সাধনপর্বের নির্জনতা
৫.
বঞ্চনা
সিংহদ্বার খুলে গেছে , ভেতরে দেখি শুধুই শূন্যতা
হা হা করছে অন্ধকার
কেউ নেই , কোনো রহস্যও না
যেন বালক বয়সের হাওয়া ঘুরে যায়
দু 'একটা শুকনো পাতার শব্দ ----
কেউ নেই ? আমি চেঁচিয়ে উঠি
প্রতিধ্বনি আসে , কেউ নেই, নেই , নেই ---
আমার তীব্র অভিমান হয়
এ কি এক ধরনের বঞ্চনা নয় ?
যদি কেউ না থাকবে , তবে দ্বার কেন বন্ধ ছিল ?
কেন প্রতীক্ষায় ছিলাম এতদিন!
আমি মাক্সবাদে বিশ্বাসী , আবার অবিশ্বাসের মেঘও ঘন হয়ে ওঠে কখনো-সখনো । সে সময় বিশেষের ফল। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ' বঞ্চনা ' কবিতাটি আমাকে আরো একবার অতীত বিশ্বাসের ভূমিতে নিয়ে দাঁড় করালো । ' কেন প্রতীক্ষায় ছিলাম এতদিন '! কবি বিস্মিত । আমরাও কি বিস্মিত! কেউ কেউ । নচেৎ কেউ না । ইতিহাসের গতি অনুধাবনের শক্তি আমাদের আছে । কবিও তার বাইরে নন। তখন প্রশ্ন করে মন , সত্যিই তো এই দীর্ঘ প্রতীক্ষা কার জন্য । অথবা কিসের জন্য । যদি এমনটা হত প্রতীক্ষার শেষে ওই সিংহদুয়ার শুধু খুলেই যাবে না , সঙ্গে সঙ্গে তার অভ্যন্তরের ঐশ্বর্য রাশি রাশি ছড়িয়ে পড়বে আদিগন্ত । তা কিন্তু হয় নি। আমাদের স্বপ্নগুলি আশাগুলি শুধু পুরোনো আসবাবের মত ভেঙে খানখান হয় । ' হা হা করছে অন্ধকার '। অন্ধকারের তীব্রতা যন্ত্রণার মত । ' হা হা' শব্দে চিরকালের সেই বঞ্চনার ইতিহাস , মানুষের ব্যথার মেহফিল ---- শ্রেষ্ঠ কিছু শব্দেই ধরে রেখেছেন কবি ।
মনে করুন ' পথের পাঁচালি ' র অপুকে । কল্পনায় সে একবার কুরুক্ষেত্র যুদ্ধভূমিতে , আবার পর মুহূর্তে মেঘের ওপারের জীবন সম্বন্ধে কৌতূহলী । শৈশবের সেই জিজ্ঞাসাই তৈরি করে দেয় ভবিষ্যতের দিক। দুর্ভিক্ষ দাঙ্গা উদ্বাস্তু সমস্যা কবির কাছে কল্পনাটুকু ছিল । কিন্তু তাতে ছিল না মহাভারতের বীর যোদ্ধা বা অচেনা পৃথিবীর হাতছানি । অন্ন বস্ত্র বাসস্থানের মতো শান্তিও যাচ্ঞা করেছিল শৈশব । পুনর্বাসনের দুরন্ত ইতিহাস ছাপিয়ে একটু ভালো থাকার মত বিষয়টি সেখানে গুরুত্ব পেয়েছে । কিন্তু ...
কিন্তু এই কবিতায় কি পাওয়া যেত , তা থেকেও কী কী পাওয়া যায়নি , সেই স্বপ্নভঙ্গের ছবি বড় হয়ে উঠেছে । নৈর্বক্তিক জীবন নয় , মেরুদন্ড সোজা রেখে বেঁচে থাকার কথাই কবি ভেবেছেন । তার ভেতর একটু স্বপ্ন একটু আশা ... এই আর কি। বেশি কিছু নয় । অথচ রাষ্ট্রব্যবস্থা সেটুকুও দিতে কার্পণ্য করে । ' এ কি এক ধরনের বঞ্চনা নয় ? ' হ্যাঁ বঞ্চনা। শৈশবের বঞ্চনা - ব্যক্তি মানবের বঞ্চনা । জীবনব্যাপী সাধনার বঞ্চনা । অর্থাৎ একটা সিংহদ্বার অনেকগুলি বিষয়ের প্রতীক হয়ে উঠতে থাকে।
আত্মা বশীভূত হয়েও যেটুকু প্রতিবাদ জমা থাকে শ্রমিকের দুটি হাতে , সেটাই কোনোদিন মুষ্টিবদ্ধ হয়ে ওপরে ওঠে । লাল হয়ে যায় যে কোন ঋতুর আকাশ।
কবিতাটি পড়তে পড়তে থমকে যেতে হয় । এক নিঃশ্বাসে শেষ হয়েও সেই না-জ্বলা আগুন টের পাই। যাকে আগলে রেখেছে ভীতু অস্থির না হওয়া এক প্রাণ । অপ্রতিরোধ্য হতে চেয়েও চেতনা ফুসমন্তর।
বিন্দু হতে হতে ...
বিশ্বাসে দুটি হাত বাড়িয়েছি । যদি আরো একবার হাড়গোড় থেকে মুখ বাড়ায় মানুষের ভগবান! একমুঠো লাল রঙের স্বপ্নে ।
৬.
আজ মাংস
সারা শরীরের মধ্যে একমাত্র জেগে আছে নাক। ডেকচিতে টগবগ ফুটছে লোভ আর লালা
' একটু চাখো তো দেখি ' বলার আগেই
তিনটি জিভের মত বেরিয়ে এসেছে তিনটি ডিশ,
আজ সাড়ে তিনশো মাংস ---
মাংসের প্রথম রবিবার।
বিলুর বরাদ্দ চার টুকরো।
ওর পর্শু ফাইনাল ।
নীলু তিন।
মেটুলির পীস্ মা- মণির ।
আলু আর একটুকরো চর্বির সুবাদে
বাপের দুচোখ জুড়ে মহাপ্রসাদের পুণ্য ,
রক্তমাখা রং ও গর্দান ।
সাড়ে তিনশো মাংস ভোজবাজি হয়ে উবে গেলে আলুহীন মাংসহীন
এক বাটি ঝোল খেয়ে উঠে যান গণেশজননী ।
রসুন-পেঁয়াজে, ভাজা মসলার ম ম গন্ধে
দু-তিন আউন্স স্বাস্থ্য বেড়ে গেছে গেরস্তবাড়ির। কার্ণিশে নরম রোদে বলবান কাক ।
দেড়খানা নোনাধরা ঘর
আজ পুরোপুরি শান্তিনিকেতন ।
মায়ের কথা মনে পড়ে গেল । অথবা দিদিমা। জীবনের প্রবহমানতাকে সচল রেখে এগিয়ে যাওয়াই ছিল তাঁদের ধর্ম । প্রসন্নতা শব্দটি ঠিক কতটা গভীর , তা বুঝতে জানতে এমন মা-দিদিমাদের কাছে এসে দাঁড়াতে হয় । আর কে না জানে সে কথা । অমিতাভ দাশগুপ্ত এই কবিতায় এক শুদ্ধ আত্মাকে ধরতে চেয়েছেন । ইচ্ছে থাকলেই যে সব ক্ষেত্রে তা সম্ভব হয় , তা তো নয়। অনেক মুহূর্ত থাকে যখন কবিতা আর শব্দ বাক্য
রীতিতে নিজেকে আবদ্ধ রাখতে চায় না । সে তখন মেধাবী যাত্রা থেকে সরে এসে এলো চুলে উঠোনে বা বাড়ির ছোট্ট ছাদটুকুতে দাঁড়ায় । কী এক বুনো তেলের গন্ধে নির্ভার হয়ে ওঠে পংক্তিমালা।
৫০' , ৬০' , ৭০' এমনকি আশির দশকের চেনা ছবি উঠে এসেছে ' আজ মাংস ' কবিতাটিতে । উদ্বাস্তু সমস্যায় জর্জরিত বাঙালির কাছে দৈবানুগ্রহের মতো ছিল সাড়ে তিনশো মাংসের হাড়- মজ্জা। দেড় খানা নোনা ধরা ঘরেই জীবন যুদ্ধের সঙ্গী ছিলেন একদিন আমাদের বাবা জ্যাঠা কাকারা । এ কথা শুনেছি আমার বড় পিসি সন্ধ্যা চক্রবর্তীর মুখে। সেখানে সিঁড়ির নিচে নতুন সংসার সাজিয়ে স্বপ্ন বুনে ছিলেন আমার ঠাকুমা ।
কবিতাটিতে যে মাকে পাচ্ছি তিনি যেন দুর্গার-ই প্রতিরূপ । দশ হাতে সামলান সংসার । কেউ কিছু অসুবিধা বুঝতে পারেনা । অথবা সামান্য সমস্যা দেখা দিলেই ' এক বাটি ঝোল ' খাওয়ার মতো করে তিনি সামলে নেন সব । গৃহস্থবাড়ির এই চেনা ছবি কিন্তু আরো চেনা হয়ে ওঠে যখন দেখি শীলিত এক জীবনের দিকে এগিয়ে চলেছে সংসার । সংহত জীবন সমাজকে জড়িয়ে থাকে । স্পর্শগ্রাহ্য করে রাখে মনুষ্যেতরকেও। জীবনের উৎস থেকে কেউ বিচ্ছিন্ন নয় । কাক তাই দুপুরের নরম রোদে কার্ণিশে অপেক্ষারত । অথবা অপেক্ষার অবসানের পর বিশ্রামে লীন।
আমার মায়ের কথা মনে পড়ে গেল । কতবার দেখেছি ওই ঝোল- আলুর গল্প । হয়তো কিছু অন্যরকম । তবু জীবনের খোঁজে নেমে ওই একই ঝর্ণাধারা দেখি সর্বত্র । কবিতার দেহাত্মা বহিরঙ্গে- অন্তরঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে। তাতে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের ' সোনার মুকুট ' মাথায় দিয়ে বসে আছেন আমাদের গণেশ জননীরা।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন