শনিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২১

ফেব্রুয়ারির গদ্য : শিমুল আজাদ

 

বাংলা ভাষার বর্তমান প্রেক্ষাপট ও তার                              ভবিষ্যৎ




ফেব্রæয়ারি এলেই আমরা জাতিগত জেগে ওঠার যৌক্তিক কারণ খুঁজে পাই। মাতৃভাষার ভাবনাকে কেন্দ্র করে এর পূর্বে আমাদের সত্তার কোনো নড়ন-চড়ন নেই। অথচ যে চেতনার পথে ভাষার অধিকার স্বীকৃতি পেয়েছিল, সে চেতনা থেকে ফিরে আসার কোনো সুযোগ মাতৃভ‚মির সন্তানদের নেই; থাকার অবকাশও নেই। সভ্যতার এই প্রবল বিকাশলগ্নে ভাষার অধিকার, পরিচর্যা নিয়ে যে পরিমাণ সময়, কর্ম সঞ্চালনের প্রয়োজন ছিল, আজ তা অনুপস্থিত।স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে রক্ষা করা কঠিন’Ñ প্রবাদ বাক্যটি এমন চিরন্তন সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করেছে যে, তার না উল্লেখ অবিবেচকের পরিচয় প্রমাণ করে। প্রথমত ভাষার অধিকার রক্ষার সংগ্রামে যাঁদের অবদান শিখরস্পর্শী, তাদেরকে মনে রাখার আত্মিক অবস্থান আজ ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে। ক্ষতি হয়েছে তাঁদের মহানতর চেতনার পথ। সেই চেতনার উজ্জীবনের পথ ধরে যে স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র সংগ্রাম তারও ভুলণ্ঠিতরূপ আজ আমাদের রাষ্ট্রযজ্ঞের প্রতি ক্ষেত্রে বিদ্যমান। 

জাতির চেতনাধারণকারী অনেক সন্তান আজ এসব ভয়ংকর পরিণতি মর্মে মর্মে বুঝতে পারছে, কিন্ত পরিত্রাণের পথ তারা কেউ খুঁজে পাচ্ছে না। বুদ্ধি-বিবেক, চৈতন্য দিয়ে তারা এই বীভৎস পরিণতি থেকে উত্তরণের পথ খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করছেন। অন্যদিকে জাতির অধিকাংশ সন্তান হেলায়-ফেলায় প্রহরকে পার করছে। এক শ্রেণির সমাজ-দেশমাতৃকাকে শকুন ও হায়েনার মতো ছিবড়ে-খুঁবড়ে খাচ্ছে। যারা দেখার তারা দেখছে, যারা বোঝার তারা বুঝছে। কোথাও কেউ নেই যে, এই ধবংসযজ্ঞতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে দেশমাতৃকাকে রক্ষার উপায় বের করবে। দেশের যেকোনো স্থান, পর্যায় ও অবস্থান থেকে উদ্যোগ গ্রহণ করলে হয়তো বা দেশমাতৃকার পরিত্রাণের পথ বা উপায় সম্ভব। আর সেই উপায়ের উৎকৃষ্ট সময় এখন যে যাচ্ছে বয়ে তাতে কোনো সংশয় নেই। অতীতে না হয় ঔপনেবেশিকতার জোয়াল ছিল জাতির ঘাড়ে। তখন না হয় অত্যচার আর শোষণের চাকা ছিল নিত্যপ্রবাহিত, কিন্তু আজ তো স্বরাজত্বের সময়, নিজেদের হাতেই ঘুরছে রাষ্ট্রযজ্ঞ। তারপরও কেন উত্তরণের পথ, সমৃদ্ধির ছোঁয়া ঘটছে না দেশমাতৃকার শরীরে! কেন দুর্নীতির কালো থাবা, অন্যায় আর অত্যচারের খড়গ নিত্য প্রবাহিত হচ্ছে জাতির সমগ্র অবয়বে? জানা নেই এই সব প্রশ্নের সদুত্তর। বোঝা যাচ্ছে না কে জাতির মিত্র! আর কে বা তার শত্রæ! এ এক বীভৎসকাল! বীভৎস সময়।

ভাষা সভ্যতার অমূল্য সম্পদ। সেই সম্পদের পরিচর্যার অর্থ হচ্ছে সভ্যতার পরিচর্যা, প্রয়োজনের তৃষ্ণার নিবারণ। ভাষার ভ‚মিকাকে ছোট করে দেখার কোনো অবকাশ নেই। জাতির দীর্ঘদিনের পথ চলায় সে যেমন সঙ্গী, তেমনি সে অবলম্বনও বটে। ভাষার সমগ্র অবয়বে রয়েছে তার প্রকৌশলী, বিজ্ঞানীদের প্রচেষ্টার, গবেষণার নানা চিহ্ন। অতীত থেকে বর্তমান আর বর্তমানকে নিংড়ে গড়ে তোলা ভবিষ্যতের জগৎ। ভাষাকে পৌঁছাতে হয় জাতির অন্তিম মুহূর্ত পর্যন্ত। যা তার জন্য একটা চ্যালেঞ্জও বটে। 


অস্তিত্ব রক্ষায় মাতৃভাষার নানা সংগ্রাম


ভাষার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আমরা দেখব যে তা একদিনের, একজন মানুষের গড়ে তোলা কোনো বিষয় ও ঘটনা নয়। তা জাতির হাজার হাজার বছরের, কোটি কোটি সন্তানের নানা অবস্থানের, নানা প্রচেষ্টার দ্বারা বৃত্তাবদ্ধ একটি প্রধান ঘটনা। সেই ঘটনার রয়েছে নানা নাটকীয়তা, উষ্ণতা, আবেগ, প্রেম ও ক্রোধের নানা উচ্ছ¡াস। কাজেই স্বল্প সময়ের হীনবুদ্ধিতা, কোনো ব্যক্তি বা গোত্রের নঞর্থক ভ‚মিকা তাকে পারে না নিশ্চিহ্ন করতে। যদি বা ভাষার শত্রæরা নানা সময়ে, নানারূপে তার শরীরের উপর বসবাস করে তাকেই ক্ষতিগ্রস্ত করার পরিকল্পনা শানিয়ে যায়, কার্যক্রম গ্রহণ করে। কিন্তু আমাদের মাতৃভাষা বাংলা এমন এক সংগ্রামশীল ভাষা কাঠামো যে তাতে তারা কোনো ক্রমেই সফল হতে পারেনি। দমন, নিপীড়ন দ্বারা তাকে তার সচ্ছল সমৃদ্ধ প্রবাহন থেকে কোনক্রমেই যায়নি ফেরানো। ভাষার ইতিহাস ঘেটে আমরা দেখতে পাই যে, জাতির সেই প্রাচীন ইতিহাসে ভাষা সৃষ্টির কাল থেকেই তার শত্রæর অভাব ছিল না। ব্রাহ্মণ, ফতোয়া বাজরা ঘোষণা করেছিল, ‘বাংলা ভাষায় যারা চর্চা করবে, –কথা ও সাহিত্য রচনা করবে তারা রৌরব নরকে পতিত হবে।’Ñ আমাদের সহজেই অনুমিত হয় যে, মাতৃভাষা বাংলার বিরুদ্ধে শত্রæদের দৃঢ় অবস্থান কোন পর্যায়ে উচ্চকিত ছিল! মধ্যযুগেও নানা বাধা, ষড়যন্ত্র ছিল বাংলা ভাষাকে কেন্দ্র করে। যা প্রাচীন যুগের ধারাবাহিক ষড়যন্ত্রের রূপ ও রীতি দ্বারা বৃত্তাবদ্ধ হয়ে আধুনিক যুগেও ত্বরান্বিত হয়েছে! সেকালে বাংলা ভাষাকে একদল বঙ্গবাসী, স্তন্যপায়ী জীব বাংলা ভাষাকে হিন্দুর অক্ষর বা হিন্দুর ভাষা বলে নিধন করতে চেয়েছিল। তাদের অন্তঃকরণজুড়ে ছিল বাংলা ভাষার প্রতি প্রচÐ ঘৃণা আর তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য। অন্যদিকে মোগলদের শাসনামলে ভারতে ফারসি ভাষা রাজভাষা হিসেবে প্রচলন পায়। ফলে মাতৃভাষা বাংলা অনেকটা আক্রান্ত হয়। ভাষার বিকাশের পথ হয় রুদ্ধ। অঞ্চলভিত্তিক জাতিসত্তার সাধারণ মানুষ তাকে বহন করে নিয়ে চলে নিজেদের স্কন্ধে, বুকে। ফলে ভাষা তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়। আর আশ্চর্য এই যে, এত সব ষড়যন্ত্র, উৎপীড়নকে ছাড়িয়ে, মাড়িয়ে মাতৃভাষা বাংলা স্বরূপে, স্বমহিমায় বেঁচে থাকার অমর গান শোনাতে পেরেছে জাতির সন্তানদের। 





ঔপনেবেশিক যুগে ইংরেজদের শাসনামলেও বাংলা ভাষার প্রতি দমন-পীড়ন সামান্য ছিল কিন্তু তা অনায়াসে খণ্ডিত  হয়। ইংরেজরা বুঝতে পারে যে, নেটিভদের ভাষার মধ্যেই তাদেরকে নিবিষ্ট রাখতে হবে। নতুন একটি ভাষা শিক্ষার কাজটি প্রকৃতই কঠিন। শিক্ষা- দীক্ষায় উন্নতি না ঘটলে ইংরেজি ভাষার প্রসার, প্রচার ঘটবে না। কাজেই নেটিভদের ভাষার মাধ্যমে নিজেদের ধর্ম খ্রিষ্টানত্বকে ছড়িয়ে দিতে হবে। 

রাজধর্ম রক্ষার জন্য এ পথ অবলম্বনই ছিল তাদের জন্য উৎকৃষ্ট পন্থা। ফলে প্রথমেই শ্রীরামপুর মিশন পরবর্র্তীকালে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে বাংলা ভাষার বিকাশের সুযোগ ঘটে। ইতিহাসের এই সময়টাতেই বাংলা গদ্যের বিকাশের পথ সৃষ্টি হয়। 

এই ক্ষেত্রে ইংরেজদের অবদান অনস্বীকার্য। যদিও তাদের মূল লক্ষ্য ছিল রাজত্ব ও ধর্মের প্রসার, প্রচার এবং তার স্থায়িত্ব। 

অষ্টাদশ শতাব্দীর শুরুতেই বাংলা ভাষা, গদ্য ভাষার পথ খুঁজে পেল। মনীষী রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, উইলিয়াম কেরী, রামরাম বসু, মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার প্রমুখের শ্রম, মেধা ও আন্তরিকতারগুণে বাংলা ভাষা অনন্যতর পথ খুঁজে পেল। দীর্ঘদিনের চর্চিত কাব্যভাষা তার মসৃণ, পেলব পথ থেকে ঘুরে দাঁড়াল কর্কশ, বন্ধুর পথে। সেখান থেকে যাত্রা পেল  বিস্তৃত এক ভ‚মিস্তরে। আমরা জানি যে, বাহ্যত ইংরেজ ঔপনেবেশিক কাল নানা রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কারণে শেষ হয়। ভারতবর্ষকে ভেঙে ধর্মকে প্রাধান্য দিয়ে সে সময় দুটি রাষ্ট্রের সৃষ্টি একটি অনাকাক্সিক্ষত চিরন্তন দ্ব›দ্বকে প্রতিষ্ঠিত করে। সেই দ্ব›েদ্বর ধারা এখনও প্রবল প্রবাহিত। এতে বাংলাদেশও খÐিত হয়। বাংলাদেশের পূর্বাংশ পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিমাংশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গ নামে পরিচিতি লাভ করে। এক জাতি ও তার ভাষা, কৃষ্টি-সংস্কৃতি দ্বিখণ্ডিত হওয়ায় নানা সংকট সৃষ্টি হয়। পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই চলতে থাকে নানা নিষ্পেষণ, নির্যাতন এবং অন্যায়। বাংলাদেশের মানুষ সেদিন সচেতনতার সাথে রুখে দাঁড়িয়েছিল। মাতৃভাষাকে রক্ষার্থে গড়ে উঠল রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ। সমগ্র পাকিস্তানের ৫৬ শতাংশ মানুষের মুখের ভাষা বাংলাকে অযৌক্তিক ভাবে হঠাতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়েছিল হীন পাকিস্তানিরা কিন্তু বাংলার দুর্বার গণ-আন্দোলন রক্ত ও মৃত্যুর রাজপথ পেরিয়ে এল ভাষার অধিকার। বাংলা ভাষা স্বীকৃতি পেল মহান ৮ ফাল্গুনের ত্যাগ ও তিতিক্ষার মধ্য দিয়ে। মাতৃভাষা বাংলা প্রোজ্জ্বল হয়ে জ্বলল জাতির ভাগ্যকাশে। ইতিহাসে গৌরবময় স্থান দখল করল মাতৃভাষার বীর সৈনিকেরা। 


বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা


ফেব্রæয়ারি মাস, অমর শহীদের আত্মাহুতি ও চেতনার মাস। একদিকে যা বেদনার চিহ্ন বহনে সক্ষম, অন্যদিকে তা তেমন জাতির গৌরবদীপ্ত সাহসের পরিচয় প্রমাণ করে চৈতন্যের চূঁড়ায় পৌঁছায়। সেই বেদনার চিহ্নকে খোঁড়ার মধ্যে দিয়ে চৈতন্যের স্পর্শ লাভ এবং ভাষাসংগ্রামীদের মহৎ প্রবণতার খোঁজ পাওয়ার মধ্য দিয়ে জাতির গৌরবের পথ ভাস্বর হয়ে ওঠে। আর একথা তো আমরা জানি যে, ভাষার চর্চার মধ্য দিয়েই তার বেঁচে থাকার গান, জেগে থাকার মূল সূত্রj করে চলি! না গ্রহণে, চর্চায় তাকে প্রধানতর ভ‚মিকায় রাখি! 

ভাষার প্রধান সম্পদ তার শব্দভাণ্ডারের। বর্তমান কালে সেই শব্দ ভাÐারের দ্বারস্থ আমরা ঠিক-ঠাক হচ্ছি না! শব্দসমূহের ব্যবহারে যতœবান না হওয়াতে বাংলা ভাষার অনেক শব্দই আজ অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে। তাদেরকে আলো-বাতাসে নিয়ে আসা জরুরি। মূলত সেই শব্দসমূহ আজ মুমূর্ষুর পথে। আকাশসং¯ৃ‹তির প্রভাব, আন্তর্জাতিক ও দেশীয় ষড়যন্ত্রের নিত্য-নতুন ফাঁদে জাতির সন্তানেরা। তারা অবুঝ ও আহাম্মক। কিসে তাঁদের মঙ্গল আর কিসে বা তাদের অমঙ্গল বা দায়-দায়িত্ব তা আজ কারও মধ্যে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তাই কবি শামসুর রাহমানের কবিতায় মাতৃভাষা বাংলার বর্ণমালাসমূহ ‘দুঃখিনী বর্ণমালা’ হিসেবে ক্রন্দনরত। 


ভাষা নদীর  মত চলতে ভালোবাসে। তা মানুষের মুখে মুখে, অন্তরে অন্তরে লেখায়-লেখাতে বেঁচে থাকে। তাকে ভুলে গেলে, বিস্মিত হলে ধীরে ধীরে সে বিলুপ্তির পথ খুঁজে নেয়। ভাষার প্রধান সম্পদ যে শব্দভাÐার তার সঠিক ব্যবহার প্রয়োজন। তাকে ঘষে-মেজে রাখাটা জরুরি। এতে ভাষার স্বরূপটি ফুটে ওঠার পাশাপাশি তার সমৃদ্ধি, শিহরণ, ঔজ্জ্বল্য প্রকাশ পায়। প্রকাশ পায় তার সম্ভাবনার উজ্জ্বলতর নানা দিক। শব্দে, শব্দে ধ্বনিতে ধ্বনিতে নতুন শব্দের সৃষ্টির পথও কোনো কোনো সময় ওঠে জেগে। কাজেই ভাষার পরিচর্যার প্রয়োজন তার বর্তমান ও ভবিষ্যতের কথা ভেবে। 

জাতির  সন্তানদেরও উচিত সচেতনভাবে ভাষার গৌবর ও অর্জিত সম্পদের সার্বিকভাবে সদ্ব্যবহার করা। কারণ আগামী দিনের সন্তানগণ এই যুগের পানে চেয়ে রয়েছেন। আমাদের নিত্য-নতুন উদ্ভাবন ক্রিয়ার উপর, পরিচর্যার উপর ভর করছে ভবিষ্যতের জাতির সুখ-শান্তি। আমরা যদি পূর্বসূরিদের মতো নিজেদের জাতি ভাবনার নানা দিক নিয়ে সোচ্চার না হই, তাহলে জাতির ভবিষ্যতের সন্তানেরা নানা দুঃখ-কষ্টে পতিত হবে। 


আমরা যদি নিজেদের মঙ্গল চাই তাহলে তাদের কথা ভেবে, ভবিষ্যতের কথা ভেবে বর্তমানকে সেইভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। নিজেদেরকে ত্যাগে, শ্রমে, মহত্বে উন্নত করতে হবে। এসব চেতনার মধ্যেই লুকিয়ে আছে মহান ভাষা শহিদ ও সংগ্রামীদের চেতনা, মুক্তিযুদ্ধের বীরসেনানীদের আত্মত্যাগের উজ্জ্বল গৌবর। 

আজ স্বাধীন বাংলাদেশের বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের যেমন সৃজনশীল চর্চা অব্যাহত রয়েছে, তেমনি অব্যাহত রয়েছে ভাষাকে আক্রান্ত করার নানা অভিসন্ধি। জ্ঞাতে-অজ্ঞাতে ভাষার দুশমনেরা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। বাংলা ভাষা ও তার কৃষ্টি-সংস্কৃতির বুকে কুঠারাঘাত হানছে অজ্ঞদের হাত। বাংলা ভাষার মর্যাদা অন্তর থেকে অনেক পূর্বেই নির্বাসিত। এ ব্যাপারে সুশীল সমাজের উদ্বিগ্নতা সামান্য হলেও কার্যকরী পদক্ষেপের অভাব সর্বস্থানে পরিলক্ষিত। ভিন্ন ভাষার প্রতি আগ্রহ দোষের নয় কিন্ত আমাদের বর্তমান কালের আগ্রহ দোষের অবস্থানকে ছাড়িয়ে মাত্রাতিরিক্ত ক্ষতির ভ‚মিকায় পৌঁছেছে। যাকে প্রতিহত করা আজকের জাতির সন্তানদের অনিবার্য কর্তব্য। 


বাংলিশ চর্চা ও ভাষার বিবমিষা


আমাদের দেশে বেসরকারি রেডিও সেন্টারগুলোয় কিছুকাল পূর্বে শুরু হয়েছে বাংলিশ নামে এক অদ্ভুত ভাষা ধ্বংসের খেলা। কিছু অন্তঃসারশূন্য মনন-মেধাবীরা অসচেতনভাবে এই কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে প্রবল প্রতিপত্তিতে। এতে না হয় বাংলা, না হয় ইংরেজি। অন্যদিকে জনজীবনে এর প্রভাব পড়ছে নানান মাত্রায়। ভাষার এই বেহাল দশা থেকে মুক্ত প্রচেষ্টা যদিও কম নেই, তবু আশ্চর্য যে তারা কোন ভাবনা-চিন্তা থেকে এই হীন কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়েছে! আধুনিকতার নামে যুগ বৈচিত্র্যে জেগে যারা এই রকমভাবে গা ভাসিয়ে দিয়ে ভাষার মতো এক মহান সত্য ও শক্তিকে কলুষিত করতে চেয়েছে, চেয়েছে অত্যাচার করতে; তাদেরকে শিক্ষা দেবার প্রয়োজন। প্রয়োজন হাজার বছর ধরে চলে আসা ভাষার ধারাবাহিক দিকগুলো সর্ম্পকে জ্ঞানদান। প্রয়োজনে ভাষার ইতিহাসকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখানো। 

এছাড়া বর্তমানে কবিতায়, গল্পে, প্রবন্ধে, উপন্যাসে এবং নাটকে তথা সাহিত্যের সমগ্র শরীরে বিদেশি ভাষার সুকৌশলী পদচারণা আমাদের অবাক করে তুলছে! হ্যাঁ, এটা ঠিক যে, বাংলা ভাষার ধারণক্ষমতা বিদেশি অন্যান্য ভাষার চেয়ে তুলনামূলকভাবে বেশি। বাঙালি জাতির মতোই তার ভাষা বাংলাও শংকর। এতে সন্নিবেশিত হয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন প্রকার ভাষার শব্দ ও গঠনরীতি। হয়তো আজও বাংলা ভাষায় বিদেশি ভাষার সংমিশ্রণের প্রয়োজন কিন্ত ইতোমধ্যে তার শরীরে যা অধিকার পেয়েছে, হাজার হাজার বছরের ক্রিয়া-বিক্রিয়ায় সেসবের প্রয়োগে বৈজ্ঞানিক ভাবনা-চিন্তার অবকাশের মধ্যে দিয়েই আমাদের এগোতে হবে। তাতে আমাদের প্রয়োজন মিটলে তবেই না আমরা নতুন বিষয় ও শব্দের কাছে পৌঁছাব এবং সেটিই হবে যুক্তিসংগত ও মঙ্গলময়। আমরা চাই না ঠুনকো বোধোদয়ের জয় এবং উল্লাস! আমরা চাই, ভাষার সংগঠিত রূপ ও সমৃদ্ধি। অতীতের নানা অর্জনকে সম্পূর্ণভাবে ব্যবহারে নৈপুণ্যেই যখন আমরা বর্তমানে ব্যর্থ, সেখানে নতুন নতুন বিদেশি শব্দের প্রয়োগ আমাদের জন্য কী মঙ্গল বয়ে আনতে পারে? কীভাবে পারে মাতৃভাষা বাংলাকে পরিশোধিত করতে?

