কে যেন পিদিম জ্বালিয়ে গেছে মাঙ্গলিক
কিছু কিছু কবিতা পড়তে পড়তে মন অপূর্ব এক রসে সিক্ত হয়ে ওঠে, সোনালি কাঠের দোলনায় দুলতে দুলতে মাটির রোমশ নালিটির গায়ে বেড়ে ওঠা অনামি ফুলের কেশরে ঢুকে তার পুঞ্জিত রেখাগুলিকে স্পর্শ করতে থাকে, অপরূপ কল্পনার ভেতর পাক খেতে খেতে আবার ফিরে আসে নিজের কাছে। বাইরের ধূসর তাপ ও ক্ষোভ থেকে দূরে প্রজাপতিটির চঞ্চল ওড়ার কাছে ভিজিয়ে দিতে চায় সমস্ত অন্তর্মুখ দেহবোধ। এক অপার্থিব ঘোর, নিরালা সাড়া আর মেদুর রঙের কাছে তার সমস্ত যাত্রা নিশ্চুপ হয়ে থাকে। সোমেন মুখোপাধ্যায়ের ‘কাঁঠালপাতা বন্ধুপাতা’ বইটির কবিতাগুলি ঠিক এমনি ধরণের। সে যত বলে তার চাইতে বেশি অভিভূত হতে পারে, সে বেশি খনন করে না কিন্তু একটু একটু করে পাখনা মেলতে পারে। তার সেই পেখমের ভেতর অনুপম রঙের ঝিকিমিকি। সেই পালকের রেখায় অনামি ফুলের গন্ধ। তার আনন্দের মাঝে বুনো কুসুমের বিকাশ। কবি সোমেনের খুব সুন্দর নিজস্ব এক জগৎ আছে আর আছে তেমনি সুন্দর একটি মন। পৃথিবীর সমস্ত কিছুকেই তাঁর মন সুন্দর করে তোলে। সেজন্য অল্পেতেই কাতর হয়ে ওঠে সত্তা। নির্ভার প্রেমের প্রতি তার সহজিয়া অনুরাগ কোনো উন্মন ফাগুনের রঙমাখা পলাশের লজ্জা নিয়ে বিকিরিত হয় আরেক প্রেমের অভিমুখে। অপ্রাপণীয়কে তিনি ছুঁতে চাননি, তৃপ্তির মেঠো সুরে যে লয়, বাঁশের বাঁশির মায়াময়তায় যে আলো, সাধারণ আটপৌরে জীবনের যে নিবিড়তা আর স্বাস্থ্য সেইসব অপ্রাকৃত ছোঁয়াগুলি আরো নতুন হয়ে ওঠে তার মনের স্পর্শে। দু একটি উদাহরণ দিলেই স্পষ্ট হয়ে উঠবে-
একটি বীজ ভিক্ষে করে
এনেছিল পাখি,
এনেছিল আত্মীয়দের ছায়া ও বাসস্থান।
আজ, এইখানে –
গছতলে বসে থাকা পথিক
তুমি কি জেনেছ, পূর্ব আত্মজ?
বটফল ভেঙে তুমি দেখো
সহস্র সবুজ পাতার কাঁপন,
রোদ ঝিকিমিকি
মা-পাখিটির ঠোঁটের মতন
(আত্মজ)
বিশ্লেষণ নয় বরং চুপচাপ বসে থাকতে ইচ্ছে করে, ইচ্ছে করে ওর নিশ্চুপতাকে উপভোগ করতে। মা পাখির আশ্রয় ও পালনের আশ্বাস, স্নেহের বিশ্বাসের কাছে দুদণ্ড জিরিয়ে নিতে ইচ্ছে করে। গাছের ছায়ার তলে বিশ্রামরত পথিক খুঁজে পায় নিজের নাড়ির গন্ধ। পাঠকও দেখতে পায় লাল বটফলের ভেতর মা পাখিটির ঠোঁটের মতন সহস্র সবুজ পাতার কাঁপন। বুঝতে বাকি থাকে না এই কাঁপন আসলে পরম্পরার লালন, স্নেহের স্নানে আত্মাকে সিক্ত করে নেওয়া। কবিতা এগিয়ে যায় এভাবে প্রেমে প্রত্যয়ে মাখামাখি হয়ে-
পথের ওপর পড়ে থাকে পথ।
অর্জুন গাছের বাকল ছাড়িয়ে
পাখি এঁকেছিলাম
পাখিটি আর বাসায় ফিরল না
কোনোও দিন। (পথ)
সোমেন মুখোপাধ্যায়ের কলমে বিরহও মধুর হয়ে ওঠে। বৈরাগ্যের মৃদু রাংতায় মুড়ে কাঁচা রোদ্দুরের মতো আছড়ে পড়ে গোবর নিকানো দাওয়ায়। পরখ করতে থাকে জীবনকেই। এই বিরহবোধ থাকে বলেই তার চোখ সবকিছুকেই সুন্দর দ্যাখে, বিষণ্ণতার মাঝেও অনাবিল মুক্ত আনন্দে ভর করে থাকে অন্তঃসার। বিস্তীর্ণ গতিশীলতার মাঝে যে সংযমের সামঞ্জস্য নিয়ে নদী বয়ে চলে আরো প্রসারণের দিকে সেই আয়ত্ত সেই অর্জন কোনো নতুন সংগীতে কথা বলে ওঠে এই কবির কবিতায় –
মাটির ওপর তৈরি হয়েছে পথ,
পা পথে হাঁটলে
ফিরে ফিরে দেখা হবেই।
পথকে রাস্তা বললে
পথিকের ব্যঞ্জনা নষ্ট হয়।
পথ মানে অজস্র পায়ের ছাপ
পথ মানে ধুলো কিংবা বিশ্রাম,
পিছন ফিরে আরেকবার দেখা।
(পথ)
আর পথ মানে আহ্বান, গতি সুষমা। পথ মানে অন্বেষণ। এই যে দেখা হওয়ার কথা কবি বললেন তা কেমন দেখা হওয়া? এই দেখা হওয়া আসলে আমাদের চিরন্তন কোমল অনুভূতির কাছে আবার ফেরৎ নিয়ে আসা, ভুলে যাওয়া প্রেমকে চিনিয়ে দেওয়া কিংবা আমারই কোনো আয়াস, প্রতিজ্ঞা, ইশারা যা আমরা ভুলে যেতে চাই বারবার অথচ ভুলতে পারি না। পিছন ফিরে আরেকবার দেখা আবার নিকটবর্তী অতীতটিকেও নিরীক্ষণ করা। দেখার ভেতরে এই যে আস্বাদন তার বর্ণলিপিগুলি নানা অনুনাদে প্রতিধ্বনিত হয়ে ওঠে। ছোট্ট ছোট্ট প্রেমের ভাবনাগুলি খুবই মধুর আর অবগুণ্ঠনবতী হয়ে উঠেছে এই কাব্যে –
মাটির হাঁড়িতে ভেজা পলাশের ফুল। ঢাকা
সরিয়ে বারে বারে দেখেছি, কত গাঢ় হল
রঙ। সবুর করা রাত পোহালেই ফ্রকপরা
সকাল। সবার মাঝেই লুকিয়ে চুরিয়ে শরমের
রঙ।
বিকেল নামা পুকুরঘাটে গা মাজছিস
তুই। শরমের রঙ ছড়িয়ে পড়ছে জলে।
দূরে পলাশ গাছে ফিরে আসছে পাখির
দল। তাদের ঝটপটিতে ঝরে পড়ছে
পলাশের ফুল। নীচে ধানক্ষেতের গাড়হা
থেকে বেরিয়ে আসছে ঢ্যামনা সাপ।
(দোল)
প্রেম, মিলন, বিরহ কোনো কিছুই সোমেন মুখোপাধ্যায়ের গাঢ় নয়। বরং সামান্য তার প্রতিভাস, আলতো তার ছায়া। কমনীয়তার পেলব বাঁকগুলি খুব সহজেই চোখে পড়ে। এখানে মিলনের রঙে একাকার হয়ে আছে প্রকৃতি আর মন। দোলের আবিরে আঁকা আছে শরমের শিখা। আর আছে প্রকৃতির আটপৌরে সাজে কিশোরীর মনের প্রতিফলন। ধানক্ষেতের গর্ত থেকে বেরিয়ে আসা ঢ্যামনা সাপ হয়তো কোনো সুপ্ত কামনার প্রতীক। কবিতার ভাষা খুবই নরম। ক্ষণে ক্ষণে এখানে উঁকি মারছে খরা কবলিত পুরুলিয়ার রূপের ঝাঁঝ। অনবদ্য রূপতৃষ্ণা রুক্ষতার কাছে গিয়ে আরো কোনো গভীর খয়েরি দীপনকে ফুটিয়ে তুলেছে। চলুন কবিতান্তরে যাওয়া যাক –
ঠাকুমার চিবানো পান মুখ দিয়ে ঠোঁটে
রাঙা করেছি কতবার। হাসিমাখা এইসব
ঘরকন্নাতে, পানসাজানোর দিনগুলি
ফুরিয়ে আসছে এখন। পানের খুঙিতে
ছোট ছোট ডিবা। ডিবা খুলতেই লাফ
দিয়ে বেরিয়ে আসত খয়ের জর্দার গন্ধ।
(পিরিতি পাতা)
কবিতা পড়তে পড়তে আমাদের মন শৈশবের সেই স্বপ্নালু বর্ণময় দিনগুলির কথায় আচ্ছন্ন হয়ে ওঠে। একটি মন কেমনিয়া বুকের অতলে বাজতে থাকে। আজকের যুগের ব্যস্ত ক্যরিয়ার তৈরির দিনে এই অনুভূতি শান্তির প্রলেপ দিতে সাহায্য করে। ডিবা খুলতেই লাফ দিয়ে বেরিয়ে আসা খয়ের জর্দার গন্ধ আসলে বুকের আগল ঠেলে বেরিয়ে আসা এক চিরন্তন উদ্ভাসও। এই আবহে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে কবিতার অন্তর্গত তাপ ও বিভা-
পানের পাতায় পিরিত জমে থাকে।
পিরিতের রঙে ঠোঁট রাঙাব বলে
পানে চুন সাজতে গিয়ে দেখি খয়ের নেই।
গাঁয়ের মুড়ায় একটি পলাশ গাছ। সবে
রঙ ধরেছে।
(পিরিতি পাতা)
পানের রঙে মিশে থাকে পিরিত। পিরিতের রঙে ঠোঁট রাঙাতে গিয়ে দেখা যায় ঘরে খয়ের নেই। শুধু গাঁ মুড়ায় পলাশ গাছে রঙ ধরতে শুরু করেছে। কবিতাটিতে তখন আলো ফেলে বাউলের প্রেমিক সত্তা, লোকায়ত সুরের টান, আঞ্চলিক রসের সুষমা। কোথাও যেন হালকা দুঃখবোধও ক্রিয়াশীল থাকে। চুন সাজতে গিয়ে খয়েরের অভাব তো দারিদ্র্যকেই দেখিয়ে দেয়। তবুও পলাশফুল ফোটার ভেতর দিয়ে এ বিষাদ আর থাকে না। মধুর আনন্দধারা প্রেমবোধের অনন্যবিভায় জারিত হতে থাকে।
সোমেন মুখোপাধ্যায়ের কবিতায় পুরুলিয়ার জনজীবনের আশা, আনন্দ, দুঃখ-বেদনার মধ্যে যে চিরকালীন এক রসসত্তা বিরাজ করে তারই প্রতিফলন ঘটে থাকে। অভাবের সহস্র ধাক্কা আর প্রাকৃতিক রুক্ষতা এই অন্তরের স্রাবকে টলাতে পারে না। ফলতই দুঃখের বিষাদ নয় দুঃখের প্রাচুর্যকে আবিষ্কার করে তার কবি চৈতন্য। বাস্তবের অগ্নিধ্বস আর জটিলতার ব্যুহে হারিয়ে যায় না কোনোদিন টুসু, ভাদু, ঝুমুরের অভিজ্ঞান। এই সুরের ঝর্ণাধারায় সত্তাকে নিষিক্ত করে নিয়ে একটি জনজাতি এগিয়েছে ঔদার্যের মহৎ অভিমুখে। সহস্র অভাবের আঙিনায় পা রেখেও তাদের ধমনিতে জ্বলেছে সুরের রক্তরাগ। যন্ত্রণায় বিদ্ধ হওয়া নয় বরং যন্ত্রণাকে আলিঙ্গন করে তারা যন্ত্রণাকে ঢাকে, হাত বাড়ায় প্রেমের আলিঙ্গনের জন্য-
গুড় জল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা একটি
দুয়ার। দুয়ার মানে, জিরাবে নাকি তুমি?
(দুয়ার)
এই আতিথেয়তা সোমেন মুখোপাধ্যায়ের কবিত্বেরও ধর্ম। একটি আশ্রয়কে যেন লালন করে চলে, আশ্রয়ের গভীর জ্যোতিকে আঁজলা পেতে নেয়। পথিককে দেখিয়ে দেয় পথ। একটু দূর থেকে দেখে আদিবাসী মানুষদের জীবনযাত্রা, ভালোবাসা এবং সংগ্রামের পরতগুলিকে। দেখতে থাকে ঘুঁটের গায়ে পাঁচ আঙুলের দাগ, সাইকেলের প্যাডেল ঘুরিয়ে আসা ছাতা সারার লোক, গোবর নিকানো ঢেঁকিঘরে ঝিমমারা খুঁকড়ির ছানা, হেঁশেল থেকে উড়ে আসা চ্যাথরা শাকে ফোড়ন দেওয়ার গন্ধ, তুলসী গাছের নীচে মাথা নাড়া প্রদীপের শিখা আর তার সঙ্গে একাকার হয়ে ওঠে মা ষষ্ঠীর ব্রত, লক্ষীপূজা, টুসুর পার্বন, দোল, গাজনমেলা এবং পথের পাঁচালী, পদ্মানদীর মাঝি কিংবা গণদেবতার আখ্যান। এই বহুমুখী আত্মীকরণে এবং অর্জনে জন্ম হয় অপূর্ব সাংস্কৃতিক বয়নের। দেশ-কাল-মানুষের সুগভীর ভাষা ও উন্মোচনকে শিরায় শিরায় প্রবাহিত করে ‘কাঁঠালপাতা বন্ধুপাতা’ দিয়ে যায় পরিপূর্ণ মানবতার মহাসঙ্গীত।
কাঁঠালপাতা বন্ধুপাতা ৳ সোমেন মুখোপাধ্যায় ৳ ছোঁয়া প্রকাশনী ৳ আশি টাকা


কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন