মনের ভ্রমে মাটি দিয়ে
মানুষের মন বড়ই চঞ্চল। কেবল অন্ন বস্ত্র বাসস্থানে মানুষের মন ভরে না। আর ভরে না বলেই যুগ যুগ ধরে মানুষ নিজেকে আবিষ্কার করেছে। সভ্যতার বিবর্তন আসলে মানুষের নিজেকে খুঁজে পাওয়ার ইতিহাস।কখনো সে আগুনের আবিষ্কার করেছে তো কখনো সে শিখে নিয়েছে চাষের কৌশল। শিখেছে বীজের সংরক্ষণ।চাকা আবিষ্কার। অস্ত্রের ব্যবহার সেই পাথর লাঠি দিয়ে শুরু করে কুড়ুল তলোয়ার পেরিয়ে বন্দুক কামান ট্যাঙ্ক মিশাইল সভ্যতায় পৌঁছে গেছে মানুষ। কিন্তু এত সব করেও মানুষের মনের খিদে মেটেনি। আর তাই আমরা
খুঁজে পেয়েছি ভীমভেটকার গুহাচিত্র। খুঁজে পেয়েছি অজন্তা গুহাচিত্র। আর পেয়েছি সারা পৃথিবী জুড়ে ছড়িয়ে থাকা ব্রাহ্মী খরোষ্ঠী হায়রোগ্লিফিক সহ অদ্ভুত বৈচিত্রময় সব লিপি। সে সব লিপির যত না আবিষ্কৃত হয়েছে অনাবিষ্কৃত থেকে গেছে তার চেয়েও বেশি। সারা পৃথিবী জুড়ে কত কত পাহাড়ের গায়ে যে মানুষ খোদাই করেছে ইতিহাস !
আসলে শিল্প মানুষের মনের চাহিদা মেটায়। না বলা কথার ভেতর মনের মাধুরী মিশিয়ে সে গড়ে তোলে অবয়ব। কথার ফুলঝুরি। এই শিল্প হয়ে ওঠা কথাই কখনো হয়েছে নতুন আবিষ্কারের দিশারি তো কখনো কথায় বুনে তোলা কাব্য মানুষকে উড়ালের স্বপ্ন দিয়েছে। পৌত্তলিকতা এবং বিমূর্তা ধারণা দুটির কোনোটিই ভুল নয়। আসলে ভিন্ন ভিন্ন মানুষের চিন্তার ব্যপ্তি ভিন্ন। কেউ পুতুলকে বিমূর্ত করে তোলেন আবার কেউ বিমূর্ত ধারণাটিকে মূর্তির রূপ দেন। আমরা বেদের দিকে তাকালে দেখতে পাই পঞ্চভূতের পূজার চিন্তাধারাটিকে। এ তো আসলে বিমূর্ত রূপেরই পূজা। অগ্নি বায়ু আকাশ জল মাটি সমস্তটাই বিমূর্ত আবার মূর্তও। অথবা শিবের যে শিলা রূপে আরাধনা একেও তো বিমূর্তই বলতে হয়। গণ্ডকী নদী থেকে পাওয়া শালগ্রাম শিলাও কি বিমূর্ত নয় ! কোনো একটি গাছের নিচে বনদেবীর আরাধনাকেও তো বিমূর্তই বলতে হয়। আমরা কেউই সেই বনদেবীকে দেখিনি কোনোদিন। অথবা কার্তিক সরস্বতী দুর্গা লক্ষ্মী নারায়ণের যে মূর্তি তার ভেতরেও বিমূর্ততা প্রবহমাণ। আর সেজন্যই কখনো দুর্গার দশহাত কল্পনা করতে পারি। নীল সরস্বতীর কথা ভাবতে পারি। ভাবতে পারি ব্রহ্মা চতুরানন। ভাবতে পারি গণেশের মুখখানি হাতির। প্রাচীন মিশরীয় দেবদেবীদেরও দেখি কারোর মুখে গরুর অবয়ব কারো বা সিংহীর। এসবই আসলে শিল্পের বিভিন্ন রূপ।
(১৩২২ শ্রাবণ) সাহিত্যের খেলা প্রবন্ধে শ্রী প্রমথ চৌধুরী বলেছেনঃ " কবির সৃষ্টিও এই বিশ্ব সৃষ্টির অনুরূপ,সে সৃজনের মূলে কোনো অভাব দূর করবার অভিপ্রায় নেই-- সে সৃষ্টির মূল অন্তরাত্মার স্ফূর্তি এবং তার ফুল আনন্দ। এককথায় সাহিত্য সৃষ্টি জীবাত্মার লীলামাত্র, এবং সে লীলা বিশ্বলীলার অন্তর্ভূত।" তিনি খেলা শব্দটি লীলা শব্দের সঙ্গে অভিন্ন অর্থে ব্যবহার করেছেন। রবীন্দ্রনাথ বলেছেনঃ " খেলার বৃত্তি আর প্রয়োজন সাধনের বৃত্তি মূলে একই সেইজন্যে খেলার মধ্যে জীবন যাত্রার নকল এসে পড়ে। কুকুরের জীবনযাত্রায় যে লড়াইয়ের প্রয়োজন আছে , দুই কুকুরের খেলার মধ্যে তারই নকল দেখতে পাই।" রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতে সাহিত্যে জীবন ব্যবসায়ের নকল আমরা করে থাকি একথায় তাঁর সায় নেই। এ হল বিশুদ্ধ আনন্দ রূপের প্রকাশ।
তবে সবসময়ই যে শিল্পে বিশুদ্ধ আনন্দ রূপেরই প্রকাশ ঘটে তেমনটা না-ও হতে পারে। উদাহরণ হিসেবে আমরা যদি লাস্ট সাপার ছবিটির কথাই ধরি একে তো আর আনন্দ রূপ বলা চলে না, গোইয়ার ছবিতে আমরা দেখি বীভৎস রসের ছড়াছড়ি, সালভাদোর দালির ছবিতেও কিছু কিছু বীভৎসতা লক্ষ করা যায়। প্রকাশ কর্মকারের আঁকা কিছু ছবিতেও এই বীভৎসতা ফুটে উঠতে দেখা যায় অথবা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের "দুই বিঘা জমি" কবিতাটিকেও কি আনন্দ রূপ বলবো! আবার আল মাহমুদের সোনালি কাবিন কাব্যগ্রন্থের সব লেখাতেই অংশত আনন্দ রূপের প্রকাশ। কবি অনির্বাণ মুখোপাধ্যায়ের "শাক্ত চতুর্দশপদী" কাব্যগ্রন্থের ত্রিশ সংখ্যক কবিতায় পাই " তোমাতে ব্যাপৃত হবে, খড় মাটি কাঠামোর চেয়ে / আরো দূর রূপ ছেনে, শ্রীময়ীর সুঠাম গড়নে/ তুমি কি আসিবে মা গো, ঝাঁপি ভরা সুখস্বপ্ন সনে "। এখানেও মূর্ত বিমূর্তর মিশেলে গড়ে ওঠে এক অদ্বিতীয়া রূপ। ভাবতে অবাকই লাগে কালো কালী রূপের আরাধনার কথা ঘোর অমাবস্যার রাতেই ভাবা হয়েছে। নিচে শুয়ে শ্বেতশুভ্র ভোলানাথ। এ এক অনুপম মূর্তি বিমূর্ত কাঠামোর ভেতর। তাই তো সাধক রামপ্রসাদ গেয়েছেন " মনের ভ্রমে মাটি দিয়ে মায়ের মূর্তি গড়াতে চাই। " আসলে শিল্প ব্যাপারটাই মনের ভেতরে গড়ে ওঠা এক অনির্বচনীয় আদল। যার কোনো ব্যাখ্যাই হয় না। কেবল রস আস্বাদন হয়।

ঝরঝরে গদ্য। এমন গদ্য পড়লে স্বচ্ছতার দিকে চলে যায় মন। ভাল লাগল রাজীব।
উত্তরমুছুনঝরঝরে গদ্য। এমন গদ্য পড়লে স্বচ্ছতার দিকে চলে যায় মন। ভাল লাগল রাজীব।
উত্তরমুছুন