বর্তমানে যাঁরা বাংলা ভাষার উপর এই রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছেন, তাদের উদ্দেশ্যে আমাদের বক্তব্য পরিষ্কার। আমরা পরিষ্কারভাবে বলতে চাই যে, ভাষার বর্তমান অবস্থান ও পরিস্থিতির বিচার-বিশ্লেষণ ও গবেষণা করেই আপনারা তার শরীর নিয়ে নাড়া-চাড়া করুন। খুঁজুন প্রয়োজনীয় শব্দ, ঐশ্বর্য। ভাষার প্রয়োগের ক্ষেত্রে মনের ভাব ঠিক প্রকাশ করতে না পারেন, অথবা শব্দভাণ্ডারের শব্দসমূহ পছন্দ না হয়! সে ক্ষেত্রে বিদেশি শব্দের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারেন। 

তাতে আমাদের কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু নিজ ভাষার প্রতি প্রেমহীনতার এমন প্রমাণ, প্রয়োগ না করুন। এতে অন্তিমে নিজেই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, অন্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করবেন, করবেন প্রভাবিত। এতে করে আপনি জাতির কুলাঙ্গার সন্তান হিসেবে চিহ্নিত হবেন। ব্যক্তিজীবনেও হবেন প্রবল অসুখী।

মাতৃভাষা বাংলাকে প্রাচীন যুগ থেকে আধুনিক যুগে পৌঁছে দিয়েছেন এ ভাষার মহান প্রকৌশলীগণ, বিজ্ঞানী এবং কবি-সাহিত্যিকগণ। এদের সাথে ভ‚মিকা রেখেছেন জাতির সাধারণ সন্তানগণ। নানা পরীক্ষা, নানা ভাষার মিশ্রণ, শব্দে শব্দে প্রেম, বিরহ সংগঠিত করে ভাষাকে সংগঠিত করে ভাষাসংগঠকেরা তাকে গড়েছেন নানা মাধুর্যে, নানা রঙে। হঠাৎ করে খুব সংক্ষিপ্ত সময়ে ভাষা নিয়ে উন্নাসিকতা আমরা আজ মানব কেন? বিশেষ করে যখন আমরা বুঝতে ও দেখতে পারছি এসবের মূলে কাজ করছে নানারকম অজ্ঞতা, অপরিপক্বতা এবং অবশ্যই উন্নাসিকতা।

তাই আসুন, আমরা প্রত্যেকে ফিরে আসি অজ্ঞতার অন্ধকার থেকে, প্রজ্ঞার পথে ভাষা ও তার জাতিপ্রেমে, ইতিহাস-ঐতিহ্যের পথ ধরে বর্তমানকে করে তুলি অর্থময়। ভবিষ্যতকে গড়ে তুলি ঋদ্ধ ও বলিষ্ঠ। জাতির আগামী সন্তানদের জন্য মা, মাটি ও মাতৃভাষাকে রাখি সুরক্ষিত, চর্চিত এবং নন্দিত।



ছবি : বিধান দেব 



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

কবিতা

সম্পাদকের কথা

দ্বিতীয় বর্ষ  ।। অষ্টম সংখ্যা ।। মার্চ ২০২২   খুব অসহায় লাগছে এবার। আমাদের ডান পাশে ধস। বায়ে গিরিখাত। মাথায় বোমারু। পায়ে পায়ে হিমানীর ব...