জন্মের আগের মুখ : জেন তত্ত্ব ও জেন গল্পের অমায়িক ভুবন
হুইনেং-এর আখ্যান অথবা এক অকুলীন নিরক্ষরের আত্মান্বেষণ
তৃতীয় প্রহরের রাত, ঘুমে ডুবে আছে ডংশান মঠ। তরতাজা তরুণ সন্ন্যাসী মুদিত চোখে কম্বলের উপর পদ্মাসনে বসে, আজ ঘুমের সঙ্গে তার বিচ্ছেদ ঘটে গেছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সে যাবে আচার্য হং-জেনের সঙ্গে দেখা করতে। স্থান, উত্তর চিনের হুয়াংমেই প্রদেশের চিচোউ পরগনার পূর্ব ফেংমাও পর্বতের চ্যানমঠ। সময়, সপ্তম শতকের শেষ দশক। হুইনেং আজ বিকাল থেকে স্মৃতিতাড়িত হয়ে পড়েছে। সে কখনও যা ভাবেনি আজ তাই হয়েছে। আচার্য হং-জেন কিনা স্বয়ং তার কাছে পৌঁছে গেছেন। হুইনেং তখন প্রতিদিনের মতো মাড়াই-ঘরে ঢেঁকিতে পাড় দিয়ে চলেছে। সে কাজ ফেলে তাড়াতাড়ি আচার্যের সামনে প্রণত হয়। আচার্য দেখলেন তরুণ হুইনেং কোমরের সঙ্গে একটা পাথরের চাঙর বেঁধে রেখেছে। তিনি আশ্চর্য হয়ে জানতে চাইলেন— হুইনেং কোমরে পাথর বেঁধে রেখেছ কেন ?
—ঢেঁকিতে পাড় দেওয়ার মতো যথেষ্ট ওজন আমার নেই তাই।
—শরীরী-যন্ত্রণা উপেক্ষা করে এমন কর্তব্যনিষ্ঠা আমি আগে দেখিনি। কতদিন থেকে তুমি এমনটা করছ ?
—প্রথম দিন থেকে।
—তা তো প্রায় আট মাস হল।
—হ্যাঁ আচার্য।
আচার্য এবার চালের পাত্র থেকে একমুঠো চাল তুলে নিলেন। হুইনেংকে দেখিয়ে বললেন, এগুলো কি প্রস্তুত হয়ে গেছে?
—না প্রভু, ঝাড়াই-বাছাই করে তুঁষ ও কাঁকড় থেকে চাল বেছে নিতে হবে।
—হ্যাঁ ঠিকই বলেছ, ঝাড়াই-বাছাই একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ। আজ রাত তৃতীয় প্রহরের সময় তুমি আমার সঙ্গে দেখা কোরো।
হুইনেং দক্ষিণ দেশের লোক। সেখানে তখনও বুদ্ধের দর্শন পৌঁছায়নি। বাল্যকালে বাবা মারা যাওয়ায় সে পড়াশোনার সুযোগ পায়নি। জঙ্গল থেকে জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করে বিক্রির মাধ্যমে সংসার চালাত। একদিন সে একটি দোকানে কাঠের দাম নিতে গিয়ে জনৈক খরিদ্দারের কণ্ঠে উচ্চারিত আশ্চর্য এক ধ্বনিমালা শুনতে পায়। হুইনেং-এর সমস্ত সত্তা জুড়ে সেই অপূর্ব ধ্বনিমালা অনুরণিত হতে থাকে। সে যে একজন অকুলীন, নিরক্ষর কাঠুরে তা আর তার মনে থাকে না। ধ্বনিগুচ্ছের অসামান্য বিন্যাস ও উদাত্ত উচ্চারণের মাদকতায় সে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে।
হুইনেং হতভম্বের মতো জিজ্ঞেস করে, হ্যাঁ ভাই এসব তুমি কোথায় শিখেছ ?
আগন্তুক বলে, হুয়াংমেই প্রদেশের চিচোউ পরগনার পূর্ব ফেংমাও পর্বতের ডংশান মঠে। সেখানকার আচার্য পঞ্চম জেনগুরু হুং-জেন এই ‘চিং কাং চিং’( Diamond Sutra )আবৃত্তি করেন, আমি তাঁর মুখ থেকে শুনে মুখস্থ করেছি। আমি তাঁর অনুগামীদের বলতে শুনেছি এই সূত্র আবৃত্তির মাধ্যমে নিজের প্রকৃতি যথার্থভাবে চেনা যায়, এমনকি বুদ্ধ হয়ে ওঠাও সম্ভব। হুইনেংকে কে আর আটকায়। এক অদম্য উন্মাদনা তার ভেতরে মাথা চাড়া দিয়েছে। তাকে জেনগুরু হুং-জেন-এর পাদপদ্মে আশ্রয় নিতেই হবে। মায়ের গ্রাসাচ্ছদনের যথাসম্ভব ব্যবস্থা করে হুইনেং যাত্রা করল। পুত্রের আত্মিক উন্নয়নের পথে বাধা হলেন না মা। প্রায় ৮০০ কিমি দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে হুইনেং অবশেষে পৌঁছে যায় কামনার মোক্ষধামে।
হুইনেং-এর আজ খুব মনে পড়ছে আচার্যের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতের কথা। হুং-জেন তাঁর মঠে প্রবেশাধিকার দেওয়ার আগে যাচাই করে নেন, পরখ করে নেন স্বরূপ-সন্ধানের আকুতি। অনেকেই তাঁর চোখা চোখা বাক্যবাণের সামনে পড়ে পালাতে পথ পায় না। হুইনেং এখনও পরম যত্নে আচার্যের সঙ্গে তার কথোপকথনটি স্মৃতিতে ধরে রেখেছে।বাক্যগুলি এখনও তাদের হীরকদ্যুতি হারায়নি।
হুং-জেন— কোথা থেকে আসা হচ্ছে ? আমাকে শ্রদ্ধা জানিয়ে কী হাসিল করার জন্য এই পার্বত্য মঠে আসা হয়েছে শুনি ?
হুইনেং— আমি শিংচৌ এর লিংনান অঞ্চলের একজন সাধারণ ব্যক্তি,আপনার একান্ত অনুগত। আমি সমস্ত যাত্রাপথ জুড়ে আপনাকে স্মরণ করে বুদ্ধ হয়ে ওঠার কথাই ভেবেছি। আমার একান্ত ইচ্ছা এটাই।
হুং-জেন— কিন্তু লিংনানের মানুষেরা তো বর্বর প্রকৃতির, তাদের পক্ষে বুদ্ধত্ব অর্জন কীভাবে সম্ভব ?
হুইনেং— মানুষ দক্ষিণের হোক বা উত্তরের তার সঙ্গে তাদের বুদ্ধ প্রকৃতির কোনো সম্পর্কই নেই। এই বর্বর আর আপনি একই প্রাণশক্তির অধিকারী, তাহলে বুদ্ধপ্রকৃতি কীভাবে পৃথক হতে পারে ?
কথোপকথন এমন বুদ্ধিদীপ্ত ও মনোগ্রাহী হয়ে উঠছিল যে আচার্যের অনুগামীরা ক্রমশ ভিড় জমাচ্ছিলেন। আচার্য তার ক্ষুরধার মেধার পরিচয় পেয়ে মুগ্ধ হলেন। তবে তাকে মঠের নবিশ হিসাবে গ্রহণ না-করে শস্য-মাড়াই-ঘরের দায়িত্ব দিলেন। ঢেঁকিতে পাড় দিয়ে ধান ভানানোই তার কাজ। সে নিরক্ষর, বর্বর দখনো জাতির অকুলীন ব্যক্তি। মঠে তার কোনো সম্মান নেই, প্রচলিত ব্যাকরণ অনুযায়ী থাকার কথাও নয়। এমনকি মঠের নবীন সন্ন্যাসীরাও তার সঙ্গে এমন আচরণ করে যেন সে ভিনগ্রহী অনুপ্রবেশকারী।
ষাটোত্তীর্ণ হং-জেন মনস্থির করেই ফেলেছেন এবার অনুগামীদের মধ্যে থেকে ষষ্ঠ আচার্য নির্বাচনের কাজটা তিনি সেরেই ফেলবেন। তিনি ঘোষণা করলেন মঠের প্রত্যেকে যেন বুদ্ধ-প্রকৃতি সম্পর্কিত নিজস্ব ধারণাকে একটি শ্লোক হিসাবে লিপিবদ্ধ করে তাঁর কাছে জমা দেয়, সেরা শ্লোক রচয়িতাকে তিনি পরম্পরিত চীবর ও ভাণ্ড দ্বারা ষষ্ঠ আচার্যের পদে বরণ করে নেবেন। ষষ্ঠ আচার্যের পদে কে বসবেন তা মঠের কারও অজানা নয়। শেনজিউ ছাড়া ওই গুরুভার কে বহন করবে! সে যেমন বয়োজ্যেষ্ঠ, তেমন প্রাজ্ঞ। ফলে শেনজিউ ছাড়া কেউই কোনো শ্লোক লিখল না। কিন্তু সংকোচবশত শেনজিউ সেই শ্লোকটি আচার্যের হাতে না-দিয়ে রাতের অন্ধকারে মঠের দক্ষিণ দিকের দেয়ালে সাঁটিয়ে দিল। ভোরবেলা আচার্য হং-জেন, শিল্পী লু-চেনকে সঙ্গে নিয়ে ধ্যানকক্ষের দক্ষিণ দিকের দেয়ালের কাছে পৌঁছালেন। আগে থেকেই ঠিক ছিল ওইদিকের দেয়ালে ‘লঙ্কাবতার সূত্র’ থেকে কিছু আখ্যানের ছবি আঁকবেন লু-চেন। সম্ভবত এই কারণেই শেনজিউ শ্লোক টাঙানোর জন্য দক্ষিণ দিকের দেয়াল বেছে নিয়ে ছিল। হঠাৎ আচার্যের চোখ পড়ল শ্লোকের উপর।তিনি লু-চেনকে বিদায় দিয়ে অনুগামীদের ডেকে নিলেন। শ্লোকটি ঘিরে সবাই ভিড় জমাল। আচার্য শ্লোকটির সামনে ধূপ জ্বেলে দিয়ে নিবিষ্ট মনে পাঠ করলেন—
দেহই বোধিবৃক্ষ
মন উজ্জ্বল আরশি
নিত্য প্রযত্ন দাও
না-হয় ধূলিমলিন
আচার্য সবাইকে শ্লোকটি মুখস্থ করতে বললেন। আরও বললেন এই শ্লোকটি তাদের বুদ্ধ-প্রকৃতির সান্নিধ্যে নিয়ে যাবে। শেনজিউ-এর তখন সেখানে থাকার কথা নয়, সে দূর থেকে সমস্তটাই পর্যবেক্ষণ করছিল। বিদায় নেওয়ার সময় আচার্য বলে গেলেন শেনজিউ যেন রাতে তাঁর সঙ্গে একবার দেখা করে। শেনজিউ এই আহ্বানের অপেক্ষায় ছিল। যথাসময়েই সে আচার্যের কক্ষে পৌঁছে যায়।
আচার্য বলেন, শ্লোকটি তুমি লিখেছ?
শেনজিউ— হ্যাঁ। তবে আমি ষষ্ঠ আচার্যের পদলাভের উদ্দেশ্যে শ্লোকটি লিখিনি, সে যোগ্যতাও আমার নেই। আমি আসলে দেখতে চেয়েছি আমি যৎসামান্য প্রজ্ঞা অর্জন করতে পেরেছি কি না ?
আচার্য— শ্লোকটি জানিয়ে দিচ্ছে তুমি এখনও প্রজ্ঞার দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছ, ভিতরে প্রবেশ করতে পারনি। বরং কয়েকদিন পরে তুমি আরও একটি শ্লোক লিখে আমাকে দেখিয়ো।
দিন দুই কেটে গেছে শেনজিউ একটি পঙক্তিও আর লিখে উঠতে পারেনি। হুইনেং এসব কিছুই জানে না। একজন বালক শিক্ষার্থী শ্লোকটি উচ্চারণ করতে করতে মাড়াই-ঘরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। হুইনেং তার কাছে শ্লোকটি সম্পর্কে জানতে চায়। সে ষষ্ঠ আচার্য নির্বাচনের জন্য শ্লোক প্রতিযোগিতা,ধ্যানকক্ষের দক্ষিণ দিকের দেয়ালে শেনজিউ-এর লিখিত শ্লোক ইত্যাদি সম্পর্কিত সবকিছু আনুপূর্বিক জানিয়ে দেয়। হুইনেং আটমাস মঠে থাকলেও মাড়াই-ঘরের বাইরে বেরোনোর অবকাশ পায়নি। সারাক্ষণ কেবল কোমরে পাথর বেঁধে ঢেঁকিতে পাড় দিয়ে চলে। সে শ্লোকটি একবার নিজের চোখে দেখে নিতে চায়। কিন্তু ধ্যানকক্ষের দক্ষিণ দিকের দেয়াল কোথায় তা সে জানে না। বালকটি হুইনেংকে সঙ্গে করে নিয়ে যায় শ্লোক-দেয়ালের সামনে। সে শ্লোকটির সামনে অবনত হয়ে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে। হুইনেং পড়তে জানে না, তার অনুরোধে মঠের অন্যতম তত্ত্বাবধায়ক ঝাং রিয়াং শ্লোকটি পড়ে শোনায় । হুইনেং বলে বুদ্ধ-প্রকৃতি নিয়ে আমার নিজের বানানো একটি শ্লোক আছে; কিন্তু আমি তো লিখতে পারি না। ঝাং রিয়াংই স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এগিয়ে আসেন। হুইনেং বলে যায়—
বোধি কোনো বৃক্ষই নয়
নেই উজ্জ্বল আরশি কোথাও
বুদ্ধ-প্রকৃতি চির বিশুদ্ধ
ধূলিমলিন হবে কীরূপে ?
