জন্মের আগের মুখ : জেন তত্ত্ব ও জেন গল্পের অমায়িক ভুবন
ধ্যান > ঝান > চ্যান > জেন এবং প্রথম আচার্য বোধিধর্ম
ভণই লুই আমহে ঝাণে দিঠা।
ধমণ চমণ বেণি পাণ্ডি বইঠা।।
বাংলাভাষার আদি নিদর্শন চর্যা-সংকলনের সূচনা-পদে সিদ্ধাচার্য লুইপাদ এমন কথা বলেছেন । এখানে ঝাণে শব্দটির অর্থ ধ্যানে। সংস্কৃত ধ্যান শব্দটি ধ্বনিতাত্ত্বিক বিবর্তনের পথ ধরে পালি ভাষায় পৌছে হয়েছে ঝাণ । প্রাচীনবাংলায়ও ঝাণ শব্দের প্রচলন লক্ষ করা যায়। উদ্ধৃত চর্যাংশটি তার সাক্ষবাহী। শব্দের এই ধ্বনিগত বিবর্তন বেশ মজাদার। অনেকসময় পরিচিত শব্দ এমনভাবে বিবর্তিত হয় যে, চেনার উপায় থাকে না। চ্যান (Chan) একটি চিনা শব্দ। শব্দটি শুনে আমাদের কখনওই মনে হয় না যে, এমন বিজাতীয় শব্দের সঙ্গে আমাদের নাড়ির যোগ আছে। কিন্তু আশ্চর্য হলেও সত্যি এই চিনা শব্দটির সঙ্গে আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতির সম্পর্ক নিবিড় । চ্যান শব্দটির শিকড় আমাদের দেশের মাটিতেই প্রোথিত। সংস্কৃত ধ্যান শব্দটির পালি-রূপ ঝান যখন প্রতিবেশী দেশ চিনে পোঁছায় তখন সে দেশের মানুষের উচ্চারণে তা হয়ে যায় —চ্যান (Chan)। আবার জাপানিরা তাদের উচ্চারণ প্রবণতা অনুযায়ী এই চ্যান শব্দটিকেই জেন (Zen) রূপে প্রতিধ্বনিত করে।
খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতকের কথা। বোধিধর্ম, নামের এক অদম্য সন্ন্যাসী ঝান শব্দটি কায়মনোবাক্যে বহন করে পৌঁছে গেলেন চিনদেশে। তাঁর সেই যাত্রাপথ মোটেও সুগম ছিল না। নদনদী, পাহাড়-পর্বত অতিক্রম করেই তাঁকে পৌঁছাতে হয়েছিল পীতদানবের দেশে। মহাযান পথের সাধককে এককসিদ্ধির মোহ উপেক্ষা করে এভাবেই জগদ্ধিতায় প্রব্রজ্যা বেছে নিতে হয়। হীনযানীদের মতো কেবল আত্মসিদ্ধি অর্জনের আয়োজন নয় ; মহাযানীদের জগতের সকল মানুষের সিদ্ধির কথা ভাবতে হয়। কিন্তু কে এই বোধিধর্ম, যিনি ভিক্ষাভাণ্ড, চীবর ও সিংহল থেকে সংগৃহীত " লঙ্কাবতার সূত্র " ঝোলায় ভরে পৌছে গেলেন এক অচিন ভূখণ্ডে ! চৈনিক নথি থেকে বোধিধর্মের পূর্বাশ্রম সম্পর্কে কিছু কথা জানা যায়। খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতকের শেষার্ধে তামিলনাড়ুর কাঞ্চিপুরমে এক রাজপরিবারে বোধিধর্মের জন্ম। ইতিহাস বলছে এইসময়ে কাঞ্চিপুরম ছিল পল্লবদের রাজধানী। বোধিধর্মের পারিবারিক নাম ছিল বোধিতারা। আচার্য প্রজ্ঞাতারার কাছে দীক্ষা নেওয়ার পর তাঁর নতুন নাম হয় বোধিধর্ম। দীক্ষা গ্রহণের পর দুই অগ্রজের উপর রাজ্যভার অর্পণ করে বোধিধর্ম বেছে নেন প্রব্রজ্যার পথ। ৫২০ খ্রিস্টাব্দে তিনি দক্ষিণ চিনের গুয়াং ঝউ-তে পৌঁছান। তখন সেখানে লিয়াং বংশের (৫০২ - ৫৫৭ খ্রিস্টাব্দ) রাজত্ব চলছে। বৌদ্ধধর্মাবলম্বী রাজা উ (Wu) বোধিধর্মকে আমন্ত্রণ জানালেন রাজধানী জিয়াং কাং (Jian-Kang)-এ। বোধিধর্ম আমন্ত্রণ রক্ষা করলেন। বুদ্ধের দেশের এক সন্ন্যাসীকে দেখে রাজা উ আপ্লুত হয়ে জানতে চাইলেন —
মান্যবর ! পশ্চিম দেশ (ভারত চিনের পশ্চিম দিকে অবস্থিত) থেকে আপনি আমাদের জন্য কোন সূত্র বহন করে এনেছেন ?
— শিক্ষণীয় একটি শব্দও আমি বহন করে আনিনি। বোধিধর্ম উত্তর দিলেন ।
সম্রাট উ বললেন —আমি অনেক মঠ নির্মাণ করেছি। অজস্র সূত্রের তর্জমা করিয়েছি, অনেক শ্রমণকে সহায়তা দিয়েছি। এসব কাজের জন্য আমার কতটা পুণ্য অর্জিত হয়েছে ?
বোধিধর্ম বললেন —এসব মনগড়া জাগতিক ধারণা । বস্তুর ছায়া যেমন সত্য নয়, এই পুণ্য-সংক্রান্ত ধারণাও সত্য নয়।
উ এবার প্রসঙ্গ ঘোরালেন —মহান-সত্য প্রকাশক প্রথম সূত্রটি কী ?
বোধিধর্ম —মহান-সত্য বলে কিছু নেই।
উ —কে আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন ?
বোধিধর্ম —আমি জানি না ।
রাজা উ আগন্তুকের মুখে এমন অদ্ভুত কথাবার্তা শুনে ভাবলেন, লোকটির মাথা একেবারেই গেছে ! আসলে এমনই হয়। এমনই হওয়ার কথা। আমাদের সংস্কার, আমাদের চেনা-চৌহদ্দির মধ্যে পাওয়া অভিজ্ঞতা, আমাদের জন্মসূত্রে পাওয়া ধর্ম, শেখা-শাস্ত্র ইত্যাদির বাইরেও যে সত্য থাকতে পারে এমনটা আমরা ভাবতেই পারি না। ভাবতে গেলে আমরা বিপন্ন বোধ করি ; খেই হারিয়ে ফেলি । রাজা উ-র ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। হলেও তিনি রাজা। তাঁর রক্তের ভিতরেও তো আমাদের মতো বিপন্নতার বোধ খেলা করে।
শাওলিন কুং ফু ও ওস্তাদ সন্ন্যাসী
বোধিধর্ম, রাজা উ-র সভা ছেড়ে, দক্ষিণ চিন ছেড়ে চললেন উত্তর চিনের দিকে। দুরন্ত ইয়াং সি (Yang-tse) নদী পার হয়ে পৌঁছে গেলেন উত্তর চিনে। হেনান প্রদেশের ইয়ং নিং মঠ তখন খ্যাতির তুঙ্গে অবস্থান করছে। তার স্বর্ণশীর্ষ প্যাগোডা সূর্যালোক মেখে চোখধাঁধানো মায়া তৈরি করে। বোধিধর্ম বেশ কয়েকদিন কাটিয়ে দিলেন সেই মঠে। অতঃপর এগিয়ে চললেন শাওলিন মঠ অভিমুখে। শাওশি (Shaoshi) পর্বতের জঙ্গলাকীর্ণ এই মঠটির একটি ইতিহাস আছে। এই মঠের প্রথম অধ্যক্ষ ছিলেন বুদ্ধভদ্র নামের এক ভারতীয় শ্রমণ। বলা ভালো বুদ্ধভদ্রকে শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য উত্তরের ওয়েই বংশের রাজা জিয়াওয়েন (Xiaowen) নির্জন পার্বত্য অরণ্যে ৪৭৭ খ্রিস্টাব্দে এই আশ্চর্য সুন্দর মঠটি নির্মাণ করান। বোধিধর্ম ৫২৫ খ্রিস্টাব্দে শাওলিন মঠে পৌছান। কিন্তু পৌছালে কী হবে চেহারার যা বাহার! মস্তকের অগ্রভাগ কেশশূন্য, লাটিমের মতো বিশালাকার দুই চোখ, মুখে অগোছালো দাড়ির জঙ্গল,পালোয়ানের মতো যুতসই চেহারা —এমন বিদঘুটে দর্শন বিদেশি সন্ন্যাসীকে কী মঠে স্বাগত জানানো সম্ভব ! এতদিনের সঞ্চিত পুণ্য উবে যাবে না ; আরোপিত পবিত্রতার নিদাগ প্রলেপে চিড় ধরবে না ! বোধিধর্ম মঠের আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ করে সব বুঝলেন। আর সবাইকে আশ্চর্য করে অদূরের একটি গুহায় দেয়ালের দিকে মুখ করে ধ্যানে বসলেন। আহাম্মক সন্ন্যাসীর কাণ্ডকারখানা দেখে মঠের লোকজন তো অবাক । এমন হতচ্ছাড়া ধ্যান তাঁরা চোখে দেখা তো দূরের কথা, কস্মিনকালে কানেও শোনেননি। আহাম্মক আসলে বোধিধর্ম নন, মঠের লোকজন। কারণ চক্ষু মুদে যখন কেউ ধ্যানে বসে তখন সামনে ফাঁকা মাঠ থাক বা দেয়াল থাক তাতে কীই বা আসে যায় ! তবে ধ্যানের অভিনয় হলে অন্য কথা। বোধিধর্মের এই দেয়ালমুখো ধ্যানের একটি সুবিধাও আছে , হঠাৎ করে অবাঞ্ছিত কেউ সামনে এসে বিরক্ত করতে পারবে না। বোধিধর্মের এই অদ্ভূত ধ্যান নিয়ে একটি জনশ্রুতি প্রচলিত। প্রথম প্রথম তিনি নাকি ধ্যানে বসেই ঘুমিয়ে পড়তেন! অনেক চেষ্টা করেও তিনি চোখের পাতা খুলে রাখতে পারতেন না। শেষমেশ তিনি নিতান্ত ক্রুদ্ধ হয়ে ছুরি দিয়ে দুচোখের পাতা কেটে ফেলেন। আর আশ্চর্যের বিষয় এই যে, তাঁর চোখের পাতা মাটিতে পড়তেই মুহূর্তে তা থেকে জন্ম নেয় চা-গাছ। এই মিথ থেকে আমরা অনুমান করতে পারি বোধিধর্মের হাত ধরেই চিন দেশে চা-এর প্রচলন শুরু হয়। তবে এই অনুমান হবে কালানৌচিত্য দোষে দুষ্ট। কারণ চা-এর ইতিহাস বলছে, বোধিধর্মের চিন দেশে পৌঁছানোর বহু আগে থেকেই সে দেশে চা-পান প্রচলিত ছিল। হান যুগের প্রখ্যাত ধ্রুপদী কবি ওয়াং বাও ( খ্রিস্টপূর্ব ৮৪ - ৫৩ অব্দ) রচিত একটি পুথিতে চা-পানের প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে একথা বলা যায়, বোধিধর্ম হয়তো ভারত বা সিংহল থেকে চা-গাছ নিয়ে গেছিলেন। আর তিনি যেহেতু একজন ভেষজবিদ ছিলেন সেহেতু শিষ্যদের এই ঘুমতাড়ানিয়া পানীয় গ্রহণে উৎসাহিত করেও থাকবেন। বোধিধর্মের সঙ্গে চা-এর একটা ওতোপ্রোত সম্পর্ক থাকাটা অসম্ভব কিছু নয়। কারণ চ্যান তথা জেন-সংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ চা-পান। সম্ভবত বোধিধর্মের প্রত্যক্ষ প্রভাবে চ্যান মঠে চা-পান প্রথা প্রচলিত হয়ে থাকবে। আর চোখের পাতা কেটে ফেলার মিথের পিছনে হয়তো বোধিধর্মের বিশালাকার অক্ষিগোলকই দায়ী l হঠাৎ করে দেখলে মনে হতেই পারে, চোখে বোধহয় পাতাই নেই । আবার চিনা তথা মঙ্গোলিয়ান আধবোজা চোখের সঙ্গে তুলনা করে এমনটা মনে হওয়াই স্বাভাবিক। যাইহোক, বোধিধর্ম সেই গুহায় দীর্ঘদিন ধ্যানে কাটান, নথি বলছে নয় বছর। এই অদ্ভূত দর্শন উদ্ভট সন্ন্যাসীর কাছেও একদা এসে পৌছায় এক নাছোড়বান্দা ভক্ত, হুইকে (Huike)। দিনরাত সে বোধিধর্মকে ছায়ার মতো ছুঁয়ে থাকে। ডিসেম্বারে ভয়ংকর শৈত্যপ্রবাহ শুরু হয়। প্রাণান্তকর তুষারপাত অবজ্ঞা করে তবুও দাঁড়িয়ে থাকে সে। কোমর সমান বরফ জমে যায়। তবুও নির্বিকার থাকে হুইকে ।
বোধিধর্ম জিজ্ঞেস করেন —কী চান ?
—আমাকে আপনি সার্বজনীন সত্য ও করুণার জগতে প্রবেশের দুয়ারটি খুলে দিন প্রভু !
—আপনি সামান্য জ্ঞান, অগভীর ও অহংকারী মন নিয়ে যে চেষ্টা করে যাচ্ছেন , তা ব্যর্থ হতে বাধ্য । আপনি ফিরে যান ।
হুইকে ফেরার জন্য আসেনি। দিনের পর দিন কেন পড়ে থেকেছে, ফিরে যাওয়ার জন্য ! বামহাতটি কেটে গুরুকে দক্ষিণা দেয়। বোধিধর্ম এই সমর্পণ এড়াতে পারেন না। এইভাবে ঝাণ বা চ্যান-এর জগতে প্রবেশাধিকার লাভ করল হুইকে। অন্য এক নথি বলছে হুইকে হাত কাটেনি; ডাকাতদের সঙ্গে লড়াইয়ে আগেই সে বামহাতখানা খুইয়েছিল।
শেষমেশ বোধিধর্ম শাওলিন মঠে সাদরে গৃহীত হলেন। মঠের সন্ন্যাসীদের চেহারা দেখে বোধিধর্ম আঁতকে উঠলেন। নিছক ধ্যান করে করে তাঁরা সব এক-একটা জড়ভরত হয়ে উঠেছেন। হাতপা তাঁদের অসাড় হয়ে গেছে, ভালো করে হাঁটাচলা করতে পারেন না l এমন রুগ্ন বেঢপ চেহারা নিয়ে সাধনভজন কী, সাধারণ কোনো কাজ করাই সম্ভব নয়। তিনি সন্ন্যাসীদের জন্য বাধ্যতামূলক শারীরিক কসরত চালু করলেন । চৈনিক কুস্তির সঙ্গে মিশিয়ে দিলেন দক্ষিণ ভারতীয় যুদ্ধকৌশল এবং নিজস্ব পর্যবেক্ষণলব্ধ বিভিন্ন পশুপাখির আক্রমণ-প্রণালী।তৈরি হল আত্মরক্ষামূলক এক অসাধারণ সামরিক-শিল্প —কুং ফু। সঙ্গে দিলেন শ্বাসপ্রশ্বাস-সংক্রান্ত নিয়ম ও পরিমিত ধ্যান। সমকালীন চিনে প্রচলিত লাও ৎ সে (Lao Tse)-এর তাও (Tao) দর্শন দ্বারাও বোধিধর্ম প্রভাবিত হয়েছিলেন। তাওবাদীদের মতো তিনিও সাধনপথে প্রকৃতির সঙ্গে মিশে থাকা ও জীবনের ওঠাপড়াকে সহজভাবে গ্রহণ করার উপর জোর দিয়েছিলেন ।
বাকপথাতীত কাহিব কীস
বোধিধর্ম চিনদেশ ত্যাগ করে ভারতে প্রত্যাবর্তনের আগে (কোনো কোনো নথি অনুযায়ী মৃত্যুর অব্যবহিত আগে) প্রিয় শিষ্যদের একত্রিত করে বললেন তোমরা প্রত্যেকে অর্জিত প্রজ্ঞা বিষয়ে দু-একটা কথা বলো।
প্রথমে মুখ খুললেন দাও ফু (Dao Fu) —এই বিষয়টা শব্দ বা বাক্যাংশ দিয়ে বোঝানো যাবে না। আবার শব্দ বা বাক্যাংশ বহির্ভূত বিষয়ও নয় এটা ।
বোধিধর্ম বললেন —তুমি আমার চর্মের অধিকারী হলে।
এবার এগিয়ে এলেন নান জং চি ( Nun Zong Chi ) —এটা অক্ষোভ বুদ্ধের জ্যোতির্ময় আভাসের মতো, একবার দেখা যায় , দ্বিতীয়বার দেখা যায় না ।
বোধিধর্ম বললেন — তুমি আমার মাংসের অধিকারী হলে।
শিষ্য দাও য়ু বললেন ( Dao Yu ) —জগত সৃষ্টির চারটি উপাদানই (মাটি, জল, আলো ও বায়ু) ফাঁপা। পঞ্চস্কন্দ (রূপ, বেদনা, সংজ্ঞা, সংস্কার ও বিজ্ঞান বা চৈতন্য) অস্তিত্বহীন।
বোধিধর্ম বললেন —তুমি আমার অস্থির অধিকারী হলে।
হুইকে ( Huike ) এগিয়ে এসে গুরুর সামনে মাথা নত করে দাঁড়ালেন। কোনও শব্দই উচ্চারণ করলেন না ।
বোধিধর্ম বললেন —তুমি আমার মজ্জার অধিকারী হলে।
এই যে বোধিধর্ম তাঁর চর্ম-অস্থি-মাংসও মজ্জার অধিকারী করলেন এর তাৎপর্য কী ?
আমরা দীক্ষিত নই ফলে আমরা জানি না । আবার এ এক এমন হেঁয়ালি যে, দীক্ষিতরাও এর অর্থ ভাষায় ব্যাখ্যা করতে অপারগ। সেই যে চর্যার ৪০ সংখ্যক পদে কাহ্নপাদ বলেছেন —
ভণ কইসে সহজ বোল বা জাঅ ।
কাঅ বাক্ চিঅ জসু ন সমায় ।।
আলে গুরু উএসই সীস ।
বাকপথাতীত কাহিব কীস ।।
জে তই বোলী তে ত বিটাল ।
গুরু বোব সে সীসা কাল ।।
সত্যিই তো সহজ-কে ব্যক্ত করা অত সহজ ব্যাপার নয় । কায়াবাকচিত্ত সেখানে প্রবেশ করে না। অকারণেই গুরু শিষ্যকে উপদেশ দেন । বাকপথাতীতকে কী ভাষায় বাঁধা যায় ! সুতরাং যতই বলা যায় ততই জটিলতায় জড়িয়ে পড়তে হয় । তাই গুরু এখানে বোবা এবং শিষ্য বধির। মনে রাখতে হবে চর্যাকাররা ছিলেন মহাযানশাখার বজ্রযান উপশাখার সহজিয়া সাধক এবং জেনবাদীরাও মহাযানী । তত্ত্বগত সাদৃশ্য তো কিছুটা থাকবেই । হুইকে জানতেন বাকপথাতীতকে ভাষায় বাঁধার চেষ্টা বৃথা । তাই তিনি বোধিধর্মের সামনে নিরুত্তর ছিলেন। গুরুও মেপে নিয়েছিলেন শিষ্যের গভীরতা । তাই প্রিয়তম শিষ্যের হাতে ভিক্ষাপাত্র, চীবর ও লঙ্কাবতার সূত্রের পুথি তুলে দিয়ে তাঁকে উত্তরাধিকারী নির্বাচন করলেন । হুইকে হলেন বোধিধর্ম-উত্তর সময়ের চ্যান-আচার্য ।
তথ্যসূত্র :
১. ZEN MASTERS OF CHINA : THE FIRST STEP EAST
BY RECHARD BRYAN MC DANIEL; TUTTLE PUBLICATION, TOKYO/ VERMONT/ SINGAPORE.
২. THE PLATFORM SUTRA OF THE SIXTH PATRIARCH BY JOHN R. MC RAE; NUMATA CENTER FOR BUDDHIST TRANSLATION AND REASEARCH, BARKELY, CALIFORNIA, AMERICA.
৩. THE PLATFORM SUTRA : THE ZEN TEACHING OF HUINENG BY RED PINE ; COUNTERPOINT, BARKELY, CALIFORNIA, AMERICA.
৪. TRANSMISSION AND ENLIGHTENMENT IN CHAN BUDDHISM SEEN THROUGH THE PLATFORM SUTRA BY MORTEN SCHLUTTER ; TAIPEI CHUNG – HWA INSTITUTE OF BUDDHIST STUDIES.
৫. ZENS CHINESE HERITAGE BY ANDY FERGUSON ; WISDOM PUBLICATION, BOSTON.
৬. THE ILLUSTRATED ENCYCLOPEDIA OF ZEN BUDDHISM BY HELEN J. BARONI ; THE ROSEN PUBLICATION GROUP , NEW YORK.

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন