শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২০

বিশেষ রচনা ।। সুপর্ণা দেব


 


চণ্ডী কথা 


 সুরথ সমাধি  আখ্যান

রাজ্যহারা রাজা সুরথ ঘুরতে ঘুরতে  মেধামুনির আশ্রমে এলেন । ভাগ্যহারা বিষণ্ণ  রাজা । কিন্তু ফেলে আসা রাজ্য ও বৈভবের মোহ তখনো যায় নি । তাই প্রশ্ন রাখলেন মুনির কাছে ।  এ মোহ যাবে কীভাবে ? ঘটনাচক্রে সেই আশ্রমেই দেখা হয় বৈশ্য সমাধির  সঙ্গে । তার সব ধন সম্পদ স্ত্রী ও পুত্রেরা কেড়ে নিয়ে তাকে  ছেড়ে চলে গেছে । ভাগ্যহত এক নৃপতি ও এক বনিক মেধা মুনির আশ্রমে মিলিত হলেন  জীবন দর্শনের প্রশ্ন নিয়ে । 

রাজা সুরথ জানতে চাইলেন মেধা মুনি  বারবার মহামায়ার  কথা বলছেন । এই  মহামায়া  কে ?  

মুনিবর বললেন , পৃথিবী একসময় মদিরা সমুদ্রে পরিনত হল । কারণসাগর ।  ভগবান বিষ্ণু অনন্তনাগের ওপরে  শয়ন করে  যোগনিদ্রায় চলে গেলেন । এক কথায়  পৃথিবী হয়ে পড়লো তমসাচ্ছন্ন   , সত্ত্বগুণ নিষ্ক্রিয়  হয়ে পড়ল । তখন বিষ্ণুর কানের ময়লা থেকে মধু ও কৈটভ এই দুই অসুরের জন্ম হল । মধু কৈটভের গল্প দেবীভাগবতেও আছে । এই দুই অসুর  আকাশে  একটি  বীজমন্ত্র শুনতে পায় ও নিবিষ্ট মনে  দুজনে সেই মন্ত্র জপ করতে থাকে । দীর্ঘকাল  তপস্যার পর  পরমা দেবী চিৎ রূপিনী শক্তি প্রসন্ন হন । তারা ইচ্ছা মৃত্যুর  বর প্রার্থনা  করে । বরপ্রাপ্ত হয়ে বলীয়ান দুই অসুর  কারণ সমুদ্রে , মদিরা সাগরে প্রচন্ড আস্ফালনে নিজেদের ইচ্ছামত দিন কাটাতে থাকে । এইভাবে জলের মধ্যে ঘুরে বেড়াতে  বেড়াতে তারা  যোগনিদ্রামগ্ন বিষ্ণুর কাছে এসে বিষ্ণুর নাভিতে ব্রহ্মাকে  দেখল । ব্রহ্মা , অসুরদের দেখে  ভয় পেয়ে বিষ্ণুকে কে জাগিয়ে তোলার জন্য যোগনিদ্রার স্তব করতে শুরু করলেন । “ হে দেবি , আপনি ভগবান বিষ্ণুর ঘুম ভাঙিয়ে  এই দুই অসুরকে বধের একটা ব্যাবস্থা করুন ।“  বিষ্ণুর অঙ্গ প্রত্যঙ্গ  থেকে  তামসী দেবী দেখা দিলেন তার মধ্যে রয়েছে সত্ত্ব  রজ আর তম, তিন গুণের  সমাহার  । মহাকালী মহালক্ষ্মী  মহাসরস্বতী । ভগবান বিষ্ণু নিদ্রাভঙ্গের পর অসুরদের সঙ্গে লড়াই চালিয়ে গেলেন বহু বহুদিন । 

মধু কৈটভ তখন আচ্ছন্ন হচ্ছে মহামায়ার জালে। মোহে  আচ্ছন্ন অসুরদ্বয় বিষ্ণুকে বলল আমরা  আপনার যুদ্ধে খুবই প্রীত হয়েছি । আপনার হাতে আমাদের মৃত্যু হোক তবে । যে স্থান জলপ্লাবিত নয় এমন স্থানে । অসুর দুজনের মাথা নিজের জঙ্ঘায় রেখে সুদর্শন চক্র দিয়ে মাথা কেটে নিলেন মধুসূদন বিষ্ণু ।  সমগ্র ঘটনার নেপথ্য চালিকা শক্তি  ছিল অঘটন ঘটন পটিয়সী  মহামায়ায় মায়াজাল । মধু কৈটভ হল অজ্ঞানতা , তমস , অন্ধ মোহ । উগ্র । কুৎসিত । 

এরপর প্রবল পরাক্রান্ত  মহিষাসুরের নেতৃত্বে অসুররা পরাজিত করে দেবসৈন্যদের । স্বর্গ  থেকে হটিয়ে দেওয়া হল দেবতাদের । পরাস্ত ও অসহায়   দেবতার দল ব্রহ্মাকে সামনে রেখে চললেন শিব আর বিষ্ণুর কাছে । স্বর্গ  থেকে খেদিয়ে দেওয়া হয়েছে তাবড় তাবড় দেবতাদের । সূর্য ইন্দ্র অগ্নি বায়ু যম বরুণ ও অন্যান্য  ।  শিব ও বিষ্ণু খুবই রুষ্ট হলেন । ব্রহ্মা , বিষ্ণু মহেশ্বরের থেকে মহাতেজ বেরিয়ে এলো । তিন মহাতেজের সংমিশ্রন । তিন গুণ । স্বত্ত্ব , রজ , তম । দেবী তাই ত্রিগুণা । অন্যান্য দেবতাদের দেহ থেকেও তেজ নির্গত হল  । 

সেই তেজঃ পুঞ্জকে দেখা গেল জ্বলন্ত পাহাড়ের মত ।বিশাল ।  দিগন্ত ব্যাপী । দেখা গেল হিমালয়ের কোলে   মহর্ষি কাত্যায়নের আশ্রমে । 

সেই জমাট বাঁধা তেজঃপুঞ্জ  এক নারী মূর্তির  আকার নিতে থাকল । বিভিন্ন দেব দেবীর তেজে এক এক করে সেই নারীমূর্তিটির একটি একটি করে  অঙ্গ গড়ে উঠল । শুধু তাই নয় তাঁকে নানান অস্ত্র সাজিয়ে দেওয়া হল । তাঁকে সিংহ বাহন দেওয়া হল । তাঁর  দৈব অঙ্গে একের পর এক অলঙ্কার শোভা পেতে থাকল ।  

“ সমস্ত রোমকূপেষু   নিজরশ্মীন্ দিবাকরঃ” ,  দেবীর সমস্ত লোমকূপে দিবাকর নিজের কিরণ রাশি ঢেলে দিলেন । সুতরাং  সেই দেবীর গাত্রবর্ণ সূর্যের আলোর মত উজ্জ্বল । সমুদ্রের   অম্লান পদ্ম মালায়  অনুপম সাজ সমাপ্ত করে সেই দেবী কী করলেন ? অট্টহাস্য করে উঠলেন । হুঙ্কার দিলেন ঘনঘন । পৃথিবী পর্বত  সমুদ্র কাঁপানো সেই গর্জন ! তারপর শুরু হল সে এক অতি  ভয়ানক যুদ্ধ ! মহিষাসুর নানান মায়াবী রূপ ধারণ করতে থাকে । যুদ্ধে মত্ত সেই দেবী এবারে ভয়ঙ্কর  রেগে গিয়ে সুরাপান করতে থাকেন । তাঁর  চোখদুটি লাল হয়ে উঠেছে । আকাশ চুম্বী  দেবী অট্টহাস্য করে উঠছেন । যুদ্ধে মত্ত দেবী সুরা পান  করে রজ গুণ প্রাপ্ত হলেন । তখন দেবী কী বললেন ? বললেন “ “গর্জ গর্জ ক্ষণং  মূঢ় মধু যাবৎ  পিবাম্যহম্ । “ ওরে মূঢ় অসুর ,  তুই গর্জন করতে থাক  । আমি ততক্ষণ  মধু পান করি । তারপর তোকে বধ করব ।  সব দেবতারা আনন্দ ধ্বনি করবেন ।“  দেবী চন্ডিকা লাফ দিয়ে মহিষাসুরের  ওপরে  উঠে  তার গলায় পা দিয়ে বুকে ত্রিশূল বিঁধিয়ে দিলেন  । এদিকে মহিষাসুর নিজের মুখ দিয়ে অন্য মহাসুর রূপ ধরে একটু উঁকি দেওয়া  মাত্রই দেবী খড়্গ দিয়ে তাঁকে মেরে ফেল্লেন ।  মহিষাসুর উদগ্র ক্রোধ , লোভ লালসা , অহমিকার প্রতীক ।  

মেধা ঋষি রাজা  সুরথকে বললেন সমস্ত দেবতারা মাথা নত করে দেবীর স্তব করতে লাগল । 

এরপর শুরু হল শুম্ভ নিশুম্ভের পালা ।  তারা ইন্দ্র সূর্য চন্দ্র কুবের যম বরুণ সবাইকে বিতাড়িত করে সকলের ক্ষমতা দখল করে আস্ফালন করতে লাগল । এই দুই অসুর ব্রহ্মাকে তুষ্ট করে বর প্রার্থনা করেন যে দেব ও মানব জাতির কোনো পুরুষ তাদের মারতে পারবে না । কিন্তু এখানে  একটা  শর্ত ছিল যা হয়তো শুম্ভ নিশুম্ভের কষ্ট - কল্পনার বাইরে ছিল । বলা হয়েছিল গর্ভজাত নন অর্থাৎ অযোনিজা এবং পুরুষ  স্পর্শ করে নি  এমন নারীর প্রতি যদি তারা আসক্ত হয়ে পড়ে সেই নারীই যুদ্ধে তাদের পরাস্ত করতে পারবেন ।

দেবতাদের এই ঘোর সঙ্কটকালে  দেবী পার্বতীর দেহকোষ থেকে নির্গত  হলেন কৌশিকী । শুম্ভ নিশুম্ভের অনুচর চন্ড ও মুন্ড অতি মনোহর রূপিণী কৌশিকী কে দেখতে পেল । তারা দৌড়ে গিয়ে শুম্ভকে গিয়ে বলল মহারাজ এক পরমা সুন্দরী  পর্বত  আলোময় করে ঘুরে বেড়াচ্ছেন । 

এরমধ্যে স্বর্গ  থেকে কী কী ছিনিয়ে এনেছে শুম্ভ , একবার দেখা যাক । ইন্দ্রের কাছ থেকে গজশ্রেষ্ঠ ঐরাবত , দেববৃক্ষ পারিজাত , অশ্বশ্রেষ্ঠ উচ্চৈঃশ্রবা । ব্রহ্মার হংস চালিত বিমান । কুবেরের কাছ থেকে  এনেছে নবরত্নের অন্যতম নিধি মহাপদ্ম ।সমুদ্রের  কাছ থেকে অম্লান পদ্মের মালা কিঞ্জল্কিনী  । নিশুম্ভ , তার ভাইও যম , বরুণ , সমুদ্রের কাছ থেকে প্রচুর মূল্যবান সামগ্রী ও অস্ত্র নিয়ে এসেছে । সুতরাং এই অপরূপ স্বর্গীয় রমণীটিকেও তাদের  নেওয়া উচিত । 

শুম্ভের দূত হয়ে দেবী কৌশিকীর কাছে গেল মহাসুর সুগ্রীব  । কৌশিকী উত্তর  দিলেন যিনি  তাঁকে যুদ্ধে পরাস্ত করবেন , যিনি তার মতই বলশালী তিনিই  হবেন তাঁর  পতি । সুতরাং শুম্ভ আসুন যুদ্ধ করতে । 

সুগ্রীব  বলল এ আপনি কী বলছেন? । কোনো দেবতা শুম্ভের  সামনে দাঁড়ানোর সাহস পায় না  আর আপনি একা একা  কী করবেন ? 

দেবী বললেন  , এই আমার প্রতিজ্ঞা  । তুমি দৈত্য রাজকে জানাও সে কথা  । 

এরপর অসুর  সেনাপতি ধূম্রলোচন  ও তার অসুর বাহিনীকে হুঙ্কার দিয়ে পরাস্ত করলেন দেবী  । দেবীর বাহন সিংহ  যুদ্ধে দেবীকে সাহায্য করল বিপুল ভাবে । 

মেধা ঋষি  রাজা সুরথকে বললেন , শুম্ভের আদেশে এবারে দেবীর কাছে গেল শুম্ভের দুই অনুচর  চন্ড ও  মুন্ড । পর্বত  চূড়ায় সোনার বরণ দেবী সিংহের পিঠে  বসে আছেন  । জগদম্বা  দেবী তাদের দেখে খুবই বিরক্ত হলেন এবং  তাঁর  মুখ রাগে কালো হয়ে গেল । তাঁর  ললাট থেকে বেরিয়ে এলেন ভীষণ দর্শন চামুন্ডা কালী করালবদনা  । কালী তারপর চন্ড মুন্ডকে হত্যা করে তাদের কাটা মুন্ডু নিয়ে জগদম্বাকে গিয়ে বললেন ,  এই নিন আপনার উপহার । আপনি নিজে শুম্ভ নিশুম্ভকে বধ করবেন । 

শুম্ভ নিশুম্ভ যখন যুদ্ধে নেমেছে,  প্রত্যেক দেবতার থেকে একটি  করে শক্তি নির্গত  হয়ে দেবীকে সাহায্য করতে এসেছেন  । যে দেবতার আকার ভূষণ বাহন যেমন তার শক্তির ও সেই রকম রূপ । 

এরপর মাহেশ্বরী , ঐন্দ্রী নারসিংহী  , ব্রহ্মাণী কৌমারী  এই রকম অষ্ট মাতৃকা অসুরদের   নাজেহাল করে তুল্লেন  । ভয়ানক অসুর রক্তবীজের শরীরের  থেকে একবিন্দু রক্ত পড়লেই বলশালী অসুরের জন্ম হয় । যার ফলে বিপুল পরিমানে অসুর সৃষ্টি হবার জন্য  দেবতাদের মাথায় হাত ! তাঁরা  খুব  ভয় পেলেন । দেবী চন্ডিকা তখন কালীকে বললেন,  মুখ হাঁ কর । রক্ত মাটিতে  পড়তে  দেওয়া যাবে না । 

চামুন্ডা কালী  সেই রক্ত পান করতে থাকলেন । রক্তবীজ , এক বাসনা থেকে সহস্র বাসনার প্রতীক । বাসনাজাল । অথবা যোগ কালে মনের মধ্যে নিরন্তর অস্থির চিন্তার আনাগোনা । 

দেবী চন্ডিকার সঙ্গে শুম্ভ নিশুম্ভের প্রবলতম  যুদ্ধ হল ।শুম্ভ হল অহং , সর্বদা  আমি আমি আমি , নিশুম্ভ হল আসক্তি ।  অসুর নিধন ও দেবত্বের পুনরুদ্ধারে সবাই দেবী চণ্ডীর আরাধনা করতে লাগলেন । 

“ দেবী প্রচন্ড দোর্দণ্ডে দৈত্যদর্পনিষুদিনী “ 


২ 

চন্ডী কথা ।। দেবী মাহাত্ম্য 

দেবীসূক্ত বেদ । অম্ভ্রৃণ ঋষির মেয়ে বিদুষী বাক । ঋষি বাক , আটটি  মন্ত্র নিয়ে রচনা  করেন দেবীসূক্ত । দেবী চন্ডীর মাহাত্ম্য নিয়ে যে দেবীমাহাত্ম্য  লেখা হয়েছিল , দেবীসূক্ত তার  মূল উপাদান । চন্ডী এক গূঢ় দর্শনের শক্তিবীজ । মানবাত্মার পরমাশ্রয় সচ্চিদানন্দ পরমাত্মা । দেবীসূক্তের পরমাত্মা আর মহামায়ায় কোন ভেদ নেই । 

“ আমি এই ব্রহ্মান্ডের একমাত্র অধিশ্বরী “ ।

“ আমি জগত পিতাকে প্রসব করি” 

“ আমি যখন বায়ুর  মত প্রবাহিত হই তখনিই এই ভুবনের সৃষ্টির সূচনা হয় “ । 

দেবী মাহাত্ম্য পাঠের আগে মনে অর্গল বা খিল দিতে হয় । কারণ বিক্ষিপ্ত অশান্ত বহির্মুখী মন নিয়ে চন্ডীতত্ত্বে প্রবেশ করা সম্ভব নয় । সেই জন্য অর্গল ,কীলক ,দেবীকবচ পাঠের কথা বলা হয় । রূপ দাও , জয় দাও । যশ দাও । শত্রু দমন কর । অথবা বল দাও , মনোবৃত্তি  অনুযায়ী মনোরমা  ভার্যা দাও  । সৌভাগ্য দাও । আরোগ্য দাও । 

জগন্মাতার কাছে চাইতে নিষেধ নেই । কিন্তু প্রার্থনা গুলির আপাত অর্থের গভীরে অন্য ব্যাঞ্জনা নিহিত আছে । চন্ডীতত্ত্বে  প্রবেশের আগে সমস্ত মনোবৃত্তি মায়ের কাছে প্রকাশ করে আত্মস্থ হতে হয় । এই প্রয়াসটি যত  সুশৃঙ্খল ও গভীর হবে ততোই চন্ডীমাহাত্ম্য চন্দন সুগন্ধের মত মননে লিপ্ত হবে । 

চণ্ড শব্দের অর্থ কোপন , অতিশয় কোপ । 

মেধা ঋষি রাজা সুরথ ও বৈশ্য সমাধিকে যে  চন্ডীকথা শুনিয়েছিলেন  মার্কণ্ডেয় মুনি সেই কথা তার শিশ্যদের বলেন । দ্রোণ মুনির চার শাপগ্রস্ত পুত্র পাখি হয়ে জন্মায় , তারা পিঙ্গাখ্য , বিরাধ , সুমুখ সুপুত্র । এই পক্ষী চতুষ্টয় পুরো কাহিনি জানতো । 

ব্যাসদেবের শিষ্য জৈমিনি কয়েকটি প্রশ্ন নিয়ে মার্কণ্ডেয় মুনির কাছে যান । মার্কণ্ডেয় মুনির হাতে সময় না থাকায় তিনি জৈমিনিকে বিন্ধ্য পর্বতে পক্ষী চতুষ্টয়ের কাছে যেতে বলেন । এই চারজন পাখি জৈমিনির কাছে দেবীর মাহাত্ম্য কীর্তন করেন । 

দেব ও দানবের যুদ্ধ । শক্তির হাতে দানবের পরাজয় ও দৈব শক্তির পুন প্রতিষ্ঠা । নানান স্তরীভূত এই যুদ্ধ । ব্যক্তিজীবনে , সমাজ জীবনে , রাষ্ট্রজীবনে , নিবিড় অধ্যাত্ম জীবনেও । 

একই ব্যক্তির মধ্যে  লুকিয়ে থাকে দেব আর দানব । একই ইন্দ্রিয়কে  ভালো ও মন্দ দুইই কাজে ব্যাবহার করা যায় । ব্যষ্টি থেকে তা যখন সমষ্টি হয়ে ওঠে তখন ভালো বা মন্দ যাই হোক না কেন তা উদগ্র ভাবে জেগে ওঠে । নারী শক্তির প্রতীক । প্রচন্ড শক্তি । চন্ড । আবার এই নারীই পরম করুণাময়ী জগজ্জননী । চন্ডী তত্ত্ব এক গভীর ও গূ ঢ় আধ্যাত্মিক রহস্য । একই নারীর বিভিন্ন রূপ ও শক্তির প্রকাশের মন্ত্র আছে চণ্ডীতে । দুষ্ট দমনের জন্য । এই দুষ্ট তো শুধু বহির্জগতে নেই । এ আমাদের অন্তরের মধ্যেও প্রতিনিয়ত যুদ্ধ ভূমি বানিয়ে চলেছে । শুধু তাই নয় প্রতিটি অসুরের নিহিতার্থ আলাদা আলাদা । তাদের ব্যবহৃত অস্ত্রগুলির প্রয়োগও বিভিন্ন প্রকার । সুতরাং অসুর বা রিপু দমন যে কী সুকঠিন কাজ , দেবী মাহাত্ম্য তা বর্ণনা করেছে নিপুণ ভাবে । 

মায়ের তিনটি চোখ । ত্রিনয়না । স্থূল চক্ষু , মনশ্চক্ষু, জ্ঞান চক্ষু। গুণ তিনটি  , ত্রিগুণা , সত্ত্ব রজ তম । তিনটি ভাব , সৎ , চিদ , আনন্দ । 

ঋষি বাক রচিত দেবী সূক্তে যে আমিত্ব বা অস্মিতার কথা বলা হয়েছিল তাকে বলিদান দেওয়া অত সহজ নয় । যিনি প্রকৃত ব্রহ্মবিদ তার ভেতর থেকে অহং টি সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয় । 

অসুর শুম্ভ যখন দেবী চণ্ডীকে বলল , তুমি তো অনেকের বলে বলীয়ান । 

তখন মা চন্ডী বলেছিলেন , সে সব আমার বিভূতি , নানা রূপের  প্রকাশ। দেখো , আমি এক ও অদ্বিতীয় । 

শুম্ভ অসুর বধের নিহিতার্থ দেবী মাহাত্ম্যে এইভাবে বর্ণিত  আছে ,যে “আমি” কে নিয়ে লক্ষ লক্ষ জন্ম কাটিয়েছি , যে আমি কে কতবার কতরকম সাজে সাজিয়েছি , এইবারে দেখো , সেই “আমি “ আর নেই । সে নিত্য শুদ্ধ বুদ্ধ মুক্ত আত্মা ।  এখানে এসেই অদ্বৈত দর্শনের সঙ্গে চণ্ডী একাত্ম হয়ে যান ।     



 বড় ধুম লেগেছে হৃদি কমলে 

ব্রহ্মর্ষি গুরু মেধা মুনি তার কথা শেষ করলেন । পুরো বিবরণ টি অর্থাৎ দেবী মাহাত্ম্য 

 মার্কণ্ডেয় উবাচ বলে শুরু এবং শেষ ।  

রাজা সুরথ রাজ্য বিত্ত বৈভবে আসক্ত । আর বৈশ্য সমাধি স্ত্রী পুত্র সংসারের চিন্তায় মগ্ন । তারা তিন বছর সংযত মনে দেবীর আরাধনা করলেন । এই আরাধনার অন্য নাম আত্মজয় । 

রাজা সুরথ জীবাত্মা । মায়ের কাছে সে হৃত রাজ্যের পুনরুদ্ধার ও জন্মান্তরেও যেন নিষ্কণ্টক ভাবে রাজ্যসুখ ভোগ করতে পারে তাই প্রার্থনা করল । সমাধি আগে থেকেই বিষয় বিমুখ । তার ধন সম্পদ কেড়ে নিয়েছিল তার পরিবার । সে প্রার্থনা করল আত্মজ্ঞান যার ফলে সংসারে আসক্তি তার বিনষ্ট হয়ে যাক । সুরথের রাজ্য প্রার্থনা এবং সমাধির জ্ঞান প্রার্থনার অর্থ , একই  ব্যক্তির  মধ্যে এই দ্বন্দ্ব চলে । সাধক যখন মাকে পায় তখন তার মন চায় অবিরাম ভোগ আর প্রাণ চায় আত্মার সম্যকরূপে লীন হয়ে যাওয়া । এরাও রূপক । নিরবচ্ছিন্ন  সংগ্রামের আবহমান ছবি  । 

শক্তি সাধনার তত্ত্বটি ব্যাখ্যা করা কঠিন । এর মধ্যে মিশে গেছে তন্ত্র সাধনা । বৌদ্ধ তন্ত্র ও এসেছে কালের গতিতে । তন্ত্রের মহামায়া তত্ত্বটি শ্রী রামকৃষ্ণ ও রামপ্রসাদ একেবারে সহজ করে বলেছেন ব্রহ্ম ই কালী , কালীই ব্রহ্ম । ব্রহ্ম ও মহামায়া অভেদ । 

বঙ্গদেশ , শক্তিসাধনার অন্যতম কেন্দ্র । এখানকার প্রবাদেই আছে জুতো সেলাই থেকে চন্ডীপাঠ , অর্থাৎ চণ্ডীপাঠ নিত্য কর্মের অঙ্গীভূত । প্রতিদিনের কাজেরই একটি অঙ্গ । আর প্রত্যেক গ্রামে একটি চন্ডী মন্ডপ থাকতোই । 

ষোড়শ শতাব্দীতে মঙ্গল কাব্যের জোয়ার এসেছিল । চণ্ডী মঙ্গল কাব্যের চণ্ডী অরণ্য দেবতা অভয়া । তিনি লোকায়ত দেবী , মা মঙ্গল  চন্ডী ।

চণ্ডী এমন একটি দর্শন যার কেন্দ্রে রয়েছে নারী শক্তির জাগরণ । পুরুষের যা শক্তি সেও নারীর কাছ থেকেই । প্রকৃতি না হলে পুরুষের ভূমিকা কোথায় ? 

ঋক বেদের বাক বা দেবী সূক্তের কাছে আবার ফিরে যাই । সপ্তশতি চণ্ডী বা দেবী মাহাত্ম্যের আকর সেই আটটি সূক্ত যা মহিলা ঋষি বাক রচনা করেন তাতে বলা হয়েছে 

আদি পরাশক্তি । তিনি পরম ব্রহ্ম । দুর্গা লক্ষ্মী সরস্বতী তাঁর বিভিন্ন প্রকাশ । “ প্রথম আদি তব শক্তি "

এইখানে এসে ধরা পড়েছে সমগ্র  ব্রহ্মান্ড । সমস্ত বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের সৃষ্টি তত্ত্ব ।

অদ্বৈত বেদান্ত তো বটেই চন্ডীতত্ত্ব আমাদের গীতার কথাও মনে করিয়ে দেয় । চন্ডীর পুরো কাহিনি যেন গীতার অর্জুন বিষাদ যোগের সংশয় দুঃখ ও দ্বিধা  থেকে মোক্ষ যোগের পরম সমর্পণ ও নির্বাণে  বিধৃত । আর দুটির পটভূমিতে রয়েছে যুদ্ধ । নিরন্তর যুদ্ধ চলছে অন্তরে , বাহিরে । শুভ আর অশুভের মধ্যে ।    মধু কৈটভ নিধন সত্য প্রতিষ্ঠা ।  মহিষাসুর বধ , চৈতন্য প্রতিষ্ঠা  ।  শুম্ভ নিশুম্ভ বধ আনন্দ প্রতিষ্ঠা । 

কুলকুণ্ডলিনী জাগরণের সঙ্গেও মাতৃ আরাধনার অনুষঙ্গ চলে আসে । চরম অবস্থায় হৃদ কমলে ধুম লেগে যায় । 

মানুষের মধ্যে থাকে দুটি প্রবৃত্তি  বা প্রকৃতি । একটি নারী ও একটি পুরুষ । ইংরেজিতে যাকে বলে ফেমিনিন  ও ম্যাসকুলিন । এই দুই এর সামঞ্জস্যে একটি পূর্ণ মানুষ তৈরি হয় । 

প্রখর  তেজ ও  রুদ্র রূপের সঙ্গে ধী ও কল্যাণশ্রীর সংযোগে এক পূর্ণ মানব বা পূর্ণ মানবী ।

চণ্ডী যেন তার প্রতীক । একই হাতে সংহার করছেন , বরাভয় দিচ্ছেন , রক্ষা করছেন , পালন করছেন । নারী পুরুষ বিভাজন ব্যতিরেকে সেইই তো প্রকৃত মানুষ । 

অন্যদিকে  সম্পূর্ণ নারী প্রকৃতি বিবর্জিত যে পুরুষ সেখানে শুধুই শক্তির আস্ফালন ,  মদমত্ততা , হিংসা , লোভ মাৎসর্য ভোগ ও শঠতা । আগ্রাসন ।  সমস্ত অসুরকুল তার প্রতিভূ ।  

চণ্ডী কেন প্রাসঙ্গিক  তার উত্তর এখানেই নিহিত আছে । এমনই এক দেবী , যদি নারী বা পুরুষ বিবর্জিত অর্থে ধরি তাহলে বলতে হয় এমন এক শক্তি বা এমন এক সৃষ্টি যার মধ্যে একটি আদর্শ ও সম্পূর্ণ  এক বলিষ্ঠ স্বপ্নের মানুষকে আমরা খুঁজে পাই, যা আমাদের আরাধনা  বা অন্বেষণ  ।একই সঙ্গে  রৌদ্র তেজ ও পরম করুণা । চন্ডীর রচয়িতাগণ এক মহীয়সী দেবীর মধ্য দিয়ে মানবতার গুণগুলিই রূপায়িত করেছেন । 

তবু ধন্দ যায় না মন থেকে ,শুম্ভ দেবীকে আকাঙ্ক্ষা করল , বলল রমণী রত্ন । 

দেবীর উদগ্র শক্তি ও অনমনীয়তা দেখে সেই রমণী রত্ন হয়ে গেল দুষ্ট রমণী । 

এই হল সার্বিক দৃষ্টি ।চণ্ডী তার বাহ্যিক রূপকল্প আর গভীর আভ্যন্তরীণ তত্ত্ব দর্শন নিয়ে পুরুষ তান্ত্রিক সমাজে একটি প্রকট প্রহেলিকার মত যুগ যুগ ধরে অট্টহাস্য করে চলেছে !

 

ছবি: বিধান দেব      





1 টি মন্তব্য:

  1. চন্ডীতত্ত্ব যে আসলে আমাদের অন্তরের রিপু জয় করে, বাইরের জগৎ থেকে অন্তরের জগতে দৃষ্টি রেখে পরমাত্মার অন্বেষণ করার সাধনা -তা খুব প্রাঞ্জল ভাষায় প্রকাশিত করেছেন লেখিকা। এই যুগে যখন আমরা চারপাশে নারীর প্রতি প্রতিনিয়ত ঘটতে থাকে লাঞ্ছনা ও অবমাননা উপেক্ষা করে মেতে উঠি নারী শক্তির বাহ্যিক আরাধনায়-অন্তরের সম্পদের চেয়ে বাইরের সম্পদ ও প্রতিপত্তির উন্মত্ত আস্ফালন শোভা পায় নিজের অহংকার হিসেবে পুজোর নামে-তখন এরম লেখা আমাদের পথ দেখায়, তুলে ধরে বহু বিস্মৃত আত্মতত্ত্ব -যা আছে ব্রহ্মাণ্ডে,তাই আছে দেহভান্ডে(শক্তি)....
    লেখিকা কে অসংখ্য ধন্যবাদ 💐

    উত্তরমুছুন

কবিতা

সম্পাদকের কথা

দ্বিতীয় বর্ষ  ।। অষ্টম সংখ্যা ।। মার্চ ২০২২   খুব অসহায় লাগছে এবার। আমাদের ডান পাশে ধস। বায়ে গিরিখাত। মাথায় বোমারু। পায়ে পায়ে হিমানীর ব...