বৃহস্পতিবার, ২৬ নভেম্বর, ২০২০

ছোটগল্প: অনিন্দিতা গোস্বামী

 




                                       যাত্রা 



                বাসটা থামতেই বিনতা গলা তুলে বলল, ছেলের মা কই? তখন লোকজন হুড়মুড় করে নামছে দরজা দিয়ে, কেউ তার কথা তত আমল করল না। এদিকে বিনতার একটু নামা দরকার, প্রকৃতির ডাক তাছাড়া চোখে মুখে একটু জল দেবার ও ছিল। অথচ বাচ্চাটা এমন ভাবে তার কোলে লেপ্টে ঘুমচ্ছে যে সে উঠে দেখতেও পাচ্ছে না চারধার। দেখতে দেখতে সবাই প্রায় নেমে গেল বাস থেকে। পাদানিতে দুপা রেখে বাসের ভেতরে মুখ ঝুঁকিয়ে সুব্রত ডাকল বিনতাকে, কি হলো? নেমে এসো, চা-টা খাবে না না কি! বিনতা বলল, আরে নামব তো, কিন্তু এই যে বাচ্চাটা। 

সুব্রত দরজার ওখান থেকেই বলল, বাচ্চা! কার বাচ্চা, কিসের বাচ্চা?

বিনতা বিরক্তি নিয়ে বলল, কিসের বাচ্চা আবার, মানুষের বাচ্চা, বাসের মধ্যে কি বাঘের বাচ্চা আসবে!

সুব্রত বলল, তা তোমার কাছে এলো কি করে?

 বিনতা বলল, কি করে আবার। ভিড়ের মধ্যে বাচ্চা কোলে নিয়ে মা-টা দাঁড়াতে পারছিল না, টাল খেয়ে খেয়ে পড়ে যাচ্ছিল তাই হাত বাড়িয়ে বাচ্চাটাকে আমি কোলে নিলাম।

সুব্রত বলল, তা বেশ করেছ। এখন বাচ্চাটাকে কোলে করেই নীচে নেমে এসো, বাসের ভেতরে তো এখন আর কেউ নেই। মা নীচে নেমে গিয়েছে বোধহয়। বাচ্চা তখন ডান হাতের বুড়ো আঙুল মুখের মধ্যে পুরে বাঁ হাতে বিনতার আঁচল জড়িয়ে পরম নিশ্চিন্তে ঘুমুচ্ছে। বিনতা তাকে কোলে নিয়েই বাস থেকে নামল। এই বার সুব্রত চেঁচালো, এই বাচ্চাটা কার ? কেউ কোনো সারা শব্দ দিল না। অনেকেই তখন বাড়ির দিকে হাঁটা দিয়েছে আর যারা আবার বাসে উঠবে তারা সকলেই চা খেতে কিম্বা বাথরুমে যেতে ব্যস্ত।

             সদর শহর থেকে করিমপুর দীর্ঘ পথ। তেহট্টের কাছে এসে বাসটা অনেক্ষণ দাঁড়ায়। বেশির ভাগ লোকই নেমে যায় সেখানে। যারা থাকে তারাও নেমে একটু হাত পা ছড়ায়, চা বিস্‌কুট খায়। কেউ কেউ টিফিন খায়। চোখে মুখে জল দেয়, বাথরুম যায়, ড্রাইভার কন্ডাকটর ও কিছুক্ষন মুক্ত বায়ু সেবন করে তারপর বাস ফের স্টার্ট দেয়।

            বাচ্চাটা ততক্ষণে ঘুম ভেঙে এ্যাঁ এ্যাঁ করে চেঁচিয়ে উঠেছে। বিনতা দুবার ও ও করে ঝাঁকি দিতেই আবার চুপ, বিনতার কাঁধের ওপর মাথা দিয়ে পজিশন নিয়েছে। এবার বিরিক্ত লাগছে বিনতার, আচ্ছা মা তো, বাচ্চাকে তার হাতে ধরিয়ে দিয়ে গেল কোথায়? ইতি উতি চোখ দিয়ে খুঁজে কোথাওতো দেখতে পাচ্ছে না মা-টাকে। দুকাপ চায়ের অর্ডার দিয়ে সুব্রত এদিক ওদিক ঘুরতে লাগল আর বলতে লাগল বাচ্চাটা কার দাদা, বাচ্চাটা?

