শনিবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২১

সম্পাদকের কথা


 এখন হেমন্ত। শরৎ এল। কিন্তু বর্ষা তাকে কোথায় যে কিক করল খুঁজে পাওয়া গেল না। শুধুমাত্র সাহিত্য পত্রিকাগুলির শরৎকালীন পুজোসংখ্যা প্রকাশিত হতে দেখে মনে পড়ল তিনি এসেছেন। যদিও অন্ধের সহ্যশক্তি অনেক বেশি। তাই আমরা আবহাওয়ার কবলে শান্ত থেকে আরও শান্ততর হয়ে গেছি। যদিও এটা কবি জীবনানন্দের কাল। হেমন্তের রিক্ত মাঠ ধূসর খড় যেভাবে তাঁর হৃদয়ের শূন্যতাকে প্রকাশসক্ষম করে তুলেছিল তাতে  রবীন্দ্র সংগীতে কিঞ্চিত স্থান পাওয়ার দুঃখ হেমন্তের গেছে। শিশিরের শব্দের মতো সন্ধ্যার আগমনের এই সূচনা। কিন্তু সাধ্যকে আরোগ্য করে সেই সন্ধ্যার দীন সম্বর্ধনা এখনও আমার চেতনায় আঘাত করল না। অতিবাস্তবতা বাস্তবই তো! কবিতার বহুল পঙক্তিকে অধিকতর বাস্তবতায় মিলিয়ে দেবার জন্য পথে নেমেছিলাম। প্রসঙ্গের পূর্বাপর সমারোহ কেমন মিলেও যাচ্ছিল। কিন্তু আটকে গেল শিশিরের শব্দে।  নীরবে একদিন প্রেম আসার মতো। এখন তো বুকে চাপ চাপ অন্ধকার। বিদিশার নয়। খাঁটি বাংলার। ফলে কাল ঋতু সব গুলিয়ে যাচ্ছে। শুনতে পাচ্ছি হেমন্তে কোন বসন্তেরই বাণী। তবে মাঝখানে অতলান্তিকের মতো শীত শুয়ে আছে। তার রঙের জোব্বায় নানান প্রলোভন। উৎসবের এই তো শুরু। সেই সব উৎসবের ফাঁকে ফাঁকে এবারে বরং আসুন বাংলার প্রত্যন্ত গ্রামে গ্রামে খোঁজ করি কিশোরীর চালধোয়া ভিজে হাতটির, যথার্থ শীতহাতখানির...

মুক্ত গদ্য ।। সায়ন রায়


 

এলোমেলো বায়ু বয়, ছন্নছাড়া সমুদ্র উত্তাল


After great pain, a formal feeling comes—

The Nerves sit ceremonious, like Tombs—

The stiff Heart questions was it He, that bore,

And, Yesterday,  or Centuries before ? 


The Feet, mechanical, go round—

Of Ground, or Air, or Ought—

A Wooden way

Regardless grown,

A Quartz contentment, like a stone—


This is the Hour of Lead—

Remembered, if outlived,

As Freezing persons, recollect the Snow—

First—Chill—then Stupor—then the letting go—

[After Great Pain, a Formal Feeling Comes—Emily Dickinson ]



একটা অসম্ভব আর অবাস্তব তাড়া করে ফিরছে।তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে চিন্তার জগৎ। বেদনার গাছ হতে ফুল ঝরে পড়ছে টুপটাপ।আমি শিশিরের শব্দ একটা একটা করে তুলে রাখছি সুদৃশ্য  বয়ামে।ভাবছি কার্যকারণ সূত্র।নাকি সবটাই মনের ভুল।এক উদভ্রান্ত এলোমেলো দুর্বার খামখেয়াল। দারুণ কাব্যিক, কিছুটা দার্শনিকও।ঝড় উঠেছে পশ্চিমাকাশে।পাগলপারা এই মরুঝড়ে সব ঝাপসা। আঁধিয়ার। আধঘন্টাটাক এই ঝড়ের পর আশ্চর্য বদলে গেল দৃশ্যপট।বালিপাহাড়ের নতুন রূপ, নতুন গঠনে জগৎ নতুন করে আবিষ্কৃত হচ্ছে।হারিয়ে যাচ্ছে স্মৃতি।চেতনার নব নব বিস্ফার। আশ্চর্য ! আগের আমি আর নতুন আমি দুটো আলাদা মানুষ।ভিন্ন দুই সত্তা। 

~~

যোসেফ থিওদোর কনরাড করজেনিওস্কি,জন্ম ১৮৫৭,ইউক্রেনে এক পোলিশ পরিবারে,যিনি পরবর্তীকালে ইংরেজিতে গল্প,উপন্যাস লিখে আধুনিক ইংরেজি সাহিত্যকে মারাত্মক ভাবে প্রভাবিত করবেন,যার একটি নমুনা : সম্পাদক-কবি এজরা পাউন্ড এলিয়ট-এর যুগান্তকারী 'দ্য ওয়েস্টল্যান্ড'(১৯২২) কবিতাটির প্রায় অর্ধেক বাদ দিয়ে দেন।তিনি জানিয়েছিলেন তিনি সেই ধাই-মা যে কনরাডের 'হার্ট অফ ডার্কনেস'(১৯০২) থেকে 'দ্য ওয়েস্টল্যান্ড'-এর নাটাল কর্ডটিকে ছিন্ন করেন।আরেকটি গল্প : জাহাজে করে যাচ্ছিলেন ব্রিটিশ ঔপন্যাসিক উইলিয়াম গোল্ডিং,যার বিখ্যাত উপন্যাস 'লর্ড অফ দ্য ফ্লাইস' (১৯৫৪), নোবেল পুরস্কার পান ১৯৮৩ সালে, একটি বই বারবার পড়তে পড়তে একসময় তিনি সেটি জলে ফেলে দিলেন।বইটি ছিল কনরাডের 'হার্ট অফ ডার্কনেস'।পরে জানিয়েছিলেন বইটি তাকে এতটাই আচ্ছন্ন করে ফেলছিল যে তার মনে হয়েছিল যে তিনি নিজে আর কিছু লিখতে পারবেন না।কুড়ি বছর বয়সে নিজের বুকে রিভালবার ঠেকিয়ে যোসেফ কনরাড আত্মহত্যার চেষ্টা করেন।অদ্ভুতভাবে গুলিটি শরীরের অভ্যন্তরের কোনো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গকে আহত না করেই বেরিয়ে যায়। বেঁচে যান তিনি।তার মনে হয়, হয়তো তার কিছু করার আছে। একুশ বছর বয়সে ইংরেজি শেখা শুরু করেন।ইংরেজি সাহিত্যপ্রীতির কারণ  সম্ভবত ছোটবেলায় পড়া শেক্সপিয়রের অনুবাদ।

~~

কোথায় যাব ? কোথায় কোথায় খুঁজবো আমার হারিয়ে যাওয়া সাইকেল। একটা তপ্ত দুপুর কাটিয়েছি একা।এই অস্থিরতা আমায় কোথায় নিয়ে ফেলবে ? বিকেলের দিকে কিছু প্রশমণ। ঠান্ডা হাওয়া নেমে আসছে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে।অল্প অল্প শীত।আষ্টেপৃষ্টে চাদরটাকে জড়িয়ে নিই। ওটুকুই ওম। ভালবাসা। কিছুপরই কুয়াশা জড়িয়ে অন্ধকার নেমে আসবে পৃথিবীর বুকে। নিজেরই পদক্ষেপ হয়ে যাবে অস্পষ্ট, অচেনা। ঠাহর করে করে পাকদণ্ডি বেয়ে কীভাবে ফিরবো,কখন ফিরবো নিজের ঘর ? নিজেরই কি ঘর ? প্রশ্ন জাগে, প্রশ্ন জাগে আজীবন। আর কিছু থাক বা না থাক, আর কিছু পাই বা না পাই ওই প্রশ্ন কটি থেকে যাবে। কখনও দুরন্ত দুর্বার পাগল ঝাপট।কখনও মৃদু মৃদু উষ্ণ ওম। থেকে যাবে আমৃত্যু। মৃত্যুর পরও। থেকে যাবে আমাকে ঘিরে। আবছা ছায়ার মত, জালের মত। দূরপ্রসারী। 

~~

মৃত্যুর পর স্বীকৃতি পেলেন পল গগ্যা(১৮৪৮-১৯০৩)। এ ব্যাপারে সহায়ক হয়েছিল প্রখ্যাত আর্ট ডিলার অ্যামবোয়েজ ভোলা (Ambroise Vollard)-র উদ্যোগে প্যারিসে অনুষ্ঠিত দুটি মৃত্যু পরবর্তী প্রদর্শনী। জীবনের শেষ দশবছর কাটিয়েছিলেন তাহিতি সহ ফ্রান্স অধিকৃত প্রশান্ত মহাসাগরের বুকের ছোট দ্বীপগুলিতে।প্যারিসে ফেরেননি।মারা যান অ্যাটুয়ানায়। এখানেই তাকে সমাধিস্থ করা হয়।  পোস্ট-ইম্প্রেশনিস্ট গগ্যা তার সমসাময়িক ইম্প্রেশনিস্ট শিল্পীদের সীমাবদ্ধতাকে পেরিয়ে দৃপ্ত রঙের ব্যবহার, চড়া বৈপরীত্য, অতিরিক্ত শরীরি ভঙ্গি নিয়ে এগিয়ে গেলেন সিম্বলিসমের দিকে।যা প্রভাবিত করলো পরবর্তী শিল্পীদের। আক্রান্ত হলেন পাবলো পিকাসো, হেনরি মাতিস।প্যারিস শহরে একজন সফল ও ধনী স্টকব্রোকার, পাঁচ সন্তানের জনক গগ্যা পঁচিশ বছর বয়সে ছবি আঁকা শুরু করলেন।বন্ধুশিল্পী পিসারোর তত্ত্বাবধানে চলতে থাকলো তার আঁকাআঁকি।পরবর্তীতে এই বন্ধুর সাথেও বিচ্ছেদ হয়ে যায়। স্বশিক্ষিত এই শিল্পী ছত্রিশ বছর বয়সে ঠিক করলেন ব্যবসা,পরিবার সব কিছু ছেড়ে পূর্ণসময়ের শিল্পী হবেন। বেঁচেছিলেন মাত্র পঞ্চান্ন বছর।

~~

এই গ্রহ তার রূপ রস গন্ধ স্পর্শ দিয়ে বেঁধেছে আমাকে।তবু..তবু..। এলোমেলো হয়ে যায় বাগিচার ফুল। ঝরা পাতা। অচেনা অজানা কোনও মহাজাগতিক রশ্মি যেন। কোনও এক সুর। সহস্র আলোকবর্ষ দূরে কোনও ক্ষুদ্র গ্রহে বসে  ক্ল্যারিওনেট বাজাচ্ছে কেউ। তার সুর ঢেউ হয়ে, আলো হয়ে, জোছনার ঘ্রাণ হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে দিগবিদিক। সেইসব মধু। কী লাবণ্য! সাধ হয় স্বাদ নিতে। পাথর চুঁয়ে ফোঁটায় ফোঁটায় জমা হচ্ছে জল পাহাড়ের খাঁজে।কত প্রাচীন সময়ের আলো মিশে আছে ওই জলে। নৈর্ব্যক্তিক। মুক্তোর কণা চোখে মুখে গলায় মাথায়। জলের রশিতে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলছে কেউ। সূর্য উঠছে ! সূর্য উঠছে ! 

~~

১৯২৭ সালে জার্মান পদার্থ বিজ্ঞানী হাইজেনবার্গ প্রকাশ করলেন তার যুগান্তকারী 'অনিশ্চয়তা সূত্র' (theory of uncertainty)। ভেঙে পড়লো এতদিনকার সযত্নলালিত ইমারত। বিজ্ঞানের জগতে।দর্শনের জগতেও। বদলে গেল ভাবনাচিন্তার দুনিয়া। নিউটনের গতিসূত্রে আস্থা রেখে এতদিন পর্যন্ত আমাদের বিশ্বাস অটুট ছিল কার্যকারণতত্ত্বে।এই মহাবিশ্বে সকল বস্তুর অবস্থান ও গতিবেগ নির্ধারিত হচ্ছে তার পূর্বের অবস্থান ও গতিবেগ দ্বারা।শুধু জড় বস্তু নয় জীবের ক্ষেত্রেও একই কথা সত্য। কারণ জীবদেহও তো বস্তুকণা দিয়ে তৈরি। আর সেই বস্তুকণাও একই নিয়মের অধীন।এই মহাবিশ্ব কাজ করে চলেছে একটি যন্ত্রের মত, তার আচরণে স্বাধীন ইচ্ছের কোনও স্থান নেই। এ এক অমোঘ নিয়তিবাদ। সবকিছুই পূর্বনির্ধারিত। হাইজেনবার্গ তার 'অনিশ্চয়তা সূত্র'-এ দেখালেন অস্তিত্বের সূক্ষ্মতম উপাদান ইলেকট্রনের প্রকৃতি চরিত্রগতভাবে এলোপাথাড়ি/খামখেয়ালি ।সেখানে কার্যকারণসূত্র খাটে না। একটা পরমাণুর নিউক্লিয়াসকে ঘিরে ঘূর্ণায়মান ইলেকট্রন কখন কোন অরবিটে থাকবে, তার অবস্থান অনির্ণেয়। শুধু সম্ভাবনাটুকুই ব্যক্ত করা যেতে পারে। 

~~

কী সেই গূঢ় সম্ভাবনা ?  কী সেই আশ্চর্য উদ্ধার ? আজ সারারাত ধরে উল্কাপাত। আজ সারারাত বিষাদ প্লাবন।কোন সে জ্ঞান ? কী সেই মধু ? আজ হাওয়ার নাচন।দুরুদুরু বক্ষে পথ চাওয়া...


ছবি : বিধান দেব 





আবহবিকার ।। রাজদীপ রায়

                                    
                               দ্বিতীয় পর্ব

 এই মন সেই মন ও রেলগাড়ি ঠাকুর



--তোর ঘরে কে থাকে?

--আমি আর আমার মন থাকে। 


রতন পাগলাকে পাড়ার লোকে এই একটা কথা বললে সে ওই একটিই উত্তর দিত। বাকি অন্য কথা বলে রাগানোর চেষ্টা করলেও সে কোনও রা-কাড়ত না। এই রতন তোর প্যান্ট ছেঁড়া! রতন চুপ। এই রতন তোর মাথায় উকুন! রতন চুপ। এমনকি কাগজ ছুঁড়ে মারলেও কোনো প্রতিধ্বনি হত না। তাই উপায় না-দেখে তারা সেই প্রশ্নই করতে বাধ্য হত, যা-করলে উত্তর আসে। রতন কথা বলে। একটাও কথা না-বলে সবাইকে এক পথে নিয়ে এসেছিল ওই পাগল। মাঝেমধ্যে গান গাইত: তোমার ভুবনে মা গো এত পাপ...। মোড়ের জটলা তাকিয়ে দেখত উসখোখুসকো চুলের মাথা এগিয়ে যাচ্ছে। উত্তর থেকে দক্ষিণে। এই রতন কোথা থেকে এসেছিল কেউ জানত না। ওর সম্পর্কে কতরকম জনশ্রুতি! কে বলল ওর বউ অন্য কোনো পুরুষের সঙ্গে চলে গেছে, তারপর থেকেই ওর মাথা খারাপ। আর একজন বলে ব্রিলিয়াণ্ট ছাত্র ছিল রতন, হাওড়া জেলা স্কুলে স্ট্যান্ড করত; বেশি পড়াশুনোর জন্যেই এটা হয়েছে। এ-কারণেই বেশি পড়তে নেই। মাথার স্ক্রু ঢিলে হয়ে যায়। পাশের পাড়া থেকে চা-খেতে আসা ব্রজবাবু বললেন ওসব কিছু নয়, রতন খুব বড় ষড়যন্ত্রের শিকার। ওর সত্‍-মা আর তার ছেলে মিলে নাকি ওকে বাড়ি থেকে তাড়িয়েছে। ভাল বংশের ছেলে তো, সহ্য করতে পারেনি। কারোর থেকে কোনদিনও পয়সা চাইত না-বলেই যেন কেউ-কেউ কারুণ্যবসত কিছু ফেলে দিত তার ঝোলায়। কপাল ভাল থাকলে জুটে যেত এক-ভাঁড় চা, দুটো বিস্কুট। এই ঘটনা ঘটত সেইদিনই, যেদিন বাবলুদা থাকত। একমাত্র বাবলুদাই ওর সঙ্গে কথা বলবার চেষ্টা করে যেত। একদিন সেই নানাবিধ প্রশ্নের মধ্যে ‘তোর ঘরে কে থাকে?’ শুনে ঘাড় ফেরায় রতন। চোখে যেন কিসের ব্যাকুলতা। ‘আমি আর আমার মন’ সেই প্রথম বলা হয়েছিল কি? সে তথ্য কেউ যত্নে তুলে রাখেনি। শুধু এই তথ্য রয়ে গেছে উত্তর-পশ্চিম পাড়ায়—স্মৃতিকণ্ঠ কোনও কোনও পুরুষের গোপন খেয়ালে।  বাবলুদাও পাগল হয়ে গিয়েছিল। ছাঁট মাংস কিনে এনে ছাদে ছড়িয়ে রাখত। আর আকাশে কালশিটে ফেলে নেমে আসত অতিকায় সব চিল। পাশের গেরস্ত দেখত তাদের বাড়িতে তাদের ডানার ছায়া যেন কোন অনির্দিষ্টপূর্ব, অশনি-সংকেতকে বিশেষিত করে। এই নিয়ে অনেকবার অভিযোগ জানানো হয়, কিন্তু পিতৃমাতৃহীন বাবলুদার ওসব কথা বোঝবার মতো চেতনা অবশিষ্ট ছিল না। সেই বাবলুদা একদিন বিষ খেয়ে ছাদেই আত্মহত্যা করেছিল। সেদিন একটু বেশিই চিল নেমে এসেছিল ছাদে। সঙ্গে অগুনতি কাক। বাবলুদার মাংস চিল-কাকের ঠোঁট থেকে ছিটকে পড়েছিল কারোর-কারোর বাড়িতে। তুমুল হৈ-চৈ বেঁধে যায় তাই নিয়ে। পুলিশ এসে ছাদে মৃতদেহ সনাক্ত করে। সে প্রায় বছর তিরিশের আগের কথা। কী আশ্চর্য! এখনো যদি চিল আসে আমাদের পাড়ায়, চক্কর কাটে উত্তর-পশ্চিম পাড়ার লোহাচুর-আকীর্ণ-আকাশে, তাহলে ওই ছাদেই তারা জিরোতে বসে। আজও কি তাদের নাকে কোনো অকালমৃত যুবকের থেমে যাওয়া মেরুদণ্ডের গন্ধ ভেসে আসে? এই ভূতের বাড়ির পাশ দিয়ে কিছুটা জোরে হেঁটে দোকানে যাওয়া লোক সেই খবর রাখে না। তার মাথায় আরেকটি তথ্য কাজ করে—এই বাবলুর মৃত্যুর কুড়ি-বাইশ বছর আগে তার বাবাও আত্মহত্যা করেছিল। পাখা থেকে ঝুলে। অনেক দেনা হয়ে গিয়েছিল বাজারে।  সবচেয়ে দুঃখের কথা এই সমস্ত ঘটনা যিনি সামনে থেকে দেখেছিলেন, তিনি জেঠিমা। তাকে একা থাকতে হয়েছিল আরো কিছুদিন। জোত্‍স্নায় আপ্লুত কোনো নিস্তব্ধ রাতে মানুষজন যখন খেয়ে-দেয়ে ঘুমোতে যায় বা ঘুমিয়ে-ঘুমিয়ে পুরাণজগতে ফিরে যায়, সেইসময়ে ছাদে উঠে কেউ পায়েচারি করে। একমাথা চুল ওড়ে অনির্দিষ্ট ভবিষ্যতের দিকে। রূপোলি চিল-শকুনেরা নেমে আসে হিম-পড়ার গন্ধে।


ভূতের আবহ ছিল এখানে-সেখানে। ছোটবেলায় বাড়ির মধ্যে যে ছোট্ট বাগান ছিল, তা যে নেহাত্‍ই ছোট, পরে সেই নিয়ে সন্দেহ থাকেনি। জবাগাছ, টগরগাছ, শিউলিগাছ, ফলসাগাছ, আরো কত গাছ। একটা পেয়ারাগাছ ছিল, লম্বাটে পেয়ারা দিত। পরে ঘর-দোর বাড়াতে গিয়ে কাটা পড়ে যায়। সেই শোক দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে। এখনো সেই গাছের কথা অবচেতনে ঘুরে-ফিরে আসে। এখনো আমি বিশ্বাস করি তার দীর্ঘশ্বাস শোনা যায় কান পাতলে। এই পেয়ারাগাছটাই ছিল ওই ছোট্ট বাগানের মুখোপাত। একেবারে শেষ মাথায় ছিল শিউলিগাছটা। খুবই শুয়োপোকা হত। ওর তলায় দাঁড়ানো নিষেধ ছিল। আর একটা কারণ, শিউলি গাছটাই আমাদের বাড়ির সীমানা, আর তার ওপারের রহস্যময় বাড়ি। ওখানে নাকি জলাজমি ছিল, ডাকাতি করে টেনে নিয়ে গিয়ে খুন করা হত। তাই ও জায়গাটা ভাল নয়। হাওয়া-বাতাস লাগে। এরকম আরো বেশ কিছু রাস্তা ছিল পাড়ায়। আমরা খেলতে যেতাম এ-পাড়া থেকে অন্য পাড়ায়। বড় রাস্তায় ভিড় বেশি বলে গলি ব্যবহার করেই কত দূর পর্যন্ত চলে যেতাম। যারা ঘুড়ি ওড়াত, তাদের সমস্ত গলিপথ মুখস্থ ছিল। তারা গাইড করে দিত কখনো-কখনো। কিন্তু কোনো-কোনো পথে অঘোষিত ভয় ছিল। আমার সঙ্গে কে থাকে? আমার মন থাকে। সেই মন দেখত, কলকারখানার আওয়াজ ঝিমিয়ে-আসা দুপুরে এখানে-ওখানে অন্ধকার জমেছে। অদৃশ্য বিপদ দাঁড়িয়ে। তাকে কিছুতেই এড়ানো যাবে না। যখন এই পাড়াটাই জলাজমি ছিল, পানবরজ। শেয়াল ঘুরে বেড়াত। একবার রাস্তায় অহিনমামা দেখেছিল শেয়াল মুখে করে কী একটা নিয়ে যাবার চেষ্টা করছে। কাটা মুন্ডু! সাত দিন মামা কিছু খায়নি। খেলেই বমি আসত। এর কয়েক মাস পর শিরোসিস অফ লিভারে আক্রান্ত হয়ে মামা মারা যায়। হাওড়ার শিল্পাঞ্চলে পাঁচশো টাকার জন্যেও কখনো খুন হয়। লাশ গুম হয়ে যায় মাটির ভেতরে। অতৃপ্ত মন নিয়ে আত্মারা ঘুরে বেড়ায়, লোহাচুরের ঘ্রাণে, ইছাপুরের রোস্টেড-বাতাসে। 


পানবরজ ভর্তি একটা জলাজমি ক্রমশ তার জৌলুস হারিয়ে বদলে গেল সাধারণ বসতিপূর্ণ অঞ্চলে। সেই পান ফিরে এসেছিল যৌথ পরিবারের অংশীদার হয়ে। আমাদের বাড়িতেও ডাবর থাকত। তার মধ্যে ঠাকুমা তার সাত ছেলের জন্যে দু-বেলা পান সেজে রাখত। কখনোই ডাবর ফাঁকা হত না। এই ডাবর যেন একটি বাড়ির ভরকেন্দ্র, এক অনন্ত ব্রহ্মাণ্ডস্বরূপ। আর ঠাকুমা অতিকায় হাত দিয়ে সেই ব্রহ্মাণ্ড থেকে পান তুলে, তার সাত ছেলের মুখে গুঁজে দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিচ্ছেন--এই দৃশ্য আমি মনে-মনে কতবার কল্পনা করেছি।  ঠাকুমার প্রয়াণের বেশ কিছুদিন পরেও এই রেওয়াজ প্রচলিত ছিল। শুধু ওই ঘরে পান খেতে যাওয়া নয়, পান খাবার অছিলায় বৃদ্ধা মায়ের সঙ্গে গল্প করা, তার আবদার মেটানো। একসময় মনে হয়, ঠাকুমার মৃত্যুর পর ওই ঘরে ঢুকে ডাবর থেকে পান তুলে খাবার সময় বাবা কার সঙ্গে কথা বলত? কার সঙ্গে আবার, নিজের মনের সঙ্গে। ছোটবেলায় আমি জগন্নাথদেবকে প্রায়ই দেখতে পেতাম। বিশেষত সন্ধের সময় এবং অবশ্যই ঘরে একা থাকলে। তখনও পুরী যাইনি কিন্তু জগন্নাথদেবকে চিনতাম ঠাকুমার ঘরেই টাঙানো ছবি দেখে। জগন্নাথ-সুভদ্রা-বলরাম। সবচেয়ে আকর্ষণ করত দেবতার চোখ। আমি ছোটবেলায় নাম দিয়েছিলাম রেলগাড়ি ঠাকুর। এখন, দেবতাকে প্রায়ই দেখতে পাওয়া বাড়ির বড়দের কাছে অন্য অর্থ নিয়ে আসে। তারা মনে করলেন ঠাকুর আমাকে তার কাছে ডাকছেন! ঠাকুমা মা-কে বলল বৌমা, তোমরা দেরি কোরো না। ঘুরে এসো শ্রীক্ষেত্রে। আমার তখন এসব বোঝবার বয়স ছিল না। পুরীর টিকিট কাটা হল এবং শুধু বাবা-মা-আমি নই, তিন পিসিমা, ঠাকুমাও আমাদের সঙ্গে গেল। পুরীতে গিয়ে প্রথম চাক্ষুস করি জগন্নাথদেবের মূর্তি। সেখান থেকে ফিরে আসবার পর নাকি আমি আর কোনোদিন ওই সন্ধের মুহূর্তে তাকে দেখার কথা কাউকে বলিনি। বাড়িতে সবাই এটাই বোঝান ঠাকুরের আমাকে দেখার ইচ্ছে হয়েছিল। পরে যখন এই ঘটনা কাউকে-কাউকে বলেছি, যুক্তিবাদী ঈশ্বর-সত্তায় অবিশ্বাসীরা বলেছেন ওটা তোমার হ্যালুসিনেশন। জগন্নাথদেবের মূর্তি, তার রূপ আমার মনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল, সেই থেকেই এই ঘটনা। এর মধ্যে কোনো অলৌকিকতা নেই। সেই সুদূরপরাহত কোনো বিকেলে কী ঘটেছিল, সময়ের সঙ্গে স্তরীভূত হয়ে যায়। তবে বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসী এই দু-ধরনের দৃষ্টিভঙ্গিই আমার সঙ্গে হওয়া এই ঘটনাকে ব্যাখ্যা করতে ব্যবহৃত হয়। দুটি পথ খুলে যায়, তাদের নিজস্ব আমন্ত্রণে। কিন্তু আমার মন ঠিক কী চেয়েছিল? কী দেখেছিল? সন্ধে হব-হব, আবছা জানলার ধুসর আলোয় জগন্নাথদেব দাঁড়িয়ে আমার দিকে তাকিয়ে। বিশ্বাসের সত্য না মনের মিথ্যে? তারপর থেকে অনেকবার পুরী গেছি। তাকে দেখতে পাইনি। দেখেছি রতন পাগলাকে। কীভাবে কোন জাদুবলে সে এইখানে এসে পড়ল, ভেবে অবাক হয়েছি। বিস্তীর্ণ বালিয়াড়িতে পা-ফেলে হাঁটতে-হাঁটতে সে গাইছে: তোমার ভুবনে মা গো এত পাপ...। আমি অবশ্য তাকে ডাকিনি। কেননা তার সঙ্গে কথা বলবার মন আমি অর্জন করতে পারিনি। তার সঙ্গে কথা একমাত্র বাবলুদাই বলতে পারত। কিই বা প্রশ্ন করতাম তাকে? তোমার ঘরে কে থাকে? সে-উত্তর কি আমি নিজে জানতে পেরেছি? এবার যদি কখনো রেলগাড়ি ঠাকুরের সঙ্গে দেখা হয়, তাহলে তাকেই জিজ্ঞেস করব। বলব আসুন, সমুদ্রের মুখোমুখি বসে দুটো মনকেমনের কথা বলি। 

                                                           ( ক্রমশ)

ছবি : বিধান দেব 







পাঠকের হাট ।। অরুণ পাঠক


 মহাশূন্য থেকে ধেয়ে আসা বিভূতি


[আমার কাব্যজ্ঞানের প্রারম্ভিক পর্যায় থেকেই দেখে আসছি অগ্রজ কবিরা তাঁদের বই অকাতরে উপহার দিচ্ছেন। মুখে তৃপ্তির হাসি দাতা ও গ্রহীতার। চার চোখে সমান আগ্রহ। আশে পাশে কৌতুহল। বয়সে অনেক ছোট হলেও বহু প্রতিষ্ঠিত বিদ্বান কবি অল্পবয়সী আমাকেও তাঁদের কাব্যগ্রন্থ উপহার দিয়েছেন। আমিও আমার কাব্যগ্রন্থ ঝোলা থেকে বের করে কাঁপা কাঁপা হাতে কোনও শ্রদ্ধেয় অথবা স্নেহভাজন কবিকে উপহার দিয়ে স্বর্গীয় তৃপ্তি উপলব্ধি করি। আজও কোনও অনুষ্ঠানে গেলে এই কাব্যগ্রন্থ দেওয়া-নেওয়ার একটি বিশেষ পর্ব অলিখিতভাবে সূচিভুক্ত থাকে। তার বাইরে ডাক বিভাগের মাধ্যমেও অনেক কবি তাঁদের কাব্যগ্রন্থ আমার ঠিকানায় পাঠান।
নবীন-প্রবীণ, পরিচিত-অপরিচিত সেইসব কবিদের কাব্যগ্রন্থ নিয়ে আমি এবার আমার অনুভবের দু-চার কথা বলতে চাইছি এখানে। তবে শুধু উপহার পাওয়া কাব্যগ্রন্থ নয় সেইসঙ্গে গাঁটের কড়ি খরচ করে যে অসংখ্য কাব্যগ্রন্থ আমি এযাবৎ কিনেছি সেইসব কাব্যগ্রন্থেরও কোনও কোনওটি এই আলোচনার উপলক্ষ্য হয়ে উঠতে পারে।]



প্রায় দুমাস আগে অতিমারীর সমস্ত ভয়কে জয় করে নীলোৎপল ও হরদার (কবি নীলোৎপল জানা ও কবি হরপ্রসাদ সাহু) আমন্ত্রণে মহিষাদলে আয়োজিত কাব্যগ্রন্থ মেলায় উপস্থিত হই। সেখানেই অনেক কাব্যগ্রন্থের সঙ্গে উপহার পাই কবি আনন্দরূপ নায়েক-এর " নৈঃশব্দ্য হে, হে আনন্দ !" কাব্যগ্রন্থখানি।
কাব্যগ্রন্থখানি bilingual. বাংলা এবং ইংরাজী এই দুই ভাষার মিশ্রসহাবস্থানে কবিতা, আলোচনা, কবি পরিচিতি সবই পাশাপাশি বিধৃত হয়েছে। আমি বাংলা অর্থাৎ মূল লেখাগুলিই পড়েছি এবং সেগুলি নিয়েই আমার অনুভব জানাব। এই মহাবিশ্বে প্রাণের উন্মেষ থেকে তার শেষ পরিণতি---- এই প্রবাহটুকু এই কাব্যগ্রন্থের মূল উপজীব্য বিষয়। মেধা, পাণ্ডিত্য, আত্মোপলব্ধি ও জীবন সম্পর্কে একধরনের আস্তিত্বিক উদারতা থাকলে তবেই এই বিশেষ বোধে বিচরণ করার সাহস জাগে। প্রবেশক কবিতায় আনন্দরূপ লিখেছেন---
" সিক্ত মৃত্তিকা থেকে জন্মেছে কোমল ভৈরব
এ জন্মের আনন্দরূপ,
সে কেবল আলো নয়..
করতল ভরে প্রাণ করি অমৃত।"
সত্তা সচ্চিদানন্দময়। সৎ, চিৎ ও আনন্দের এই সমূহতা আকাশ থেকে প্রাপ্ত। জগৎ ও জীবনের স্বরূপ তাই শেষাবধি আনন্দস্বরূপ। তাই প্রবেশক কবিতার শেষ স্তবকে কবি লিখেছেন---
"অক্ষর বিছিয়েছ সম্মুখে,
প্রাণিত অব্যয় জুড়ে শব্দ মায়াখেলা...
পথ হেঁটে চলেছি দূরে,
শ্মশান ছাপিয়ে উঠে আসছে আনন্দভৈরবী।"
লক্ষ্যনীয়, কবি কিন্তু প্রাণিত অব্যয় ( অপরিবর্তিত আত্মা) নিয়ে মায়াময় শব্দের সাম্রাজ্যে পথ হাঁটছেন এবং সেখান থেকে লক্ষ্য করছেন শ্মশান ছাপিয়ে উঠে আসা আনন্দভৈরবী। জগৎ ও জীবন সম্পর্কে কবির এই ইঙ্গিত আমাদের পৌঁছে দিতে চায় সেই ঔপনিষদিক সত্যে যেখান থেকে আমরা শিক্ষা পাই সুখ-দুঃখের ওপারে থাকা চৈতন্যময় এক আনন্দঘন অবস্থার। আর পৃষ্ঠা ওল্টালেই আমরা পেয়ে যাব তৈত্তিরীয় উপনিষদের তৃতীয় খণ্ড ভৃগুবল্লী-র ষষ্ঠ অধ্যায় থেকে উৎকলিত শ্লোক---
"আনন্দো ব্রহ্মেতি ব্যজানাৎ।
আনন্দাদ্ধেব খল্বিমানি ভূতানি জায়ন্তে।
আনন্দেন জাতানি জীবন্তি।
আনন্দং প্রয়ন্ত্যভিসংবিশম্ভীতি।"
এর অর্থ :

----আনন্দই ব্রহ্ম ইহা জানিলেন। কারণ আনন্দ হইতেই এই ভূতবর্গ জাত হয়, জাত হইয়া আনন্দের দ্বারা বর্ধিত হয় এবং অবশেষে আনন্দাভিমুখে প্রতিগমন করে ও আনন্দে বিলীন হয়।
                  ---স্বামী গম্ভীরানন্দ,
                   উপনিষদ গ্রন্থাবলী--১,উদ্বোধন কার্যালয়



এবার সূচি অন্তর্ভুক্ত কবিকৃতির আসল কারুকাজে প্রবেশ করব। আমরা জানি যে কোনও সৃষ্টিও আনন্দময়। তাই যেকোনও শিল্পকর্মের মতো কবিতাপাঠেও আমরা বিদ্যা-বুদ্ধি-জ্ঞান সবকিছু পাশে রেখে পেতে চাইব আনন্দ। যেকোনও কবিতা ততখানি সার্থক যতখানি তা ঐতিহ্যকে ধারণ করেও সমকালীন। সমকালীনতা কোনও বিচ্ছিন্ন সময় নয়। বরং তা অতীতের সমূহ বর্তমান। বর্তমান ভোগবাদী সময়ে তাই ওই নৈঃশব্দ্য আর আনন্দ একটা অন্যরকম ইশারা দেয় আমাদের। 'অপেক্ষা' কবিতায় কবি লিখেছেন ---
" রোজ ভোরে হাঁটতে বেরোই। /অই আমার ঘুমঘোর-গভীরে বেজেছে যে গান, সে গান / সঙ্গেই থাকে।"
গান নামাঙ্কিত পাঁচ পর্বের একটি সিরিজ কবিতা আমরা পরেও পাব। কিন্তু এখানেই স্পষ্ট হল 'ঘুমঘোর-গভীরে' বাজা গান আমাদের সচেতন মুহূর্তের সর্বক্ষণের সঙ্গী। কিন্তু এই গানের সচেতন উপলব্ধি সবার থাকে না। কবি সেটা উপলব্ধি করছেন এবং তা বলছেন।  এবং তিনি আরও লিখেছিলেন---
" এ পথেই রোজ দেখা হয় তাঁর সাথে। প্রায়শই হেসে বলেন, কুশল তো?" আর  কবিতার শেষে আমরা দেখব কবিকথিত এই চরিত্রটি আরও পরিষ্কার----
" এখনও বুঝিনি যে, আমার চেয়ে কত ভোরে ওঠেন আমার ঈশ্বর"। কবিকে যদি আমরা সত্যবাদী বলে মনে করি তাহলে এখানেই স্পষ্ট হয়ে যায় তথাকথিত কিছু প্রগতিশীল প্রদত্ত ঈশ্বরের অবস্থান। যদিও গান। গানের ওই সুপ্ত গতিধারা যা আমাদের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রবাহিত এমনকী জন্ম জন্মান্তরে প্রবাহিত সেই সাংগীতিক বিমূর্তিই আমাদের সত্তাকে সংবহ করেন। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন---
" যবে কাজ করি
            প্রভু মোরে দেন মান।
যবে গান করি
             ভালোবাসে ভগবান।।
                               ( লেখন ৫২)
ঈশ্বরের এই ভালোবাসাই সম্পদ আমাদের। কিন্তু কী এই গান? কীভাবেই বা গাইব? কবি আনন্দরূপ লিখেছেন---
" আমি তো শিখিনি এই সুর, তবু্ও বেজে উঠি বারংবার।" ( সুর ) আর এই বেজে ওঠা কী?
তারও সন্ধান কবি দেন----
" এই সত্য, বেজে ওঠা শব্দ হয়ে।"( সুর)
আমরা পেয়ে গেলাম আত্ম-মীমাংশার সারবস্তু সেই সত্যকে যে প্রসঙ্গে পরমপুরুষ শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণদেব বলেছিলেন--- কলিযুগের সাধনা হল সত্যের সাধনা।




উপনিষদের অতীতকে কবি এখানেই করে তোলেন সমকালীন। চূড়ান্ত ভোগবাদী এই সভ্যতায় কবির এই নিরাভরণের দিকে যাত্রা আমাদের মনে পড়ায় বৈদিক যুগের যদৃচ্ছ ভোগবাসনা থেকে মানুষকে কীভাবে ত্যাগের দিকে দৃষ্টি ফেরাতে সাহায্য করেছিল উপনিষদসমূহ। আর বেদের সুউচ্চ মর্মকে মস্তকে রেখেও কীভাবে উপনিষদ কথিত ব্রহ্মবাদকে হৃদয়ে স্থান দিয়েছিল সেকালের ভারত।
" নির্জন ঘুমঘোরে এ যাবৎ স্থাবর অস্থাবর বন্ধক রেখে ঘাটে এসে / দাঁড়ায় একজন..." ( ধ্বনি)


আর তারপরই তার পক্ষে উপলব্ধি করা সম্ভব---
"...গানের ওপারে একটি বাড়ি ছিল। বাড়িটির নাম রূপকথা।"( গান)
তারও পর---
" মহাশূন্য থেকে ধেয়ে আসা বিভূতি খসে খসে পড়ছে দেহসমগ্রে।"( গান)
পার্থিব জড়বস্তুর মোহ ঘুচলে তবেই এই বিভূতির দেখা মেলে। কবি মণীন্দ্র গুপ্ত  তাঁর বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় স্মারক বক্তৃতা ১৯৯২- এ বলেছেন---
" গভীরভাবে  বাঁচতে হলে হালকা, বাহুল্যবর্জিত, উপকরণহীন হয়ে বাঁচতে হবে আজকাল এই কথাটাই  কেবল মনে হয়। প্রথম থেকেই মূল্যহীনকে না জমানো এবং শেষে মূল্যবানকে ছেড়ে চলে যাওয়া--- এই পথেই মুক্তি। কিন্তু ঘরবাড়ি অর্থাৎ ভোগ্যপণ্যে ঠাসা তার নিশ্ছিদ্র কংক্রিটের কুঠুরিটি নিয়ে আজকাল মানুষ বড় বিভোর ও বিব্রত। প্রাণের অনেকখানি ক্ষইয়ে দিয়েছে এই ঘর ও সরঞ্জাম-সভ্যতা।"( তাহারা অদ্ভুত লোক)।  'মূল্যহীনকে না জমানো এবং শেষে মূল্যবানকে ছেড়ে চলে যাওয়া'---- এই প্রকৃত মুক্তি পথের সন্ধান দেয় এই কাব্যগ্রন্থ। কবি লিখেছেন---
" যাব বলেই আজ ভীরু চোখ পশ্চাতে তাকাল। ... সামান্য তৈজসরাশি আর কিছু / অসামান্য বৈভব।"( ঐশ্বর্য )
তৈত্তিরীয় উপনিষদের শ্লোকাংশ কাব্যগ্রন্থটির মূল টিউন হলেও কাব্যে বিধৃত উনিশটি কবিতার মর্মমূলে রয়ে গেছে ঈশোপনিষদ কথিত সেই ব্রহ্মজিজ্ঞাসা। আকাশ-মৃত্তিকা ও সহউপকরণের সাহচর্যে সেই জ্যোতির্ময় পুরুষের সন্ধান, যা কবি সহস্রাব্দের ভেতর থেকে কুড়িয়ে নিয়েছেন।
এ কাব্যগ্রন্থ পাঠে আমরা বুঝতে পারি---
" ওঁ ঈশাবাস্যমিদং সর্বং
যৎকিঞ্চ জগত্যাং জগৎ।
তেন তক্তেন ভুঞ্জীথা
মা গৃধঃ কস্য স্বিদ্ধনম্।।১
অর্থাৎ,  পরিবরশীল এই জগতে সবকিছুরই ক্রমাগত পরিবর্তন হচ্ছে। তথাপি সবকিছু পরমেশ্বরের দ্বারা আবৃত। ত্যাগ অনুশীলন কর এবং সর্বভূতের চৈতন্যস্বরূপ আত্মায় দৃঢ়প্রতিষ্ঠ হও। অপরের ধনে লোভ করো না।(উপনিষদ প্রথম ভাগ, স্বামী লোকেশ্বরানন্দ, আনন্দ পাবলিশার্স)।

শুধু একটা কথাই বলব কাব্যগ্রন্থ এরূপ ভূমিকাসংবলিত পাঠক সহায়ক না হলেই কি হত না? কবির কাছে অহংকার শুধুমাত্র শব্দ-আকরিক। ব্যাখ্যা-শোধনাগার সেখানে নাই-বা থাকল। পাঠকের আত্মজ্ঞানের ওপর আরও একটু বিশ্বাস রাখা উচিত ছিল কবির। ২০১৯ সালে 'কবি বাসুদেব দেব সংসদ সম্মান' প্রাপ্ত এই কাব্যগ্রন্থের প্রত্যেকটি কবিতাই অত্যন্ত সহজ । বোধের অমন নিগূঢ় বার্তা লেখনীর গুণে সরস ও প্রাঞ্জল হয়ে উঠেছে। এরপর নৈঃশব্দ্য ও আনন্দ ছাড়া আর কোনও কথা হবে না।

নৈঃশব্দ্য হে, হে আনন্দ! ।। আনন্দরূপ নায়েক ।। ঋত প্রকাশন ।। দাম : ১২০ টাকা


ছবি : বিধান দেব 

                                                     ( ক্রমশ)


নয়া বৃহদারণ্যক ।। দেবাশিস দাশ


 

৪. আত্মতত্ত্ব


আদিতে ছিলেন আত্মা— নিউক্লিয় ঈশ্বর! 

মহাবিস্ফোরণে তাঁর জেগেছিল ভর। 

'পূর্ব'-কে 'ঔষৎ' করে ফেলার কারণে 

তিনিই 'পুরুষ'। প্রাকৃতিক সাইক্লোট্রনে 

চরাচরে ভরবাহী ঈশ্বর-কণিকা 

নক্ষত্র-শরীরে জ্বালে ভয়ঙ্কর শিখা।

কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াস তীব্র উষ্ণতায় 

পুরোবর্তী সব পাপ দগ্ধ হয়ে যায়।

একা অন্ধকারে তিনি ছিলেন শঙ্কিত

পরক্ষণে বুঝেছেন দ্বিতীয়বর্জিত 

তিনিই অসীম, শূন্যে কেউ নেই আর! 

সুতরাং ভয় নেই, ভয় নেই তাঁর। 

তবুও অপূর্ণ তিনি, আনন্দবিহীন

সীমা খুঁজে-খুঁজে একা কাটাতেন দিন।


আদিমৌল-নিউক্লিয়াসে নিউট্রনের ভর 

সংযোগ করলেন তিনি সূক্ষ্মতা-নির্ভর। 

'আমিই সে— সোহহমস্মি— স্বয়ং অহং,'

স্বেচ্ছায় হুঙ্কার ছেড়ে দ্বিগুণিত হন।

এক থেকে একাধিক হওয়ার পদ্ধতি 

আবিষ্কার করে তিনি পরমাণুব্রতী। 

লক্ষ-কোটি সূক্ষ্ম অতি দহন সংগ্রাম 

ভারী হাইড্রোজেন থেকে জাগে হিলিয়াম।


ক্রমে নাম-রূপান্তর— কেন্দ্রীণ-বিক্রিয়া 

মৌল-যৌগ অনুলিপি পদার্থ-দরিয়া। 

গোপনে একদিন প্রোটো-ক্লাস্টারের বনে 

ভুবন জন্মাল সৌর ধুলোর ঘূর্ণনে। 

তারপর মেঘ-বৃষ্টি টগবগে তরল 

মাধ্যাকর্ষ, ধাতুরতি, মা-মাটির কোল। 

ওপারিন, হলডেন, স্ট্যানলি মিলার...

কত ঋষি প্রাণতত্ত্ব করে আবিষ্কার।


অজৈব বিক্রিয়া থেকে জৈব-রসায়নে 

অযৌন জনন শুরু কোষ-বিভাজনে।

সৃষ্টিতে প্রবিষ্ট সত্তা— আত্মা নাম তাঁর 

সকল চাওয়ার শ্রেষ্ঠ, উপাস্য সবার। 

ছেলেমেয়ে, টাকাপয়সা সমস্ত বস্তুর 

ওপরে তিনিই প্রিয়তম সুমধুর। 

তিনি ধর্ম, তিনি সত্য, নিয়ম-শৃঙ্খল 

ন্যায়দণ্ডে বলীয়ান দুর্বলের বল।


স্ত্রী-পুরুষ বিজড়িত বেঢপ আকৃতি

আদ্যপ্রাণী রূপে তার অ্যামিবার রীতি। 

অসুন্দর কীট তিনি লার্ভার মতন 

তিনিই অচিরে সুশ্রী তিতলি-রূপী হন। 

গরু, ঘোড়া, ছাগ, পিঁপড়ে— সমস্ত মিথুনে 

তিনি পরিব্যাপ্ত হন স্ত্রী-পুরুষ গুণে। 

সবচে' উঁচু গাছ তিনি, তিনিই জিরাফ 

কোষকলা বেড়ে দীর্ঘ ডাইনোসর-মাপ। 

আবার ভাইরাসও তিনি, সূক্ষ্মতায় গড়া 

ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপে পড়েন কি ধরা? 

ডায়াটম নামে কভু এককোষী উদ্ভিদ 

বালুকা সিলিকা যার কঙ্কালের ভিত। 

বাস্তুতন্ত্রে তিনি সাম্য— জীব ও প্রকৃতি 

খাদ্য পিরামিডে তিনি সাংখ্য-পরিমিতি। 


প্রজাপতি ব্রহ্মা তিনি, হাত-মুখ মন্থনে 

অগ্নি সৃষ্টি করেছেন যজ্ঞের কারণে। 

তিনিই প্রকৃতি, অন্ন, সোম— সমুদয়

আর্দ্র কোষ তাঁরই রেত থেকে সৃষ্ট হয়। 

আবার পুরুষও তিনি— আগুন, অন্নাদ! 

রসালো অন্নের ভোক্তা,— ভোগ্যবস্তুবাদ— 

খাদ্য ও খাদকচক্রে অতিসৃষ্টিকথা 

যে বোঝে, সে মরদেহে অমর দেবতা।

       [প্রথম অধ্যায় চতুর্থ ব্রাহ্মণ অসমাপ্ত। ক্রমশ...]


ছবি : বিধান দেব 




ভিনদেশি তারা ।। অরিন্দম রায়


 

 গোয়েন্ডোলিন অ্যালবার্ট 
গোয়েন্ডোলিন  অ্যালবার্ট একজন  মানবাধিকার কর্মী। চেক প্রজাতন্ত্রের যেসব মহিলাকে তাঁদের অজান্তেই বন্ধ্যাকরণ করা হয়েছে তাঁদের জন্য তিনি লড়াই করছেন। লড়াই চালাচ্ছেন চেক প্রজাতন্ত্রের উদ্বাস্তু সমস্যা, পুলিশ ব্যবস্থায় সংস্কারের জন্য।  আদতে ক্যালিফোর্নিয়ার বাসিন্দা, ১৯৯৪ সাল থেকে চেক প্রজাতন্ত্রে বসবাসকারী। ইউসি বার্কলেতে লিঙ্গুইস্টিক নিয়ে পড়াশোনা করেছেন, প্রাগ এর চার্লস ইউনিভার্সিটির ফুল ব্রাইট স্কলার ছিলেন এই কবি। চেক থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন ব্রাডালা কেভ নামের একটি উপন্যাস। সাহিত্যের বেলাভূমির পাঠকের জন্য রইল তাঁর একটি কবিতা।

 

 

 

 




আফটারমাথের কবিতা

আমি ধুলো

আমি ধুলোয় আচ্ছাদিত

উল্টোনো বাড়িগুলি

আকাশ ঢেকে দেয়


আর কোনও ঈশ্বর নেই কিন্তু ঈশ্বরের 

নিরানব্বইটি সুন্দর নাম আছে

তাঁর দেবদূতদের ডানাগুলি ধুলো হয়ে গেছে

তাঁর আকাশ বাড়িতে ঢেকে গেছে


আমায় সিল করা হয়েছে

আমার মাথার উপরিভাগ সিল করা হয়েছে

আমার স্তনদুটি সিল করা, ঠিক যেমন আমার মুখ

আমার প্রত্যেক অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সিল করা আছে

আমার কোনও আকার নেই  আমি পড়তে পারি না

আমি লিখতে পারি না আমি একটা

ফাঁকা মুখবন্ধ খাম

ধুলোর চারপাশে


মৃত্যুর তারাগুলি  আমাদের মাথার উপরে

১৯৩৫ সালে তিনি লিখেছিলেন

আকাশের কান্না থেকে বোমা ঝরে পড়ছে আর বাড়িগুলির

কান্না থেকে ঝরে পড়ছে মুখবন্ধ খাম


আর কতগুলি শ্বাস আমাদের জন্য রাখা আছে?

আকাশে যতগুলো তারা ততগুলো?

মাটিতে যতগুলো মাইন পোঁতা আছে ততগুলো? কাচের স্লাইডে যতগুলো গুটিবীজ রাখা আছে ততগুলো?

 

এই ধুলোর মধ্যে দিয়ে নেওয়া প্রতিটি শ্বাস খুব মূল্যবান

একে আঁকড়ে ধরে রাখো 


                                               ( ক্রমশ)


জন্মের আগের মুখ ।। চন্দন মিত্র




জন্মের আগের মুখ : জেন তত্ত্ব ও জেন কোয়ানের অমায়িক ভুবন     

 

 

একাদশ পর্ব

লিন-চি/রিনজাই সম্প্রদায়

লিন-চি (জাপানি উচ্চারণে রিনজাই) সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা লিন-চি ই-শিউয়েন। তিনি ছিলেন বর্তমান চিনের শ্যানতং প্রদেশের তোংমিং অঞ্চলের বাসিন্দা। তিনি ৮৮৬ খ্রিস্টাব্দ বা তার পরের বছর মারা যান। তাঁর জন্মসাল নিশ্চিতভাবে জানা যায় না। তবে অনুমান  করা হয়, তিনি নবম শতাব্দীর প্রথম দশকেই জন্মগ্রহণ করেন। কৈশোরেই তিনি গৃহত্যাগ করে মঠে মঠে ঘুরে  বেড়ান। সূত্র মুখস্থ ও শাস্ত্র পাঠ করে করে বৌদ্ধমঠের বুদ্ধিবৃত্তিক শিক্ষার প্রতি তিনি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েন। একঘেয়ে জীবন থেকে মুক্তির আশায় তিনি এমন এক গুরুর সন্ধান  করতে থাকেন, যিনি নিতান্ত সূত্র ও শাস্ত্র কেন্দ্রিকতায় আবদ্ধ না-থেকে মুক্তির স্বচ্ছন্দ কোনও পথ বাতলে দেবেন। ঘুরতে ঘুরতে তিনি কুড়ি বছর বয়সে চিয়াংশি প্রদেশের নানচান অঞ্চলের হুয়াংপো পর্বতে পৌঁছান। সেখানে তিনি আচার্য শি-ইউয়েন-এর মঠে উপনীত হন। শি-ইউয়েন দীর্ঘদিন হুয়াংপো পর্বতে অবস্থান করার জন্য হুয়াংপো নামে খ্যাত হয়ে পড়েন, জাপানি উচ্চারণে ওবাকু। আমরা তাঁকে এই ওবাকু নামেই ডাকব। ওবাকু-র গুরু ছিলেন বাইজাং হুয়াইহাই (জাপানি উচ্চারণে হিয়াকুজো)। আবার হিয়াকুজো-র গুরু ছিলেন মাৎ-সু দাও-ই (জাপানি উচ্চারণে বাসো )।   

    ওবাকু-র মঠে লিন-চি তিনবছর কাটিয়ে দিলেন। মঠের কাজ ও মাঝেমধ্যে ধ্যান করা ছাড়া লিন-চি-র করার মতো আর কিছুই ছিল না। পড়াশোনা করা বা মুখস্থ করার প্রতি মোহ তাঁর  আগেই ঘুচে গেছিল। এই তিন বছরের মধ্যে একদিনের জন্যও তিনি আচার্যের মুখোমুখি হননি। বিষয়টা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছিলেন মঠের মুখ্য সন্ন্যাসী মুচো তাওমিং। তিনি একদিন লিন- চি-কে ডেকে কথাবার্তা শুরু করলেন।

মুচো— তোমার এই মঠে কতবছর হল ?

লিন-চি— তিন বছর।

মুচো— তুমি কি আমাদের আচার্যের কাছে কোনোদিন কিছু জানতে চেয়েছ ?

লিন-চি— তাঁর কাছে আমার কোনো জিজ্ঞাসা নিবেদন করা উচিত কিনা, তা নিয়ে আজও আমি মনস্থির করে উঠতে পারিনি।

মুচো— ঠিক আছে। তুমি তাঁর কাছে গিয়ে জানতে চাও বৌদ্ধধর্মের মূল শিক্ষাটি কী ?

    মুখ্য সন্ন্যাসীর কথামতো সমস্ত দ্বিধাদ্বন্দ্ব দূর করে লিন-চি চললেন, আচার্য ওবাকু-র কক্ষে। যথাবিহিত শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে লিন-চি বললেন, আচার্য আপনি দয়া করে আমাকে বলুন বৌদ্ধধর্মের মূল শিক্ষাটি কী? জিজ্ঞাসাবাক্যটি শেষ হতে না-হতে ওবাকু-র হাতের ছড়িটি সবেগে এসে পড়ল লিন-চি-র পিঠে। বিস্ময়ে হতবাক হলেও লিন-চি আচার্যের কাছে বিদায় নিতে ভুললেন না। থতমত অবস্থায় লিন-চি-কে ফিরে আসতে দেখে মুখ্য সন্ন্যাসী মুচো তাঁর কাছে জানতে চাইলেন— কী উত্তর পেলে? লিন-চি সবই বললেন। মুচো, আবার তাঁকে আচার্যের কাছে গিয়ে ওই জিজ্ঞাসাটিই  করতে বললেন। লিন-চি পুনরায় আচার্যের কাছে একই জিজ্ঞাসা উত্থাপন করে একই ফল লাভ করলেন। মুচো, ব্যর্থ মনোরথ লিন-চি-কে আবারও পাঠালেন আচার্যের কাছে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও  লিন-চি গেলেন, জিজ্ঞাসা রাখলেন এবং প্রহৃত হয়ে ফিরে এলেন। মুচো আর কী বলবেন! তিনিও বিস্ময়বিমূঢ় হয়ে পড়লেন। লিন-চি, তাঁকে সাফ সাফ জানিয়ে দিলেন, এমন অপমান সহ্য করে  তিনি আর থাকবেন না, কাল সকালেই তিনি মঠ ত্যাগ করবেন। মুচো বললেন, তা সে করতেই   পারে, তবে মঠ ছাড়ার আগে যেন সে আচার্যের কাছে দেখা করে অনুমতি নিয়ে যায়। মুচো এবার   স্বয়ং চললেন আচার্যের সঙ্গে দেখা করতে। তিনি গিয়ে আচার্যকে বললেন, আচার্যদেব, আজ আপনার কাছে তিনবার একই জিজ্ঞাসা করে যে নবীন সন্ন্যাসীটি তিনবারই প্রহৃত হয়েছে, সে    আপনার কাছে বিদায় নিতে আসবে। আমি তাকে দীর্ঘদিন পর্যবেক্ষণ করেছি সে সৎ, আন্তরিক, নির্ভীক ও অনিসন্ধিৎসু। আমার মনে হয় একদিন সে মহাদ্রুম হয়ে জগতের বহু তাপিতকে প্রাণদায়ী ছায়া দান করবে। আপনি তার প্রতি একটু যত্নবান হোন। এটাই আমার নিবেদন। পরের দিন সকালে লিন-চি আচার্যের কক্ষে উপস্থিত হলে, আচার্য বললেন, তুমি যদি এই মঠ ত্যাগ করতে চাও, তা করতেই পারো। তবে তোমার জিজ্ঞাসার যথাযথ উত্তর জানার জন্য তোমাকে  কাও-আন নদীর তীরে আচার্য তা-য়ু-র মঠে যেতে হবে।

    লিন-চি খুঁজে খুঁজে কাও-আন-নদী-তীরবর্তী এক মঠে তা-য়ু-কে পেয়ে গেলেন। নতুন কাউকে  দেখলে যেমনটা রীতি তা-য়ু ঠিক তেমনই জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করলেন।

তা-য়ু— কোথা থেকে আসা হচ্ছে শুনি ?

লিন-চি— আচার্য ওবাকুর মঠ থেকে। সেখানে আমি তিন বছর কাটিয়ে আসছি।

তা-য়ু— তা ওই মঠ থেকে তুমি কী শিক্ষা নিয়ে এসেছ ?

লিন-চি— না, না, আমি ওই মঠে তেমন কোনও শিক্ষা লাভ করিনি। আমি আচার্যের কাছে বৌদ্ধধর্মের মূলনীতি সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলাম। তিন তিন বার জিজ্ঞাসাটি করে যারপরনাই প্রহৃত হয়ে আমি এখানে এসেছি। আমি এখনও বুঝতে পারছি না আমার দোষটা ঠিক কোথায়!

তা-য়ু— অকৃতজ্ঞের মতো কথা। ওবাকুর হৃদয় অপার করুণার আধার, ঠিক যেমনটা হয় আমাদের মা-ঠাকুরমাদের অন্তর। তিনি আপনাকে অতিরিক্ত প্রযত্ন দিতে গিয়ে নিজেকেও বিধ্বস্ত করেছেন।  আর তুমি এসে বলছ তোমার দোষ কোথায়! আশ্চর্য তো!

তা-য়ু-র এই কথায় লিন-চি আমূল কম্পিত হন। তাঁরর মনোজগতে সত্তা-টলানো আলোড়ন সৃষ্টি  হয়। এই অভূতপূর্ব আলোড়নেই তাঁর আলোকপ্রাপ্তি ঘটে, তিনি বোধিপ্রাপ্ত হন। আচ্ছন্নের মতো তিনি উচ্চারণ করেন— আমারই বোঝার ভুল। ওবাকু-র বৌদ্ধধর্মে জটিলতার ছিটেফোঁটাই নেই।  

তা-য়ু, লিন-চি-র কাঁধ ধরে ঝাঁকুনি দিয়ে বলেন— বিছানা-ভেজানো শিশুর মতো কথা বলছ। প্রথমে বললে, তোমার দোষ কোথায় তা তুমি বুঝতে পারনি। আবার এখন বলছ, ওবাকু-র বৌদ্ধধর্মে জটিলতার ছিটেফোঁটাই নেই।

আচমকা লিন-চি, তা-য়ু-র পাঁজরে তিনবার মুষ্ট্যাঘাত করেন। তা-য়ু, তাঁকে দূরে ঠেলে দিয়ে বলেন— এই ছোকরা, তোমার আচার্য ওবাকু। এসব আমার বিষয় নয়।

    লিন-চি ফিরলেন হুয়াংপো পর্বতের মঠে। গিয়ে দাঁড়ালেন একেবারে প্রবৃদ্ধ ওবাকুর মুখোমুখি।

ওবাকু— দ্যাখো কাণ্ড, আবার সেই খ্যাপা ছেলেটি ফিরে এসেছে ! এতো দেখছি গিয়েও যায় না। যায় আবার আসে, আসে আবার যায় ! এই বালখিল্যপনা এবার শেষ করো, বুঝলে!

লিন-চি— আপনার অপার স্নেহই তো আমাকে ফেরাল।

ওবাকু— তাহলে কে গেল আর কে ফিরল ?

লিন-চি— গতকাল আমি আচার্যের স্নেহময় নির্দেশ পেয়েছিলাম। আজ ফিরেছি আচার্য তা-য়ু-র কাছে শিক্ষা নিয়ে।

ওবাকু— তা, বুড়ো তা-য়ু কী শেখাল তোমাকে ?

লিন-চি— তেমন কিছুই না ! আপনার আপাত কাঠিন্যের ভিতরে প্রবহমান অপার স্নেহধারার রহস্য তিনিই তো আমার কাছে উন্মোচন করে দিয়েছেন। 

ওবাকু— বুড়ো হচ্ছে তো! তাই ভুলভাল বকা শুরু করেছে। আমার সঙ্গে দেখা হোক একবার। আচ্ছা করে বেশ কয়েক ঘা দিতে হবে।

লিন-চি— সে তো আপনি তা-য়ু-র সঙ্গে দেখা হলে দেবেন। এখন আমারটা নিন।

কথা শেষ করেই আচমকা লিন-চি ওবাকু-র গালে ঠাস করে একটা চড় কশিয়ে দেন। ওবাকু  সিংহের মতো গর্জন করে উঠলেন— এই খ্যাপাটা বাঘের গোঁফে টান মেরেছে।   

এবার লিন-চি উচ্চকণ্ঠে চিৎকার করে উঠলেন— কাৎজ !

তাঁর এই মঠ-কাঁপানো  হুংকার শুনে সন্ন্যাসীরা ছুটে এলেন। ওবাকু তাঁদের বললেন— এই খ্যাপাটাকে এখান থেকে বের করে ধ্যানকক্ষে নিক্ষেপ করো। ওটাই ওর যথার্থ জায়গা।       লিন-চি ওবাকু-কে শ্রদ্ধা নিবেদন করে সন্ন্যাসীদের পিছু নিলেন।   

      লিন-চি ও ওবাকু-র এই অদ্ভুত আচরণ চ্যান-ধারায় বহুল-চর্চিত একটি বিষয়। এই প্রসঙ্গে কুয়েই-শান ও ইয়াং-শান-এর একটি সংলাপখণ্ড পাওয়া যায়।

কুয়েই-শান— দুজনের এমন কথাবার্তা ও অদ্ভুত আচরণের রহস্যটা কী ?

ইয়াং-শান— এ সম্বন্ধে আপনার মত কী ?

কুয়েই-শান সন্তানকে বড়ো করে তোলার জন্য বাবাকে অপার স্নেহশীল হয়ে উঠতে হয়।

ইয়াং-শান— এই মন্তব্যটা আমার মনঃপূত হল না।            

কুয়েই-শান— আপনার মত কী ?

ইয়াং-শান— আমার মনে হয় এটা চোরকে বাড়ি ধ্বংস করতে উসকে দেওয়ার মতো ঘটনা।

কুয়েই-শান— লিন-চি কি তা-য়ু বা ওবাকু-র কাছ থেকে কোনোরকম সহায়তা পেয়েছিলেন বলে মনে হয় ?

ইয়াং-শান— লিন-চি যে কেবল বাঘের মাথায় চাপতে সক্ষম হয়েছিলেন তা নয়, তিনি বাঘের লেজেও মোচড় দিয়েছিলেন।

ইয়াং-শান শেষোক্ত সংলাপের মাধ্যমে বোঝাতে চেয়েছেন, লিন-চি, তা-য়ু এবং ওবাকু-র শিক্ষাকে  যথাযথভাবে উপলব্ধির মাধ্যমে নিজে যেমন আলোকিত হয়েছেন, তেমন দুই আচার্যকেও আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের ক্ষেত্রে আলোকপ্রাপ্তির স্বাক্ষর রেখেছেন; যা অবশ্যই প্রথাসিদ্ধ নয়, হৃদয়সিদ্ধ!   প্রখ্যাত জাপানি জেন আচার্য ওমোরি সোগেন (১৯০৪-১৯৯৪) এই ঘটনায় আচার্য তা-য়ু-র ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। তিনি মনে করেছেন তা-য়ু, লিন-চি-র মতো একজন সুযোগ্য শিক্ষার্থীকে ত্যাগ  করে মহানুভবতার পরিচয় দিয়েছেন; তিনি লিন-চি-র আচার্য হিসাবে ওবাকুকে মেনে নিয়েছেন। তা-য়ু যদি নাম সর্বস্ব আচার্য হতেন, তা হলে বোধিপ্রাপ্ত লিন-চি-কে প্রত্যাখ্যান না-করে নিজের মঠে স্থান দিতেন এবং নিজের প্রভাব-প্রতিপত্তি বৃদ্ধির জন্য তাঁকে ব্যবহার করতেন।

    রেকর্ড অব লিন-চি (চৈনিক, লিন-চি লু) থেকে লিন-চি-র জীবনের অনেক কথাই জানা যায়। লিন-চি, তা-য়ু ও ওবাকু দুজনের মঠেই থাকতেন। সম্রাট উ-চোঙ ৮৪৫ খ্রিস্টাব্দে চিনে বৌদ্ধধর্ম নিষিদ্ধ করলে লিন-চি সেই সময় তা-য়ু-র মঠে গা-ঢাকা দেন। যদিও এই নিষেধাজ্ঞা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি, ৮৪৬ খ্রিস্টাব্দে তা রদ হয়। এই সংক্ষিপ্ত সময়সীমায় বহু মঠ-বিহার মাটিতে মিশে যায়, বৌদ্ধ ধর্মানুসারীরা হেনস্থার শিকার হন। নিষেধাজ্ঞা রদ হওয়ার অব্যবহিত পরে তা-য়ু-র মৃত্যু হয়। অতঃপর লিন-চি চলে আসেন ওবাকু-র মঠে। ৮৪৯-৫০ খ্রিস্টাব্দের দিকে তিনি পাকাপাকিভাবে ওবাকু-র কাছ থেকে বিদায় নেন। বিদায়ের প্রাক্কালে আচার্য ওবাকু তাঁকে বলেন—  লিন-চি, ভবিষ্যতে তুমি বহু মানুষের জিহ্বা কর্তন করবে ! ওবাকু-র এই ভবিষ্যদবাণী বিফল  হয়নি। ওবাকুর মঠ ছেড়ে হাঁটতে হাঁটতে লিন-চি, চেন-চউ নগরের হু-তাও নদী তীরবর্তী লিন-চি   ইউয়েন নামের একটি অখ্যাত ছোটোখাটো মঠে পৌঁছান। সেখানেই তিনি বসবাস করতে থাকেন। কালক্রমে অখ্যাত মঠটির খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে দূরদূরান্তে। বহু সন্ন্যাসী মঠে এসে হত্যে দিয়ে পড়ে থাকেন লিন-চি-র মুখনিঃসৃত বাণী শ্রবণের জন্য। মঠের লিন-চি নামটি স্থায়ীভাবে মুদ্রিত হয়ে যায় ই-শিউয়েন নামের উপর। একদা যে সন্ন্যাসী ই-শিউয়েন নামে পরিচিতি পেতেন এখন তিনি লিন-চি নামেই চিহ্নিত হতে থাকেন। কেবল সাধারণ লোকজন নয়, চেন-চউ নগরের শাসক ওয়াং ও ছিলেন লিন-চি-র একজন অনুরাগী। লিন-চি-র ধর্মসূরী হিসাবে জনৈক চিন হুয়া চিং চুয়াং (৮৩০-৮৮৮ খ্রিঃ)-এর নাম পাওয়া যায়। চিন হুয়া, লিন-চি মঠে এসেছিলেন ৮৬১ খ্রিস্টাব্দে। তারপর তীর্থযাত্রায় বেড়িয়ে পড়েছিলেন। পরে ফিরে আসেন লিন-চিকে দেখভাল করার জন্য। লিন-চি-র অন্য এক শিষ্য সান-শেং-এর কথা জানা যায়। লিন-চি-র মৃত্যুর অব্যবহিত পূর্ববর্তী সময়ে অন্যান্যদের সঙ্গে তিনিও উপস্থিত ছিলেন। তাঁর সঙ্গে লিন-চি-র শেষ কথোপকথনটুকু দেখে নেওয়া যাক।

লিন-চি— আমি চলে যাওয়ার পরও কী আমার ধর্মদৃষ্টি অক্ষুণ্ণ থাকবে বলেই মনে হয় ?

সান-শেং— আমরা কেউই আপনার সত্যদৃষ্টিকে ক্ষুণ্ণ করার মতো সাহসই পাব না।

লিন-চি— ভবিষ্যতে আমার শিক্ষা সম্পর্কে কেউ জানতে চাইলে তাকে তুমি কী বলবে ?

সান-শেং তখন লিন-চি-র মতো অবিকল চিৎকার করে উঠলেন ‘কাৎজ’

লিন-চি— এমন অন্ধ গাধা থাকতে কে বলে আমার ধর্মদৃষ্টি অক্ষুণ্ণ থাকবে না ?

এই কথোপকথনের শেষে উপবিষ্ট অবস্থাতে লিন-চি বিদায় নেন। আর তাঁর ধর্মদৃষ্টি প্রচারের দায় স্বেচ্ছায় মাথায় তুলে নেন তার অনুগত ‘অন্ধ গাধা’-র দল।

   লিন-চি জন্মেছেন উত্তর চিনে। তাঁর আমৃত্যু বিচরণের ভূমিও উত্তর চিন। আন লু শান বিদ্রোহ ( ৭৫৫-৭৬২খ্রিঃ) থেকে শুরু করে তাং আমলের শেষ পর্যন্ত উত্তর চিন বারবার অরাজকতার শিকার হয়েছে। সামাজিক মাৎস্যন্যায় তো ছিল, তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল বহিরাগত বর্বরদের হামলা। এমন পরিবেশে বেড়ে ওঠার ফলে লিন-চি সহজ-স্বাভাবিক আচরণের পরিবর্তে এক রূঢ় অথচ অকৈতব আচরণ আত্মস্থ করেছিলেন। অকস্মাৎ বজ্রকণ্ঠে চিৎকার অথবা মুষ্ট্যাঘাতের মাধ্যমে আবেগের বহিঃপ্রকাশ ইত্যাদি আসলে প্রচলিত দানবিক সমাজব্যবস্থাকে প্রতিহত করতে না-পারার প্রতিক্রিয়া ছাড়া অন্য কিছু নয়। লিন-চি মানেই বিতর্কিত আচরণ ও মন্তব্যের এক অলোকসামান্য আধার। একদা তিনি বোধিধর্মের স্তূপ পরিদর্শন করতে গিয়ে তত্ত্বাবধায়কের সঙ্গে বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন।              

তত্ত্বাবধায়ক— আপনি প্রথমে কাকে শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন, বুদ্ধকে না বোধিধর্মকে ?

লিন-চি— আমি দুজনের কাউকেই শ্রদ্ধা নিবেদন করব না।

তত্ত্বাবধায়ক— বুদ্ধদেবকে বা বোধিধর্মকে আপনি শ্রদ্ধেয় মনে করেন না ?

লিন-চি আর কথা না-বাড়িয়ে হাত নাড়তে নাড়তে সেখান থেকে অন্তর্হিত হন।

এই হল দেখনদারি সংস্কৃতির এক মারাত্মক বৈশিষ্ট্য। মহাপুরুষের মূর্তির সামনে মাথা ঝোঁকাও, শ্রদ্ধা প্রদর্শন করো ব্যাস তুমি উতরে গেলে। তুমি জীবনে উক্ত মহাপুরুষের দেখানো পথে এক পাও হাঁটলে না। বরং জীবনযাপনে তুমি বিপরীত পথটাকেই আঁকড়ে ধরলে। তবুও তুমি যেহেতু সেই মহাপুরুষের মূর্তির সামনে নতজানু হলে তোমার সাতখুন মাফ হয়ে গেল। আর তুমি যদি সেই মহাপুরুষের আদর্শকে বাস্তবায়নের পথে হাঁটো তাহলে তুমি হয়ে গেলে গণশত্রু। আসলে এ হল মহাপুরুষদের মেরে ফেলার এক অদ্ভুত চক্রান্ত। লিন-চি এই চক্রান্তের অন্ত দেখতে চেয়েছিলেন। তিনি হাঁটছিলেন বুদ্ধ-বোধিধর্মের পথে তাই তাঁদের প্রতি বাহ্যিক শ্রদ্ধা প্রদর্শন ছিল তাঁর কাছে অর্থহীন। লিন-চি মঠের পাশ দিয়ে তীর্থযাত্রীরা যেতেন উ-তাই পর্বতে বোধিসত্ত্ব মঞ্জুশ্রী-র মন্দির দর্শনে। লিন-চি এ বিষয়ে তাঁর শিষ্যদের বলতেন— একধরণের শিক্ষার্থী আছে, যারা বোধিসত্ত্ব মঞ্জুশ্রীকে খুঁজতে উ-তাই পর্বতে ছোটে। তাদের চিন্তার গোড়াতেই গলদ থেকে গেছে। উ-তাই পর্বতে আদৌ মঞ্জুশ্রী নেই। তোমরা কি মঞ্জুশ্রীকে জানতে চাও ? তোমাদের চোখের সামনেই আছে মঞ্জুশ্রী। এটা আসলে আর কিছুই নয়, তুমি যেখানেই যাও না কেন সবকিছুকেই সন্দেহ করবে, তাহলেই তোমাদের মধ্যে মঞ্জুশ্রী জীবিত হয়ে উঠবেন।  

     লিন-চি তাঁর শিষ্যদের বোধিপ্রাপ্তির জন্য আকস্মিক চিৎকার ও মুষ্ট্যাঘাতকে ব্যবহার করতেন। আসলে এই চরম পদ্ধতিকে কাজে লাগিয়ে তিনি তাদের ভিতরে জেঁকে বসা পরম্পরিত স্থবিরত্বকে উৎখাত করতে চাইতেন। এই কাজে তিনি অভূতপূর্ব সাফল্যও পেয়েছিলেন। লিন-চি-র শিক্ষার অন্য এক উল্লেখযোগ্য দিক হল, রক্তমাংসের মানুষের ভিতরে লুকিয়ে থাকা জাত-গোত্র ও   পদমর্যাদা বা উপাধিবিহীন এক আসল মানুষকে খুঁজে বের করা। তিনি এই মানুষকে সত্য মানুষ  বা  প্রকৃত মানুষ নামাঙ্কিত করেছেন। তাঁর মতে প্রত্যেক মানুষের ভিতরেই আছে এমন একজন সত্য মানুষ যাকে খুঁজে বের করতে পারলেই সিদ্ধিগঞ্জের মোকামে পৌঁছানো যাবে। লিন-চি-র তিরোধানের পর মূলত নান-উয়া হুই ইয়ুং (মৃত্যু ৯৩০ খ্রিঃ), ফেং শুয়ে ইয়েন চাও (৮৯৬-৯৭৩ খ্রিঃ), শো শান শেং নিয়েন (৯২৬-৯৯৩ খ্রিঃ), ফেং ইয়াং শেন  চাও (৯৪৭-১০২৪ খ্রিঃ) প্রমুখের নিরলস প্রচেষ্টায় লিন-চি-র শিক্ষা সমগ্রে উত্তর চিনে বিস্তৃতি পায়। দক্ষিণ চিনে লিন-চি-র শিক্ষাকে প্রচারের আলোয় নিয়ে যান শি-শং চুয়ি (৯৪৭-১০৩৯ খ্রিঃ)। তিনি লিন-চি ধারাকে অপ্রতিহত করে তোলেন। অন্যান্য চ্যানধারাগুলি ক্রমশ এই ধারার অঙ্গীভূত হয়ে পড়ে। সং আমলে (৯৬০-১২৭৯ খ্রিঃ) লিন-চি ধারা এক পৃথক সম্প্রদায়ের রূপ পায়। এই সম্প্রদায়ের উদ্যোগে গুরু-শিষ্যের হেয়ালিপূর্ণ গূঢ় কথোপকথন তথা “কোয়ান” সংগ্রহ শুরু হয়। ১০০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে লিন-চি সম্প্রদায় ইয়াং চি ও হুয়া লুং এই দুই শাখায় ভাগ হয়ে যায়। জাপানে লিন-চি সম্প্রদায় প্রবিষ্ট হয়  দ্বাদশ শতাব্দীতে। তখন জাপানে চলছে কামাকুরা যুগ। জাপানি উচ্চারণে লিন-চি হয়ে যায়  রিনজাই। এখনও পর্যন্ত সে দেশে এই সম্প্রদায় বহালতবিয়তে টিকে আছে।                             

 

তথ্যসূত্র :

1.THE ZEN TEACHING OF MASTER LIN-CHI ; A TRANSLATION OF THE LIN-CHI LU BY BURTON WATSON, SHAMBHALA PUBLICATION 1993.

2. THE RECORD OF LINJI; TRANSLATION AND COMMENTARY BY RUTH FULLER SASKI, UNIVERSITY OF HAWAII PRESS 2009.

3. DHANA BUDDHISM IN CHINA: ITS HISTORY AND TEACHING BY CHOU HSIANG-KUANG, INDO-CHINESE LITERATURE PUBLICATION INDIA, 1960.

4. ZEN BUDDHISM : A HISTORY INDIA AND CHINA BY HEINRICH DUMOULIN TRANSLATED BY J.W. HEISIG AND PAUL KNITTER ; MACMILAN PUBLISHERS 2003.

                                               ( ক্রমশ)

ছবি : বিধান দেব 

 

  

 

         


 

শুক্রবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২১

গুচ্ছ কবিতা ।। বিশ্বজিৎ রায়

 


অন্ধকারের দাগগুলো


এক 


দরজা খুললেই অনেক মুখ ----

কোন মুখের সঙ্গে সখ্যতা করবো, গল্প করবো

ভাবতে ভাবতে মুখগুলো

কখন যেন সব হারিয়ে যায়.... 


একটা শরত- মুখ পছন্দ হলে,  তাকে ডেকে

কথা বলার কথা ভাবার আগেই চলে আসে

 অচেনা কোনো হেমন্ত-মুখ ---

তার সঙ্গে কথা বলতে বলতে

পায়ে পায়ে কাছে এসে হাজির হয় কোনো বসন্ত-মুখ, 

আতান্তরে প'ড়ে আমি তখন

 লজ্জায় ঘরে ঢুকে যাই... 


ভোরবেলায় আবার দরজা খুললে দেখি,

একটা কুয়াশামাখা মুখ জড়সড় হয়ে বসে আছে,

তার সারা শরীরে গতরাতের শীত ও সংশয় জড়ানো ----


ভীড় করে দাঁড়িয়ে থাকা অনেক সোনালী-মুখ,

 রূপালী-মুখ উপেক্ষা করে আমি তার সঙ্গেই 

কথা বলা শুরু করি ---


ধীরে ধীরে একটা গল্প তৈরি হয়, 

অচেনা জীবনের গল্প.... 


দুই 


দরজার বাইরে একিদিন তাকিয়ে দেখলাম, 

একদিকে সুগন্ধি ফুল হাতে দাঁড়িয়ে আছে প্রেম

অন্যদিকে, শূন্য থালা হাতে কয়েকটা ভুখা মুখ,

মাথার ওপর একদিকে ফুটে আছে পূর্ণিমাচাঁদ,

অন্যদিকে,  ভেসে বেড়াচ্ছে  হিংস্র কালো মেঘের দল ----


কিংকর্তব্যবিমুঢ় আমি জোরে হাঁটা লাগালাম ---

কিছুদূর এগিয়ে দেখলাম,  রাস্তা দুভাগ হয়ে 

একটা চলে গেছে সমুদ্রের দিকে, অন্যটা

অনন্তে -----


কোন দিকে যাব, ভাবতে ভাবতে একটা জীবন আমি

 মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে আছি একা.... 


তিন


তোমরা তো দেখনি আমার ছায়ায় লেগে থাকা রক্তের দাগ,

শীর্ণ, ব্যথাতুর একটা নদীর আত্মনিবেদন , 

মুছে ফেলা স্বপ্নের গোপন দহন  ---


এসব কিছুই দেখনি তোমরা, দেখতে চাওনি,

রঙিন চশমা চোখে ভেবে নিয়েছ,

 ওসব রক্তের দাগ নয়,  পলাশের রঙ,

শীর্ণ নদীটাকে ভেবে নিয়েছ তন্বী কোনো নারী 

আলগোছে শুয়ে আছে প্রেমিকের কোলে, 

দহনের চিহ্নগুলিকে ভেবে নিয়েছো 

 পুরনো  বনেদী জীবনের প্রহেলিকা মাত্র ---


এসব অনৃত ভাবনাগুলো থেকে আমার যে প্রতিকৃতি বানিয়েছো, সেখানে নেই কোনো সত্য-সংলাপ,

অন্ধকারের দাগগুলো নিপুন দক্ষতায় মুছে আমাকে সুমহান করে দিয়েছো---


আমার চারপাশে এখন ঘুরে বেড়াচ্ছে

ক্ষুধার্ত আততায়ীদের দল ..... 


চার


ছায়াটা সরেনি তখনও,  কে যেন আমাকে

টেনে নিয়ে গেল ঝুলে থাকা অরণ্য-বারান্দায়,

একটা স্বর এসে দাঁড়ালো কাছে, খুব কাছে,

তার কাছে শুনলাম আমার পূর্বজন্মের মৃত্যু- যন্ত্রণার বিবরণ..... 


সে কি আমাকে 'থ্রেট ' দিল, নাকি নতুন করে

বাঁচানোর প্রতিশ্রুতি!  

এই দ্বন্দ্ব নিয়ে যখন

পায়চারী করছি দড়ির ওপর, 

একটা জ্বলন্ত অগ্নিপিণ্ড ঘুরপাক খেতে লাগলো/ 

আমাকে ঘিরে.....


ভয়ে, শঙ্কায় আমার যখন প্রায় মূর্ছা যাওয়ার অবস্থা, 

ঠিক তখন,  আমাকে ওই ভয়ংকর দশা থেকে 

মুক্তি দিল একটা হাত, 

খুব চেনা পূর্বজন্মের  একটা হাত...


ছবি : বিধান দেব 

গুচ্ছ কবিতা ।। অরিন্দম চট্টোপাধ্যায়


 

জলশূন্য নদী


জলশূন্য নদীর দিকে তাকিয়ে থাকি

হাহাকার গুলো ছায়াপথ  ধরে 

 বৈরাগী দিঘির দিকে যায় 

আমার বিদগ্ধ সন্ধ্যা 

সীমান্তবিহীন পথের ওপর উড়ে যায়

 মনে হয় যেন ডানা মেলা হলুদ পাখি 

যন্ত্রণা কাতর হৃদয় দেখছে

এক এক করে প্রিয়জনের চলে যাওয়া

তারা সব আকাশ পথ ধরে হাঁটছে

 নক্ষত্র আলোকে রঙিন হয়ে আছে

নিঝুম রাত্রি, পথ জুড়ে সার সার অর্জুন গাছ

তবু ও আমি অন্তহীন অপেক্ষায়..... 

লালভূমি উপত্যাকা জুড়ে 

চেনা শব্দছন্দ আর অক্ষর স্রোত

মিশিয়ে দেব জলশূন্য নদী পথে


জলশূন্য নদীর দিকে তাকিয়ে থাকি

 

 নিঃসঙ্গ শূন্যভূমি


এখানে শূন্যভূমি বলে জায়গা আছে

যার কাছে সীমহীন ধারাপাত

উৎসব রাত্রি ঙেঙে ভেঙে

হরিশ বাঁধ এ এক হেমন্তী সকাল

ছড়িয়ে আছে গুচ্ছ গুচ্ছ শেফালিকা

এখানে প্রজাপতির পাখার মতো

 নিস্তব্ধ পৃথিবী  উড়ে বেড়ায়

আদিবাসী মানুষ মহুয়া পাতার মতো

আরও নিঃশব্দে পা ফেলে ফেলে বনজ পথ 

ধরে ধরে চলে এক আদিম পৃথিবী8র দিকে

দূরে মুরালপুরে কয়েকটা ধূসর পাহাড়

এর কোণ থেকে নামে বর্ণহীন রাত

আরও নিঃসঙ্গ আরও নিঃসঙ্গ হয়ে যায়


এতো নিঃসঙ্গতা পৃথিবীতে থাকতে পারে!


ছবি : বিধান দেব 

গুচ্ছ কবিতা ।। অমিতাভ রায়


 দেশ

অনেক উপত্যকাই শেষ পর্যন্ত শেকড় 

খুঁজে পায় না । যেমন আমার

ঠাকুরমা তার বাবার একমাত্র সন্তান ছিলেন 

ধনী পরিবারে বিয়ে হয়ে 

এক চঞ্চল নদীর কাছে বসত বেঁধে ছিলেন 

সেই কোন কিশোরী বেলায়

রবীন্দ্রনাথের গান গাইতেন,  নজরুলের 


মুসলমান মুনিষ তারা উঠোনের এক কোনে

মুড়ি, বাতাসা খেতেন,

মাঝের পুকুরে জাল দিয়ে তারা বড় বড়

কালবোস মাছ তুলে এনে রাখতেন উঠোনে 


ঠাকুরমা আজ নেই। গল্পের মতন

রয়ে গেছে সেই নদী, সেই ক্ষেতের হাওয়া,

আর সেই উঠোনের রোদ। 


আর আজও রয়ে গেছে 

সেই প্রতিমা ভাঙার ছুঁতো, পোড়া আগুনের গন্ধ,

ছিন্নভিন্ন বোন, অসহায় লাশ


কুরুবংশ ভেবেছিল 

সংখ্যা দিয়ে তারা 

সব কিছু জয় করবে

হিংসা, ঘৃণা দ্বারা


তারপর 


এরপরও তাই হবে

যা হয়েছে আগে

আক্রমণ না হলে কী

নারায়ণ জাগে


ধৃতরাষ্ট্র অন্ধ হলে

রাজ্য, জনতার 

আমরা সবাই জানি

পরিনতি তার।


খুব ভালো থাকবেন। 

যদি আর কোনদিন ফিরে আসতেও না পারি

যদি আর কোনদিন দেখা সাক্ষাত না হয়

টিপ টিপ বৃষ্টির ভিতর, 

অচেনা নদীর ঝর্ণা,

গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে ভেঙে যাওয়া ভালোবাসা,

হারানো পথের ঝরা পাতাদের অন্দর মহলে


বাস স্ট্যান্ডে এক পলকের দৃষ্টি বিনিময়ে

কি নাম, কি নাম, খুঁজতে খুঁজতে একটা

গোটা জীবনের না পাওয়ার সন্ধিক্ষণে, 

শূন্য আতরের শিশির মতন

সফল ব্যর্থতা এসে বন্ধুত্বের হাত ছেড়ে দিলে,

নীল আকাশের গায় ভোরের নক্ষত্রদের মত

অতলান্ত বরফের নীচে চুম্বনের উষ্ণতায়

ভালো থাকবেন আপনি।


ভালো থাকবেন অসুখে ও উন্মাদনায়

আমাদের সমস্ত না পাওয়াগুলো 

একদিন খালি পা নিয়ে ঠিক খুঁজে পাবে

শিউলি ফুলের মত মেঘেদের স্কুল ঘরগুলো

আর আপনার পিছল অনুমতি।

ভিড় বাস, ফাঁকা পার্কে 

সন্ধ্যার আলোয় পুরনো বাংলা গানে

সিরিয়ালের জটিল সম্পর্কের ইশারায়

কোনদিন ঘন হতে না পারার আনন্দে ও যন্ত্রণায় 

বুড়ির চুলের মত সব উড়ে গেলে - 

একা একা লাগে যদি খুব অন্ধকার 

তবুও ভালো থাকবেন ।


যদি একদল ছুটে এসে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে 

ছাই করে দেয় জমানো বিশ্বাস 

গলা কেটে ফেলে রাখে আমাদের 

নীরবতা, চরম সভ্যতা আর ধৈর্য্য 


যদি আর ফিরে আসতে মন মানা করে

যদি আর ইচ্ছা করে চিনতে অস্বীকার করি কোনদিন


শুধুমাত্র এই শহরের জন্য,

না পারা কান্নার জন্য, ধাপার মাঠের জন্য, 

আমাদের ভুল ভাল দুঃখ, কষ্ট, 

অসহায় মৃত্যুদের খেলনা কিনে দিতে

নন্দিনী, ভালো থাকবেন খুব। 

 

 ছবি : বিধান দেব 

গুচ্ছ কবিতা ।। পার্থপ্রতিম মজুমদার


 ভয়...


ভয় যেন ভূতে-পাওয়া ঘোড়া

আমি সেই ঘোড়ার ওপরে

হয়েছি সওয়ার আর দেখি


চারিদিকে মৃতের পাহাড়... ... 


ভয় যেন আঁধার-গোখরো

কখন কোথায় তার লেজে

পড়ে যাবে পা-দু'খানি আর


হিস-হিস,চেরা-জিভ,ধার...


ঘুমের ভিতরে কালো ঢেউ

ভেসে যাই,ভেসে যেতে যেতে 

ঘুরপাক খেতে খেতে দেখি


এ-জীবন ধোঁয়া শুধু,ভার...


লাশ ভেসে যায় গঙ্গায়

টিভি খুলে দেখি বারবার

নিজেই নিজেকে শুধু বলি


মানুষ মানুষ আছে আর?


বাতাস বাতাস খুঁজে মরা

চারিদিকে স্বর আর্তের

পৃথিবী বিষিয়ে গেছে আজ


সবদিকে পুঁজ,লালা,ক্ষত...  ...


ছবি : বিধান দেব 

গুচ্ছ কবিতা ।। নীলোৎপল জানা


 আজারবাইযান থেকে…  

                                                                

তোমার চাওয়ার ওপর আমার আসা নির্ভর করে না…

 

রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে ফিরি ঠিকানাহীন ভাবে 

এক সময় আমার ঠিকানা ছিলে তুমি, 

সেই তুমি বিকেলের রোদের মতো শীতল---,

নখের আঁচড়েও তুমি নিরুত্তর 

প্রতিটি নিশ্বাসে যাকে পাশে পেতাম 

তার এমন নিরুপদ্রপ ; পথ ভোলা পথিক করেছে আমায়।


আমি ঘুরে চলেছি নাগাসাকি থেকে গাঙুড়ের জল হয়ে

 আলাস্কার গ্রামে গ্রামে। বাঁশ পাতার মতো ঘুরে ফিরে 

খুঁজে নেবো তোমায়,তোমার চাওয়ায় ,আমার আসা নির্ভর করেনা ;

আমি আজারবাইযান থেকে এখনো পথে পথে ঘুরে চলেছি…


আলো

কতগুলো নক্ষত্র পতন হয়ে গেল আমার মাথার উপর ।


বুঝবো কী বুঝবো না কোনো দিন জানি না…

তবুও যেটুকু বুঝেছি তাও এজীবনে কম নয়,

মথার ভিতর সব এলোমেলো হয়ে যায় বুঝে ওঠার আগেই ।

এ নক্ষত্রগুলোর একদিন শক্তিশালী আলোছিল

ভাষাও ছিল;মুখ ছিল ,চোখ ছিল--

তবুও থাকতে পারেনি অক্ষত,অমর

একদিন পড়তেই হল খাদে ,মৃত্যুর মুখে


সব থেকেও যারা সর্বহারা তাদের একটি কথাই

আজ মহা মূল্যবান,পৃথিবীর কাছে

কারণ তারা যে মহামানব, নক্ষত্র…।


ঔ ফুলের মতো চুল


 আয়োজন সম্পূর্ণ ,শুধু তুমি আসবে বলে

 অপেক্ষায় সারা দিন রাত…

গাছের সবুজ পাতায় তোমার মুখ,

ঔ ফুলের মতো মাথার চুল,

বিহান বেলায় তোমাকেই দেখি

কলা পতার সবুজ ডগায়।


তুমি আসবে বলে দুইবেলা ধরে ঘর সাজিয়েছি

 তোমার পছন্দ মতো ঘরের রঙ, ঠাকুর ঘর ,বারান্দার ব্যালকনি;

সবকিছুই তোমার মতো

শুধু তুমি আসবে বলে…   


কালপুরুষের কান্না


আকাশের দিকে তাকাতেই আটকে গেল চোখ।


কালপুরুষের চিত্র যেন আমার পিতা,পিতামহ,ঠাম্মা, দিম্মা...

চোখ থেকে ঝরে পড়ছে হিরের টুকরোর মতো বিন্দু বিন্দু জল 

আমি যখন হেঁটে যাই ভুবন ডাঙার মাঠ দিয়ে… 

তখন দেখা হয় রবি ঠাকুর,অবন ঠাকুর আর সাঁওতাল মেয়েটির সাথে

যে রবি ঠাকুরের নায়কের ক্যামেলিয়া মাথায় পরেছিল; 

এরা সকলেই উজ্জ্বল আজও আমার চোখে,

তবে কেন কান্না আমার প্রিয়জনদের?


এ কান্না অন্তরে থাকে যুগযুগ ধরে

অনেক অনেক ভালোবাসার মধ্যে থাকে অনেক গভীর অন্ধকার

সব অন্ধকারের হদিস পায় না সকলে বলে 

মহাপৃথিবীর কান্না ঝরে পড়ে পৃথিবীর পরে।


আসলে বোধ আর বুদ্ধির সমন্বয় হলেই স্বপ্নে ফুটে ওঠে পদ্ম ফুল।


ছবি : বিধান দেব 

গুচ্ছ কবিতা ।। অভিজিৎ দাশগুপ্ত


 প্রজ্ঞাবান 




 এবার বসন্তে শরৎবাবুর উপন্যাস পড়তে পড়তে

 দুপুর-উৎসব শুরু হয়



 যতবার পৃষ্ঠা খোলা পায়

 এসে ওঠে পুরানো দেবতা



অভিমুখ পাল্টে ফেলি। 

হে অগ্নি হে বায়ু

দানশীল হও ---

পৃথিবী প্রভূত হব্য দান করে 

                            আজ নিঃস্ব



 আশ্রয়যোগ্য পূর্বাভাস প্রদান করো



 আমাদের রক্ত ওঠা গলা ধরে 

            ঝুলে আছে প্রজ্ঞাপারমিতা

     



ক্রান্তিকাল



জেগে থাকা ভালো। 

সর্বদর্শী হও। পূজনীয় জল মাটি 

                 পুত্রপৌত্রাদি ভোগ করেছি



আজ সুরধারা তরল কুটিল… মৃত আত্মা

                                    ধুয়ে মুছে সাফ

ব্যথা বাড়ে তলপেটে, গুঁড়ো দুধ 

আর ঐশ্বর্যসম্পন্ন  নয়



 রাজ ভক্ষণার্থে প্রতিদিন কাটা হয় 

           তরুণ শাবক। 


হে ব্রহ্ম , ইন্ধনঘরে জ্বেলে রেখো 

' মাতৃ-মুক্তি-পণ '


   



মরুৎগণের বন্ধু


 সমান্তরাল মুহূর্তগুলি অতিথির মতো  উল্লাস প্রমত্ত হাত-পা ছড়িয়ে ত্রিভুবন বিচরণকারী।।। নেতা ও মুরগির ঠ্যাং থেকে রক্ত বহমান।।। দিব্যি আছি।।। মরুৎগণের বন্ধু আমি , , , যজ্ঞ মুদ্রা খুলে রাখি সংকট সময়ে।।। ঘুসঘুসে জ্বর  তাতে সামান্য ওষুধ।।। উৎকৃষ্ট পানপাত্র তোমাকে স্বপ্ন দেখেছে --- নদীতীর আর  ভূতজাত পশুগণ  মনোজ্ঞ ভোজনরত।।। 



ছবি : বিধান দেব 
     

 

গুচ্ছ কবিতা ।। স্নেহাশিস মুখোপাধ্যায়


 



অনুধ্যান  

এভাবে মাথা নিচু করে হাঁটেন কেন?
জানতে ইচ্ছে হয়েছিলো!
তাই জানতে চাইনি।
ওভাবে কেন মাথা নিচু করে হাঁটেন!
আপনি কি সবসময়,
মাটির ভেতরের শব্দ খোঁজেন! 
ভাঙা-ভাঙা হাড়ের টুকরোগুলো
আরো খুঁড়ে খুঁড়ে দেখতে ইচ্ছে হয়?

কি আশ্চর্য!
তারপরও মাথা নিচু করে হাঁটেন! 


কৌপীন 

কৌপীনের ওপরে কোনো দেশ নেই।
ঘাসে ঘাসে পা পুড়ছে নবজাতকের!
বাড়িগুলো যেন নতুন ক'রে তৈরি হবে, 

সেরকমই মেঘ লেগে আছে পোড়া পোড়া।
কৌপীনের ওপরে শরীর; শুকনো ও ছেঁড়া।

শরীরে শরীরে পা পুড়ে গেছে নবজাতকের।


দর্শনার্থী

মন্দিরের ভিড়ে তোমার চশমার কাচে মন্দির দেখেছি।
এতো কোজাগর ঠোঁট ছিলো, তাই চোখ
গোপনে হারিয়ে গেছে দর্শনার্থীর।
কতোদিন ধরে চিনি, কতোদিন চিনি না, জানো!
মন্দির থেকে দূরে তুমি দাঁড়িয়েই থাকো।
আমি ক্রমশঃ সরে আসতে গিয়ে ভিড়ে মিশে গেছি।
মায়া ও কাজলে থাকে প্রত্যেক বিনাশের স্মৃতি। 



হোম 

হাত ছেড়ো না, চোখ ছেড়ো না,
এমন ফর্সা মুখ তোমার,
এমন কালো মুখ - 
পুড়িয়ে আমি দোলরাত্রির আগের দিন
পাতায় পাতায় ঝলসে মরে আছি।

চকমকিতে আগুন দিলে তুমিই!  


ছবি : বিধান দেব 

কবিতা

সম্পাদকের কথা

দ্বিতীয় বর্ষ  ।। অষ্টম সংখ্যা ।। মার্চ ২০২২   খুব অসহায় লাগছে এবার। আমাদের ডান পাশে ধস। বায়ে গিরিখাত। মাথায় বোমারু। পায়ে পায়ে হিমানীর ব...