শ্লোক শুনে উপস্থিত শ্রোতৃমণ্ডলী বিস্মিত হয়, তারা তো বুদ্ধ-প্রকৃতিকে এমন সহজ অথচ গভীর দৃষ্টিতে দেখেনি। লেখা শেষ করে ঝাং রিয়াং শ্লোকটি ধ্যানকক্ষের পশ্চিমদিকের দেয়ালে টাঙিয়ে দেন। আচার্য সেই পথে যাচ্ছিলেন, তিনি শ্লোকটি পড়ে বিরক্তি প্রকাশ করে বললেন, যাচ্ছেতাই লেখা। তারপর পাদুকা দিয়ে ঘষে ঘষে হরফগুলি মুছে ফেললেন। সবাই বুঝল আচার্য এমন অশ্রদ্ধা দেখিয়েছেন মানে লেখাটি গুরুত্বহীন, নিছক হেঁয়ালি ছাড়া কিছুই নয়।
তৃতীয় প্রহরের রাত, ঘুমে ডুবে আছে ডংশান মঠ। হুইনেং আচার্যের কক্ষে প্রবেশ করলেন। আচার্য তার প্রতীক্ষাতেই ছিলেন। তিনি কালক্ষেপ না-করে ‘চিং কাং চিং’ সূত্র উচ্চারণের মাধ্যমে হুইনেংকে ষষ্ঠ আচার্য হিসাবে বরণ করে নিলেন।অতঃপর আচার্য তার হাতে চীবর ও ভিক্ষাভাণ্ড তুলে দিয়ে বললেন, এই চীবর ও ভাণ্ড প্রথম আচার্য বোধিধর্মের হাত থেকে আচার্য-পরম্পরায় আমার হাতে এসেছিল, আজ তোমার হাতে তুলে দিলাম। তুমিও যথাসময়ে যোগ্য কারও হাতে এই স্মারক তুলে দেবে। এখন তোমাকে বিদায় নিতে হবে নচেৎ তুমি বিপদে পড়বে। তুমি দক্ষিণদেশের অকুলীন নিরক্ষর, মঠের অধিকাংশই তোমাকে মানতে চাইবে না। তোমার কাছ থেকে চীবর ও ভাণ্ড ছিনিয়ে নিতে চাইবে।
হুইনেং জানায়, সে রাতের অন্ধকারে পার্বত্য পথের গতিপ্রকৃতি ঠিক করতে পারবে না। আচার্য হুং-জেন তাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যান। হুইনেং তাঁর প্রযত্নে পার্বত্য পথের জটিলতা কাটিয়ে নিরাপদে নদীতীরে পৌঁছে যায়। আচার্য তাকে নৌকায় চাপিয়ে নদী পার করে দেন। বিদায় নেবার সময় হুইনেংকে তিনি উপদেশ দেন, যেন সে দক্ষিণ দেশে গিয়ে ধর্মপ্রচার করে, অবশ্য তার আগে সে যেন তিনবছর আত্মগোপন করে থাকে।
মাস দুই পরে হুইনেং পৌঁছায় দা-উ পর্বতের পাকদণ্ডীতে। একদিন সে দ্যাখে ডংশান মঠের কয়েকশ ভিক্ষু তাকে ধাওয়া করে আসছে। হুইমিং-চেন নামের জনৈক ভিক্ষু হুইনেংকে ধরে ফেলে। হুইমিং প্রথম জীবনে সেনাবাহিনীতে ছিল। সে বেশ ক্ষিপ্র ও নিষ্ঠুর প্রকৃতির। সে হুইনেং এর হাত থেকে চীবর ও ভাণ্ড ছিনিয়ে নিতে চায়। হুইনেং বলে, ধর্মের ব্যাপারে জোরাজুরি ঠিক নয়। তুমি যদি সত্যিই চীবর ও ভাণ্ড গ্রহণ করতে চাও তাহলে আমি এই পাথরের উপরে রাখলাম তুমি তুলে নাও। সত্যিসত্যিই হুইনেং চীবর ও ভাণ্ড একটি পাথর খণ্ডের উপর নামিয়ে রাখে। হুইমিং-এর আর তর সয় না, সে একেবারে ঝাঁপিয়ে পড়ে। কিন্তু ওই পর্যন্ত, সজোরে টানাটানি করেও সে চীবর বা ভাণ্ড পাথর থেকে ওঠাতে পারে না। পারবে বা কীকরে! এতটা পথ অতিক্রম করতে গিয়ে সে প্রায় সমস্ত শারীরিক শক্তি খুইয়ে ফেলেছে। বাকি থাকে মানসিক শক্তি; কিন্তু তাও আর অবশিষ্ট নেই। তার মন জানে ওই চীবর ও ভাণ্ড মহা পবিত্র, আর হুইনেং তা পেয়েছে পঞ্চম আচার্যের কাছ থেকে সুতরাং সে এখন ষষ্ঠ আচার্য। হুইমিং অনধিকারী, সে কোনোভাবেই ওই পবিত্র জিনিস গ্রহণ করতে পারে না। যদিও তা করে থাকে তার ফল শুভ হবে না। ফলত, হুইমিং ভিতর থেকে সাড়া পায়নি, বরং বাধা পেয়েছে। মন যদি না-চলে, মনের মালিক বা মালকিনকে তো থমকে দাঁড়াতেই হবে। এমন ঘটনা তো আমাদের দেশেও ঘটতে দেখি। দেবদেবীর অলংকার হাতে ধরে চোর মন্দিরে বসে আছে। এদিকে ভোর হয়ে এল চোর কিন্তু পালাতে পারছে না, তার পা চলছে না। আসলে তার মনের অন্দরে থাকা সংস্কার-লতা তার পায়ে বেড়ি হয়ে জড়িয়ে ধরেছে। হুইমিং আছড়ে পড়ে হুইনেং- এর পায়ে। বলে, প্রভু, আমি এসব নিতে আসিনি, এসবে আপনার অধিকার। আমাকে আপনি আত্মজ্ঞানের পথে এগিয়ে দিন। হুইনেং বলে, যদি তাই চাও তাহলে উঠে বসো, মনটাকে সমস্ত চিন্তা থেকে মুক্ত করো। বাধ্যছেলের মতো হুইমিং নিশ্চল হয়ে বসে পড়ে। কয়েক মুহূর্ত পরে হুইনেং এক অপার্থিব ধ্বনিমূর্ছনায় উচ্চারণ করে— ‘ ভালো বা মন্দ নিয়ে মাথা ঘামিও না। ভাবো তুমি আসলে কে ? কোথায় তোমার সেই আদি মুখ যা তোমার বাবা-মায়ের জন্মের আগেও ছিল ?
তথ্যসূত্র :
১. ZEN MASTERS OF CHINA : THE FIRST STEP EAST
BY RECHARD BRYAN MC DANIEL; TUTTLE PUBLICATION, TOKYO/ VERMONT/ SINGAPORE.
২. THE PLATFORM SUTRA OF THE SIXTH PATRIARCH BY JOHN R. MC RAE; NUMATA CENTER FOR BUDDHIST TRANSLATION AND REASEARCH, BARKELY, CALIFORNIA, AMERICA.
৩. THE PLATFORM SUTRA : THE ZEN TEACHING OF HUINENG BY RED PINE ; COUNTERPOINT, BARKELY, CALIFORNIA, AMERICA.
৪. TRANSMISSION AND ENLIGHTENMENT IN CHAN BUDDHISM SEEN THROUGH THE PLATFORM SUTRA BY MORTEN SCHLUTTER ; TAIPEI CHUNG – HWA INSTITUTE OF BUDDHIST STUDIES.
ছবি: বিধান দেব

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন