শনিবার, ৩০ জানুয়ারি, ২০২১

ধারাবাহিক গদ্য ।। চন্দন মিত্র


 

জন্মের আগের মুখ : জেন তত্ত্ব ও জেন গল্পের অমায়িক ভুবন

                            

 

হুইনেং-এর আখ্যান অথবা এক অকুলীন নিরক্ষরের আত্মান্বেষণ

                                                

                     .

                                      তিন

 

THE PLATFORM SUTRA OF THE SIXTH PATRIARCH নামক যুগান্তকারী পুস্তক থেকেই আমরা হুইনেং-এর অলোকসামান্য জীবনবৃত্তান্ত সম্পর্কে অবহিত হই। উত্তর-পশ্চিম চিনের দুংহুয়াং (Dunhuang) গুহা থেকে প্রাপ্ত পুথির সম্পাদিত তথা মুদ্রিত রূপই হল এই পুস্তক যার সংক্ষিপ্ত নাম ,প্ল্যাটফর্ম সূত্র। আনুমানিক ৭৮০ খ্রিস্টাব্দের দিকে মূল পুথিটি লিখিত হয়ে থাকবে। ষষ্ঠ আচার্য হুইনেং-এর আত্মজীবনীর আদলে রচিত এই পুথির রচয়িতা ফা-হাই (Fa-Hai), যে হুইনেং-এর প্ল্যাটফর্ম সূত্রের সাক্ষাৎ শ্রোতা হিসাবে খ্যাত। পুথির প্রকৃত রচয়িতা হিসাবে অনেকে শেন-হুই (৬৮৪-৭৫৮ খ্রিস্টাব্দ)-কে চিহ্নিত করেছেন। তাঁদের মতে প্ল্যাটফর্ম সূত্রে বর্ণিত আখ্যান সম্পূর্ণ কাল্পনিক। তাছাড়া পঞ্চম আচার্য হুং জেন-এর হুয়াংমেই মঠে শেনজিউ এবং হুইনেং কোনোদিনই একসঙ্গে ছিলেন না। ফলে বোধিলাভ সংক্রান্ত  তাত্ত্বিক পদ্য প্রতিযোগিতা ও সেই প্রতিযোগিতায় হুইনেং-এর জয় লাভ এবং ষষ্ঠ আচার্যের পদ পাওয়া নিছক গল্পকথা। এই পরিকল্পিত আখ্যান বুনে চতুর শেন-হুই, ষষ্ঠ আচার্য হিসাবে হুইনেংকে প্রতিষ্ঠা দেওয়ার পাশাপাশি এই দাবিও করেছেন যে, তিনি ষষ্ঠ আচার্য হুইনেং-এর প্রধান শিষ্য এবং তাঁর কাছ থেকে সপ্তম আচার্যের পদে মনোনয়ন পেয়েছেন। যদি সত্যিসত্যিই প্ল্যাটফর্ম সূত্র একটি ছদ্ম-পুথি হয়,  তাহলে বলতে হবে চালাকির দ্বারা শেন-হুই-এর আত্মপ্রতিষ্ঠার স্বপ্ন সফল হয়নি। কারণ চ্যান বৌদ্ধ-ধারায় সপ্তম আচার্য হিসাবে তাঁর নাম ইতিহাসে জায়গা পায়নি। আর মহাকালের পরিহাস এই যে তাঁর পরিকল্পিত ষষ্ঠ আচার্য হুইনেং আজ ভুবনজোড়া স্বীকৃতি আদায় করে নিয়েছে। 

           অষ্টম শতাব্দীর শেষের দিকে চিনে চ্যান বৌদ্ধধারার দুটি ঘরানা প্রাধান্য বিস্তারের প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ে - উত্তরের ঘরানা ও দক্ষিণের ঘরানা। উত্তরের ঘরানার কর্ণধার ছিলেন পঞ্চম আচার্য হুং-জেন-এর প্রধান শিষ্য শেনজিউ। এই কুলীন ঘরানাটিকে, রাজতন্ত্রের ছত্রছায়া জোটাতে বিশেষ বেগ পেতে হয়নি l তখন তাং বংশ (৬১৮-৯০৭) চিন শাসন করছে। রাজসভায় সাদরে স্থান পেয়ে যান শেনজিউ (৬০৬- ৭০৬) ও তাঁর উত্তরাধিকারী পুজি (৬৫১-৭৩৯)। এদিকে অকুলীন দক্ষিণ ঘরানার হাল ধরেছেন শেন-হুই। তিনি উত্তর ঘরানার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে, হুইনেংকে ষষ্ঠ আচার্য হিসাবে প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে নেমেছেন। নিজেকে হুইনেং-এর প্রত্যক্ষ শিষ্য ও সপ্তম আচার্য হিসাবে ঘোষণা দিয়েছেন। এখন আমাদের বিনীত জিজ্ঞাসা এই যে, শেন-হুই কি সত্যিই চতুরের শিরোমণি ? তিনি কি নিজে সপ্তম আচার্যের পদ লাভ করার জন্য একটি ছদ্ম-পুথি রচনা করে মানুষকে বোকা বানিয়েছেন? নাকি তিনি কুলীন প্রাতিষ্ঠানিকদের বিরূপ প্রচারের অসহায় শিকার ? আমরা জেনেছি হুইনেং আদতে কোনো কেউকেটা ছিলেন না l যদিও এই সময়ে তাঁকে নিয়ে দিস্তা দিস্তা লেখা বা আন্তর্জাতিক মানের ঝকঝকে সিনেমারও সন্ধান পাওয়া যাবে ! কিন্তু সমসময়ে তিনি যে অবহেলা ও অবজ্ঞার শিকার হয়েছেন তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। হুইনেং ও তাঁর শিষ্যদের বারংবার বিরুদ্ধপক্ষের হামলার মুখোমুখি হতে হয়েছে। নানহুয়া (Nanhua) মঠে ধর্মসূত্র ব্যখ্যার সময় তাঁকে আক্রমণ করা হয়। প্রাণঘাতী হামলা থেকে আত্মরক্ষার জন্য তিনি একটি পাথরের আড়ালে আত্মগোপন করেন। আক্রমণকারীরা তাঁকে ধরার জন্য জঙ্গলে আগুন লাগাতেও পিছপা হয়নি। যাঁকে সবাই মেরে ফেলতে চাইছে, সময়ের পাতা থেকে মুছে ফেলতে চাইছে তাঁকে কি ইতিহাসের পাতায় খুঁজে পাওয়া এতই সহজ! হুইনেংকে নিয়ে কে বা লিখতে যাবে! তিনি তো  সমকালে স্বনামধন্য হয়ে উঠতে পারেননি। তাঁকে সঠিকভাবে চিনত গুটিকয় কাছের মানুষ। তাঁর ছাব্বিশজন প্রত্যক্ষ শিষ্যের কথা জানা যায়। এই কাছের মানুষগুলোও হুইনেং-এর জীবৎকালে তাঁকে নিয়ে সাহস করে কিছু লিখতে পেরেছিল কিনা তাতে সন্দেহ থেকে যায়। তাছাড়া খামোখা লিখতে বা যাবেই কেন যখন মানুষটি সানন্দে তাদের সঙ্গেই দিনাতিপাত করে যাচ্ছেন। বরং মানুষটির অবর্তমানে লেখালেখির প্রাসঙ্গিকতা দেখা দিতে পারে। আর হয়েছেও তাই। হুইনেং-এর তিরোধানের পরেই তাঁকে নিয়ে লেখালেখি শুরু হয়।

           যুগ যুগ ধরে পৃথিবীতে সচল রয়েছে কৌলীন্য রক্ষায় নিবেদিত প্রাণ অগণিত কায়েমিচক্র। এইসব চক্রের ঘৃণ্য চক্রান্তে কত যে অকুলীন প্রতিভা ইতিহাসের পৃষ্ঠা থেকে দাগ পর্যন্ত না-রেখে অদৃশ্য হয়ে গেছে তার নথি কেউ রাখেনি। রামায়ণে শম্বুক নামের এক অভাগার কথা লিখিত আছে। বেদপাঠে অনধিকারী এই শূদ্র জ্ঞান-পিপাসুর দেহ সঙ্গত কারণেই রামচন্দ্র কর্তৃক মুণ্ডচ্যুত হয়। অযোধ্যায় দুর্ভিক্ষের কারণ হিসাবে রাজন্যপুষ্ট ব্রাহ্মণ গণৎকারেরা শূদ্রের  বেদপাঠকেই দায়ী করে বসে। তাঁরা কি ভয় পেয়েছিলেন বেদে কি আছে তা যদি সাধারণে জেনে যায় তাহলে নিজেদের বানানো কথাগুলি বেদবাক্য বলে চালানো সম্ভব হবে না ? অথবা দেবদেবী এবং  মুনিঋষিরাও যে মানুষের মতো পেটুক বা কামুক তা জানাজানি হয়ে যাবে ? অথবা চাকরি বাঁচানোর জন্য পড়াশোনার অভ্যাসটা কি কেঁচেগণ্ডূষ করতে হবে ? আমরা জানি না ঠিক  কোন ভাবনা থেকে তারা এমন তুরুপের তাস খেলেছিল। শুধু জানি প্রজাবৎসল রামচন্দ্র দুর্ভিক্ষ দূর করার জন্য শম্বুককে অভিশপ্ত শূদ্রজীবন থেকে উদ্ধার করেছিলেন। মহাভারতে একলব্য নামের ব্যাধতনয়ের মর্মন্তুদ গুরুদক্ষিণার প্রসঙ্গ তো আমরা সকলেই জানি। কেবল মহাকাব্যিক পরিসরে নয়, মহা ভারতের বাস্তবিক পরিসরেও এমন  উদাহরণের অভাব হবে না। আমরা চার্বাক নামের দার্শনিক সম্প্রদায়ের কথা জানি। বেদ-ব্রাহ্মণ বিরোধিতার জন্য যারা আমাদের শাস্ত্রগুলিতে অস্পৃশ্য হিসাবে বিবিধ কু-বিশেষণে বিশেষিত হয়ে আছে।  চার্বাকদের কোনো গ্রন্থ আমাদের হস্তগত হয়নি। অথচ এমন একটা প্রতিষ্ঠানবিরোধী দমদার দার্শনিক সম্প্রদায় তাদের উত্তরাধিকারীদের জন্য মতাদর্শ-প্রচারক কোনো পাঁজিপুথি রেখে যাবে না এমনটা  মানা যায় না। পণ্ডিতেরা বলছেন তাঁরা যথেষ্ট লেখালেখি করেছেন, কিন্তু বেদবাদীরা সেসব সমূলে বিনষ্ট করেছেন। হয়তো খুন, গুমখুনের মুখোমুখিও দাঁড়াতে হয়েছে চার্বাকপন্থী যুবাদের! অত দূর-সময়ের রক্তের  গন্ধ এখনকার বাতাস বইতে যাবে কেন ? তবুও কি মোছা গেছে সবটা ! না যায়নি। চার্বাকমত খণ্ডন করতে গিয়ে বেদবাদীরা যেসব পুথি লিখেছেন সেগুলিতে উদ্ধৃতি হিসাবে রয়ে গেছে অলৌকিক গালগল্পকে ফালাফালা করে দেওয়ার মতো চার্বাকীয় যুক্তির শানিত ফলা। আর আমাদের বঙ্গভূমি কি দ্যাখেনি  কৌলীন্যের দাপট ? লালন ফকির নামের অপ্রতিরোধ্য মানুষটির মানববাদী মতাদর্শকে মুছে দেওয়ার কম চেষ্টা করেনি শরিয়তপন্থীরা, উচ্চকোটির হিন্দুরাও তাদের সুরে সুর মিলিয়েছে। লালনের তিরোধানের পর আখড়ায় আয়োজিত স্মরণ অনুষ্ঠানে হামলা চালিয়েছে ধর্মোন্মাদ বর্বরেরা। তছনছ করে দিয়েছে  আখড়াবাড়ি, নির্বিচারে প্রহার ও লুঠপাট চালিয়েছে। ফকিরদের মাথার বেণী কেটে নিয়েছে, ভেঙে  ফেলেছে গানবাজনার সরঞ্জাম। তবুও মুছে ফেলা যায়নি সাম্প্রদায়িক চিহ্নমুক্ত লালনপন্থাকে। কেন তারা লালনকে ও তার মতাদর্শকে মুছে ফেলতে চেয়েছে? কারণ অকুলীন লালন মানুষের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে  দিয়েছেন ধর্মজীবীদের বক্তব্যের অসারতা, মানুষকে তিনি উসকে দিয়েছেন তথাকথিত ধর্মীয় বিধিবিধানের মোহ ও ভয়ভীতির বাইরে বেরিয়ে এক বস্তুনিষ্ঠ মানবিক জীবনের অংশীদার হতে। ফলে বেহেস্ত/স্বর্গের লোভ ও দোজোখ/নরকের ভয় দেখানেওয়ালাদের ব্যবসা ভেস্তে যেতে বসে ছিল l আর তাই প্রতিক্রিয়া এমন তীব্র হয়ে উঠেছিল l 

              হুইনেংকে ষষ্ঠ আচার্য হিসাবে স্বীকৃতি জানানো মানে এক অকুলীন নিরক্ষরের কাছে মাথা নামিয়ে দেওয়া। আবার হুইনেং-এর কাছ থেকে যে সপ্তম আচার্যের অভিধা পাচ্ছে সেও এক অকুলীন এবং তীব্র প্রতিষ্ঠানবিরোধী। সুতরাং শেন-হুই যে পদে পদে বাধা পাবে তাতে আর সন্দেহ কী! তবে  সমালোচকেরা হুইনেংকে সম্পূর্ণরূপে উড়িয়ে দিতে পারেননি। তাঁরা হুইনেং সম্পর্কে এইটুকু তথ্য স্বীকার করে নিয়েছেন যে, হুইনেং ছিলেন একজন সাধারণ চ্যান শিক্ষক ; তিনি মোটেও হুংজেন এর কাছ থেকে চীবর ও ভাণ্ড লাভ করে ষষ্ঠ আচার্য পদে অধিষ্ঠিত হননি। আবার কেউ বলেছেন তিনি সম্পন্ন পরিবারের শিক্ষিত সন্তান ছিলেন। মোদ্দা কথা হল অজ্ঞাতকুলশীল কাউকে আচার্য মানতে আমাদের গায়ে লাগে । আশ্চর্যের বিষয় এই যে, আমরা নিজেরা অজ্ঞাতকুলশীল হলেও আমাদের ভাবনা কিন্তু একই থেকে যায়। হুইনেং-এর জীবনকথা আলোচনা করতে গিয়ে একথা ভুললে চলবে না,পঞ্চম গুরু হুংজেন সর্বসমক্ষে হুইনেংকে দীক্ষিত করেননি। তিনি বিষয়টা গোপন রাখতে চেয়েছিলেন। তিনি চাননি হুইনেং বিপন্ন হোক। তিনি চেয়েছিলেন হুইনেং-এর প্রজ্ঞা মানুষকে আলোকিত করুক। সে এমন দূরবর্তী স্থানে চলে যাক, যেখানে ডংশান মঠের বাতাস পর্যন্ত না-পৌঁছায়। তাই তিনি হুইনেংকে সুদূর দক্ষিণে চলে যেতে বলেছিলেন এবং উপদেশ দিয়েছিলেন অন্তত তিন বছর ধর্মপ্রচার থেকে বিরত থাকতে। হুংজেন, প্রতিষ্ঠানের অন্দরে চলা রাজনীতি, ষড়যন্ত্র ইত্যাদি সম্পর্কে সম্যক ওয়াকিবহাল ছিলেন বলেই সরলমনা হুইনেংকে প্রতিষ্ঠানের জটিলতায় বাঁধতে চাননি। তিনি তাঁকে অবাধ জীবনের স্বাদ দিতে চেয়েছিলেন।

            প্ল্যাটফর্ম সূত্র থেকে হুইনেং-এর যে জীবনকাহিনি পাই তা প্রমাণ করে মানুষটি প্রকৃত সাধকের নিরাসক্তি অর্জন করেছিলেন। আসলে এক অকুলীন নিরক্ষর কাঠুরের জীবন যাপন করতে গিয়ে তিনি বুঝেছিলেন আকাঙ্ক্ষাহীন জীবন খুবই সহজ ও সুন্দর। ফলে তিনি কখনওই সম্মান বা শ্রদ্ধার জন্য প্রতিষ্ঠানের দাসত্ব করেননি। এই অনাকাঙ্ক্ষী চরিত্রই ছিল তাঁর সব থেকে বড় শক্তি। তাই তিনি কোথাও সত্যকে এড়িয়ে মিথ্যার সঙ্গে আপোষ করেননি। ফলত যেখানে গেছেন সেখানে পেয়েছেন জয়ের মুকুট, কিন্তু সেই মুকুটকে শিরোপা না-করে তিনি বিনয়ের সঙ্গে হাসতে হাসতে প্রসঙ্গ পালটে প্রত্যাখ্যান করেছেন। এমন বিপজ্জনক মানুষকে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলাই শ্রেয়! নচেৎ আমাদের প্রতিষ্ঠানপ্রেম, আমাদের কৌলীন্যের সুবাস, আমাদের কর্তাভজা মেরুদণ্ড, আমাদের পুথিপড়া জ্ঞান, এসব যারপরনাই জিজ্ঞাসার সম্মুখীন হবে। আবার এহেন হুইনেং যদি সত্যিসত্যি শেন-হুইকে আচার্য পদে দীক্ষিত করেও থাকেন, তাহলে কি তিনি তা  ঢাকঢোল পিটিয়ে করেছিলেন ? আমাদের মনে হয় হুইনেং তেমনটা করেননি। পরিণত বয়সে পৌঁছে তিনি সম্ভবত তাঁর গুরু হুংজেনকৃত গোপনদীক্ষার মাহাত্ম্য অনুধাবন করেছিলেন। তাই নিজের শিষ্যের ক্ষেত্রে একই পদ্ধতি অবলম্বন করেছিলেন। আচার্য নির্বাচনে তিনি কি ভুল করেছিলেন? আমাদের মনে হয় না। চিনা নথিপত্রে প্রাপ্ত শেনহুই সম্পর্কিত তথ্যাবলি তাকে বিতর্কিত এক দ্রোহী হিসাবেই পরিচিতি দান করে। তিনি শেনজিউ ও তার উত্তরাধিকারী পুজির দক্ষিণ ঘরানার বিরুদ্ধে আমৃত্যু লড়ে গিয়েছেন। আসলে তিনি দেখেছিলেন দক্ষিণের ঘরানা ক্রমশ প্রাতিষ্ঠানিকতার পাঁকে তলিয়ে যেতে বসেছে। যে আত্মজাগরণের কথা হুংজেন বলেছিলেন, তাঁর গুরু হুইনেং বলেছিলেন সেই আত্মজাগরণকে অস্বীকার করে নিছক ধ্যান, সূত্রপাঠ, এমনকি কোথাও কেবল দিবারাত্র বুদ্ধনাম জপ চলছে। আর এভাবেই নাকি ধীরে ধীরে মানুষের মধ্যে বুদ্ধপ্রকৃতি জাগ্রত হবে। অথচ তাঁর গুরু হুইনেং বলেছিলেন তিল তিল করে আত্মজাগরণ বা বোধি আসে না, বোধি আসে হঠাৎ আলোর ঝলকানির মতো আকস্মিকভাবে। দক্ষিণ ঘরানার প্রতিক্রিয়ায় তিনি বললেন বুদ্ধ-প্রকৃতির জাগরণের জন্য কিছুরই দরকার নেই, এমনকি ধ্যানেরও।

           নবম শতাব্দীর প্রথম দশকেই দেখা গেল চ্যান বৌদ্ধধারার উত্তর ও দক্ষিণ দুই ঘরানাই অবলুপ্ত হয়েছে। পরিবর্তে নতুন নতুন ঘরানা জন্ম নিচ্ছে। তাদের কোনো কোনোটি সোচ্চারে হুইনেং-এর উত্তরাধিকার স্বীকার করে নিল। এই নতুন ঘরানাগুলির কাছে সাদরে গৃহীত হল হুইনেং-এর হঠাৎ বোধি । প্ল্যাটফর্ম সূত্র জায়গা করে নিল নবজাত মঠগুলিতে। হুইনেং-এর জন্মের আগের মুখ  ধাঁধাটি বুদ্ধ-প্রকৃতি ব্যাখ্যায় প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠল। অবহেলিত, অবজ্ঞাত ইতিহাস থেকে প্রায় মুছে যাওয়া ষষ্ঠ আচার্য হুইনেং আবার নতুন করে জেগে উঠলেন। সব মিলিয়ে এতদিনের অস্বীকৃতির দাপট প্রবল স্বীকৃতির প্লাবনে ভেসে গেল। আর এতসব হল সেই তথাকথিত ছদ্ম-পুথি প্ল্যাটফর্ম সূত্রের বদান্যতায়। চিনের মাটিতে চ্যান বৌদ্ধধারাকে টিকে থাকার জন্য প্রভাবশালী থেরবাদী বৌদ্ধ ধারার সঙ্গে, কনফুসীয় অনুসারীদের সঙ্গে এবং তাওবাদীদের সঙ্গে মতাদর্শগত সংগ্রাম চালাতে হয়েছে। এই সংগ্রামের হাতিয়ার হয়ে উঠেছিল প্ল্যাটফর্ম সূত্র নামের অমোঘ আয়ুধটি। সূত্র শব্দটি মূলত ব্যবহৃত হয় বুদ্ধবাণী বা শিষ্যদের সঙ্গে তাঁর কথোপকথন সংকলন প্রসঙ্গে। ফলে চিনে প্রচলিত সূত্রগুলি পালি বা সংস্কৃত ভাষায় রচিত ভারতীয় পুথির চৈনিক অনুবাদ ছাড়া অন্য কিছু নয়। স্মরণীয় ব্যতিক্রম হিসাবে যুক্ত হয়েছে হুইনেং-এর নামের সঙ্গে ওতপ্রোত জড়িয়ে থাকা প্ল্যাটফর্ম সূত্র। চিনের বৌদ্ধ ঐতিহ্যে একমাত্র এই মৌলিক চিনা পুথিটি সূত্রের মর্যাদায় উন্নীত হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছে। আগেই লিখিত হয়েছে পুথিটির প্রকৃত নাম THE PLATFORM SUTRA OF THE SIXTH PATRIARC যার বাংলা করলে দাঁড়ায় ষষ্ঠ আচার্যের মঞ্চ সূত্র । বৌদ্ধ মঠের একটি আবশ্যিক অঙ্গ মঞ্চ সম্বলিত বক্তৃতা কক্ষ। এখানে প্ল্যাটফর্ম শব্দ দ্বারা সেই মঞ্চকেই চিহ্নিত করা হয়েছে। বৌদ্ধ ঐতিহ্য অনুযায়ী মঞ্চগুলি মাটি থেকে ন্যূনতম তিন ফুট ও সর্বাধিক নয় ফুট উচু হতে পারে। মঞ্চে একটি ছোটো ও নীচু টেবিল রাখা থাকে যাতে সূত্র ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র রাখা যায়। হুইনেং ক্যান্তন শহরের তা-ফান ( Ta-Fan ) মঠের এমনই এক মঞ্চে তাঁর সুপ্রসিদ্ধ বক্তব্যটি রেখেছিলেন। সেদিন শ্রোতৃমণ্ডলীতে ছিলেন বিশিষ্ট আধিকারিক ওয়েই (Wei), কনফুশিয়ান পণ্ডিত, তাওবাদী তাত্ত্বিক, বিরুদ্ধ বৌদ্ধ মতের ভিক্ষু- ভিক্ষুণী, মঠের পরিচারক-পরিচারিকা সব মিলিয়ে প্রায় হাজারখানেক উৎসুক মানুষ। হুইনেং-এর সেই যুগান্তকারী বক্তৃতার লিপিবদ্ধ রূপ হল প্ল্যাটফর্ম সূত্র।

          দশটি অধ্যায়ে বিন্যস্ত প্ল্যাটফর্ম সূত্রের প্রথম অধ্যায়ে রয়েছে হুইনেং-এর আত্ম-বিবরণী। অন্যান্য অধ্যায়গুলিতে প্রজ্ঞা, ধ্যান, বোধি ইত্যাদির ব্যাখ্যার পাশাপাশি চ্যান বৌদ্ধধারার উদ্ভব ও বিবর্তনের দিকটিকেও আলোকিত করা হয়েছে। প্রজ্ঞা সম্পর্কিত হুইনেং-এর ভাষ্য জটিলতামুক্ত। ফলে তা পরবর্তীকালে চ্যান-অনুসারীদের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। হুইনেং বলেছেন প্রজ্ঞা প্রজ্ঞা বলে চিৎকার করলে প্রজ্ঞা লাভ হয়ে না, যেমন খাব খাব বলে গলা শুকিয়ে ফেললেও পেট ভরে না। হাজারবার প্রজ্ঞা পারমিতা সূত্র পাঠ করেও প্রজ্ঞার নাগাল পাওয়া সম্ভব নয়। মুখের ভাষার সঙ্গে মনের মিলন হলেই প্রজ্ঞা আর অধরা থাকবে না, তখন বুদ্ধপ্রকৃতির ও নাগাল পাওয়া যাবে। নিজের প্রকৃতির বাইরে বুদ্ধপ্রকৃতির সন্ধান কেবল আহাম্মকেই করে থাকে। বুদ্ধমূর্তিতে বুদ্ধ নেই নিজের ভিতরেই আছে বুদ্ধ আর বুদ্ধ তো প্রত্যেকেই। জ্ঞানী বা নির্বোধের মধ্যে বুদ্ধপ্রকৃতির কোনো পার্থক্যই নেই। পার্থক্য এই, কেউ আত্ম-  অনুসন্ধান করে ; কেউ করে না। হুইনেং বুদ্ধ-প্রকৃতির অদ্বৈত ভাবটিকে প্রাঞ্জল ভাষায় ব্যক্ত করেছেন।  প্রাসঙ্গিক ক্ষেত্রে তিনি বুদ্ধবচনকেও উদ্ধৃত করেছেন। একদা বুদ্ধদেব জনৈক শিষ্যের জিজ্ঞাসার উত্তরে  বলেছিলেন – দুই ধরণের বিষয় আছে, স্থায়ী ও অস্থায়ী ; বুদ্ধপ্রকৃতি এই দুটির কোনোটিই নয়, বুদ্ধপ্রকৃতি না-স্থায়ী, না-অস্থায়ী। এই বুদ্ধবাণীর রেশ টেনে হুইনেং বললেন বুদ্ধপ্রকৃতির ক্ষমতা অসীম, মহাশূন্যের   মতোই তার বিস্তার । তার কোনো সীমানা নেই। এটা বর্গাকার বা গোলাকার নয়, নীল,হলু্দ,‌ লাল বা সাদা    নয়। এটা না-উঁচু, ; না-নীচু, না-দীর্ঘ না হ্রস্ব । এটা রাগহীন, আনন্দহীন , ঠিকভুলহীন , ভালোমন্দহীন  এর আগাও নেই, গোড়াও নেই। এই বিরোধাভাস এই ধাঁধা হুইনেং-এর ভাষ্যকে অমরত্ব দিয়েছে।

                হুইনেং চ্যান বৌদ্ধধারার উদ্ভব ও বিবর্তনের রূপরেখা নির্দেশ করে গেছেন তাঁর মঞ্চভাষ্যে। তাঁর এই মত এখনও মান্যতা পায়। তাঁর মতে স্বয়ং বুদ্ধদেবই চ্যানধারার সূত্রপাত করে গেছেন। একদা গৃদ্ধকুট পাহাড়ে আহূত এক সমাবেশে বুদ্ধদেব কোনো বক্তব্য না-রেখে ডানহাতে একটি পদ্মফুল নিয়ে সামনে তুলে ধরেন। সমবেত শিষ্যমণ্ডলী বুদ্ধের এহেন আচরণে বিস্মিত হয়। কেবল মহাকাশ্যপ মৃদু হেসে তাঁকে অভিবাদন করেন। বুদ্ধের এই নীরব শিক্ষা থেকেই চ্যানের উৎপত্তি। একমাত্র মহাকাশ্যপই বুদ্ধের কাছ থেকে সেই শিক্ষা গ্রহণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। বুদ্ধ থেকে শুরু হয়ে বোধিধর্ম পর্যন্ত এই ধারা ভারতবর্ষে প্রবাহিত হয়। অতঃপর বোধিধর্ম সেই ধারাটি চিনদেশে বহন করে নিয়ে যান। বুদ্ধদেবকে প্রথম আচার্য ধরলে বোধিধর্ম আটাশতম এবং হুইনেং তেত্রিশতম চ্যান আচার্য। আবার চিনা ঐতিহ্য অনুযায়ী বোধিধর্ম প্রথম আচার্য এবং হুইনেং ষষ্ঠ আচার্য। বস্তুতপক্ষে চ্যানধারার ধারাবাহিক আচার্যপদ হুইনেং পর্যন্ত পৌঁছে থমকে যায়। তারপর শুরু হয় নতুন নিয়মে পথ চলা। চিনের প্রচলিত ধর্মমতগুলির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে বিভিন্ন চ্যানঘরানা। রাজকীয় আনুকূল্যও লাভ করে তাদের কেউ কেউ। চিন থেকে জাপানে পৌঁছে যায় চ্যান মতাদর্শ। জাপানি উচ্চারণে চ্যান হয়ে যায় জেন (Zen)। শুধু জাপান নয় কোরিয়ায় সিওন ( Seon) বা সন (Son) ও ভিয়েতনামে থিয়েন (Thien) নাম নিয়ে চ্যান মতাদর্শ ছড়িয়ে পড়ে। আর এখন তো এই ইউরোপ-আমেরিকায় ও এই মতাদর্শ জেন নামে অভূতপূর্ব সমাদর লাভ করে চলেছে l 

                  

    

তথ্যসূত্র : 

১. ZEN MASTERS OF CHINA : THE FIRST STEP EAST

BY RECHARD BRYAN MC DANIEL; TUTTLE PUBLICATION, TOKYO/ VERMONT/ SINGAPORE.

 ২. THE PLATFORM SUTRA OF THE SIXTH PATRIARCH BY JOHN R. MC RAE; NUMATA CENTER FOR BUDDHIST TRANSLATION AND REASEARCH, BARKELY, CALIFORNIA, AMERICA.

৩. THE PLATFORM SUTRA : THE ZEN TEACHING OF HUINENG BY RED PINE ; COUNTERPOINT, BARKELY, CALIFORNIA, AMERICA.

৪. TRANSMISSION AND ENLIGHTENMENT IN CHAN BUDDHISM SEEN THROUGH THE PLATFORM SUTRA BY MORTEN SCHLUTTER ; TAIPEI CHUNG – HWA INSTITUTE OF BUDDHIST  STUDIES.      

৫. ZENS CHINESE HERITAGE BY ANDY FERGUSON ; WISDOM PUBLICATION, BOSTON.

৬. THE ILLUSTRATED ENCYCLOPEDIA OF ZEN BUDDHISM BY HELEN J. BARONI ; THE ROSEN PUBLICATION GROUP , NEW YORK

                 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

কবিতা

সম্পাদকের কথা

দ্বিতীয় বর্ষ  ।। অষ্টম সংখ্যা ।। মার্চ ২০২২   খুব অসহায় লাগছে এবার। আমাদের ডান পাশে ধস। বায়ে গিরিখাত। মাথায় বোমারু। পায়ে পায়ে হিমানীর ব...