বুধবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২১

সম্পাদকের কথা


 আমাদের যাবতীয় অসহায়তার মধ্যে আবারও শারদীয় উৎসব এসে গেল। যাকে কেন্দ্র করে এই উৎসব সেই দেবী দুর্গা আমাদের মধ্যে সাহসিকতা ও আত্মবিশ্বাসের জন্ম দেন। অশুভ শক্তি আপাত দৃষ্টিতে ভয়ঙ্কর হলেও তা কিন্তু সত্য, শিব ও সুন্দরকে ভয় পায়। মানব সভ্যতার কোনও এক ক্ষণে এই চেতনার দ্বারা ঋদ্ধ হয়েছিলেন আমাদের পূর্বজরা। প্রকৃতিতে ভালো-মন্দ, সৎ-অসৎ সব মিলেমিশে থাকে। আলোর অভাব-ই অন্ধকার, সৎ-এর অভাব-ই অসৎ এটুকু বুঝতে হবে। বিভেদ কোনও কিছুতেই দেখি না। প্রতি- প্রত্যেকের মধ্যে মিলনের আকুতিই দেখি। অবস্থানগত সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করেই আমাদের উন্নত হতে হয়। আবার অবস্থানে অটুট থেকে উন্নতিকে সেখানে আহ্বান করলে সভ্যতা পেছনে হাঁটে। আমাদের বেশিরভাগ উৎসব-ই ধর্মকেন্দ্রিক। আমাদের সৃজনসত্তাও মূলতঃ ধর্মাশ্রয়ী। মানব সংস্কৃতির এই জীবনবৃদ্ধিগত কৌশল আমরা পূর্বজদের কাছ থেকে পেয়েছি। তাই এই উৎসবে আমরা আমাদের সেরাটা দিতে চাই। চেষ্টা করি। আর করি বলেই কিছুটা এগোই। সাহিত্যের বেলাভূমির সমস্ত লেখক-পাঠক-শুভানুধ্যায়ীদের উৎসবের আগাম শুভেচ্ছা জানাই। বর্তমান পরিস্থিতিতে আমরা সবাই হয়তো সেভাবে ভালো নেই। কিন্তু পরিস্থিতিকে স্বীকার করে বেঁচে থাকাটাই এখন আমাদের কাছে ধর্ম। প্রতিবেশীদের সুখ-দুঃখের সামান্যতম অংশভাগী হলেও তা আমাদের অন্তরকে শুদ্ধ করবে। ভালো সাহিত্য পাঠ, ভালো গান শোনা, ভালো পোশাক পরা বা খাওয়া-দাওয়ার সঙ্গে প্রতিবেশী ও আত্মীয় স্বজনের সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপনও এই উৎসবের অঙ্গ হয়ে উঠুক। মানুষ আমাদের সম্পদ। নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ও আত্মগরিমাকে অধিক প্রাধান্য দিতে গিয়ে নিজের প্রতিচ্ছায়াকে যেন ভুলে না যাই।


সমস্ত শরীর জড়িয়ে একটি মানসিক সৌরভ ।। দীপক হালদার




শিরোনামের বাক্যবন্ধ একান্তভাবে তাঁর,তাঁরই সৃষ্টির সমবায় থেকে সংগৃহীত।তাই , এ নিবন্ধ এক অর্থে  গঙ্গাজলে গঙ্গাপুজো।জানিনা,  আমার এই সীমিত চোখের আলোয় কতখানি ধরা পড়বেন তিনি।তবে, অবশ্যই 
চেষ্টা করে দেখব নিজের মতো করে ছুঁয়ে দেখার।যতটুকু জানি মেধা,প্রজ্ঞা আর সুগভীর মননের আন্তরবলয়ে তাঁর অধিবাস।প্রতিভা এবং প্রত্যয়ের যুগলবন্দী তাঁর কর্মধারার সংকীর্তনী স্বর।'শব্দতান্ত্রিকের হাড়ের পাশা' তাঁর অভিজ্ঞান। 'কুমারী চিন্তার কক্ষ'
তাঁর একান্ত ব্যক্তিগত প্রকোষ্ঠের অন্তর্গত সুনির্দিষ্ট সাধন ক্ষেত্র ।নির্নিমেষ নিজস্ব বিচরণ কেন্দ্রের ধ্যানের আসন পাতা ওখানেই । লেখাপড়ার ঘোরতর আচ্ছন্নতার নিবিড় কুঠি যেমন  এই ঘর, তেমনই  নিঃশব্দ ভোর হয়ে আসার অপার্থিব মুহূর্ত দর্শন  এই সাধনপীঠের অন্দরমহল থেকেই। তিনি গবেষক, 
প্রাবন্ধিক এবং সর্বার্থে নিমগ্ন চিন্তার অগ্রগণ্য  কবি। ঐকান্তিক আত্মানুসন্ধানে ব্রতী এক একাগ্র সাধিকা। প্রাজ্ঞ প্রশ্নাবলিকে যিনি অগ্নিপরীক্ষায় পরীক্ষিত হওয়ার সমতুল্য ভাবেন এবং সেভাবেই নির্নীত হয় তাঁর পথধারা। অন্তত দুটি ক্ষেত্রে সাক্ষাৎকার পর্বে এভাবেই অনিবার্য   ভাস্বর হয়ে ওঠেন তিনি । একটি   'কবিতা প্রতিমাসে' পত্রিকার জন্য কবি বল্লরী সেন এর গৃহীত সাক্ষাৎকারে,  অন্যটি 'এই সময় 'দৈনিক পত্রিকার রবিবারোয়ারির জন্য নেওয়া কবি সুধীর দত্তর সাক্ষাৎকারে । উভয় ক্ষেত্রেই ধীরে ধীরে তিনি  উন্মোচিত নন শুধু, উদ্ভাসিত হন অপরিমেয় পরিচয়ে। 
                                                                       কবিতার কাছে প্রশ্নাতীত দায়বদ্ধতা থেকে তিনি উচ্চারণ করেন --------- 'আমি বরং শিরও দেব, স্বধর্মকে কখনও না ।' তিনি কবি  গীতা চট্টোপাধ্যায়। তাঁকে ষাটের দশকের কবি হিসেবে আপাতভাবে চিহ্নিত করা হলেও একথা অস্বীকার করার কোনও ক্ষেত্র নেই যে তিনি বাংলাভাষার একজন অন্যতম  প্রধান কবি।তাঁর কবিতার পরতে পরতে তিনি রোপন করেন পুরাণ,উপনিষদ, ব্রতকথার নিসর্গলোক।তাঁর অভিজ্ঞানে পাশ্চাত্য সাহিত্যের সমকালীন রৌদ্রকিরণ।প্রতিষ্ঠান এবং প্রাতিষ্ঠানিকতা থেকে শত সহস্র যোজন দূরে অবস্থান করেন তিনি।দৃষ্টিভঙ্গির সামুদ্রিক বিস্তৃতির মিশেলে এভারেস্ট প্রমাণ উচ্চতার সাথে এক সুগভীর অতলতার মূর্তিমতী দৃষ্টান্ত তিনি।দুহাজার আট সালের জুন মাসে ' কবিতা প্রতিমাসে 'র জন্য নেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কবি বল্লরী সেনকে নির্দ্বিধায়  জানিয়েছিলেন-----' আমার মনে হয়েছিল, অধ্যয়নপ্রার্থী হওয়াই আমার লক্ষ্য, বস্তুত আমার জীবনসাধনার জন্য বিবাহ করিনি। '
                           ঙকবি গীতা চট্টোপাধ্যায়ের জন্ম ঊনিশ শ একচল্লিশ সালের ছয়ই আগস্ট এক রাখী পূর্ণিমার দিনে।বীরেশ্বর এবং মাধবীলতা চট্টোপাধ্যায়ের কন্যা গীতারা তিন ভাই, চারবোন।'  গীতা চট্টোপাধ্যায়ের পূর্ব পুরুষ কাশ্যপ গোত্রীয় বীতরাগ ওঝা বা উপাধ্যায়। কনৌজ থেকে অষ্টম শতাব্দীতে গৌড়েশ্বরের রাজধানীতে পৌন্ড্রবর্ধনে আসেন। কুলীন ব্রাম্ভনত্বের আভিজাত্য তাঁদের ধমনীতে। গীতা চট্টোপাধ্যায়দের মালিকানা শিয়ালদহ অঞ্চলের বৈঠকখানা বাজারের। ঐ অঞ্চলের প্রাসাদোপম বাড়িতে বাস তাঁদের। তাঁদের পরিবারে একই সাথে যেন লক্ষ্মী-সরস্বতীর সহাবস্থান ঘটেছিল। সাবেক সময় থেকে এই কিছুদিন আগের বর্তমান পর্যন্ত এই পরিবার তাঁদের শিক্ষানুরাগের পরিচয় দিয়ে স্থাপন করেছিল একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। শিক্ষানুরাগ এবং সেবাব্রত তাঁদেরকে উদ্যোগী করেছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণে ।
                                                  অসম্ভব মেধাবী গীতা চট্টোপাধ্যায় প্রথমে লেডি ব্রেবোর্ন কলেজ, পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাভাষা ও সাহিত্যের ছাত্রী।স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর দুটি পর্যায়ে গীতা প্রথম শ্রেনীতে প্রথম। গবেষণা করেছেন 'ভাগবত ও বাঙলা সাহিত্য '   বিষয়ে।তাঁর গবেষণাগ্রন্থ সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে প্রখ্যাত মনস্বী সাহিত্যরত্ন হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় বলেছিলেন----'শ্রীমদ্ভাগবতের নূতন ব্যাখ্যাকর্ত্রী তুমি।স্মরণীয় গ্রন্থ তোমার। চিরস্মরনীয়া হইয়া রহিলে বাঙলা সাহিত্যের ইতিহাসে। '
                                                                                               অথচ পেশা হিসেবে গ্রহণ করলেন না অধ্যাপনা। থেকেগেলেন অন্তরালবর্তিনী হিসেবে।গৃহাবাসে আজীবন স্বেচ্ছা নির্বাসিত গীতা বাড়ি থেকে বেরিয়েছেন হয়ত দু- একবার, বিশেষ কোনো প্রয়োজনে।বার দুয়েক আকাশবানীর অনুষ্ঠানে; তাও আবার কবি কবিতা সিংহের ঐকান্তিক অনুরোধে। একবার নাকি বইমেলাতেও গিয়েছিলেন তিনি।
                                                                  বিশিষ্ট রবীন্দ্রগবেষক ও খ্যাতনামা অধ্যাপক জগদীশ ভট্টাচার্যের ছাত্রী ছিলেন গীতা চট্টোপাধ্যায়। অধ্যাপক ভট্টাচার্য সম্পাদনা করতেন 'কবি ও কবিতা 'নামের একটি অভিজাত সাময়িক পত্রিকা।গীতা চট্টোপাধ্যায় ওই পত্রিকাতেই কবি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। ওই পত্রিকা ছাড়া, যতদূর জানা যায় তিনি লিখেছেন কবি শরৎসুনীল নন্দী, কবি রামচন্দ্র প্রামাণিক ও কবি সুধীর দত্ত সম্পাদিত 'সংবেদ ' পত্রিকায়।পরবর্তীকালে ডায়মন্ডহারবার থেকে প্রকাশিত কবি গৌতম ব্রম্ভর্ষি সম্পাদিত 'নির্যাস' পত্রিকায়ও তিনি লিখেছেন । লিখেছেন কবি অজয় নাগ সম্পাদিত 'সুন্দর ' পত্রিকাতেও।খুব বেশি পত্র-পত্রিকায় লিখতেন না তিনি। তাঁর কবিতায় আসা প্রসঙ্গে দুহাজার তেরোর চব্বিশে নভেম্বর 'এইসময় ' পত্রিকার রবিবারোয়ারিতে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে কবি গীতা চট্টোপাধ্যায় জানাচ্ছেন কবি সুধীর দত্তকে ------ 'তিনি ( অধ্যাপক জগদীশ ভট্টাচার্য ) সন্তুষ্ট হয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, 'তুমি কি চাও?' এককথায় আমি বলে উঠি,  'আমি কথাশিল্পী হব।' বিস্মিত হয়ে বললেন,  'তুমি তো গজদন্ত মিনার-বাসিনী। হতে পারবে তারাশংকর, বিভূতিভূষণ,মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়? লিখতে পারবে নারায়ণ গাঙ্গুলির 'টোপ ',সমরেশ বসুর 'আদাব '?তারপর আহত মুখের দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে বললেন, 'তোমার লেখায় বাস্তবের মধ্যে পরাবাস্তবের ছায়া পড়ে,গভীর কল্পনা আর শব্দের প্রযত্ন এসবই কবির লক্ষণ।জানবে কথাশিল্প বা নাটক মিশ্রশিল্প ।একটা কাহিনী থাকে, চরিত্র, ঘটনার সংঘাত। কবিতা বিশুদ্ধ শব্দশিল্প।ভারতীয় রাগ-রাগিনী যেমন সপ্তসুরে গড়া একএকটি ধ্যানমূর্তি, কবিতাও তেমনি শব্দে বিমূর্তের ধ্যান। তুমি শ্রেষ্ঠের সাধনা কর, কবি হও।'-------
                                         সেই থেকেই  শ্রেষ্ঠের সাধনায় নিয়োজিত তিনি। প্রসঙ্গত  স্মরণ করা যাক কবি গৌতম মন্ডল- এর প্রকাশন সংস্থা আদম প্রকাশিত কবি  গীতা চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা সংগ্রহের ভূর্জপত্রের অংশবিশেষ------- 'একটি শ্রুতিবাক্য দিয়ে আরম্ভ করলে কেমন হয় ---'তদ্দুরে তদ্বন্তিকে '---- তিনি দূরে আবার তিনি কাছেও। তিনি কে ? ঈশ্বর, ব্রম্ভ,অধি- চৈতন্য? 
                                            আমরা যারা ভগ্ন চৈতন্য সাঁকো প্রতিদিন পারাপার করি,তাদের কাছে খুব বেশি স্পর্শযোগ্য মনে হয়না ব্রম্ভ বা পরমাত্মা। ওখানে যদি বসিয়ে দিই 'শিল্প ' শব্দটিকে ?'
                                ' শিল্প কাল- ভূমিষ্ঠ হয়েও কালাতীত এবং আবহমান -কালের। যেমন দিকচক্রবাল, সে আছে আবার নেই, ক্রমশ বিস্তৃততর হয়ে যাচ্ছে তার পরিধি। প্লাবনের পরে পুরীর সমুদ্রসৈকতে আবার দেবীর বালুকামূর্তি গড়ে তুলছেন মনোমোহন মহাপাত্র, খনি থেকে ফিরে সূর্যমুখী ফুল আঁকছেন ভ্যান গঘ,তরুণ বড়ে গোলাম আলি গাইছেন  'আয়ে না বালম ',এক খ্যাপা গনিতজ্ঞ পাতার পর পাতা লিখে চলেছেন  'ফিরে এসো
চাকা'।খুব একটা আঘাত পেয়েছি মনে যখন নিমাই সন্ন্যাসীর স্তবে পেয়েছি, আমি ঐশ্বর্য,লোকলস্কর, সুন্দরী রমনী বা কবিতা চাই না, আমি চাই জন্মে জন্মে তোমায় অহেতুক ভক্তি, গোবিন্দ। আমার কাছে কিন্তু কবিতাই গোবিন্দ, গোবিন্দই কবিতা। ভগবদ্গীতার ভাষায়  'যং লবধ্বা চাপরং লাভং/ মন্যতে নাধিকং ততঃ ' ।যা পেলে আর কিছুই পাবার নেই আমার কাছে, তা কবিতা। '
                                          এই কবি তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ  'গৌরীচাঁপা নদী, চন্দ্র 'উৎসর্গ করেন--' বিশ্বের সমস্ত নদীর উৎসে '।ভাবলে শিহরণ জাগে, প্রণত হতে হয় তাঁর মনন এবং দৃষ্টিভঙ্গির কাছে ।পড়ে দেখা যাক ওই কাব্যগ্রন্থের একটি কবিতার কিছু অংশ----------‐-----
      কে ফোটায় ফুল রোজ পাতায় পাতায় ডালে ডালে,
       মৃণালের বাহুবৃন্তে, মহুয়া সেগুন কাশে শালে ! 
       আরো মনোরম ওই আলোকমঞ্জরি নভোতল,
       বন- কপোতির ডাক,সুদূর ডাকেন প্রতিধ্বনি 
        পাঠায় মর্তের বুকে বাঁচার নিয়ত সঞ্জীবনী -----
        সূর্যমুখী ফুটে ওঠে, প্রচ্ছন্ন গভীর নীলোৎপল ।
        যেদিকে তাকাই শুধু নীল নীল সর্বকায় নীল, 
        বাধা নেই বাতায়নে, ভেঙে গেছে সমস্ত পাঁচিল।
                ----------- পটুয়া, গৌরীচাঁপা নদী চন্দরা 
এসময়ে শুনে নেওয়া যায় তাঁর কবিতা সংগ্রহে ভূর্জপত্রের আরো কিছু কথা।
     'আমার গবেষণা গ্রন্থ 'ভাগবত ও বাঙলা সাহিত্যে 'র সঙ্গে আমার কবিতা লেখার আট বছর পরে প্রকাশিত হল আমার প্রথম তিনটি কাব্যগ্রন্থ 'গৌরীচাঁপা নদী চন্দরা ', 'সপ্ত দিবানিশি কলকাতা ', 'মীনাঙ্ক সোপান '।
                                                        আচার্যদেব ভেবেছিলেন আমার কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হলে এদেশে একটা আলোড়ন সৃষ্টি হবে। হয়নি।
                                  আমার বইয়ের দ্বিতীয় প্রকাশক আমাদের মেজদা,প্রয়াত বৈদ্যনাথ চট্টোপাধ্যায় । তিনি বোনেদের বই প্রকাশের জন্য একটি পাবলিকেশন গড়ে ফেলেন। 'ঋক্ প্রকাশন '।ঊনিশ শ তিরানব্বই সালে বইমেলায় প্রকাশিত হল  'ভাগবত ও বাঙলা সাহিত্যে'র সঙ্গে আমার কাব্য সংকলন 'বঙ্কিমচন্দ্রের হাতে বঙ্গ ইতিহাস 'এবং প্রবন্ধ সংগ্রহ  'এক অক্ষৌহিনী বৃষ্টির 'আর কৃষ্ণার দর্শনের গবেষণাপত্র 'The world of Mystics.' দাদার ধারণা ছিল বোনেদের বই দেশের পাঠক মহলে আলোড়ন সৃষ্টি করবে। করেনি।বইমেলায় আমাদের বই এক কপিও বিক্রি হল না।আমার বদ্ধমূল ধারণা হয়ে গেল, আমার কবিতার আমিই লেখক এবং আমিই পাঠক।'
                                       ঊনিশ শ নিরানব্বই সালে কবি জয় গোস্বামী 'আনন্দ পাবলিশার্স ' থেকে আমার একটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের জন্য অনুরোধ পাঠালেন। আমি বরাবরবড় প্রতিষ্ঠানকে ভয় করি।কিন্তু মেজদার খুব ইচ্ছা ছিল এবং জয় গোস্বামীর প্রযত্নেই প্রকাশিত হল  'জলেহস্মিন সন্নিধিং কুরু ' আমার পঞ্চম কাব্যগ্রন্থ। '
                এই ঊনিশ শ নিরানব্বইতে তাঁর মেজদা বৈদ্যনাথ পাড়ি দিলেন পরলোকে। পয়লা মার্চ তাঁর প্রয়াণের  পর গীতার কাঁধে চাপল মধ্য কলকাতার পাঁচ বিঘা জমির উপর বাড়ি ও তাঁদের তত্ত্বাবধানে থাকা বাজারের গুরুদায়িত্ব।গীতা চট্টোপাধ্যায়ের কথায়---- 'যেন শেক্সপিয়ারের নাটকের পাতা একটার পর একটা অভিনীত হয়ে চলল------ সিংহাসনের চারপাশে উদ্যত ফণা বিষধর সর্প। বিষয়বুদ্ধিহীন পঞ্চাশোর্ধ বালিকাটি তার সমস্ত পড়াশোনা, তার প্রিয় কবিতাকে পরিত্যাগ করতে বাধ্য হল।নিয়মিত জপ করে সে-- 'যথানিযুক্তোহস্মি তথা করোমি।'  ---- এই মনোভাব তাঁর অদম্য আত্মবিশ্বাসের পরিচায়ক নিঃসন্দেহে। 
                 এসবের বহু আগে ঊনিশ শ পঁয়ষট্টি সালে প্রকাশিত হয়েছে কাব্যগ্রন্থ ' গৌরীচাঁপা নদী, চন্দরা। ' 'এই সময় ' দৈনিক পত্রিকার রবিবারোয়ারির জন্য দেওয়া এক
সাক্ষাৎকারে কবি সুধীর দত্তকে তিনি জানিয়েছেন, গৌরীচাঁপা নদী,  চন্দরা র জন্ম ইতিহাস। ------' আমি নিজে সাঁওতাল পরগণায় কাটিয়েছি মাস তিন। তারপর এসে পড়ল রিখিয়া। জন্ম হয়ে গেল 'গৌরীচাঁপা নদী, চন্দরা ' ।চন্দরা নাম কিন্তু রবীন্দ্রনাথের 'শাস্তি'ছোটগল্প থেকে প্রাপ্তি। 'ঐ সমসময়ে আরও দুটি কাব্যগ্রন্থ যথাক্রমে 'সপ্ত দিবানিশি কলকাতা ' ও 'মীনাঙ্ক সোপান 'প্রকাশিত হয়েছে,তারপর ঊনিশ শ তিরানব্বইতে  'বঙ্কিমচন্দ্রের হাতে বঙ্গ ইতিহাস '।
                                              কবি সুধীর দত্তকে দেওয়া ওই সাক্ষাৎকারে তাঁর  'স্বধর্ম' প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে জানিয়েছিলেন------------ 'জনপ্রিয়তার রাস্তায় হাঁটবনা।কোনও বাইরের চাপ, রাজনৈতিক তথা রাষ্ট্রনৈতিক নিয়ন্ত্রণ যথাসাধ্য মেনে নেবনা ।--এই স্বধর্মে দীক্ষা একদিনে হয়না।' এই শিরদাঁড়া সোজা রেখে চলার শিক্ষা তাঁর স্বোপার্জিত। আরও জানিয়েছেন-----'দীর্ঘ তিন দশকের অধিক কাল ধরে সাধনায় আমি শিখেছি, আমার পক্ষে নির্জনবাসই বিশল্যকরনী,এ যুগের সাংঘাতিক শক্তিশেলকে আত্মস্থ করতে একটা দৈব রসায়ন। আমি খাঁটি সাধনায় বিশ্বাসী, অর্থাৎ ফলের কিছুমাত্র আশা না রেখেই লিখেছি। তবে গোপনে বলি, আজ মাঝে মাঝে এই বলে খেদ হয়,আমার স্বদেশ আমাকে গ্রহণ করলনা, এতদিন তা হলে কী- ই লিখেছি,মানুষের কাছে পৌঁছোতে পারিনি।তাঁদের ত্রুটি নয়, আমারই প্রকাশের অচরিতার্থতা। ' ভাবা যায়! আজকের দিনে যখন নিজের মুখ দেখাবার জন্য নিজেদেরকে মঞেআবির্ভূত করার জন্য যেনতেনউপায় অবলম্বনকরার প্রতিযোগিতায় নেমেপড়েন তথাকথিত শিল্পসাধকগণ,তখন গীতা চট্টোপাধ্যায়ের ওই কথাগুলো নিঃসন্দেহে আত্মবিশ্বাসর দীক্ষায় দীক্ষিত করে।প্রাণিত করে সৎ এবং সত্য খাঁটি সাধনায় নিয়োজিত হতে, ব্রতী হতে 'স্বধর্ম পালনে।
                                             কবি গীতা চট্টোপাধ্যায়  ওভাবেই শ্রেষ্ঠের সাধনায় প্রশ্নাতীত আত্মজিজ্ঞাসু হয়ে রসদ আহরণ করতেন, পাথেয় হয়তোবা! এই বীক্ষণ অবশ্যই জরুরী যে কোনও শিল্পের শিল্পপথিক এর।শিল্পীর কর্মক্ষেত্র এই আত্ম অভিযান দাবি করে। পড়ে দেখার লোভ সামলাতে পারিনা তাঁর একটি কবিতা, যা দেবী ছিন্নমস্তার রূপারোপে বর্ণিত -------------
     আঠারো নালার যুদ্ধে হেরে গিয়ে মন- খেপী নারী 
     বেলাশেষে কালবেলা নিচকন্ঠে তুলেছে কাটারি 
      কী মায়া প্রপঞ্চময় ফিনকি দেয় রক্ত নয়, জাদু 
       নিজেরই রুধিরধারা পান মাত্রে কত না সুস্বাদু!
        মুক্তিকামী দিগম্বরী বামহাতে নিজের মস্তক 
       দক্ষিণে ধরেছে মুন্ড চোদ্দ ভুবনের প্রতারক----------
       ভুল সৃষ্টি হয়ে গেলে ছিন্নমস্তা কী রুদ্র নিষাদী 
       নিজেরাই বিচ্ছিন্ন মুখ নিজেরই প্রচ্ছন্ন প্রতিবাদী ।
                     ----------- ছিন্নমস্তা, অগ্রন্থিত কবিতা, কাব্য সংগ্রহ। 
                                                                           এই অনুসঙ্গের আবহ ছুঁয়ে আর একবার ঘুরে আসা যেতে পারে কবি সুধীর দত্তর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎকারের প্রথম পর্বে, যেখানে প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেছেন------'  তুমি আমার অনুজ  এবং ভ্রাতৃপ্রতিম  তবু তুমি সেই কবি সর্বনিয়ন্তা কালস্বরূপ, যিনি প্রশ্নচ্ছলে নচিকেতাকে আত্মজ্ঞানের সন্ধান দিয়েছিলেন। তোমার প্রাজ্ঞ প্রশ্নাবলি আমাকে আত্মস্বরূপের সন্ধান দিয়েছে।দুহাজার আট সালে মনস্বিনী কবি বল্লরী সেন আমাকে এর আগে একবার আত্মানুসন্ধানে ব্রতী করেছিলেন। তারপর দুহাজার তেরো সালে তুমি। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, আমার এক জীবনের স্বেচ্ছা নির্বাসনের এখানেই ইতি। তোমার মতো গুহায়িত গহ্বরেষ্ঠ কবির দ্বারা এ শুধু আর একবার অগ্নি পরীক্ষিত হওয়া। তৎ তম্ অসি ----- তুমি কবি হও শ্বেতকেতু। গুরু তো বলেই খালাস,সত্যি কি আমি কবি হয়েছি ? সুধীর দত্তকে গীতা বলেন----'আমার ধারণায় 'কবি' 'সর্বস্ব আমিকে নিয়ে প্রবেশ সে করেছে---'সংসারে/আলোকে তপনে তমে মৃত্যুশোকে জ্ঞানে ও ভ্রান্তিতে/ নিজের গভীর মূলে একফোঁটা ধ্বনিশেষে জেগে / আপূর্ণ খেতের ধারে বসে আছে স্থির শঙ্খচিল। / যেখানে পৌঁছলে পরে আর কোনো দুঃখও অমিল/ সেইখানে 
পৌঁছে গেছে সমস্ত সন্ধান অনুদ্বেগে। '------- এই উচ্চারণের বোধিদীপ্ত স্বরূপ যে গভীর ধ্যান স্তব্ধতায় নিবিষ্ট করে, সেখানে পৌঁছে মনে হতে থাকে বাইবেলীয় কথা-------- যেখানে আলো নেই, অন্ধকারও নেই, অনুভূতির স্তরও পৌঁছোতে বা ছুঁতে পারে না সেই ভূমি, সেই অবস্থান। 
           তাহলে কোন্ ব্যাখ্যায় ব্যাখ্যাত হবে ব্যাখ্যাতীত কল্পনাতীত ওই পর্যবক্ষেণ,ওই ভূলোক?
          উপনিষদের শ্বেতকেতু উপাখ্যান ছুঁয়ে যে জাগরণ উন্মোচিত হয় তাঁর কথায় এবং কলমে তখন অনিবার্য ইচ্ছা টেনে নিয়ে চলে কবি শঙ্খ ঘোষকে নিয়ে আলোচনার দরবারে। যেখানে তিনি জানাচ্ছেন  --------পঞ্চাশের সবচেয়ে স্তিতধী অথচ সাম্প্রতিক মনে হয়েছে শঙ্খ ঘোষকে ; 'কী আমার পরিচয় মা?'মাইল ফলক একটা।'

                             তাঁর প্রবন্ধ সংকলন 'এক অক্ষৌহিনী বৃষ্টিরেখা ' গ্রন্থের 'ডানার শিকড়'শীর্ষক আলোচনায় গীতা চট্টোপাধ্যায় জানাচ্ছেন-----'তবু কবিকে কোথাও একটা দাঁড়াতে তো হয়। তিনি দাঁড়ান এই  'নির্জন আত্মস্থতা'য় ,ঐতিহ্যে, যা তাঁকে শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রচ্যূত হতে দেয়না।'এই অবসরে দেখার লোভ সামলাতে পারিনা তাঁর 'কবি' কবিতার অংশবিশেষ------------
          ''কবিং পুরাণ মনুশাসিতারম্ অণোরনীয়াং'' ------- ভগবদ্গীতা
          
           যিনি কবি, তিনি সব জানেন, সবচেয়ে পুরোনো তিনি, 
           সকলের নিয়ন্তা অথচ সূক্ষ্ম থেকেও সূক্ষ্মতর। 
                   -------- কবি,জলেহস্মিন সন্নিধিং কুরু 
                                                              অত্যাশ্চর্য মেধা, মনন এবং পান্ডিত্যের অধিকারিনী কবি গীতা চট্টোপাধ্যায়ের প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সাহিত্যে এবং শাস্ত্রে বিশেষ জ্ঞান ছিল। অর্জিত ওইসব সম্পদ তাঁকে অপরিমান ধনী করে তুলেছিল। যা তাঁর সাহিত্য চর্চায় তিনি সযত্নে ব্যবহার করেছেন ।সেখানে বিন্দুমাত্র ফাঁক- ফোকর রাখতে রাজি ছিলেন না আদৌ।তাঁর সাহিত্যচর্চার লৌহবাসরে ছিদ্র থাকুক কোনও মতেই পছন্দ করতেন না তিনি । তাই কবি সুধীর দত্ত তাঁর কবিতা সম্বন্ধে সাধারণ অল্প সংখ্যক কিছু পাঠকের কথানুসারে তাঁকে কেউ কেউ পন্ডিত, 
'দুর্বোধ্য,তত্বপ্রধান বলেন;  আরও জানান,আবার কেউ কেউ তাঁর কবিতায় 'বিদ্যাবত্তার বিপত্তি 'দেখতে পান, একথা জানালে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় গীত চট্টোপাধ্যায় জানান------ 'যে কবির কবিতা পড়ে প্রথমেই পান্ডিত্যের কথা মনে হয়, সে কবি আদপে কবি নন।আমাদের সমস্ত জ্ঞান সমস্ত পড়াশোনা যদি কবিতার অ্যালকেমিতে সোনা হয়ে গলে না গেল, তাহলে কীসের কবি তিনি?
                                                 কিন্তু একটা কথা মনে রাখা চাই, কবিতা পাঠকের অধিকারী- ভেদ আছে। খুব পুরোনো নজির তুলে বলি,  বিদ্যাসুন্দর পালার পাঠক কি বুঝবেন মেঘনাদবধ কাব্য?'বিসর্জি প্রতিমা যেন দশমী দিবসে/ সপ্ত দিবানিশি লঙ্কা কাঁদিলা বিষাদে। 'কবি মধুসূদনের দুর্ভেদ্য পান্ডিত্যের প্রাকার চুরমার করেই কি বেরিয়ে আসেনি বাংলাদেশের হৃদয় নিংড়ে কবিতা?'
                                    এই জবাব,পর্যবক্ষেণী ক্ষমতা এবং নিজের ওপর অগাধ আস্থা ,সাথে সাথে বিরূপ সমালোচনাকে সাগ্রহে সানন্দে বরণ করার বিষয়টিও আমাদেরকে সমান ভাবে শিক্ষিত করে; নতজানু  করে তাঁর পরিনত বোধের সুমুখে। আধুনিক বাংলা কবিতা বিষয়ে অসমঞ্জস মন্তব্য এবং অসম আচরণ কম চোখে পড়েনি আধুনিক বাংলা কবিতার কবি, অনুরাগী পাঠক তথা কবিতাপ্রেমীদের। সেক্ষেত্রে কবি গীতা চট্টোপাধ্যায়ের সপাট জবাব অনুসরণযোগ্য।
                          কবি সুধীর দত্ত কৃত 'এক অনন্য কবি: গীতা চট্টোপাধ্যায় ' শীর্ষক আলোচনা থেকে জানা যায় 'যে পটভূমি থেকে উঠে এসেছেন অর্থাৎ জাত ও লালিত হয়েছেন তাঁর নিজের ভাষায় 'সেটা ঊনিশ শতকীয়।সামন্ততান্ত্রিক।'বাড়িতে ছিল 'দম দেওয়া চোঙাওলা কলের গান।কাঠের বাক্স- বোঝাই সেকেলে বড় বড় ডিস্ক।...........
বৌঝিরা লুকিয়ে শুনতেন। অন্দরমহলের দিকে বরাবর সবুজ খড়খড়ি তোলা। অন্ধকার ভিজে ঠান্ডা ।যেমন আলমারিতে তাঁদের কাচের পুতুল সাজানো থাকত সবুজ ভেলভেটের পর্দার আড়ালে।' তাঁর বাড়িতে মেম শিক্ষয়িত্রী আসত সেলাই শেখাতে। চলে গেলে অবেলায় স্নান করতে হতো।' এইভাবে চারদিকে শুধু 'নিষেধের নিরেট সবুজ ভেলভেট।'কবি গীতা জানিয়েছেন, তবু সেই  'নিস্তরঙ্গ দিঘিজলে ঢিল পড়ল'।এবং আমরা দেখতে পেলাম কবি গীতা চট্টোপাধ্যায়  তাঁর অতশ্চক্ষু দিয়ে বাইরের পৃথিবী ও মানুষকে কীভাবে আত্মভূত করে অনুভব করলেন তাদের সুখ- দুঃখ,তাদের ক্ষোভ ও খেদ ও জেহাদ।'কোনও কিছুই যেন নাগালচ্যূত হলনা তাঁর। প্রাচ্য- পাশ্চাত্য পুরাণ,সাহিত্যে অগাধ জ্ঞান,ইতিহাস ও ঐতিহ্য সচেতন মনন দিয়ে সালোক সংশ্লেষের মতো গ্রহণ করলেন হব।চেতনার গভীরতর আপত্তিকর ও উপলব্ধিতে তিনি পরিজ্ঞাত হলেন স  ....ব,সমস্ত অতীত ,বর্তমান ও ভবিষ্যতের ধারায় এভাবেই নিষিক্ত হলো তাঁর কবিতা,তাঁর সাহিত্যচর্চা বেদ- উপনিষদ, প্রাচীন এবং বর্তমানের সাহিত্য, ব্রতকথা ইত্যাদির তাৎপর্যপূর্ণ উপস্থাপন তাঁর কবিতার রসাস্বাদনের সীমাকে পর্যাপ্ত বিস্তৃতি দিয়েছে। 
                                                   তাঁর 'জলেহস্মিন সন্নিধিং কুরু 'এক আশ্চর্য কাব্যগ্রন্থ। ব্রত,ছড়া,প্রাচীন মঙ্গলকাব্য,বাইবেল, কালিদাস, শেলী, কীটনাশক,জেন্দ আবেস্তা, রিলকে, ভগবদ্গীতা ইত্যাদির সূর্যালোকের রশ্মিকে নিজের ভিতরে ধারণ করে অপূর্ব সব কবিতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছেন বাঙলা কবিতা ও সাহিত্যের পাঠককুলকে ।তুলে ধরি কয়েকটি কবিতা ও কবিতার অংশবিশেষ। 
   এক.
   কে বলেছে আমি সহ্য করব আততায়ী গুলি 
   শিকার আনন্দে করবে হঠাৎ উন্মাদ ফটোবাজি 
   আমার নির্জন এই বনবাসে ঠাট্টার কারসাজি
   ধড়িবাজ শিকারীর ফাঁদ ধরবে সুড়ঙ্গের গলি?
    লন্ডভন্ড করে দেবো একদিন দাঁতাল বরাহ 
    আদ্যোপান্ত চক্রান্তের মিডিয়ার স্মার্ট সার্থবাহ 
    এ ফোঁড় ও ফোঁড় করে কর্দমাক্ত প্রচার বাঁচাতে 
     আমার পৃথিবী আমি কবিতায় তুলে নেব দাঁতে। 
                                                          ---- বরাহ
    দুই .
    ছোট হোন ছোট হোন মিনিবাসে ছোট হয়ে যান 
    ছোট হোন ছোট হোন, ছোট গাছ ঝড়ে পড়ে না যে 
     ছোট ছোট আরও ছোট স্বদেশে সময়ে স্ব সমাজে-তিন লাথি মেরে আমি ঢেকে দেব তাবৎ আসমান। 
                                                                  ------বামন
     তিন. 
     যুবতী হয়েছে আজ,দাসীরা দেয়ালে পাতে কান। 
     প্রতিবাদ  এসে গেছে শরীরের রহস্যময়তা 
     দ্বীপের ভেতরে সূর্য আস্তে আস্তে ভূমি প্রসারিত 
     দৈবের নির্দিষ্ট ফুল শেষাবধি ফোটাতেই হবে। 
      জলের গোপন টানে জলচক্র ঘুরেছে নীরবে 
     জীব প্রকৃতির দিকে সুনিয়মে ঋতু আবর্তিত 
      এ পর্যন্ত দেহে তার রেখেছে তরঙ্গ ধূসর
       সর্বাঙ্গ-গহন তীর্থে শুরু হবে অপ্সরার স্নান ।
                                      ------ কুমারী চিন্তার কক্ষ
     চার.
     "কামিনী কমলে অবতার
     ধরিয়া বাম করে উগরায়ে করিবরে 
                              পুনরপি করয়ে সংহার। "
                                              -- চন্ডীমঙ্গল 
     সৃষ্টিকে ভেতরে এনে আবার বাইরে দিই ছেড়ে 
     গর্ভের নির্মলতম জলে আমি জন্ম দিই প্রাণ 
     সবচেয়ে সুবাতাস,  সব অন্ন, সফল শ্রীভূমি 
     পদ্মের পাতার মধ্যে রিক্ত স্বর্গ বৈকুন্ঠ নির্মাণ। 
                                                --- কমলে কামিনী 
উদ্ধৃত সবগুলো কবিতা 'জলেহস্মিন্ সন্নিধিং কুরু 'কাব্যগ্রন্থ থেকে গৃহীত। এসমস্ত কবিতায় তাঁর অবস্থান, সনিষ্ঠ নিরপেক্ষতা মাখা সচেতন সমাজ সত্যে স্নাত দৃষ্টিভঙ্গি
কবি গীত চট্টোপাধ্যায়ের বক্তব্য গভীর বৈশিষ্ট্য, বিশেষত্বকে অপার্থিব আলোকোজ্জ্বল 
অসামান্যতায় ভূষিত করে বলে বিশ্বাস। 'জলেহস্মিন্ সন্নিধিং কুরু ' কাব্যগ্রন্থে এরকম অজস্র কবিতার সমাহার।পুরাণ, মহাকাব্য আশ্রিত সেই সমস্ত কবিতার বক্তব্য ও গভীরভাবে অনুধাবনযোগ্য। ওই কাব্যগ্রন্থের আরও একটি কবিতা তুলে ধরার লোভ সামলাতে পারছি না।তাই পড়ে নেওয়া যাক একটু---------
  স্ত্রী কি সতী, উচ্চচাপে রোজ অফিসের পথে ভাবি 
  হঠাৎ হঠাৎ তার অফিসের আনাচে কানাচে 
  কে ছেলেটা হেসে হেসে কথা বলছে অত কাছে কাছে 
  হঠাৎ হঠাৎ একটা দৃষ্টিভ্রান্ত সুবর্ণহরিণ!
  মিউচুয়াল সেপারেশান, আসলে তো বনপর্ব শেষে 
  খবর মিলেছে লব- কুশ আসছে নিঃশব্দ আপোশে।
                                                                -- ----- রাম
 ভাবা যায়! এরকম আন্তরিক ঘরোয়া উপলব্ধির সমাজ - স্বরূপ এমন একজনের রচনায়,যিনি কিনা তাঁর আচার্যদেব- এর কথায়  'গজদন্ত মিনার বাসিনী !'কুর্ণিশ করি। নতজানু বসে পাঠ নেওয়ার ইচ্ছে জাগে তাঁর বোধ - ব্যাপ্তির ছায়াতলে। ধারণা হতেই পারে একজন মহিলা কবির পক্ষে বোধ হয় এসব মানায়। এই প্রেক্ষিত ও আন্তর প্রবণতাকে সামনে রেখে ঊনিশ শ তিরানব্বইতে প্রকাশিত তাঁর 'বঙ্কিমচন্দ্রের হাতে বঙ্গ ইতিহাস'  কাব্যগ্রন্থের ' আ- সমুদ্র হিমালয় ' কবিতাটির শরণাপন্ন হওয়া যায়। অনুমান করা হয় কবিতাটি রচিত হয়েছিল ভারতের তৎকালীন তরুণ প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর মৃত্যু উপলক্ষে। যেখানে ব্যক্তিমানুষের জননীসুলভ নারীসত্তার উপলব্ধির আলোকে ঝলমল করে ওঠে কবিতাটি।অনিবার্যভাবে রাজীব গান্ধীকে ঘরের ছেলেতে রূপান্তরিত করে।পড়ে নেওয়া যেতে পারে কবিতাটি--------------
     হৃৎপিন্ড কয়েক টুকরো বাঁদিকের ফুসফুস ফালফাল 
     প্লীহা ও যকৃত নেই ওপরের অদৃশ্য চোয়াল
     একা কিডনি পড়ে আছে , আর পাকস্থলী শূন্যময় 
     এ বিস্ফোরণের আগে চার ঘন্টা খাওয়া হয়নি তার 
      অক্ষত পায়ে শুধু একজোড়া স্পোর্ট-- শু স্পিকার ।
       উপুড় শরীর ঘিরে অব্যর্থ রঙের এক নদী 
      ফ্রি- ল্যান্স ফটোগ্রাফার সাক্ষাৎকার নিলে শ্বাসরোধ 
      নীচের চোয়াল খুলে অল্প একটু হাঁ করে বলে  'আ '------

