পলাশযাপন
দশক অনুযায়ী বাংলা কবিতার প্রচলিত বিভাজনকে মান্যতা দেওয়ার একটা রেওয়াজ গত শতকের মধ্যবর্তী সময় থেকে শুরু হয়েছে । সেই পথে চলতে চলতে একুশ শতকের সূচনা দশক বা শূন্য দশকে
যাঁরা কবিতা লিখতে এসেছেন , তাঁদের আলাদা হয়ে ওঠার একটা তাগিদ লক্ষ্য করা যায় । নিজস্ব কাব্যভাষা ও বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সময়ের বাস্তবতাকে স্বীকার করে নিয়ে এই নতুন লিখতে আসা কবিরা প্রতিদিনের জীবন-যুদ্ধকে চালিত করে দেন কবিতার শব্দবন্ধনীতে । ব্যক্তি থেকে সমাজ , দেশ থেকে বিশ্ব ---- এ সবকিছুই সহমত এবং ভিন্নমতের লালনে তৈরি করে নিয়েছেন তাঁরা । পলাশ দে তাঁর দ্বিধা-সংশয়-আশ্রয় নিয়ে এই সময়ের অন্যতম একটি কণ্ঠস্বর। ২০১৫ , সেপ্টেম্বরে প্রকাশ পাওয়া 'চশমা যা দেখতে পাচ্ছে না ' ( 'ধানসিড়ি' প্রকাশন) আমাদের খালি চোখের গুরুত্ব বুঝতে কিছুটা হলেও সাহায্য করে ।
জীবনের সুলুক সন্ধান করাই একজন কবির তন্নিষ্ঠ কাজ । সেই উন্মোচনে নেমে পলাশের কবিতার উচ্চারণ সার্থক হয়ে ওঠে ----
" না , হেরিটেজ নয় এক শ্বাস দীর্ঘ
সহ্য লালন করবে বলে জীবন সারাচ্ছে
#
আত্মমৈথুনের পরমে হাত কাঁপছে তোমার!
ও ঠাকুর ওওও শূন্য উত্তেজনা
#
নাহ্ মাটির অসুখ নেই বিলকুল
ঝুঁকে থাকা আজ ভুল করুক শিরদাঁড়ায়
#
আমার জন্ম মন্থনেই কি যুদ্ধ
শুরু এবং খতম হয়েছিল?
#
এই তো পলাশ তুমি যা ইচ্ছে রং লুঠে নাও "
--- ' চশমা যা দেখতে পাচ্ছে '
কবিতাটি ' আত্মমৈথুনের ' কথা আছে । যৌনতাকে যদি দূরে রাখি , তাহলে থাকে প্রতিদিনের সংগ্রামময় জীবন । আর জীবিকার উপচিন্তা । সে ও তো একদিক থেকে আত্মমৈথুন । আমরা একে অপরকে বুনে চলেছি নিরন্তর । ' এক সুতো অন্ধ বুনছে আরেক চশমা '।
চারপাশে যা কিছু ঘটছে , যা কিছু ঘটতে পারে অথবা যা ঘটতে পারত ---- সে সমস্তই ঘুম খিদে স্নানের মত ওতপ্রোত জড়িয়ে কবিতাগুলোতে। পলাশের নিজস্ব চেতনা জটিল পরীক্ষা-নিরীক্ষার ভেতর দিয়ে এগিয়েছে । " পাখি শ্মশান নেই কোথাও/ উড়তে পুড়তে আদর ক্ষয়ে ওঠা /এই বিশ্রাম এই তো পালক / পলক মিশে যাচ্ছে মাটি ও গাছে /গাছের শ্মশানে বসি । বসো /আমি পাশের জনের থেকেও পাশের জন হয়ে উঠছি। "('জন্ম')। রং ভাঙার শব্দ নিয়ে উপস্থিত পলাশ । জমি-জায়গাও এক হয়ে যাচ্ছে এই ধুঁকতে থাকা সময়ের কাছে । গুমরে উঠছে জন্মস্থান ।
" তোমার কুরুক্ষেত্রের শঙ্খ ভেঁপু বাঁশি
পানিহাটীতে আমার শিস
গুমরে ওঠে "
----- ' কুরুক্ষেত্র ভার্সেস পানিহাটী '
' চশমা যা দেখতে পাচ্ছে না ' বইটির প্রায় প্রতিটি কবিতায় যৌনতার অনুষঙ্গ ধরা পড়েছে । এ এক উদ্দীপন । নির্ভীক মন তার গোপন ইচ্ছাটিকে গোপন রাখেনি । সে অনুপস্থিত প্রতিপক্ষকে মনে করে জিজ্ঞাসা ছুড়ে দেয়। সে জিজ্ঞাসা এক অর্থে সমাধানও। ----
"অন্তত একবার নগ্ন হব , ব্রহ্মাণ্ডের দোহাই
দর্জি মাপা পোশাক মানায় না পলাশকে কোনোদিন "
এই হল পলাশ দে এবং এই তাঁর কবিতা ভাবনার কিছু মুহূর্ত । শব্দের পর শব্দ , বাক্যের পর বাক্য নির্মাণের ক্ষেত্র প্রস্তুত করে তাতে ছিটিয়ে দেন প্রাণতরঙ্গ। ফলে সেই কবিতা তখন নিহিতার্থে হয়ে ওঠে পলাশের পথরেখা।


কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন