কোন একটি দিন, কোন একটি জাতীর যুগান্তরের সম্ভাবনা নিয়ে আসে। একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালি জাতীর জন্য তেমনই মহৎ একটি দিন। দিনটি শুধুমাত্র একটি তারিখ নয়, দিনটি বাঙালির অস্তিত্বের জানান দেয়।
এক ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের মধ্য দিয়ে একুশের চেতনার সৃষ্টি হয়েছিল। ১৯৪৭ সালে পূর্ব বাংলাকে জুড়ে দেওয়া হয়েছিল সাম্প্রদায়িক পাকিস্তানের সাথে। তৎকালীন পাকিস্তানের শতকরা ৫৬ জন মানুষের মাতৃভাষা ছিল বাংলা। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী শতকরা ৭ জনের ভাষা উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দেয়৷ প্রতিবাদ করে পূর্ব বাংলার সাধারণ মানুষ। রাজনৈতিক আন্দোলনের মূল ইস্যু হয়ে ওঠে মাতৃভাষা বাংলার দাবি।
১৯৫২ সালের শুরুর দিকে আন্দোলন জোড়ালো রুপ ধারণ করে। শাসকগোষ্ঠী পুনরায় উর্দুকেই একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা করে। তার প্রতিবাদে একুশে ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ ( ৮ ফাল্গুন, ১৩৫৮) রোজ বৃহস্পতিবার "রাষ্ট্রভাষা দিবস" ও হরতাল পালনের সিদ্ধান্ত হয়। পাকিস্তান সরকার আন্দোলন প্রতিহত করতে ১৪৪ ধারা জারি করে। সকল প্রকার জনসভা ও মিছিল নিষিদ্ধ করে দেয়। ছাত্ররা ঢাকা মেডিকেল কলেজ প্রাঙ্গণ হতে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল বের করে। মিছিলে পুলিশ গুলি চালায়। শহীদ হন রফিক, সালাম, বরকত, জব্বার সহ নাম না জানা আরও অনেকে।
একুশে ফেব্রুয়ারি ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে ২২ ও ২৩ ফেব্রুয়ারি সারাদেশ বিক্ষোভে ও হরতালের ডাক দেওয়া হয়। ছাত্র-শিক্ষক, কৃষক, শ্রমিক সহ আপামর জনগণ একযোগে সারাদেশে হরতাল পালন করে ও বিক্ষোভ মিছিল বের করে। সেদিনও পুলিশ মিছিলে গুলি চালায়। শহীদ হন শফিক, রিক্সাচালক আউয়াল ও এক কিশোর। শহীদদের স্মরণে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে রাত জেগে তৈরি করা হয় শহীদ মিনার। কিন্তু পুলিশ তা ভেঙে দেয়। পুনরায় আবারও তা তৈরি করা হয়।
প্রবল আন্দোলনের মুখে পাকিস্তান সরকার ১৯৫৪ সালের ৭ মে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে। ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের ১ম সংবিধান হলে বাংলা এবং উর্দুকে রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতিসত্তায় একুশের চেতনার সৃষ্টি হয়েছিল। পরবর্তীতে প্রতিটি আন্দোলনের চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছিল ভাষা আন্দোলন। এরপর একুশের পথ ধরেই বাঙালি পেরিয়ে এসেছে নানা সংকট।
একুশের চেতনার তাৎপর্য বহুমুখী। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাঙালির উপর যে অত্যাচার, জাতিগত নিপীড়ন চালিয়েছেল তার বিরুদ্ধে সংগঠিত হতে একুশ উদ্ভুদ্ধ করেছে। আমাদের সচেতন করে গনতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক চেতনায়। বাঙালির জাতিসত্তার স্বরুপ আবিষ্কারে একুশের চেতনা অসামান্য ভুমিকা রেখেছিল। ধর্মান্ধতাকে পেছনে ফেলে জাতিগত চেতনা জেগে উঠেছিল। আমাদের জাতীয় ইতিহাসে এবং শিল্প সংস্কৃতিতে একুশের চেতনার তাৎপর্য অসামান্য। আব্দুল গাফফার চৌধুরীর অনন্য গান," আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি?" একুশের ফসল নামে খ্যাত। একুশের চেতনার ধারায় আমরা অর্জন করেছি দেশাত্মবোধক গানের সমৃদ্ধ সম্পদ।
১৯৫৩ সালে শহীদ দিবস পালনের সময় প্রগতিশীল কর্মীরা কালো পতাকা উত্তোলন, নগ্নপদে প্রভাতফেরি, শহীদদের কবরে ও শহীদ মিনারে পুষ্পমালা অর্পণ ও একুশের গান গাওয়ার কর্মসূচি পালন করে।
একুশের চেতনা সাহিত্যে সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিস্তার করেছে। কবি মাহবুবুল আলম রচনা করেছেন অমর কবিতা,"কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি।" মুনীর চৌধুরী লিখেছিলেন কালজয়ী নাটক,"কবর"। যা প্রথম মঞ্চস্থ হয়েছিল ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে থাকা রাজবন্দিদের দ্বারা। হাসান হাফিজুর রহমানের সম্পাদনার একুশের সংকলন "একুশে ফেব্রুয়ারি", আরেকটি অমর সৃষ্টি।
একুশের চেতনায় প্রতিবছর ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলা একাডেমি বই মেলার আয়োজন করে। একমাস ব্যাপি চলে বইমেলা। লেখক পাঠকের সমারোহে এক আনন্দঘন পরিবেশ সৃষ্টি হয়। এছাড়াও একুশে পদক সর্বোচ্চ বেসামরিক পদক হিসেবে স্বীকৃতি প্রাপ্ত।
এতো অগ্রগতি স্বত্তেও একুশের চেতনার স্বপ্নভঙ্গের দিকগুলোও কম নয়। আমাদের সমাজে এখনো অসাম্প্রদায়িক প্রগতিশীল চেতনার আশানুরূপ বিস্তার লাভ করেনি। মৌলবাদ, ধর্মীয় জঙ্গিবাদ ক্রমশই সমাজকে অন্ধকারে ঠেলে দিচ্ছে।
একুশের চেতনার অন্যতম দিক হচ্ছে সর্বস্তরে বাংলা ভাষার বিস্তার। এর অর্থ শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে নারী-পুরুষ বাংলা ভাষায় দক্ষতা অর্জন করবে। প্রাথমিক থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষায় বাংলা ব্যবহৃত হবে। উচ্চ আদালতেও বাংলা ভাষার প্রচলন হবে। বাংলাদেশের সংবিধানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রভাষা বাংলা। কিন্তু সর্বস্তরে বাংলা প্রচলন এখনও বাস্তবায়িত হয়নি। বরং অনেক ক্ষেত্রে বাঙালির দ্বারাই বাংলা ভাষা অবহেলিত। শিক্ষাক্ষেত্র, অফিস-আদালত, ব্যবসা-বাণিজ্য, গণমাধ্যম ও বিজ্ঞাপনে ইংরেজি ভাষার আধিপত্য। ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিস্তার, সাধারণ শিক্ষায় ইংরেজি পাঠ চালু করার ফলে বাংলার গুরুত্ব কমছে। তার প্রভাব দেখা যাচ্ছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামকরণে বিদেশি ভাষার ব্যাবহার। বিয়ে বা জন্মদিনের আমন্ত্রণপত্রে বিদেশি ভাষার ব্যবহার। দৈনন্দিন কার্যক্রমে বাংলা ভাষার সাথে বিদেশি ভাষার মিশ্রণ।
কার্যত আমরা অনেকেই ভুলে যেতে বসেছি যে, সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নতির সাথে মাতৃভাষার উন্নয়ন অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। সম্ভবত সেই জন্যই এ জায়গাটিতে আমাদের পিছুটান ক্রমেই প্রকট হচ্ছে। আমরা অনেকেই ভুলে যাচ্ছি, বাঙালির পরিচয়ের মূলভিত্তি হচ্ছে তার মাতৃভাষা। ভুলে যেতে বসেছি আর্থ-সামাজিক জীবনে বাংলা ভাষার ব্যাবহার যথাযথ গুরুত্ব না পেলে তার শক্তি ক্রমশ দুর্বল হয়ে যাবে।
এসব সত্ত্বেও আমাদের ভুললে চলবে না , একুশের চেতনাই আমাদের নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করার প্রেরণা জাগিয়েছে। ভাষা আন্দোলনের অমর স্মৃতি বিজড়িত মহান একুশে ফেব্রুয়ারি শুধুমাত্র আর আমাদের ইতিহাসের একটি দিন নয়। এ দিন এখন পেয়েছে বিশ্বস্বীকৃতি। পেয়েছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদা। আমাদের এ অর্জন এক অসামান্য গৌরব।
একুশ আমাদের অহংকার। একুশ আমাদের প্রেরণার উৎস। অমর একুশ একাধারে ইতিহাস, ঐতিহ্য, গৌরবগাথা। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ একুশের চেতনারই অর্জন। তাই একুশের চেতনা প্রতিনিয়ত আমাদের উজ্জীবিত করে। এই চেতনা সমুন্নত রেখে বাঙালির সকল ধরনের কল্যাণ ও অগ্রগতির পথে এগিয়ে যেতে হবে। সর্বস্তরে বাংলা ভাষার বিস্তার ঘটাতে হবে।
ছবি : বিধান দেব

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন