আলো – অন্ধকারে মেশা
আমাদের হয়তো মনে আছে নাইজেরিয়ার এক কবি নাম ওলে শোয়িংকা বলেছিলেন - কোনো বিশেষ আদর্শের প্রতি আনুগত্য দেখাতে গিয়ে কেউ কেউ কবিতাকে আহত করেন, তাঁর সৃজনশক্তির অপচয় ঘটান। তিনি যদি নিজের কথিত আদর্শকে লেখালিখির উপরে স্থান না দিতেন, তাহলে তাঁরা কিন্তু চমৎকার সব লেখা লিখতে পারতেন এবং নিজের আদর্শগত চিন্তার প্রতিও সৎ থাকতে পারতেন ।দেবাশিসের কবিতা – যাপনের সঙ্গে নিরন্তর যুক্ত থাকার সুবাদে বলতে পারি দেবাশিস নিজের অবস্থানে ঠিক থেকেছেন এবং সৃজনশক্তির অপচয় ঘটান নি । তিনি নিজের মত একটা স্বতন্ত্র ভাষায় পথ চলতে ভালোবাসেন । বলা যায় এ পথ তার একার । তেমন কোনো পূর্বসূরীর দ্বারা তিনি সেভাবে প্রভাবিত নন । এই যে প্রভাবহীন হয়েও উত্তীর্ণ একটা রচনায় মনোনিবেশের একটা ভঙ্গিমা দেবাশিস গড়ে তুলেছেন তাই তাঁর কবিতার প্রতি আমার একটা ব্যক্তিগত মোহ কাজ করে ।আমি তার জীবনযাপন জানি, পত্রিকা সম্পাদনা জানি ফলে তার কবিতার ভিতরে প্রবেশ করতে আমার কাঠখড় পোড়ানোর প্রয়োজন পড়ে না। একদম স্বচ্ছ একজন মানুষের নাম দেবাশিস । আসলে দেবতার আশিস প্রাপ্ত মানুষ তো এমন হবেই । একজন কবি তো বলেছিলেন কবিতা আসলে ব্যক্তিগত জীবনযাপন ।অবশ্য জীবনযাপনের সঙ্গে মিল নেই এমন অনেকেই কবিতা লিখে চলেছেন এবং আপাত বিচারে তারা কবি হিসাবে সাফল্য পাচ্ছেন । কিন্তু এই সাফল্য সার্থকতায় রূপ নেয় না । সময়ের হাতে রয়েছে একটা বড়ো মাপের ঝাঁটা – সে সব সাফ করে দেয় । পড়ে থাকে কিছু মণিমাণিক্য , রত্নশোভা । ফলে মনে হয় এদিক থেকে দেবাশিসের কবিতায় একটি দুটি সোনার কুচি থেকে যেতে পারে ।ভবিষ্যৎ সে কথা বলবে ।আমি আগাম ভবিষ্যৎবাণী করে রাখলাম । বক্ষ্যমাণ কবিতাগ্রন্থটি ‘ প্রজাপতি রঙের গ্রাম ’ । নাম দিয়ে পুরো চেনা না গেলেও বেশ খানিকটা তো চেনা যায় ।এই নামটিও তেমনই । প্রথমেই একটা ভাল লাগা – একটা মুগ্ধতার বোধ ছুঁয়ে গেল। আজ গ্রাম সেভাবে নিরাপদে নেই – ‘পথের পাঁচালী’র গ্রাম পাল্টে পাল্টে একেবারে পাল্টেই গেছে । এখানেও ঘটেছে আজ নাগরিক জীবনের ছায়াপাত ।ফলে অনেকাংশে গ্রাম তার নিজস্ব জৌলুস হারিয়েছে ।অথচ যখন এমন নামের একটি অরণ্যদর্শন ঘটে যায় , ভালোলাগার আবেশে পাতা খুলি – দেখি নিভৃতে দেবাশিস লিখে রেখেছেন – আমার বহমানতার অন্যতম কারিগর । আমার ভাবতে ভালোলাগে অগ্রজ কবিদের সেই স্বর্ণজ্জ্বল পংক্তি – কবিতার ইতিহাস আসলে বন্ধুত্বের ইতিহাস। দেবাশিস সেই ভালোলাগার মন্ত্রোচ্চারণের ঘোর এনে দিলেন । বইটি নিজের পত্রিকার তরফ থেকেই প্রকাশিত হয়েছিল যে পত্রিকার নাম আজ সকলেই প্রায় জানেন ‘ছাপাখানার গলি’ । আর প্রিয় রবীনদা –কে বইটি উৎসর্গ করেছে দেবাশিস। রবীনদা –র মতো মানুষও যে আজ ফুরিয়ে আসছে। তাই তাঁকে মনে রাখার মতো চমৎকার এই ব্যবস্থাপনা দেখেও ভাল লেগেছে । বইটির রচনাকাল ২০১১ অর্থাৎ একদশক আগে তবু কবিতাগুলোর ওপর এতটুকু ধুলো পড়েনি । বরং যতদিন যাচ্ছে তত নতুন নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হচ্ছে ।সে সূত্রে আরও কিছু কথা এসে ডানা মেলে বসে। আর কথা হল দেবাশিসের শব্দ দ্যোতনা বেশ অন্যরকম তার শব্দযুগ্ম ব্যবহার বেশ অভিনব ।একদিকে নতুন শব্দ তৈরি এবং অন্যদিকে তার সুপ্রযুক্ত ব্যবহার খুব কম কবির মধ্যেই দেখতে পাওয়া যায়। কারো কারো মতো হয়তো শব্দের নতুন ব্যবহার লক্ষ করি। এ প্রসঙ্গে শঙ্খ ঘোষ বা জয় গোস্বামীর কথা মনে করতে পারি ।তারা একটি শব্দের পুরোনো ব্যবহারে যে জীর্ণ রূপ তাকে নতুন পোশাক পরিয়ে তাকে সাজ দিয়েছেন বা আরও বেয়াড়া করেছেন সেই কবিতার নিজস্ব প্রয়োজনে। ফলে দেবাশিসের প্রতি একটা বিশ্বাস আছে যে তাঁর কবিতা কিছু দিতে চায় ।ছন্দে লেখা অন্তঃসারশূন্য পংক্তিমালা সে লেখে না। তার লেখা পড়ে প্রাণ পাই। আশ্বাস পাই বেঁচে থাকার । শুধু প্রাণ পাই বা আশ্বাস পাই না । সে তো রামকৃষ্ণ কথামৃতেও পাই- । এখানে তা নিশ্চয়ই কবিতা হয়ে ওঠে।আগে কবিতা পড়ে যদি কখনও বাণী হয় – তা হবেও বা। এভাবেই আমার স্বল্প বোধের পরিধিতে তাঁকে বুঝি। না- বোঝার মতো করে দেবাশিস কিছু বলে না। ব্যক্তি দেবাশিস যেমন স্বচ্ছ কাচের মতো তার কবিতাও তেমনই। তাঁকে নিয়ে এমন অনেক কথাই তো বলা যায় । এক কলমের কালি হয়তো সে জন্য যথেষ্টও নয়। আপাতত কবিতার বইটিতে ঢুকি । এই গ্রন্থের সব ক’টি কবিতা যে আমার ভালো লেগেছে। তেমন নয়, আবার সব যে ভালো লাগেনি তেমনও নয়। কিন্তু তার Subdued tone টি আমার খুব ভালো লেগেছে। ভালোলাগা ব্যাপারটি আপেক্ষিক । আমার রুচির সঙ্গে সবার সব কবিতা যাবে না।কিন্তু কবিতাগুলো পড়তে পড়তে কবির মনোভঙ্গিটাই আসল কথা। প্রতিটি শব্দ ভেঙে ভেঙে কবির বোঝার রীতিটা সেকেলে। তাকে বুঝতে হয় বৃহৎ প্রেক্ষাপটে । বিদেশে, আপাতত সে দেশের নাম থেকে বিরতি থাকলাম একটি দেওয়ালে একটিই ছবি রাখা হয় এই বৃহৎ প্রেক্ষাপটটি আনার জন্য – বিষয়টি আপনাদের জানা । তবু একবার মনে করালাম মাত্র । দেবাশিসের ৪৬ সংখ্যা কবিতাটিই যদি উদাহরণ হিসাবে নিই তবে আপনারা মানবেন আমার কথা। আগে কবিতাটি রাখি –
নোনা বাতাসে
বদলে যাচ্ছে খেলার রঙ
রাত পেরিয়ে পেরিয়ে
দুঃখভরা জাহাজ
খুঁজে বেড়াচ্ছে রঙিন শহর
মেঘ অনুবাদ করছে পাহাড়ি মেয়ে,
নিসর্গের গুঁড়ো গুঁড়ো আলো মেখে,
দাঁড়িয়ে আছে ঘরের মেয়ে
রাস্তার ওপারে চিৎকার করছে শীত
এখানে কোনো নতুন শব্দ নেই বা দেবাশিসের যে নতুন শব্দবন্ধের দ্যোতনা তা এখানে নেই তবে বলা যায় এ কবিতাটি দেবাশিসের একান্ত নিজস্ব । কী চমৎকার বলেছেন দেবাশিস ‘দুঃখভরা জাহাজ খুঁজে বেড়াচ্ছে রঙিন শহর ।’ আমরা এই লাইনটির কাছে নতজানু হতে রাজি। কিংবা অন্য কবিতায় ‘আমাদের গোপনে / কে বা কারা / এঁকে রাখে লাল টকটকে রোদের ঠিকানা ।’ একটু আগেই যে বলছিলাম কবিতা বাণীর ভূমিকা নিতে পারে এখানে তার প্রমাণ মিলল । অথবা ‘জঙ্গলবাড়ি শাসন করছে। কয়েকটি গনেগনে সূর্য।’ মনে হতে পারে কয়েকটি গনগনে সূর্য কীভাবে সম্ভব । হ্যাঁ এটা বৈজ্ঞানিকভাবে যেমন সম্ভব তেমনই প্রতীকী সত্তায়ও হতে পারে। হয়তো এভাবেই রবীনদাকে এই বই উৎসর্গ করতে চেয়েছেন দেবাশিস ।কী অপূর্ব দৃশ্যকল্প রচনা করেছেন দেবাশিস ‘সামুদ্রিক সম্পর্ক নিয়ে আধশোয়া আকাশ । এভাবেই আমরা যদি এই বই রচনার সময়টি দেখি – সেটা ২০১০। প্রকাশকাল ২০১১। রাজনৈতিক পটভূমিকেও মনে রেখেছেন দেবাশিস। তিনি লিখেছেন – ‘কপ্টার পাখির ডানায় পরিবর্তনের রঙ / দানার নীচে সবুজ জমি কুড়াচ্ছে / প্রজাপতি রঙের গ্রাম।’ এইখানেই রয়ে গেছে – লাশে লাশে ভরে উঠছে ভ্যানগাড়ি / গাড়িতে গাড়িতে ভর্তি হচ্ছে লাশ।’ ফলে নাম যতই ‘প্রজাপতি রঙের গ্রাম’ সেখানেও জারি হয়েছে অন্য এক চাপা কান্না – বিষাদের ঘের । ফলে শুধু আনন্দ , উল্লাস নয় দেবাশিস চোখের কাজল যেমন এঁকেছেন তেমনই ভোলেননি চোখের জল আঁকতে । সার্থক হয়েছে ‘ট্রাপিজের মেয়ে / এক হাতে জল অন্য হাতে আগুন নিয়ে / দশবছর হাঁটছে।’
প্রজাপতি রঙের গ্রাম / দেবাশিস সাহা
ছাপাখানার গলি – ষাট টাকা

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন