বুধবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২১

সমস্ত শরীর জড়িয়ে একটি মানসিক সৌরভ ।। দীপক হালদার




শিরোনামের বাক্যবন্ধ একান্তভাবে তাঁর,তাঁরই সৃষ্টির সমবায় থেকে সংগৃহীত।তাই , এ নিবন্ধ এক অর্থে  গঙ্গাজলে গঙ্গাপুজো।জানিনা,  আমার এই সীমিত চোখের আলোয় কতখানি ধরা পড়বেন তিনি।তবে, অবশ্যই 
চেষ্টা করে দেখব নিজের মতো করে ছুঁয়ে দেখার।যতটুকু জানি মেধা,প্রজ্ঞা আর সুগভীর মননের আন্তরবলয়ে তাঁর অধিবাস।প্রতিভা এবং প্রত্যয়ের যুগলবন্দী তাঁর কর্মধারার সংকীর্তনী স্বর।'শব্দতান্ত্রিকের হাড়ের পাশা' তাঁর অভিজ্ঞান। 'কুমারী চিন্তার কক্ষ'
তাঁর একান্ত ব্যক্তিগত প্রকোষ্ঠের অন্তর্গত সুনির্দিষ্ট সাধন ক্ষেত্র ।নির্নিমেষ নিজস্ব বিচরণ কেন্দ্রের ধ্যানের আসন পাতা ওখানেই । লেখাপড়ার ঘোরতর আচ্ছন্নতার নিবিড় কুঠি যেমন  এই ঘর, তেমনই  নিঃশব্দ ভোর হয়ে আসার অপার্থিব মুহূর্ত দর্শন  এই সাধনপীঠের অন্দরমহল থেকেই। তিনি গবেষক, 
প্রাবন্ধিক এবং সর্বার্থে নিমগ্ন চিন্তার অগ্রগণ্য  কবি। ঐকান্তিক আত্মানুসন্ধানে ব্রতী এক একাগ্র সাধিকা। প্রাজ্ঞ প্রশ্নাবলিকে যিনি অগ্নিপরীক্ষায় পরীক্ষিত হওয়ার সমতুল্য ভাবেন এবং সেভাবেই নির্নীত হয় তাঁর পথধারা। অন্তত দুটি ক্ষেত্রে সাক্ষাৎকার পর্বে এভাবেই অনিবার্য   ভাস্বর হয়ে ওঠেন তিনি । একটি   'কবিতা প্রতিমাসে' পত্রিকার জন্য কবি বল্লরী সেন এর গৃহীত সাক্ষাৎকারে,  অন্যটি 'এই সময় 'দৈনিক পত্রিকার রবিবারোয়ারির জন্য নেওয়া কবি সুধীর দত্তর সাক্ষাৎকারে । উভয় ক্ষেত্রেই ধীরে ধীরে তিনি  উন্মোচিত নন শুধু, উদ্ভাসিত হন অপরিমেয় পরিচয়ে। 
                                                                       কবিতার কাছে প্রশ্নাতীত দায়বদ্ধতা থেকে তিনি উচ্চারণ করেন --------- 'আমি বরং শিরও দেব, স্বধর্মকে কখনও না ।' তিনি কবি  গীতা চট্টোপাধ্যায়। তাঁকে ষাটের দশকের কবি হিসেবে আপাতভাবে চিহ্নিত করা হলেও একথা অস্বীকার করার কোনও ক্ষেত্র নেই যে তিনি বাংলাভাষার একজন অন্যতম  প্রধান কবি।তাঁর কবিতার পরতে পরতে তিনি রোপন করেন পুরাণ,উপনিষদ, ব্রতকথার নিসর্গলোক।তাঁর অভিজ্ঞানে পাশ্চাত্য সাহিত্যের সমকালীন রৌদ্রকিরণ।প্রতিষ্ঠান এবং প্রাতিষ্ঠানিকতা থেকে শত সহস্র যোজন দূরে অবস্থান করেন তিনি।দৃষ্টিভঙ্গির সামুদ্রিক বিস্তৃতির মিশেলে এভারেস্ট প্রমাণ উচ্চতার সাথে এক সুগভীর অতলতার মূর্তিমতী দৃষ্টান্ত তিনি।দুহাজার আট সালের জুন মাসে ' কবিতা প্রতিমাসে 'র জন্য নেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কবি বল্লরী সেনকে নির্দ্বিধায়  জানিয়েছিলেন-----' আমার মনে হয়েছিল, অধ্যয়নপ্রার্থী হওয়াই আমার লক্ষ্য, বস্তুত আমার জীবনসাধনার জন্য বিবাহ করিনি। '
                           ঙকবি গীতা চট্টোপাধ্যায়ের জন্ম ঊনিশ শ একচল্লিশ সালের ছয়ই আগস্ট এক রাখী পূর্ণিমার দিনে।বীরেশ্বর এবং মাধবীলতা চট্টোপাধ্যায়ের কন্যা গীতারা তিন ভাই, চারবোন।'  গীতা চট্টোপাধ্যায়ের পূর্ব পুরুষ কাশ্যপ গোত্রীয় বীতরাগ ওঝা বা উপাধ্যায়। কনৌজ থেকে অষ্টম শতাব্দীতে গৌড়েশ্বরের রাজধানীতে পৌন্ড্রবর্ধনে আসেন। কুলীন ব্রাম্ভনত্বের আভিজাত্য তাঁদের ধমনীতে। গীতা চট্টোপাধ্যায়দের মালিকানা শিয়ালদহ অঞ্চলের বৈঠকখানা বাজারের। ঐ অঞ্চলের প্রাসাদোপম বাড়িতে বাস তাঁদের। তাঁদের পরিবারে একই সাথে যেন লক্ষ্মী-সরস্বতীর সহাবস্থান ঘটেছিল। সাবেক সময় থেকে এই কিছুদিন আগের বর্তমান পর্যন্ত এই পরিবার তাঁদের শিক্ষানুরাগের পরিচয় দিয়ে স্থাপন করেছিল একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। শিক্ষানুরাগ এবং সেবাব্রত তাঁদেরকে উদ্যোগী করেছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণে ।
                                                  অসম্ভব মেধাবী গীতা চট্টোপাধ্যায় প্রথমে লেডি ব্রেবোর্ন কলেজ, পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাভাষা ও সাহিত্যের ছাত্রী।স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর দুটি পর্যায়ে গীতা প্রথম শ্রেনীতে প্রথম। গবেষণা করেছেন 'ভাগবত ও বাঙলা সাহিত্য '   বিষয়ে।তাঁর গবেষণাগ্রন্থ সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে প্রখ্যাত মনস্বী সাহিত্যরত্ন হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় বলেছিলেন----'শ্রীমদ্ভাগবতের নূতন ব্যাখ্যাকর্ত্রী তুমি।স্মরণীয় গ্রন্থ তোমার। চিরস্মরনীয়া হইয়া রহিলে বাঙলা সাহিত্যের ইতিহাসে। '
                                                                                               অথচ পেশা হিসেবে গ্রহণ করলেন না অধ্যাপনা। থেকেগেলেন অন্তরালবর্তিনী হিসেবে।গৃহাবাসে আজীবন স্বেচ্ছা নির্বাসিত গীতা বাড়ি থেকে বেরিয়েছেন হয়ত দু- একবার, বিশেষ কোনো প্রয়োজনে।বার দুয়েক আকাশবানীর অনুষ্ঠানে; তাও আবার কবি কবিতা সিংহের ঐকান্তিক অনুরোধে। একবার নাকি বইমেলাতেও গিয়েছিলেন তিনি।
                                                                  বিশিষ্ট রবীন্দ্রগবেষক ও খ্যাতনামা অধ্যাপক জগদীশ ভট্টাচার্যের ছাত্রী ছিলেন গীতা চট্টোপাধ্যায়। অধ্যাপক ভট্টাচার্য সম্পাদনা করতেন 'কবি ও কবিতা 'নামের একটি অভিজাত সাময়িক পত্রিকা।গীতা চট্টোপাধ্যায় ওই পত্রিকাতেই কবি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। ওই পত্রিকা ছাড়া, যতদূর জানা যায় তিনি লিখেছেন কবি শরৎসুনীল নন্দী, কবি রামচন্দ্র প্রামাণিক ও কবি সুধীর দত্ত সম্পাদিত 'সংবেদ ' পত্রিকায়।পরবর্তীকালে ডায়মন্ডহারবার থেকে প্রকাশিত কবি গৌতম ব্রম্ভর্ষি সম্পাদিত 'নির্যাস' পত্রিকায়ও তিনি লিখেছেন । লিখেছেন কবি অজয় নাগ সম্পাদিত 'সুন্দর ' পত্রিকাতেও।খুব বেশি পত্র-পত্রিকায় লিখতেন না তিনি। তাঁর কবিতায় আসা প্রসঙ্গে দুহাজার তেরোর চব্বিশে নভেম্বর 'এইসময় ' পত্রিকার রবিবারোয়ারিতে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে কবি গীতা চট্টোপাধ্যায় জানাচ্ছেন কবি সুধীর দত্তকে ------ 'তিনি ( অধ্যাপক জগদীশ ভট্টাচার্য ) সন্তুষ্ট হয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, 'তুমি কি চাও?' এককথায় আমি বলে উঠি,  'আমি কথাশিল্পী হব।' বিস্মিত হয়ে বললেন,  'তুমি তো গজদন্ত মিনার-বাসিনী। হতে পারবে তারাশংকর, বিভূতিভূষণ,মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়? লিখতে পারবে নারায়ণ গাঙ্গুলির 'টোপ ',সমরেশ বসুর 'আদাব '?তারপর আহত মুখের দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে বললেন, 'তোমার লেখায় বাস্তবের মধ্যে পরাবাস্তবের ছায়া পড়ে,গভীর কল্পনা আর শব্দের প্রযত্ন এসবই কবির লক্ষণ।জানবে কথাশিল্প বা নাটক মিশ্রশিল্প ।একটা কাহিনী থাকে, চরিত্র, ঘটনার সংঘাত। কবিতা বিশুদ্ধ শব্দশিল্প।ভারতীয় রাগ-রাগিনী যেমন সপ্তসুরে গড়া একএকটি ধ্যানমূর্তি, কবিতাও তেমনি শব্দে বিমূর্তের ধ্যান। তুমি শ্রেষ্ঠের সাধনা কর, কবি হও।'-------
                                         সেই থেকেই  শ্রেষ্ঠের সাধনায় নিয়োজিত তিনি। প্রসঙ্গত  স্মরণ করা যাক কবি গৌতম মন্ডল- এর প্রকাশন সংস্থা আদম প্রকাশিত কবি  গীতা চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা সংগ্রহের ভূর্জপত্রের অংশবিশেষ------- 'একটি শ্রুতিবাক্য দিয়ে আরম্ভ করলে কেমন হয় ---'তদ্দুরে তদ্বন্তিকে '---- তিনি দূরে আবার তিনি কাছেও। তিনি কে ? ঈশ্বর, ব্রম্ভ,অধি- চৈতন্য? 
                                            আমরা যারা ভগ্ন চৈতন্য সাঁকো প্রতিদিন পারাপার করি,তাদের কাছে খুব বেশি স্পর্শযোগ্য মনে হয়না ব্রম্ভ বা পরমাত্মা। ওখানে যদি বসিয়ে দিই 'শিল্প ' শব্দটিকে ?'
                                ' শিল্প কাল- ভূমিষ্ঠ হয়েও কালাতীত এবং আবহমান -কালের। যেমন দিকচক্রবাল, সে আছে আবার নেই, ক্রমশ বিস্তৃততর হয়ে যাচ্ছে তার পরিধি। প্লাবনের পরে পুরীর সমুদ্রসৈকতে আবার দেবীর বালুকামূর্তি গড়ে তুলছেন মনোমোহন মহাপাত্র, খনি থেকে ফিরে সূর্যমুখী ফুল আঁকছেন ভ্যান গঘ,তরুণ বড়ে গোলাম আলি গাইছেন  'আয়ে না বালম ',এক খ্যাপা গনিতজ্ঞ পাতার পর পাতা লিখে চলেছেন  'ফিরে এসো
চাকা'।খুব একটা আঘাত পেয়েছি মনে যখন নিমাই সন্ন্যাসীর স্তবে পেয়েছি, আমি ঐশ্বর্য,লোকলস্কর, সুন্দরী রমনী বা কবিতা চাই না, আমি চাই জন্মে জন্মে তোমায় অহেতুক ভক্তি, গোবিন্দ। আমার কাছে কিন্তু কবিতাই গোবিন্দ, গোবিন্দই কবিতা। ভগবদ্গীতার ভাষায়  'যং লবধ্বা চাপরং লাভং/ মন্যতে নাধিকং ততঃ ' ।যা পেলে আর কিছুই পাবার নেই আমার কাছে, তা কবিতা। '
                                          এই কবি তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ  'গৌরীচাঁপা নদী, চন্দ্র 'উৎসর্গ করেন--' বিশ্বের সমস্ত নদীর উৎসে '।ভাবলে শিহরণ জাগে, প্রণত হতে হয় তাঁর মনন এবং দৃষ্টিভঙ্গির কাছে ।পড়ে দেখা যাক ওই কাব্যগ্রন্থের একটি কবিতার কিছু অংশ----------‐-----
      কে ফোটায় ফুল রোজ পাতায় পাতায় ডালে ডালে,
       মৃণালের বাহুবৃন্তে, মহুয়া সেগুন কাশে শালে ! 
       আরো মনোরম ওই আলোকমঞ্জরি নভোতল,
       বন- কপোতির ডাক,সুদূর ডাকেন প্রতিধ্বনি 
        পাঠায় মর্তের বুকে বাঁচার নিয়ত সঞ্জীবনী -----
        সূর্যমুখী ফুটে ওঠে, প্রচ্ছন্ন গভীর নীলোৎপল ।
        যেদিকে তাকাই শুধু নীল নীল সর্বকায় নীল, 
        বাধা নেই বাতায়নে, ভেঙে গেছে সমস্ত পাঁচিল।
                ----------- পটুয়া, গৌরীচাঁপা নদী চন্দরা 
এসময়ে শুনে নেওয়া যায় তাঁর কবিতা সংগ্রহে ভূর্জপত্রের আরো কিছু কথা।
     'আমার গবেষণা গ্রন্থ 'ভাগবত ও বাঙলা সাহিত্যে 'র সঙ্গে আমার কবিতা লেখার আট বছর পরে প্রকাশিত হল আমার প্রথম তিনটি কাব্যগ্রন্থ 'গৌরীচাঁপা নদী চন্দরা ', 'সপ্ত দিবানিশি কলকাতা ', 'মীনাঙ্ক সোপান '।
                                                        আচার্যদেব ভেবেছিলেন আমার কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হলে এদেশে একটা আলোড়ন সৃষ্টি হবে। হয়নি।
                                  আমার বইয়ের দ্বিতীয় প্রকাশক আমাদের মেজদা,প্রয়াত বৈদ্যনাথ চট্টোপাধ্যায় । তিনি বোনেদের বই প্রকাশের জন্য একটি পাবলিকেশন গড়ে ফেলেন। 'ঋক্ প্রকাশন '।ঊনিশ শ তিরানব্বই সালে বইমেলায় প্রকাশিত হল  'ভাগবত ও বাঙলা সাহিত্যে'র সঙ্গে আমার কাব্য সংকলন 'বঙ্কিমচন্দ্রের হাতে বঙ্গ ইতিহাস 'এবং প্রবন্ধ সংগ্রহ  'এক অক্ষৌহিনী বৃষ্টির 'আর কৃষ্ণার দর্শনের গবেষণাপত্র 'The world of Mystics.' দাদার ধারণা ছিল বোনেদের বই দেশের পাঠক মহলে আলোড়ন সৃষ্টি করবে। করেনি।বইমেলায় আমাদের বই এক কপিও বিক্রি হল না।আমার বদ্ধমূল ধারণা হয়ে গেল, আমার কবিতার আমিই লেখক এবং আমিই পাঠক।'
                                       ঊনিশ শ নিরানব্বই সালে কবি জয় গোস্বামী 'আনন্দ পাবলিশার্স ' থেকে আমার একটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের জন্য অনুরোধ পাঠালেন। আমি বরাবরবড় প্রতিষ্ঠানকে ভয় করি।কিন্তু মেজদার খুব ইচ্ছা ছিল এবং জয় গোস্বামীর প্রযত্নেই প্রকাশিত হল  'জলেহস্মিন সন্নিধিং কুরু ' আমার পঞ্চম কাব্যগ্রন্থ। '
                এই ঊনিশ শ নিরানব্বইতে তাঁর মেজদা বৈদ্যনাথ পাড়ি দিলেন পরলোকে। পয়লা মার্চ তাঁর প্রয়াণের  পর গীতার কাঁধে চাপল মধ্য কলকাতার পাঁচ বিঘা জমির উপর বাড়ি ও তাঁদের তত্ত্বাবধানে থাকা বাজারের গুরুদায়িত্ব।গীতা চট্টোপাধ্যায়ের কথায়---- 'যেন শেক্সপিয়ারের নাটকের পাতা একটার পর একটা অভিনীত হয়ে চলল------ সিংহাসনের চারপাশে উদ্যত ফণা বিষধর সর্প। বিষয়বুদ্ধিহীন পঞ্চাশোর্ধ বালিকাটি তার সমস্ত পড়াশোনা, তার প্রিয় কবিতাকে পরিত্যাগ করতে বাধ্য হল।নিয়মিত জপ করে সে-- 'যথানিযুক্তোহস্মি তথা করোমি।'  ---- এই মনোভাব তাঁর অদম্য আত্মবিশ্বাসের পরিচায়ক নিঃসন্দেহে। 
                 এসবের বহু আগে ঊনিশ শ পঁয়ষট্টি সালে প্রকাশিত হয়েছে কাব্যগ্রন্থ ' গৌরীচাঁপা নদী, চন্দরা। ' 'এই সময় ' দৈনিক পত্রিকার রবিবারোয়ারির জন্য দেওয়া এক
সাক্ষাৎকারে কবি সুধীর দত্তকে তিনি জানিয়েছেন, গৌরীচাঁপা নদী,  চন্দরা র জন্ম ইতিহাস। ------' আমি নিজে সাঁওতাল পরগণায় কাটিয়েছি মাস তিন। তারপর এসে পড়ল রিখিয়া। জন্ম হয়ে গেল 'গৌরীচাঁপা নদী, চন্দরা ' ।চন্দরা নাম কিন্তু রবীন্দ্রনাথের 'শাস্তি'ছোটগল্প থেকে প্রাপ্তি। 'ঐ সমসময়ে আরও দুটি কাব্যগ্রন্থ যথাক্রমে 'সপ্ত দিবানিশি কলকাতা ' ও 'মীনাঙ্ক সোপান 'প্রকাশিত হয়েছে,তারপর ঊনিশ শ তিরানব্বইতে  'বঙ্কিমচন্দ্রের হাতে বঙ্গ ইতিহাস '।
                                              কবি সুধীর দত্তকে দেওয়া ওই সাক্ষাৎকারে তাঁর  'স্বধর্ম' প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে জানিয়েছিলেন------------ 'জনপ্রিয়তার রাস্তায় হাঁটবনা।কোনও বাইরের চাপ, রাজনৈতিক তথা রাষ্ট্রনৈতিক নিয়ন্ত্রণ যথাসাধ্য মেনে নেবনা ।--এই স্বধর্মে দীক্ষা একদিনে হয়না।' এই শিরদাঁড়া সোজা রেখে চলার শিক্ষা তাঁর স্বোপার্জিত। আরও জানিয়েছেন-----'দীর্ঘ তিন দশকের অধিক কাল ধরে সাধনায় আমি শিখেছি, আমার পক্ষে নির্জনবাসই বিশল্যকরনী,এ যুগের সাংঘাতিক শক্তিশেলকে আত্মস্থ করতে একটা দৈব রসায়ন। আমি খাঁটি সাধনায় বিশ্বাসী, অর্থাৎ ফলের কিছুমাত্র আশা না রেখেই লিখেছি। তবে গোপনে বলি, আজ মাঝে মাঝে এই বলে খেদ হয়,আমার স্বদেশ আমাকে গ্রহণ করলনা, এতদিন তা হলে কী- ই লিখেছি,মানুষের কাছে পৌঁছোতে পারিনি।তাঁদের ত্রুটি নয়, আমারই প্রকাশের অচরিতার্থতা। ' ভাবা যায়! আজকের দিনে যখন নিজের মুখ দেখাবার জন্য নিজেদেরকে মঞেআবির্ভূত করার জন্য যেনতেনউপায় অবলম্বনকরার প্রতিযোগিতায় নেমেপড়েন তথাকথিত শিল্পসাধকগণ,তখন গীতা চট্টোপাধ্যায়ের ওই কথাগুলো নিঃসন্দেহে আত্মবিশ্বাসর দীক্ষায় দীক্ষিত করে।প্রাণিত করে সৎ এবং সত্য খাঁটি সাধনায় নিয়োজিত হতে, ব্রতী হতে 'স্বধর্ম পালনে।
                                             কবি গীতা চট্টোপাধ্যায়  ওভাবেই শ্রেষ্ঠের সাধনায় প্রশ্নাতীত আত্মজিজ্ঞাসু হয়ে রসদ আহরণ করতেন, পাথেয় হয়তোবা! এই বীক্ষণ অবশ্যই জরুরী যে কোনও শিল্পের শিল্পপথিক এর।শিল্পীর কর্মক্ষেত্র এই আত্ম অভিযান দাবি করে। পড়ে দেখার লোভ সামলাতে পারিনা তাঁর একটি কবিতা, যা দেবী ছিন্নমস্তার রূপারোপে বর্ণিত -------------
     আঠারো নালার যুদ্ধে হেরে গিয়ে মন- খেপী নারী 
     বেলাশেষে কালবেলা নিচকন্ঠে তুলেছে কাটারি 
      কী মায়া প্রপঞ্চময় ফিনকি দেয় রক্ত নয়, জাদু 
       নিজেরই রুধিরধারা পান মাত্রে কত না সুস্বাদু!
        মুক্তিকামী দিগম্বরী বামহাতে নিজের মস্তক 
       দক্ষিণে ধরেছে মুন্ড চোদ্দ ভুবনের প্রতারক----------
       ভুল সৃষ্টি হয়ে গেলে ছিন্নমস্তা কী রুদ্র নিষাদী 
       নিজেরাই বিচ্ছিন্ন মুখ নিজেরই প্রচ্ছন্ন প্রতিবাদী ।
                     ----------- ছিন্নমস্তা, অগ্রন্থিত কবিতা, কাব্য সংগ্রহ। 
                                                                           এই অনুসঙ্গের আবহ ছুঁয়ে আর একবার ঘুরে আসা যেতে পারে কবি সুধীর দত্তর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎকারের প্রথম পর্বে, যেখানে প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেছেন------'  তুমি আমার অনুজ  এবং ভ্রাতৃপ্রতিম  তবু তুমি সেই কবি সর্বনিয়ন্তা কালস্বরূপ, যিনি প্রশ্নচ্ছলে নচিকেতাকে আত্মজ্ঞানের সন্ধান দিয়েছিলেন। তোমার প্রাজ্ঞ প্রশ্নাবলি আমাকে আত্মস্বরূপের সন্ধান দিয়েছে।দুহাজার আট সালে মনস্বিনী কবি বল্লরী সেন আমাকে এর আগে একবার আত্মানুসন্ধানে ব্রতী করেছিলেন। তারপর দুহাজার তেরো সালে তুমি। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, আমার এক জীবনের স্বেচ্ছা নির্বাসনের এখানেই ইতি। তোমার মতো গুহায়িত গহ্বরেষ্ঠ কবির দ্বারা এ শুধু আর একবার অগ্নি পরীক্ষিত হওয়া। তৎ তম্ অসি ----- তুমি কবি হও শ্বেতকেতু। গুরু তো বলেই খালাস,সত্যি কি আমি কবি হয়েছি ? সুধীর দত্তকে গীতা বলেন----'আমার ধারণায় 'কবি' 'সর্বস্ব আমিকে নিয়ে প্রবেশ সে করেছে---'সংসারে/আলোকে তপনে তমে মৃত্যুশোকে জ্ঞানে ও ভ্রান্তিতে/ নিজের গভীর মূলে একফোঁটা ধ্বনিশেষে জেগে / আপূর্ণ খেতের ধারে বসে আছে স্থির শঙ্খচিল। / যেখানে পৌঁছলে পরে আর কোনো দুঃখও অমিল/ সেইখানে 
পৌঁছে গেছে সমস্ত সন্ধান অনুদ্বেগে। '------- এই উচ্চারণের বোধিদীপ্ত স্বরূপ যে গভীর ধ্যান স্তব্ধতায় নিবিষ্ট করে, সেখানে পৌঁছে মনে হতে থাকে বাইবেলীয় কথা-------- যেখানে আলো নেই, অন্ধকারও নেই, অনুভূতির স্তরও পৌঁছোতে বা ছুঁতে পারে না সেই ভূমি, সেই অবস্থান। 
           তাহলে কোন্ ব্যাখ্যায় ব্যাখ্যাত হবে ব্যাখ্যাতীত কল্পনাতীত ওই পর্যবক্ষেণ,ওই ভূলোক?
          উপনিষদের শ্বেতকেতু উপাখ্যান ছুঁয়ে যে জাগরণ উন্মোচিত হয় তাঁর কথায় এবং কলমে তখন অনিবার্য ইচ্ছা টেনে নিয়ে চলে কবি শঙ্খ ঘোষকে নিয়ে আলোচনার দরবারে। যেখানে তিনি জানাচ্ছেন  --------পঞ্চাশের সবচেয়ে স্তিতধী অথচ সাম্প্রতিক মনে হয়েছে শঙ্খ ঘোষকে ; 'কী আমার পরিচয় মা?'মাইল ফলক একটা।'

                             তাঁর প্রবন্ধ সংকলন 'এক অক্ষৌহিনী বৃষ্টিরেখা ' গ্রন্থের 'ডানার শিকড়'শীর্ষক আলোচনায় গীতা চট্টোপাধ্যায় জানাচ্ছেন-----'তবু কবিকে কোথাও একটা দাঁড়াতে তো হয়। তিনি দাঁড়ান এই  'নির্জন আত্মস্থতা'য় ,ঐতিহ্যে, যা তাঁকে শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রচ্যূত হতে দেয়না।'এই অবসরে দেখার লোভ সামলাতে পারিনা তাঁর 'কবি' কবিতার অংশবিশেষ------------
          ''কবিং পুরাণ মনুশাসিতারম্ অণোরনীয়াং'' ------- ভগবদ্গীতা
          
           যিনি কবি, তিনি সব জানেন, সবচেয়ে পুরোনো তিনি, 
           সকলের নিয়ন্তা অথচ সূক্ষ্ম থেকেও সূক্ষ্মতর। 
                   -------- কবি,জলেহস্মিন সন্নিধিং কুরু 
                                                              অত্যাশ্চর্য মেধা, মনন এবং পান্ডিত্যের অধিকারিনী কবি গীতা চট্টোপাধ্যায়ের প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সাহিত্যে এবং শাস্ত্রে বিশেষ জ্ঞান ছিল। অর্জিত ওইসব সম্পদ তাঁকে অপরিমান ধনী করে তুলেছিল। যা তাঁর সাহিত্য চর্চায় তিনি সযত্নে ব্যবহার করেছেন ।সেখানে বিন্দুমাত্র ফাঁক- ফোকর রাখতে রাজি ছিলেন না আদৌ।তাঁর সাহিত্যচর্চার লৌহবাসরে ছিদ্র থাকুক কোনও মতেই পছন্দ করতেন না তিনি । তাই কবি সুধীর দত্ত তাঁর কবিতা সম্বন্ধে সাধারণ অল্প সংখ্যক কিছু পাঠকের কথানুসারে তাঁকে কেউ কেউ পন্ডিত, 
'দুর্বোধ্য,তত্বপ্রধান বলেন;  আরও জানান,আবার কেউ কেউ তাঁর কবিতায় 'বিদ্যাবত্তার বিপত্তি 'দেখতে পান, একথা জানালে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় গীত চট্টোপাধ্যায় জানান------ 'যে কবির কবিতা পড়ে প্রথমেই পান্ডিত্যের কথা মনে হয়, সে কবি আদপে কবি নন।আমাদের সমস্ত জ্ঞান সমস্ত পড়াশোনা যদি কবিতার অ্যালকেমিতে সোনা হয়ে গলে না গেল, তাহলে কীসের কবি তিনি?
                                                 কিন্তু একটা কথা মনে রাখা চাই, কবিতা পাঠকের অধিকারী- ভেদ আছে। খুব পুরোনো নজির তুলে বলি,  বিদ্যাসুন্দর পালার পাঠক কি বুঝবেন মেঘনাদবধ কাব্য?'বিসর্জি প্রতিমা যেন দশমী দিবসে/ সপ্ত দিবানিশি লঙ্কা কাঁদিলা বিষাদে। 'কবি মধুসূদনের দুর্ভেদ্য পান্ডিত্যের প্রাকার চুরমার করেই কি বেরিয়ে আসেনি বাংলাদেশের হৃদয় নিংড়ে কবিতা?'
                                    এই জবাব,পর্যবক্ষেণী ক্ষমতা এবং নিজের ওপর অগাধ আস্থা ,সাথে সাথে বিরূপ সমালোচনাকে সাগ্রহে সানন্দে বরণ করার বিষয়টিও আমাদেরকে সমান ভাবে শিক্ষিত করে; নতজানু  করে তাঁর পরিনত বোধের সুমুখে। আধুনিক বাংলা কবিতা বিষয়ে অসমঞ্জস মন্তব্য এবং অসম আচরণ কম চোখে পড়েনি আধুনিক বাংলা কবিতার কবি, অনুরাগী পাঠক তথা কবিতাপ্রেমীদের। সেক্ষেত্রে কবি গীতা চট্টোপাধ্যায়ের সপাট জবাব অনুসরণযোগ্য।
                          কবি সুধীর দত্ত কৃত 'এক অনন্য কবি: গীতা চট্টোপাধ্যায় ' শীর্ষক আলোচনা থেকে জানা যায় 'যে পটভূমি থেকে উঠে এসেছেন অর্থাৎ জাত ও লালিত হয়েছেন তাঁর নিজের ভাষায় 'সেটা ঊনিশ শতকীয়।সামন্ততান্ত্রিক।'বাড়িতে ছিল 'দম দেওয়া চোঙাওলা কলের গান।কাঠের বাক্স- বোঝাই সেকেলে বড় বড় ডিস্ক।...........
বৌঝিরা লুকিয়ে শুনতেন। অন্দরমহলের দিকে বরাবর সবুজ খড়খড়ি তোলা। অন্ধকার ভিজে ঠান্ডা ।যেমন আলমারিতে তাঁদের কাচের পুতুল সাজানো থাকত সবুজ ভেলভেটের পর্দার আড়ালে।' তাঁর বাড়িতে মেম শিক্ষয়িত্রী আসত সেলাই শেখাতে। চলে গেলে অবেলায় স্নান করতে হতো।' এইভাবে চারদিকে শুধু 'নিষেধের নিরেট সবুজ ভেলভেট।'কবি গীতা জানিয়েছেন, তবু সেই  'নিস্তরঙ্গ দিঘিজলে ঢিল পড়ল'।এবং আমরা দেখতে পেলাম কবি গীতা চট্টোপাধ্যায়  তাঁর অতশ্চক্ষু দিয়ে বাইরের পৃথিবী ও মানুষকে কীভাবে আত্মভূত করে অনুভব করলেন তাদের সুখ- দুঃখ,তাদের ক্ষোভ ও খেদ ও জেহাদ।'কোনও কিছুই যেন নাগালচ্যূত হলনা তাঁর। প্রাচ্য- পাশ্চাত্য পুরাণ,সাহিত্যে অগাধ জ্ঞান,ইতিহাস ও ঐতিহ্য সচেতন মনন দিয়ে সালোক সংশ্লেষের মতো গ্রহণ করলেন হব।চেতনার গভীরতর আপত্তিকর ও উপলব্ধিতে তিনি পরিজ্ঞাত হলেন স  ....ব,সমস্ত অতীত ,বর্তমান ও ভবিষ্যতের ধারায় এভাবেই নিষিক্ত হলো তাঁর কবিতা,তাঁর সাহিত্যচর্চা বেদ- উপনিষদ, প্রাচীন এবং বর্তমানের সাহিত্য, ব্রতকথা ইত্যাদির তাৎপর্যপূর্ণ উপস্থাপন তাঁর কবিতার রসাস্বাদনের সীমাকে পর্যাপ্ত বিস্তৃতি দিয়েছে। 
                                                   তাঁর 'জলেহস্মিন সন্নিধিং কুরু 'এক আশ্চর্য কাব্যগ্রন্থ। ব্রত,ছড়া,প্রাচীন মঙ্গলকাব্য,বাইবেল, কালিদাস, শেলী, কীটনাশক,জেন্দ আবেস্তা, রিলকে, ভগবদ্গীতা ইত্যাদির সূর্যালোকের রশ্মিকে নিজের ভিতরে ধারণ করে অপূর্ব সব কবিতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছেন বাঙলা কবিতা ও সাহিত্যের পাঠককুলকে ।তুলে ধরি কয়েকটি কবিতা ও কবিতার অংশবিশেষ। 
   এক.
   কে বলেছে আমি সহ্য করব আততায়ী গুলি 
   শিকার আনন্দে করবে হঠাৎ উন্মাদ ফটোবাজি 
   আমার নির্জন এই বনবাসে ঠাট্টার কারসাজি
   ধড়িবাজ শিকারীর ফাঁদ ধরবে সুড়ঙ্গের গলি?
    লন্ডভন্ড করে দেবো একদিন দাঁতাল বরাহ 
    আদ্যোপান্ত চক্রান্তের মিডিয়ার স্মার্ট সার্থবাহ 
    এ ফোঁড় ও ফোঁড় করে কর্দমাক্ত প্রচার বাঁচাতে 
     আমার পৃথিবী আমি কবিতায় তুলে নেব দাঁতে। 
                                                          ---- বরাহ
    দুই .
    ছোট হোন ছোট হোন মিনিবাসে ছোট হয়ে যান 
    ছোট হোন ছোট হোন, ছোট গাছ ঝড়ে পড়ে না যে 
     ছোট ছোট আরও ছোট স্বদেশে সময়ে স্ব সমাজে-তিন লাথি মেরে আমি ঢেকে দেব তাবৎ আসমান। 
                                                                  ------বামন
     তিন. 
     যুবতী হয়েছে আজ,দাসীরা দেয়ালে পাতে কান। 
     প্রতিবাদ  এসে গেছে শরীরের রহস্যময়তা 
     দ্বীপের ভেতরে সূর্য আস্তে আস্তে ভূমি প্রসারিত 
     দৈবের নির্দিষ্ট ফুল শেষাবধি ফোটাতেই হবে। 
      জলের গোপন টানে জলচক্র ঘুরেছে নীরবে 
     জীব প্রকৃতির দিকে সুনিয়মে ঋতু আবর্তিত 
      এ পর্যন্ত দেহে তার রেখেছে তরঙ্গ ধূসর
       সর্বাঙ্গ-গহন তীর্থে শুরু হবে অপ্সরার স্নান ।
                                      ------ কুমারী চিন্তার কক্ষ
     চার.
     "কামিনী কমলে অবতার
     ধরিয়া বাম করে উগরায়ে করিবরে 
                              পুনরপি করয়ে সংহার। "
                                              -- চন্ডীমঙ্গল 
     সৃষ্টিকে ভেতরে এনে আবার বাইরে দিই ছেড়ে 
     গর্ভের নির্মলতম জলে আমি জন্ম দিই প্রাণ 
     সবচেয়ে সুবাতাস,  সব অন্ন, সফল শ্রীভূমি 
     পদ্মের পাতার মধ্যে রিক্ত স্বর্গ বৈকুন্ঠ নির্মাণ। 
                                                --- কমলে কামিনী 
উদ্ধৃত সবগুলো কবিতা 'জলেহস্মিন্ সন্নিধিং কুরু 'কাব্যগ্রন্থ থেকে গৃহীত। এসমস্ত কবিতায় তাঁর অবস্থান, সনিষ্ঠ নিরপেক্ষতা মাখা সচেতন সমাজ সত্যে স্নাত দৃষ্টিভঙ্গি
কবি গীত চট্টোপাধ্যায়ের বক্তব্য গভীর বৈশিষ্ট্য, বিশেষত্বকে অপার্থিব আলোকোজ্জ্বল 
অসামান্যতায় ভূষিত করে বলে বিশ্বাস। 'জলেহস্মিন্ সন্নিধিং কুরু ' কাব্যগ্রন্থে এরকম অজস্র কবিতার সমাহার।পুরাণ, মহাকাব্য আশ্রিত সেই সমস্ত কবিতার বক্তব্য ও গভীরভাবে অনুধাবনযোগ্য। ওই কাব্যগ্রন্থের আরও একটি কবিতা তুলে ধরার লোভ সামলাতে পারছি না।তাই পড়ে নেওয়া যাক একটু---------
  স্ত্রী কি সতী, উচ্চচাপে রোজ অফিসের পথে ভাবি 
  হঠাৎ হঠাৎ তার অফিসের আনাচে কানাচে 
  কে ছেলেটা হেসে হেসে কথা বলছে অত কাছে কাছে 
  হঠাৎ হঠাৎ একটা দৃষ্টিভ্রান্ত সুবর্ণহরিণ!
  মিউচুয়াল সেপারেশান, আসলে তো বনপর্ব শেষে 
  খবর মিলেছে লব- কুশ আসছে নিঃশব্দ আপোশে।
                                                                -- ----- রাম
 ভাবা যায়! এরকম আন্তরিক ঘরোয়া উপলব্ধির সমাজ - স্বরূপ এমন একজনের রচনায়,যিনি কিনা তাঁর আচার্যদেব- এর কথায়  'গজদন্ত মিনার বাসিনী !'কুর্ণিশ করি। নতজানু বসে পাঠ নেওয়ার ইচ্ছে জাগে তাঁর বোধ - ব্যাপ্তির ছায়াতলে। ধারণা হতেই পারে একজন মহিলা কবির পক্ষে বোধ হয় এসব মানায়। এই প্রেক্ষিত ও আন্তর প্রবণতাকে সামনে রেখে ঊনিশ শ তিরানব্বইতে প্রকাশিত তাঁর 'বঙ্কিমচন্দ্রের হাতে বঙ্গ ইতিহাস'  কাব্যগ্রন্থের ' আ- সমুদ্র হিমালয় ' কবিতাটির শরণাপন্ন হওয়া যায়। অনুমান করা হয় কবিতাটি রচিত হয়েছিল ভারতের তৎকালীন তরুণ প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর মৃত্যু উপলক্ষে। যেখানে ব্যক্তিমানুষের জননীসুলভ নারীসত্তার উপলব্ধির আলোকে ঝলমল করে ওঠে কবিতাটি।অনিবার্যভাবে রাজীব গান্ধীকে ঘরের ছেলেতে রূপান্তরিত করে।পড়ে নেওয়া যেতে পারে কবিতাটি--------------
     হৃৎপিন্ড কয়েক টুকরো বাঁদিকের ফুসফুস ফালফাল 
     প্লীহা ও যকৃত নেই ওপরের অদৃশ্য চোয়াল
     একা কিডনি পড়ে আছে , আর পাকস্থলী শূন্যময় 
     এ বিস্ফোরণের আগে চার ঘন্টা খাওয়া হয়নি তার 
      অক্ষত পায়ে শুধু একজোড়া স্পোর্ট-- শু স্পিকার ।
       উপুড় শরীর ঘিরে অব্যর্থ রঙের এক নদী 
      ফ্রি- ল্যান্স ফটোগ্রাফার সাক্ষাৎকার নিলে শ্বাসরোধ 
      নীচের চোয়াল খুলে অল্প একটু হাঁ করে বলে  'আ '------

      চন্দন কাঠের মালা হাতে নিয়ে ভেলট জ্যাকেট বোমা
      এগিয়ে আসছে কেউ পিঠে বাঁধা বেল্ট দিয়ে ভারী 
      প্লাস্টিক,  আর ডি এক্স ,চোরা পথে ন'ভোল্ট ব্যাটারী

      লক্ষ্য একমাত্র এই আমি, আ- সমুদ্র হিমালয়।
                                             ------- আ- সমুদ্র হিমালয়
প্রসঙ্গত, আমরা পড়ে নিতে পারি কবি জয় গোস্বামীকৃত অসামান্য বিশ্লেষণের কিছু কথা।  
জয় গোস্বামী জানাচ্ছেন-----'অক্ষত দু'পায়ে শুধু একজোড়া স্পোর্ট স্ -- শু স্নিকার  -----এসবই আমাদের জানা। কিন্তু যা আমাদের জানা নয়, বা জানলেও আমরা মনে রাখিনি, তা হল 'পাকস্থলী শূন্যময়। '  'এ বিস্ফোরণের আগে চারঘন্টা খাওয়া হয়নি তার। 'এই লাইনটা কোনো পুরুষ কবি লিখতে পারতেন বলে মনে হয় না।'
                                                                             এর সাথে সাথে 'এই সময়' দৈনিক পত্রিকার রবিবারোয়ারির জন্য নেওয়া সাক্ষাৎকার পর্বে কবি সুধীর দত্তর একটি প্রশ্ন  এবং কবি গীতা চট্টোপাধ্যায়ের উত্তর স্মরণ করতে পারি। কবি দত্ত জিজ্ঞেস করেছিলেন---------- 'আপনি চিরকুমারী হয়েও আপনার  'অপত্য 'কবিতায় একটি শিশুর জন্ম- মুহূর্তকে এমন অনুপুঙ্খে এমন জীবন্তভাবে ধরলেন কী ভাবে? আর 'সুদাসী বৈষ্ণবী 'কে কি অপরোক্ষ অনুভবে পেয়েছিলেন?
গীত  : চিরকুমারীর 'অপত্য ' স্নেহ ? আমাদের বিশাল সংসারে কত যে বালবিধবাকে আমি ' কানাইয়ের মা 'হয়ে সারাজীবন কাটাতে দেখেছি ।জন্ম না দিয়েও শিশু জন্মদানের অভিজ্ঞতা মেয়েদের সহজাত। তবে  'সুদাসী বৈষ্ণব ' তোমার আশ্চর্য আবিষ্কার। সারা গায়ে সে মেখেছিল হরিচন্দনের মতো প্রেম।আমারই দ্বিতীয় সত্তা। সমস্ত শরীর জড়িয়ে একটি 
                                                                                           --------------------------------------
একটি মানসিক সৌরভ। '   --------- পুনরায় মনে পড়ে কবির  'আ - সমুদ্র  হিমালয়  ' কবিতা
----------------------------------
আলোচনায় কবি জয় গোস্বামীর বক্তব্য  : ' বিস্ফোরণের আগে চারঘন্টা খাওয়া হয়নি তার। এই একটি লাইন অকালমৃত এই রাজনীতিককে আমাদের ঘরের ছেলে করে দেয়,আত্মীয় করে আনে। নারীর সহজাত স্নেহমমতার স্বর আমাদের মনে আসে। আহা,না খেয়ে রয়েছে এতক্ষণ। 'মনে আসতে পারে কবি সুধীর দত্তর চিরকুমারীর অপত্য স্নেহসম্পর্কিত জিজ্ঞাসা এবং কবি গীতা চট্টোপাধ্যায়ের উত্তরও। এ পর্যায়ে এসে কবি গীতা চট্টোপাধ্যায়ের একটি আক্ষেপ  ---' তবে গোপনে বলি, আজ মাঝে মাঝে এই বলে খেদ হয়, আমার স্বদেশ আমাকে গ্রহণ করলনা, এতদিন তা হলে কী- ই লিখেছি,মানুষের কাছে পৌঁছোতে পারিনি। তাঁদের ত্রুটি নয়,আমারই প্রকাশের অচরিতার্থতা। ' -------- আজ এতদিন পরে ধীরে ধীরে নিত্য নতুন অভিধায় আবিষ্কৃত হচ্ছেন তিনি,মানুষের মনের মনিকোঠায় স্থান পাচ্ছেন শ্রদ্ধায় , সম্ভ্রমে, আদরে। আজকের দিনে কবি গীতা চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা, গদ্য পাঠ যেমন অনিবার্য হয়ে উঠছে রসিক পাঠক জনের কাছে, তখন আমাদেরই খেদ হয় যদি আরও কিছুদিন থাকতেন তিনি! তবে আরও কতো কি যে পেতাম আমরা ! জানাতে পারতাম আমাদের আপ্লুত উপলব্ধির পূর্ণতার কথা ।হয়ত তাতে কিছুটা প্রশমিত হত তাঁর খেদ, তাঁর আক্ষেপ। পরনতি পর্বে এসে পড়ে নেওয়া যাক তাঁর 'জলেহস্মিন সন্নিধিং কুরু ' কাব্যগ্রন্থের  'কবির মৃত্যু 'নামক কবিতা। 
  টগরফুলের শব্দ বৃষ্টিপতনের শব্দ নয়----
  টানা বর্ষণের পরে সমস্ত দুপুর ছাদময়। 
  আকাশে প্রশস্ত পথ,মেঘধোয়া তিনি চলে যান 
  গরদের জোড় পরা চন্দন তিলক অভিমান। 
  টবের আঠালো মাটি মায়া এসে ডেবে দিচ্ছে চাকা
  তবু অনিবার্যতায় বৃষ্টিধৌত টগরের ফাঁকা 
  শূন্যপথ সূর্যাস্তের নিঃশেষিত উপুড় কলসী 
  অলকা তিলকা আঁকা অভিমানে সেই মহীয়সী। 
  যখন যাবেন কবি এমনি করে যান, 
  টগরফুলের শব্দ শব্দহীন একা ছাদময়। 

দুই.
শুধু কবিতা নয় গদ্যের দরবারে কবি গীতা চট্টোপাধ্যায়ের প্রবন্ধসমূহ এক অতুলনীয় সংযোজন। অনবদ্য বিশ্লেষণী দক্ষতায় সেখানে আলোচিত এবং আশ্রিত হয়েছেন প্রবীণ থেকে নবীন কবি ।তাঁর সচেতন সজাগ দৃষ্টি যে কবিতাজগতের সর্বত্র প্রসারিত ছিল এ বিষয়ে সন্দেহের  কোনও অবকাশ নেই। তাঁর 'এক অক্ষৌহিনী বৃষ্টিরেখা  ', 'বত্রিশ সিংহাসন সিরিজ 'এবং 'বাবু কবিতা আড্ডাধারী 'তাঁর মেধা, মনন, শিক্ষা, বোধিদীপ্ত মনীষার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সুধী ও রসিক পাঠক নিশ্চয়ই আরও আরও নতুন দিগন্তের সন্ধান পাবেন তাঁর রচনা জগৎ থেকে।তাঁকে আবিষ্কারের সাথে সাথে নিজেরাও আবিষ্কৃত হবেন নবলব্ধ
বোধের উজ্জীবনে-------- এ বিশ্বাস খুব সচেতনভাবে করাই যায়। 
 
                  ---------------------------------------------------------------------------------------------
কৃতজ্ঞতা ও ঋণ স্বীকার:---------
এক. 'আদম ' ডিসেম্বর, দুহাজার ষোল
দুই. কবি জয় গোস্বামী
তিন. কবি সুধীর দত্ত 
চার. কবি বল্লরী সেন 
পাঁচ. প্রাবন্ধিক অঙ্কনা বেতাল 

ছবি: অন্তর্জাল থেকে।

1 টি মন্তব্য:

কবিতা

সম্পাদকের কথা

দ্বিতীয় বর্ষ  ।। অষ্টম সংখ্যা ।। মার্চ ২০২২   খুব অসহায় লাগছে এবার। আমাদের ডান পাশে ধস। বায়ে গিরিখাত। মাথায় বোমারু। পায়ে পায়ে হিমানীর ব...