শনিবার, ৩০ জানুয়ারি, ২০২১

কাব্যগ্রন্থ আলোচনা : আবু রাইহান




 

“মৃত্যুকে নগ্ন করে”-আমি আর       মাত্রাতিরিক্ত উলঙ্গ হতে চাইনা



কবিদের সম্পর্কে কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় মন্তব্য করেছিলেন, ‘কোনো কবিকেই সম্পূর্ণভাবে চেনা যায় না। মানুষ হিসেবে, কবি হিসেবে। প্রত্যেক প্রকৃত কবিই আস্তে আস্তে নিজের চারপাশে একটা অস্বচ্ছ বৃত্ত তৈরি করে নেন, স্বেচ্ছায় কখনো তার থেকে বেরিয়ে আসেন, আবার অনেক সময় অগোচর থাকতেই পছন্দ করেন।কখনো কখনো বৃত্তে সংঘর্ষওলাগে।’শূন্য দশকের শক্তিশালী উত্তরাধুনিক কবি কাকদ্বীপের শান্তনু প্রধান তাঁর ঘনিষ্ঠ অগ্রজ কবিদের প্রতি নায্য অভিমানে নিজের চারপাশে একটা অস্বচ্ছ বৃত্ত তৈরি করে নেওয়ার কারণে কবি হিসেবে অগোচরেই থেকে গেছেন। কিন্তু হৃদয়ের শুশ্রূষা খুঁজতে কবিতাই তার নিরাপদ আশ্রয়!দিনযাপনের ক্লান্তিকর একঘেয়েমি থেকে মুক্তি খুঁজতে কবিতা প্রণয়ীর কাছে আশ্রয় ভিক্ষা করেন নিরন্তর!অসহনীয় রাত্রির কাছে, শিশির ভেজা স্নিগ্ধ ভোরের কাছে কবিতার জন্য অনায়াসে নতজানু থাকেন এই কবি!কি লিখবো আর কিভাবে লিখব এইসব আত্মগত ক্ষরণের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়াতে চান কবি!তাঁর কবিতার ভেতরের বয়ান দৃশ্যমান প্রেক্ষাপট।লেখালেখির সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত থাকতে চান বলেই তাঁর নিঃসঙ্গ যাত্রার অন্বেষণ!ছায়া কিংবা অনির্বচনীয় রাত্রি,ক্ষতবিক্ষত উপত্যকা কিংবা বজ্রপাতের নক্ষত্র যেসব নিঃসঙ্গতার জন্ম দেয় কবি তা লিপিবদ্ধ করতে চান তাঁর যখম ডানায়!ফলে তাঁর কাব্যকথা কবিতা প্রিয় পাঠককে আগ্রহী করে তোলে!

2017 সালে প্রকাশিত “মৃত্যুকে নগ্ন করে” কবি শান্তনু প্রধানের একটি উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ! এই কাব্যগ্রন্থে তিনি কঠিন বাস্তবের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে উচ্চারণ করেছেন ধ্রুপদী কবিতার পংক্তিমালা! প্রতিটি মুহূর্তের যন্ত্রণাদায়ক অনুভব থেকে রচনা করেছেন নিজস্ব দ্বিধাহীন আচরণের যাপিত বর্ণমালা!

‘আস্তে আস্তে নেমে যাচ্ছে নগ্নতার স্রোত! আমি ভয় পাই! সমস্ত ভ্রমণ মিশে যাচ্ছে ভোরের অষ্টমীর ভাটায়! এখনো কি সংজ্ঞাহীন মানুষেরা নিরুৎসাহ হয়ে থাকবে? সারাটা জীবনের একটাই নৃত্য! ত্রিকোণ! পোশাক খুলে অলংকার খুলে ঝাঁপিয়ে  পড়ছে অন্তিম আগুনে! তবু পুরুষ তুমি কেমন আছো!জনহীন দেবতার মুখ শ্যাওলা ঢেকেছে! তবে খাদ্যহীন উলঙ্গ পাগলি ছুটছে কার সন্ধানে! এই আমাদের কৃতজ্ঞতা! আত্মগোপনের কুয়াশায় ভেসে উঠছে পরাগ! কুমারী ধ্বংসস্তূপ থেকে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ছে গর্ভবতী আর্তনাদ! খাদ্যহীন হতে দেখে আমি ভয় পাই বৃষ্টি ও বাল্মিকীকে! ক্রমে বৃষ্টি নামছে, বাল্মিকী ও গৃহহীন বর্ণমালা দাঁতে চেপে বসে আছেন দোআঁশ মাটিতে! তুমি সেখানে একবারও ঘর বাঁধনি! দীর্ঘসময় জ্যামিতিক শুদ্ধতা নিয়ে প্রশ্নের লড়াই চলেছে ফেসবুক আর নিউজ চ্যানেলে! আসলে তারা কেউ কি জানে পকেটে হাত ঢোকালে মুঠো ভর্তি হয়ে কতটা নগ্নতা উঠে আসে! বৈধ নতুবা অবৈজ্ঞানিক-’


কবি শান্তনু প্রধানের যাপিত জীবনের যন্ত্রনা, অসহায়তা বোধ, অপ্রাপ্তি এবং  প্রতিবাদহীনতা মানবিক বোধ এই কাব্যগ্রন্থে জারিত হয়ে কবিতার অক্ষরে ঝরে পড়েছে!

‘তুমি কি দেখতে পাচ্ছো, ওদের কোনো ওষুধ, নেই জলও নেই! তুমি তবে চন্দ্রপথের বাতাস, নতুবা সূর্যবন্দনার মলাটে অপরিবর্তনীয় মাল্টিন্যাশনাল প্রহরী! তাহলে এই চিরহরিতের দেশে ক্যাসিনো কাঞ্চন মাতাল তরুণী সীতা হবে নাই বা কেন? কেনই বা নিদ্রিত পরস্ত্রীর পাশে লুকিয়ে রাখবো না তারায় তারায় রচিত আমার জীর্ণ মাদুর খানি! তার স্বর্ণপতঙ্গ জুড়ে কসমেটিক রঙের খচ্চর, খুব ভরসা করে  লো -কাট ব্লাউজের ড্যাসে একশো আট পদ্ধতির চুম্বন রাখলে ক্ষতি কী!? আমার ত্বকের গভীরে সেই স্রোতের গর্জন! ওহে কালপুরুষ কী যেন বলতে চাইছিলেন? দৈবক্রমে নয়, মহাসিন্ধুর ওপার থেকে যারা ভেসে আসছে তারা আমার প্রতিবেশী! সভ্যতার ডট ইন এ অদ্ভুত ভাবে সংক্রামিত!’

‘জ্যোৎস্না বেয়ে নেমে আসা রাত, মদ ও যৌনতা নিয়ে খেলা করে! আমি তাদের  বাধ্য বিকেল থেকে চুরি করি যাবতীয় সংলাপের ব্রতকথা! তারা আমাকে আগুন মারি চর থেকে বাধ্য করে বয়ার গভীরে ডুব দিতে! আমি তাদের লালিত্ত্বের ঘন  আবরণ উন্মোচন করে দেখি পল্লবিত ছায়ার প্রগাঢ় ঘনিষ্ঠতা! সেখানেও নিরীশ্বর চেতনা অক্ষরবৃত্তের ভেতর মদ ও যৌনতায় ডুবে আছে !’

শান্তনু প্রধান কোনো পেলব ভাষা দ্বারা কবিতার দেহাবয়ব নির্মাণ করেন নি। কিংবা তার কবিতায় নিছক কোনো বর্ণনার খাতিরে চিত্রকল্প  আসেনি।প্রচলিত চিত্রকল্পময়তার এক বৈপরীত্য ভর করে থাকে তার কবিতায়।

‘পৃথিবীর রঙ কী তা জানি না! অনুধাবনের বাইরে অবিশ্বাস্য অনুধাবনে যে কয়েকটা গরু চরে তাদের সোনালী সিং এর মতো নয়তো? ফুটন্ত তেলে এই সমস্যাগুলি থেকে আর কী কী বানানো যায়? তাও আলমারিতে সাজাতে চাই! ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি অন্ধকারের অন্ধকারে গুম হয়ে থাকা আলমারিগুলো শুধুই পাটিগণিতের ঠাসা! তাই আজ সত্যিই পাখির মতো চমৎকার একটা আলমারি টেন- জি সেটে ডাউনলোড করেছি!’ 

‘ঝোপের আড়াল থেকে সন্ধ্যা বেরিয়ে এলে ভয় হয়! ভয় হয় এই বুঝি নক্ষত্রের  অন্ধকার শ্বাসনালী চেপে গলা চিরে ঢুকে পড়বে শরীরের ভেতর! যাবতীয় নগ্নতা নরম বিছানা ছেড়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে মাত্রাহীনতার পথে পথে!          এই কি তবে  গুঢ় সন্ত্রাসে লুকিয়ে থাকা কালের দৃশ্য--শুধু আমি একা ছন্দপতনের পক্ষপাতে হাত ডুবিয়ে বসে থাকি! বিশ্বাস করুন সে এক কঠিন যন্ত্রনা! এই বাঁধনের শিকল ছিঁড়ে পালাতে চাই অজানা চেহারায়, অজানা শব্দে! সেই শব্দে রক্ত ঝরুক, সেই শব্দে উড়ে যাক টকটকে রমণীর সম্ভাব্য কাতুকুতু!’

কবিতা ব্যক্তির ভেতর থেকে উচ্চারিত হলেও তা উৎসারিত হয়েছে একটা সময়ের যন্ত্রণাকে চিহ্নায়নের প্রতীক রূপে, যা সমকালীন সমাজে সৃষ্ট। আধা সামন্ততান্ত্রিক ও আধা ধনবাদী সমাজব্যবস্থা যে সভ্যতার সংকট সৃষ্টি করে ও ভারসাম্যহীনতার জন্ম দেয় এবং তার কবলে পড়ে মানুষ যে দুঃস্বপ্নগুলি দেখে, বহন করে যে মুক্তির আকুতি, তারই রক্তক্ষরণের গান ও স্বপ্ন শান্তনু প্রধানের  কবিতা।

‘নগ্ন হতে কার না ভালো লাগে! রাস্তার মোড়ে যখন ভোর নামে,  আমি সঙ্গম চাই মহাসমুদ্রের কাছে! একজন নিঃসঙ্গ পুরুষের অতিরিক্ত আর কী বা চাওয়ার থাকতে পারে! এইতো সময়            দরজা বন্ধ করে  একা একা নগ্ন হওয়া প্র্যাকটিস করা!এইতো সময় তোমার বিনুনি পেরিয়ে  আমার নগ্নতা খুদকুঁড়ো খুঁটে খায়!-                 ঝড় হোক অথবা মুষলধারা বৃষ্টি প্রতিটি মানুষ স্থিরতা খুঁজে পাওয়ার আগে  নগ্নতা খুলে রাখে  টেবিলের ওপর!’

তাঁর কবিতায় এক ধরনের অস্থিরতাবোধ লক্ষ করা যায়।শান্তনু প্রধানের    কবিতা তাঁর কাব্যচর্চার সময়কালকে চিহ্নিত করতে সাহায্য করে।তাঁর কবিতায় কবিতার প্রচলিত নন্দনতাত্ত্বিক উপরি কাঠামো সযত্নে উপেক্ষা করে ভেতরের বয়ানটাকেই অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আর এই ভেতরের বয়ানটা কবির যাপিত জীবনের পরিমণ্ডল থেকে এসেছে ।

‘প্রতিদিন যে ঢেউয়ের মাথায় পা রাখলে পার হয়ে যায় সংঘাত, আজ সেই ঢেউয়ের নিঃশ্বাস গোধূলি উচ্চারণে মেলায় প্রভুত্বের অচেনা নারী-চোখ! আমার স্বপ্নে,অতিক্ষীণ আলোর ভেতর হেঁটে যায় ম্যানগ্রোভ অরণ্য, আর শব্দের ব্যঞ্জনমথিত নদী-নালা!কোথায় তোমার অহংকারী জ্যোৎস্না? একা একা এক কিশোরী নোনা-কাদা ধূসর সন্ধ্যার গায়ে দু-হাতে মাথায়!হেঁতাল পাতা চিরে ঢেকে ফেলি নগ্নতা!এই বুঝি হরিণঘাটে ঝাঁপ দিলো বাঘ আর কুমিরের ফিসফিস!

-নদীর ঢালু পাড় বেয়ে নোনা ঘাসে সাপ খোঁজে প্রনয়ের ঘন আঁধার!’

    

‘একা একা ঘুরপাক খেতে খেতে ভাবী পরিতক্ত মাটির রঙ কেন বিকেল হয়ে যায়! এইতো জীবন, সিগন্যাল পেরিয়ে পুরষশক্তি পাড় ভাঙার চেষ্টা করছে শুধু! তোর কাঁধের ওপর যে বৃষ্টি ভেজা অস্থি রেখেছি তারই ভগ্নাংশে আমার নক্ষত্রমন্ডল ঘোরাফেরা করে! ধাক্কাধাক্কি হওয়ার আগে স্বেচ্ছায় তুই সরে দাঁড়াস! গণতন্ত্রের পিঠ নিচু ,গণতন্ত্রের মাথা নিচু, উদ্ধত প্রহরীরা তাই তাপসী মালিক খোঁজে!’


‘আমাকে ভাঙ্গে প্রতিদিন !মানুষ নাকি মানুষের মতো অন্য কারা! ভাঙতে ভাঙতে আমার উঠোন জুড়ে জড়ো করেছি ছাই!

-- আমার অগভীরে জেগে থাকা কচুরিপানা যৌথ উদ্যোগে ঘিরে ফেলে কর্পোরেশন! এই নিয়ন্ত্রণ কি শপথের মতো দ্রুতগামী! 

--এখানে এন্ডিগেন্ডিদের অস্তিত্বের লড়াই! আমি আরো কতটা ভাঙলে শৃঙ্গই হোক বা নতুন সিংহাসন নিশ্চিত হবে জয়!’


কবি শান্তনু প্রধানের ‘মৃত্যুকে নগ্ন করে’ কাব্যগ্রন্থটির অনেক কবিতায় উত্তরাধুনিক কবিতা হয়ে ওঠার মতো প্রয়োজনীয় উপাদান মজুত ছিল! চিত্রকল্প নির্মাণের অভিনবত্বেও কবি যথেষ্ট স্মাটনেস দেখিয়েছেন!কিন্তু কবির অতিরিক্ত শব্দের জাগলারি মানসিকতার কারণে এই সব কবিতাগুলি মহৎ কবিতা হয়ে উঠতে গিয়েও লক্ষ্য ভ্রষ্ট হয়েছে বলে আমার মনে হয়েছে!


1 টি মন্তব্য:

কবিতা

সম্পাদকের কথা

দ্বিতীয় বর্ষ  ।। অষ্টম সংখ্যা ।। মার্চ ২০২২   খুব অসহায় লাগছে এবার। আমাদের ডান পাশে ধস। বায়ে গিরিখাত। মাথায় বোমারু। পায়ে পায়ে হিমানীর ব...