আজকের দিনে দুর্গাপূজা বাঙালির সবচেয়ে বড় উৎসব হলেও মাত্র তিন থেকে পাঁচ শত বছর পূর্বেও এই পূজার প্রচলন ছিল নিতান্তই হাতে গোনা। তবে একথা বলাই যায় যে একাদশ শতকে মৈথিলী কবি বিদ্যাপতির দুর্গাভক্তি তরঙ্গিনীত দুর্গাবন্দনার উল্লেখ পাওয়া যায়। ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায় ১৫১০ সালে কোচবিহার রাজা বিশ্ব সিংহ দুর্গাপূজার আয়োজন করেছিলেন। কোলকাতার বরিশায় রায়চৌধুরী পরিবারে পূজার প্রচলন ১৬১০ সালে। আবার উড়িষ্যার রামেশ্বরপুরে চারশ বছর ধরে দুর্গাপূজা চলে আসার ইতিহাস পাওয়া যায়। পাটনাতে ১৮০৯ সালের দুর্গাপূজার ওয়াটার কালার ডকুমেন্ট পাওয়া যায়। হুগলীর গুপ্তিপাড়ায় প্রথম ১৭৬১ সালে বারোয়ারি দুর্গাপজার উল্লেখ পাওয়া যায়। ১৭১১ সালে অহম রাজ্যের রংপুরে নিমন্ত্রণ পেয়েছিলেন ত্রিপুরা রাজ্যের দূত রামেশ্বর নয়ালঙ্কার। শোভাবাজার রাজবাড়িতে রাজা নবকৃষ্ণ দেব দুর্গাপূজার মধ্যে দিয়ে সিরাজের পরাজয় উদযাপন করেন। ১৯২৬ সালে জাতি ধর্ম নির্বিশেষে অতীন্দ্রনাথ বোস সবাইকে পূজায় অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ জানান।
দুর্গাপূজার প্রথম প্রচলন কবে কোথায় কিভাবে হয়েছিল তার সঠিক উল্লেখ পাওয়া দুষ্কর। মূল রামায়ণে রামচন্দ্র কর্তৃক রাবণ বধের জন্য দুর্গাপূজার উল্লেখ নেই তবে কৃত্তিবাসী রামায়ণে এই অংশটি বিশেষ প্রসিদ্ধি লাভ করে। মার্কণ্ডেয় পুরাণ মতে চেদী রাজবংশের রাজা সুরথ খ্রীস্টের জন্মের তিনশ বছর আগে কলিঙ্গে দুর্গাপূজার প্রচলন করেছিলেন। নেপালে এই পূজা দশেরা বা দাঁসাই নামে পালিত হয়ে থাকে । দেবী দুর্গার বাসন্তী রূপের অকাল বোধন শরতে হয়েছিল বলেই এটি অকাল বোধন নামেও পরিচিত। তবে অনুমান করা যায় দ্রাবিড় সভ্যতায় মাতৃতান্ত্রিকতা থেকে অথবা শৈব সিন্ধু সভ্যতার পশুপতির অর্ধাঙ্গিনী হিসেবেও দেবী দুর্গার পূজা প্রচলন হয়ে থাকতে পারে। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে কৃষ্ণকে দুর্গাপূজার প্রবর্তক বলা হয়েছে।“প্রথমে পূজিতা সা চ কৃষ্ণেণ পরমাত্মন।/ বৃন্দাবনে চ সৃষ্ট্যাদ্যৌ গোলকে/রাগমণ্ডলে।’’।দ্বিতীয়বার দুর্গাপূজার উল্লেখ ব্রহ্মা কর্তৃক মধু ও কৈটভ নামের দৈত্যদের হাত থেকে নিস্তার পাবার জন্য করেছিলেন বলে উল্লেখ পাওয়া যায়। “মধুকৈটভভীতেন ব্রহ্মণা সা দ্বিতীয়তঃ।’’।এবং তৃতীয় ও চতুর্থবার শিব ও দেবরাজ ইন্দ্র দুর্গাপূজার আয়োজন করেন। দেবীভাগবত পুরাণ অনুসারে ব্রহ্মার মানসপুত্র মনু মর্তে ক্ষীরোদসাগরের তীরে দেবীর মাটির মূর্তি বানিয়ে পূজার প্রচলন করেন।
মূর্তিপূজার ক্ষেত্রে দেখা যায় দশহাতের দেবী দুর্গার মূর্তির প্রচলন এছাড়া সঙ্গে গণেশ কার্তিক লক্ষ্মী সরস্বতী মহিষাসুর এবং বাহন হিসেবে প্যাঁচা ইঁদুর হাঁস ময়ূর সিংহ ও মহিষের উপস্থিতি। লক্ষ করা যায় দেবী দুর্গার হাতে সাপ। সম্ভবত এর প্রতিটিই প্রতীকী। কোথাও দেখা যায় সাবেকি ঢঙের একচালার প্রতিমা আবার কোথাও পৃথক পৃথক মূর্তি। অনেকেই মূর্তিকে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করেন। কেউ কেউ মূর্তি পূজার বিরোধিতাও করেন। এক্ষেত্রে বলা যায় দুই পন্থাই সঠিক। যারা অতি সাধারণ যাদের কাছে বিশ্ব চরাচরের পরিচয় এখনো রহস্যময়তার আবরণে মোড়া তারা মূর্তি পূজায় আস্থা রাখেন অন্যথায় তারা দিগভ্রষ্ট হবার আশঙ্কায় ভোগেন। যারা বিশ্বজনীনতার জ্ঞান লাভ করেছেন তারাই নিরাকার ব্রহ্মে বিশ্বাস রাখতে পারেন। এছাড়া মূর্তি পূজার মধ্যে দিয়ে শিল্পীর শিল্প সত্ত্বারও স্বীকৃতি লাভ ঘটে।
বর্তমানে বহু চিন্তক মানুষ এইসব উৎসব অনুষ্ঠানের বদলে এই টাকা শিল্পে বিনিয়োগের পক্ষে সওয়াল করে থাকেন তাদের দৃষ্টিভঙ্গীও সমাজের পক্ষে হিতকারী বলেই মনে করেন অনেকে। এক্ষেত্রে কিছু পরিসংখ্যানের দিকে নজর রাখা যেতে পারে। যদি ধরা যায় সারা বাংলায় আশি হাজার পুজো অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে তাহলে গড়ে দেড় লক্ষ টাকার হিসেবে মোট ব্যয়ের পরিমাণ ১২০০ কোটি টাকা। এতে একটা দুটো বড় ইন্ডাস্ট্রি হবে ঠিকই কিন্তু তাতে কর্মসংস্থান হবে বড় জোর কুড়ি হাজার লোকের। এই পূজা নামক ইন্ডাস্ট্রির মধ্যে দিয়ে সম্ভবত ছয় সাত লক্ষ লোকের তিন মাসের কর্মসংস্থান হয়ে থাকে। একে বছরে হিসেব করলে দাঁড়ায় দেড় লক্ষ লোকের কর্মসংস্থান। এছাড়া বস্ত্র নির্মাণ পাদুকা শিল্প মিষ্টান্ন ও অন্যান্য ক্ষেত্রেও বহু কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরী হয়। তাই বহু মানুষের বর্ষভিত্তিক রুজিরোজগারের কোনো স্থায়ী সমাধান না ভেবে একটি চিরাচরিত ব্যবস্থাকে ভেঙে ফেলার ভাবনা কতটা যুক্তিযুক্ত তাও বিবেচ্য।
একটা সময় দুর্গাপূজাকে রাজসিক পূজা বলা হলেও বর্তমানে তা সর্ব্বজনীন পূজায় পরিণত হয়েছে। অর্থাৎ সবার জন্য অনুষ্ঠিত পূজা। দুর্গাপূজা আক্ষরিক অর্থেই সর্ব্বজনীন পূজা । পুজায় প্রতিমার খড়ের যোগান দেন চাষী। কুমোর ছুতার মাটি দিয়ে বানায় প্রতিমা। এছাড়া ডোম মালি ব্রাহ্মণ থেকে ময়রা সকলেই অবদান রাখেন । কখনো কখনো লোকদেখানো আত্মপ্রচারকরা ছোঁয়াছুতের ধুয়ো তোলেন। এতে করে একই এলাকার বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদের বাতাবরণ তৈরী হয়। তবু এর মধ্যেই আবার সম্প্রীতির নজির গড়ে ওঠে আলিঙ্গন দৃশ্য অন্য সব স্বার্থগন্ধকে দূরে ছুড়ে ফেলে। নৌকা দোলা কিংবা গজে অথবা ঘোড়ায় দেবীর আগমন হয়। উৎসবের আনন্দে ভেদাভেদ দূর হয়। বেজে ওথে আগমনী …
ছবি: বিধান দেব

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন