বিষ
- স্যার, ফুল নেবে ? নও না, বৌদিকে গিফট করলে খুশি হবে।
একটা ফুটপাথের ভিখারি মেয়ে, হাতে তার একগোছা গোলাপ। একদম বাচ্চা। বছর চারেক বয়েস হবে। ওর দিদি দাদারা গেছে সিগনালে দাঁড়ানো গাড়ির জানলায় গোলাপ বেচতে। আর এ মেয়েটা ছোট বলে গাড়ির মধ্যে যেতে পারেনি ! ফুটপাথ দিয়ে যওয়া মানুষদের ধরছে সে। আমি না নেওয়ার জন্য একবার তাকিয়েই গতি বাড়ালাম। আমার তো বউ নেই। পিজি হসপিটালের উত্তর গায়ের চওড়া ফুটপাথ। বাচ্চাটা বোধহয় বুঝতে পেরেছে বৌদি শব্দটা ঠিকঠাক বসেনি। দৌড়ে আমার সামনে এসে বলে স্যার, গার্লফ্রেন্ডকে গিফট করবে !
আমি এবার হেসে ফেললাম। লুকোতে চাওয়া হাসি বেরিয়ে পড়লে বেশ অপ্রতিভ লাগে। এই বাচ্চাগুলো খুব চালাক হয়। আমার মতো পৌঢ়কেও এরা গার্লফ্রেন্ড দেখায় ! আমার অপ্রতিভতা ঢাকতে মেয়েটিকে বললাম, গোলাপ কি শুধু বউ, বৌদি বা গার্লফ্রেন্ডকে দিতে হয় ! মাকে দেওয়া যায় না ?
যদিও আমার সাতকুলে কেউ নেই। সরকারি অনাথ আশ্রম থেকে বেরিয়ে মধ্যকলকাতার লেলিন সরনীতে একটা প্রাচীন বাড়ির বড় এক কামরা ঘর দখল করে আছি। ভালো একটা পদ আছে কিন্তু আমার পদবীর মতো সেও মেকি। মাইনে পাই না। তাতে অবশ্য আমার দুঃখ নেই। মাথা গোঁজার ঠাঁই পেয়েছি তাতেই ধন্য। বাড়িটা অবশ্য যে কোন দিন হুড় মুড়িয়ে পড়ে যেতে পারে। সে সম্ভবনা প্রবল। তবে গত চব্বিশ বছর বাড়িটা ভেঙ্গে পড়েনি। আমারও এই ধংসসম্ভাবনা গা সওয়া। এখন এই মাঝ বয়েসে এসে বাড়িটা ভেঙ্গে পড়লে কী হবে সে নিয়ে আর ভয় পাই না। ভাবিও না।
বাচ্চাটা কোন উত্তর দিল না। কিন্তু গোলাপের যে বিক্রিসম্ভবনা আছে বুঝে গিয়ে গোলাপের গোছাটা বাড়িয়ে ধরে আমার দিকে। সরু সরু হাতে উজ্জ্বল গোলাপতোড়া। গোলাপতোড়া নিয়ে আমি তার হাতে টাকা গুঁজে দিই। দামের থেকে বেশিই।
বাচ্চাটা এবার সমস্যায় পড়ে যায়। বিক্রি হবে বোধহয় ভাবেনি। দাম কত জানেও না। শুধু দাদা দিদিদের দেখাদেখি বেচতে শুরু করেছে। কিন্তু আমার দেওয়া নোটটা যে গোলাপের থেকে বেশি বুঝতে পেরে আমার পথ আটকায়।
- কী হলো ? বাকি টাকায় তুই খেয়ে নিস।
আমি হালকা স্বরে বলি। আমিও জানি এই জীবন। কীভাবে সরকারি হোমে পৌঁছে ছিলাম জানি না।
- না, তুমি ঠিক টাকা দও !
বাচ্চাটা বলে।
খুব মুশকিলে পড়লাম। আমার কাছে ওই একশো টাকার একটা নোটই আছে। বাকি সব পাঁচশো। আমি ভাব করার জন্য বাচ্চাটাকে বললাম, তুই ইস্কুলে যাস ?
- না। তবে পড়তে পারি !
এইটুকু মেয়ে কী পড়তে পারবে ! ব্যাটা বলে কী ! আমি বেশ মজা পাই মেয়েটার কথায়। বলি, কী পড়তে পারিস তুই?
