মঙ্গলবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২১

গুচ্ছ কবিতা : মজিদ মাহমুদ





একাকীত্ব


এমন দিন তো আসতেই পারে- যখন লোকজন আমারই মতো একা হয়ে যাবে

আমারই মতো তাদের আনন্দ বেদনাগুলো তাদের সাথে খেলতে থাকবে

নদীতে জল উঠাবে, গরুগুলো সূর্যাস্তের আগে ফিরে যাবে নিজস্ব আলয়ে

আমারই মতো ধূম্রজলে শব-শৎকার করে বসে থাকবে লাল চুল্লির পাশে


আমাকেই ডাকতে থাকবে তাদের নিজ নিজ নামে- বলবে হে মানুষ, ঈশ^রশর্মা

আমাদের অলীক কষ্টগুলো, মায়া ও প্রপঞ্চগুলো মূলত তোমার রহস্যের ছায়া

তুমি মরে যাবার পরেও আমরা অনেক অনেক দিন মরে গেছি, কদাচিৎ জেগেছি

আমাদের ভাষা নির্মাণ বাঁশিতে সুর সংযোগ আমাদের একাকীত্বের দীর্ঘশ্বাস


কে তুমি প্রাচিন প্রপিতামহী এখনো আছ জেগে, এখনো ভাবছ হয়তো কেউ

পর্বত থেকে নেমে আসবে জলে- বলবে এখনে বাজবে না একাকীত্বের সঙ্গীত

সকল শিশু পানিতে ভাসতে ভাসতে কিনারায় উঠবে লম্ফে, কেউ তাদের

পারবে না ধরতে, কোল থেকে কোলে ছড়িয়ে পড়বে- আনন্দের টানে


যারা বলে একাকীত্ব তাদের উপভোগ্য- তারা ঈশ্বরের মতো ভয়ঙ্কর একা

আমারই মতো তোমরাও একদিন একা হতে হতে পেয়ে যাবে তার দেখা।





শোকগাথা


সূর্যটাকে নিজস্ব আয়নার সাথে যুক্ত করার আগেই

আমাদের রাতগুলো বেরিয়ে আসে দিনের আলোয়

বলি, পাখি ডাকার একটু ফুরসত দাও ভাই

দাও মোরগের গলা ফুলাবার কারুকাজ

সারাদিন সঙ্গীনির কাছে যেন কিছুটা গাঁক অবশিষ্ট থাকে

পুরুষ প্রজাতির আজ পৃথিবীতে বড়ই হ্যাপা

নিষিক্ত ডিম্বকগুলো ল্যাবরেটরিতে দিচ্ছে জানান

জনকের প্রয়োজনীয়তা যদি ফুরিয়ে গেল

তাহলে নেমে আসতে কতক্ষণ প্রকৃতির প্রতিশোধ

ডিম ফোটাতে আজ মোরগের অবদান নেই

মিলন ছাড়াই গাভিগুলো বাচ্ছা দিচ্ছে

আর বকনাগুলো হাসছে বলদগুলোর বেহাল অবস্থা দেখে 

এমন ত্যাগ আর খাদ্যগ্রহণ- এমন কি মহৎ কাজ

তোমার এই বেঁচে থাকা- বড়জোর মসজিদের 

সারিগুলো কিছুটা লম্বমান করা

রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রেও আজ তোমার প্রাধান্য গৌণ

রাজার জন্য যেহেতু হচ্ছে না লাইনে দাঁড়াতে

তাহলে ট্রিগারের মতো অস্ত্রের বাড়তি অংশ অহেতুক বহন

যারা আজ তোমাকে শেখাচ্ছে বাঙ্কার আর বেয়োনেট এক

তুমি কি এখনো পড়ে আছ তাদের সঙ্গ লিপ্সায়

নাকি ভার্চুয়াল মধ্যমার সাথে করছ খুঁনসুটি

সকাল হলেই বাতাসে ভেসে আসা একটি মার্জারের মতো 

রাবারের মুষিকের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ছ ব্যর্থ আক্রোশে

যারা তোমায় দেহহীন ভুলিয়ে রেখেছে

তুমি সারাদিন ব্যস্ত তাদের অন্বেষণে

হে আমার সন্তান হে আমার বিভাজিত রেখা

তোমার ক্রুশ তোমাকেই করতে হবে বহন

কবর খোড়ায় উৎসবে যারা গাইছে সঙ্গীত

এমনকি মন্দিরের ঘন্টাগুলো তুমিই বাজিয়ে দিচ্ছ শূন্যে

আর দাঁড়িয়ে থেকো না- রাস্তার পাশে যে মা অপেক্ষায় ছিল

তাকে বলো তোমার অক্ষমতার কথা

যে জন্মের জন্য তোমার ছিল না মূল্য পরিশোধোর দায়

কেন করছ তার অহেতুক খোয়াবার ভয়!





হৃদয় 


তুমি না থাকলে হৃদয় থাকার কি মানে

কেনই বা হৃদয় থকতে হবে

তোমায় অনুভব করা ছাড়া 

হৃদয় আর কোন কাজে লাগে

অদৃশ্য বাতাস সমুদ্রের কাছে এসে ঝড়ের সৃষ্টি করে

জলের অনুগুলোর সাথে সে পুনরায় মিলিত হতে চায়

ধরো সব কিছু আছে- তুমি নেই

তাহলে হৃদয় দিয়ে আমি কি করব

আমার যে-সব অঙ্গ লেহন করে

তার জন্য বস্তুর উপস্থিতি যথেষ্ট

কিন্তু তুমি তো বস্তুর অতীত

তোমাকে স্পর্শ করার জন্য আমার এই হৃদয়

আমি যখন একা হই- কাঁদতে থাকি

স্বজনরা আমায় সান্ত¡না দেয়

কিন্তু আমার এই অদৃশ্য মিলন কেউ

দেখতে পায় না

অনেকেই বলে হৃদয় বলে কিছু নেই

এসব দেহের কামনার সমষ্টি

তার মানে ওরা বলতে চায়- তুমি নেই

তুমি না থাকলে আমার থাকারই বা কি মানে

তুমি নেই তো আমিও নেই

এসব মাংসপিণ্ড দিয়ে আমি কি করব 

রিপুর দাস হয়ে থাকা

পেটের জন্য খাদ্য সংগ্রহ

মিলনের জন্য বিপরীত লিঙ্গের অনুসন্ধান

পায়ের ওপর ভর দিয়ে চলা- কার ভালো লাগে

আমি তো বেঁচেই আছি আমার হৃদয়ের জন্য

হতে পারে তুমিই আমার হৃদয়

তুমিই আমার ভালোবাসা

তোমার বহিরাঙ্গ

লতাপাতা প্রজাপতি

রঙধনুর রঙ দেখে

আমার হৃদয় যখন নেচে ওঠে

তখনই বুঝতে পারি তুমি আছ

তুমি হাসছ আমার ব্যাকুলতা দেখে

যেন বলছ- আমি তো তোমার জন্য

আমার কোটিদেশ ও বিম্বাধর

স্তনযুগল- প্রকৃতির মত পরিশুদ্ধ

আমার হৃদয়ের আকাক্সক্ষায় তুমি মুক্ত

এই কামনা ও বিচ্ছেদে আমাদের মিলন

দেহের মিলন ফুরিয়ে গেলেও

তোমার হৃদয়ে আমার বাস

হৃদয় প্রেমিকের আবাস

যখন হবে দেহের অবসান

তখন তুমি আমার করবে পুনর্নিমাণ

কারণ তোমার হৃদয়ে আমার বাসস্থান।





নদী



নদী নিয়ে আমার কারবার

নদীতে গেছি বারবার

মাছ ধরেছি মাছ ধুয়েছি

পানিতে হয়েছে রক্ত লাল

নদীর পানিতে ফেলেছি বড়শি

নদী আমাকে বলেছে কাল-

মা বকলে মোহনায় আসিস

জলেতে দু’জন ভেজাব পা

সাঁতার শেখাব

সাঁতার শিখবি

জানবে না কথা- পাড়া ও গাঁ

একটি নদী শৈশব থেকে

এনেছিল আমায় নদীতে ডেকে

পাল তুলে কেউ বর্ষার দিনে

দূর-দূরান্তে নিয়ে যায় চিনে

নদীর টানে ফিরে আসি ঘরে

নদী চলে বহমান

আমি ফিরে আসি নদীর টানে

এই তটিনী আমার প্রাণ

বলি নদীকে- নৌকাখানি

স্বচ্ছ তোমার বুকে নাও টানি

আমি দাঁড় বায়

সকাল ও রাতে

নদী বলে- তুমি দাঁড়ি নও ভালো

মীন খুঁজে ফের গভীর রাতে

রাগ করে বলি- হয়েছে কি তাতে

ছাই দেইনি কারো বাড়া ভাতে

কার প্ররোচনায় ভেঙেছি ঘর 

কে করেছে দিগম্বর

কে নিয়েছে তরল যত

ভেদ করেনি আপন পর

তোর তরলে গরল ফোটা

আমার জীবন নিয়েছিস গোটা

মৃত ভাসানে চাঁদের ব্যাটা

বেহুলার খোঁজ নেই

নদী আর আমি কাছাকছি থাকি

পার করি নদীকেই।




নির্জন বিটপীর তলে


আবার কি আমাদের দেখা হতে পারে

আমরা কি অনেকটা দূর চলে গেছি

সায়াহ্ন কি হয়েছি পার

ফিরতে গেলে বেলাবেলি বড় কি দেরি হয়ে যাবে

বৃক্ষের নিচে কি নেমেছে ছায়া

পাতার আড়াল থেকে পারব কি চিনতে অবয়ব

আলো থেকে দূরে গেলে তুমি কি তেমনই থাক

পুনরপি ভাবতে গেলে নিশ্চিত সায়ংকাল

নদীও হয়েছে উত্তাল ভরপুর

মাঝি চলে গেছে পারে

অথৈ তটিনী আমি পাব কি সন্তরণে 

এই ভর সন্ধ্যায় ফিরে গেলে তুমিও 

নাকি আমারই মতো দ্বিধায়

নাকি বিপদ ঘনিয়েছে ঘনিষ্ঠতার দায়ে

এখনো প্রান্তরে বুড়ো বিটপীর নিচে

সাঁঝের অন্ধকারে খুঁজছ কোনো মুখ

প্রেতমূর্তি হয়তো একা একা কইছে কথা

এখানে এসেছে নেমে বিচ্ছেদের শূন্যতা।




মৃতদের রাজ্যে


এত এত মরা মানুষের সাথে থাকি বলেই কি আমার মরে যেতে ভয়

পুনরায় মরে কিভাবে প্রমাণ করব আমিও মরেই ছিলাম

যে-সব লাশের সঙ্গে বসবাস করি- তাদের খুব কমই সদ্যমরা

তাদের শরীর থেকে কবেই খসে পড়েছে কাফনের বস্ত্র

এমনকি হাড্ডিগুলো প্রায় নেই বললেই চলে

তবু তারা প্রত্যেকে ভাবছে তাদের কাপড় আব্রু ঢাকার মতো অক্ষত

অথচ তারা কেউ মারা গেছে আদম ও ঈভের জীবদ্দশায়

কেউ আব্রাহামের অগ্নিকুণ্ডে

কেউ মারা গেছে সক্রেটিস কিংবা তার শিষ্যদের সাথে

দু’একজন এমনও আছে যারা যিশুর সাথে ক্রুশবিদ্ধ হয়েছিল

অথবা কেউ কুষ্ঠরোগী, কেউবা বদ্ধ-উন্মাদ

মৃত্যুর পরেও ভাবছে ঈশ্বরপুত্র তাদের সুস্থ করে তুলবেন

হাজার দু’হাজার বছরের মৃত্যুর ভেতর দিয়েই তো আমি হাঁটছি

অবশ্য দু’একবার কেউ জেগে উঠতেও চেষ্টা করেছে

ঘুমের ঘোরে স্লোগান দিয়েছে ইনকিলাব জিন্দাবাদ

কিন্তু তারাও তো আজ মৃত

এই সব সদ্য-মরার দুর্গন্ধে আমি আজ দিশাহারা

আমরা মৃতরা শব সাফসুতর না করে

গলিত শবের উপর ছড়াচ্ছি গোলাপ-জল

এখানে মৃতরাই বহন করছে মৃতদের কফিন

মৃতদের কাছ থেকে দু’এক পয়সা কামিয়েও নিচ্ছে

কেন ভাই তুমি এখনো দাবি করছ জীবিত 

তুমি তো ঘুমের মধ্যে হাঁটছ

স্বপ্ন দেখছ

বলছ সব কাজ তোমার পিতামহ আগেই করেছে সমাপন

তাহলে কেনই বা তুমি বাঁচতে চাচ্ছ

উপরে বোঝাই, নিচে খালাস ছাড়া আর কি কাজ রেখেছ বাকি 

অনেকদিন বেঁচেছিলে বলে

মৃতদের কাছে শুয়ে শুনেছিলে মৃতদের গল্প 

আর ভেবেছিলে তুমি হয়তো বা এখনো রয়েছ জেগে

এ সব শব শৎকারের জন্য তোমায় না বাঁচলেও চলে

কেবল ডারউনের বান্দর, ফ্রয়েডের মণ্ডুপাত ছাড়া

তোমার কি কোনো এজেন্ডা নেই

যারা তোমায় জন্ম দিয়েছিল

তারা কি রেখে দিয়েছিল তোমার জননতন্ত্র 

না কি তোমায় কবর পাহারায় নিযুক্ত রেখে তারা দিচ্ছে ঘুম

অথচ তুমিও পারছ না বুঝতে তুমিও মরে গেছ

কতিপয় চতুর মৃতদের রাজ্যে!


ছবি : বিধান দেব 


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

কবিতা

সম্পাদকের কথা

দ্বিতীয় বর্ষ  ।। অষ্টম সংখ্যা ।। মার্চ ২০২২   খুব অসহায় লাগছে এবার। আমাদের ডান পাশে ধস। বায়ে গিরিখাত। মাথায় বোমারু। পায়ে পায়ে হিমানীর ব...