      চন্দন কাঠের মালা হাতে নিয়ে ভেলট জ্যাকেট বোমা
      এগিয়ে আসছে কেউ পিঠে বাঁধা বেল্ট দিয়ে ভারী 
      প্লাস্টিক,  আর ডি এক্স ,চোরা পথে ন'ভোল্ট ব্যাটারী

      লক্ষ্য একমাত্র এই আমি, আ- সমুদ্র হিমালয়।
                                             ------- আ- সমুদ্র হিমালয়
প্রসঙ্গত, আমরা পড়ে নিতে পারি কবি জয় গোস্বামীকৃত অসামান্য বিশ্লেষণের কিছু কথা।  
জয় গোস্বামী জানাচ্ছেন-----'অক্ষত দু'পায়ে শুধু একজোড়া স্পোর্ট স্ -- শু স্নিকার  -----এসবই আমাদের জানা। কিন্তু যা আমাদের জানা নয়, বা জানলেও আমরা মনে রাখিনি, তা হল 'পাকস্থলী শূন্যময়। '  'এ বিস্ফোরণের আগে চারঘন্টা খাওয়া হয়নি তার। 'এই লাইনটা কোনো পুরুষ কবি লিখতে পারতেন বলে মনে হয় না।'
                                                                             এর সাথে সাথে 'এই সময়' দৈনিক পত্রিকার রবিবারোয়ারির জন্য নেওয়া সাক্ষাৎকার পর্বে কবি সুধীর দত্তর একটি প্রশ্ন  এবং কবি গীতা চট্টোপাধ্যায়ের উত্তর স্মরণ করতে পারি। কবি দত্ত জিজ্ঞেস করেছিলেন---------- 'আপনি চিরকুমারী হয়েও আপনার  'অপত্য 'কবিতায় একটি শিশুর জন্ম- মুহূর্তকে এমন অনুপুঙ্খে এমন জীবন্তভাবে ধরলেন কী ভাবে? আর 'সুদাসী বৈষ্ণবী 'কে কি অপরোক্ষ অনুভবে পেয়েছিলেন?
গীত  : চিরকুমারীর 'অপত্য ' স্নেহ ? আমাদের বিশাল সংসারে কত যে বালবিধবাকে আমি ' কানাইয়ের মা 'হয়ে সারাজীবন কাটাতে দেখেছি ।জন্ম না দিয়েও শিশু জন্মদানের অভিজ্ঞতা মেয়েদের সহজাত। তবে  'সুদাসী বৈষ্ণব ' তোমার আশ্চর্য আবিষ্কার। সারা গায়ে সে মেখেছিল হরিচন্দনের মতো প্রেম।আমারই দ্বিতীয় সত্তা। সমস্ত শরীর জড়িয়ে একটি 
                                                                                           --------------------------------------
একটি মানসিক সৌরভ। '   --------- পুনরায় মনে পড়ে কবির  'আ - সমুদ্র  হিমালয়  ' কবিতা
----------------------------------
আলোচনায় কবি জয় গোস্বামীর বক্তব্য  : ' বিস্ফোরণের আগে চারঘন্টা খাওয়া হয়নি তার। এই একটি লাইন অকালমৃত এই রাজনীতিককে আমাদের ঘরের ছেলে করে দেয়,আত্মীয় করে আনে। নারীর সহজাত স্নেহমমতার স্বর আমাদের মনে আসে। আহা,না খেয়ে রয়েছে এতক্ষণ। 'মনে আসতে পারে কবি সুধীর দত্তর চিরকুমারীর অপত্য স্নেহসম্পর্কিত জিজ্ঞাসা এবং কবি গীতা চট্টোপাধ্যায়ের উত্তরও। এ পর্যায়ে এসে কবি গীতা চট্টোপাধ্যায়ের একটি আক্ষেপ  ---' তবে গোপনে বলি, আজ মাঝে মাঝে এই বলে খেদ হয়, আমার স্বদেশ আমাকে গ্রহণ করলনা, এতদিন তা হলে কী- ই লিখেছি,মানুষের কাছে পৌঁছোতে পারিনি। তাঁদের ত্রুটি নয়,আমারই প্রকাশের অচরিতার্থতা। ' -------- আজ এতদিন পরে ধীরে ধীরে নিত্য নতুন অভিধায় আবিষ্কৃত হচ্ছেন তিনি,মানুষের মনের মনিকোঠায় স্থান পাচ্ছেন শ্রদ্ধায় , সম্ভ্রমে, আদরে। আজকের দিনে কবি গীতা চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা, গদ্য পাঠ যেমন অনিবার্য হয়ে উঠছে রসিক পাঠক জনের কাছে, তখন আমাদেরই খেদ হয় যদি আরও কিছুদিন থাকতেন তিনি! তবে আরও কতো কি যে পেতাম আমরা ! জানাতে পারতাম আমাদের আপ্লুত উপলব্ধির পূর্ণতার কথা ।হয়ত তাতে কিছুটা প্রশমিত হত তাঁর খেদ, তাঁর আক্ষেপ। পরনতি পর্বে এসে পড়ে নেওয়া যাক তাঁর 'জলেহস্মিন সন্নিধিং কুরু ' কাব্যগ্রন্থের  'কবির মৃত্যু 'নামক কবিতা। 
  টগরফুলের শব্দ বৃষ্টিপতনের শব্দ নয়----
  টানা বর্ষণের পরে সমস্ত দুপুর ছাদময়। 
  আকাশে প্রশস্ত পথ,মেঘধোয়া তিনি চলে যান 
  গরদের জোড় পরা চন্দন তিলক অভিমান। 
  টবের আঠালো মাটি মায়া এসে ডেবে দিচ্ছে চাকা
  তবু অনিবার্যতায় বৃষ্টিধৌত টগরের ফাঁকা 
  শূন্যপথ সূর্যাস্তের নিঃশেষিত উপুড় কলসী 
  অলকা তিলকা আঁকা অভিমানে সেই মহীয়সী। 
  যখন যাবেন কবি এমনি করে যান, 
  টগরফুলের শব্দ শব্দহীন একা ছাদময়। 

দুই.
শুধু কবিতা নয় গদ্যের দরবারে কবি গীতা চট্টোপাধ্যায়ের প্রবন্ধসমূহ এক অতুলনীয় সংযোজন। অনবদ্য বিশ্লেষণী দক্ষতায় সেখানে আলোচিত এবং আশ্রিত হয়েছেন প্রবীণ থেকে নবীন কবি ।তাঁর সচেতন সজাগ দৃষ্টি যে কবিতাজগতের সর্বত্র প্রসারিত ছিল এ বিষয়ে সন্দেহের  কোনও অবকাশ নেই। তাঁর 'এক অক্ষৌহিনী বৃষ্টিরেখা  ', 'বত্রিশ সিংহাসন সিরিজ 'এবং 'বাবু কবিতা আড্ডাধারী 'তাঁর মেধা, মনন, শিক্ষা, বোধিদীপ্ত মনীষার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সুধী ও রসিক পাঠক নিশ্চয়ই আরও আরও নতুন দিগন্তের সন্ধান পাবেন তাঁর রচনা জগৎ থেকে।তাঁকে আবিষ্কারের সাথে সাথে নিজেরাও আবিষ্কৃত হবেন নবলব্ধ
বোধের উজ্জীবনে-------- এ বিশ্বাস খুব সচেতনভাবে করাই যায়। 
 
                  ---------------------------------------------------------------------------------------------
কৃতজ্ঞতা ও ঋণ স্বীকার:---------
এক. 'আদম ' ডিসেম্বর, দুহাজার ষোল
দুই. কবি জয় গোস্বামী
তিন. কবি সুধীর দত্ত 
চার. কবি বল্লরী সেন 
পাঁচ. প্রাবন্ধিক অঙ্কনা বেতাল 

ছবি: অন্তর্জাল থেকে।

কবি সুব্রত চক্রবর্তী ।। অনিমেষ মণ্ডল


স্তব্ধ বাড়ি, জবাগাছ ,ঘুমন্ত কবর:কবি সুব্রত চক্রবর্তীর কবিতা


ঘরে ঢোকার ঠিক আগে,সহসা মনে হয়েছে, এমন ভঙ্গিতে 

পর্দার আড়ালে তুমি সরে গেলে;

সামান্য আনতমুখে দ্রুতহাতে মুছে নিলে ঠোঁট।

বাজে ঝরনা, চীনাংশুক ওড়ে ।


চৈত্রের জ্বলন্ত রাত্রি একা বাড়ে, একা পুড়ে যায়।

ঘুমন্ত চোখের পাশে জাগে স্বপ্ন, প্রহরিণী, দেখো মধ্যযাম!

নিভন্ত চুল্লির বুকে ধিকিধিকি আমার হৃদয় 

দহন সহিছে একা, চৈত্রের জ্বলন্ত রাত একা পোড়ে।


ঘরে ঢোকার ঠিক আগে তোমার নিবিড় ছায়া 

পর্দার আড়ালে ডুবে যায়--

দ্রুত হাতে মুছে নিলে ঠোঁট 

                হঠাৎ মনে হয়েছে এমনই ভঙ্গিতে 

ঈষৎ রাতুল মুখে ।সে কি স্বপ্ন!


                           সদাভ্রাম্যমাণ

চৈত্রের বাঘিনী রাত,অন্ধকারে কোন ঝরনা বাজে!

        (রোগশয্যায়, বিবিজান ও অন্যান্য কবিতা)


'যা কিছু অভিনব নয় তা কবিতাও নয়' ....কবিতা সম্পর্কে ঠিক এরকমই ভাবনা ছিল কবি সুব্রত চক্রবর্তীর।তিনি বিশ্বাস করতেন কবিতা হলো কিছু পাচার করা সত্য খবর এবং তা মানুষের জন্যই।কবিতার প্রতি এক অসম্ভব আত্মিক ভালোবাসা ছিল পেশায় পদার্থ বিজ্ঞানের অধ্যাপক এই কবির।তাঁর বাড়ি ভর্তি হয়ে ছিল  বাংলা সাহিত্যের অসংখ্য গ্রন্থরাজিতে।এক নিষ্ঠাবান পড়ুয়া ছিলেন তিনি।ফলত যা বলতেন তা খুব গভীর থেকে বলতে পারতেন।কারণ তাঁর কবিতার পরিধি জুড়ে ছিল এক গভীর অনুভূতিময়তার প্রকাশ ।


কবি ভাস্কর চক্রবর্তীর কথায় তাঁর "কবিতার ভাষা, যাকে সে অনবরত আক্রমণ আক্রমণ আর আক্রমণ করতে শিখছিল তার উৎস ছিল তো সুব্রতর অবিশ্বাস্য কবিতাপ্রীতিই,আর তার দেশ কাল আর মানুষজন সম্পর্কে এক মতলবহীন অনুভূতিময় সচেতনতা ।"


সমুদ্রের ওপারে প্রবাস, আমি তার লবণাক্ত বুকে।

জলস্রোত, জেলেডিঙি, পূর্বদিকে ব্যাপক আঁধার---

ঝাউবন, সাইরেন, বালি,

                            ম্লান জোনাকির ছিন্নমালা ।


বাতাসে শাঁখের শব্দ, আর ঐ শব্দের আড়ালে 

অপঘাত ,মৃত্যুদণ্ড, আজীবন নত মস্তকের 

কুর্নিশ, পিপাসা, ভয়--নীল কোন পূর্ণিমা--রজনী ।

                        

ব্রেকারের দৃপ্তশীর্ষে উজ্জ্বল মাছের চোখ, কুহকের দেশ;

আর নীচে-আঁধার জলের গর্ভে মৃত পশুপালকের গান--

দূর ও নিকটে কোনো ব্যাবধান নেই।


যে-কোনো দিকেই আমি চলে যেতে পারি,চলে যাব

তুমি ডেকো।প্রিয়তম, তোমার ইঙ্গিতে 

যে-কোনো প্রবাস যেন বসবাসযোগ্য বলে মনে হবে।আমি

যে-কোনো দিগন্তে ঠিক চলে যাব,তোমার নিশান

দূর কোনো প্রান্তে যদি ঝলসে ওঠে ভোরের আলোয়।

                  (দীঘায় বহুদূরে কন্যাকুমারিকায়)


বর্ধমানের বাঁকা নদীর উপর এক নড়বড়ে কাঠের সাঁকোর পাশে তাঁর বাড়ি।সেই সাঁকো হয়ত এখন আর নেই ।কিন্তু সেই সাঁকোর উপর দাঁড়িয়ে তিনি বহুবার প্রত্যক্ষ করেছেন নীচে বহমান ঘোলা জল আর মাথার উপর ক্রমঘনায়মান অন্ধকারের বুক চিরে চিরজাগ্রত নক্ষত্রের অতন্দ্র লীলা।কবিতা নিয়ে, ব্যাক্তিজীবন নিয়ে, এই বহমান পৃথিবী নিয়ে কত কথা তিনি বলে যেতেন অবলীলায় তা প্রত্যক্ষদর্শীরা সকলেই জানেন।তরুণ কবিদের উৎসাহ দেওয়া ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম এক ব্রত।যেকোনো ছোট পত্রিকা খুব যত্ন করে পড়তেন ।আর ছিলেন সংসার জীবনের প্রতি ভীষণ দায়িত্ববান।তাঁর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ তথা জীবদ্দশায় প্রকাশিত শেষ কাব্যগ্রন্থে কবির ঘর গেরস্থালি'র প্রায় প্রতিটি বিষয়ই উঠে আসে কবিতার ছত্রে ছত্রে যা তাঁর রক্ত থেকে উঠে আসা নিজস্ব যাপনের তন্নিষ্ঠ চিত্রমালা।


ঐ দেখো কবির বাড়ি--কবি তো সন্ন্যাসী নয়,

                           ওর ঘর-গেরস্থালি আছে ।

আছে ন্যুব্জ বাবা তার;বারান্দার সামান্য রোদ্দুরে 

                        ওই দেখো উনি বসে,

                                 চোখে ঘুম, 

       হাত -থেকে- খসে-পড়া গুড়গুড়ির নলে লাল-পিঁপড়ে ঘুরে যায়,বারান্দায় ঐ তো রোদ্দুরে

                    শালিখ পাখিরা আসে,

               তাই দেখে তালি দেয় ,হাসে

কবির প্রথম মেয়ে 

         কাল রাত্রে পরী দেখেছিল।

             (কবির ঘর গেরস্থালি,বালক জানে না)


সুব্রত চক্রবর্তী সেই কবি যিনি সন্ন্যাসী নন।ঘর গৃহস্থালি করেন পরিপাটি করে।সাংসারিক কাজে তাঁর কোনও আলস্য নেই।থরে থরে সাজানো অজস্র বই।অথচ একটিও এলোমেলো নয়।পড়ার ঘর সুন্দর ভাবে গোছানো। স্ত্রী  মালা চক্রবর্তী, এক কন্যা রুমনি ও এক পুত্র রুদ্রকে নিয়ে তাঁর সাজানো সংসার।


বৃষ্টির ভেতরে ওই ধবল পোশাক পরে বালিকার ছুটে যাওয়া 

              আমাকে এমন

নিঃসঙ্গ করেছে।...চেয়ে দেখি তুমুল বৃষ্টিতে 

স্তব্ধ বাড়ি, জবাগাছ,ঘুমন্ত কবর---


অনন্ত বৃষ্টিতে ভেজে দিগ্ বলয়,লাল পথ,প্রসারিত হাত;

একটি মহিষ ভেজে, সমাধিফলক ভেজে।...আর ওই বৃষ্টির ভেতরে 

চকিত পাখির মতো--দূর থেকে আরো দূরে--

                  উড়ে যায় শৈশবের ধবল পোশাক ।

                                                       (বালিকা)


একদিন সত্যি সত্যিই তাঁর বাড়ি তুমুল বৃষ্টিতে ভেজা স্তব্ধ জবাগাছের মতো ঘুমন্ত কবর হয়ে গেল।সব কিছু এলোমেলো করে 1980 সালের 10ই জানুয়ারি মাত্র ঊনচল্লিশ বছর বয়সে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে অকালে চলে গেলেন কবি সুব্রত চক্রবর্তী তাঁর সাজানো গৃহস্থালি ফেলে।

কবি অরণি বসু স্মৃতিচারণা করেছেন---

"কথা বন্ধ করে আমরা অনেকক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়েছিলাম।অন্ধকার ঘন হয়ে এলে আমরা রওনা হয়েছিলাম বাড়ির পথে।ফেরার সময় সুব্রতদা খুব শান্ত গলায় আবৃত্তি করেছিলেন তাঁর প্রিয় কবিদের কবিতা।তুচ্ছ মানুষ আমরা, বুঝতেও পারিনি সেই আমাদের শেষ সাক্ষাৎকার।সময় 1979 সালের নভেম্বর-ডিসেম্বর,....."


বিকেলবেলার  দুঃখী আলো এসে আমাকে বলেছে, দেখা হবে ।

নৈশ রাজপথে এক আধপাগলা যুবতী ভিখিরি 

                               অকারণে হাত নেড়েছিল।

একটি হলুদ পাখি, একদিন আমাদের মৃত জবা গাছে

    বসেছিল কিছুক্ষণ--তারপর উড়ে গিয়েছিল ...

একটি পালক শুধু ঝরে পড়েছিল তার।কেন আমি কুড়িয়ে রাখিনি।


বিকেলের আলো আজ দুঃখহীন, মায়াহীন, উদ্ভাবনহীন.

নৈশ রাজপথে এক চাঁদভোলা কুকুর শুধু অকারণে কেঁদে কেঁদে ওঠে;

আজ কোনো পাখি নেই---একটি পালক শুধু মৃত জবা গাছে 

বারবার কাঁপে---কেন আজো তাকে ভুলতে পারিনি!

                  (একটি পালক শুধু,  নীল অপেরা)


39 বছরের স্বল্প জীবনে তাঁর মোট কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা মাত্র তিনটি।নীল অপেরা তাঁর মৃত্যুর পর 1990 সালে কবি ভাস্কর চক্রবর্তীর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় উলুখড় থেকে।কবি ভাস্কর চক্রবর্তী বলেছেন---

" আজ এই জলরাশি ভেদ করে 'নীল অপেরা'য় --আমরা হয়ত দেখতে পাব সুব্রতর কবিতার এক নতুনতর আভাস, হয়ত শুনতে পাব নতুন এক সুর যা ফিসফিসিয়ে আমরাও বলতে চাই : মানুষই মানুষকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে,আর সেখান থেকেই হয়ত ভোরবেলার শুরু।"


আজ তাঁর কবিতাগুচ্ছ আবার নতুন প্রজন্মের হাতে উঠে আসছে এতে প্রমাণিত হয় যে কবি সুব্রত চক্রবর্তীর কবিতা কালোত্তীর্ণ হয়েছে।তাঁর মৃত্যুর এত বছর পরেও তাঁর কবিতা পুনর্মুদ্রিত হচ্ছে বাংলা কবিতার পক্ষে এ বড় আশার কথা।এই চল্লিশ বছরে পৃথিবী অনেক বদলে গেলেও পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নেওয়া এক প্রায় অখ্যাত কবির কবিতা ফিরে দেখার এই প্রচেষ্টা আমাদের ভীষণ রকম উদ্বেল করে।এভাবেই বাংলা কবিতার জয় হোক একদিন।


জন্ম 10ই অক্টোবর 1941 ,আসামের তেজপুরে।যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিদ্যায় এম এস সি।কর্মজীবন শুরু মহিষাদল রাজ কলেজে।তারপর কলকাতা সাউথ পয়েন্ট স্কুল হয়ে রামপুরহাট কলেজ ও সবশেষে 1966 সাল থেকে জীবনের শেষদিন পর্যন্ত বর্ধমান রাজ কলেজে অধ্যাপনা।1967 সালে বিবাহ শ্রীহট্টের মালা বিশ্বাসের সঙ্গে।দুই সন্তান, কন্যা সাবর্ণি ও পুত্র রুদ্র।


প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ বিবিজান ও অন্যান্য কবিতা (1969,সখী সংবাদ প্রকাশনী)

বালক জানে না (1976,আনন্দ পাবলিশার্স)

নীল অপেরা (1990,উলুখড় প্রকাশনী)

প্রিয় পঁচিশ (2013,শব্দ হরিণ)।

পত্র পত্রিকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রবন্ধগুলি নিয়ে একটি সংকলন প্রকাশের পথে।

এছাড়াও লিখেছেন অনেক ছোটগল্প,বিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধ, কল্পবিজ্ঞানের গল্প,বেতার নাটক  ও একটি উপন্যাস যার নাম 'রুদ্রর দুপুর'।


কবি ভাস্কর চক্রবর্তীর কথায়...

" সুব্রত যখন প্রধানত প্রথাবাহিত ভাষাকে সরিয়ে, মৃত্যুকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে চলছিল, তখনই নেমে এল এমনই এক স্তব্ধতা, যে স্তব্ধতার শব্দ আমাদের কাছে এখনও কর্কশ আর সত্যিই অসহনীয়।"

কবি অরণি বসুও বলেছেন ....

"আজ এতদিন পরেও তাঁর মৃত্যু কেন জানি না আমার কাছে মিথ্যে মনে হয়।এখনও তাঁর কথা বলার ভঙ্গি, হাঁটার ছাঁদ, কৃষ্ণকায় হাসি, গভীর দৃষ্টিপাত স্পষ্ট মনে পড়ে।এমনও হয়েছে রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে পেছন থেকে কাউকে সুব্রতদা ভেবে এগিয়ে গিয়ে ভুল ভেঙেছে।মনে হয় সুব্রতদা প্রবাসে আছেন,একদিন ফিরে এসে জড়িয়ে ধরবেন।"

আলো ও রঙের মনোভূমি ।। দেবাশিস দাশ


আলো ও রঙের মনোভূমি


১. বিজ্ঞানের আলো, আলোর বিজ্ঞান

যা কিছু আমরা দেখি, যা কিছু দেখি না, সমস্ত জুড়ে আলোর খেলা। শক্তির অভাবনীয় প্রকাশ এই আলো। কোয়ান্টাম বিজ্ঞানী জানেন, মানুষের মতোই আলোও আসলে দ্বিচারী। যা চোখে দেখছি, তা-ই বাস্তব নয়। অন্য এক জগৎ আছে, যা আমাদের ভাল-লাগা, আমাদের আকাঙ্ক্ষা-পূরণের স্বপ্নময়তা দিয়ে তৈরি। এক ঔপনিষদিক কোয়ান্টাম বিশ্ব। সমান্তরাল মায়া-ব্রহ্মাণ্ড। 

আলোর কথায় ফিরে আসা যাক। ব্রহ্মাণ্ডের সফ্টওয়্যার-গেম আলোর গতির সীমা দিয়েই বাঁধা রয়েছে। এর চেয়ে জোরে ছুটতে পারলেই টাইম-মেশিন আবিষ্কৃত হবে। কিন্তু সে আরেক আজব তত্ত্ব। বিজ্ঞানী বলেন, মানুষের মন যেরকম, আলোও অনেকটা তেমনই। বড্ড শেয়ানা সে। তার চরিত্রের ঠিক নেই। কখনও সে ঢেউ, কখনও আবার থোকা-থোকা সূক্ষ্মতম (অথচ ভরবিশিষ্ট) বস্তুকণা। ঢেউও কি সহজ-সরল? আসলে সেও দু'দুটো শক্তির প্রবাহ— পরস্পর ৯০° কোণে একটাই অক্ষের দড়ি বেয়ে একসঙ্গে ছুটে চলা তড়িৎ আর চুম্বকের তরঙ্গ মিলেমিশে গড়ে তুলেছে আলোর সেই ঢেউ-সত্তা। সে যখন কোনও জিনিসের ওপর আছড়ে পড়ে, তখন প্রতিফলিত হতে পারলে জিনিসটার আকৃতি বুঝে প্রতিবিম্ব গড়ে তোলে আমাদের চোখের লেন্সে। এই বিম্বিত রশ্মির প্রভাবে রেটিনা-লাগোয়া স্নায়ুদের প্রান্তগুলো উত্তেজিত হয়। উত্তেজনার স্পন্দন তড়িদ্বেগে মস্তিষ্কে দৌড়ে গিয়ে দেখার বোধ তৈরি করে আমাদের চেতনায়। 

আলো নিজে অদৃশ্য থাকে; সত্যিকারের কবিতার মতো, নিরাময়দায়ী। আমাদের চোখে ধরা পড়ে কেবল আলোকিত বস্তু, যার ওপর আপতিত আলোকরশ্মির তরঙ্গদৈর্ঘ্যের বিস্তার দর্শকের দৃষ্টির মধ্যে সীমাবদ্ধ। অবলোহিত অতল অন্ধকারের গভীরে থাকা আলো তাই আমরা দেখতে বা বুঝতে পারি না। ভৌতিক গল্পে ভূতেদের অস্তিত্ব অবলোহিত-টর্চে ধর্তব্য হতে পারে, ঠিক যেমনটা সমুদ্রগর্ভেও পারে; কিংবা নাইট-ভিশন বাইনোকুলারে। অন্যদিকে আমরা কিন্তু অতিবেগুনি ও তার ওপারে থাকা বিভিন্ন রশ্মিজালকেও টের পেতে পারি না। দৃশ্যবর্ণালি ছাপিয়ে, একদিকে তেজস্ক্রিয় অদেখা বিভাবিশ্ব, অন্যদিকে বেতার শ্রুতির কিনারা পর্যন্ত কাঁপতে থাকে অধরা জগৎ। আমরা মূর্খের মতো, সবজান্তার মতো, কিছু না দেখেও, সর্বজ্ঞানে প্রচারিত হতে চাই! 

২. শুশ্রূষার জন্য চাই রং

রঙের ধারণা বলা যায় অনেকটাই ব্যক্তিগত। ভাল লাগা, না-লাগা দিয়ে গঠিত চিন্তা ও অনুভূতির রং। তবু, সর্বজনীন কিছু বোধ, কিছু আবেগ বের করা গিয়েছে বই-কী। লাল, কমলা ও হলুদ এক-রকম গরম অনুভূতি জোগান দেয়, যা তেজ, রাগারাগি অথবা বিদ্বেষের চেতাবনি হতে পারে। অন্যদিকে, নীল, বেগুনি ও সবুজ হল শীতল রং। শান্ত প্রকৃতির দরুন মনে বিষাদ অথবা ঔদাস্যের ধারণা জাগাতে পারে এরা। মনোবিদ্যার জন্য প্রাচীনকাল থেকে মানুষ তাই বর্ণ-চিকিৎসার বিভিন্ন আয়োজন করে এসেছে। মিশর, চিন ইত্যাদি দেশের পুরনো সংস্কৃতিতে নিজস্ব বর্ণ-চিকিৎসার পদ্ধতি দেখা যেত। হয়তো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রংয়ের প্রভাব আর ক্ষমতাকে অনেক গুণ বাড়িয়ে দেখানো হয়েছিল। আসলে মনোভাব বা আবেগের ওপর রংয়ের কাজ অস্থায়ী এবং অনেকটাই পরিবেশ-নির্ভর। যেমন, আকাশি নীল রঙের ঘরে চুপচাপ বসে থাকতে-থাকতে শান্ত ভাব আসে, খুব অল্প সময়ের জন্য হলেও। তার পর, জেদি মানুষের বিক্ষিপ্ত বহুগামী মন সেই প্রশান্তিটুকুকে নিজের অভ্যাসেই হয়তো-বা অস্বীকার শুরু করে। পরিপাটি সাদা বেডকভার-ঢাকা বিছানায় বসে কবিতা লেখার আরামই আলাদা। জ্ঞানে বোঝাই পৃথিবী থেকে নিমেষে কখন একলা পরম শান্তির দেশে পৌঁছে যাওয়া যায়! পাগল স্রষ্টার জন্য সাদা রং তাই নার্সিংহোমের বেডকভার। 

বিভিন্ন রঙের প্রকৃতি, তাদের (চিকিৎসার কাজে) ব্যবহারযোগ্যতা আর ক্ষতিকর দিকগুলো টেবিলভুক্ত করে তালিকায় সাজিয়ে ধরা যায়। এখানে লেখাকে অযথা ভারী করে তুলতে চাই না। কোনও পাঠকের সত্যিই যদি আগ্রহ জাগে, তবে কোভিড-উত্তীর্ণ দিনে সহৃদয় আমন্ত্রণ থাকল আমার নিজস্ব বর্ণালি দিয়ে গড়া ছোটখাটো কবিতা-কুটিরে। ভালবাসার রং, রস ও বিজ্ঞানের তথ্য ভাগ করে নিতে পারব হয়তো। আপাতত দু'একটা রঙিন নমুনা পেশ করা যাক। ঘন নীল বর্ণাভা'র প্রকৃতি বেশ ঠান্ডা। আকাশি নীলের মতো অতখানা কর্মদক্ষ করে তোলার ক্ষমতা কিম্বা প্রশমনবিদ্যা শ্রাবণঘন নীলের আয়ত্তে নেই বটে, কিন্তু এই রং চামড়ার রোগের সমস্যা বেশ কম রাখতে পারে। তবে, শীতল-শান্ত স্বভাবের সামান্য ক্ষতিকর দিকও তো আছে। নাড়ির বেগ, দেহের উষ্ণতা কমিয়ে মনে বিষাদবোধ জাগাতে পারে। তাই, ওষুধ হিসেবে রংকেও মাপ-মতো গ্রহণ করা জরুরি মনে হয়। অন্য আরেকটি রং হল গোলাপি। শান্ত। প্রেম ও রোমান্সের প্রতীক। জেলখানার কক্ষের দেয়ালে ড্রাংক পিঙ্ক রং ব্যবহার করা হয় কারাবন্দীদের মনকে শান্ত, নির্জীব রাখার জন্য। তবে ক্ষতির ব্যাপারটা হল প্রথম দিকে স্থির ও শান্ত করতে পারলেও খুব বেশিক্ষণ এই রঙের পাল্লায় পড়লে অতিরিক্ত এক উত্তেজনা আসবে— এক নরম মাতাল হাওয়া। আসলে রং হলেও তার মধ্যেও দোষ আর গুণ দুইই রয়েছে কি-না!

এ-বারের মতো এখানেই ক্ষান্ত হলাম। পরে কোনওদিন সুযোগ বুঝে, সুরের সঙ্গে রঙের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করব। স্বামী প্রজ্ঞানানন্দ শক্তির বিচ্ছুরণজনিত কম্পনের কথা কিছুটা লিখেছেন তাঁর 'রাগ ও রূপ' বইটিতে। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সাংগীতিক সাত স্বরের বর্ণাভাও উল্লেখ করা হয় তুলনামূলক সারণির মাধ্যমে। সে এক অন্য গহন চিকিৎসা-পদ্ধতি, যা সুর আর রঙের যৌথ শুশ্রূষাধর্মের প্রতি আস্থা বাড়ায়।


ছবি : বিধান দেব 



ভারতবর্ষে সমাজতন্ত্র : শতবর্ষের শ্রদ্ধাঞ্জলি ।। অভিজিৎ দাশগুপ্ত


ভারতবর্ষে সমাজতন্ত্র : শতবর্ষের শ্রদ্ধাঞ্জলি




 ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি গঠনের ১০০ বছর অতিক্রান্ত । এই আন্দোলন সম্বন্ধে বলা হয় শ্রেণি থেকে সমাজতান্ত্রিক সমাজ এবং সেই শোষণহীন সমাজকে শ্রেণহীন সাম্যবাদী সমাজের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যে-কোনো কমিউনিস্ট পার্টির লক্ষ্য। 


 ব্রিটিশ শাসিত ভারতবর্ষকে যখন কমিউনিস্ট আন্দোলন মাথাচাড়া দিচ্ছে তখন আমাদের পাশের রাষ্ট্র বাংলাদেশ এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়বে আরো বেশ কিছুদিন পরে । যদিও তখন সে ভারত রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত ।


কমিউনিস্ট আন্দোলনের প্রথম পর্ব থেকে যদি আমরা আরও দু-তিন দশক এগিয়ে যাই তাহলে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের মূলভিত্তি খুজে পাব স্বাধীনতার পরে পূর্বপাকিস্তানে বামপন্থী আন্দোলন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে দেশভাগ ও উদ্বাস্তু সমস্যা দাঙ্গা দুর্ভিক্ষ নিপীড়িত মানুষের অবস্থান বামপন্থী আন্দোলন কে মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে লড়াই করার সুযোগ করে দেয়। একটি তথ্য বলছে , " ১৯৪৮  সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত কলকাতায় ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির দ্বিতীয় কংগ্রেসের সিদ্ধান্ত অনুসারে কংগ্রেসে আগত পাকিস্তানের প্রতিনিধিরা স্বতন্ত্রভাবে এক বৈঠকে মিলিত হয়ে  ৯ সদস্য বিশিষ্ট পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করেন।" সেদিন এই কমিটিতে যারা ছিলেন, তারা হলেন , সাজ্জাদ জহির , খোকা রায়, নেপাল নাগ ,জামাল উদ্দিন বুখারি, মণি সিংহ, আতা মোহাম্মদ , কৃষ্ণবিনোদ রায় , মনসুর হাবীবউল্লা ।  সাজ্জাদ জহির কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন । ভবানী সেনকে পাঠানো হয়েছিল পার্টিকে পরিচালনা করার দায়িত্ব দিয়ে ।


এই সময় পূর্ববঙ্গের কমিউনিস্ট আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন কমরেড বিষ্ণু চ্যাটার্জি , মোহাম্মদ ফরহাদ , জিতেন ঘোষ , জ্ঞান চক্রবর্তী , রতন সেন  প্রমুখরা। বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ । এখানে ইউরোপের মতো কল-কারখানা নেই , ফলে কেউ যদি মনে করেন এদেশে ইউরোপের মতো শ্রমিক আন্দোলন হবে তা ভুল । বরং কৃষকদের সঙ্গে নিয়েই এদেশের আন্দোলন দানা বাঁধবে সেটাই স্বাভাবিক । তাই সে সময় বামপন্থী আন্দোলন বলতে কৃষক আন্দোলনকি বোঝাত। সেই সঙ্গে ছিল শাসক শ্রেণীর অত্যাচার থেকে গরিব মানুষকে মুক্ত করার মরণপণ সংগ্রাম। জেলায় জেলায় গড়ে উঠেছিল বিভিন্ন ধরনের সমিতি। যেমন--- 'মহিলা সমিতি',' পূর্ব পাকিস্তান কৃষক সমিতি'  ইত্যাদি।


পূর্ব বাংলার বামপন্থী আন্দোলন একটা সময় হিন্দুদের প্রাধান্য বেড়ে যায় ।  পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ হয় । ফলে আত্মগোপন করতে বাধ্য হয় বামপন্থী নেতারা । সেই সঙ্গে দুই ধর্মের বিবেককে কাজে লাগিয়ে একশ্রেণীর মানুষ কমিউনিস্ট আন্দোলনকে দুর্বল করে দিতে থাকে।

এই সময় বহু কমিউনিস্ট বিশেষ করে হিন্দুরা ভারতে চলে আসতে চায় পূর্ববঙ্গে তাদের জমি বিক্রি করে একে একে ভারতে এসে নিজেদের স্থায়ী ঠিকানা খোঁজার চেষ্টা করে পাকিস্তানের ঘোষিত নীতি ছিল কমিউনিস্ট পার্টিকে কোনরকম মাথা তুলতে না দেওয়া স্বাভাবিক কারণেই সরকারের রক্তচক্ষুকে ভয় পায় অনেকে তাই চাঁদা দিতেও অনেক মানুষ আপত্তি জানাতে থাকে কমিউনিস্টদের প্রতি অত্যাচার বাড়তে থাকে পূর্বপাকিস্তানে তবুও সবকিছুর মধ্যে দিয়ে পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট নেতারা বিশ্ব রাজনীতির সঙ্গে নিজেদেরকে স্থাপন করতে উদগ্রীব ছিলেন তারা। চীন , রাশিয়া , হাঙ্গেরি ইত্যাদি অঞ্চলে মাটির কার্যকলাপ নিয়ে যেমন আলোচনা কউসরতেন একইভাবে শেখ মুজিবের ৬ দফা দেওয়া নিয়েও আলোচনা হতো । আসলে বামপন্থী আন্দোলন একটা সময় পূর্ব বাংলায় মুক্তি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে লড়াইকে ভেতরে নিয়ে আসে।


জনগণের যে ক্ষমতা তা তাদের বিশ্বাসের জায়গা থেকে উঠে আসার প্রয়োজন রয়েছে । মানুষের মনে অতীতের স্মৃতিগুলি থাকে। অবশ্যই থাকে। কিন্তু ক্ষমতাশালী রাষ্ট্র তাকে ভুলিয়ে দিতে চায় নিজস্ব কৌশলে । তারা চায় বর্তমানকে প্রধান্য দিতে । কারণ অতীত হয়তো সেই ক্ষমতাশালীর কাছে নিরাশার দ্যোতক। সে সবসময় চায় তাকে অস্বীকার করতে । তাই মানুষের কাছে বর্তমানকে বড় করে তোলে সর্বত্র। ষাটের দশকে অতিবাম আদর্শ ছড়িয়ে পড়ে যশোর, খুলনা,মাগুরা, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা প্রভৃতি অঞ্চলে । এক্ষেত্রে আদর্শের দ্বন্দ্বের থেকে বড় হয়ে ওঠে ক্ষমতা এবং বিভেদের রাজনীতি । তবে বর্তমানে কমিউনিস্ট দলগুলি রাজনীতিতে  সক্রিয়। যদিও জোটের লক্ষ্যে তাদের বিরাট কিছু অন্তর্ভুক্তি নেই । তবু টিকে থাকার লড়াই-এ এখনো তাদের কিছু উপদল  টিকে আছে । তবে এই সমস্ত বামপন্থী দলগুলোর বিপ্লবের স্তর , রাষ্ট্র চরিত্র , রণকৌশল ইত্যাদি একটি সঙ্গে অন্যটির পার্থক্য রয়েছে।


অন্যদিকে ভারতবর্ষে কমিউনিস্ট আন্দোলন আরো সক্রিয় হয়ে ওঠে যত সময় এগিয়েছে। তাদের যাবতীয় চর্চা বা অনুশীলনের শিকড় গাঁথা রয়েছে ভারতের আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতার মাটিতে । যদিও এ দেশে নিজেদের বিপ্লবী কর্মকাণ্ডকে তারা মানব মুক্তি ও স্বাধীনতার বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক সংগ্রামের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ বলে মনে করেছিল একদিন।  ভারতবর্ষের কমিউনিস্ট আন্দোলনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল ১৯১৭  সালের অক্টোবর বিপ্লব । ১৯২০ সালের ১৭ অক্টোবর ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠা লাভ করে এম . এন . রায়ের সাহায্যে। গোড়ার দিকের বছরগুলিতে উপনিবেশ বিরোধী সংগ্রামে বামপন্থীরা ধর্মঘট , আন্দোলন ইত্যাদি চালিয়ে যায় । যেমন ১৯২৮ এবং ১৯২৯ --- শ্রমজীবী মানুষের দ্বারা একের পর এক ধর্মঘট অনুষ্ঠিত হয় । তার সঙ্গে বোম্বের কাপড়ের মিলের শ্রমিক ও বাংলার রেলওয়ে  শ্রমিকদের দীর্ঘ লড়াই যুক্ত হয়।


এই পর্বের লড়াইতে একটি অন্যতম অংশ হল তেভাগা আন্দোলন । তেভাগা শব্দের আক্ষরিক অর্থ তিনভাগ। তিন ভাগের মধ্যে ২ ভাগ চাষীদের দেওয়ার দাবি ওঠে । এই আন্দোলন যে সময়ে সংঘটিত হয়েছিল তখন দাঙ্গায় বিধ্বস্ত বাংলার মানুষ । অথচ তেভাগা আন্দোলন হিন্দু মুসলমানের ঐক্যের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত । পুলিশের হাতে আন্দোলনকারী ৭৩  জন মারা যান , তাদের মধ্যে হিন্দু- মুসলমান , আদিবাসী নারী -পুরুষ সকলেই ছিলেন । তেলেঙ্গানার সশস্ত্র সংগ্রাম এ প্রসঙ্গে স্মরণ করা যেতে পারে।


স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে দেশের বিভিন্ন রাজ্যে কমিউনিস্ট সরকার গঠিত হয় । যেমন---কেরালা, পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা। এ প্রসঙ্গে জ্যোতি বসু একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছিলেন । " ১৯৮২  সাল থেকে মধ্যবিত্তদের একটা অংশ ও গ্রামাঞ্চলের একটা অংশের মধ্যে আমাদের রাজনৈতিক প্রভাব হ্রাস পাচ্ছে ।... গ্রামাঞ্চলে আমাদের বিভিন্ন গণফ্রন্টের দুর্বলতা রয়েছে । খেতমজুর গরিব কৃষক এবং মধ্য কৃষক ও অন্যান্যদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক ও ঐক্য বিষয়ে কোনো ক্ষেত্রে বা কোন এলাকার দুর্বলতা আছে । "

আসলে শ্রমিকশ্রেণীর রাজনৈতিক চেতনা বৃদ্ধির ওপরেই বামপন্থার জয়জয়কার ।  সেই সঙ্গে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় , আদিবাসী প্রমুখদের সমস্যাগুলির ওপর নজর দিয়ে তারা তাদের হারানো জমি পুনরুদ্ধারের চেষ্টায় নামে। 

এই চেতনার আরো একটি দিক শিল্প , সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে বাম মনোভাবকে তাত্ত্বিকভাবে প্রবেশ ঘটানো । মার্ক্স  বলেছিলেন , আমাদের আগের নাটককাররা  চেষ্টা করেছেন এই পৃথিবীকে ব্যাখ্যা করতে , আমরা চেষ্টা করব তাকে পরিবর্তন করতে। বামপন্থীরাই  প্রথম দেখালো থিয়েটারের দর্শক শুধুমাত্র দর্শক নন , তিনি একই সঙ্গে তার বিচারক এবং অংশগ্রহণকারী অভিনেতাও বটে ।  চলচ্চিত্রে  ঋত্বিক ঘটক , মৃণাল সেন , নিমাই ঘোষ , শ্যাম বেনেগাল , কেতন মেহেতা , গৌতম ঘোষ , বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত , আদুর গোপালকৃষ্ণন , উৎপলেন্দু চক্রবর্তী , রাজা মিত্র , রাজেন তরফদার প্রমুখ পরিচালকরা  আঙ্গিকের ক্ষেত্রে মানবপ্রীতিকেই মর্মমূলে বেঁধে নিয়ে ক্যামেরা হাতে নেমে পড়েছিলেন। সত্যজিৎ রায়ের 'পথের পাঁচালী' সিনেমার সেলুলয়েডে নতুন আঙ্গিক এনে তাকে মানুষের ভেতর পৌঁছে দেওয়াকে সুনিশ্চিত করেছিল। ঋত্বিক ঘটকের তারপর ছিন্নমূল ইত্যাদি দেশভাগ রাজনৈতিক ঘটনা ইত্যাদি কে সামনে নিয়ে এসেছে

একইভাবে সাহিত্যের ভেতরেও ঢুকে পড়ে মানবমুক্তির ধারণাটি । পূর্বে তার যে লক্ষণ দেখা যায়নি , তা নয় । তবে এবার যেন বিষয়টা আরো স্পষ্ট হয়। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের , সমর সেন , বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় , রাম বসু , মঙ্গলাচরণ চট্টোপাধ্যায় , মণিভূষণ ভট্টাচার্য , সুভাষ মুখোপাধ্যায় প্রমুখদের লেখালেখি  সমাজ বাস্তবতাকে নির্মম ভাবে প্রকাশ করে। এখানে একটা কথা বলার আছে । জ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে সাধারণত দুটি ভাবনাকে প্রাধান্য দেওয়া হয় ।  একটি হলো ভাববাদী চিন্তা ; দ্বিতীয়টি হলো বস্তুগত  ভাবনাচিন্তা।
---- " ইউরোপীয় বিদ্যাচর্চা বস্তুবাদী ঘরানার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফসল হলেও কার্ল মার্কসের চিন্তা সারা পৃথিবীকে এখনও পর্যন্ত প্রভাবিত করে রেখেছে নিপুণভাবে ।  মার্কসের চিন্তায় সীমাবদ্ধতা অবশ্যই ছিল , তারা যা সময় , সেই সময়ের ছাপ সর্বাঙ্গে রেখেই তার বৌদ্ধিক বিকাশ ঘটেছে। "
        ( ' আধুনিকতা , উত্তর আধুনিকতা ও উত্তর
                        উপনিবেশবাদী  মতাদর্শ। '
                              রতন খাসনবিশ  ) 
    
১০০ বছর আগে নিজেদের জীবন বিপন্ন করে বামপন্থী আন্দোলনকে  এদেশের বুকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন কিছু মানুষ। তাদের আত্মত্যাগকে ভুলে যাওয়া উচিত নয় । মানুষের শোষণের সমাপ্তি ঘটানোই  লক্ষ্য ছিল তাদের। আজ সেই সমস্ত মানুষেরা  বর্তমান অবস্থা দেখে হয়তো দিশেহারা। আসলে যে আন্দোলন ১০০ বছরে পা রাখল তা এখনো একটি অসম্পূর্ণ প্রজেক্ট । তাই ' ভারতবর্ষে কমিউনিস্ট আন্দোলনের ১০০ বছর ' পুস্তিকায় বলা হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি কথা ।
      "এখনো অঘনীভূত এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল। নয়া উদারবাদের উত্থান তাকে দুর্বল করেছে কিন্তু তা নিজস্ব সীমাবদ্ধতা ও সুযোগ দুই বিষয়েই ওয়াকিবহাল।"



ছবি : বিধান দেব 

        

ভিনদেশি তারা ।। অরিন্দম রায়


উইসলাওয়া সিম্বোর্স্কা : নোবেল বক্তৃতা, ৭ ডিসেম্বর, ১৯৯৬


বলা হয় যে যেকোনো বক্তৃতায় প্রথম বাক্যটিই সবচেয়ে কঠিন। তাহলে, ঐ বাক্যটি যেভাবেই হোক না কেন আমার পিছু নিয়েছে। কিন্তু আমার এটা মনে হচ্ছে যে আরও বাক্য আসতে চলেছে যেগুলো আমার পিছু নেবে___ তৃতীয়, ষষ্ঠ, দশম , এভাবে চলতেই থাকবে, শেষ লাইন পর্যন্ত ___ সেটিও একইরকমের কঠিন হবে, যেহেতু আমাকে কবিতা নিয়ে কথা বলতে হবে। এই বিষয়ে আমি খুব কমই বলেছি, বলা যেতে পারে কিছুই বলিনি। আর যখনই কিছু বলেছি, আমার সবসময় সন্দেহ হয়েছে যে আমি এই ব্যাপারে মোটেই ভালো নই। এই কারণেই আমার বক্তৃতাটি সংক্ষিপ্ত হতে চলেছে। সমস্ত ত্রুটিই সহ্য করা সহজ হয় যদি সেটা কম পরিমাণে পরিবেশন করা যায়। 


সমকালীন কবিরা সন্দিহান এবং সন্দেহপ্রবণ , সম্ভবত নিজেদের সম্পর্কে। তাঁরা জনসমক্ষে নিতান্ত অনিচ্ছার সঙ্গে স্বীকার করে থাকেন যে তাঁরা কবি, মনে হয় যেন তাঁরা এই ব্যাপারটি নিয়ে বেশ লজ্জিত। কিন্তু আমাদের এই কোলাহলপূর্ণ সময়ে নিজের যোগ্যতা উপলব্ধি করার চেয়ে নিজের ভুল স্বীকার করে নেওয়া বেশ সহজ ব্যাপার, অন্তত যদি সেগুলো আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করা যায়, যেহেতু এগুলো অনেক গভীরে লুকোনো থাকে আর আপনি নিজে কখনই এগুলো বিশ্বাস করেননি… প্রশ্নাবলীর উত্তর দেওয়ার সময় অথবা অচেনা ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলার সময় , যখন তারা নিজেদের পেশা কী সেটা না বলে এড়িয়ে যেতে পারেন না, কবিরা ‘লেখক’ এই সাধারণ নামটিই পছন্দ করেন অথবা ‘কবি’ এই পরিচয় দেওয়ার বদলে লেখালেখি ছাড়াও অন্য যে পেশার সঙ্গে তিনি যুক্ত সেই পরিচয় দিয়ে থাকেন। আমলারা এবং বাস প্যাসেঞ্জাররা কিছুটা অবিশ্বাস ও শঙ্কিত হয়ে সাড়া দেন যখন তারা জানতে পারেন যে তারা একজন কবির সঙ্গে কথা বলছেন। আমার অনুমান দার্শনিকরাও একইরকম প্রতিক্রিয়ার সম্মুখীন হন। তবুও , তাদের অবস্থা অনেক ভালো, যেহেতু তাঁরা পাণ্ডিত্যসুলভ কোনো উপাধি দিয়ে নিজেদের পেশাগত পরিচিতিকে অলঙ্কৃত করতে পারেন। দর্শনের অধ্যাপক , ___ এটা অনেক বেশি সম্মানজনক শুনতে লাগে। 

কিন্তু কবিতার অধ্যাপক বলে কিছু হয় না। সর্বোপরি, এর মানে দাঁড়ায়, যে কবিতা এমন একটা পেশা যার জন্য বিশেষ পড়াশোনা, নিয়মিত পরীক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা, গ্রন্থপঞ্জী এবং পাদটীকাযুক্ত তাত্ত্বিক প্রবন্ধ , এবং সবশেষে, সাড়ম্বরে ডিপ্লোমা প্রদানের বন্দোবস্ত থাকা উচিত। পরিবর্তে, এটাও মানে দাঁড়ায় যে, কবি হওয়ার জন্য পাতা ভর্তি সূক্ষ্ম কবিতা লেখাও যথেষ্ট নয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হল অফিশিয়াল স্ট্যাম্প মারা একটা কাগজের টুকরো। একবার মনে করে দেখুন যে রাশিয়ান কবিতার গর্ব, ভবিষ্যতের নোবেল লরিয়েট জোসেফ ব্রডস্কিকে ঠিক এই যুক্তিতে স্বদেশে নির্বাসনের সাজা দেওয়া হয়েছিল। তারা ব্রডস্কিকে ‘‘একটা পরজীবী’’, বলে অভিহিত করেছিলেন কারণ তাঁর কাছে কোনো সরকারি সার্টিফিকেট ছিল না যেটা তাঁকে কবি হওয়ার অধিকার দেবে… 

বেশ কয়েক বছর আগে , আমার সৌভাগ্য হয়েছিল ব্রডস্কির সঙ্গে দেখা করার। আমি সম্মানিত বোধ করেছিলাম। আমি লক্ষ্য করেছিলাম যে, যতজন কবিকে আমি চিনি, তাঁদের মধ্যে তিনিই ছিলেন এমন একজন যিনি নিজেকে কবি বলাটা উপভোগ করতেন। তিনি এই শব্দটি কোনরকম সঙ্কোচ ছাড়াই উচ্চারণ করতেন।

বরং ঠিক এর বিপরীত ___ তিনি ‘কবি’ এই শব্দটিকে স্পর্ধিত স্বাধীনতার সঙ্গে উচ্চারণ করতেন। আমার মনে হয়েছে ব্রডস্কি এরকম করতেন কারণ যুবক বয়সে লাঞ্ছিত, অপমানিত হওয়ার কথা তাঁর মনে পড়ে যেত।

আরও সৌভাগ্যবান দেশে, যেখানে মানুষের মর্যাদার উপর চট করে আক্রমণ নেমে আসে না, কবিরা আকাঙ্ক্ষা করেন, অবশ্যই প্রকাশিত হওয়ার, পঠিত হওয়ার, এবং চান পাঠক যেন তাঁদের লেখাগুলি উপলব্ধি করেন, কিন্তু সাধারণ মানুষের থেকে, প্রাত্যহিক সংঘর্ষের থেকে নিজেদের আলাদা করার জন্য তাঁরা খুব একটা কিছু করেন না। অথচ খুব বেশিদিন আগেও নয়, এই শতাব্দীর প্রথম দশকে, কবিরা তাঁদের অদ্ভুত পোশাক আর খামখেয়ালি আচরণের মাধ্যমে আমাদের ধাক্কা দিতে চাইতেন। কিন্তু এসবই ছিল নিছক জনগণকে দেখানোর জন্য। সেই মুহূর্ত সবসময় আসে যখন কবিকে দরজা বন্ধ করে দিতে হয়, খুলে ফেলতে হয় পরনের আঙরাখা, জবড়জং গয়নাগাটি, আর যত কাব্যিক সাজসজ্জা আর মুখোমুখি হতে হয় ___ নীরবে, ধৈর্যের সঙ্গে অপেক্ষা করতে হয় নিজের মুখোমুখি হওয়ার __ স্থির সাদা পাতার জন্য। কারণ শেষ পর্যন্ত এটাই সবেচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। 


এটা কোনো আকস্মিক ব্যাপার নয় যে বিজ্ঞানী এবং শিল্পীদের জীবন নিয়ে প্রচুর পরিমাণে ছায়াছবি নির্মিত হয়। আরও উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিচালকেরা বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গে যে সৃজনশীল প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যাওয়ার ফলে একজন বিজ্ঞানী তাঁর গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারটি করেন বা একজন শিল্পী জন্ম দেন একটি মাস্টারপিসের সেই প্রক্রিয়াটিকে পুনর্গঠনের চেষ্টা করেন। পর্দায় যখন নানারকম যন্ত্রপাতি, গবেষণাগারের দৃশ্য, সেই বিজ্ঞানীর পরীক্ষা নিরীক্ষার মুহুর্তগুলি বিশদভাবে ফুটিয়ে তোলা হয় তখন তা স্বাভাবিকভাবেই দর্শকের মনোযোগ আকর্ষণ করে। এবং সেইসব অনিশ্চয়তার মুহূর্তগুলি ___ হাজারবার ধরে করা পরীক্ষায় সামান্য পরিবর্তন করে পাওয়া যাবে কি সেই কাঙ্ক্ষিত ফলাফল?__ নিঃসন্দেহে নাটকীয় মুহূর্তের জন্ম দেয়। চিত্রশিল্পীর জীবন নিয়ে সৃষ্ট চলচ্চিত্রগুলি খুবই আকর্ষণীয়, চিত্তাকর্ষক হতে পারে, কারণ সেখানে বিখ্যাত ছবিগুলির সৃষ্টির মুহূর্তগুলোকে, সেই ছবিগুলোর অভিযোজনের প্রক্রিয়াগুলো ধাপে ধাপে দর্শকের সামনে উপস্থাপন করার সু্যোগ থাকে, পেনসিলের প্রথম রেখা টানা থেকে ব্রাশের শেষ স্ট্রোক অবধি। সুরকারদের নিয়ে তৈরি ছায়াছবিতে সুরই মুখ্য হয়ে ওঠে। তাঁর কানে প্রথম যে সুরের অনুরণন বেজে উঠেছিল সেখান থেকে সিম্ফনির মতো পরিণত কাজ অব্দি। অবশ্যই এই জাতীয় সিনেমাগুলি অতীব সরল হয়ে থাকে এবং সেই জটিল মানসিক অবস্থা যা সাধারণভাবে অনুপ্রেরণা নামেই পরিচিত তার ব্যাখা দিতে ব্যর্থ হয়, তবুও অন্ততপক্ষে কিছু একটা দেখার এবং শোনার মতো থাকে। 


কিন্তু কবিরা হচ্ছে সবচেয়ে খারাপ। তাঁদের কাজগুলি মারাত্মকরকমের আনফটোজেনিক। কেউ একজন টেবিলে বসে আছে বা সোফায় শুয়ে একদৃষ্টিতে দেয়াল বা সিলিং-এর দিকে তাকিয়ে আছে। পনেরো মিনিট বাদে সেই ব্যক্তি সাত লাইন লেখেন তার মধ্যে কেউ হয়ত সেখান দিয়ে একবার হেঁটে যায়, তারপরে আরও একঘণ্টা কেটে যায় , যার মাঝখানে কিছুই ঘটে না… কে এইসব দেখার জন্য দাঁড়িয়ে থাকবে? 

আমি এর আগে অনুপ্রেরণার উল্লেখ করেছিলাম।

সমসাময়িক কবিরা অনুপ্রেরণা কি এবং আদৌ এর অস্তিত্ব আছে কিনা এই প্রশ্নের উত্তরে কিছুটা চাতুরীর আশ্রয় নেন। এমন নয় যে তাঁরা কোনদিন তাঁদের অন্তরে এর মঙ্গলময় অভিঘাত অনুভব করেননি। যা আপনি নিজে বোঝেন না সেটি অন্য কাউকে ব্যাখ্যা করা খুব একটা সহজ নয়।

যখন আমাকে এই বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়, আমিও এড়িয়ে যাই। কিন্তু আমার উত্তর হল এই যে: অনুপ্রেরণা  কবি বা শিল্পীর একচেটিয়া ব্যাপার নয়। বেশ কিছু মানুষ যারা আছেন ,আগেও ছিলেন, যাঁদের কাছে অনুপ্রেরণা ধরা দেয়। সেই সব মানুষ যাঁরা সচেতনভাবে নিজেদের কাজকে বেছে নিয়েছেন এবং যাঁরা ভালোবেসে, কল্পনাশক্তির সাহায্যে সেই কাজটি করেন তাঁরা সকলেই এই শ্রেণির মধ্যে পড়বেন। এঁদের মধ্যে ডাক্তাররা থাকতে পারেন , শিক্ষকরা থাকতে পারেন, মালীরা থাকতে পারেন ___ এরকম আরও একশোটা পেশার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তির নাম আমি এই প্রসঙ্গে করতে পারি। তাঁদের কাজ একটা ধারাবাহিক রোমাঞ্চকর অভিযানে পরিণত হয় যতদিন পর্যন্ত তাঁরা এর মধ্যে নিত্যনতুন চ্যালেঞ্জ আবিষ্কার করতে সক্ষম হন। প্রতিবন্ধকতা এবং বাধা কখনোই তাঁদের কৌতূহলকে দমিয়ে দিতে পারে না। প্রত্যেক সমস্যা যা তাঁরা সমাধান করেছেন তাঁদের সামনে একঝাঁক নতুন প্রশ্ন নিয়ে আসে। অনুপ্রেরণা যাই হোক না কেন, এর জন্ম ধারাবাহিক ‘আমি জানি না’ -এর থেকে। 

কিন্তু এরকম লোক খুব বেশি পাওয়া যাবে না। এই পৃথিবীর বেশিরভাগ বাসিন্দা কোনরকমে প্রয়োজন মেটানোর জন্য কাজ করে থাকেন। করতে হয় বলেই তাঁরা কাজ করেন। কাজ বেছে নেওয়ার পিছনে তাঁদের কোনো আবেগ কাজ করে না; তাঁদের জীবনের পরিস্থিতি তাঁদের হয়ে কাজটি বেছে দেয়। ভালোবাসাহীন কাজ, একঘেয়ে কাজ, কাজের মূল্যায়ন হয় এইভাবে যে যতই ভালোবাসাহীন বা একঘেয়ে হোক না কেন অন্যেরা সেই কাজটি পায়নি ___ এটা মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড়ো যন্ত্রণা। আর তেমন কোনও ইঙ্গিত বা সম্ভাবনা নেই যে আগামী শতাব্দীতে এই অবস্থার কোন পরিবর্তন ঘটবে অন্তত যা চলছে তার থেকে ভালো কোনো পরিস্থিতির জন্ম হবে। 


সুতরাং আমি, যদিও অনুপ্রেরণার উপর কবিদের একচেটিয়া অধিকারের বিষয়টি অস্বীকার করি, আমি তাঁদের  বিশেষভাবে সৌভাগ্যবান বলে মনে করি। 


এই মুহূর্তে, যদিও, আমার শ্রোতাদের মনে কয়েকটি সন্দেহের উদ্রেক হতে পারে। সবধরনের অত্যাচারী, স্বৈরাচারী, ধর্মান্ধ এবং বাক্যবাগীশ নেতারা যারা ক্ষমতায় আসার জন্য গরম গরম শ্লোগান দেন তারাও নিজেদের কাজকে উপভোগ করেন, এবং বেশ উৎসাহের সঙ্গেই করেন আর উদ্ভাবনী শক্তিরও পরিচয় দিয়ে থাকেন। হ্যাঁ, কিন্তু তারা ‘জানেন’। তারা জানেন, যা-ই তারা জানেন তাদের জন্য সেই জানাটাই যথেষ্ট। তারা আর অন্য কোনো কিছু সম্পর্কে জানতে চান না, কারণ এরকম করলে সম্ভবত তাদের তর্কের জোর কমে যায়। আর যেকোন জ্ঞান যা নতুন প্রশ্নের দিকে আমাদের চালনা করে না দ্রুত হারিয়ে যায়: জীবন ধারণের জন্য যে উত্তাপের প্রয়োজন হয় তা বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়। শুধু তাই নয় সমাজের জন্য অনেকসময় মারাত্মক ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে। প্রাচীন এবং আধুনিক ইতিহাসের এমন অনেক ঘটনা আমাদের জানা আছে।


যে কারণে, ‘আমি জানি না’ এই ছোটো শব্দবন্ধটিকে আমি এত গুরুত্ব দিয়ে থাকি। এটা ছোটো, কিন্তু শক্তিশালী ডানায় ভর করে ওড়ে। এটি আমাদের জীবনকে আরও প্রসারিত করে যাতে আমাদের ভিতরে আরও একটু জায়গার সংকুলান হতে পারে সেই সঙ্গে আমাদের বাহ্যিক জীবনেরও সম্প্রসারণ ঘটাতে সাহায্য করে যে জীবন নানা পার্থিব কারণে আটকা পড়ে যায়। যদি আইজ্যাক নিউটন কোনোদিন নিজেকে না বলতেন “আমি জানি না,” তাহলে তাঁর বাগানে আপেলের বৃষ্টি হয়ে যেত আর তিনি সবথেকে বেশি যা করতেন তা হল নীচু হয়ে আপেলগুলি কুড়িয়ে নিতেন আর তৃপ্তি সহকারে সেগুলি খেতেন। আমার স্বদেশনিবাসী মারি ক্যুরি যদি কোনোদিন নিজেকে না বলতেন “আমি জানি না”, হয়ত সারাজীবন তিনি কোনো প্রাইভেট কলেজে ধনীর দুলালীদের কেমিস্ট্রি পড়াতেন, এবং একটা সম্মানজনক পেশায় নিযুক্ত থেকেই তাঁর জীবন কাটিয়ে দিতেন। কিন্তু তিনি নিজেকে বারবার বলে গেছেন “আমি জানি না” এবং এই শব্দবন্ধ তাঁকে একবার নয় দু-দুবার, স্টকহোম-এ নিয়ে এসেছে, যেখানে অস্থির, অনুসন্ধিৎসু মানসিকতাকে কখনও কখনও নোবেল পুরস্কারে পুরস্কৃত করা হয়ে থাকে। 

কবিরা, যদি তাঁরা প্রকৃত কবি হন, নিজেদের বারবার বলে যেতে হবে “আমি জানি না।” প্রতিটি কবিতা এই বিবৃতির উত্তর দেওয়ার একটা প্রচেষ্টাকে চিহ্নিত করে, কিন্তু যখনই সাদা পাতার উপর চূড়ান্ত পর্যায় এসে উপনীত হয়, কবি তখন দ্বিধা করতে আরম্ভ করেন, তিনি বুঝতে শুরু করেন যে তাঁর নির্দিষ্ট উত্তরটি একেবারেই কাজ চালানো গোছের যা কিনা সম্পূর্ণভাবে অনপুযুক্ত। তাই কবিরা চেষ্টা চালিয়ে যান, আর তার ফলাফল হিসেবে আজ হোক কাল হোক কবিদের উপর্যুপরি আত্ম-অসন্তুষ্টিকে একটা প্রকাণ্ড পেপারক্লিপ দিয়ে জুড়ে সাহিত্যের ঐতিহাসিকরা তার নাম দেন “সাহিত্যসম্ভার”। 


আমি মাঝেমধ্যে এমন সব পরিস্থিতির স্বপ্ন দেখি যা সম্ভবত কখনই বাস্তবায়িত হতে পারে না। আমি দুঃসাহসের সঙ্গে কল্পনা করি, যেমন ধরুন, যে আমার সুযোগ হল সমগ্র মানবজাতির অহমিকা নিয়ে শোকগাথা লেখা এক্লেসিয়াসটেস এর সঙ্গে কথা বলার। আমি তাঁর সামনে নতজানু হবো, কারণ তিনি, অন্তত আমার  মতে মহান কবিদের মধ্যে একজন। এইসব হয়ে গেলে, আমি তাঁর হাত আঁকড়ে ধরব। ‘“পৃথিবীতে নতুন কিছুই নেই’: এটাই আপনি লিখেছিলেন, এক্লেসিয়াসটেস । কিন্তু আপনি নিজেই জন্মেছিলেন নতুন হয়ে, এই পৃথিবীতে এবং যে কবিতাগুলি আপনি সৃষ্টি করেছিলেন, সেগুলোও ছিল একেবারে আনকোরা, যেহেতু পৃথিবীতে, আপনার আগে কেউ এগুলো লেখেনি। এবং আপনার সমস্ত পাঠক তারাও নতুনই ছিলেন এই পৃথিবীতে , কারণ আপনার জন্মের আগে যারা বেঁচে ছিলেন তাদের আপনার লেখা পড়ার কোনো সুযোগ ছিল না। এবং যে সাইপ্রেস গাছের তলায় আপনি বসে আছেন সৃষ্টির আগেই তার জন্ম হয়নি। এক্লেসিয়াসটেস, আমি আপনাকে জিগ্যেস করতে চাই নতুন কী নিয়ে আপনি এখন কাজ করার পরিকল্পনা করছেন? যা কিছু ভাবনাচিন্তা আপনি ইতিমধ্যেই ব্যক্ত করেছেন তার সঙ্গেই কিছু যোগ করার কথা ভাবছেন? নাকি সেগুলোর মধ্যে কয়েকটি খণ্ডন করতে লোভ হচ্ছে আপনার এখন? আপনার পূর্বের কাজগুলিতে আপনি আনন্দের উল্লেখ করেছিলেন ___ কী হবে যদি তা দ্রুত ফুরিয়ে যেতে থাকে? হয়ত আপনার নতুন লেখা কবিতাগুলো হবে আনন্দ নিয়ে? আপনি কি নোটস নিয়েছেন, খসড়া তৈরি করেছেন কিছু? আমার সন্দেহ আছে যে আপনি বলবেন, “আমার সমস্তকিছু লেখা হয়ে গেছে, আমার আর নতুন করে যোগ করার মতো কিছু নেই।’ পৃথিবীর কোনও কবি এমনটা বলতে পারেন না, আর আপনার মতো মহান কবি তো কখনই নয়।”


এই বিশ্ব __ আমরা যাই ভাবি না কেন এর বিশালত্ব আর আমাদের অক্ষমতার কারণে ভীত হয়ে, অথবা তিক্ত মনোভাব পোষণ করে থাকি ব্যক্তিগত যন্ত্রণার প্রতি এর উদাসীনতার কারণে, মানুষের, পশুর, এবং সম্ভবত গাছপালার, কীভাবে আমরা এত নিশ্চিত হয়ে যাই যে গাছেরা কোনও যন্ত্রণা অনুভব করে না,  যা কিছুই আমরা ভাবি না কেন এর বিস্তৃতি যা নক্ষত্রের আলোয় এফোঁড় ওফোঁড় হয়ে যায় একে ঘিরে থাকা গ্রহরা যাদের আমরা সবেমাত্র আবিষ্কার করতে শুরু করেছি, গ্রহগুলি যারা কিনা ইতিমধ্যেই মৃত? এখনও মৃত? আমরা স্রেফ জানি না; যা-ই আমরা ভাবি না কেন এই অসীম থিয়েটার সম্পর্কে যেখানে আমরা রিজার্ভ টিকিট পেয়ে গেছি, কিন্তু সেই রিজার্ভ টিকিটের মেয়াদ হাস্যকরভাবে সংক্ষিপ্ত, দুটো খামখেয়ালি তারিখের দ্বারা যা সীমাবদ্ধ; আর যা কিছু আমরা এই বিশ্ব সম্পর্কে ভাবি না কেন ___ এটি বিস্ময়কর।


কিন্তু ‘বিস্ময়কর’ এই বিশেষণটির মধ্যে একটি যৌক্তিক ফাঁদ লুকোনো আছে। আমরা বিস্মিত হই, মোটের উপর, যা কিনা সুপরিচিত এবং বিশ্বজনীনভাবে স্বীকৃত, আমরা যাতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি সেইসমস্ত ঘটনার  থেকে আলাদা এমন ঘটনা ঘটলে। এখন কথা হচ্ছে, এরকম কোনো সংশয়াতীত নিশ্চিত জগৎ নেই। আমাদের বিস্মিত হওয়ার বোধ সহজাত এবং সেটি অন্য কিছুর সঙ্গে তুলনার উপর নির্ভর করে না। 


আমাদের দৈনন্দিন কথাবার্তায়, যেখানে আমরা প্রতিটি শব্দ থেমে থেমে ভেবে ভেবে বলি না, সেখানে আমরা সকলেই “ সাধারণ পৃথিবী”, “ সাধারণ জীবন” “ সাধারণ ঘটনাস্রোত” … এই জাতীয় শব্দবন্ধ ব্যবহার করে থাকি। কিন্তু কবিতার ভাষায়, যেখানে প্রতিটি শব্দ নিক্তিতে মাপা হয়, সেখানে কিছুই সাধারণ বা স্বাভাবিক নয়। একটা পাথরও না আর তার উপরে একটা মেঘও না। একটা দিনও না আর তার পরে একটা রাত্রিও না। আর সর্বোপরি, একটা অস্তিত্বও না, এই পৃথিবীতে আর কারুর অস্তিস্ত্ব না। 


মনে হয় কবিরা চিরকাল নিজেদের পথ নিজেরাই তৈরি করে নেবেন।  


উইসলাওয়া সিম্বোর্স্কা-র  জন্ম ১৯২৩ খ্রীস্টাব্দের ২রা জুলাই , পোল্যান্ডে। পরিবারের দুই কন্যাসন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন কনিষ্ঠতম। শৈশবেই ছোটগল্প এবং গান রচনার মধ্যে দিয়ে লেখায় হাতেখড়ি। কবি হিসেবে আত্মপ্রকাশ ১৯৪৫ সালে। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থগুলি হল Calling Out To Yeti , Salt, No End of Fun , Could Have , A Lare Number , The People On The Bridge , The End and The Beginning , Here ইত্যাদি। লিখেছেন পোলিশ ভাষায়।তাঁর কবিতাগুলি অনূদিত হয়েছে ইংরেজিসহ অন্যান্য ভাষাতে। কবিতা লেখার পাশাপাশি বিভিন্ন লিটারারি জার্নালে তিনি সম্পাদক হিসেবে কাজ করেছেন। যার মধ্যে  Zycie Literackie এবং Pismo উল্লেযোগ্য। ১৯৯৬ সালে সিম্বোর্স্কা সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান। ২০২১ সালের ১লা ফেব্রুয়ারি  তাঁর প্রয়াণ ঘটে।


ঋণ : nobelprize.org 


চীনা কবিতা ।। চন্দন মিত্র

















চৈনিক কবি   হানশান   প্রণীত



                              
                               শীতলগিরির পদ্য

    (হানশান-বৃত্তান্ত ও হানশান প্রণীত কতিপয় পদ্যের বাংলা রূপান্তর)  

 

আজ থেকে হাজার-বারোশো বছর আগের কথা। তিরিশ বছর বয়সী এক চিনাযুবক সমাজ-সংসারের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে যান, দক্ষিণ পশ্চিম চিনের ঝেজিয়াং প্রদেশের তিয়েনতাই পর্বতের দুর্গম অঞ্চলে। বসবাসের স্থান হিসাবে বেছে নেন, দক্ষিণমুখো এক পার্বত্য  গুহা। বসবাসের সেই মনোরম স্থানটিকে তিনি হানশান নামে চিহ্নিত করেন। কালক্রমে নিজের দেওয়া ওই স্থান নামটিই হয়ে ওঠে তাঁর ব্যক্তিনাম। চিনা ভাষায় হান শব্দের অন্যতম অর্থ শীতল  এবং শান শব্দের অর্থ গিরি বা পর্বত ; কাব্যিক বাংলা করলে দাঁড়ায় শীতলগিরি। আমরা এই  লেখায় কবির ব্যক্তিনাম হিসাবে হানশান এবং স্থাননাম হিসাবে শীতলগিরি শব্দটি ব্যবহার করব। হানশান নামের আড়ালে আশ্রয় নেওয়া কবির প্রকৃত নাম, জন্ম বা বংশ পরিচয়, জীবৎকাল   ইত্যাদি সম্পর্কে প্রামাণিক কোনও তথ্যই পাওয়া যায় না। তিনি যে কখন কোথা থেকে গিয়ে শীতলগিরিতে আশ্রয় নিয়ে ছিলেন, সে সম্পর্কে কেউ বিশেষ কোনও তথ্য এখনও পর্যন্ত দিতে পারেননি। তবে এটা নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে তিনি খ্রিস্টীয় দশম শতাব্দীর আগে বর্তমান ছিলেন। কারণ, নবম শতাব্দীর বিভিন্ন নথিতে তাঁর উল্লেখ পাওয়া যায়। তাঁর লিখিত পদ্যগুলি প্রথম সংকলিত হয় খ্রিস্টীয় নবম শতাব্দীতে হানশানশি অর্থাৎ হানশানের পদ্য শিরোনামে। এক তাওবাদী সাধক শিউ লিং-ফু ছিলেন সংকলক, যিনি বাস করতেন তিয়েনতাই পর্বতের ইউন-কাই শৃঙ্গে। সংকলনের জন্য একটি ভূমিকাও তিনি লিখেছিলেন। তাঁর দাবি, হানশান ছিলেন তাওবাদী। সংকলনটি জনপ্রিয় হলেও কেবল কিছু নথিতে উল্লেখটুকু রেখে একসময় সে হারিয়ে যায়। হানশানশি-র পরবর্তী সংকলক হলেন শাও-শান পেনচি (৮৪০-৮৯০ খ্রিঃ) ও তুং-শান লিয়াং-চিয়ে (৮০৭-৮৬৯ খ্রিঃ)। তাঁরা ছিলেন শাও-তুং বা শোতো জেন সম্প্রদায়ের সাধু। এই সংকলনের জন্য ভূমিকা লিখেছিলেন শাও-শান পেনচি। এই সংকলনে হানশানকে জেন সাধু হিসাবেই তুলে ধরা হয়। প্রথম সংকলনের মতো এই সংকলনও কেবল নথির তথ্যে টিকে আছে।



    পরবর্তীকালে হানশানশি সংকলনে লু চিউ-ইয়ুন নামের জনৈক সরকারি আধিকারিকের একটি  প্রস্তাবনা সংযুক্ত হয়। লু চিউ-ইয়ুন দাবি করেছেন, তিনি কুও চিং মঠে হানশান-কে দেখেছেন।  এই প্রস্তাবনাটিই কবি হানশান সম্পর্কিত একমাত্র নথি। পরবর্তীকালে হানশান সম্পর্কিত যাবতীয় লেখায় এই প্রস্তাবনাটির সহায়তা নেওয়া হয়েছে। এই প্রস্তাবনা থেকে জানা যায়, তিয়েনতাই পর্বতের কুও চিং মঠে হানশানকে মাঝেমধ্যে দেখা যেত। হানশান-এর গুহাবাস থেকে কুও চিং মঠ ছিল ২৫ লি অর্থাৎ সাড়ে ১২ কিমি দূরে। মঠের এক বুড়ো সাধু ফেংগান ও শি-তে নামক এক জোয়ান রাঁধুনির সঙ্গে হানশান-এর বেশ ভাব ছিল। শি-তে সকলের অগোচরে একটি বাঁশের খোলে খাদ্যসামগ্রী এনে হানশানের হাতে তুলে দিতেন। মঠের লম্বা বারান্দায় পায়চারি করতে করতে হানশান কখনও হাসতেন, কখনও গান ধরতেন আবার কখনও বকবক করতেন। মঠের ছেলেরা তাঁর পিছনে লাগলে তিনি পালিয়ে যেতেন। তাঁর মুখমণ্ডলে বার্ধক্যের স্পষ্ট ছাপ থাকলেও তাঁর কথাবার্তা ছিল জড়তামুক্ত ও তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর টুপি ছিল বার্চ গাছের ছালের তৈরি, পরনে জীর্ণ চীবর ; আর পায়ে ছিল কাঠের খড়ম। হানশান, ফেংগান ও শি-তে এই তিয়েনতাই ত্রয়ী তাও ও জেন সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা রাখতেন এবং কাব্যচর্চা করতেন। তবে এই কাব্যচর্চায় কাগজকলমের ব্যবহার ছিল না। তাঁরা লিখতেন পাথরের গায়ে, গুহাগাত্রে, গাছের গুঁড়িতে, কখনও গ্রামভ্রমণে গিয়ে সেখানকার দেয়ালে-পাঁচিলে।



       হানশান-এর জীবৎকাল সঠিকভাবে নির্ণীত না হলেও তিনি যে তাং আমলের কবি সে বিষয়ে নিঃসংশয় হওয়া যায়। তাং রাজাদের শাসনকাল (১৮জুন ৬১৮-৪জুন ৯০৭ খ্রিঃ) চিনা কবিতার সুবর্ণ যুগ নামে খ্যাত। তাং যুগের কবিতার সব থেকে বড় সংকলন চুয়ান তাংশি, বাংলায় তাং কবিতা সমগ্র। প্রকাশিত হয় ১৭০৫ বা ১৭০৭ খ্রিস্টাব্দে। নয়শো খণ্ডের এই সংকলনে ২২০০ কবির ৪৯০০০ কবিতা স্থান পেয়েছে। কবি হানশানও চুয়ান তাংশি-তে সাদরে স্থান পেয়েছেন। এই সংকলনে তাঁর কবিতা সংখ্যা ৩১১। তবুও একথা উল্লেখ করতেই হয় যে, তাং যুগের কবি লি পো (৭০১-৭৬২ খ্রিঃ), তু ফু (৭১২- ৭৭০ খ্রিঃ), ওয়াং ফেই (৬৯৯-৭৬১ খ্রিঃ) বা পো চু (৭৭২-৮৪৬ খ্রিঃ)-র মতো খ্যাতি বা পরিচিতি কোনোটাই হানশান-এর ছিল না। অনেক  সংকলনেই তিনি ব্রাত্য থেকে গেছেন। আসলে মূলধারার যে কাব্যচর্চা বা প্রাতিষ্ঠানিকতাকে শিরোধার্য করে যে কাব্যচর্চা, তা হানশান করেননি। সারস্বতমণ্ডলীতে নাম লেখানো দূরের কথা তিনি তো সমাজ-সংসার থেকে এক স্বেচ্ছা নির্বাসনের পথই বেছে নিয়েছিলেন। হানশানকে নিয়ে তাওবাদী বা বৌদ্ধদের বা সাধারণ পাঠকদের মাতামাতি দেখা গেলেও রক্ষণশীল সমালোচকগণ হানশানকে যথাসম্ভব এড়িয়ে গেছেন বা খাটো করে দেখেছেন। এর কারণ এই যে, হানশান মান্যভাষারীতিকে সচেতনভাবে বর্জন করে তিয়েনতাই অঞ্চলের স্থানীয় ভাষাতেই তাঁর পদ্যগুলি লিপিবদ্ধ করেছেন। আসলে হানশান চেয়েছিলেন জীবন সম্পর্কে তাঁর জানাবোঝা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে যাক, তাঁরাও প্রজ্ঞার পথে পা রেখে নিজেদের মতো করে জীবনকে বুঝে নিক। এই জন্যই তিনি সাধারণের ভাষায় লিখেছেন তাঁর জ্ঞানগর্ভ পদ্যাবলি। হানশান তাঁর একটি পদ্যে জানিয়েছেন, তিনি সব মিলিয়ে ছয়শো পদ্য লিখেছেন। এগুলির মধ্যে প্রতি লাইনে পাঁচ শব্দ থাকা পদ্যের সংখ্যা পাঁচশো, প্রতি লাইনে সাত শব্দ থাকা পদ্যের সংখ্যা উনআশি এবং প্রতি লাইনে তিন শব্দ থাকা পদ্যের সংখ্যা একুশ। যদিও তাঁর সব কবিতা পাওয়া যায়নি। সর্বসাকুল্যে তিনশো এগারোটি কবিতা পাওয়া গেছে। হানশানের অধিকাংশ পদ্যই সংক্ষিপ্ত। প্রতি লাইনে পাঁচ শব্দ থাকা পদ্যগুলি আট লাইনের। এগুলির সংখ্যাই সর্বাধিক।



    লু চিউ-ইয়েন এর প্রস্তাবনা থেকে হানশান-এর ব্যক্তিজীবন সম্পর্কে তেমন কিছুই জানা যায় না। এক্ষেত্রে আমাদের একমাত্র সহায় হয়ে উঠতে পারে হানশান রচিত পদ্যাবলি। হানশান-এর পদ্য তাঁর ব্যক্তিজীবনের অনেক তথ্যই তুলে ধরেছে। তাঁর পদ্যাবলি অবলম্বনে আমরা অনায়াসে একটি হানশান-চরিত নির্মাণ করতেই পারি। সম্ভবত হানশান ছিলেন সম্পন্ন কৃষক পরিবারের সন্তান। কৃষিকাজের সঙ্গে সঙ্গে তাঁতবোনাও তাঁদের পারিবারিক বৃত্তি ছিল। পড়াশোনার প্রতি  অত্যধিক আসক্তি ছিল তাঁর। কৃষক পরিবারের সন্তানের এই পুস্তকপ্রীতি তাঁকে ঘরেবাইরে  উপহাসের পাত্র করে তুলেছিল। তিনি সংগীত ও যুদ্ধবিদ্যা শিখেছিলেন মন দিয়ে। এমনও হতে  পারে তাং রাজাদের বাহিনীতে সৈনিকের ভুমিকাও তিনি পালন করেছিলেন। কেউ কেউ অনুমান করেছেন আন-লু-শান বিদ্রোহের সময় (৭৫৫-৭৬৩ খ্রিঃ) তিনি সামরিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়ে  অথবা বিদ্রোহের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত থাকার কারণে বিদ্রোহ ব্যর্থ হওয়ায় দণ্ড এড়ানোর জন্যই তিয়েনতাই পর্বতে গা-ঢাকা দেন। রাজ-আধিকারিক লু চিউ-ইয়েন আসলে তাঁকে ধরার  জন্যই কুও চিং মঠে গেছিলেন। কিন্তু তিনি তাঁর বেশভূষা আচরণ দেখে তাঁকে ভূতপূর্ব সৈনিক বা বিদ্রোহী বলে চিহ্নিত করতে ব্যর্থ হয়েছেন অথবা চিনেও না-চেনার ভান করেছেন। এমনও হতে  পারে দাম্পত্যজীবনের নিরন্তর অশান্তি, আত্মীয়স্বজনদের অমানবিক ব্যবহার, নাগরিক জীবনে প্রতিষ্ঠা না-পাওয়ার যন্ত্রণা ইত্যাদি কারণে আমাদের তরুণ কবি স্বেচ্ছানির্বাসন বেছে নিয়েছিলেন শীতলগিরির নিভৃত পরিমণ্ডলে।



      হানশান-এর পদ্যকে প্রথম ইংরেজি ভাষায় রূপান্তরিত করেন প্রখ্যাত ইংরেজ অনুবাদক আর্থার ওয়ালি (১৮৮৯-১৯৬৬ খ্রিঃ)। কবি স্তিফেন স্পেণ্ডার ও সাংবাদিক আরভিন ক্রিস্টল  সম্পাদিত ব্রিটেনের বিখ্যাত পত্রিকা এনকাউন্টার তাঁর অনূদিত ২৭ টি পদ্য প্রকাশ করে ১৯৫৪ সালের সেপ্টেম্বর সংখ্যায়। আর্থার ওয়ালি-র এই অনুবাদ অচিরেই চৈনিক কবি হানশানকে ইংরেজ পাঠকের কাছে পরিচিত করে তোলে। অতঃপর আমেরিকান কবি গ্যারি স্নিডার অনুবাদ করেন হানশান-এর ২৪ টি কবিতা। তাঁর অনূদিত কবিতাগুলি আমেরিকার দি এভারগ্রীন রিভিউ  পত্রিকার ১৯৫৮ সালের হেমন্ত সংখ্যায় প্রকাশ পায়। এবার হানশানকে ইংরেজি সাহিত্যের পাঠকের কাছে বিশেষভাবে পরিচিত করতে এগিয়ে আসেন আমেরিকান ঔপন্যাসিক জ্যাক কেরুয়াক। না, তিনি হানশান-এর কবিতার অনুবাদ করলেন না। তিনি ১৯৫৮ সালের ২ অক্টোবর প্রকাশ করেন দ্য ধর্ম বামস নামের উপন্যাসটি। সবাই আশ্চর্য হয়ে দেখলেন বইটির উৎসর্গ পত্রে  লেখা আছে—  Dedicated to Han Shan অর্থাৎ উপন্যাসটি তিনি হানশান  নামের জনৈক ব্যক্তিকে উৎসর্গ করেছেন। উপন্যাসের উনিশতম অধ্যায়ে হানশান-এর প্রসঙ্গ এসে পড়েছে। কথক চরিত্র রে স্মিথ, দেখা করতে চলেছে জ্যাফি রাইডার নামের এক তরুণ বোহেমিয়ানের সঙ্গে, যে   আসলে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন গবেষক ছাত্র। রে স্মিথ, ঢুকে পড়ে জ্যাফির অস্থায়ী কুঁড়ে ঘরে। সে তখন মেঝেতে পেতে রাখা একটি চাদর বেছানো মাদুরের উপর বাবু হয়ে বসে কোলের উপর একটি পাণ্ডুলিপি রেখে গভীর মনোযোগের সঙ্গে নিরীক্ষণ করছিল। চোখে চশমা থাকায় তাকে বেশ পণ্ডিত পণ্ডিত বলে মনে হচ্ছিল। পাশে ছিল ধোঁয়া-ওঠা চা-পাত্র। এরপর দুই বন্ধুর কথোপকথন শুরু হয়।

 

‘রে স্মিথ— এটা কী করছ ?

জ্যাফি— প্রাজ্ঞ কবি হানশান রচিত দুর্দান্ত সব পদ্যের অনুবাদ করছি। হাজার বছর আগে এই  পদ্যগুলি লোকালয় থেকে শতশত মাইল দূরে নির্জন পর্বতের গায়ে লিখিত হয়েছিল।  

রে স্মিথ— দারুণ ব্যাপার। আমি হানশান-এর কবিতা পড়তে চাই। পড়াবে কি ? আমাকে কি হানশান সম্পর্কে কিছু বলবে ?

জ্যাফি— অবশ্যই।

রে স্মিথ— হানশান চিনা পণ্ডিত। শহুরে আবহাওয়ায় হাঁফিয়ে উঠে তিনি পার্বত্য-নির্জনতায় আত্মগোপন করেছিলেন।’



উপন্যাসের বিভিন্ন জায়গায় হানশান প্রসঙ্গ ও তাঁর পদ্যের উদ্ধৃতি ধ্রুবপদের মতো ধ্বনিত হয়েছে। এই উপন্যাসের কথক চরিত্র রে স্মিথ এবং জ্যাফি রাইডার যথাক্রমে জ্যাক কেরুয়াক ও গ্যারি স্নাইডার-এর ছায়া অবলম্বনে নির্মিত। কেরুয়াক-এর এই উপন্যাস হানশানকে আমেরিকান পাঠক সমাজে বিশেষ পরিচিতি এনে দেয়। বিট-প্রজন্মের তরুণেরা যেন তাদের বোহেমিয়ান জীবনের একজন আদর্শ পূর্বসূরির সন্ধান পেয়ে কৃতার্থ হয়। গ্যারি স্নিডার অনূদিত পদ্যগুলি ১৯৬৯ সালে রিপরাপ অ্যান্ড কোল্ড মাউন্টেন নামে প্রকাশ পায়।

 

    এইভাবে হানশান ক্রমশ ইংল্যান্ড-আমেরিকার পাঠক সমাজের আপনজন হয়ে ওঠেন। বহু অনুবাদক হানশান-এর প্রেমে পড়ে যান। ১৯৬২ সালে গ্রোভ প্রেস থেকে প্রকাশিত হয় বার্টন ওয়াটসন এর অনুবাদে হানশান-এর ১০০টি কবিতার অনুবাদগ্রন্থ, কোল্ড মাউন্টেন : ১০০  পোয়েমস। ১৯৮৩ সালে কপার ক্যানিয়ন প্রেস থেকে প্রকাশিত হয় দ্য কালেক্টেড সংস অব কোল্ড মাউন্টেন। অনুবাদক প্রখ্যাত চৈনিক ভাষা ও সংস্কৃতি বিশেষজ্ঞ রেড পাইন তথা বিল পোর্টার। এই সংকলনে হানশান-এর ৩০৭ টি, ফেংগান-এর ৪ টি এবং শি-তে-এর ৪৯ টি কবিতা স্থান পেয়েছে। এই টীকাটিপ্পনীযুক্ত গ্রন্থটিই হানশান-এর সমগ্র পদ্যের প্রথম ইংরেজি অনুবাদ। এই গ্রন্থে মূল চিনা পদ্যগুলিও মুদ্রিত হয়েছে। ১৯৯০ সালে স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত হয় রবার্ট জি. হেনরিক্স অনূদিত দ্য পোয়েট্রি অব হানশান : আ কমপ্লিট অ্যানোটেটেড ট্র্যানস্লেশন অব কোল্ড মাউন্টেন। এই সংকলনে  হানশান-এর কবিতার সংখ্যা ৩১১। এই সংকলনটিও টীকাটিপ্পনীযুক্ত। বেজিং-এর ডি গ্রুটার প্রকাশনী থেকে ২০১৬ সালে প্রকাশিত হয়  দ্য পোয়েট্রি অব হানশান, শি-তে অ্যান্ড ফেংগান। এই সংকলনেও মূল চিনা পদ্যগুলি স্থান পেয়েছে। এছাড়া এই গ্রন্থে লু চিউ-ইয়ুন-এর প্রস্তাবনাটিও সংযুক্ত করেছেন অনুবাদক পল রাউজার। এই সংকলনে  হানশান-এর পদ্যের সংখ্যা ৩১৩, ফেংগান-এর কবিতার সংখ্যা ২ এবং শি-তে-এর কবিতা সংখ্যা ৫২। ২০১৮ সালে কানাডার বোল্ডার পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত হয় দ্য কমপ্লিট কোল্ড মাউন্টেন : পোয়েমস অব দ্য লেজেনডারি হারমিট হানশান । অনুবাদক কাজুয়াকি  তানাশাহি ও পিটার লেভি। এই সংকলনে হানশান-এর পদ্যের সংখ্যা ৩১৫। কেবল ইংরেজি নয়, ফরাসি ও জার্মান ভাষাতেও হানশান অনূদিত হয়েছেন। এই একুশ শতকেও হানশান চর্চায় অনুবাদকদের মনোযোগ লক্ষ করার মতো।  



    জেন বিষয়ক লেখালেখির সুবাদে পড়াশোনা করতে গিয়ে আকস্মিকভাবে আমি হানশান-এর সঙ্গে পরিচিত হই। বলা বাহুল্য প্রথম পরিচয়েই তাঁর প্রেমে পড়ে যাই। হানশান যে সময়ের কবি, সে সময়ে ‘বৃহৎ বঙ্গে’ বাংলা ভাষার আদি নিদর্শন চর্যাপদ রচিত হচ্ছে অথবা রচিত হওয়ার পটভূমি নির্মিত হচ্ছে। চর্যাপদের মতো হানশান-এর বেশ কিছু পদ্যে ধর্মতাত্ত্বিক কথাবার্তা লক্ষ্য করা যায়। তবে চর্যাকারগণ তাঁদের পদে পূর্বাশ্রমের কোনও স্মৃতি উল্লেখ করেননি। তাঁরা মূলত সাধনতত্ত্ব প্রকাশক পদ রচনা করেছেন এবং তা করতে গিয়ে সমাজ-সংসার থেকে উপমা-রূপক-প্রতীক-চিত্রকল্প সংগ্রহ করেছেন। কিন্তু হানশান-এর পদ্য রচনার উদ্দেশ্য এতটা ধর্মনিষ্ঠ ছিল না। তিনি তাঁর সংসারজীবনের সুখস্মৃতিকে সানন্দে তুলে ধরেছেন তাঁর পদ্যে। যদিও চর্যাকারদের মতো হানশানও মহাযান বৌদ্ধশাখার ধর্মতত্ত্ব দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। হানশান যেমন মহাযান বৌদ্ধমত থেকে উদ্ভূত জেন মতাদর্শ আত্মস্থ করেছিলেন, পাশাপাশি বিশেষ চৈনিক ধর্ম-দর্শন তাও  দ্বারাও প্রভাবিত ছিলেন। তবে একথাও ঠিক হানশান জেন ও তাওবাদকে আত্মস্থ করেও এই উভয় মতবাদকে নিজের জীবনদর্শন দিয়ে প্রশ্নবিদ্ধও করেছেন। তিনি বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের মতো মস্তকমুণ্ডন করেননি, ব্যঙ্গ করেছেন তাওবাদীদের অমরত্ব হাসিলের প্রচেষ্টাকেও। আসলে হানশান প্রকৃত কবির মতো সত্য ও সুন্দরের সাধনা করেছেন, কোনও ধর্মীয় মতাদর্শের কঠিন বাঁধনে নিজেকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে নেননি। 



    হানশান-এর কবিতাগুলিকে বিষয়গত দিক থেকে কয়েকটি শ্রেণিতে বিন্যস্ত করা যেতে পারে। প্রথমত, সংসারজীবনের স্মৃতিচারণ। ফেলে আসা সংসার জীবনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে হানশান, তাঁর স্ত্রী ও পুত্রকে নিয়ে সুখী জীবনযাপনের মনোরম গৃহচিত্র উপস্থাপন করেছেন। কোনও কোনও পদ্যে একান্নবর্তী পরিবারের ছবিও ফুটে উঠেছে।



দ্বিতীয়ত, নাগরিক জীবনের নির্দয়তা। বেশ কিছু কবিতায় হানশান শহুরে লোকজনের নির্দয়তাকে তুলে ধরেছেন। একটি পদ্যে দেখি, একজন গেঁয়ো লোককে দেখে শহরের কুকুরেরা পর্যন্ত আড়চোখে তাকাচ্ছে। ছেলেছোকরারা লোকটির টুপি দেখে বলছে, যথেষ্ট উঁচু নয়। বেল্ট বা প্যান্টের ধরণ দেখেও তারা হাসাহাসি করছে। আর লোকটি এই ব্যঙ্গের উত্তরে জানাচ্ছেন, যেদিন পয়সা কামিয়ে দামি হয়ে উঠবেন, সেদিন তিনি মাথায় টুপির বদলে আস্ত একটা প্যাগোডা চাপিয়ে নেবেন। এ যেন হাজার বছর আগের চিনের কোনও শহরের চিত্র নয়, আমাদের এই সময়ের শহরের চলচ্ছবি, যেখানে গ্রাম থেকে যাওয়া লোকেরা ব্যঙ্গের শিকার হয় তাদের ভাষা ও পোশাকপরিচ্ছদের জন্য।  



তৃতীয়ত, শিক্ষিত বেকারের দুরবস্থা। একটি পদ্যে আমরা ইতিহাস ও শাস্ত্রে ডিগ্রিধারী এক ঝকঝকে তরুণকে দেখি, যে প্রতিবেশীদের কাছ থেকে মাস্টার সম্বোধন পান। কিন্তু সরকারি চাকরি জোটাতে পারেননি। আবার চাষবাসের কৌশলও তাঁর জানা নেই। একটামাত্র শণের জামায় প্রবল শীতে কাঁপতে কাঁপতে তিনি অনুভব করেছেন, বই তাকে বেপথু করেছে। এই ছবি কী আমাদের চারপাশে জীবন্ত হয়ে উঠতে দেখি না। কত ছেলেমেয়ে ডিগ্রির বোঝা কাঁধে নিয়ে বেকারজীবন যাপন করছেন। তাঁদের অন্য কোনও কাজও জানা নেই, আবার সরকারি চাকরির শিকেটাও ছিঁড়ছে না।



চতুর্থত, শীতলগিরির সৌন্দর্যের গুণগান। বহুসংখ্যক পদ্যে হানশান তিয়েনতাই পর্বত তথা শীতলগিরির নৈসর্গিক শোভা ও আরামদায়ক আবহাওয়ার বর্ণনা দিয়েছেন। 

 

পঞ্চমত, ধনীদের কার্পণ্য ও মূঢ়তা। হানশানের অনেকগুলি পদ্যে ধনীদের কৃপণতা ও মূর্খতা প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি ধনীদের জীবনের এই অন্তঃসারশূন্যতাকে ব্যঙ্গের সুতীক্ষ্ণ খোঁচায় ক্ষতবিক্ষত করেছেন।

       

ষষ্ঠত, তাও ও জেন বিষয়ক পদ্য। হানশান-এর অনেকগুলি পদ্যের বিষয় জেন ও তাও সম্পর্কিত বিভিন্ন তত্ত্ব। এই পদ্যগুলির মর্মোদ্ধার করতে হলে অবশ্যই ধর্মসম্পর্কিত জ্ঞান প্রয়োজন। দীক্ষিত জন ছাড়া এগুলির ভিতরে প্রবেশ অসাধ্য।



সপ্তমত, হানশান তাঁর অনেকগুলি পদ্যে তথাকথিত সমালোচকদের ব্যঙ্গবিদ্রূপে বিধ্বস্ত করেছেন। তাঁর এই ধরণের পদ্যগুলি পড়তে পড়তে জীবনানন্দের ‘সমারূঢ়’ কবিতার প্রথম পঙক্তিটির কথা মনে পড়ে যায়। যেখানে কবি, সমালোচকের উদ্দ্যেশ্যে শুনিয়েছেন একটি মোক্ষম বাণী — বরং নিজেই তুমি লেখনাকো একটি কবিতা।



    হানশান-এর পদ্যের বাংলা রূপান্তরের ক্ষেত্রে ইংরেজি তরজমাগুলির তুলনামূলক পাঠের সাহায্য নেওয়া হয়েছে। ইংরেজি অনুবাদগুলিতে পাঠান্তর তেমন লক্ষ করা যায় না। যেখানে পাঠান্তর লক্ষিত হয়েছে সেখানে অনুবাদক নিজস্ব বিচারবিবেচনার দ্বারাই চালিত হয়েছেন। অনুবাদের ক্ষেত্রে আট পঙক্তিযুক্ত পদ্যগুলিকেই বেছে নেওয়া হয়েছে এবং সেগুলিকে চার পঙক্তির দুই স্তবকে বিন্যস্ত করা হয়েছে। ছয়মাত্রার কলাবৃত্ত ছন্দ ও পর্যায়ক্রমিক মিলবিন্যাস পদ্যগুলিকে অনেকটাই বঙ্গজ করে তুলবে বলে আমাদের বিশ্বাস। হানশানশি-তে সঙ্কলিত পদ্যগুলির  কোনও  শিরোনাম নেই, সংখ্যা দ্বারা চিহ্নিত। হানশান কোনও পদ্যের শিরোনাম দিয়ে যাননি, শিরোনামের রীতিও তখন শুরু হয়নি। এখানে আমরা প্রতিটি পদ্যেরই পৃথক পৃথক শিরোনাম দিয়েছি, যাতে তারা প্রত্যেকেই স্বতন্ত্র সত্তা হয়ে উঠতে পারে। অনুবাদের সূত্রে হানশান-এর পদ্যগুলি বারবার পড়তে গিয়ে মনে হয়েছে, আমাদের প্রত্যেকের ভিতরে একজন হানশান সন্তর্পণে বাস করেন ; আমরা প্রত্যেকেই এক নিভৃত শীতলগিরির সন্ধানে ব্যাপৃত থাকি আমৃত্যু। এই প্রতিষ্ঠান-পীড়িত সমাজ-সংসার ছেড়ে আমরাও পালাতে চাই দূরে। হানশান পেরেছেন,  আমরা পারিনি... 



     



শী ত ল গি রি র প দ্য





 

বসতবাড়ি



পিতৃসূত্রে পেয়েছি বসতবাড়ি,

নজর দিই না কারও জমি জায়গায়।

বউ খটাখট তাঁতে বুনে যায় শাড়ি

ছেলে হইহই খেলা করে আঙিনায়।     

 

ফুলেরা নাচলে করতালি দিই আমি,

ধ্যানস্থ হয়ে শুনি পাখিদের গান।  

কে বোঝাবে আর জীবন-সালতামামি !    

কাঠুরিয়া কালেভদ্রে এপথে যান।



 

যাপন



পাতার কুটিরে বাস করি দেশোয়ালি

ঘোড়া বা শকট কম চলে এই পথে।

নিকটের বনে জিরোয় পাখপাখালি,

মাছ খেলা করে স্বচ্ছ পাহাড়ি স্রোতে।  

 

আমিও আমার ছেলে বুনোফল তুলি

চাষের সময় বউও সঙ্গে থাকে

আমার বাড়িতে আসবাব কতগুলি ?

কিছু নেই; শুধু পুথি ভরা আছে তাকে।  

 

 

 টুপির বদলে প্যাগোডা



‘গেঁয়োলোক দ্যাখ’ ! তারা সহাস্যে কয়। 

—‘এমন বুদ্ধু দেখেছিস কোনও কালে  

টুপিটা পরেছে যথেষ্ট উঁচু নয়,

কোমরবন্ধ এঁটেছে গাঁইয়া চালে’।

 

এটা নয় ঠিক, ফ্যাশন জানি না আমি

ভেঙে পড়া লোক সটান কী আর দাঁড়ায় !

একদিন হব পয়সা কামিয়ে দামি,

টুপির বদলে প্যাগোডা চড়াব মাথায়।



 

লালধুলোমাখা পৃথিবী



হাতে বই আর লাঙল কাঁধে ঝুলিয়ে

দাদাদের সাথে আমিও যেতাম মাঠে।

লোকেরা হাসত অতি বইপ্রীতি নিয়ে,

বউও আমাকে গাল দিত— পাগলাটে।   

 

লালধুলোমাখা পৃথিবীকে ছেড়ে আজ

মজায় কাটাই; যা ইচ্ছা তাই পড়ি।

বাসরাস্তায় আটকে পড়লে মাছ,

বাঁচাতে গিয়ে কে জল ঢালে তড়িঘড়ি ?

 

 

 জেন



উঁচু উঁচু চূড়া ছড়ানো চতুর্দিকে,

চোখ ভরে এই নির্বাধ শোভা দেখি।

কেউই জানে না এখানেই আছি টিকে

আবদ্ধ স্রোতে আটকে চাঁদ একাকী।

 

স্রোত খুঁড়ে খুঁড়ে নাগালে কি পাব তাকে ?

চাঁদ তো সতত আকাশে বিরাজ করে।

এই যে লেখাটা পদ্য বলছি যাকে

বস্তুত জেন নেই এর অন্দরে। 



 

 বেপথু



মার্জিত ও শৌখিন যুবা তিনি।

ডিগ্রি মিলেছে শাস্ত্রে ও ইতিহাসে।  

লোকেরা জানায়— ‘পণ্ডিত বলে চিনি,

মাস্টার তাঁকে বলে ফেলি অভ্যাসে’।

 

নিয়োগ পাননি সরকারি চাকরিতে,

জানেন না তিনি জমিতে লাঙল-চষা

শণের জামায় কেঁপে কেঁপে ভরা শীতে,

ভাবেন— বেপথু, এই বই নিয়ে বসা।



 

 অন্ধ গায় সূর্যের গান



ওয়াং নামের প্রখ্যাত জ্ঞানীলোক

আমার পদ্য পড়ে হেসে বললেন—

‘দুটি শ্বাসাঘাত কীভাবে এড়াল চোখ ?

এই চরণেতে মাত্রাও বাড়ালেন!

 

ছন্দের জ্ঞান আদৌ কী আছে ভাঁড়ে ?

যা খুশি লেখেন, যখন মন যা চায় ?’

আমি হেসে ফেলি ওয়াং-এর লেখা পড়ে,

যেন এক অন্ধ, সূর্যের গান গায়। 

 



বড় ধনী বড় মূর্খ




নতুন ফসল পাকতে এখনও বাকি,

শেষ সম্বলও আজকে নিলাম খেয়ে।

এই দুর্দিনে উপোসে মরব নাকি !

পাশের বাড়িতে দাঁড়ালাম দ্বিধা নিয়ে।

 

বাড়ির কর্তা দোর খুলে স্মিতস্বরে

বললেন— আমি বলছি বউকে গিয়ে।

গিন্নি বেরিয়ে জানালেন অকাতরে—

দেখুন বরং স্বামীর কাছেই চেয়ে।

 

খারাপ সময়ে এমন মুখোশ পরে,

কঞ্জুস লোক ভালো মানুষের মতো

করবে ভণিতা। তুমিও ফেলবে ধরে —

যত বড় ধনী মূর্খও বড় তত।



 

  পাড়ি



জীর্ণ কাঠের ভাঙাচোরা নৌকায়

আমরা ভরেছি নিমবৃক্ষের ফল।

ভেসেই চলেছি সমুদ্রে ক-জনায়,

ফুঁসে ওঠা জলে নৌকাও টলমল।

 

রসদ যা আছে, চলবে একটা দিন।

বেলাভূমি আজও লক্ষ যোজন দূরে

কেন এই দশা ? কেন আশা এত ক্ষীণ ?

গূঢ় তিক্ততা কাঠ খায় কুরেকুরে।

 

    

জ্ঞানপাপী



নিদারুণ কিছু বোকা আছে পৃথিবীতে

মগজে গোবর, চূড়ান্ত সব গাধা।

তুমি কী বলছ, পারে তারা বুঝে নিতে,

কিন্তু লোলুপ, কামের ঘানিতে বাঁধা।

 

বস্তুত তারা গভীর জলের মাছ,

বড় বড় কথা যা বলে সব ভড়ং।

অভিনয়ে খুব দক্ষ ও ধড়িবাজ ,

জ্ঞানপাপী তারা, সঙ্গ ছাড়ো বরং।





হৃদয়



বুড়ো চুং থাকে শহরের উত্তরে,

ভাঁড়ারে ভর্তি মাংস ও খাঁটি সুরা।

যেদিন বুড়োর বুড়ি গেল পরপারে,

এল ঘটা করে আত্মীয় স্বজনেরা।

 

কিন্তু যেদিন বুড়োর দিন ফুরোল  

কাঁদার জন্য একজনও জুটল না,

যারা এতদিন সুরাও কাবাব খেল,

তাদের হৃদয় একটুও গলল না।



 নিপাতন



শীতলগিরি তো মেঘের অন্য নাম

কী নির্জন আর নির্ধুল জায়গাটি,

খড়ের আসনে ভিক্ষু পায় আরাম,

পর্বত দ্যাখো, জ্বালিয়েছে শিখাটি। 

 

পাথুরে বিছানা, নিকটেই জলাশয়,

বাঘ ও হরিণ আলাপ করতে আসে।

নির্জনতার আনন্দে নিশ্চয়,

ভিক্ষু এখন নিপাতন ভালোবাসে।


ছবি : বিধান দেব 

কবিতা

সম্পাদকের কথা

দ্বিতীয় বর্ষ  ।। অষ্টম সংখ্যা ।। মার্চ ২০২২   খুব অসহায় লাগছে এবার। আমাদের ডান পাশে ধস। বায়ে গিরিখাত। মাথায় বোমারু। পায়ে পায়ে হিমানীর ব...