- অ, আ, ই, ঈ। বই দও খুঁজে দিচ্ছি অ কার আর আ কার।
আমি এবার বাচ্চা মেয়েটার হাত ধরি। বলি, চল তোকে খাওয়াবো। নন্দনের পরে ট্রাফিক গার্ডের গায়ে চাউমিনের দোকান আছে। তোকে এখানে আবার দিয়ে যাব।
বাচ্চাটা কী মনে করে রাজি হয়ে যায়। আমার হাত ধরে হাঁটতে থাকে নাচতে নাচতে।
- তোর নাম কী ?
- চুটকী গো !
- তোর বাপ মা কী করে ? কোথায় থাকে ?
- নেই।
- নেই মানে ?
- আগে একটা মা ছিল। কদিন হলো ভেগেছে কারও সঙ্গে।
- যাহ !
আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল। ও হাঁটতে হাঁটতে পিজির ভেতরে একটা ভ্যাট দেখিয়ে বলল, ঐ যে ওখানে যে ময়লাগুলো আছে, সেখানে আমার আসল বাপমা আমাকে ফেলে রেখে গিয়েছিল। তারপর এই যে মা, যার আরও চারটে ছেলে মেয়ে আছে, যে পুষতো আমাকে। ভিক্ষে করা শেখাত।
বাচ্চা মেয়েটা নিজের মনে বলে যায়। একদম স্বাভাবিক গলা। যেন ঘুম থেকে উঠে চায়ে রুটি ডুবিয়ে খাচ্ছে, এমন স্বাভাবিক। আমার শুধু চিবুকটা কেঁপে কেঁপে যাচ্ছে। আমার গল্পটাই তো বলছে বাচ্চা মেয়েটা।
- ফুল বেচিস তো তুই। বলছিস যে ভিক্ষে করা শেখাতো !
- সে তো এখন গো। আগে তো ভিক্ষেই করতাম। ওই মা আমাকে ভাড়া দিত। কেউ একজন কোলে করে নিয়ে ঘুরতো। লোকের কাছে বলতো মেয়ের ক্যানসার বা হার্টে ফুটো ! আমি জুলজুল করে তাকিয়ে থাকতাম। মা-ই শিখিয়েছিল। আমার ভাল্লাগতো না। খুব গরম হতো ওই ভিক্ষেমার কোলে ! খুব নোংরা তো ! তার থেকে এই বরং ভালো। গোলাপ বিক্রি করা বেশ ভালো। আমি আর একটু লম্বা হলেই রাস্তায় নামবো। গাড়ির জানলায় হাত পাবো। টাকা গোনাটাও শেখাচ্ছে এখনের মাসি। যে আমাকে খেতে দেয় গো। বলেছে, ফুল বিক্রি শিখে গেলে দুবেলা খেতে দেবে।
- এখন কবার খেতে দেয় ?
- এখনও তো ফুলবেচা শিখিনি, তাই শুধু দুপুরে খেতে দেয়।
- আর সকালে, রাতে কী খাস ?
- খাই না। তারপর কী ভেবে বলল, না না ! জল খাই। কখনও কখনও ডাস্টবিনের ভালো শুখনো খাবার পেলে খাই।
আমার চোখ ফেটে জল এল। ধরে রাখতে পারলাম না। হোম না পেলে আমারও এরকমই জীবন কাটতো। মুখ ঘুরিয়ে চোখের জল রুমাল মোছা করে সরিয়ে দিলাম। কিন্তু মনের দুঃখ কোথায় লুকোব ? হোমে থেকে পড়াশোনা করে যাহোক করে পেট চালান শিখেছি। আমি চুটকীকে বললাম, আমার সঙ্গে থাকবি ?
- কই স্বদেশবাবু, কী করছেন ?
আমি বড় ট্রেসিং পেপারে পেন্সসিল দিয়ে একমনে সিভিলের ড্রয়িং করছিলাম। বিভিন্ন বড় কনস্ট্রাকসান কম্পানী থেকে কাজগুলো বুঝে নিয়ে আমি প্ল্যান মাফিক ড্রয়িং কমপ্লিট করে দিই। এটাই আমার পেশা। গত তিনদিন কোন কাজ করিনি। আজ সকাল থেকে কাজে বসেছি। বসেছি মানে, ঘরের ভেতর একটা টেবিল আছে। টেবিলে খুব নীচু পর্যন্ত একটা ঝোলানো বাল্ব আছে। আগে ফিলামেন্ট বাল্ব ছিল, এখন সিএলএফ বাল্ব লাগিয়েছি। লোকটা এই মুহূর্তে আমার কাছে শুধু অবাঞ্ছিত নয় অসহ্যও। তবু হাসি মুখে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে গেলাম নির্মলবাবুকে স্বাগত জানাতে। নির্মলবাবু সিড়ি বেয়ে উঠছে ধীরে ধীরে। মোটা মানুষ। উনি তিনতলা পর্যন্ত আসতে আসতে আমি টেবিলটা পরিস্কার করে নিই। সিএলএফ বাল্বটা নিভিয়ে ঘরের টিউবটা জালিয়ে দিই। পেন্সিলের গুড়ো কাগজ থেকে ভাঁজ করে ছোট্ট একটা কৌটয় ঢেলে রাখি। এটা গত ছমাস ধরে করছি। চুটকি যাতে এই গুঁড়ো খেয়ে না ফেলে।
নির্মলবাবু ঘরে ঢুকলেন। ঢুকে একটু থমকে দাঁড়ালেন। ভগ্ন প্রাসাদে আস্ত একটা ঘর দেখে কি থমকে গেলেন ? না, আগের দেখা ঘরের সঙ্গে এখনের ঘরটা মেলাতে পারছেন না ! যে বিল্ডিংএ আমি আশ্রিত, সেই বিল্ডিংএ আরও বেশ কিছু ঘর আছে ব্যবহার যোগ্য। একটা পোড়া ডাক্তারের চেম্বার। কোনদিন পেশেন্ট দেখিনি। একটা কাগজের গোডাউন। একটা এন.জি.ওর অফিস। এন.জি.ও তে নির্মলবাবু চাকরি করেন অথবা ওনারই এনজিও আমি জানি না। সবগুলো নি:শব্দে খোলা হয় আর বন্ধ হয়। সকাল সন্ধে।
- দাঁড়িয়ে আছেন কেন ? বসুন বসুন !
আমি ঘরের ভেতরের একমাত্র চেয়ার দেখিয়ে বছর পঞ্চাশের নির্মলবাবুকে বসতে বললাম। বসতে বলে দেখলাম, চেয়ারটায় চুটকির একটা প্লাস্টিকের যোদ্ধা মৃত মানুষের মতো পড়ে আছে। আমি তাড়াতাড়ি খেলনাটাকে সরিয়ে নিয়ে নির্মলবাবু কে বসতে দিলাম। আমি বসলাম নির্মলবাবুর সামনে, তক্তপোষটায়।
- আমি ভাবলাম আপনি আমার উপর রেগে আছেন ! যাই ক্ষমা চেয়ে আসি।
- না, না। রাগের কী আছে ! যা করেছেন ঠিকই করেছেন। আমি সত্যিই কি ওকে মানুষ করতে পারতাম !
- হ্যাঁ স্বদেশবাবু, হোমে থাকবে। মানুষ হবে। আপনিও তো শুনেছি হোমে মানুষ।
আমি দম বন্ধ করে সব রাগ গিলে নিই এক ঢোকে। আমার মুখে যেন এক ফোঁটা ক্রোধরেখা না ফুটে ওঠে! তার জন্য ভেতরে ভেতরে অসম্ভব পরিশ্রম করছি। মুখে দারুন দারুন সব হাসির ছবি টাঙিয়ে রাখি। তারপর খুব বিনিত ভাবে বলি, হ্যাঁ, দাদা যা হয়েছে ভালোই হয়েছে। ভগবান আপনাকে পাঠিয়েছেন। ঝোঁকের মাথায় করে ফেলেছিলাম। টাকাই বা কোথায় একটা বাচ্চাকে মানুষ করার। আপনি আমার বড়ো উপকার করেছেন।
নির্মলবাবু আমার কথার মধ্যে হেঁ হেঁ করে হেসে ওঠেন। ওনার দাঁতগুলো পরিষ্কার খুব। বয়ষ্ক লোকের দাঁত এতো পরিস্কার সাধারণত হয় না। চুটকীর মতো ঝকঝকে দাঁত নির্মলবাবুর। তবে কি বাধানো দাঁত ?
- কফি বসাই একটু ?
আমি যেন কোন পান্ডার সেবাইত, এমন ভেবে বলি। নির্মলবাবু সেটা নিলেন। মানে আমার সেবা গ্রহণ করে আমায় ধন্য করতে চাইলেন।
- তা খেতে পারি। কিন্তু একটা শর্ত্তে !
- কী শর্ত্তে নির্মলবাবু ?
- আমাকে নির্মলবাবু বলা যাবে না ! নির্মলদা বা শুধু দাদা বলতে হবে। হেঃ হেঃ হেঃ।
- ওক্কে দাদা, তাহলে কফি বসাই। তবে ব্ল্যাক কফি কিন্তু।
নির্মলবাবুর প্রথম দিনের কফিতেই এক চুটকী পেন্সিলের শিষ মেশাই। চুটকীর ভয়ে গত ছমাস আমি পেন্সিলের গুঁড়ো শিষ একটা ছোট্ট কাঁচের কৌটয় ভরে রাখছিলাম। ভয় পেতাম পেন্সিলের শিষের গুঁড়োয় চুটকীর না স্কিন ডিজিজ হয়। আসলে ক’মাসেই খুব ভালবেসে ফেলেছিলাম। চুটকীর জন্যই এই ভেঙ্গে পড়া বাড়িটার পুরানো ঘরটায় সংসার সংসার গন্ধ উঠতো। ওর জন্যই বেয়াল্লিশ বছরের অবিবাহিত জীবনে পিতৃত্বের স্বাদ পেয়েছিলাম। আমার আগোছাল ছন্নছাড়া জীবনে চুটকীর জন্যেই অতিপ্রাথমিক সব বিলাসবস্তু কিনে এনেছিলাম। ওর জন্যে তক্তপোষের উপর দোকান থেকে ম্যাট্রেস কিনে এনেছিলাম। কী খুশি হয়েছিল চুটকী। বলেছিল, ও লোকটা, কী নরম বিছানা গো !
রাস্তার বিছানায় জীবন কাটানো চুটকী আমাকে খুব জড়িয়ে ধরতো। আমি ওকে বাবা বলা শেখাতে চেয়েছিলাম। কিন্তু চুটকি কেবলই আমাকে ও লোকটা বলতো ! আমি একদিন জিজ্ঞাস করেছিলাম, চুটকী, আমাকে বাবা বলিস না কেন ?
চুটকী বড়দের মতো মুখকরে উত্তর দিয়েছিল, যাকেই বাবা মা বলি, সেই মাঝ রাস্তায় ছেড়ে পালায় !
সেদিনই আমি মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, চুটকীকে কোনদিন ছাড়বো না। ওকে মানুষ করবো, বিয়ে দেব ভালো কোন ছেলের সঙ্গে। ওকে নর্মাল একটা জীবন দেব। সেই ভাবে সব কিছু শুরুও করেছিলাম। ওর নতুন জামাকাপড়ের সঙ্গে রঙ্গিন সব বই কিনে এনেছিলাম। আর একটা কাজ শুরু করেছিলাম। শেষ হয়ে এসেছিল প্রায়। চুটকীর বার্থ সার্টিফিকেট সামনের সপ্তায় হাতে পেয়ে সাব। কর্পোরেশানের দালালটা অনেকগুলো টাকা নিক, কাজটা সময় মতোই করেছে।
চুটকীর নাম দিয়েছি চুমকী। কী খুশি হয়েছিল মেয়েটা। বলেছিল, ও লোকটা, এটা তো ভদ্দোরলোকের নাম গো !
আমি বলেছিলাম, তোকে ইস্কুলে পড়াবো চুটকী। পড়বি তো ? আমি রোজ তোকে ইস্কুলে দিয়ে আসবো নিয়ে আসবো।
চুটকী ভ্যাঁক করে কেঁদে উঠেছিল। আমার হাতের আঙ্গুলগুলো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলেছিল, আমি অত ভারী ব্যাগ বইতে পারবো না । আমাকে ইস্কুলের মেয়েরা ভিখিরি বলে চিনতে পারবে ! মারবে গো লোকটা। আমি ইস্কুলে যাব না। আমি তোমার কাছে নাম সই শিখবো। ও লোকটা, আমি তোমাকে ছেড়ে থাকবোওওও না !
সেই চুটকীকে আমার থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে সরকারি হোমে জমা করেছে নির্মলবাবু। আমার কোন বৈধ কাগজ নেই চুটকীকে রাখার। তবু বার্থসার্টিফিকেটটা এসে গেলে একটা কথা ছিল। ওখানে বাবার জায়গায় জ্বল জ্বল করতো আমার নাম। তাতে হয়তো কাজ হত। কিন্তু সে সুযোগ পেলাম কোথায় !
সেই প্রথমদিন থেকে নির্মলবাবুর কফিতে গোপনে পেন্সিলের শিষ মেশাই। কিন্তু গত চারমাসে রোজ বিকালে আমার ঘরে এলেও লোকটার কিচ্ছু হয়নি। যেমন ছিল তেমন আছে। সোম থেকে শনি অফিস খুলে বসে। যদিও
কোন কাজ করতে দেখিনি। ওনার কাছে কাউকে আসতেও বড় একটা দেখি না। উনিও দশটায় এসে সারাটা দিন অফিসে বসেই থাকে। বসে কী করে জানি না। বিকাল হলে, আমি ঘরে থাকলে সিড়ি ভেঙে আসে কফির লোভে। আমি চুটকীর কথা প্রথম দিনের পর কোনও দিন তুলিনি। সমস্ত রাগ, ঘৃণা, প্রতিহিংসা আমার হাসি হাসি মুখোশের ভেতরে লুকিয়ে রেখেছি।
আমি ভেবেছিলাম পান্সিলের শিষে সীসা আছে। শিষ আর সীসা কাছাকাছি উচ্চারণগত মিল আছে বলেই এরকম ভাবা। সীসা স্থির নিশ্চিৎ ভাবে মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। মারাত্মক চর্মরোগ এর প্রথম লক্ষণ। কিন্তু এখন গুগুল থেকে জেনে দেখলাম, পেন্সিলের শীষে সীসা নেই ! যা আছে তাতে কোন ভাবেই মানুষের প্রাণ যাবে না। গ্রাফাইড। আমার প্রতিহিংসা মারাত্মক ভাবে ধাক্কা খেলো। চুটকীকে আমার থেকে সরিয়ে দেওয়াটা আমি কোন ভাবেই মেনে নিতে পারিনি। আমি নির্মলবাবুকে কিছুতেই মাফ করবো না।
- কই ভাই স্বদেশ, কী করছ ?
নির্মলবাবু তিনতলায় ওঠার আগে উঠোনে নেমে আমাকে সাড়া দেয়। দেখে নেয় আমি ঘরে আছি কি না। না থাকলে ওঠার পরিশ্রমও করবে না। কিছু কিছু মানুষ আছে নির্মলবাবুর মতো নিজের অধিকারের বাইরে গিয়ে পাওয়াগুলোকে পাওনাদারের মতো চেয়ে নেয়। আবার চুটকীকে দেখেছিলাম, না পাওয়াগুলো পেয়েও কত উদাস থাকতে পারে। খেলনা ছেড়ে আমার সঙ্গেই বেশি খেলতে ভালবাসতো।
- হ্যাঁ দাদা, আছি। আসুন।
আমি চুটকীর কথা ভুলে যাই জোর করে। ওর কথা মনে পড়লে আমার মুখোশ কাজ করে না। তাছাড়া সকাল থেকেই মাথা খারাপ হয়ে আছে, পেন্সিলের শিষের গুঁড়োয় বিষ নেই জেনে। আমি ভেতরে ভেতরে অস্থির হয়ে উঠি। দাঁতে দাঁতে চেপে বলি, শয়তান তোকে আমি নিজে হাতে শাস্তি দেবই।
তখনই ঘরের দেওয়াল থেকে একটা টিকটিকি ডেকে উঠলো, ঠিক ! ঠিক ! ঠিক !
টিকটিকির ডাকে আমি যেন নিজের কথার সমর্থন পাই। আর একটা বুদ্ধি খুলে গেল টিকটিকির ডাকে। সেদিন আর হলো না। ভাবনাটা কাজে পরিণত করার আগেই নির্মলবাবু আমাকে ঘরের দরজায় হেঁ হেঁ হাসি নিয়ে এসে পড়েছে। অসহ্য নির্মম লাগে হাসিটা, এই গায়ে পড়ে ভাব করার নামে কফি খেতে আসা বা সমগ্র নির্মলবাবু লোকটাকেই নির্মম লাগে এখন।
- বসুন দাদা, বসুন। আমি কফি বানিয়ে আনছি।
- আর বলো না ভাই স্বদেশ ! একা আছ ভালো আছ।
- কেন দাদা ?
আমি পাশের রান্না ঘরে কফি বানাতে গ্যাস জ্বালিয়ে বলি সস্প্যানে জল ঢালি। ফুটন্ত জলে কফি ঢালায় আজ আরাম পাই না। লোকটা বিষের ছাড়া পেয়ে যাওয়ায় আমি নিজের উপর রেগে আছি।
- আমার ছেলের এখন ল্যাপটপ লাগবে !
- তা তো লাগবেই দাদা ! কীসে উঠলো ?
- আর কীসে ! এই তো সবে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এ ভর্তি হল ক’মাস আগে।
- ও হো ! তাহলে তো দাদা ল্যাপটপ লাগবেই।
আমার লোকটার সঙ্গে এক মুহূর্ত খেজুর করতে ভালো লাগছে না। মনে হয় গলা টিপে ধরি। কিন্তু সমাজ আছে, আইন আছে। তার থেকেও আছে ধরা পড়ার আর শাস্তি পাওয়ার ভয়।
- ল্যাপটপ না হয় কিনে দিলাম। এদিকে আবার তোমার বৌদির একটা বড় অপরেশান আছে। ওভারিতে সিষ্ট। ক্যান্সার সাসপেকটেড। কোন দিকে যাই বলো ! আর এই তো অবস্থা !
- কীসের কী অবস্থা দাদা ?
আমি কফি নিয়ে রান্নাঘর থেকে ঘরে ঢুকি। লোকটা আরাম করে আধশোয়া হয়ে বসেছে আমার বিছানায়। ঘেন্নায় গা রিরি করে ওঠে। ওই বিছানাতেই একদিন আমার সঙ্গে চুটকী শুতো। কত কথা হতো। কত আবোল তাবোল বকত। আমাকেও বকিয়ে নিত মেয়েটা। শেষের দিকে বলতো, আমার একটা তোমার মতো ভালো মা চাই।
- ভালো মা কী রে ?
- তুমি লোকটা যেমন ভালো তেমনি একটা ভালো মাও চাই ! বলেই চুটকী আমার পিঠে উঠে পড়তো লাফিয়ে। ওকে নিয়ে সারা ঘর ঘুরতে হবে। আমি বলতাম, তাহলে আমাকে বাবা বল !
- না, ভালো মা আনলে তবে বাবা বলবো !
দুজনেই হেসে উঠতাম খুব। আর আমাদের সেই হাসির কথা উড়ে যেত হয়তো কাঁচ ভাঙ্গা জানলা দিয়ে নিচে নির্মলবাবুর কানে। সহ্য করতে পারেনি আমাদের এই ভালো থাকা। চুটকীকে ছিনিয়ে নিল আইন দেখিয়ে ! এখন মেয়েটা কোথায় আছে কেমন আছে কে জানে। এক ফোঁটা গোপন নোনা জল টপ করে চোখ থেকে গড়িয়ে পড়লো কফির কাপে। আমি কাপটা হাতে নিয়ে বসেই রইলাম, গোপনে চোখ মুছে।
- ব্যবসার যা অবস্থা ল্যাপটপ আর হসপিটাল এক সঙ্গে কী করে কিনবো বলো ?
- ব্যবসা !
আমি বিস্ময় চেপে রাখতে পারি না। এন.জি.ও কখনও ব্যবসা হয় ভাবিনি। লোকটাকে সত্যিই ড্যাস ড্যাস মত দেখতে লাগছে।
- আরে সবই তো ব্যবসা। ইংরেজীতে একটা কথা আছে শোননি, মাইন্ড ইওর ওন বিজনেস ! বিজনেস মানে কাজ। এন.জি.ও টা আমার কাজ।
লোকটা সামলে নেয়। আমিও নিজেকে সামলে নিই। আমার উদ্দেশ্য লোকটাকে চরম শাস্তি দেওয়া। দোঁতো হাসির মুখোশটা ফিটফাট করে মুখে চড়িয়ে নিই।
- তা দাদা বৌদির অপরেশানটা করিয়ে তারপর ল্যপটপ কিনে দিন না ছেলেকে।
আমি নির্মলবাবুর পরম মিত্র সেজে মুখোশের মুখে মধু ঢেলে বলি। মুখোশের ভিতরে লুকিয়ে রাখি চরম শত্রুতা।
তারপর মাস দুই নির্মলবাবুকে সঙ্গে টিকটিকির লেজ সিদ্ধ করে খাওয়াই। নির্মলবাবুর আসার সময় জানতাম। আসার সময় হলেই ঘরের মধ্যে থাকা একটা টিকটিকি কে লেজে ঝুলঝাড়া দিয়ে মেরে লেজ খসিয়ে নিতাম। সেই সদ্য কাটা লেজে প্রচুর জৈব বিষ জানতাম। কিন্তু তাতেও নির্মলবাবুর কিছু হলো না। মরলো না তো বটেই। বরং আমার সঙ্গে খচরামো করার জন্য আরও যেন সজীব হয়ে উঠতে লাগলো ! নির্মলবাবুর স্ত্রীর অপরেশান করাতে হলো না। ওষুধেই সিষ্ট কমে গেল। ক্যান্সার ট্যান্সার অল বোগাস; ভেলোর বলে দিয়েছে, ওসব কোলকাতার ডাক্তারদের টাকা হাতানোর নাটক !
শালা যে সব লোক পরের ক্ষতি করে বেড়ায় তাদের তো খারাপ থাকার কথা। এ লোকটা কী করে একের পর এক মাফ পেয়ে যাচ্ছে। চুটকীটাকে হোমে দিল, না বেচে দিল কে জানে ! হয়তো বিক্রি করে দিয়ে সেই টাকায় বউএর চিকিৎসা করিয়ে এখন বলছে অপেরেশান করাতে হয়নি ! এ হারামীর কিছুই বিশ্বাস করার নেই। একে নিজে হাতে শাস্তি না দিলে শান্তি নেই। আমি নির্মলবাবুর আরও বিশ্বাস পেতে ছেলের ল্যাপটপ কিনতে কিছু টাকা ধার দিলাম।
আসলে সময় কিনলাম। পেন্সিলের শিষে হলো না। টিকটিকির লেজে হলো না। এবার খোঁজ পেলাম সেঁকো বিষের। আর্সেনিক। কিন্তু আর্সেনিক কোথায় পাবো ! জলে আর্সেনিক শুনেছি কিন্তু তাই খাইয়ে তো লোক মারা যাবে না। আর এ হারামী তো সব বিষ হজম করে ফেলছে। জলের বিষে এর কিচ্ছু হবে না। শেষে খোঁজ পেলাম কলেজ ল্যাবে পাওয়া যেতে পারে। কেমিস্ট্রি ল্যাবে সহজলভ্য। কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও জোগাড় করতে পারলাম না।
শেষে একদিন কফি খেতে ডেকে বাজার থেকে কিনে আনা ধারালো ছুরি দিয়ে নির্মলবাবুকে কুপিয়ে দিই। হারামীটা এবারও বেঁচে গেল। ছুরির ঘা পেটের বদলে পড়োলো বাম কাঁধে। চুটকীর জন্যে আমার প্রতিশোধ নেওয়া হলো না। নির্মম নির্মলকে খুন করতে পারলে। চুটকীর আত্মা শান্তি পেতো।
একটানা কথাগুলো বলে সামনের টেবিলে রাখা জলের গ্লাসে হাত বাড়াই। জলের গ্লাসের ঢাকাটা সরিয়ে নীচে রাখি। তারপর গ্লাসটা নিয়ে জল খেতে যাব, টেবিলের উল্টো দিকে বসা অফিসার গ্লাসটা সরিয়ে নেয়। আমার প্রচন্ড রাগ ধরে। এরকম অসভ্যতা এরা করে শুনেছি। আমি রাগটা লুকিয়ে ফেলি। অফিসার মিঃ পোদ্দার বুঝতে পারে আমার রাগের কথা। বয়েস অল্পই কিন্তু দেখতে বেশ বুদ্ধিদৃপ্ত। খুব একটা লম্বা না। মিষ্টি মুখের পুলিশ আমি কম দেখেছি। যদিও আমি পুলিশ নিয়ে খুব একটা উৎসাহী নয়। কোন দিন পুলিশস্টাডি করিনি। “মিঃ রায়চৌধুরী”, চেয়ার থেকে উঠে এসে আমার কেসের আই ও মানে ইনভেস্টিগেশান অফিসার আমার কাঁধে হাত দিয়ে কথা শুরু করে।
আমি প্রথমেই ওনাকে বাধা দিলাম, রায়চৌধুরী আমার পদবী নয়। ওটা হোম থেকে র্যান্ডাম দেওয়া।
- হ্যাঁ স্বদেশবাবু, আমি জানি। আমি আপনার সম্পর্কে সব খোঁজ খবর নিয়েছি। আপনি আপনার অনাথত্ব কিছুতেই মানতে পারেন না। আবার আপনি অনাথদের প্রতি খুব দুর্বল। আপনি সম্ভবত চুটকী নামের কোন রাস্তার বাচ্চাকে একদিন খাইয়ে ছিলেন। মেয়েটাকে নিজের কাছে রাখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু চুটকী নামের বাচ্চাটা আসেনি আপনার সঙ্গে। আমি আপনার রান্নার মাসির থেকে খোঁজ নিয়েছি। কোন বাচ্চাকে সে আপনার ঘরে দেখেনি। কিন্তু আপনি প্রচুর খেলনা কিনেছিলেন বলেছে। আসলে আপনি ভাবতে শুরু করলেন ওই চুটকীকে আপনি ঘরে এনেছেন। কল্পনায় তাকে বড় করতে লাগলেন। একজন অনাথ আর একজন অনাথকে আশ্রয় দেবে এটা একটা চিরকালীন মানসিক শান্তি। আপনি সেই শান্তিটা চেয়েছিলেন কিন্তু চুটকী না আসায় পাননি।
যেহেতু বাচ্চা মেয়েটা সত্যিই আসেনি, আপনার মন চাইছিল এমন একটা ঘটনা যা আপনার এই আশ্রয় দেওয়ার ইচ্ছাটা সম্পৃক্ত করবে। অর্থাৎ আপনি দিতে চাইলেন অথচ তৃতীয় কোন ব্যক্তি বা সংস্থার জন্য পারলেন না। তখনই আপনার মন খুঁজে পায় নির্মলবাবুকে। নির্মলবাবু বহুদিন থেকেই আপনার ঘরে আসে। এন.জি.ও চালান জানতেন। আপনি ওনাকেই আপনার প্রয়োজনীয় কাল্পনিক ভিলেন বানিয়ে নিলেন মনে মনে। সীসা খাওয়ানো, টিকটিকির লেজ খাওয়ানো সব আপনার মনগড়া। তবে আপনার ঘরে আমি একটা কৌটায় পেন্সিলের শিষ গুঁড়ো পেয়েছি। আর দেওয়ালে দু একটা বেঁড়ে টিকটিকি দেখেছি।
আপনি সমস্ত ব্যাপারটা নিজের মনের মত ভাবতে ভাবতে এমন জায়গায় চলে গিয়েছিলেন যে শেষে ঘরের আলু ছাড়ানো ছুরি নিয়ে নির্মলবাবুকে আঘাত করে বসেন। মারাত্মক কিছু আঘাত নয়। তবু একটা কেস রুজু হয়েছে। আপনাকে অ্যারেষ্ট করতেও হল। কিন্তু কালই কোর্টে থেকে জামিন পেয়ে যাবেন। সেভাবেই আমি কেস ডাইরী লিখবো। আর একটা অনুরোধ স্বদেশবাবু, জামিন পেয়ে কোন সাইক্রিয়াটিস্টের কাছে কাউন্সেলিং করাবেন। আমি খুব বেশী সাইকো অ্যানালিসিস জানি না। তবে আপনার কেসটা মনে হয় পার্শিকিউশান ডিসঅর্ডার বলে।
একটানা এতগুলো কথা বলে আই.ও পোদ্দারবাবু টেবিলে রাখা গ্লাসের জলটা এক চুমুকে শেষ করলেন। যাহ বাব্বা, আমি ভাবছিলাম গ্লাসের জলে সেঁকোবিষ মেশানো আছে; আর আমার মত খুনেকে খাইয়ে নিঃশব্দে শেষ করে দেবে পুলিশ প্রশাসন !
ছবি: বিধান দেব

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন