্বাভাবিক । তাই সে সময় বামপন্থী আন্দোলন বলতে কৃষক আন্দোলনকি বোঝাত। সেই সঙ্গে ছিল শাসক শ্রেণীর অত্যাচার থেকে গরিব মানুষকে মুক্ত করার মরণপণ সংগ্রাম। জেলায় জেলায় গড়ে উঠেছিল বিভিন্ন ধরনের সমিতি। যেমন--- 'মহিলা সমিতি',' পূর্ব পাকিস্তান কৃষক সমিতি' ইত্যাদি।
পূর্ব বাংলার বামপন্থী আন্দোলন একটা সময় হিন্দুদের প্রাধান্য বেড়ে যায় । পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ হয় । ফলে আত্মগোপন করতে বাধ্য হয় বামপন্থী নেতারা । সেই সঙ্গে দুই ধর্মের বিবেককে কাজে লাগিয়ে একশ্রেণীর মানুষ কমিউনিস্ট আন্দোলনকে দুর্বল করে দিতে থাকে।
এই সময় বহু কমিউনিস্ট বিশেষ করে হিন্দুরা ভারতে চলে আসতে চায় পূর্ববঙ্গে তাদের জমি বিক্রি করে একে একে ভারতে এসে নিজেদের স্থায়ী ঠিকানা খোঁজার চেষ্টা করে পাকিস্তানের ঘোষিত নীতি ছিল কমিউনিস্ট পার্টিকে কোনরকম মাথা তুলতে না দেওয়া স্বাভাবিক কারণেই সরকারের রক্তচক্ষুকে ভয় পায় অনেকে তাই চাঁদা দিতেও অনেক মানুষ আপত্তি জানাতে থাকে কমিউনিস্টদের প্রতি অত্যাচার বাড়তে থাকে পূর্বপাকিস্তানে তবুও সবকিছুর মধ্যে দিয়ে পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট নেতারা বিশ্ব রাজনীতির সঙ্গে নিজেদেরকে স্থাপন করতে উদগ্রীব ছিলেন তারা। চীন , রাশিয়া , হাঙ্গেরি ইত্যাদি অঞ্চলে মাটির কার্যকলাপ নিয়ে যেমন আলোচনা কউসরতেন একইভাবে শেখ মুজিবের ৬ দফা দেওয়া নিয়েও আলোচনা হতো । আসলে বামপন্থী আন্দোলন একটা সময় পূর্ব বাংলায় মুক্তি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে লড়াইকে ভেতরে নিয়ে আসে।
জনগণের যে ক্ষমতা তা তাদের বিশ্বাসের জায়গা থেকে উঠে আসার প্রয়োজন রয়েছে । মানুষের মনে অতীতের স্মৃতিগুলি থাকে। অবশ্যই থাকে। কিন্তু ক্ষমতাশালী রাষ্ট্র তাকে ভুলিয়ে দিতে চায় নিজস্ব কৌশলে । তারা চায় বর্তমানকে প্রধান্য দিতে । কারণ অতীত হয়তো সেই ক্ষমতাশালীর কাছে নিরাশার দ্যোতক। সে সবসময় চায় তাকে অস্বীকার করতে । তাই মানুষের কাছে বর্তমানকে বড় করে তোলে সর্বত্র। ষাটের দশকে অতিবাম আদর্শ ছড়িয়ে পড়ে যশোর, খুলনা,মাগুরা, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা প্রভৃতি অঞ্চলে । এক্ষেত্রে আদর্শের দ্বন্দ্বের থেকে বড় হয়ে ওঠে ক্ষমতা এবং বিভেদের রাজনীতি । তবে বর্তমানে কমিউনিস্ট দলগুলি রাজনীতিতে সক্রিয়। যদিও জোটের লক্ষ্যে তাদের বিরাট কিছু অন্তর্ভুক্তি নেই । তবু টিকে থাকার লড়াই-এ এখনো তাদের কিছু উপদল টিকে আছে । তবে এই সমস্ত বামপন্থী দলগুলোর বিপ্লবের স্তর , রাষ্ট্র চরিত্র , রণকৌশল ইত্যাদি একটি সঙ্গে অন্যটির পার্থক্য রয়েছে।
অন্যদিকে ভারতবর্ষে কমিউনিস্ট আন্দোলন আরো সক্রিয় হয়ে ওঠে যত সময় এগিয়েছে। তাদের যাবতীয় চর্চা বা অনুশীলনের শিকড় গাঁথা রয়েছে ভারতের আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতার মাটিতে । যদিও এ দেশে নিজেদের বিপ্লবী কর্মকাণ্ডকে তারা মানব মুক্তি ও স্বাধীনতার বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক সংগ্রামের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ বলে মনে করেছিল একদিন। ভারতবর্ষের কমিউনিস্ট আন্দোলনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল ১৯১৭ সালের অক্টোবর বিপ্লব । ১৯২০ সালের ১৭ অক্টোবর ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠা লাভ করে এম . এন . রায়ের সাহায্যে। গোড়ার দিকের বছরগুলিতে উপনিবেশ বিরোধী সংগ্রামে বামপন্থীরা ধর্মঘট , আন্দোলন ইত্যাদি চালিয়ে যায় । যেমন ১৯২৮ এবং ১৯২৯ --- শ্রমজীবী মানুষের দ্বারা একের পর এক ধর্মঘট অনুষ্ঠিত হয় । তার সঙ্গে বোম্বের কাপড়ের মিলের শ্রমিক ও বাংলার রেলওয়ে শ্রমিকদের দীর্ঘ লড়াই যুক্ত হয়।
এই পর্বের লড়াইতে একটি অন্যতম অংশ হল তেভাগা আন্দোলন । তেভাগা শব্দের আক্ষরিক অর্থ তিনভাগ। তিন ভাগের মধ্যে ২ ভাগ চাষীদের দেওয়ার দাবি ওঠে । এই আন্দোলন যে সময়ে সংঘটিত হয়েছিল তখন দাঙ্গায় বিধ্বস্ত বাংলার মানুষ । অথচ তেভাগা আন্দোলন হিন্দু মুসলমানের ঐক্যের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত । পুলিশের হাতে আন্দোলনকারী ৭৩ জন মারা যান , তাদের মধ্যে হিন্দু- মুসলমান , আদিবাসী নারী -পুরুষ সকলেই ছিলেন । তেলেঙ্গানার সশস্ত্র সংগ্রাম এ প্রসঙ্গে স্মরণ করা যেতে পারে।
স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে দেশের বিভিন্ন রাজ্যে কমিউনিস্ট সরকার গঠিত হয় । যেমন---কেরালা, পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা। এ প্রসঙ্গে জ্যোতি বসু একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছিলেন । " ১৯৮২ সাল থেকে মধ্যবিত্তদের একটা অংশ ও গ্রামাঞ্চলের একটা অংশের মধ্যে আমাদের রাজনৈতিক প্রভাব হ্রাস পাচ্ছে ।... গ্রামাঞ্চলে আমাদের বিভিন্ন গণফ্রন্টের দুর্বলতা রয়েছে । খেতমজুর গরিব কৃষক এবং মধ্য কৃষক ও অন্যান্যদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক ও ঐক্য বিষয়ে কোনো ক্ষেত্রে বা কোন এলাকার দুর্বলতা আছে । "
আসলে শ্রমিকশ্রেণীর রাজনৈতিক চেতনা বৃদ্ধির ওপরেই বামপন্থার জয়জয়কার । সেই সঙ্গে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় , আদিবাসী প্রমুখদের সমস্যাগুলির ওপর নজর দিয়ে তারা তাদের হারানো জমি পুনরুদ্ধারের চেষ্টায় নামে।
এই চেতনার আরো একটি দিক শিল্প , সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে বাম মনোভাবকে তাত্ত্বিকভাবে প্রবেশ ঘটানো । মার্ক্স বলেছিলেন , আমাদের আগের নাটককাররা চেষ্টা করেছেন এই পৃথিবীকে ব্যাখ্যা করতে , আমরা চেষ্টা করব তাকে পরিবর্তন করতে। বামপন্থীরাই প্রথম দেখালো থিয়েটারের দর্শক শুধুমাত্র দর্শক নন , তিনি একই সঙ্গে তার বিচারক এবং অংশগ্রহণকারী অভিনেতাও বটে । চলচ্চিত্রে ঋত্বিক ঘটক , মৃণাল সেন , নিমাই ঘোষ , শ্যাম বেনেগাল , কেতন মেহেতা , গৌতম ঘোষ , বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত , আদুর গোপালকৃষ্ণন , উৎপলেন্দু চক্রবর্তী , রাজা মিত্র , রাজেন তরফদার প্রমুখ পরিচালকরা আঙ্গিকের ক্ষেত্রে মানবপ্রীতিকেই মর্মমূলে বেঁধে নিয়ে ক্যামেরা হাতে নেমে পড়েছিলেন। সত্যজিৎ রায়ের 'পথের পাঁচালী' সিনেমার সেলুলয়েডে নতুন আঙ্গিক এনে তাকে মানুষের ভেতর পৌঁছে দেওয়াকে সুনিশ্চিত করেছিল। ঋত্বিক ঘটকের তারপর ছিন্নমূল ইত্যাদি দেশভাগ রাজনৈতিক ঘটনা ইত্যাদি কে সামনে নিয়ে এসেছে
একইভাবে সাহিত্যের ভেতরেও ঢুকে পড়ে মানবমুক্তির ধারণাটি । পূর্বে তার যে লক্ষণ দেখা যায়নি , তা নয় । তবে এবার যেন বিষয়টা আরো স্পষ্ট হয়। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের , সমর সেন , বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় , রাম বসু , মঙ্গলাচরণ চট্টোপাধ্যায় , মণিভূষণ ভট্টাচার্য , সুভাষ মুখোপাধ্যায় প্রমুখদের লেখালেখি সমাজ বাস্তবতাকে নির্মম ভাবে প্রকাশ করে। এখানে একটা কথা বলার আছে । জ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে সাধারণত দুটি ভাবনাকে প্রাধান্য দেওয়া হয় । একটি হলো ভাববাদী চিন্তা ; দ্বিতীয়টি হলো বস্তুগত ভাবনাচিন্তা।
---- " ইউরোপীয় বিদ্যাচর্চা বস্তুবাদী ঘরানার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফসল হলেও কার্ল মার্কসের চিন্তা সারা পৃথিবীকে এখনও পর্যন্ত প্রভাবিত করে রেখেছে নিপুণভাবে । মার্কসের চিন্তায় সীমাবদ্ধতা অবশ্যই ছিল , তারা যা সময় , সেই সময়ের ছাপ সর্বাঙ্গে রেখেই তার বৌদ্ধিক বিকাশ ঘটেছে। "
( ' আধুনিকতা , উত্তর আধুনিকতা ও উত্তর
উপনিবেশবাদী মতাদর্শ। '
রতন খাসনবিশ )
১০০ বছর আগে নিজেদের জীবন বিপন্ন করে বামপন্থী আন্দোলনকে এদেশের বুকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন কিছু মানুষ। তাদের আত্মত্যাগকে ভুলে যাওয়া উচিত নয় । মানুষের শোষণের সমাপ্তি ঘটানোই লক্ষ্য ছিল তাদের। আজ সেই সমস্ত মানুষেরা বর্তমান অবস্থা দেখে হয়তো দিশেহারা। আসলে যে আন্দোলন ১০০ বছরে পা রাখল তা এখনো একটি অসম্পূর্ণ প্রজেক্ট । তাই ' ভারতবর্ষে কমিউনিস্ট আন্দোলনের ১০০ বছর ' পুস্তিকায় বলা হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি কথা ।
"এখনো অঘনীভূত এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল। নয়া উদারবাদের উত্থান তাকে দুর্বল করেছে কিন্তু তা নিজস্ব সীমাবদ্ধতা ও সুযোগ দুই বিষয়েই ওয়াকিবহাল।"
ছবি : বিধান দেব
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন