ছবি ঋণ: অনিরুদ্ধ মান্না
ছবি ঋণ: অনিরুদ্ধ মান্না
ভি ন দে শি তা রা
এমিলি জোয়ে বেকার
সাম্প্রতিকতম অস্ট্রেলিয়ান কবিতার একটি উল্লেখযোগ্য নাম এমিলি জোয়ে বেকার । জীবিকার জন্য তিনি একসময় ওয়েট্রেস হিসেবে কাজ করেছেন , কাজ করেছেন রেকর্ড বিক্রির দোকানে । পেশার প্রয়োজনে কখনো তাঁকে সাজতে হয়েছে খরগোশ , কখনো আবার বাঘ! আবার জোকারও সাজতে হয়েছে তাঁকে। বিচিত্র তাঁর জীবন। তিনি বিশ্বাস করেন ছোটদের কথা মন দিয়ে শুনতে হবে। তিনি চান ক্লাসরুমের মধ্যে কবিতাকে মজাদার , রোমাঞ্চকর আর অপ্রত্যাশিত উপায়ে ছড়িয়ে দিতে । তাঁর কবিতার বিষ্যবস্তু নারীবাদ , সাইবার গুণ্ডামি , বিজ্ঞাপন আর অস্ট্রেলিয়ার সংস্কৃতি । পেয়েছেন বেশ কিছু পুরস্কার। তাঁর কবিতা অস্ট্রেলিয়াসহ নানা দেশে বহুলপঠিত। তাঁর কবিতা স্থান পেয়েছে ‘অস্ট্রেলিয়ার প্রেমের কবিতা’ এবং ‘ Sincerely , and Yours Truly’ সংকলনে। অস্ট্রেলিয়ার প্রায় ৯০টি প্রাইমারি এবং সেকেন্ডারি বিদ্যালয়ে তিনি কবিতা পড়ান , কবিতা লেখা আর কবিতা কিভাবে পড়তে হয় তা শেখান। তাঁর একটি চিঠি “ Why It’s Utterly Essential to Taech Poetry to Teenagers” প্রকাশিত হয়েছে Women of Letters internationally distributed anthology Airmail নামক সংকলনে ,যেটি প্রকাশ করেছে পেঙ্গুইন। ছোটদের জন্য তাঁর লেখা বইয়ের সংখ্যা ১৪ , এখনও অব্দি তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা তিনটি , সেগুলি হল ___ ‘সেলফি প্রেস’ , ‘হিট অ্যান্ড মিস’ , এবং ‘লাইনার নোটস’ । এছাড়াও তিনি থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত। অল্পবয়সীদের তিনি নাটক লিখেছেন। বর্তমানে তিনি অস্ট্রেলিয়ার প্রথম টিন টিম পোয়েট্রি স্ল্যামের সৃষ্টিশীল পরিচালক ।
আমাকে এস এম এস পাঠাও সোনা
ই জি বি
আমার সঙ্গে কথা বোলো না ।
আমার কথা বলার
সময় নেই।
আমাকে টেক্সট করো। এস এম এস পাঠাও আমায়।
আমার মতো করো , সিনাত্রার স্টাইলে।
আমি ওই ল্যান্ডলাইনের টেনশন চাই না ,
ওই অতিরিক্ত ফোনের এক্সটেনশনের কথা উল্লেখ কোরো না ।
ছোট হাতের হরফে আমার ঠোঁট চুষে দাও।
আমাকে এস এম এস পাঠাও সোনা ,
আমাকে একজন উত্তেজক মহিলার মতো অনুভব করাও।
শব্দের ব্যবহারে মিতব্যয়ী হও
মাইক্রোওভেনে তপ্ত সবুজ সসের মতো ভাষা ব্যবহার করো ।
একটামাত্র মেসেজ পাঠিয়ে
আমাকে ঠকানো যাবে না ।
ফোনে ছিনালি করো , আমার স্কার্ট ভিজিয়ে দাও ,
আমাকে চোখ মারো পিজিয়ন ইংরেজিতে।
২২ সেন্টের বিনিময়ে তুমি কি কি করতে পারো আমাকে দেখাও।
আমাকে নোংরা শব্দগুচ্ছ পাঠাও
আমার সময়ের মধ্যে থেকে তোমাকে দেওয়া তিরিশ সেকেন্ডে মুড়ে
আর আমি সেগুলো এমন জায়গায় রাখব যেখানে সবচেয়ে জোরে কম্পন অনুভূত হয়।
আমাকে তোমার রিংটোন বেছে দিতে দাও ,
আমি সেটা বিপজ্জনক অঞ্চলের প্রধান সড়কে পরিণত করব।
কোনও বস্তাপচা লোমশ গতানুগতিকতা নয়
কোনও তোমার বাবা কেমন আছেন নয়
কোনও তোমার মা কেমন মুরগি রাঁধেন নয়
কথাবার্তা চালিয়ে যাওয়ার জন্য কোনও আলবাল খসড়া নয়।
আকাশের দিকে পাঠানো
ছোট্ট খামটি উড়ে যাবে
এখন আর কোনও পিছনে ফিরে যাওয়া নেই ,
বিশেষ করে সেই লোকটার জন্য যে প্রেমিকাকে নোংরা মেসেজ পাঠাতে গিয়ে
ভুল করে নিজের মাকে পাঠিয়ে বসে আছে
তার ‘যাহ!’ অনেক দূর থেকে শোনা যাচ্ছে।
তোমার প্রযুক্তি আমাকে দেখাও
তোমার কিপ্যাড সক্রিয় আর আমিও।
আমি তোমাকে আমার ইনবক্সের ভিতর চাই।
অপশন সিলেক্ট করো ___ রিপ্লাই।
তোমার ফোন প্যাড দুধক্ষরণের মতো বিকিরণ ছড়াচ্ছে আর আমি ডিম্বাণু উৎপাদন করছি।
দেখাও তুমি কেমন খেলতে পারো ,
তুমি খেলতে চাও … সাপ ?
তোমার যতিচিহ্নের ব্যবহারে আমাকে আনন্দ দাও ,
দুবার স্ক্রোল করলে পড়া যায় এমন কথোপকথন হোক।
আমাকে তোমার সবচেয়ে যৌন উত্তেজক মুহূর্তের কথা বলো ,
কিন্তু কয়েক মুহূর্তের জন্য ।
এখন সেই পরবর্তী সহস্রাব্দ , সময় গুলি ভর্তি বন্দুক।
শুধুমাত্র আনন্দের জন্য মোবাইল চালু করার কোনও জায়গা নেই।
আমার কাছে ঘড়ি নেই ক্লিক আর ব্রাউজ করার জন্য আর
টাইপ আর কথা বলা আর পড়া আর প্রিন্ট করার জন্য।
আমাকে এস এম এস পাঠাও সোনা ।
আমাকে রোমাঞ্চিত করো , প্রোফাইলে আমাকে রাখো , ভোর তিনটের সময় আমাকে চমকে দাও
তোমার পাঠানো এস এম এস - এর আচমকা দুবার বিপ শব্দের মাধ্যমে
আর কখনো তোমার পাঠানো শব্দগুলির ভিতরে কিটস-এর কৌশলী ব্যবহার
একেবারে তোমার ছাপ মারা ,
অশুদ্ধ , মিশেল দেওয়া ভালোবাসা।
আমি কামনা করি এই অবকাশ , কন্ঠস্বর থেকে মুক্ত ,
কত মানবিক , কত বিরক্তিকর , কত অপ্রয়োজনীয় খুঁটিনাটিতে ভরা।
আমাকে তুমি একটি বর্ণ দিয়ে লেহন করো ।
আমাকে তুমি একটি উদ্ধৃতি দিয়ে চুমু খাও।
আমাকে তুমি একটা হাইফেন দিয়ে জড়িয়ে ধরো।
একটি কমা দিয়ে তুমি আমার প্রণয় প্রার্থনা করো।
কল ডাইভার্ট এর মাধ্যমে তুমি আমায় আদর করো ।
ওহ সোনা ,
আমি অল্পসময়ের জন্য মনোযোগ পেতে চাওয়া মেয়েদের মতো ।
আমি এম টিভি প্রজন্ম
অথবা আমাকে কখনই বলা হয় নি যে আমি কোনদিন এম টিভি দেখিনি
আমি ‘ বেতার প্রজন্ম’
আর আমার হাতে সময়ই ছিল না ওসব দেখার আর যাইহোক
আমার ক্ষমতাও ছিল না ।
আমি হচ্ছি সেই প্রজন্ম যারা ভাবে ‘ আহ! আমি এখন যা করছি
তার বদলে আমার অন্য কিছু করার কথা ছিল’ ।
ভালো , দারুণ , এখন আমায় বসতে হবে আর গোছাতে হবে
আর আবার গোছাতে হবে আর ডেটা আর আমার ফাইলগুলো আর লগ ইন করতে হবে
আর আমার নার্ভাস ব্রেকডাউন হবে
আর ঘুম আর এস এম এস …
শর্ট মেসেজ সার্ভিস।
আমার বেশ্যাকে তলব করো ।
বোকার মতো আমাকে প্রভাবিত করো।
আমার চেতনাকে প্রলুব্ধ করো ।
আমার আত্মাকে থাপ্পড় মারো।
আমাকে এস এম এস পাঠাও সোওওওওনা ।
জন্মের আগের মুখ : জেন তত্ত্ব ও জেন গল্পের অমায়িক ভুবন
হুইনেং-এর আখ্যান অথবা এক অকুলীন নিরক্ষরের আত্মান্বেষণ
.
THE PLATFORM SUTRA OF THE SIXTH PATRIARCH নামক যুগান্তকারী পুস্তক থেকেই আমরা হুইনেং-এর অলোকসামান্য জীবনবৃত্তান্ত সম্পর্কে অবহিত হই। উত্তর-পশ্চিম চিনের দুংহুয়াং (Dunhuang) গুহা থেকে প্রাপ্ত পুথির সম্পাদিত তথা মুদ্রিত রূপই হল এই পুস্তক যার সংক্ষিপ্ত নাম ,প্ল্যাটফর্ম সূত্র। আনুমানিক ৭৮০ খ্রিস্টাব্দের দিকে মূল পুথিটি লিখিত হয়ে থাকবে। ষষ্ঠ আচার্য হুইনেং-এর আত্মজীবনীর আদলে রচিত এই পুথির রচয়িতা ফা-হাই (Fa-Hai), যে হুইনেং-এর প্ল্যাটফর্ম সূত্রের সাক্ষাৎ শ্রোতা হিসাবে খ্যাত। পুথির প্রকৃত রচয়িতা হিসাবে অনেকে শেন-হুই (৬৮৪-৭৫৮ খ্রিস্টাব্দ)-কে চিহ্নিত করেছেন। তাঁদের মতে প্ল্যাটফর্ম সূত্রে বর্ণিত আখ্যান সম্পূর্ণ কাল্পনিক। তাছাড়া পঞ্চম আচার্য হুং জেন-এর হুয়াংমেই মঠে শেনজিউ এবং হুইনেং কোনোদিনই একসঙ্গে ছিলেন না। ফলে বোধিলাভ সংক্রান্ত তাত্ত্বিক পদ্য প্রতিযোগিতা ও সেই প্রতিযোগিতায় হুইনেং-এর জয় লাভ এবং ষষ্ঠ আচার্যের পদ পাওয়া নিছক গল্পকথা। এই পরিকল্পিত আখ্যান বুনে চতুর শেন-হুই, ষষ্ঠ আচার্য হিসাবে হুইনেংকে প্রতিষ্ঠা দেওয়ার পাশাপাশি এই দাবিও করেছেন যে, তিনি ষষ্ঠ আচার্য হুইনেং-এর প্রধান শিষ্য এবং তাঁর কাছ থেকে সপ্তম আচার্যের পদে মনোনয়ন পেয়েছেন। যদি সত্যিসত্যিই প্ল্যাটফর্ম সূত্র একটি ছদ্ম-পুথি হয়, তাহলে বলতে হবে চালাকির দ্বারা শেন-হুই-এর আত্মপ্রতিষ্ঠার স্বপ্ন সফল হয়নি। কারণ চ্যান বৌদ্ধ-ধারায় সপ্তম আচার্য হিসাবে তাঁর নাম ইতিহাসে জায়গা পায়নি। আর মহাকালের পরিহাস এই যে তাঁর পরিকল্পিত ষষ্ঠ আচার্য হুইনেং আজ ভুবনজোড়া স্বীকৃতি আদায় করে নিয়েছে।
অষ্টম শতাব্দীর শেষের দিকে চিনে চ্যান বৌদ্ধধারার দুটি ঘরানা প্রাধান্য বিস্তারের প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ে - উত্তরের ঘরানা ও দক্ষিণের ঘরানা। উত্তরের ঘরানার কর্ণধার ছিলেন পঞ্চম আচার্য হুং-জেন-এর প্রধান শিষ্য শেনজিউ। এই কুলীন ঘরানাটিকে, রাজতন্ত্রের ছত্রছায়া জোটাতে বিশেষ বেগ পেতে হয়নি l তখন তাং বংশ (৬১৮-৯০৭) চিন শাসন করছে। রাজসভায় সাদরে স্থান পেয়ে যান শেনজিউ (৬০৬- ৭০৬) ও তাঁর উত্তরাধিকারী পুজি (৬৫১-৭৩৯)। এদিকে অকুলীন দক্ষিণ ঘরানার হাল ধরেছেন শেন-হুই। তিনি উত্তর ঘরানার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে, হুইনেংকে ষষ্ঠ আচার্য হিসাবে প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে নেমেছেন। নিজেকে হুইনেং-এর প্রত্যক্ষ শিষ্য ও সপ্তম আচার্য হিসাবে ঘোষণা দিয়েছেন। এখন আমাদের বিনীত জিজ্ঞাসা এই যে, শেন-হুই কি সত্যিই চতুরের শিরোমণি ? তিনি কি নিজে সপ্তম আচার্যের পদ লাভ করার জন্য একটি ছদ্ম-পুথি রচনা করে মানুষকে বোকা বানিয়েছেন? নাকি তিনি কুলীন প্রাতিষ্ঠানিকদের বিরূপ প্রচারের অসহায় শিকার ? আমরা জেনেছি হুইনেং আদতে কোনো কেউকেটা ছিলেন না l যদিও এই সময়ে তাঁকে নিয়ে দিস্তা দিস্তা লেখা বা আন্তর্জাতিক মানের ঝকঝকে সিনেমারও সন্ধান পাওয়া যাবে ! কিন্তু সমসময়ে তিনি যে অবহেলা ও অবজ্ঞার শিকার হয়েছেন তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। হুইনেং ও তাঁর শিষ্যদের বারংবার বিরুদ্ধপক্ষের হামলার মুখোমুখি হতে হয়েছে। নানহুয়া (Nanhua) মঠে ধর্মসূত্র ব্যখ্যার সময় তাঁকে আক্রমণ করা হয়। প্রাণঘাতী হামলা থেকে আত্মরক্ষার জন্য তিনি একটি পাথরের আড়ালে আত্মগোপন করেন। আক্রমণকারীরা তাঁকে ধরার জন্য জঙ্গলে আগুন লাগাতেও পিছপা হয়নি। যাঁকে সবাই মেরে ফেলতে চাইছে, সময়ের পাতা থেকে মুছে ফেলতে চাইছে তাঁকে কি ইতিহাসের পাতায় খুঁজে পাওয়া এতই সহজ! হুইনেংকে নিয়ে কে বা লিখতে যাবে! তিনি তো সমকালে স্বনামধন্য হয়ে উঠতে পারেননি। তাঁকে সঠিকভাবে চিনত গুটিকয় কাছের মানুষ। তাঁর ছাব্বিশজন প্রত্যক্ষ শিষ্যের কথা জানা যায়। এই কাছের মানুষগুলোও হুইনেং-এর জীবৎকালে তাঁকে নিয়ে সাহস করে কিছু লিখতে পেরেছিল কিনা তাতে সন্দেহ থেকে যায়। তাছাড়া খামোখা লিখতে বা যাবেই কেন যখন মানুষটি সানন্দে তাদের সঙ্গেই দিনাতিপাত করে যাচ্ছেন। বরং মানুষটির অবর্তমানে লেখালেখির প্রাসঙ্গিকতা দেখা দিতে পারে। আর হয়েছেও তাই। হুইনেং-এর তিরোধানের পরেই তাঁকে নিয়ে লেখালেখি শুরু হয়।
যুগ যুগ ধরে পৃথিবীতে সচল রয়েছে কৌলীন্য রক্ষায় নিবেদিত প্রাণ অগণিত কায়েমিচক্র। এইসব চক্রের ঘৃণ্য চক্রান্তে কত যে অকুলীন প্রতিভা ইতিহাসের পৃষ্ঠা থেকে দাগ পর্যন্ত না-রেখে অদৃশ্য হয়ে গেছে তার নথি কেউ রাখেনি। রামায়ণে শম্বুক নামের এক অভাগার কথা লিখিত আছে। বেদপাঠে অনধিকারী এই শূদ্র জ্ঞান-পিপাসুর দেহ সঙ্গত কারণেই রামচন্দ্র কর্তৃক মুণ্ডচ্যুত হয়। অযোধ্যায় দুর্ভিক্ষের কারণ হিসাবে রাজন্যপুষ্ট ব্রাহ্মণ গণৎকারেরা শূদ্রের বেদপাঠকেই দায়ী করে বসে। তাঁরা কি ভয় পেয়েছিলেন বেদে কি আছে তা যদি সাধারণে জেনে যায় তাহলে নিজেদের বানানো কথাগুলি বেদবাক্য বলে চালানো সম্ভব হবে না ? অথবা দেবদেবী এবং মুনিঋষিরাও যে মানুষের মতো পেটুক বা কামুক তা জানাজানি হয়ে যাবে ? অথবা চাকরি বাঁচানোর জন্য পড়াশোনার অভ্যাসটা কি কেঁচেগণ্ডূষ করতে হবে ? আমরা জানি না ঠিক কোন ভাবনা থেকে তারা এমন তুরুপের তাস খেলেছিল। শুধু জানি প্রজাবৎসল রামচন্দ্র দুর্ভিক্ষ দূর করার জন্য শম্বুককে অভিশপ্ত শূদ্রজীবন থেকে উদ্ধার করেছিলেন। মহাভারতে একলব্য নামের ব্যাধতনয়ের মর্মন্তুদ গুরুদক্ষিণার প্রসঙ্গ তো আমরা সকলেই জানি। কেবল মহাকাব্যিক পরিসরে নয়, মহা ভারতের বাস্তবিক পরিসরেও এমন উদাহরণের অভাব হবে না। আমরা চার্বাক নামের দার্শনিক সম্প্রদায়ের কথা জানি। বেদ-ব্রাহ্মণ বিরোধিতার জন্য যারা আমাদের শাস্ত্রগুলিতে অস্পৃশ্য হিসাবে বিবিধ কু-বিশেষণে বিশেষিত হয়ে আছে। চার্বাকদের কোনো গ্রন্থ আমাদের হস্তগত হয়নি। অথচ এমন একটা প্রতিষ্ঠানবিরোধী দমদার দার্শনিক সম্প্রদায় তাদের উত্তরাধিকারীদের জন্য মতাদর্শ-প্রচারক কোনো পাঁজিপুথি রেখে যাবে না এমনটা মানা যায় না। পণ্ডিতেরা বলছেন তাঁরা যথেষ্ট লেখালেখি করেছেন, কিন্তু বেদবাদীরা সেসব সমূলে বিনষ্ট করেছেন। হয়তো খুন, গুমখুনের মুখোমুখিও দাঁড়াতে হয়েছে চার্বাকপন্থী যুবাদের! অত দূর-সময়ের রক্তের গন্ধ এখনকার বাতাস বইতে যাবে কেন ? তবুও কি মোছা গেছে সবটা ! না যায়নি। চার্বাকমত খণ্ডন করতে গিয়ে বেদবাদীরা যেসব পুথি লিখেছেন সেগুলিতে উদ্ধৃতি হিসাবে রয়ে গেছে অলৌকিক গালগল্পকে ফালাফালা করে দেওয়ার মতো চার্বাকীয় যুক্তির শানিত ফলা। আর আমাদের বঙ্গভূমি কি দ্যাখেনি কৌলীন্যের দাপট ? লালন ফকির নামের অপ্রতিরোধ্য মানুষটির মানববাদী মতাদর্শকে মুছে দেওয়ার কম চেষ্টা করেনি শরিয়তপন্থীরা, উচ্চকোটির হিন্দুরাও তাদের সুরে সুর মিলিয়েছে। লালনের তিরোধানের পর আখড়ায় আয়োজিত স্মরণ অনুষ্ঠানে হামলা চালিয়েছে ধর্মোন্মাদ বর্বরেরা। তছনছ করে দিয়েছে আখড়াবাড়ি, নির্বিচারে প্রহার ও লুঠপাট চালিয়েছে। ফকিরদের মাথার বেণী কেটে নিয়েছে, ভেঙে ফেলেছে গানবাজনার সরঞ্জাম। তবুও মুছে ফেলা যায়নি সাম্প্রদায়িক চিহ্নমুক্ত লালনপন্থাকে। কেন তারা লালনকে ও তার মতাদর্শকে মুছে ফেলতে চেয়েছে? কারণ অকুলীন লালন মানুষের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন ধর্মজীবীদের বক্তব্যের অসারতা, মানুষকে তিনি উসকে দিয়েছেন তথাকথিত ধর্মীয় বিধিবিধানের মোহ ও ভয়ভীতির বাইরে বেরিয়ে এক বস্তুনিষ্ঠ মানবিক জীবনের অংশীদার হতে। ফলে বেহেস্ত/স্বর্গের লোভ ও দোজোখ/নরকের ভয় দেখানেওয়ালাদের ব্যবসা ভেস্তে যেতে বসে ছিল l আর তাই প্রতিক্রিয়া এমন তীব্র হয়ে উঠেছিল l
হুইনেংকে ষষ্ঠ আচার্য হিসাবে স্বীকৃতি জানানো মানে এক অকুলীন নিরক্ষরের কাছে মাথা নামিয়ে দেওয়া। আবার হুইনেং-এর কাছ থেকে যে সপ্তম আচার্যের অভিধা পাচ্ছে সেও এক অকুলীন এবং তীব্র প্রতিষ্ঠানবিরোধী। সুতরাং শেন-হুই যে পদে পদে বাধা পাবে তাতে আর সন্দেহ কী! তবে সমালোচকেরা হুইনেংকে সম্পূর্ণরূপে উড়িয়ে দিতে পারেননি। তাঁরা হুইনেং সম্পর্কে এইটুকু তথ্য স্বীকার করে নিয়েছেন যে, হুইনেং ছিলেন একজন সাধারণ চ্যান শিক্ষক ; তিনি মোটেও হুংজেন এর কাছ থেকে চীবর ও ভাণ্ড লাভ করে ষষ্ঠ আচার্য পদে অধিষ্ঠিত হননি। আবার কেউ বলেছেন তিনি সম্পন্ন পরিবারের শিক্ষিত সন্তান ছিলেন। মোদ্দা কথা হল অজ্ঞাতকুলশীল কাউকে আচার্য মানতে আমাদের গায়ে লাগে । আশ্চর্যের বিষয় এই যে, আমরা নিজেরা অজ্ঞাতকুলশীল হলেও আমাদের ভাবনা কিন্তু একই থেকে যায়। হুইনেং-এর জীবনকথা আলোচনা করতে গিয়ে একথা ভুললে চলবে না,পঞ্চম গুরু হুংজেন সর্বসমক্ষে হুইনেংকে দীক্ষিত করেননি। তিনি বিষয়টা গোপন রাখতে চেয়েছিলেন। তিনি চাননি হুইনেং বিপন্ন হোক। তিনি চেয়েছিলেন হুইনেং-এর প্রজ্ঞা মানুষকে আলোকিত করুক। সে এমন দূরবর্তী স্থানে চলে যাক, যেখানে ডংশান মঠের বাতাস পর্যন্ত না-পৌঁছায়। তাই তিনি হুইনেংকে সুদূর দক্ষিণে চলে যেতে বলেছিলেন এবং উপদেশ দিয়েছিলেন অন্তত তিন বছর ধর্মপ্রচার থেকে বিরত থাকতে। হুংজেন, প্রতিষ্ঠানের অন্দরে চলা রাজনীতি, ষড়যন্ত্র ইত্যাদি সম্পর্কে সম্যক ওয়াকিবহাল ছিলেন বলেই সরলমনা হুইনেংকে প্রতিষ্ঠানের জটিলতায় বাঁধতে চাননি। তিনি তাঁকে অবাধ জীবনের স্বাদ দিতে চেয়েছিলেন।
প্ল্যাটফর্ম সূত্র থেকে হুইনেং-এর যে জীবনকাহিনি পাই তা প্রমাণ করে মানুষটি প্রকৃত সাধকের নিরাসক্তি অর্জন করেছিলেন। আসলে এক অকুলীন নিরক্ষর কাঠুরের জীবন যাপন করতে গিয়ে তিনি বুঝেছিলেন আকাঙ্ক্ষাহীন জীবন খুবই সহজ ও সুন্দর। ফলে তিনি কখনওই সম্মান বা শ্রদ্ধার জন্য প্রতিষ্ঠানের দাসত্ব করেননি। এই অনাকাঙ্ক্ষী চরিত্রই ছিল তাঁর সব থেকে বড় শক্তি। তাই তিনি কোথাও সত্যকে এড়িয়ে মিথ্যার সঙ্গে আপোষ করেননি। ফলত যেখানে গেছেন সেখানে পেয়েছেন জয়ের মুকুট, কিন্তু সেই মুকুটকে শিরোপা না-করে তিনি বিনয়ের সঙ্গে হাসতে হাসতে প্রসঙ্গ পালটে প্রত্যাখ্যান করেছেন। এমন বিপজ্জনক মানুষকে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলাই শ্রেয়! নচেৎ আমাদের প্রতিষ্ঠানপ্রেম, আমাদের কৌলীন্যের সুবাস, আমাদের কর্তাভজা মেরুদণ্ড, আমাদের পুথিপড়া জ্ঞান, এসব যারপরনাই জিজ্ঞাসার সম্মুখীন হবে। আবার এহেন হুইনেং যদি সত্যিসত্যি শেন-হুইকে আচার্য পদে দীক্ষিত করেও থাকেন, তাহলে কি তিনি তা ঢাকঢোল পিটিয়ে করেছিলেন ? আমাদের মনে হয় হুইনেং তেমনটা করেননি। পরিণত বয়সে পৌঁছে তিনি সম্ভবত তাঁর গুরু হুংজেনকৃত গোপনদীক্ষার মাহাত্ম্য অনুধাবন করেছিলেন। তাই নিজের শিষ্যের ক্ষেত্রে একই পদ্ধতি অবলম্বন করেছিলেন। আচার্য নির্বাচনে তিনি কি ভুল করেছিলেন? আমাদের মনে হয় না। চিনা নথিপত্রে প্রাপ্ত শেনহুই সম্পর্কিত তথ্যাবলি তাকে বিতর্কিত এক দ্রোহী হিসাবেই পরিচিতি দান করে। তিনি শেনজিউ ও তার উত্তরাধিকারী পুজির দক্ষিণ ঘরানার বিরুদ্ধে আমৃত্যু লড়ে গিয়েছেন। আসলে তিনি দেখেছিলেন দক্ষিণের ঘরানা ক্রমশ প্রাতিষ্ঠানিকতার পাঁকে তলিয়ে যেতে বসেছে। যে আত্মজাগরণের কথা হুংজেন বলেছিলেন, তাঁর গুরু হুইনেং বলেছিলেন সেই আত্মজাগরণকে অস্বীকার করে নিছক ধ্যান, সূত্রপাঠ, এমনকি কোথাও কেবল দিবারাত্র বুদ্ধনাম জপ চলছে। আর এভাবেই নাকি ধীরে ধীরে মানুষের মধ্যে বুদ্ধপ্রকৃতি জাগ্রত হবে। অথচ তাঁর গুরু হুইনেং বলেছিলেন তিল তিল করে আত্মজাগরণ বা বোধি আসে না, বোধি আসে হঠাৎ আলোর ঝলকানির মতো আকস্মিকভাবে। দক্ষিণ ঘরানার প্রতিক্রিয়ায় তিনি বললেন বুদ্ধ-প্রকৃতির জাগরণের জন্য কিছুরই দরকার নেই, এমনকি ধ্যানেরও।
নবম শতাব্দীর প্রথম দশকেই দেখা গেল চ্যান বৌদ্ধধারার উত্তর ও দক্ষিণ দুই ঘরানাই অবলুপ্ত হয়েছে। পরিবর্তে নতুন নতুন ঘরানা জন্ম নিচ্ছে। তাদের কোনো কোনোটি সোচ্চারে হুইনেং-এর উত্তরাধিকার স্বীকার করে নিল। এই নতুন ঘরানাগুলির কাছে সাদরে গৃহীত হল হুইনেং-এর হঠাৎ বোধি । প্ল্যাটফর্ম সূত্র জায়গা করে নিল নবজাত মঠগুলিতে। হুইনেং-এর জন্মের আগের মুখ ধাঁধাটি বুদ্ধ-প্রকৃতি ব্যাখ্যায় প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠল। অবহেলিত, অবজ্ঞাত ইতিহাস থেকে প্রায় মুছে যাওয়া ষষ্ঠ আচার্য হুইনেং আবার নতুন করে জেগে উঠলেন। সব মিলিয়ে এতদিনের অস্বীকৃতির দাপট প্রবল স্বীকৃতির প্লাবনে ভেসে গেল। আর এতসব হল সেই তথাকথিত ছদ্ম-পুথি প্ল্যাটফর্ম সূত্রের বদান্যতায়। চিনের মাটিতে চ্যান বৌদ্ধধারাকে টিকে থাকার জন্য প্রভাবশালী থেরবাদী বৌদ্ধ ধারার সঙ্গে, কনফুসীয় অনুসারীদের সঙ্গে এবং তাওবাদীদের সঙ্গে মতাদর্শগত সংগ্রাম চালাতে হয়েছে। এই সংগ্রামের হাতিয়ার হয়ে উঠেছিল প্ল্যাটফর্ম সূত্র নামের অমোঘ আয়ুধটি। সূত্র শব্দটি মূলত ব্যবহৃত হয় বুদ্ধবাণী বা শিষ্যদের সঙ্গে তাঁর কথোপকথন সংকলন প্রসঙ্গে। ফলে চিনে প্রচলিত সূত্রগুলি পালি বা সংস্কৃত ভাষায় রচিত ভারতীয় পুথির চৈনিক অনুবাদ ছাড়া অন্য কিছু নয়। স্মরণীয় ব্যতিক্রম হিসাবে যুক্ত হয়েছে হুইনেং-এর নামের সঙ্গে ওতপ্রোত জড়িয়ে থাকা প্ল্যাটফর্ম সূত্র। চিনের বৌদ্ধ ঐতিহ্যে একমাত্র এই মৌলিক চিনা পুথিটি সূত্রের মর্যাদায় উন্নীত হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছে। আগেই লিখিত হয়েছে পুথিটির প্রকৃত নাম THE PLATFORM SUTRA OF THE SIXTH PATRIARC যার বাংলা করলে দাঁড়ায় ষষ্ঠ আচার্যের মঞ্চ সূত্র । বৌদ্ধ মঠের একটি আবশ্যিক অঙ্গ মঞ্চ সম্বলিত বক্তৃতা কক্ষ। এখানে প্ল্যাটফর্ম শব্দ দ্বারা সেই মঞ্চকেই চিহ্নিত করা হয়েছে। বৌদ্ধ ঐতিহ্য অনুযায়ী মঞ্চগুলি মাটি থেকে ন্যূনতম তিন ফুট ও সর্বাধিক নয় ফুট উচু হতে পারে। মঞ্চে একটি ছোটো ও নীচু টেবিল রাখা থাকে যাতে সূত্র ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র রাখা যায়। হুইনেং ক্যান্তন শহরের তা-ফান ( Ta-Fan ) মঠের এমনই এক মঞ্চে তাঁর সুপ্রসিদ্ধ বক্তব্যটি রেখেছিলেন। সেদিন শ্রোতৃমণ্ডলীতে ছিলেন বিশিষ্ট আধিকারিক ওয়েই (Wei), কনফুশিয়ান পণ্ডিত, তাওবাদী তাত্ত্বিক, বিরুদ্ধ বৌদ্ধ মতের ভিক্ষু- ভিক্ষুণী, মঠের পরিচারক-পরিচারিকা সব মিলিয়ে প্রায় হাজারখানেক উৎসুক মানুষ। হুইনেং-এর সেই যুগান্তকারী বক্তৃতার লিপিবদ্ধ রূপ হল প্ল্যাটফর্ম সূত্র।
দশটি অধ্যায়ে বিন্যস্ত প্ল্যাটফর্ম সূত্রের প্রথম অধ্যায়ে রয়েছে হুইনেং-এর আত্ম-বিবরণী। অন্যান্য অধ্যায়গুলিতে প্রজ্ঞা, ধ্যান, বোধি ইত্যাদির ব্যাখ্যার পাশাপাশি চ্যান বৌদ্ধধারার উদ্ভব ও বিবর্তনের দিকটিকেও আলোকিত করা হয়েছে। প্রজ্ঞা সম্পর্কিত হুইনেং-এর ভাষ্য জটিলতামুক্ত। ফলে তা পরবর্তীকালে চ্যান-অনুসারীদের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। হুইনেং বলেছেন প্রজ্ঞা প্রজ্ঞা বলে চিৎকার করলে প্রজ্ঞা লাভ হয়ে না, যেমন খাব খাব বলে গলা শুকিয়ে ফেললেও পেট ভরে না। হাজারবার প্রজ্ঞা পারমিতা সূত্র পাঠ করেও প্রজ্ঞার নাগাল পাওয়া সম্ভব নয়। মুখের ভাষার সঙ্গে মনের মিলন হলেই প্রজ্ঞা আর অধরা থাকবে না, তখন বুদ্ধপ্রকৃতির ও নাগাল পাওয়া যাবে। নিজের প্রকৃতির বাইরে বুদ্ধপ্রকৃতির সন্ধান কেবল আহাম্মকেই করে থাকে। বুদ্ধমূর্তিতে বুদ্ধ নেই নিজের ভিতরেই আছে বুদ্ধ আর বুদ্ধ তো প্রত্যেকেই। জ্ঞানী বা নির্বোধের মধ্যে বুদ্ধপ্রকৃতির কোনো পার্থক্যই নেই। পার্থক্য এই, কেউ আত্ম- অনুসন্ধান করে ; কেউ করে না। হুইনেং বুদ্ধ-প্রকৃতির অদ্বৈত ভাবটিকে প্রাঞ্জল ভাষায় ব্যক্ত করেছেন। প্রাসঙ্গিক ক্ষেত্রে তিনি বুদ্ধবচনকেও উদ্ধৃত করেছেন। একদা বুদ্ধদেব জনৈক শিষ্যের জিজ্ঞাসার উত্তরে বলেছিলেন – দুই ধরণের বিষয় আছে, স্থায়ী ও অস্থায়ী ; বুদ্ধপ্রকৃতি এই দুটির কোনোটিই নয়, বুদ্ধপ্রকৃতি না-স্থায়ী, না-অস্থায়ী। এই বুদ্ধবাণীর রেশ টেনে হুইনেং বললেন বুদ্ধপ্রকৃতির ক্ষমতা অসীম, মহাশূন্যের মতোই তার বিস্তার । তার কোনো সীমানা নেই। এটা বর্গাকার বা গোলাকার নয়, নীল,হলু্দ, লাল বা সাদা নয়। এটা না-উঁচু, ; না-নীচু, না-দীর্ঘ না হ্রস্ব । এটা রাগহীন, আনন্দহীন , ঠিকভুলহীন , ভালোমন্দহীন এর আগাও নেই, গোড়াও নেই। এই বিরোধাভাস এই ধাঁধা হুইনেং-এর ভাষ্যকে অমরত্ব দিয়েছে।
হুইনেং চ্যান বৌদ্ধধারার উদ্ভব ও বিবর্তনের রূপরেখা নির্দেশ করে গেছেন তাঁর মঞ্চভাষ্যে। তাঁর এই মত এখনও মান্যতা পায়। তাঁর মতে স্বয়ং বুদ্ধদেবই চ্যানধারার সূত্রপাত করে গেছেন। একদা গৃদ্ধকুট পাহাড়ে আহূত এক সমাবেশে বুদ্ধদেব কোনো বক্তব্য না-রেখে ডানহাতে একটি পদ্মফুল নিয়ে সামনে তুলে ধরেন। সমবেত শিষ্যমণ্ডলী বুদ্ধের এহেন আচরণে বিস্মিত হয়। কেবল মহাকাশ্যপ মৃদু হেসে তাঁকে অভিবাদন করেন। বুদ্ধের এই নীরব শিক্ষা থেকেই চ্যানের উৎপত্তি। একমাত্র মহাকাশ্যপই বুদ্ধের কাছ থেকে সেই শিক্ষা গ্রহণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। বুদ্ধ থেকে শুরু হয়ে বোধিধর্ম পর্যন্ত এই ধারা ভারতবর্ষে প্রবাহিত হয়। অতঃপর বোধিধর্ম সেই ধারাটি চিনদেশে বহন করে নিয়ে যান। বুদ্ধদেবকে প্রথম আচার্য ধরলে বোধিধর্ম আটাশতম এবং হুইনেং তেত্রিশতম চ্যান আচার্য। আবার চিনা ঐতিহ্য অনুযায়ী বোধিধর্ম প্রথম আচার্য এবং হুইনেং ষষ্ঠ আচার্য। বস্তুতপক্ষে চ্যানধারার ধারাবাহিক আচার্যপদ হুইনেং পর্যন্ত পৌঁছে থমকে যায়। তারপর শুরু হয় নতুন নিয়মে পথ চলা। চিনের প্রচলিত ধর্মমতগুলির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে বিভিন্ন চ্যানঘরানা। রাজকীয় আনুকূল্যও লাভ করে তাদের কেউ কেউ। চিন থেকে জাপানে পৌঁছে যায় চ্যান মতাদর্শ। জাপানি উচ্চারণে চ্যান হয়ে যায় জেন (Zen)। শুধু জাপান নয় কোরিয়ায় সিওন ( Seon) বা সন (Son) ও ভিয়েতনামে থিয়েন (Thien) নাম নিয়ে চ্যান মতাদর্শ ছড়িয়ে পড়ে। আর এখন তো এই ইউরোপ-আমেরিকায় ও এই মতাদর্শ জেন নামে অভূতপূর্ব সমাদর লাভ করে চলেছে l
তথ্যসূত্র :
১. ZEN MASTERS OF CHINA : THE FIRST STEP EAST
BY RECHARD BRYAN MC DANIEL; TUTTLE PUBLICATION, TOKYO/ VERMONT/ SINGAPORE.
২. THE PLATFORM SUTRA OF THE SIXTH PATRIARCH BY JOHN R. MC RAE; NUMATA CENTER FOR BUDDHIST TRANSLATION AND REASEARCH, BARKELY, CALIFORNIA, AMERICA.
৩. THE PLATFORM SUTRA : THE ZEN TEACHING OF HUINENG BY RED PINE ; COUNTERPOINT, BARKELY, CALIFORNIA, AMERICA.
৪. TRANSMISSION AND ENLIGHTENMENT IN CHAN BUDDHISM SEEN THROUGH THE PLATFORM SUTRA BY MORTEN SCHLUTTER ; TAIPEI CHUNG – HWA INSTITUTE OF BUDDHIST STUDIES.
কত দূরে সেদিন
একটা কোন সুসংবাদের প্রত্যাশায় থাকি
আজ, নয়তো কাল, নয়তো পরশু
একটা সুসংবাদ আসবেই।
বিফল প্রত্যাশায় দিনের-পর-দিন যায়
এমন-কী বছরের-পর-বছর;
সুসংবাদ আসে কই?
পরিবর্তে আসে কখনও ঝড়, কখনও তুফান
খরা আসে, বন্যা আসে, আসে কালান্তক মহামারি
ঘরে ঘরে ঢুকে পড়ে শোক,
মানুষের আজন্ম লালিত স্বপ্ন চুরমার হয়ে যায়।
ব্যক্তিগত শোক কখন যে সমষ্টির শোকে
পর্যবসিত হয়? মানুষ তখন তৃণকুটির মতো
ভেসে থাকার চেষ্টা করে সময়ের স্রোতে।
ভাবি, আসবে, সুসংবাদ আসবে,
সমাজটা বদলে যাবে; ঈর্ষাকাতর মানুষেরা
ভালোবাসা শিখবে, সমাজ বিরোধীরা
হাতের নোংরা ধুয়ে ফেলবে নদীর জলে;
খুন, রাহাজানি, ধর্ষণ যা নিত্যকার ঘটনা
তা থেকে মুখ ফেরাবে ভ্রষ্ট সমাজ।
ভাবি, অনেক কিছুই ভাবি, বন্ধ হবে
রাজনৈতিক খুনোখুনি, রক্তপাত, গণধর্ষণ আর
দরিদ্র গ্রামবাসীর গৃহদাহের বহ্ণুৎসব।
কিন্তু এসব কিছুই হয় না, একটির-পর-একটি
লাশ এসে হাজির হয় থানার ফটকে।
নিরন্ন মানুষের ঢল নামে শহরের বুকে
যেসব মেয়েরা সুস্থ জীবনের স্বপ্ন দেখেছিল
বাধ্য হয় গ্রহণ করতে পতিতাবৃত্তি,
কত মেয়ে যে হারিয়ে যায় কোন্ মুলুকে!
একদিন তো স্বপ্ন দেখেছিলাম অনেক কিছুর
বাল্য থেকে বেড়ে ওঠার দিনগুলিতে।
গ্রামের প্রতিটি গৃহে অন্ন ফুটবে
রোগগ্রস্ত মানুষ চিকিৎসা পাবে, ওষুধ, পথ্য পাবে
গ্রামগুলি ভিখিরি মুক্ত হবে।
বেকার যুবকেরা, যাদের স্বপ্ন-ইচ্ছে-বাসনা
ঝরে পড়ছে শীতের শুকনো পাতার মতো,
কাজ পেয়ে হাসি ফোটাবে বাবা মার মুখে।
কোন হিসেবই তো মিললো না;
আদৌ কি অবসান হবে প্রত্যাশার?
সুসংবাদ কী আসবে? যদিও-বা আসে, কবে?
দিন, মাস, বছর ফুরিয়ে যায়, ফুরিয়ে যায়
দশকের-পর-দশক;
যৌবন, প্রৌঢ়ত্ব পেরিয়ে পৌঁছে গেলাম বার্ধক্যে।
আজও বারান্দায় চেয়ার পেতে বসে আছি
এই ভরসায়, আসবে, সুসংবাদ আসবে;
কিন্তু কত দূরে ক্ষেত-ভরা সোনালি
শস্যের মতো সেদিন!
মানুষ বড় একা
মানুষ বড় একা, মানুষ বড় নিঃসঙ্গ;
তুমি তাকে সঙ্গ দিও কাছে ডেকে।
যে তোমার বন্ধু হতে পারতো;
যে আছে দূরে, ডেকে বসাও পাশে।
মানুষ বড় দুঃখী, মানুষ বড় অভিমানী;
তুমি কিঞ্চিৎ ভাগ নিও দুঃখের।
অভিমানকে কোরো না অবহেলা,
ঝরা পাতারও থাকে অভিমান---
তুমি অভিমানের মূল্যটুকু দিও।
মানুষ বড় বেশি কাঙাল ভালোবাসার;
প্রশ্রয় পেলে গলে যাবে মোমের মতো।
মানুষ যা চায়, তা হৃদয়ের উষ্ণতা;
তুমি স্বেচ্ছায় বাড়িয়ে দিও হৃদয়।
তারপর দ্যাখো, আকাশ কত নীল;
তারপর দ্যাখো, বাতাস কত নির্ভার।
মানুষ বড় এক।, মানুষ বড় নিঃসঙ্গ;
মানুষ বড় দুঃখী, মানুষ বড় অভিমানী।
নদীপারে সন্ধ্যা
মাথার উপর ঝুঁকে আছে মেঘ
নদী উচ্ছল পূবালী হাওয়ায়,
ঘাটে বাঁধা নৌকো টলোমলো।
কেউ কি ভেসেছিল চোখের জলে
এমন-ই মেঘবরণ দিনে?
ক্ষণে ক্ষণে ঝিলিক দেয় তারই মুখ
ভাঙা মেঘের ফাঁকে?
নদীপারে দোলে শরবন---
পাতাগুলি না না করে কাঁপে।
ও সোনাবউ, নাও ভাসাইয়া যাও কোন্ দ্যাশে---
দরদ ঝরে ভাটিয়ালী সুরে।
ছলাৎ ছলাৎ পাটাতনে ভাঙে ঢেউ
দাঁড় থেকে রুপোলি তরল ঝরে।
' ঘন মেঘে ছাইল আকাশ---'
গলা ছেড়ে গাইছে একলা পাগল
বুকে এসে তার ছন্দ দোলে।
আমি কী জানি, কে যায় কত দূরে!
জলের পিছনে ধায় জল;
আঁধার ডেকে আনে কাজল মেঘে।
বিন্দু বিন্দু আলোর সংকেতে
অক্ষরের মতো জ্বলে ওঠে গ্রাম।
ছবি: বিধান দেব
মাটির খুব কাছাকাছি
যেভাবে সন্ধ্যা নামে
মাটির খুব কাছাকাছি গুল্মঘ্রাণে বকুল কুড়াই
আগুন আসুক কিংবা আরোগ্যের সফলতা
একদিন প্রতিটি শরীর হবে দ্বিধাহীন ছাই
আজ কেন তবে মিহি কাচের সমীরণে সংকোচ
দৃশ্যত যা কিছু প্রথাসিদ্ধ পাহারা
হয়তো কেউ এই ভাবে
জং ধরা তরবারির অন্তরালে করেছে টিটেনাস
বিনীত শয্যায় যেভাবে সন্ধ্যা নামে
তোমার প্রেম ছবি আকাঙ্ক্ষিত ধুলোবালিও
কেন যে ভোকাট্টা ঘুড়ির লেজে বারেবারে পাক খায়
হয়তো তাই মাটির খুব কাছাকাছি বকুল খুঁজে বেড়াই
জানালার পাশে
কখনো কেউ জানালার পাশে বাতাস হলে
নড়ে উঠি, থেমে যায় সমস্ত রক্তের তঞ্চকতা।
এ- ঘর ও-ঘর ছড়িয়ে ছিটিয়ে আতঙ্কিত চোখেরা অভাজন।
কোথায় যে থাকে সবাই--
উঠোন জুড়ে বেদনার গান, তবু সেই কৃষ্ণপক্ষের বাতাস
গ্রিল টপকে ঢুকে পড়ে, বৈধ চেতনার কোলাহলে
বাতাস কি জানে বৈকুণ্ঠরিপু।
স্বচ্ছতর নদীর আধারে যদি কেউ
যথার্থ যাপনের অন্তরা টুকু খুলে রাখে
সেই আলিঙ্গন বুঝে যায় স্বর্গের পর্দায়
লেগে থাকা গ্রহণ নক্ষত্রের বিভাজন।
আমার এই আত্মউন্মোচন কিভাবে আরোগ্যের অপরাধী
নির্লিপ্ত আকাশ পুঁতে রাখে চৈতন্যের ভ্রান্ত ভবিষ্যৎ।
এখনো কেউ জানালার পাশে বাতাস হলে
সে যেন আমায় আরোও শূন্য করে...
শ্যাওলার ভাস্কর্য
পাহাড় থেকে নেমে আসা অন্ধকার সারা গায়ে মেখে
এপারের সমস্ত কথা উড়ে যায় সিন্ধু নদীর তীরে
ভেঙে যাওয়া কাচের মতো ধারালো কুয়াশা
আমার হাতের তালুতে জড়ো করে দুঃস্বপ্নের ছাই
তাই দেখে পাতায় পাতায় লেগে থাকা জোনাকিরা
বুঝে গেছে এই যথার্থ সময়ের আগুনরঙা সৌখিনতা
আমাকে জল দাও সেই জলে ভাসাই শ্যাওলার ভাস্কর্য
পাহাড় থেকে নেমে আসা অন্ধকারে দেখি নিজস্ব বুদবুদ
আর মাথাটা ভেসে যাচ্ছে প্রাগৈতিহাসিক স্রোতে
পাহাড়ি লতা
চোখের ঘনিষ্ঠতা কতখানি নির্জন হলে
মাটি খুঁড়ে বেরিয়ে আসে বুকেরই চূর্ণ কঙ্কাল
হাত ফসকে জল সেই জলে
কারা যেন ডুবে মরে আমাদেরই বারান্দায়
তবুও তো কেউ গান হয়ে ঝুলে থাকে
পাহাড়ি গাছের শাখা-প্রশাখায়
একদিন সেই গান বিঁধেছিল বুকের পাঁজরে
আজ শুধু সেই সম্পর্কের অবনতি
লিখে রাখে পাহাড়ি লতা
জানি না কতটা পথ কৌশলের
জানি না কতটা দূরত্ব দুর্বল হলে
সম্পর্কের ছোঁয়া নিবিড় পর্যবেক্ষণে
আরোও বেশি আঁধার হবে
অপেক্ষার আঁধার ভিজে গড়িয়ে গেল আমার ছাই
সেই মুহূর্তের মধ্যে কারা
সেই ছাইয়ের পুতুল ধরে লোফালুফি করো নির্জন পথে
খাড়াই ও নিচু সবটাই তো আশ্চর্য আলাদিন
ছবি: বিধান দেব
'পূর্ণ ও শূন্যের এক মিলিত কোরাস'
মগ্ন অনুভূতিকে আশ্রয় করে কবিতা যখন গহন পথের যাত্রী, পাঠককেও তন্বিষ্ঠ মন নিয়ে পৌঁছতে হয় কবিতার কাছে। এমনই নির্জন, শান্ত, অন্তর্লীন পথের যাত্রী 'তরঙ্গ ও ইশারা', সায়ন রায়ের তৃতীয় কবিতার বই। প্রকাশ কাল ২০১২। এই সময়ের তরুণ কবিদের মধ্যে বিশিষ্ট নাম সায়ন রায়। 'তরঙ্গ ও ইশারা'-র পূর্বসূরী 'মহামানবের পোশাক' (২০০০), 'মুহূর্তের পাশে সমগ্র' (২০০৯) এবং উত্তরসূরী 'রভস' (২০১৭), 'লুকোনো জলের দাগ'(২০১৭), 'সকল ধূসর চিহ্ন'(২০১৯)। 'তরঙ্গ ও ইশারা'-য় সায়নের মন ও মনন ঐশী অনুভবে আপ্লুত। সন্ধান করছে রূপের মাঝে অরূপ। যে ৪০টি কবিতা 'তরঙ্গ ও ইশারা'-য় সংকলিত,তারা আলাদা শিরোনাম বর্জিত, কেবল সংখ্যাচিহ্নিত। প্রতিটি টুকরো কবিতার মধ্যে ভাবগত ঐক্য রয়েছে, সূক্ষ্ম যোগসূত্র গড়ে তুলেছে অখণ্ড দীর্ঘকবিতা—যাতে চেতনার বিচিত্রমুখী প্রসারণ আছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত রচিত হয় এক আলোকিত ক্যানভাসের সামগ্রিকতা।অতীন্দ্রিয় উন্মোচনের বয়ান। আদি প্রকৃতির 'জল মাটি শিলা' এবং অন্তহীন সময়স্পন্দন কবিতাগুলির মৌল উপাদান। যাপিত জীবনের দৈনন্দিনতার বাইরে বেরিয়ে এসে জীবনজিজ্ঞাসা, ভোরের কুয়াশায়, গোধূলি আলোছায়ায় দেখতে পায় আত্মপ্রতিকৃতি। সায়ন রায়ের কবিতার ভাবতরঙ্গ ইশারাময় এবং ক্রম-উত্তরণের 'বোধিদৃষ্টি' কবির অভীষ্ট। নিবিড় শুভবোধ এবং আনন্দের পথে একা একা ভেসে যাওয়া তাঁকে প্রাণিত করে। কবিতার ভেতর প্রবাহিত আধ্যাত্মিক চেতনার স্রোত। এই আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে কোনও প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মাচরণের সম্পর্ক নেই। আমার ভেতরে স্থিত 'আমি'-কে আবিষ্কার করাই এখানে আধ্যাত্মিক অভিনিবেশের গন্তব্য। স্তব্ধতার দিকে, শুদ্ধতার দিকে যেতে চায় তাঁর কবিতা—
দুঃখ থেকে সমাধি পেরিয়ে
আশু আনন্দের পথে ধীরে
আত্মার ঐ ক্রম উত্তরণ
যে আনন্দে স্মিত মনে অনন্ত পদ্মেরা
ফুটে থাকে। নিবিড় নিভৃতে
অপ্রকাশ্য চুপ-কথা গাঢ় অনুভবে
একা একা ভেসে যাওয়া
রবীন্দ্রসংগীতে।
—৩৫ সংখ্যক কবিতা
'তরঙ্গ ও ইশারা'-য় সায়ন রায় কোনও ন্যারেটিভ রচনা করেননি। বিমূর্ত অনুভবের আলোয় জ্বালিয়ে রেখেছেন আত্মদীপ। সত্তার গভীরে যে সংগীতের অনুরণন চলছে তা 'পূর্ণ ও শূন্যের এক মিলিত কোরাস'। রূপ ও অরূপের লীলা, অস্তিত্বের বেলাভূমির ওপর গড়িয়ে যাওয়া ঢেউয়ের মতো যুগপৎ স্পন্দনশীল ও স্পর্শাতীত। 'নিত্যানন্দ' নামের সঙ্গে যুক্ত বাংলার বৈষ্ণব ধর্ম, বৈষ্ণব সাধনা ও তত্ত্ব। চৈতন্যদেবের সঙ্গে তাঁর নাম বৈষ্ণব পরিমণ্ডলে এক নিঃশ্বাসে উচ্চারিত। অন্য অর্থে, 'নিত্যানন্দ' নিত্য জ্ঞানময় ও সুখস্বরূপ ব্রহ্ম। আনন্দবিশিষ্ট পরম সত্তার উদ্ভাসন। 'সচ্চিদানন্দ'— শব্দের প্রতিধ্বনি আমরা শুনতে পাই 'তরঙ্গ ও ইশারা'-য়। সৎ (নিত্য), চিৎ ( জ্ঞান) এবং আনন্দ (দিব্য সুখ)—এই ত্রিবিধ চেতনার সমন্বয়ে উন্মীলিত হয় 'অনির্বচনীয়'। 'তৈত্তিরীয়োপনিষদ্'-এর ষষ্ঠ অনুবাকে বলা হয়েছে—' আনন্দাদ্ব্যেব খল্বিমানি ভূতানি জায়ন্তে। আনন্দেন জাতানি জীবন্তি '। আনন্দ থেকেই জীবনের সৃষ্টি ও সম্প্রসারণ। আবার আনন্দ অভিমুখে প্রতিগমন করে আনন্দেই বিলীন হয় জীবনপ্রবাহ। আনন্দ-বেদনা-বিরহ-মাধুর্য পুষ্পিত হয় চেতনায়। ফুল ফোটে, ফুল ঝরে পড়ে। বেদনার ফল পক্ব হয় চৈতন্যের মাধুর্যে।অধরার জন্য নিবেদিত এক আজীবনের প্রতীক্ষার কথা বলেন কবি—
আমিও নিত্যানন্দ খুঁজি, নিত্যানন্দ দ্বার
ফুলের ফসলে ভরা সোনার সংসার
বিরহ বিধুর মায়া সেই স্বর্ণজাল
প্রেম পূজা প্রতিপাদ্য রূপের কাঙাল
রূপ অরূপেই মজে পুষ্পিত অধরা
দিশা বিদিশায় লীন কাঙ্ক্ষিত সুদূর
অনির্বচনীয় আর অপ্রকাশ্য ব্যথা
বেদনার ফলগুলি পক্ব সুমধুর।
—২৮ সংখ্যক কবিতা
২৭ সংখ্যক কবিতায় জেনবাদের অনুষঙ্গ। 'ধ্যান ' থেকে 'জেন' শব্দ ব্যুৎপন্ন। জেনবাদ কী? এর উত্তর মৌনতা, সত্যবোধ, বোধিদৃষ্টি অর্জন। বীতশোক ভট্টাচার্যের মতে 'জেন এক অনুত্তর যোগ। এ যেন চিরপ্রশ্নের এক বেদীর চিরনির্বাক হয়ে থাকা'। সায়ন শেষ চরণে ব্যবহার করলেন— 'নিদিধ্যাসন' শব্দটি, যার অর্থ একান্ত মনে দেহজ্ঞানরহিত হয়ে চিন্তা, একনিষ্ঠ ধ্যান। নিজের মধ্যে ডুব দিয়ে প্রতর্কহীন অনুভবে প্রবেশ করতে চাইছেন কবি—
ফুরিয়ে যাওয়া গ্রহের ধুলো যত্ন করে রাখেন
দশদিকেতেই মনোনিবেশ ঘুমে জাগরণে
হঠাৎ হঠাৎ বায়ুর প্রকোপ এমন চন্দ্রাহত
সত্য দ্রষ্টা, কবি তিনি অবিশ্বাস সন্দেহ
মেজাজটা যেই ঠাণ্ডা বরফ জেন-এর মতো হয়
প্রতর্ক আর পাল্টা আঘাত মিহিন হয়ে আসে
বাস্তব তো বাস্তবিকই একটি প্রতিচ্ছবি
সজল হাসি কী প্রশান্তি নিদিধ্যাসন হলে।
—২৭ সংখ্যক কবিতা
এমন গভীর ভাবনা দলবৃত্তের আধারে প্রকাশ করে সায়ন মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। বাস্তব তো বাস্তবিক অর্থে একটি প্রতিচ্ছবি মাত্র। মুহূর্তের দর্পণ, বিলীয়মানতাই তার পরিণাম। সময়বিহীন সময়ঘড়ির কাঁটায় আপতিত মৃত নক্ষত্রের আলো, প্রয়াণচিহ্ন।
গ্রিক পুরাণের চরিত্র সিসিফাসের দণ্ডিত জীবনকথায়, নিয়তি ও পরাজয়ের বিরুদ্ধে মানুষের অবিরত সংগ্রাম রূপক হয়ে পুনরাবৃত্ত হয়েছে শিল্পে, সাহিত্যে। সিসিফাস একটা পাথরখণ্ড পাহাড়শীর্ষে তোলার জন্য অন্তহীন চেষ্টা করে চলেছেন। চূড়ার কাছাকাছি যতবার তোলা হয়, ততবারই অধোগমনের টানে নীচের দিকে নেমে আসে পাথরখণ্ড। সিসিফাসের কাহিনিকে নতুন ডাইমেনশন দিলেন আলব্যের কামু, তাঁর বিখ্যাত সন্দর্ভ 'The myth of Sisyphus'-এ। পরাজয়, নিয়তি, জীবনের অর্থহীনতা ও অন্তর্দ্বন্দ্বের গাঢ় ভাষ্য লিখলেন কামু। কামুর দর্শন চিন্তায় আত্মহত্যা, হতাশা ও বিপ্রতীপের যে সূত্র ও বিশ্লেষণ রয়েছে তাকে কবিতার পরিসরে ডিকোড করতে চেয়েছেন সায়ন রায়। জীবনের চেতনাতরঙ্গে মিশে থাকে জাদু ও গরল। সায়ন সন্ধান করছেন বিকল্প আত্মপরিচয়—
পাহাড়ের তলদেশে কামু ও তার স্বপ্ন সিসিফাস
প্রাচীন এ বোঝাটুকু মেনে নেয় সরস হাসিতে
সঙ্গে সঙ্গে ভেঙে পড়ে ধরাচূড়া পার্বত্য অতল
পড়ে থাকে ব্যথাহরা নরম মসৃণ এক জল।
—৩ সংখ্যক কবিতা
কামুর বহুমাত্রিক জটিলতা ও জীবনকেন্দ্রিক প্রশ্ন এবং গ্রিক পুরাণের অনুষঙ্গ সায়নের কবিতায় জীবনবোধের ইশারাময় প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠল।
'তরঙ্গ ও ইশারা'-র পাঠ অভিজ্ঞতায় ক্রমশ খুলে যায় অধিচেতনার বাতায়ন। কবি যেন জীবনের 'মায়াবী জাদুর এক রূপলোক থেকে টুপ করে তুলে নেন দৈব এক ফল'। এই ফলের অনুষঙ্গে মনে পড়ে জীবনের অমেয় মাধুর্য ও জীবনরসিকের আত্মউৎসারণের কথা। অস্তিত্বের চারপাশে বেজে চলেছে অন্তহীন সুর, সুরসপ্তক ধারণ করেছে মুক্তির আনন্দ—
তুচ্ছাতিতুচ্ছ কণা সুরের আলোকে
ক্ষণে ক্ষণে বেজে ওঠে
সুধা সুরলোকে।
—৬ সংখ্যক কবিতা
সৃষ্টির আদি রহস্যের গহনে পৌঁছতে চান কবি।অনন্ত জলের ভেতর একদিন প্রাণের সঞ্চার হয়েছিল। এই জল প্রকৃতির শিরায় শিরায়, মেঘলোকে, মাতৃজঠরে। আগুন ও জল বিশ্বলোকের অগ্রগতি ও প্রাণের উৎস। আদি কবি স্তব রচনা করেছিলেন আগুন ও জলের। গায়ত্রী ছন্দে ঋকবেদ-সংহিতার প্রথম স্তোত্র নিবেদিত আগুনের উদ্দেশ্যে—
অগ্নিমীলে পুরোহিতং যজ্ঞস্য দেবমৃত্বিজম্ হোতারং রত্নধাতমম্।।১
সায়ন লিখলেন—'এসো হে পবিত্র অগ্নি মাতৃজঠরের মধ্যে মিশে/ মায়াবী তন্তুজ বোনো বুনে চলো আরক্তিম ফল'। 'তরঙ্গ ও ইশারা' এক অর্থে আলোর সংগীত। অন্তর্লীন অনুভূতির সংলাপ। একই সঙ্গে আত্মগত ও 'আত্মহারা'। দূর নক্ষত্রের সংকেতে যে অনিশ্চয়তা থাকে তাকে গ্রহণ করেছে কবিতা। কোনও চমক সৃষ্টির অভিপ্রায় নেই কোনও কবিতা খণ্ডে। শব্দ ও নৈঃশব্দ্যের মধ্যবর্তী ভুবনে বিশ্বাস, প্রেম, মায়া, হাহাকার এমন এক ছায়াপথ নির্মাণ করেছে যেখানে 'রস ও রসিক' সমীভূত। কবীরের দোঁহা, ওমর খৈয়ামের রুবাইৎ কবিতার পরিধি বিস্তৃত করে। সায়ন একটি আশ্চর্য কবিতা লিখেছেন নারীকে কেন্দ্র করে ' এক বিশিষ্ট চেতনার '-র উন্মীলন থেকে—
নারী কোনো দৈববস্তু নাকি অন্যভাবে
দূরতম দৃষ্টি এক বিশিষ্ট চেতনা
উদ্ বায়ী শরীর ঘিরে আবিল পুলক
পরতে পরতে মেঘ ছড়ায় সুঘ্রাণ
ঋষি যা পায়নি খুঁজে নিঃস্ব সিন্ধুতটে
গভীর গোপনে থিতু নিজস্ব নির্বাণ।
—১০ সংখ্যক কবিতা
'তরঙ্গ ও ইশারা'—শান্ত, ঋদ্ধ ও ধ্রুব চেতনার প্রেক্ষাপটে রচনা করে কেন্দ্র ও পরিধির সেতু। ললিত করুণ স্তব। সময়ের কণ্ঠস্বর মিশে যায় দূরাগত সংগীতে। কারুবাসনার স্বপ্নে জেগে থাকেন কবি—
অন্তর্লীন রক্তপাতে আহত মণীষা
ভেসে যায় কবি,
তার কবিতাজিজ্ঞাসা।
—২১ সংখ্যক কবিতা
উদয়ার্ণব বন্দ্যোপাধ্যায়।বাংলা কবিতায় এক প্রখর তারুণ্যের নাম।উত্তরাঞ্চলের কোচবিহারে বসেই শূণ্য দশকে কবিতা লিখতে আসা এই কবি কাজ করে চলেছে বাংলা কবিতা নিয়েই।অর্জন করেছে নিজস্ব স্বর।নিজস্ব উচ্চারণ।সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে উদয়ার্ণব বন্দ্যোপাধ্যায়ের দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘নাম ধরে ডাকা বারণ’।মালদার ‘শহরতলি’ প্রকাশনার এই বইটির নান্দনিক ও প্রতীকি প্রচ্ছদ করেছেন প্রশান্ত সরকার।প্রথম কবিতার বই ‘মৃত্যুর পর যে ঘোড়ায় চড়ে তুমি দেশ পেরোবে(২০১৬)’-টিতেই উদয়ার্ণব বন্দ্যোপাধ্যায় তার মেজাজ ও জাত চিনিয়ে দিয়েছিলেন।খুব সচেতন পাঠকের জন্যই তার কবিতা।অত্যন্ত সময় ও সমাজসচেতন এই কবি চারপাশের সবকিছু,সমস্ত অন্ধকার ও আলোর দিকে সজাগ নজর রেখে চলেন।মানুষের বিষাদ ও বিপন্নতাগুলিকে তীব্রভাবে ছুঁয়ে যান তিনি।তার কইতা আমাদেরকে ভাবায়।গভীর এক প্রশ্নের দিকে নিয়ে যায়।কবি বলেন_
‘অশান্ত চোখের দিকে তাকিয়ে আছে মানুষ,
অশান্ত চোখের ভেতর জমিয়ে রেখেছে ক্ষোভ হিংস্রতা,
যে স্বার্থের জোরে ভিড় করে আছে ফ্যাসিস্ট সংগঠন
এভাবে দেখে নিও তুমি
ইতিহাস মুখ বন্ধ করে থাকবে না’।
মারী ও মড়কের এই দেশ,এই বিশ্ব,প্রতিপল যেখানে ধর্ষিত হয় মানুষ আর মানবতা।পুজির দাপটে বিপন্ন হয়ে পড়েন ভূমিলগ্ন জনমানুষ।সেই প্রতারিত ও বিপন্ন মানুষের কথা,তাদের যাপন,তাদের ভাঙা জীবন আর তুমুল স্বপ্ন দেখবার চিরকালীন আকাঙ্খা উদয়ার্ণব বন্দ্যোপাধ্যায়-এর কবিতায় উঠে আসে আন্তরিকভাবেই_
‘পৃথিবীটা একটা নিরেট হৃদপিণ্ডের সমাধিস্থল।যেখানে
ভালোবাসার এক মুমূর্ষূ ভিক্ষুক খড়ের কবরের নীচে বাস করেন।
আমরা তার রূপকথার ভেতর নুন ঢেলে দি’।
২৭ টি কবিতা দিয়ে জমিয়ে তোলা এই বইটির সবচেয়ে বড় দিক হলো উদয়ার্ণব বন্দ্যোপাধ্যায় তার কবিতায় প্রতিবাদের এক দীর্ঘ সংগীত শুনিয়ে গেছেন,কিন্তু কোন কবিতাই কিন্তু স্লোগান হয়ে যায় নি।তার শব্দের ভেতর সুর ও সুরেলা প্রপাতের ধ্বনি তুমুল আচ্ছন্ন করে তোলে।প্রেম মিশে যায়,প্রিয় নারীর মুখের ছায়ায় কবি আমাদের শোনাতে থাকেন_
‘আমি সমস্ত মজা দিয়ে লিখছি সাদর আমন্ত্রণ,
যে চৌরাস্তার মোড়ে আমাকে একদিন উলঙ্গ করে জ্বালিয়ে
দেওয়া হবে,
সেই দেশটার নাম তোমরা খুঁজে পাবে আমার কবিতার খাতায়’
গোটা বই জুড়ে কান্নাঘর।বারুদশলাকা।ঝাপ্সা রোদের শিখরে বসে থাকা মেয়েরা।এক অদ্ভূত ঘোর বিছিয়ে দিতে থাকেন কবি_
‘হে মহামান্যগণ আপনারা সবাই দাঁড়িয়ে দেখুন
এক
দুই
তিন
আমরা প্রগতিশীল হলে আপনাদের ইজ্জত চলে যায় কিনা’
কুর্নিশ,কবি উদয়ার্ণব বন্দ্যোপাধ্যায় আপনাকে।
আলো – অন্ধকারে মেশা
আমাদের হয়তো মনে আছে নাইজেরিয়ার এক কবি নাম ওলে শোয়িংকা বলেছিলেন - কোনো বিশেষ আদর্শের প্রতি আনুগত্য দেখাতে গিয়ে কেউ কেউ কবিতাকে আহত করেন, তাঁর সৃজনশক্তির অপচয় ঘটান। তিনি যদি নিজের কথিত আদর্শকে লেখালিখির উপরে স্থান না দিতেন, তাহলে তাঁরা কিন্তু চমৎকার সব লেখা লিখতে পারতেন এবং নিজের আদর্শগত চিন্তার প্রতিও সৎ থাকতে পারতেন ।দেবাশিসের কবিতা – যাপনের সঙ্গে নিরন্তর যুক্ত থাকার সুবাদে বলতে পারি দেবাশিস নিজের অবস্থানে ঠিক থেকেছেন এবং সৃজনশক্তির অপচয় ঘটান নি । তিনি নিজের মত একটা স্বতন্ত্র ভাষায় পথ চলতে ভালোবাসেন । বলা যায় এ পথ তার একার । তেমন কোনো পূর্বসূরীর দ্বারা তিনি সেভাবে প্রভাবিত নন । এই যে প্রভাবহীন হয়েও উত্তীর্ণ একটা রচনায় মনোনিবেশের একটা ভঙ্গিমা দেবাশিস গড়ে তুলেছেন তাই তাঁর কবিতার প্রতি আমার একটা ব্যক্তিগত মোহ কাজ করে ।আমি তার জীবনযাপন জানি, পত্রিকা সম্পাদনা জানি ফলে তার কবিতার ভিতরে প্রবেশ করতে আমার কাঠখড় পোড়ানোর প্রয়োজন পড়ে না। একদম স্বচ্ছ একজন মানুষের নাম দেবাশিস । আসলে দেবতার আশিস প্রাপ্ত মানুষ তো এমন হবেই । একজন কবি তো বলেছিলেন কবিতা আসলে ব্যক্তিগত জীবনযাপন ।অবশ্য জীবনযাপনের সঙ্গে মিল নেই এমন অনেকেই কবিতা লিখে চলেছেন এবং আপাত বিচারে তারা কবি হিসাবে সাফল্য পাচ্ছেন । কিন্তু এই সাফল্য সার্থকতায় রূপ নেয় না । সময়ের হাতে রয়েছে একটা বড়ো মাপের ঝাঁটা – সে সব সাফ করে দেয় । পড়ে থাকে কিছু মণিমাণিক্য , রত্নশোভা । ফলে মনে হয় এদিক থেকে দেবাশিসের কবিতায় একটি দুটি সোনার কুচি থেকে যেতে পারে ।ভবিষ্যৎ সে কথা বলবে ।আমি আগাম ভবিষ্যৎবাণী করে রাখলাম । বক্ষ্যমাণ কবিতাগ্রন্থটি ‘ প্রজাপতি রঙের গ্রাম ’ । নাম দিয়ে পুরো চেনা না গেলেও বেশ খানিকটা তো চেনা যায় ।এই নামটিও তেমনই । প্রথমেই একটা ভাল লাগা – একটা মুগ্ধতার বোধ ছুঁয়ে গেল। আজ গ্রাম সেভাবে নিরাপদে নেই – ‘পথের পাঁচালী’র গ্রাম পাল্টে পাল্টে একেবারে পাল্টেই গেছে । এখানেও ঘটেছে আজ নাগরিক জীবনের ছায়াপাত ।ফলে অনেকাংশে গ্রাম তার নিজস্ব জৌলুস হারিয়েছে ।অথচ যখন এমন নামের একটি অরণ্যদর্শন ঘটে যায় , ভালোলাগার আবেশে পাতা খুলি – দেখি নিভৃতে দেবাশিস লিখে রেখেছেন – আমার বহমানতার অন্যতম কারিগর । আমার ভাবতে ভালোলাগে অগ্রজ কবিদের সেই স্বর্ণজ্জ্বল পংক্তি – কবিতার ইতিহাস আসলে বন্ধুত্বের ইতিহাস। দেবাশিস সেই ভালোলাগার মন্ত্রোচ্চারণের ঘোর এনে দিলেন । বইটি নিজের পত্রিকার তরফ থেকেই প্রকাশিত হয়েছিল যে পত্রিকার নাম আজ সকলেই প্রায় জানেন ‘ছাপাখানার গলি’ । আর প্রিয় রবীনদা –কে বইটি উৎসর্গ করেছে দেবাশিস। রবীনদা –র মতো মানুষও যে আজ ফুরিয়ে আসছে। তাই তাঁকে মনে রাখার মতো চমৎকার এই ব্যবস্থাপনা দেখেও ভাল লেগেছে । বইটির রচনাকাল ২০১১ অর্থাৎ একদশক আগে তবু কবিতাগুলোর ওপর এতটুকু ধুলো পড়েনি । বরং যতদিন যাচ্ছে তত নতুন নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হচ্ছে ।সে সূত্রে আরও কিছু কথা এসে ডানা মেলে বসে। আর কথা হল দেবাশিসের শব্দ দ্যোতনা বেশ অন্যরকম তার শব্দযুগ্ম ব্যবহার বেশ অভিনব ।একদিকে নতুন শব্দ তৈরি এবং অন্যদিকে তার সুপ্রযুক্ত ব্যবহার খুব কম কবির মধ্যেই দেখতে পাওয়া যায়। কারো কারো মতো হয়তো শব্দের নতুন ব্যবহার লক্ষ করি। এ প্রসঙ্গে শঙ্খ ঘোষ বা জয় গোস্বামীর কথা মনে করতে পারি ।তারা একটি শব্দের পুরোনো ব্যবহারে যে জীর্ণ রূপ তাকে নতুন পোশাক পরিয়ে তাকে সাজ দিয়েছেন বা আরও বেয়াড়া করেছেন সেই কবিতার নিজস্ব প্রয়োজনে। ফলে দেবাশিসের প্রতি একটা বিশ্বাস আছে যে তাঁর কবিতা কিছু দিতে চায় ।ছন্দে লেখা অন্তঃসারশূন্য পংক্তিমালা সে লেখে না। তার লেখা পড়ে প্রাণ পাই। আশ্বাস পাই বেঁচে থাকার । শুধু প্রাণ পাই বা আশ্বাস পাই না । সে তো রামকৃষ্ণ কথামৃতেও পাই- । এখানে তা নিশ্চয়ই কবিতা হয়ে ওঠে।আগে কবিতা পড়ে যদি কখনও বাণী হয় – তা হবেও বা। এভাবেই আমার স্বল্প বোধের পরিধিতে তাঁকে বুঝি। না- বোঝার মতো করে দেবাশিস কিছু বলে না। ব্যক্তি দেবাশিস যেমন স্বচ্ছ কাচের মতো তার কবিতাও তেমনই। তাঁকে নিয়ে এমন অনেক কথাই তো বলা যায় । এক কলমের কালি হয়তো সে জন্য যথেষ্টও নয়। আপাতত কবিতার বইটিতে ঢুকি । এই গ্রন্থের সব ক’টি কবিতা যে আমার ভালো লেগেছে। তেমন নয়, আবার সব যে ভালো লাগেনি তেমনও নয়। কিন্তু তার Subdued tone টি আমার খুব ভালো লেগেছে। ভালোলাগা ব্যাপারটি আপেক্ষিক । আমার রুচির সঙ্গে সবার সব কবিতা যাবে না।কিন্তু কবিতাগুলো পড়তে পড়তে কবির মনোভঙ্গিটাই আসল কথা। প্রতিটি শব্দ ভেঙে ভেঙে কবির বোঝার রীতিটা সেকেলে। তাকে বুঝতে হয় বৃহৎ প্রেক্ষাপটে । বিদেশে, আপাতত সে দেশের নাম থেকে বিরতি থাকলাম একটি দেওয়ালে একটিই ছবি রাখা হয় এই বৃহৎ প্রেক্ষাপটটি আনার জন্য – বিষয়টি আপনাদের জানা । তবু একবার মনে করালাম মাত্র । দেবাশিসের ৪৬ সংখ্যা কবিতাটিই যদি উদাহরণ হিসাবে নিই তবে আপনারা মানবেন আমার কথা। আগে কবিতাটি রাখি –
নোনা বাতাসে
বদলে যাচ্ছে খেলার রঙ
রাত পেরিয়ে পেরিয়ে
দুঃখভরা জাহাজ
খুঁজে বেড়াচ্ছে রঙিন শহর
মেঘ অনুবাদ করছে পাহাড়ি মেয়ে,
নিসর্গের গুঁড়ো গুঁড়ো আলো মেখে,
দাঁড়িয়ে আছে ঘরের মেয়ে
রাস্তার ওপারে চিৎকার করছে শীত
এখানে কোনো নতুন শব্দ নেই বা দেবাশিসের যে নতুন শব্দবন্ধের দ্যোতনা তা এখানে নেই তবে বলা যায় এ কবিতাটি দেবাশিসের একান্ত নিজস্ব । কী চমৎকার বলেছেন দেবাশিস ‘দুঃখভরা জাহাজ খুঁজে বেড়াচ্ছে রঙিন শহর ।’ আমরা এই লাইনটির কাছে নতজানু হতে রাজি। কিংবা অন্য কবিতায় ‘আমাদের গোপনে / কে বা কারা / এঁকে রাখে লাল টকটকে রোদের ঠিকানা ।’ একটু আগেই যে বলছিলাম কবিতা বাণীর ভূমিকা নিতে পারে এখানে তার প্রমাণ মিলল । অথবা ‘জঙ্গলবাড়ি শাসন করছে। কয়েকটি গনেগনে সূর্য।’ মনে হতে পারে কয়েকটি গনগনে সূর্য কীভাবে সম্ভব । হ্যাঁ এটা বৈজ্ঞানিকভাবে যেমন সম্ভব তেমনই প্রতীকী সত্তায়ও হতে পারে। হয়তো এভাবেই রবীনদাকে এই বই উৎসর্গ করতে চেয়েছেন দেবাশিস ।কী অপূর্ব দৃশ্যকল্প রচনা করেছেন দেবাশিস ‘সামুদ্রিক সম্পর্ক নিয়ে আধশোয়া আকাশ । এভাবেই আমরা যদি এই বই রচনার সময়টি দেখি – সেটা ২০১০। প্রকাশকাল ২০১১। রাজনৈতিক পটভূমিকেও মনে রেখেছেন দেবাশিস। তিনি লিখেছেন – ‘কপ্টার পাখির ডানায় পরিবর্তনের রঙ / দানার নীচে সবুজ জমি কুড়াচ্ছে / প্রজাপতি রঙের গ্রাম।’ এইখানেই রয়ে গেছে – লাশে লাশে ভরে উঠছে ভ্যানগাড়ি / গাড়িতে গাড়িতে ভর্তি হচ্ছে লাশ।’ ফলে নাম যতই ‘প্রজাপতি রঙের গ্রাম’ সেখানেও জারি হয়েছে অন্য এক চাপা কান্না – বিষাদের ঘের । ফলে শুধু আনন্দ , উল্লাস নয় দেবাশিস চোখের কাজল যেমন এঁকেছেন তেমনই ভোলেননি চোখের জল আঁকতে । সার্থক হয়েছে ‘ট্রাপিজের মেয়ে / এক হাতে জল অন্য হাতে আগুন নিয়ে / দশবছর হাঁটছে।’
প্রজাপতি রঙের গ্রাম / দেবাশিস সাহা
ছাপাখানার গলি – ষাট টাকা
কে যেন পিদিম জ্বালিয়ে গেছে মাঙ্গলিক
কিছু কিছু কবিতা পড়তে পড়তে মন অপূর্ব এক রসে সিক্ত হয়ে ওঠে, সোনালি কাঠের দোলনায় দুলতে দুলতে মাটির রোমশ নালিটির গায়ে বেড়ে ওঠা অনামি ফুলের কেশরে ঢুকে তার পুঞ্জিত রেখাগুলিকে স্পর্শ করতে থাকে, অপরূপ কল্পনার ভেতর পাক খেতে খেতে আবার ফিরে আসে নিজের কাছে। বাইরের ধূসর তাপ ও ক্ষোভ থেকে দূরে প্রজাপতিটির চঞ্চল ওড়ার কাছে ভিজিয়ে দিতে চায় সমস্ত অন্তর্মুখ দেহবোধ। এক অপার্থিব ঘোর, নিরালা সাড়া আর মেদুর রঙের কাছে তার সমস্ত যাত্রা নিশ্চুপ হয়ে থাকে। সোমেন মুখোপাধ্যায়ের ‘কাঁঠালপাতা বন্ধুপাতা’ বইটির কবিতাগুলি ঠিক এমনি ধরণের। সে যত বলে তার চাইতে বেশি অভিভূত হতে পারে, সে বেশি খনন করে না কিন্তু একটু একটু করে পাখনা মেলতে পারে। তার সেই পেখমের ভেতর অনুপম রঙের ঝিকিমিকি। সেই পালকের রেখায় অনামি ফুলের গন্ধ। তার আনন্দের মাঝে বুনো কুসুমের বিকাশ। কবি সোমেনের খুব সুন্দর নিজস্ব এক জগৎ আছে আর আছে তেমনি সুন্দর একটি মন। পৃথিবীর সমস্ত কিছুকেই তাঁর মন সুন্দর করে তোলে। সেজন্য অল্পেতেই কাতর হয়ে ওঠে সত্তা। নির্ভার প্রেমের প্রতি তার সহজিয়া অনুরাগ কোনো উন্মন ফাগুনের রঙমাখা পলাশের লজ্জা নিয়ে বিকিরিত হয় আরেক প্রেমের অভিমুখে। অপ্রাপণীয়কে তিনি ছুঁতে চাননি, তৃপ্তির মেঠো সুরে যে লয়, বাঁশের বাঁশির মায়াময়তায় যে আলো, সাধারণ আটপৌরে জীবনের যে নিবিড়তা আর স্বাস্থ্য সেইসব অপ্রাকৃত ছোঁয়াগুলি আরো নতুন হয়ে ওঠে তার মনের স্পর্শে। দু একটি উদাহরণ দিলেই স্পষ্ট হয়ে উঠবে-
একটি বীজ ভিক্ষে করে
এনেছিল পাখি,
এনেছিল আত্মীয়দের ছায়া ও বাসস্থান।
আজ, এইখানে –
গছতলে বসে থাকা পথিক
তুমি কি জেনেছ, পূর্ব আত্মজ?
বটফল ভেঙে তুমি দেখো
সহস্র সবুজ পাতার কাঁপন,
রোদ ঝিকিমিকি
মা-পাখিটির ঠোঁটের মতন
(আত্মজ)
বিশ্লেষণ নয় বরং চুপচাপ বসে থাকতে ইচ্ছে করে, ইচ্ছে করে ওর নিশ্চুপতাকে উপভোগ করতে। মা পাখির আশ্রয় ও পালনের আশ্বাস, স্নেহের বিশ্বাসের কাছে দুদণ্ড জিরিয়ে নিতে ইচ্ছে করে। গাছের ছায়ার তলে বিশ্রামরত পথিক খুঁজে পায় নিজের নাড়ির গন্ধ। পাঠকও দেখতে পায় লাল বটফলের ভেতর মা পাখিটির ঠোঁটের মতন সহস্র সবুজ পাতার কাঁপন। বুঝতে বাকি থাকে না এই কাঁপন আসলে পরম্পরার লালন, স্নেহের স্নানে আত্মাকে সিক্ত করে নেওয়া। কবিতা এগিয়ে যায় এভাবে প্রেমে প্রত্যয়ে মাখামাখি হয়ে-
পথের ওপর পড়ে থাকে পথ।
অর্জুন গাছের বাকল ছাড়িয়ে
পাখি এঁকেছিলাম
পাখিটি আর বাসায় ফিরল না
কোনোও দিন। (পথ)
সোমেন মুখোপাধ্যায়ের কলমে বিরহও মধুর হয়ে ওঠে। বৈরাগ্যের মৃদু রাংতায় মুড়ে কাঁচা রোদ্দুরের মতো আছড়ে পড়ে গোবর নিকানো দাওয়ায়। পরখ করতে থাকে জীবনকেই। এই বিরহবোধ থাকে বলেই তার চোখ সবকিছুকেই সুন্দর দ্যাখে, বিষণ্ণতার মাঝেও অনাবিল মুক্ত আনন্দে ভর করে থাকে অন্তঃসার। বিস্তীর্ণ গতিশীলতার মাঝে যে সংযমের সামঞ্জস্য নিয়ে নদী বয়ে চলে আরো প্রসারণের দিকে সেই আয়ত্ত সেই অর্জন কোনো নতুন সংগীতে কথা বলে ওঠে এই কবির কবিতায় –
মাটির ওপর তৈরি হয়েছে পথ,
পা পথে হাঁটলে
ফিরে ফিরে দেখা হবেই।
পথকে রাস্তা বললে
পথিকের ব্যঞ্জনা নষ্ট হয়।
পথ মানে অজস্র পায়ের ছাপ
পথ মানে ধুলো কিংবা বিশ্রাম,
পিছন ফিরে আরেকবার দেখা।
(পথ)
আর পথ মানে আহ্বান, গতি সুষমা। পথ মানে অন্বেষণ। এই যে দেখা হওয়ার কথা কবি বললেন তা কেমন দেখা হওয়া? এই দেখা হওয়া আসলে আমাদের চিরন্তন কোমল অনুভূতির কাছে আবার ফেরৎ নিয়ে আসা, ভুলে যাওয়া প্রেমকে চিনিয়ে দেওয়া কিংবা আমারই কোনো আয়াস, প্রতিজ্ঞা, ইশারা যা আমরা ভুলে যেতে চাই বারবার অথচ ভুলতে পারি না। পিছন ফিরে আরেকবার দেখা আবার নিকটবর্তী অতীতটিকেও নিরীক্ষণ করা। দেখার ভেতরে এই যে আস্বাদন তার বর্ণলিপিগুলি নানা অনুনাদে প্রতিধ্বনিত হয়ে ওঠে। ছোট্ট ছোট্ট প্রেমের ভাবনাগুলি খুবই মধুর আর অবগুণ্ঠনবতী হয়ে উঠেছে এই কাব্যে –
মাটির হাঁড়িতে ভেজা পলাশের ফুল। ঢাকা
সরিয়ে বারে বারে দেখেছি, কত গাঢ় হল
রঙ। সবুর করা রাত পোহালেই ফ্রকপরা
সকাল। সবার মাঝেই লুকিয়ে চুরিয়ে শরমের
রঙ।
বিকেল নামা পুকুরঘাটে গা মাজছিস
তুই। শরমের রঙ ছড়িয়ে পড়ছে জলে।
দূরে পলাশ গাছে ফিরে আসছে পাখির
দল। তাদের ঝটপটিতে ঝরে পড়ছে
পলাশের ফুল। নীচে ধানক্ষেতের গাড়হা
থেকে বেরিয়ে আসছে ঢ্যামনা সাপ।
(দোল)
প্রেম, মিলন, বিরহ কোনো কিছুই সোমেন মুখোপাধ্যায়ের গাঢ় নয়। বরং সামান্য তার প্রতিভাস, আলতো তার ছায়া। কমনীয়তার পেলব বাঁকগুলি খুব সহজেই চোখে পড়ে। এখানে মিলনের রঙে একাকার হয়ে আছে প্রকৃতি আর মন। দোলের আবিরে আঁকা আছে শরমের শিখা। আর আছে প্রকৃতির আটপৌরে সাজে কিশোরীর মনের প্রতিফলন। ধানক্ষেতের গর্ত থেকে বেরিয়ে আসা ঢ্যামনা সাপ হয়তো কোনো সুপ্ত কামনার প্রতীক। কবিতার ভাষা খুবই নরম। ক্ষণে ক্ষণে এখানে উঁকি মারছে খরা কবলিত পুরুলিয়ার রূপের ঝাঁঝ। অনবদ্য রূপতৃষ্ণা রুক্ষতার কাছে গিয়ে আরো কোনো গভীর খয়েরি দীপনকে ফুটিয়ে তুলেছে। চলুন কবিতান্তরে যাওয়া যাক –
ঠাকুমার চিবানো পান মুখ দিয়ে ঠোঁটে
রাঙা করেছি কতবার। হাসিমাখা এইসব
ঘরকন্নাতে, পানসাজানোর দিনগুলি
ফুরিয়ে আসছে এখন। পানের খুঙিতে
ছোট ছোট ডিবা। ডিবা খুলতেই লাফ
দিয়ে বেরিয়ে আসত খয়ের জর্দার গন্ধ।
(পিরিতি পাতা)
কবিতা পড়তে পড়তে আমাদের মন শৈশবের সেই স্বপ্নালু বর্ণময় দিনগুলির কথায় আচ্ছন্ন হয়ে ওঠে। একটি মন কেমনিয়া বুকের অতলে বাজতে থাকে। আজকের যুগের ব্যস্ত ক্যরিয়ার তৈরির দিনে এই অনুভূতি শান্তির প্রলেপ দিতে সাহায্য করে। ডিবা খুলতেই লাফ দিয়ে বেরিয়ে আসা খয়ের জর্দার গন্ধ আসলে বুকের আগল ঠেলে বেরিয়ে আসা এক চিরন্তন উদ্ভাসও। এই আবহে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে কবিতার অন্তর্গত তাপ ও বিভা-
পানের পাতায় পিরিত জমে থাকে।
পিরিতের রঙে ঠোঁট রাঙাব বলে
পানে চুন সাজতে গিয়ে দেখি খয়ের নেই।
গাঁয়ের মুড়ায় একটি পলাশ গাছ। সবে
রঙ ধরেছে।
(পিরিতি পাতা)
পানের রঙে মিশে থাকে পিরিত। পিরিতের রঙে ঠোঁট রাঙাতে গিয়ে দেখা যায় ঘরে খয়ের নেই। শুধু গাঁ মুড়ায় পলাশ গাছে রঙ ধরতে শুরু করেছে। কবিতাটিতে তখন আলো ফেলে বাউলের প্রেমিক সত্তা, লোকায়ত সুরের টান, আঞ্চলিক রসের সুষমা। কোথাও যেন হালকা দুঃখবোধও ক্রিয়াশীল থাকে। চুন সাজতে গিয়ে খয়েরের অভাব তো দারিদ্র্যকেই দেখিয়ে দেয়। তবুও পলাশফুল ফোটার ভেতর দিয়ে এ বিষাদ আর থাকে না। মধুর আনন্দধারা প্রেমবোধের অনন্যবিভায় জারিত হতে থাকে।
সোমেন মুখোপাধ্যায়ের কবিতায় পুরুলিয়ার জনজীবনের আশা, আনন্দ, দুঃখ-বেদনার মধ্যে যে চিরকালীন এক রসসত্তা বিরাজ করে তারই প্রতিফলন ঘটে থাকে। অভাবের সহস্র ধাক্কা আর প্রাকৃতিক রুক্ষতা এই অন্তরের স্রাবকে টলাতে পারে না। ফলতই দুঃখের বিষাদ নয় দুঃখের প্রাচুর্যকে আবিষ্কার করে তার কবি চৈতন্য। বাস্তবের অগ্নিধ্বস আর জটিলতার ব্যুহে হারিয়ে যায় না কোনোদিন টুসু, ভাদু, ঝুমুরের অভিজ্ঞান। এই সুরের ঝর্ণাধারায় সত্তাকে নিষিক্ত করে নিয়ে একটি জনজাতি এগিয়েছে ঔদার্যের মহৎ অভিমুখে। সহস্র অভাবের আঙিনায় পা রেখেও তাদের ধমনিতে জ্বলেছে সুরের রক্তরাগ। যন্ত্রণায় বিদ্ধ হওয়া নয় বরং যন্ত্রণাকে আলিঙ্গন করে তারা যন্ত্রণাকে ঢাকে, হাত বাড়ায় প্রেমের আলিঙ্গনের জন্য-
গুড় জল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা একটি
দুয়ার। দুয়ার মানে, জিরাবে নাকি তুমি?
(দুয়ার)
এই আতিথেয়তা সোমেন মুখোপাধ্যায়ের কবিত্বেরও ধর্ম। একটি আশ্রয়কে যেন লালন করে চলে, আশ্রয়ের গভীর জ্যোতিকে আঁজলা পেতে নেয়। পথিককে দেখিয়ে দেয় পথ। একটু দূর থেকে দেখে আদিবাসী মানুষদের জীবনযাত্রা, ভালোবাসা এবং সংগ্রামের পরতগুলিকে। দেখতে থাকে ঘুঁটের গায়ে পাঁচ আঙুলের দাগ, সাইকেলের প্যাডেল ঘুরিয়ে আসা ছাতা সারার লোক, গোবর নিকানো ঢেঁকিঘরে ঝিমমারা খুঁকড়ির ছানা, হেঁশেল থেকে উড়ে আসা চ্যাথরা শাকে ফোড়ন দেওয়ার গন্ধ, তুলসী গাছের নীচে মাথা নাড়া প্রদীপের শিখা আর তার সঙ্গে একাকার হয়ে ওঠে মা ষষ্ঠীর ব্রত, লক্ষীপূজা, টুসুর পার্বন, দোল, গাজনমেলা এবং পথের পাঁচালী, পদ্মানদীর মাঝি কিংবা গণদেবতার আখ্যান। এই বহুমুখী আত্মীকরণে এবং অর্জনে জন্ম হয় অপূর্ব সাংস্কৃতিক বয়নের। দেশ-কাল-মানুষের সুগভীর ভাষা ও উন্মোচনকে শিরায় শিরায় প্রবাহিত করে ‘কাঁঠালপাতা বন্ধুপাতা’ দিয়ে যায় পরিপূর্ণ মানবতার মহাসঙ্গীত।
কাঁঠালপাতা বন্ধুপাতা ৳ সোমেন মুখোপাধ্যায় ৳ ছোঁয়া প্রকাশনী ৳ আশি টাকা
নেক্রপলিস : পলকে স্বচ্ছ জলের উপর জেগে ওঠা ছায়ায় নিজেকে চিনতে শেখায়, চারপাশকেও.
শূন্য দশকেই তাঁর স্বরের সাথে পরিচিত হয়েছেন পাঠক. গড়ে তুলেছেন নিজস্ব হাঁটার পথ. স্বতন্ত্র উচ্চারণ. পারিবারিক আবহে সাহিত্য. আর তা যখন কবির শ্বাসের সাথে জড়িয়ে যায়, সৃষ্টি হয় ঘোর. ঘোরাচ্ছন্ন কবি পাপড়ি গুহ নিয়োগী. প্রান্তে বসে উদযাপন করছেন প্রান্তিকতা. আর চোখে চোখ রেখে চেয়ারের দিকে ছুঁড়ে দিচ্ছেন প্রশ্ন. সম্প্রতি আবারও পড়ছিলাম কবি পাপড়ির পঞ্চম কবিতাবই নেক্রপলিস. বাকি বইগুলোতে যে স্বর, এই বইতেও তা স্পষ্ট. সেই স্বরই চিনিয়ে দেয় ঘোরের উৎসমুখ. ঘোরাচ্ছন্ন হন পাঠক. সোজাসাপ্টা ভাষা. যেন আজকের কথা কবি আজকেই বলবেন. এবং আজকের ভাষায়. ভাষায় কোন ছুৎমার্গ নেই. আবার তার ব্যবহার সম্পর্কেও সচেতন. তীব্র সচেতন.
আসলে কোন কবির উচ্চারণই একটা সময় পর আর ব্যক্তিগত থাকে না. একক থাকে না. তখন সবটাই কোরাস. আর সেই সুর, সমষ্টির সুর যখন মিলেমিশে এক, তখন অজস্র উৎসমুখ এক হয়ে যায়. স্বতন্ত্রতা দাঁড়িয়ে যায় প্রশ্নচিহ্নের মুখে. কিন্তু কবি পাপড়ির এই বইটি প্রমাণ করে, সমষ্টির সুর হয়েও স্বতন্ত্র থাকা যায়. জেন ওয়াইয়ের ভাষা বলে আদৌ আলাদা কি কিছু হয়? সবটাই বৃত্তাকার ঘোরে. নেক্রপলিসে তা স্পষ্ট. আর কবির অন্যান্য কবিতাবইয়ের পাশেও এই বইটি নিজস্ব স্বরে উজ্জ্বল. তার অন্যতম কারণ, সামাজিক অবস্থানে নারীর অবস্থা, সম্পূর্ণ নিজস্ব আলো অন্ধকারের গল্প নয়, সোজা সাপটাভাবে তীক্ষ্ণ ভাষায় চারপাশের প্রতিটি বস্তু/ বস্তু নয় এমন সব কিছুকেই প্রশ্নচিহ্ন বিস্ময়ের মাঝে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন সাবলীল ভাবে, যা পাঠককে ঋদ্ধ করবে. ভাষা থেকে দর্শন, সাহস থেকে উচ্চারণ... নেক্রোপলিস আসলে সমাজের অসুস্থ বাতাবরণের বিপরীতে, তার সাথে জড়িয়ে থাকা চেয়ার গদি মঞ্চ মাইক আলো ঝাণ্ডা জার্সি পতাকা রং উৎসব উদযাপন... এসবের মাত্রা জ্ঞানহীনতার বিপরীতে গর্জে ওঠার নাম. কখনো মনে হয়, সমস্ত ভুলকে সপাটে চড় দিচ্ছেনে কবি. কখনো মনে হয়, অস্বচ্ছতার প্রতিটি একক বিন্দুকে.
সর্বমোট একান্নটি কবিতা. এক সুতোয় বাধা কিছু সত্যি. যা পলকে আয়নার মুখোমুখি করে. পলকে স্বচ্ছ জলের উপর জেগে ওঠা ছায়ায় নিজেকে চিনতে শেখায়. চারপাশকেও. আসলে কবিতা একান্নটি নেই. কবিতা একটিই. যার একান্নটি পর্ব. প্রতি পর্বের মাঝে যে পৃষ্ঠা ওল্টানোর শব্দ, সেগুলোও কবিতা. কখনো কবিতার মতো. সশব্দ উচ্চারণের পর যে চুপশব্দ, সেও তো কবিতাই.
কবি লিখছেন,
• 'এই নেক্রপলিসে মরে গেছি নাকি বেঁচে আছি বুঝতে পারি না/.../ কোন রঙের উপর মন্দির l মসজিদ লিখব, কে বলে দেবে/ শুধুই শূন্যতা... অতৃপ্ত যৌবনছিপি/ এসব জল হাহাকারের পর কঠিন বরফে পরিণত হয়'
• 'আপনি দূরে লোভ ছিটিয়ে রাখেন/ তারপর জনগণের দল নেড়ি কুত্তা হয়ে যায়/ মৃত্যু পর্যন্ত বিষাক্ত কাঁটার লালা, ভয়ঙ্কর/ আপনি মর্গে দাঁড়িয়েও ক্যামোফ্লেজ ধারণে ওস্তাদ'
• 'বমি পায় l দীর্ঘশ্বাসে পা ডুবিয়ে/ পাখিদের জীবন দেখি/ স্নান শেষে/ আমারই গায়ে ধূপের গন্ধ/ অথচ, দীর্ঘজীবন/ আগুন I জল I নদী I শ্মশান পাশাপাশি রেখেছি'
• 'নেক্রপলিসে মরা মাছ ভেসে ওঠে/ ইঁদুরের গলিতে বাড়ে মাংসের দোকান'
• 'ধর্ষিতার জামায় পতাকার রং/ আর আপনি মাংস চিবোচ্ছেন/ যাহান্নাম ভালো, না আপনার পা-চাটা/.../ আচ্ছা, যদি আমরা আপনাকে বেজম্মা বলি/ আপনি কি রাগ করবেন?'
• 'দেশের ভেতর দাবার বোর্ড ঢুকে পড়ে/ হাসতে, হাসাতে, খেলার ঘুঁটি হয়ে যাই'
• 'আলমারি খুলে চমকে যাই/ সারি সারি ইচ্ছের মৃতদেহ/.../ বুকের ভেতর দীর্ঘশ্বাস নিয়ে, কফিনে বসে/ ফুসফুসের অসুখ কিনছি'
• 'যে মেয়েটি নেক্রপলিসকে ভালোবেসেছিল/ শেষ বেলায় পোশাক খুলে রোদ হয়ে যায়'
• 'নেক্রপলিস আর কিছু নয়/ মাটি হচ্ছে ইট/ গাছেরা আসবাব/ আর আমি তুমি আমরা বোকাচোদা'
• 'মানসিক উৎকণ্ঠার রক্তচাষ করে উলঙ্গ শাসক'
• 'গর্ত বিক্রি হয় না, নীরবে পুড়ে যায়/ রাক্ষুসে খিদে ঈশ্বরকেই মানায়/ ভয় নেই বাঘিনী পরি প্রতিটি গর্তের মূল্য ধরে দেবে/ ভ্রমণের আনন্দ বেড়ে যাবে বহুগুণ/... / প্রতিটি গর্ত আসলে আমাদের দেশ'
• 'সম্পর্কের গর্তে চিতা জ্বলছে দেশে/ খুনি আজ ঈশ্বরের প্রতিনিধি'
• 'ওরা উচ্চস্বরে ধর্ম বাজাচ্ছে বারুদ ঘেঁটে/ অবরোধ I ধর্মঘট/ মদ মাংসে নারকীয় উল্লাস/ বমি পায়'
• 'প্রত্যক্ষদর্শী ভয়ের ভেতর দাঁড়িয়ে/ নিজের মৃতদেহের সাথে নিজস্বী তুলছে'
• 'এখনও শিরদাঁড়ার ওপর হাত রাখতে পারি/ কুয়োর সামনে বসে কবিতা পড়ি/ ধর্ষকের কাছে গিয়ে রাষ্ট্রের কথা জানতে চাই'
• 'ইদানীং সমস্ত দৃশ্য দাঁতমুখ চেপে/ ভালো আছি, দেখাতে পারি ম্যাজিক/ আদতে আমরা জিভহীন জনতা'
• 'রং পাল্টে আপনি পাল্টেছেন তো?/... / লোকে জানুক আপনি প্রত্যেকবার প্রতারক'
• 'ক্ষমতার গর্ভে জন্ম আপনার/ বলতে শুনেছি/ ধর্ম ছাড়া রাজনীতি হয় না/ রাজনীতি ছাড়া ধর্ম/... / গ্যালারিতে বসে দেখছেন মোরগ লড়াই/... / আর আমরা ভোদাই জনগণ/ হাততালির ভেতর ব্লেড হেঁটে/ ডিটেনশন ক্যাম্পের দিকে যাচ্ছি'
• 'জেনে গেছি/ মাথা নীচু করে শাসকের সামনে দাঁড়াতে হয়'
আর শেষ কবিতাটি তুলে দিলাম সম্পূর্ণ.
নেক্রপলিস একান্ন
এই নেক্রপলিসে, মুখোশের মিছিল পেরিয়ে
শুয়োরের বাচ্চা হতে চায় কয়েকজন...
ইতস্তত ছেলেটি বলে, কুত্তার বাচ্চা হব
তাও মানুষ আর না
ওয়াক-থু করে বুড়ো একের পর এক গ্লাস আর্তনাদ পান করে
বলে, বাঞ্চোৎ মানুষের বাচ্চারাই রাজনীতি করে
উপরেশকুন চিল হাসতে থাকে...
তীব্র ব্যথা নিয়ে হঠাৎ মাঝবয়েসি ছেলেটি বলে ওঠে
বাল, মঞ্চও বিক্রি হয় যৌবনবতী চাঁদের হাতে
নৌকা বেয়ে পরিত্রাণহীন মা
কচ্ছপের মতো বয়ে বেড়ায় মানুষ হওয়ার জ্বালা
পাঠক, বিস্ময় বিস্ময় এবং বিস্ময়পর্ব. স্বাভাবিক সাহস ও বোধ. এরপর শুরু হল জারণ. বৃত্ত বৃত্ত করে সময় এগিয়ে যায়. আর এই উচ্চারণ. কালকে বিদীর্ণ করে গেঁথে যায় হৃদয়ের পুরু, কঠিন ও খসখসে দেওয়ালে. সামান্য পাঠক হিসেবে বারবার নত হয়েছি কবিতার কাছে. না কিছু চমকপ্রদ পঙক্তিতে নয়, ফিনিশিং টাচে নয়, গ্ল্যামারে নয়. কবিতায়. কবিতার সমস্ত জার্নিতে.
বইটির ভূমিকা লিখেছেন স্বপন রঞ্জন হালদার. তাঁর অক্ষর কবিতার আত্মার কাছে নিয়ে যায়. যদিও এ কথা বলতেই হয়, কবি পাপড়ি গুহ নিয়োগীর পাঠকদের খানিকটা বড় শ্বাস নিয়ে এ জার্নিতে সংযুক্ত হতে হবে. বৈভাষিক এর সুন্দর, ঝকঝকে প্রোডাকশন, অদ্বয় চৌধুরীর অসাধারণ প্রচ্ছদ... সব মিলিয়ে নেক্রপলিস অবশ্যই সংগ্রহে রাখার মতো. যা ভাবাবে পাঠের আগে. পরে তো অবশ্যই.
নেক্রপলিস
পাপড়ি গুহ নিয়োগী
প্রচ্ছদ- অদ্বয় চৌধুরী
ক্যালিগ্রাফি- নবেন্দু সেনগুপ্ত
বৈভাষিক
120 টাকা
দ্বিতীয় বর্ষ ।। অষ্টম সংখ্যা ।। মার্চ ২০২২ খুব অসহায় লাগছে এবার। আমাদের ডান পাশে ধস। বায়ে গিরিখাত। মাথায় বোমারু। পায়ে পায়ে হিমানীর ব...