মঙ্গলবার, ২৯ ডিসেম্বর, ২০২০

অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত ।। স্মরণ : রজতকান্তি সিংহচৌধুরী

 



দোলায় আছে ছ'পণ কড়ি

এক

হেমন্তের গোধূলি আর সন্ধ্যার ভেতরে তেমন তো কোনও ফারাক থাকে না। ১৭ নভেম্বর ২০২০ হির্শবার্গের সন্ধ্যা আর কলকাতার রাত্রির দ্বিতীয় যামের তফাৎ লুপ্ত করে দিয়ে চলে গেলেন কবি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত (৬ অক্টোবর, ১৯৩৩--- ১৭ নভেম্বর, ২০২০)। রবীন্দ্রনাথ এবং অমিয় চক্রবর্তীর পরে আমাদের সাম্প্রতিকতম বিশ্বকবি। তাঁর কবিতায় স্থানকালের ক্রমিক প্রসার আমাদের মাতৃভাষা, আমাদের দুঃখিনী বর্ণমালার বৈভব। কাব্যভাষার অকুতোভয় প্রয়োগে নতুন বাক্ রীতির, বাক্ স্পন্দের দুনিয়া রচনা করে কবি শ্রীমধুসূদনের পরে আর কেই বা বাংলা ভাষার আকম্র সীমারেখাকে এমন হাট করে খুলে দিয়েছেন?
"দোলায় আছে ছ'পণ কড়ি "(২০১৬ অভিযান)। অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের কবিতার উত্তর পর্বের এক উজ্জ্বল প্রস্থানবিন্দু। সদ্যপ্রস্থিত কবির ছ'দশক ছাপানো কবিতাযাত্রার শিখরে যে শেষ পঞ্চক, তার সূচনা কিন্তু এই হার্দ্যমধুর কবিতার বইটি দিয়েই। 'সাহিত্যের বেলাভূমি'-র পাঠক লক্ষ্য করবেন, অলোকরঞ্জনের অধিকাংশ কবিতার বইয়ের নামও কিন্তু ছন্দোময়, তাঁর কবিতার মতোই। মালার্মের মতো তিনি বিশ্বাস করেন, সরকার আসবে যাবে, কিন্তু ছন্দ থেকে যাবে। বক্ষ্যমাণ কবিতার বইটির নামকরণে এসে গেছে একেবারে ঘরোয়া, লোকায়়ত, প্রায় সবার জানা বাংলার এক ছেলে ভুলানো ছড়ার চরণ এবং ছন্দ, শ্বাসাঘাতপ্রধান স্বরবৃত্ত।
বইয়ের নামে এবং অনেক কবিতার বেলাশেষের বা বিদায়ের ছবি, অন্তময়তার রেশ। কিন্তু সে বিদায়সুর কোনও নিরাশায় তলিয়ে যায় না। সে সুর, আমাদের সৌভাগ্যক্রমে, মধুর, কৃতজ্ঞতার, মুগ্ধতার। এই আলো, এই সৌন্দর্যভরা পৃথিবীর মাঝখানে তিনি হয়তো শারীরিকভাবে থাকবেন না। কিন্তু কীই বা তাতে আসে যায়! এইখানে তাঁর জীবন দেবতা রবীন্দ্রনাথের সুরে সুর মিলিয়ে গেয়ে উঠতেই পারেন সুধাকণ্ঠ অলোকরঞ্জন, 'মধুর তোমার শেষ যে না পাই, প্রহর হল শেষ '। অঙ্গবিহীন আলিঙ্গনে সকল অঙ্গ ভরিয়ে তোলবার নেশায় হলই বা সেটা সায়ন্তনের 'ক্লান্ত ' ফুলের গন্ধ। যে গানটি তিনি একদিন গেয়ে শুনিয়েছিলেন হাইডেলবার্গের অহংকার এবং বিশ্ববিশ্রুত দার্শনিক হান্স-গেয়র্গ গাদামারকে। বস্তুত এ গানটি লেখাও হয়েছিল জার্মানির স্টুটগার্টে। ২১ সেপ্টেম্বর, ১৯২৬। রবীন্দ্রনাথ তখন ইউরোপ সফরে। ইতালির আতিথ্যগ্রহণ নিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে ছুটে আসা ছোট কথার ঝাঁক থেকে বেরিয়ে আসতে গানের সুরের মুক্তি খুঁজছেন, ছন্দে স্পন্দিত হয়ে উঠছে আলোক-অন্ধকার।

দুই

মূলত 'যৌবন বাউল'(১৯৫৯) এবং অংশত তার প্রথম ও দ্বিতীয় পর্বের কবিতা নিয়েই অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের কবিতার অধিকাংশ আলোচনা শেষ হয়, 'মরমী করাত'(১৯৯০) অথবা 'রক্তমেঘের স্কন্দপুরাণ'(১৯৯৩) পর্যন্ত যার অন্তিম সীমা। এর একটা কারণ হয়তো, তাঁর অনেক বইয়ের অলভ্যতা। 'কবিতাসংগ্রহ'-এর তিনটি খণ্ডই আপাতত প্রকাশিত, 'রক্তমেঘের স্কন্দপুরাণ'(১৯৯৩) অবধিই যেখানে বিধৃত। 'শ্রেষ্ঠ কবিতা' নিঃশেষিত বহুকাল। এই সব কারণেই এর পর থেকে বুঝি শুরু হয়ে যায় পূর্বজ আর এক দাশগুপ্ত কবির মতো পাঠক হারানোর বৃত্তান্ত। উত্তর পর্বের পরিণত জীবনানন্দ বিষয়ে বুদ্ধদেব বসুর অনাগ্রহ কি একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ নয়? এক নদীতে দুবার স্নান করা যায় না। কৈশোরে ঠাকুর্দার মুখে শোনা গ্রিক দার্শনিক হিরাক্লিটাসের এই ভ্রূভর্ৎসনা মেনে কবিতা থেকে কবিতার উজাড় গাঙে ক্লিষ্ট পুনরুক্তি খারিজ করতে করতে এগিয়ে চলেন কবি। তাঁর কবিতার ধরতাই এখনও অনেক কবিতাপ্রেমিক পাঠকের কাছে অধরা।
তাই এ শহরে তাঁর লেখালেখি নিয়ে আলোচনা নজরে পড়ে কম। শুধুমাত্র শেষ পাঁচটি কবিতা-বইয়ের ঋদ্ধিঋণ বাংলা ভাষাভাষী হিসেবে বর্তমান বিনীত প্রতিবেদককে কৃতজ্ঞ করে।
রবীন্দ্রনাথের শেষ দশকের কবিতা তাঁর নিবিড় বন্ধু শঙ্খ ঘোষের মতো তাঁরও গভীর আগ্রহের বিষয়। আমাদের বিনীত বিবেচনায়, তাঁর জীবন দেবতা রবীন্দ্রনাথের মতো অলোকরঞ্জনের কবিতা-যাত্রায় শেষ দশকটি নব নব উন্মেষশালিনী কল্পনা-প্রতিভায় বেড়াডিঙোনো দৌড়বীরের মতো বাংলা কবিতার কম্প্র সীমারেখাকে দিকে দিগন্তরে বিসর্পিত করবার বিবরণ। একটি দ্রবপাত্রের মতো অস্থির আয়তনের ভেতরে বসেও কবি বজায় রাখছেন তাঁর এপিক শ্বাস, বাংলার অজস্র লিটল ম্যাগাজিনের সম্পাদক, ছোট ছোট প্রকাশকের হাতে উজাড় করে বিলিয়ে দিচ্ছেন তাঁর অমূল্য সব কবিতা, গদ্য। স্রোতের ভেতরে ধ্রুবতারার আদলের মতো কবিতার শাশ্বত ফুটে বেরুচ্ছে নৈমিত্তিকের ভেতরে। ঘরোয়া তাঁর শিকড়চেতনা এসে মিশছে দুনিয়াজোড়া তাঁর শরণার্থী চেতনায়। 'তোমরা কি চাও, শিউলি না টিউলিপ'(২০১৭) বইয়ের বিভাব কবিতায় কবি তাই লিখলেন, 'বসতবাড়ির শেষবারকার পুজোয়/ শেফালিকার শুভ্র আগুনটাকে/ চ্য়ন করে বেড়িয়ে পড়লাম নিরঞ্জনের আগে'। পৌঁছলেন কোথায়? পৌঁছলেন ভিনদেশের গাঁয়ে, 'সেখানে শুধু অজস্র টিউলিপ/যা শুধু লাগে নশ্বরের কাজে'। আমরা জানি ১৯৫৭-৭১ পর্বে যাদবপুরের জনপ্রিয় অধ্যাপক কবি গত শতকের সাতের দশকে জার্মানির হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। তখন থেকেই তাঁর সময় কলকাতা ও জার্মানির মধ্যে দ্বিধাবিভক্ত। রিখিয়ায় তাঁদের একান্নবর্তী ভিটেবাড়ির পুজোর শিউলি ফুল এসে মিলল ইউরোপীয় টিউলিপে। প্রথম পর্বের শাশ্বত হতে চাওয়া কবিতা ব্যস্ত হল নশ্বর নৈমিত্তিকে। যুদ্ধের বিরুদ্ধে তাঁর নাছোড় জেহাদে।

তিন

পার্থপ্রতিম দাসের অসামান্য প্রচ্ছদ শোভিত পাঁচ ফর্মা ছাপানো এই 'দোলায় আছে ছ'পণ কড়ি' বইটার বিভাগ কবিতায় কবি বলেছেন, "মনের ভেতর গুমরে ওঠে/ ধাইমার সেই দাবি/ মাছের কাঁটা পায়ে বিঁধলে/ দোলায় চেপে যাবি/ দোলায় আছে ছ'পণ কড়ি/ গুনতে গুনতে যাবি'..."
প্রথম কবিতার নাম '২০২'। বুদ্ধদেব বসুর স্মৃতিধন্য ২০২, রাসবিহারী অ্যাভিনিউ ঘিরে "আমাদের তারুণ্যের শেষ তীর্থ 'কবিতা ভবন'।" শ্মশানের জন্য নাম 'পিতৃবন'। এ বইয়ের 'পিতৃবন' কবিতায় তাই পেয়ে যাই তাঁর স্নেহাপ্লুত বাবা বিভূতিরঞ্জনকে। তাঁর পিতার পিছনেই দাঁড়িয়ে পিতামহ দক্ষিণারঞ্জন দাশগুপ্ত, 'যৌবন বাউল'-এর সেই সুখ্যাত 'আমার ঠাকুমা' কবিতার 'শহর বিদ্বেষী মানুষটি, যিনি সাঁওতাল পরগনায় ভিটে পত্তন করে তাঁর বড় নাতি অলোকের বয়স যখন 'বড়জোর পনেরো', তখনই সেই জ্যেষ্ঠ পৌত্রের হাতে পারিবারিক দুর্গাপূজার ভার তুলে দিয়েছিলেন। এভাবেই অলোকরঞ্জনের পরিজনেরা ঘুরে ঘুরে আসেন তাঁর কবিতার প্রবাহে। আর যেই পরিজনদের সীমা বিস্তারিত হতে থাকে দুনিয়াভর রক্তসম্পর্কহীন দীনতম মানুষটি অবধি।দুঃখতাপের উপত্যকায় উপচে পড়ে স্বাধীনতার পুষ্পোলিবাহার।



আর এ বইতেই টানা গদ্যে লেখা 'অনাবাসী যদি অনুবাদ করে' কবিতায় লিখলেন, 'তুলসীতলার আজলকাজল মায়ামদির নিরাপত্তার ঘেরাটোপ থেকে একবার বেরিয়ে পড়লে ইহমানুষের কপাল থেকে বাস্তুদেবতার আশীর্বাদ চিরতরে অবলুপ্ত হয়ে যায়,তার বরাতে তখন চলতে থাকার চালচিত্তির ছাড়া অন্যতর কোনো বিধিলিপি অবশিষ্ট থাকে না। তখন থেকেই সম্ভবত ভাষাই হয়ে ওঠে মানুষের একমাত্র আবাসন।' হাইডেগার-অনুরণিত এই আভাষণ অলোকরঞ্জনেরই সিলমোহর হয়ে ওঠে। ভারতীয় নাগরিকত্বের মতো বাংলা ভাষার আবাসন তিনি ছেড়ে যাননি। নতুন নতুন সমাসবদ্ধ পদের জোড়কলম, নতুন পরিভাষা, প্রতিশব্দ নির্মাণ তাঁর নিত্যকৃত্য।

এ বইয়ের 'কবিতা লেখার গরজে' কবিতায় আমরা পাচ্ছি আশৈশব সুহৃদ শঙ্খ ঘোষকে:
'দুপুরের কাছে নিরপেক্ষতা শিখি
দুপুর যেন বা আশৈশব সুহৃদ
শঙ্খ ঘোষের মতো'
একই কবিতায় আসছেন নিভৃতচারী কবিবন্ধু আলোক সরকার:
'বিকেলের দিকে আলোক সরকারের
প্রজ্ঞা ও পারমিতা
শিখে নিয়ে আমি থেকে যাই অনাহত'...
আর তারপর?
'ধু-ধু সন্ধ্যায় আমি তো নিরক্ষর /কেননা তখন যাপিত দিনের অর্জন মুছে ফেলে / কবিতা লেখার গরজে নিজেকে করি ক্ষতবিক্ষত...'
মনে পড়ছে, দূরভাষে দৈববানীর মতো এই চরণগুলি ভেসে এসেছিল আমার কাছে। 'মাঝি' সম্পাদক প্রশান্ত রায়ের হাতে তুলে দেবার গরজে। কবি যখন জার্মানিতে থাকতেন, তখন মাঝে মাঝেই তাঁর ফোন পেতাম, ক্বচিৎ কখনও লোকোত্তর কবিতাও। শ্রুতিলিখনে তুলে দেওয়া যেত নানা সম্পাদকের হাতে।
বইয়ের উপান্ত্য কবিতা ' পালকি করে যারা আমায় নিয়ে চলেছে' যেই না পাঠক সজলচক্ষু হতে যাবেন, অমনি আসে অমোঘ শৈলীতে অলৌকিক আশ্বাসন, বইটির সব শেষ কবিতায়:
আমার জন্য হা-হুতাশন কোরো না, অরুণাভ
উত্তরাধিকারসূত্রে পুণ্য পারমিতার
ছ'পণ কড়ি সঞ্চয়িত আছে আমার দোলায়,
বাকিটা পথ গুনতে গুনতে যাব।


ছবি: লেখক 





কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

কবিতা

সম্পাদকের কথা

দ্বিতীয় বর্ষ  ।। অষ্টম সংখ্যা ।। মার্চ ২০২২   খুব অসহায় লাগছে এবার। আমাদের ডান পাশে ধস। বায়ে গিরিখাত। মাথায় বোমারু। পায়ে পায়ে হিমানীর ব...