শনিবার, ৩০ জানুয়ারি, ২০২১

কাব্যগ্রন্থ আলোচনা : অনিমেষ মন্ডল

 


শুভজিৎ সেনের কবিতাঃ নির্জনে অশ্বত্থের অবুঝ পাতার মতো পড়ে থাকে 




'এটা সেই ভেলকির হাট।আমাকে জীবনবাবু এখানেই নগ্ন ছেড়ে গেছেন।বাস্তবের টুপি থেকে পরাবাস্তবিক পায়রা উড়লে গড়িয়ে পড়ে একভিড় হাততালি, অবোধ বিশ্বাস।এবং আমিও, হাতে-পায়ে ভারসাম্য বিহীন চাকা।কতদূর সুতো ছাড়ব, কোন মহাসময়ে গুটোব-হাতে ধরে কে শেখাবে?'     
                                                                                                                     এই অংশটির রচয়িতা শূন্য দশকের এক শক্তিশালী কবি শুভজিৎ সেন।পৌর্ণমাসী থেকে চোদ্দশ চব্বিশের অঘ্রাণে প্রকাশিত হয় তার তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ পথঘ্রাণ।তার পূর্ব প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ দুটির নাম অসমতল উষ্ণ (2008)আর বহুভাষী আলো(2015)।তুলনায় পথঘ্রাণ অনেক সহজ ও নির্ভার একটি নাম।অথচ এই কাব্যগ্রন্থে জীবনবোধ কী সুস্পষ্ট এবং গভীর। মনে হতেই পারে পথ চলা তো কবির সম্পদ তাই পথ চলতে চলতে যেটুকু দেখাশোনা যেটুকু অর্জন তাই হয়ত কবিতার স্তরে স্তরে বিন্যস্ত হয়ে আছে।হয়ত কিছুটা তাই।কিন্তু সবটুকু নয়।কবি তো পথিক।পরিক্রমাই তার উদযাপন কিন্তু পথচলা কি আক্ষরিক অর্থে শুধু পথচলা।পথচলা বলতে হতে পারে তা আমাদের দিনাতিপাত আমাদের যাপনের অনিবার্য অংশ।তখন সেই পথের ঘ্রাণ অন্যরকম হতে বাধ্য।যা নিবিষ্ট এক কবিজীবনকেই সূচিত করে।




    








সেই প্রতিদিনের চাওয়া আর না পাওয়ার ব্যবধান,সেই বেদনাবোধের অধিকার কবিকে অর্জন করতে হয়।যা সফল ভাবে পেরেছেন শুভজিৎ।কারণ কবিতা তার রক্তে।উৎসর্গ পৃষ্ঠায় তিনি লিখেছেন যাঁরা আজও কবিতার জন্য ভাবেন।অর্থাৎ কবিতার জন্য ভাবতে পারাটা তার কাছে একটা সাধনা।যে সাধনা এবং তার ক্রমবিস্তারকে  শিল্পের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছেন তিনি।শালপ্রাংশু কবিতায় দেখি.....

'কাঠুরে দেখলেই ভয় হয়।এক-নিশ্বাসে ছুটে চলে আসি বাবার পাঁজরে।দেহ ও চৈতন্য দিয়ে অসুস্থ তাঁকে নিবিড় জড়িয়ে রাখি।বাবার শরীরে একটা অদ্ভুত গাছের গন্ধ ।আঘ্রাণ মাত্রই কেমন ছায়াময় ঘাসের সবুজ হয়ে যাই।মা বলে,স্নেহের ।'

এটুকু উচ্চারণই যথেষ্ট।'মা বলে স্নেহের'-এই কথাটি উচ্চারিত হবার সঙ্গে সঙ্গেই কবিতাটি একটা উচ্চতায় পৌঁছে যায় । বাবা একটা আশ্রয়।সেই আশ্রয়েরও একটা ঘ্রাণ আছে।অদ্ভুত গাছের গন্ধ।সেই গন্ধ একমাত্র কবি পেতে পারেন।কারণ তার একটা ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় থাকে।

নদীয়ার সন্তান শুভজিৎ।তাই তার কবিতায় অন্ধ কানাই,
গোপিনীদের বৃন্দগান,ভক্তদাস এসব থাকবে না তাই কি হয়?অলিন্দগাথা কবিতাটি একবার পাঠ করা যাক....

'কুঞ্জবিহারীর কাঁধে হাত রাখে অন্ধ কানাই ।বলে, গান নয় মাধুকরী নয়-উস্রি নদীর ঝর্ণা দেখতে যাবে।কয়েকটা লতানো গাছ জানালায় মুখ তুলে ঘরোয়া দুপুর দ্যাখে।নববধূর নিঝুম ছায়ায় বুক পাতে আরও একটা ছায়া।খাঁচার সোহাগ যে কী,বিহগ তা হাড়ে হাড়ে বোঝে।ভক্তদাসের চোখে পড়ে কামরাঙা হয় তেলাকুচো ফল....'

কী অদ্ভুত মায়াবী এক দৃশ্যকল্প।কামরাঙা হয় তেলাকুচো ফল।তখনই উস্রি নদীর ঝর্ণার মতো গোপিনীদের বৃন্দগান ভেসে আসে।বর্ষাকালীন রতিসুরে কর্ণফুলী আজও উত্তাল।প্রেমের সঙ্গে যৌনতার সঙ্গে নদীর উপমা বহুবার ব্যবহার করা হয়েছে।কিন্তু সেই ব্যবহার যদি যথাযথ হয় তবে ক্লান্তি আসে না।বরং অন্য এক সুর বাজে যা যৌনতাকে অতিক্রম করেও চিরকালীন হয়ে থাকে।এখানেই কবির দক্ষতা।শুভজিতের কবিশক্তি সম্বন্ধে আমাদের আর কোনও সন্দেহ থাকে না।

প্রেম আসে তার কবিতায়।কারণ প্রেম  কবির কাছে অব্যর্থ এক নিশানা।কিন্তু শুভজিতের কবিতায় প্রেম কোনো কোলাহল সৃষ্টি করে না।দূরে নির্জনে অশ্বত্থের অবুঝ পাতার মতো পড়ে থাকে ।সান্ধ্যকালীন কবিতাটির শেষাংশ দেখুন ....

'বিকেল-বয়সি কিছু মেঘ সন্ধ্যার চাদরে নির্দোষ ভাঙন আঁকছে ।সময় নাটের গুরু।ফলকের সবুজ মুহূর্তগুলো গড়িয়ে চলে হলুদের,বাদামির দিকে।অশ্বত্থের দু-টি পাতা অবুঝ দূরত্বে পড়ে আছে।'

মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্কের পারস্পরিক বিশ্বাস অথবা গড়ে ওঠা ব্যবধান যা আসলে তার ভাষায় অনিবার্য দুঃস্বপ্ন,তাই তার কবিতার অন্যতম উপজীব্য।কারণ সে জানে মানুষকে বাদ দিয়ে কবিতা হয় না।কবিতা আসলে মানুষের সম্পর্ক আর প্রবৃত্তির রসায়ন।কেউ তাকে সহজভাবে বলেন কেউ একটু ঘুরপথে।কিন্তু পথ যেটাই হোক না কেন আমাদের দেখতে হবে তা কতটা কবিতা হতে পেরেছে।এই পরীক্ষায় শুভজিতের ক্রম উন্মোচন ঘটেছে একথা অনস্বীকার্য।কারণ তার সঞ্চয় বলে কিছু নেই।পথকেই  ধ্রুব বলে জেনেছে  ...

'আমার সঞ্চয় শুধু পথঘ্রাণ,যা একদিন পথকেই দিয়ে চলে যাব।সন্ধ্যাকে অনেক আগেই রাতের হাতে তুলে শেষবার জ্বলে গেছে পিলসুজের বুক।'

ভীষণ নির্জনে থাকা এই কবি মাতৃস্নেহকে  নির্বিকল্প বলে মনে করেন। যে ঋণ আমাদের কোনদিন শোধ হবার নয় তার কাছেও নামিয়ে রেখেছেন একটি ভীষণ মায়াময় কবিতা যা শুভজিতের জাত চিনিয়ে দিতে সাহায্য করে...
                         
'সুদূর মন্দির থেকে আঁচলের গিঁটে যে-শিখা এনেছ,তাকে আমি অবিকল্প স্নেহ বলে জানি।কাজলের টিপ,দাঁতে কাটা কনিষ্ঠায় লেগে থাকা প্রযত্ন ও গভীর বিশ্বাস ।সময়ের কাদা-জলে পেছল খাচ্ছি,মাগো।তোমার শাশ্বত হাত ছুঁয়ে রেখো।মায়াময় কোলাহল কেন এত ভীষণ নির্জন!'

কবি শুভজিৎ সেন বড় নির্জনে থাকতে ভালোবাসেন।কবিতার শরীর তিনি বহুদূর পর্যন্ত দেখতে পান।আবহমানের গ্রাম বাংলা থেকে তিনি তুলে আনেন উপমারাশি।বাংলার নম্র মাটির মেদুর ঘ্রাণ তার কবিতার রন্ধ্রে রন্ধ্রে পাই।নাগরিকতা নয় এক সহজিয়া সংস্কৃতির চেতনা তিনি ছড়িয়ে রাখেন এই বইটির কবিতাগুলির পংক্তিমালায়।যা আমাদের যাপনের গভীরতাকে ছুঁয়ে থাকে।

পথঘ্রাণ ।শুভজিৎ সেন।প্রথম প্রকাশ-কল্যাণী বইমেলা 1424।মলাট-কাজল গাঙ্গুলী ।মূল্য-পঁচিশ টাকা।








কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

কবিতা

সম্পাদকের কথা

দ্বিতীয় বর্ষ  ।। অষ্টম সংখ্যা ।। মার্চ ২০২২   খুব অসহায় লাগছে এবার। আমাদের ডান পাশে ধস। বায়ে গিরিখাত। মাথায় বোমারু। পায়ে পায়ে হিমানীর ব...