              কিছুক্ষণের মধ্যেই খবরটা চাউর হয়ে গেল চারিদিকে। লোকজন এসে জটলা করে দাঁড়ালো বিনতাকে ঘিরে। প্রশ্নের পর প্রশ্ন। দিদি বাচ্চাটাকে আপনি কখন কোলে নিলেন? কেমন দেখতে ছিল মা-টাকে? কিন্তু এখানে তো কোন ওরকম দেখতে মেয়ে নেই। ও আর এখন নেই বুঝলেন। আপনাকে বাচ্চা ধরিয়ে দিয়ে কেটে পড়েছে। দুনম্বরীতে ছেয়ে গেছে দেশটা একেবারে। অবৈধ বাচ্চা হয়ত। কি করবেন এখন? নিয়ে যান দিদি, আপনাকে বাচ্চাটা খুব ভালোবেসে ফেলেছে মনে হচ্ছে।

             তিন্নি এতক্ষণ চুপটি করে বসে ছিল মায়ের পাশে। আর মাঝে মাঝে বাচ্চাটার ছোট্ট ছোট্ট হাত দুটো নিয়ে খেলা করছিল। এই প্রস্তাব শুনে সে যার পর নাই খুশি হয়ে উঠল। হ্যাঁ মা হ্যাঁ ভাইটাকে আমাদের বাড়ি নিয়ে চল, আমি ওর সঙ্গে খেলব। আঃ তিন্নি একটু চুপ করে বসবি বলে ধমকে উঠল বিনতা। সুব্রত বলল তোমাকে হাজার বার বলেছি যেখানে সেখানে দয়া দেখাতে যাবে না। নাও এখন ঠেলা সামলাও। এতক্ষণে এগিয়ে এসেছে বাসের কন্ডাকটর আর ড্রাইভার ও। কি হয়েছে দাদা? যান যান সবাই গিয়ে বাসে উঠুন আমরা আগে শুনি কি হয়েছে ব্যাপারটা।

            বিনতা যখন বলছিল ব্যাপারটা তখন একটু দূরে পিছনে হাত দিয়ে ঘন ঘন পায়চারি করছিল সুব্রত। এখন কোথাকার জল কোথায় গড়াবে কে জানে। শেষ পর্যন্ত বাচ্চাটা তার ঘাড়েই না চাপে। যত রাগ গিয়ে পড়ছিল বিনতার ওপর আর তার মায়ের ওপর। মায়ের জন্যই সদল বলে বছরে দুবার করে বাড়ি আসতে হয়, না হলে এই গন্ড গ্রামে মোটেও তার এখন আসতে ইচ্ছে করে না। মহালয়া পড়ার আগের থেকেই মায়ের ঘন ঘন ফোন, কিরে তোরা কবে আসবি? আসব আসব, দাঁড়াও ছুটি ছাটা পড়তে দাও, মাকে ঠেকায় সে কোন রকমে। আসলে দেবী পক্ষের শুরুতেই মায়ের উঠোনে মাটির উনুনে চাপে বিশাল কড়াই। জ্বাল পরে গুড়ে, হাতের পাকে শুরু হয় মায়ের মোয়া বানানো, মুড়ির মোয়া, চিড়ের মোয়া। নারকোল গাছ ঝুড়ে খাটের তলায় ডাই করা হয়  নারকোল, এরপর হবে নাড়ু। ঐ অত নারকোল কোরা, ছেঁই করা, মার লোকের দরকার। একা বড় বউ আর মায়ে পেরে ওঠে না। মেজ বউ তো থাকে আমেরিকা। তার তো আর আসা সম্ভব নয় অতএব বেঁড়ে বেটা কে ধর। বিনতাকে ভালো বলতে হবে, সে কোনদিনই এসবে আপত্তি করে না তারই বরং বিরক্তি লাগে। তবু সে যায় কারন অত জমি জমা বাড়ি একা বড়দার হাতে ছেড়ে দিলে পরে আর ভাগের ছিটে ফোটাও জুটবে না। এমনিতেই বড়দা গ্রামে থাকার জন্য দেখভাল ওই তো করে সব। কিন্তু দিন দিন যাত্রা পথটা অসহ্য হয়ে উঠছে। গাড়ি করে যাওয়াও পোষায় না। বড্ড দর হাঁকে ড্রাইভার গুলো।

             যদিও এই ভিড় এড়াতে সে আগে ভাগে পৌঁছে গিয়েছিল বাস স্ট্যান্ডে। তথাপি যখন বাসটা এলো বউ বাচ্চা নিয়ে হুড়োহুড়ি করে উঠতে গিয়ে সে খানিকটা পিছিয়ে গেল ফলত দুজনে বসার জায়গা পেল দুই প্রান্তে, বিনতা মেয়েকে নিয়ে বসল বাসের মাঝামাঝি একটা সিটে আর সে বসল ড্রাইভারের পাশে লম্বা সিটটায়। দুজনে একসঙ্গে বসতে পেলে আজ এই কান্ডটা হতো না।

              কন্ডাকটর বলল চিন্তা করবেন না দাদা, আগে সব লোকজন নামিয়ে নি তারপর বাস নিয়ে সোজা ঢুকিয়ে দেবো থানায়, সেখানেই যা হবার হবে। তবে জানেন তো দাদা কে চোর সে তো বলা যায় না, কে জানে আপনারাই হয়তো ছেলেটাকে চুরি করে পালাচ্ছিলেন এখন ধরা পরে উল্টো গাইছেন। ছেলে ধরায় ভরে গেছে দেশটা। এদের কথা বার্তায় কান মাথা গরম হয়ে যাচ্ছে সুব্রতর। বিনতাও থম মেরে রয়েছে। ঘন ঘন বিড়িতে টান দিচ্ছিল ড্রাইভার, মুখ ঘুরিয়ে বলল এই সব লাফরা আমার ভালো লাগে না, বহুৎ ক্যাচাল করেন আপনারা জানেন তো দাদা। কোথায় ভাবলাম বাড়ি গিয়ে চান করে খেয়ে দেয়ে ঘুম দেবো না এখন চলো থানায়।

              কন্ডাকটরের ধমকানি শুনে একটা লোকও তাদের ছেড়ে বাসে ওঠেনি। সবার প্রবল আগ্রহ বাচ্চাটা আর বিনতাকে ঘিরে। অনেকে সন্দেহের চোখেও তাকাচ্ছে তাদের দিকে। একজন বলল হাসপাতালে তো আজকাল এসব কেস লেগেই আছে। বাচ্চা বিইয়ে ভোর রাতে চুপে চাপে কেটে পড়ে হাসপাতাল থেকে। আর একজন বলল, মানুষ আর কুত্তা কুকুর সব সমান হয়ে গেছে বুঝলেন না। 

অন্য জন বলল, নানা কুকুরের দোষ দেবেন না, কুকুর কখনো বাচ্চাকে ছেড়ে পালায় না। দড়ির মতো চেহারা নিয়েও এক সঙ্গে পাঁচ খানা বাচ্চাকে দুধ দেয়, কি বলো মাষ্টার, বলে লোকটি আর একটি লোকের দিকে তাকিয়ে ঘাড় নাড়ল।

মাষ্টার বলল তা আর কি হবে বলো, ওদের তো আর বৈধ অবৈধ নেই। তবে অন্ধকার আরো গভীর হতে পারে। রাতের অন্ধকারে কত মেয়ে ধর্ষিত হয়ে যায়। সন্তানের জন্ম তো অমন বিপদের থেকেও হতে পারে কহিনুর।

কহিনুর বললেন তা যা বলেছ মাষ্টার। তুমি হলো গিয়ে শিক্ষিত মানুষ, কত রকম বুদ্ধির জাল তোমার মাথায়। সত্যিই তো এই কথাটা মাথায় আসে নি। দিদি, যে আপনার কোলে বাচ্চা দিল তার চেহারাটা কেমন ছিলো? বিনতার মুখে এসে গিয়েছিল ধর্ষনের প্রসঙ্গ উঠতেই আপনার চেহারার কথা মনে হলো কেনো? কোনো কিছু মিলিয়ে দেখবেন নাকি? কিন্তু সে এখন কাদায় পড়া বাঘিনী, তাই সে সেসব কিছু না বলে বলল, ঐ রোগা পাতলা অল্প বয়সী, আমি ভালো করে তাকিয়েও দেখিনি, আমি বাচ্চাটাকেই দেখছিলাম, বাসের ঝাকুনিতে বাচ্চার মাথাটা যদি ঠুকে যায় তাই হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলাম। মা-টা বার বার হুমড়ি খেয়ে পড়ছিলো তো।

                  ড্রাইভার বিড়ির শেষ অংশটুকু ছুঁড়ে ফেলে হাঁক দিল, ব্যাস ব্যাস অনেক হয়েছে এবার সবাই গাড়িতে উঠুন। সবাই মুতে ফিরেছে? জগা গিয়ে টিনে দুটো চাপর লাগা আর হরেনটা একবার জোরে মেরে দিয়ে আয়। দিদি ওঠেন, যান, বাসের ভেতরে গিয়ে বসেন। বিনতা বলল, কিন্তু এখনো অতক্ষণ, বাচ্চাটার যদি খিদে পেয়ে যায়? যদি কাঁদতে আরম্ভ করে? ড্রাইভার প্রায় ভেংচে উঠে বলল, তা এখন তো আমি ওর জন্য ফিডিং বোতলের ব্যবস্থা করতে পারব না। সুব্রত বলল আমি একটা মেরী বিস্কুটের প্যাকেট কিনে নিয়েছি প্রয়োজন হলে জলে ভিজিয়ে একটু একটু করে মুখে দিতে হবে। বিনতা কৃতজ্ঞ চিত্তে সুব্রতর দিকে তাকালো, দেখো এতক্ষণ এত রাগ করছিল এখন আবার নিজেই বাচ্চাটার খাবার ব্যবস্থা করেছে। বাচ্চাটাকে তাদের বাড়িতে নিয়ে গেলে মন্দ হয় না। তার তো একটা মেয়ে আর এই ছেলে, একসঙ্গে বড়ো হবে। এই চিন্তা মনে আসতেই ছেলেটাকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরল বিনতা, কোলে উঠে থেকে কেমন লেপ্টে আছে দেখো। মায়া কাড়া।

                যাত্রীরা একজন একজন করে উঠতে আরম্ভ করলো বাসে। এখন ভিড় বেশ পাতলা। বেশির ভাগ লোকই এই পর্যন্তই আসে। বিনতাও গুটি গুটি পা বাড়ালো বাসের দিকে। মনে তার এক রাশ দুশ্চিন্তা। গলা শুকিয়ে আসছে। কি জানি কি অপেক্ষা করে আছে তাদের সামনে। পুলিসের হাতে পড়লে বাচ্চাটারই বা কি হবে কে জানে। ফালতু ফালতু সে কি একটা ঝামেলায় জড়ালো। ড্রাইভার চলে গিয়েছে তার নির্দিষ্ট সিটে। বিনতা পাদানিতে পা দিতে যাবে শুনলো বাসের ভেতর থেকে চেঁচা মেচি, এই মেয়ে এই ওঠো, দেখো কেমন ভোঁস ভোঁস করে ঘুমাচ্ছে, অর্ধেক শরীর ঢুকে গিয়েছে সামনের সিটের নীচে। দূর থেকে ভালো করে দেখাই যাচ্ছে না।বিনতা দ্রুত উঠে এলো বাসের ভেতরে। ভিড় জমা হয়ে গিয়েছে একদম পিছনের সিটে জানলার কোণে। সে মেয়ে উঠে বসেছে ধড়মড় করে, আমার মনা কই?

মনা কই? সমস্বরে বলে উঠল সবাই, বাচ্চা তোমার?

- হ্যাঁ আমার মনা, তোমরা ভিড় করছ কেন্‌? এডা কোন ইস্‌টপেজ?

সবাই তাকে এই মারে তো সেই মারে, সারা দুনিয়া তোলপার হয়ে গেল আর তুমি অন্যের কোলে বাচ্চা দিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমচ্ছ? 

এগিয়ে গেল বিনতা, বলল, এই তো বাচ্চার মা, তা তুমি সিট পাবার পর আমার কাছ থেকে বাচ্চা চেয়ে নাওনি কেন? বাপরে কি ঘুম তোমার, কোনদিকে হুঁস নেই!

মেয়েটি বাচ্চার দিকে হাত বাড়িয়ে দিতে দিতে বলল, কি করব, রাজ্যের ঘুম যে আমার মাথায়। খুব ঘুমাই পড়ছিলাম। থ্যাঙ্কু মাসি। কি করব কও, শাউড়ি রাত দুপুর পর্যন্ত বিড়ি বান্দায়, মনা কান্দে, বুকের দুধ পায়না তো, তারপর মনার বাপের হুজ্জুতি। কতকাল রাতে ভালো কইরা ঘুমাইনা। হেই জন্যই তো মামা বাড়ি যাইতাছি, ঘুমাইবার লগে।

                  কতটুকু মাত্র বয়স, আহারে সতেরো কিম্বা আঠারো হবে, অপুষ্টির ছাপ সারা শরীরে, নিদ্রাহীনতার কালি চোখের কোণে। মাতৃত্বের বোধই আসেনি ওর ভালো করে। 

বিনতা বলে হয়েছে, খুব হয়েছে, এবার বাচ্চা ধর। বাচ্চাকে তার মায়ের কোলে ফিরিয়ে দিয়ে নিজের জায়গায় এসে বসে বিনতা। ঘঁ ঘঁ করে ভারী ইঞ্জিন স্টার্ট দেয় বাসের। চাকা গড়ায়। বুকের ভেতরটা টন টন করে বিনতার, সেটা বাচ্চাটার জন্য নাকি তার মায়ের জন্য নাকি গোটা ভারত বর্ষের জন্য তা ঠিক সে বুঝতে পারে না।



ছবি: তমিজ মল্লিক


                                                                                                                           

  


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

কবিতা

সম্পাদকের কথা

দ্বিতীয় বর্ষ  ।। অষ্টম সংখ্যা ।। মার্চ ২০২২   খুব অসহায় লাগছে এবার। আমাদের ডান পাশে ধস। বায়ে গিরিখাত। মাথায় বোমারু। পায়ে পায়ে হিমানীর ব...