সাধনপর্বের নির্জনতা
১১.
জলে হস্মিন সন্নিধিং কুরু
তারপর গর্ভগৃহে দক্ষিণের মুর্গেশ বললেন :
' উত্তরের গঙ্গাজল ঢেলে দিন গোদাবরী জলে ।
গঙ্গা-গোদাবরী ধারা কালো পাথরের মূর্তি বেয়ে ভাসায় ভারত তথা কন্যাকুমারিকা নামে মেয়ে ।
#
তত সন্নিহিত হই যতই জলের কাছাকাছি
ব্রহ্মপুত্র যমুনা ও সরস্বতী নর্মদা কাবেরী।
হিমালয় থেকে মেঘ ভারতসমুদ্রে গলে মেশে আমাদের তোমাদের তাহাদের পরিচয় এসে।
গীতা চট্টোপাধ্যায়ের এ কবিতা প্রকৃত কবিতা- পাঠকের কাছে অপরিচিত নয় । কবিতাটি প্রথম পড়ার পর খুব যে বোধগম্য হয়েছিল , বলতে পারব না । কিন্তু দিন যত এগিয়েছে , বোধ ও বুদ্ধির গোড়া যত পরিপক্ক (?) হয়েছে , কবিতাটির ভাব রস গ্রহণে সমর্থ হয়েছি যেন । হ্যাঁ , এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে এই ভাবরস সম্পূর্ণভাবে আমার নিজস্ব । কোন পুস্তক কেন্দ্রিক জ্ঞান নয় ।
কবিতাটি পড়া ছিল । বাবার মৃত্যুর পর শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠানে পুরোহিতের মন্ত্রোচ্চারণে ' জলে হস্মিন সন্নিধিং কুরু ' শোনা মাত্র স্নায়ুতন্ত্রে একটা বিদ্যুৎ খেলে গেল । ঠিক বলছি । শিহরণ । জল দিতে দিতে কোথাও যেন মনে হল --- ' হিমালয় থেকে মেঘ ভারতসমুদ্রে গলে মেশে । ' পুরাণের সংকল্প বিধিতে বলা আছে, --- ' ওঁ গঙ্গে চ যমুনে চৈব গোদাবরি সরস্বতি । নর্ম্মদে সিন্ধু কাবেরি জলেহস্মিন সন্নিধিং কুরু।।' বলা হচ্ছে , এই মন্ত্রোচ্চারণ করতে করতে স্বীয় হৃদয় থেকে দেবতাকে সেই জলে আবাহন করে তা মাথায় ও পূজার উপকরণে ছিটিয়ে দিতে হবে ।
ছিটিয়ে দিলাম । সেই মুহূর্তে আমার পরলোকগত পিতাকে স্মরণ করেছি । কিন্তু ... । কাজ শেষ করে একটু ফাঁকায় খুলে বসেছি কবিতার বই । এবং সেই বিশেষ কবিতাটি । এবার যেন কিছু প্রশ্ন জেগে উঠল মনে । এই ভারতবর্ষের প্রতিটি গৃহকন্দরে যে প্রশ্ন অস্ফুটে চির জাগরুক থাকে । উত্তর-দক্ষিণ- পূর্ব- পশ্চিম সব সমস্ত মিলেমিশে একাকার ।
' হিন্দু সংস্কৃতির স্বরূপ ' গ্রন্থে ক্ষিতিমোহন সেন বলছেন , " এখনো আমরা যেখানেই স্নান করি সেখানেই ভারতের সর্ব তীর্থকে আবাহন না করিয়া পারি না। সকল নদী সকল তীর্থ স্নানকালে উপস্থিত হউক ইহাই প্রার্থনীয়।
ওঁ কুরুক্ষেত্রগয়াগঙ্গাপ্রভাসপুষ্
তীর্থান্যেতানি পুণ্যানি স্নানকালে ভবন্ত্বিহ।। "
আসলে মানুষের একাত্মতাও কবির অভীষ্ট। তিনিও চান সব মিশে যাক ' মহামানবের সাগরতীরে ' । হিমালয় থেকে মেঘ ভারতসমুদ্রে যেমন গলে মেশে, পক্ষান্তরে ভারত সমুদ্রের জলরাশি বাষ্প হয়েই জন্ম দেয় কালো মেঘপুঞ্জের।
তাহলে কি পেলাম ? একটি বন্ধনের বার্তা। উত্তর দক্ষিণ এক বাষ্প রূপে প্রায় পৃথিবী সৃষ্টির সময় থেকে নিজেদের বেঁধে রেখেছে অনাগত ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে।
সম্প্রতি আরও একবার একটি লেখার জন্য গীতা চট্টোপাধ্যায়ের এই বইটি পড়ার সুযোগ হল। আর কী আশ্চর্য , বর্তমান সময়কেই যেন ধারণ করছে সে । এখন পড়তে পড়তে অন্য একটি ভাবনা চিন্তার কক্ষ অধিকার করে বসল । রাজনৈতিক স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে লেখা এ কবিতা । আমি এমনটাই বলব। এখানে বিভেদের কথা নেই। নেই ধর্ম নিয়ে 'গেল গেল ' রব । আছে মিলিয়ে দেবার সুমহান অতীত অভীপ্সা। কবির কথায় ' মেলাবেন , তিনি
মেলাবেন ' । সত্যি তো , কবি যদি না মেলানোর কথা বলেন , তাহলে কে বলবেন । তাই আমরাও চাই 'ব্রহ্মপুত্র যমুনা ও সরস্বতী নর্মদা কাবেরী ' পাশাপাশি অবস্থান করুক । অন্তত ' দক্ষিণের মুর্গেশ '- এর দিকে তাকিয়ে । আমাদের তোমাদের তাহাদের পরিচয় যে আত্মগোপন করে আছে ওই অগণিত সাধারণ মানুষগুলির মধ্যেই।
১২.
মরু
তোমার স্নিগ্ধ চুলের অরণ্যে
সিঁদুর বুঝি সূর্যোদয় হত ,
উন্মাদিনী , ভাগ্যে জ্বলল না
আয়ুষ্মতী সিঁথির সেই ব্রত !
#
কারা তোমায় দস্যুতায় ছিঁড়ে
বর্বরতা হেনেছে ; উল্কিতে
নিলাজ বুক নীরস মরুভূমি ----
জানল না তো জননী জাহ্নবী!
'অবন ছবি লেখে ', বলেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বাস্তবিকই অবনীন্দ্রনাথের লেখা পড়ার সময় পরপর দৃশ্যের উপস্থাপনা মনটাকে মেধার জটিলতা থেকে কোনো এক ঊর্ধ্বলোকে নিয়ে যায়। 'এক ঋতু' কাব্যগ্রন্থের এই কবিতাটিতে প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত একই সঙ্গে দুটি বিষয়কে ধরেছেন । প্রথম স্তবকে দৃশ্যকল্প, শেষ স্তবকে স্বকীয় বক্তব্য । দুইয়ে মিলে ' মরু ' কবিতাটি আমার মত অন্তর্মুখী পাঠককেও না-দেখা শহরের গল্প বলে । বলে প্রতিদিন কাগজে পড়া বিষয়ের সত্যাসত্যকে ।
নারীর দেহ ও মনের সৌন্দর্য নিয়ে হাজার হাজার কবিতা লেখা হয়েছে । কত সাহিত্য শিল্পে তাকে চির জাগরুক করে রাখা হয়েছে সময়ের হাত ধরে। কিন্তু আমাদের বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধের কবি সে সব দিক দিয়েই গেলেন না । তিনি তুলে আনলেন সময়কে। যে সময় দিনের পর দিন ধর্ষণ করে চলেছে সহনাগরিককে । আজকের সমাজের দিকে তাকিয়ে থাকলে দেখি , সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী ভারতে ২০১৬ সালে প্রায় কুড়ি হাজার শিশু ধর্ষিত হয়েছে। যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে আরও প্রায় ১২ হাজার শিশু। আবার ২০১৮ সালে ভারতের ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরোর রিপোর্টে বলা হচ্ছে , ভারতে প্রতিদিন ৯১ টি ধর্ষণ , ৮০ টি খুন আর ২৮৯ টি অপহরণের ঘটনা ঘটে । ২০১২ দিল্লির নির্ভয়া কান্ড যেমন একটি সামাজিক হিংসার ঘটনা , পাশাপাশি কোনো কোনো অঞ্চলে মেয়ে ভ্রুণ হত্যাও আজ সামাজিক- রাষ্ট্রিক অক্ষয়ের ছবি তুলে ধরে।
যাক অনেক কথা হল । আয়ুষ্মতী নারীর ' নিলাজ বুক নীরস মরুভূমি ' এখন । দেশও কি ধীরে ধীরে
' জননী জাহ্নবী 'কে হারিয়ে ফেলছে । এ প্রসঙ্গে ক্ষিতিমোহন সেন প্রণিধানযোগ্য একটি কথা বলেছেন, ---
" লোকে সেকালে ফাঁদ দিয়ে শিকার ধরত। এখনও লোকে সেই আদিম মনোবৃত্তি ছাড়তে পারে নি । তাই প্রেম দিয়ে বাঁধবার বদলে আমরা ভগবানকে মন্ত্রে তন্ত্রে আচারে বাঁধতে যাই । রূপে প্রসাধনে প্রিয়তমকে বাঁধবার চেষ্টার মধ্যেও সেই আদিম মনোবৃত্তিই ধরা দিচ্ছে ।"
(' বাংলার সাধনা ') ।
সমস্ত আকাশ জুড়ে দেখি কুয়াশা । হালকা ধোঁয়াও হতে পারে । কাছে- দূরের গাছপালা আজ আবছা। সোঁদা গন্ধে কাঁপছে পৃথিবীর মাটি । ফুটি ফুটি করেও পাপড়ি মেলতে পারছে না ভবিষ্যতের পুষ্পোদ্যান। প্রণবেন্দুর এই কবিতায় কুয়াশা সরিয়ে ফুল ফোটানোর চেষ্টা চোখে পড়ছে। আমাদের এগিয়ে আসতে হবে সময়মতো ।
ছবি : বিধান দেব

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন