বুধবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২১

ভিনদেশি তারা ।। অরিন্দম রায়


উইসলাওয়া সিম্বোর্স্কা : নোবেল বক্তৃতা, ৭ ডিসেম্বর, ১৯৯৬


বলা হয় যে যেকোনো বক্তৃতায় প্রথম বাক্যটিই সবচেয়ে কঠিন। তাহলে, ঐ বাক্যটি যেভাবেই হোক না কেন আমার পিছু নিয়েছে। কিন্তু আমার এটা মনে হচ্ছে যে আরও বাক্য আসতে চলেছে যেগুলো আমার পিছু নেবে___ তৃতীয়, ষষ্ঠ, দশম , এভাবে চলতেই থাকবে, শেষ লাইন পর্যন্ত ___ সেটিও একইরকমের কঠিন হবে, যেহেতু আমাকে কবিতা নিয়ে কথা বলতে হবে। এই বিষয়ে আমি খুব কমই বলেছি, বলা যেতে পারে কিছুই বলিনি। আর যখনই কিছু বলেছি, আমার সবসময় সন্দেহ হয়েছে যে আমি এই ব্যাপারে মোটেই ভালো নই। এই কারণেই আমার বক্তৃতাটি সংক্ষিপ্ত হতে চলেছে। সমস্ত ত্রুটিই সহ্য করা সহজ হয় যদি সেটা কম পরিমাণে পরিবেশন করা যায়। 


সমকালীন কবিরা সন্দিহান এবং সন্দেহপ্রবণ , সম্ভবত নিজেদের সম্পর্কে। তাঁরা জনসমক্ষে নিতান্ত অনিচ্ছার সঙ্গে স্বীকার করে থাকেন যে তাঁরা কবি, মনে হয় যেন তাঁরা এই ব্যাপারটি নিয়ে বেশ লজ্জিত। কিন্তু আমাদের এই কোলাহলপূর্ণ সময়ে নিজের যোগ্যতা উপলব্ধি করার চেয়ে নিজের ভুল স্বীকার করে নেওয়া বেশ সহজ ব্যাপার, অন্তত যদি সেগুলো আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করা যায়, যেহেতু এগুলো অনেক গভীরে লুকোনো থাকে আর আপনি নিজে কখনই এগুলো বিশ্বাস করেননি… প্রশ্নাবলীর উত্তর দেওয়ার সময় অথবা অচেনা ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলার সময় , যখন তারা নিজেদের পেশা কী সেটা না বলে এড়িয়ে যেতে পারেন না, কবিরা ‘লেখক’ এই সাধারণ নামটিই পছন্দ করেন অথবা ‘কবি’ এই পরিচয় দেওয়ার বদলে লেখালেখি ছাড়াও অন্য যে পেশার সঙ্গে তিনি যুক্ত সেই পরিচয় দিয়ে থাকেন। আমলারা এবং বাস প্যাসেঞ্জাররা কিছুটা অবিশ্বাস ও শঙ্কিত হয়ে সাড়া দেন যখন তারা জানতে পারেন যে তারা একজন কবির সঙ্গে কথা বলছেন। আমার অনুমান দার্শনিকরাও একইরকম প্রতিক্রিয়ার সম্মুখীন হন। তবুও , তাদের অবস্থা অনেক ভালো, যেহেতু তাঁরা পাণ্ডিত্যসুলভ কোনো উপাধি দিয়ে নিজেদের পেশাগত পরিচিতিকে অলঙ্কৃত করতে পারেন। দর্শনের অধ্যাপক , ___ এটা অনেক বেশি সম্মানজনক শুনতে লাগে। 

কিন্তু কবিতার অধ্যাপক বলে কিছু হয় না। সর্বোপরি, এর মানে দাঁড়ায়, যে কবিতা এমন একটা পেশা যার জন্য বিশেষ পড়াশোনা, নিয়মিত পরীক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা, গ্রন্থপঞ্জী এবং পাদটীকাযুক্ত তাত্ত্বিক প্রবন্ধ , এবং সবশেষে, সাড়ম্বরে ডিপ্লোমা প্রদানের বন্দোবস্ত থাকা উচিত। পরিবর্তে, এটাও মানে দাঁড়ায় যে, কবি হওয়ার জন্য পাতা ভর্তি সূক্ষ্ম কবিতা লেখাও যথেষ্ট নয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হল অফিশিয়াল স্ট্যাম্প মারা একটা কাগজের টুকরো। একবার মনে করে দেখুন যে রাশিয়ান কবিতার গর্ব, ভবিষ্যতের নোবেল লরিয়েট জোসেফ ব্রডস্কিকে ঠিক এই যুক্তিতে স্বদেশে নির্বাসনের সাজা দেওয়া হয়েছিল। তারা ব্রডস্কিকে ‘‘একটা পরজীবী’’, বলে অভিহিত করেছিলেন কারণ তাঁর কাছে কোনো সরকারি সার্টিফিকেট ছিল না যেটা তাঁকে কবি হওয়ার অধিকার দেবে… 

বেশ কয়েক বছর আগে , আমার সৌভাগ্য হয়েছিল ব্রডস্কির সঙ্গে দেখা করার। আমি সম্মানিত বোধ করেছিলাম। আমি লক্ষ্য করেছিলাম যে, যতজন কবিকে আমি চিনি, তাঁদের মধ্যে তিনিই ছিলেন এমন একজন যিনি নিজেকে কবি বলাটা উপভোগ করতেন। তিনি এই শব্দটি কোনরকম সঙ্কোচ ছাড়াই উচ্চারণ করতেন।

বরং ঠিক এর বিপরীত ___ তিনি ‘কবি’ এই শব্দটিকে স্পর্ধিত স্বাধীনতার সঙ্গে উচ্চারণ করতেন। আমার মনে হয়েছে ব্রডস্কি এরকম করতেন কারণ যুবক বয়সে লাঞ্ছিত, অপমানিত হওয়ার কথা তাঁর মনে পড়ে যেত।

আরও সৌভাগ্যবান দেশে, যেখানে মানুষের মর্যাদার উপর চট করে আক্রমণ নেমে আসে না, কবিরা আকাঙ্ক্ষা করেন, অবশ্যই প্রকাশিত হওয়ার, পঠিত হওয়ার, এবং চান পাঠক যেন তাঁদের লেখাগুলি উপলব্ধি করেন, কিন্তু সাধারণ মানুষের থেকে, প্রাত্যহিক সংঘর্ষের থেকে নিজেদের আলাদা করার জন্য তাঁরা খুব একটা কিছু করেন না। অথচ খুব বেশিদিন আগেও নয়, এই শতাব্দীর প্রথম দশকে, কবিরা তাঁদের অদ্ভুত পোশাক আর খামখেয়ালি আচরণের মাধ্যমে আমাদের ধাক্কা দিতে চাইতেন। কিন্তু এসবই ছিল নিছক জনগণকে দেখানোর জন্য। সেই মুহূর্ত সবসময় আসে যখন কবিকে দরজা বন্ধ করে দিতে হয়, খুলে ফেলতে হয় পরনের আঙরাখা, জবড়জং গয়নাগাটি, আর যত কাব্যিক সাজসজ্জা আর মুখোমুখি হতে হয় ___ নীরবে, ধৈর্যের সঙ্গে অপেক্ষা করতে হয় নিজের মুখোমুখি হওয়ার __ স্থির সাদা পাতার জন্য। কারণ শেষ পর্যন্ত এটাই সবেচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। 


এটা কোনো আকস্মিক ব্যাপার নয় যে বিজ্ঞানী এবং শিল্পীদের জীবন নিয়ে প্রচুর পরিমাণে ছায়াছবি নির্মিত হয়। আরও উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিচালকেরা বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গে যে সৃজনশীল প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যাওয়ার ফলে একজন বিজ্ঞানী তাঁর গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারটি করেন বা একজন শিল্পী জন্ম দেন একটি মাস্টারপিসের সেই প্রক্রিয়াটিকে পুনর্গঠনের চেষ্টা করেন। পর্দায় যখন নানারকম যন্ত্রপাতি, গবেষণাগারের দৃশ্য, সেই বিজ্ঞানীর পরীক্ষা নিরীক্ষার মুহুর্তগুলি বিশদভাবে ফুটিয়ে তোলা হয় তখন তা স্বাভাবিকভাবেই দর্শকের মনোযোগ আকর্ষণ করে। এবং সেইসব অনিশ্চয়তার মুহূর্তগুলি ___ হাজারবার ধরে করা পরীক্ষায় সামান্য পরিবর্তন করে পাওয়া যাবে কি সেই কাঙ্ক্ষিত ফলাফল?__ নিঃসন্দেহে নাটকীয় মুহূর্তের জন্ম দেয়। চিত্রশিল্পীর জীবন নিয়ে সৃষ্ট চলচ্চিত্রগুলি খুবই আকর্ষণীয়, চিত্তাকর্ষক হতে পারে, কারণ সেখানে বিখ্যাত ছবিগুলির সৃষ্টির মুহূর্তগুলোকে, সেই ছবিগুলোর অভিযোজনের প্রক্রিয়াগুলো ধাপে ধাপে দর্শকের সামনে উপস্থাপন করার সু্যোগ থাকে, পেনসিলের প্রথম রেখা টানা থেকে ব্রাশের শেষ স্ট্রোক অবধি। সুরকারদের নিয়ে তৈরি ছায়াছবিতে সুরই মুখ্য হয়ে ওঠে। তাঁর কানে প্রথম যে সুরের অনুরণন বেজে উঠেছিল সেখান থেকে সিম্ফনির মতো পরিণত কাজ অব্দি। অবশ্যই এই জাতীয় সিনেমাগুলি অতীব সরল হয়ে থাকে এবং সেই জটিল মানসিক অবস্থা যা সাধারণভাবে অনুপ্রেরণা নামেই পরিচিত তার ব্যাখা দিতে ব্যর্থ হয়, তবুও অন্ততপক্ষে কিছু একটা দেখার এবং শোনার মতো থাকে। 


কিন্তু কবিরা হচ্ছে সবচেয়ে খারাপ। তাঁদের কাজগুলি মারাত্মকরকমের আনফটোজেনিক। কেউ একজন টেবিলে বসে আছে বা সোফায় শুয়ে একদৃষ্টিতে দেয়াল বা সিলিং-এর দিকে তাকিয়ে আছে। পনেরো মিনিট বাদে সেই ব্যক্তি সাত লাইন লেখেন তার মধ্যে কেউ হয়ত সেখান দিয়ে একবার হেঁটে যায়, তারপরে আরও একঘণ্টা কেটে যায় , যার মাঝখানে কিছুই ঘটে না… কে এইসব দেখার জন্য দাঁড়িয়ে থাকবে? 

আমি এর আগে অনুপ্রেরণার উল্লেখ করেছিলাম।

সমসাময়িক কবিরা অনুপ্রেরণা কি এবং আদৌ এর অস্তিত্ব আছে কিনা এই প্রশ্নের উত্তরে কিছুটা চাতুরীর আশ্রয় নেন। এমন নয় যে তাঁরা কোনদিন তাঁদের অন্তরে এর মঙ্গলময় অভিঘাত অনুভব করেননি। যা আপনি নিজে বোঝেন না সেটি অন্য কাউকে ব্যাখ্যা করা খুব একটা সহজ নয়।

যখন আমাকে এই বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়, আমিও এড়িয়ে যাই। কিন্তু আমার উত্তর হল এই যে: অনুপ্রেরণা  কবি বা শিল্পীর একচেটিয়া ব্যাপার নয়। বেশ কিছু মানুষ যারা আছেন ,আগেও ছিলেন, যাঁদের কাছে অনুপ্রেরণা ধরা দেয়। সেই সব মানুষ যাঁরা সচেতনভাবে নিজেদের কাজকে বেছে নিয়েছেন এবং যাঁরা ভালোবেসে, কল্পনাশক্তির সাহায্যে সেই কাজটি করেন তাঁরা সকলেই এই শ্রেণির মধ্যে পড়বেন। এঁদের মধ্যে ডাক্তাররা থাকতে পারেন , শিক্ষকরা থাকতে পারেন, মালীরা থাকতে পারেন ___ এরকম আরও একশোটা পেশার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তির নাম আমি এই প্রসঙ্গে করতে পারি। তাঁদের কাজ একটা ধারাবাহিক রোমাঞ্চকর অভিযানে পরিণত হয় যতদিন পর্যন্ত তাঁরা এর মধ্যে নিত্যনতুন চ্যালেঞ্জ আবিষ্কার করতে সক্ষম হন। প্রতিবন্ধকতা এবং বাধা কখনোই তাঁদের কৌতূহলকে দমিয়ে দিতে পারে না। প্রত্যেক সমস্যা যা তাঁরা সমাধান করেছেন তাঁদের সামনে একঝাঁক নতুন প্রশ্ন নিয়ে আসে। অনুপ্রেরণা যাই হোক না কেন, এর জন্ম ধারাবাহিক ‘আমি জানি না’ -এর থেকে। 

কিন্তু এরকম লোক খুব বেশি পাওয়া যাবে না। এই পৃথিবীর বেশিরভাগ বাসিন্দা কোনরকমে প্রয়োজন মেটানোর জন্য কাজ করে থাকেন। করতে হয় বলেই তাঁরা কাজ করেন। কাজ বেছে নেওয়ার পিছনে তাঁদের কোনো আবেগ কাজ করে না; তাঁদের জীবনের পরিস্থিতি তাঁদের হয়ে কাজটি বেছে দেয়। ভালোবাসাহীন কাজ, একঘেয়ে কাজ, কাজের মূল্যায়ন হয় এইভাবে যে যতই ভালোবাসাহীন বা একঘেয়ে হোক না কেন অন্যেরা সেই কাজটি পায়নি ___ এটা মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড়ো যন্ত্রণা। আর তেমন কোনও ইঙ্গিত বা সম্ভাবনা নেই যে আগামী শতাব্দীতে এই অবস্থার কোন পরিবর্তন ঘটবে অন্তত যা চলছে তার থেকে ভালো কোনো পরিস্থিতির জন্ম হবে। 


সুতরাং আমি, যদিও অনুপ্রেরণার উপর কবিদের একচেটিয়া অধিকারের বিষয়টি অস্বীকার করি, আমি তাঁদের  বিশেষভাবে সৌভাগ্যবান বলে মনে করি। 


এই মুহূর্তে, যদিও, আমার শ্রোতাদের মনে কয়েকটি সন্দেহের উদ্রেক হতে পারে। সবধরনের অত্যাচারী, স্বৈরাচারী, ধর্মান্ধ এবং বাক্যবাগীশ নেতারা যারা ক্ষমতায় আসার জন্য গরম গরম শ্লোগান দেন তারাও নিজেদের কাজকে উপভোগ করেন, এবং বেশ উৎসাহের সঙ্গেই করেন আর উদ্ভাবনী শক্তিরও পরিচয় দিয়ে থাকেন। হ্যাঁ, কিন্তু তারা ‘জানেন’। তারা জানেন, যা-ই তারা জানেন তাদের জন্য সেই জানাটাই যথেষ্ট। তারা আর অন্য কোনো কিছু সম্পর্কে জানতে চান না, কারণ এরকম করলে সম্ভবত তাদের তর্কের জোর কমে যায়। আর যেকোন জ্ঞান যা নতুন প্রশ্নের দিকে আমাদের চালনা করে না দ্রুত হারিয়ে যায়: জীবন ধারণের জন্য যে উত্তাপের প্রয়োজন হয় তা বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়। শুধু তাই নয় সমাজের জন্য অনেকসময় মারাত্মক ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে। প্রাচীন এবং আধুনিক ইতিহাসের এমন অনেক ঘটনা আমাদের জানা আছে।


যে কারণে, ‘আমি জানি না’ এই ছোটো শব্দবন্ধটিকে আমি এত গুরুত্ব দিয়ে থাকি। এটা ছোটো, কিন্তু শক্তিশালী ডানায় ভর করে ওড়ে। এটি আমাদের জীবনকে আরও প্রসারিত করে যাতে আমাদের ভিতরে আরও একটু জায়গার সংকুলান হতে পারে সেই সঙ্গে আমাদের বাহ্যিক জীবনেরও সম্প্রসারণ ঘটাতে সাহায্য করে যে জীবন নানা পার্থিব কারণে আটকা পড়ে যায়। যদি আইজ্যাক নিউটন কোনোদিন নিজেকে না বলতেন “আমি জানি না,” তাহলে তাঁর বাগানে আপেলের বৃষ্টি হয়ে যেত আর তিনি সবথেকে বেশি যা করতেন তা হল নীচু হয়ে আপেলগুলি কুড়িয়ে নিতেন আর তৃপ্তি সহকারে সেগুলি খেতেন। আমার স্বদেশনিবাসী মারি ক্যুরি যদি কোনোদিন নিজেকে না বলতেন “আমি জানি না”, হয়ত সারাজীবন তিনি কোনো প্রাইভেট কলেজে ধনীর দুলালীদের কেমিস্ট্রি পড়াতেন, এবং একটা সম্মানজনক পেশায় নিযুক্ত থেকেই তাঁর জীবন কাটিয়ে দিতেন। কিন্তু তিনি নিজেকে বারবার বলে গেছেন “আমি জানি না” এবং এই শব্দবন্ধ তাঁকে একবার নয় দু-দুবার, স্টকহোম-এ নিয়ে এসেছে, যেখানে অস্থির, অনুসন্ধিৎসু মানসিকতাকে কখনও কখনও নোবেল পুরস্কারে পুরস্কৃত করা হয়ে থাকে। 

কবিরা, যদি তাঁরা প্রকৃত কবি হন, নিজেদের বারবার বলে যেতে হবে “আমি জানি না।” প্রতিটি কবিতা এই বিবৃতির উত্তর দেওয়ার একটা প্রচেষ্টাকে চিহ্নিত করে, কিন্তু যখনই সাদা পাতার উপর চূড়ান্ত পর্যায় এসে উপনীত হয়, কবি তখন দ্বিধা করতে আরম্ভ করেন, তিনি বুঝতে শুরু করেন যে তাঁর নির্দিষ্ট উত্তরটি একেবারেই কাজ চালানো গোছের যা কিনা সম্পূর্ণভাবে অনপুযুক্ত। তাই কবিরা চেষ্টা চালিয়ে যান, আর তার ফলাফল হিসেবে আজ হোক কাল হোক কবিদের উপর্যুপরি আত্ম-অসন্তুষ্টিকে একটা প্রকাণ্ড পেপারক্লিপ দিয়ে জুড়ে সাহিত্যের ঐতিহাসিকরা তার নাম দেন “সাহিত্যসম্ভার”। 


আমি মাঝেমধ্যে এমন সব পরিস্থিতির স্বপ্ন দেখি যা সম্ভবত কখনই বাস্তবায়িত হতে পারে না। আমি দুঃসাহসের সঙ্গে কল্পনা করি, যেমন ধরুন, যে আমার সুযোগ হল সমগ্র মানবজাতির অহমিকা নিয়ে শোকগাথা লেখা এক্লেসিয়াসটেস এর সঙ্গে কথা বলার। আমি তাঁর সামনে নতজানু হবো, কারণ তিনি, অন্তত আমার  মতে মহান কবিদের মধ্যে একজন। এইসব হয়ে গেলে, আমি তাঁর হাত আঁকড়ে ধরব। ‘“পৃথিবীতে নতুন কিছুই নেই’: এটাই আপনি লিখেছিলেন, এক্লেসিয়াসটেস । কিন্তু আপনি নিজেই জন্মেছিলেন নতুন হয়ে, এই পৃথিবীতে এবং যে কবিতাগুলি আপনি সৃষ্টি করেছিলেন, সেগুলোও ছিল একেবারে আনকোরা, যেহেতু পৃথিবীতে, আপনার আগে কেউ এগুলো লেখেনি। এবং আপনার সমস্ত পাঠক তারাও নতুনই ছিলেন এই পৃথিবীতে , কারণ আপনার জন্মের আগে যারা বেঁচে ছিলেন তাদের আপনার লেখা পড়ার কোনো সুযোগ ছিল না। এবং যে সাইপ্রেস গাছের তলায় আপনি বসে আছেন সৃষ্টির আগেই তার জন্ম হয়নি। এক্লেসিয়াসটেস, আমি আপনাকে জিগ্যেস করতে চাই নতুন কী নিয়ে আপনি এখন কাজ করার পরিকল্পনা করছেন? যা কিছু ভাবনাচিন্তা আপনি ইতিমধ্যেই ব্যক্ত করেছেন তার সঙ্গেই কিছু যোগ করার কথা ভাবছেন? নাকি সেগুলোর মধ্যে কয়েকটি খণ্ডন করতে লোভ হচ্ছে আপনার এখন? আপনার পূর্বের কাজগুলিতে আপনি আনন্দের উল্লেখ করেছিলেন ___ কী হবে যদি তা দ্রুত ফুরিয়ে যেতে থাকে? হয়ত আপনার নতুন লেখা কবিতাগুলো হবে আনন্দ নিয়ে? আপনি কি নোটস নিয়েছেন, খসড়া তৈরি করেছেন কিছু? আমার সন্দেহ আছে যে আপনি বলবেন, “আমার সমস্তকিছু লেখা হয়ে গেছে, আমার আর নতুন করে যোগ করার মতো কিছু নেই।’ পৃথিবীর কোনও কবি এমনটা বলতে পারেন না, আর আপনার মতো মহান কবি তো কখনই নয়।”


এই বিশ্ব __ আমরা যাই ভাবি না কেন এর বিশালত্ব আর আমাদের অক্ষমতার কারণে ভীত হয়ে, অথবা তিক্ত মনোভাব পোষণ করে থাকি ব্যক্তিগত যন্ত্রণার প্রতি এর উদাসীনতার কারণে, মানুষের, পশুর, এবং সম্ভবত গাছপালার, কীভাবে আমরা এত নিশ্চিত হয়ে যাই যে গাছেরা কোনও যন্ত্রণা অনুভব করে না,  যা কিছুই আমরা ভাবি না কেন এর বিস্তৃতি যা নক্ষত্রের আলোয় এফোঁড় ওফোঁড় হয়ে যায় একে ঘিরে থাকা গ্রহরা যাদের আমরা সবেমাত্র আবিষ্কার করতে শুরু করেছি, গ্রহগুলি যারা কিনা ইতিমধ্যেই মৃত? এখনও মৃত? আমরা স্রেফ জানি না; যা-ই আমরা ভাবি না কেন এই অসীম থিয়েটার সম্পর্কে যেখানে আমরা রিজার্ভ টিকিট পেয়ে গেছি, কিন্তু সেই রিজার্ভ টিকিটের মেয়াদ হাস্যকরভাবে সংক্ষিপ্ত, দুটো খামখেয়ালি তারিখের দ্বারা যা সীমাবদ্ধ; আর যা কিছু আমরা এই বিশ্ব সম্পর্কে ভাবি না কেন ___ এটি বিস্ময়কর।


কিন্তু ‘বিস্ময়কর’ এই বিশেষণটির মধ্যে একটি যৌক্তিক ফাঁদ লুকোনো আছে। আমরা বিস্মিত হই, মোটের উপর, যা কিনা সুপরিচিত এবং বিশ্বজনীনভাবে স্বীকৃত, আমরা যাতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি সেইসমস্ত ঘটনার  থেকে আলাদা এমন ঘটনা ঘটলে। এখন কথা হচ্ছে, এরকম কোনো সংশয়াতীত নিশ্চিত জগৎ নেই। আমাদের বিস্মিত হওয়ার বোধ সহজাত এবং সেটি অন্য কিছুর সঙ্গে তুলনার উপর নির্ভর করে না। 


আমাদের দৈনন্দিন কথাবার্তায়, যেখানে আমরা প্রতিটি শব্দ থেমে থেমে ভেবে ভেবে বলি না, সেখানে আমরা সকলেই “ সাধারণ পৃথিবী”, “ সাধারণ জীবন” “ সাধারণ ঘটনাস্রোত” … এই জাতীয় শব্দবন্ধ ব্যবহার করে থাকি। কিন্তু কবিতার ভাষায়, যেখানে প্রতিটি শব্দ নিক্তিতে মাপা হয়, সেখানে কিছুই সাধারণ বা স্বাভাবিক নয়। একটা পাথরও না আর তার উপরে একটা মেঘও না। একটা দিনও না আর তার পরে একটা রাত্রিও না। আর সর্বোপরি, একটা অস্তিত্বও না, এই পৃথিবীতে আর কারুর অস্তিস্ত্ব না। 


মনে হয় কবিরা চিরকাল নিজেদের পথ নিজেরাই তৈরি করে নেবেন।  


উইসলাওয়া সিম্বোর্স্কা-র  জন্ম ১৯২৩ খ্রীস্টাব্দের ২রা জুলাই , পোল্যান্ডে। পরিবারের দুই কন্যাসন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন কনিষ্ঠতম। শৈশবেই ছোটগল্প এবং গান রচনার মধ্যে দিয়ে লেখায় হাতেখড়ি। কবি হিসেবে আত্মপ্রকাশ ১৯৪৫ সালে। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থগুলি হল Calling Out To Yeti , Salt, No End of Fun , Could Have , A Lare Number , The People On The Bridge , The End and The Beginning , Here ইত্যাদি। লিখেছেন পোলিশ ভাষায়।তাঁর কবিতাগুলি অনূদিত হয়েছে ইংরেজিসহ অন্যান্য ভাষাতে। কবিতা লেখার পাশাপাশি বিভিন্ন লিটারারি জার্নালে তিনি সম্পাদক হিসেবে কাজ করেছেন। যার মধ্যে  Zycie Literackie এবং Pismo উল্লেযোগ্য। ১৯৯৬ সালে সিম্বোর্স্কা সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান। ২০২১ সালের ১লা ফেব্রুয়ারি  তাঁর প্রয়াণ ঘটে।


ঋণ : nobelprize.org 


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

কবিতা

সম্পাদকের কথা

দ্বিতীয় বর্ষ  ।। অষ্টম সংখ্যা ।। মার্চ ২০২২   খুব অসহায় লাগছে এবার। আমাদের ডান পাশে ধস। বায়ে গিরিখাত। মাথায় বোমারু। পায়ে পায়ে হিমানীর ব...