বুধবার, ৩০ ডিসেম্বর, ২০২০

সম্পাদকের কথা


 ৩১ ডিসেম্বর ২০২০


কবিতা ঠিক কী রকম হবে এ নিয়ে আমাদের মনে বিস্তর প্রশ্ন। আর প্রশ্ন থাকলে তার উত্তরও খুঁজতে চেষ্টা করি আমরা। কবিতার স্বরূপ সম্পর্কে কোনও নির্দিষ্ট ধারণা নেই বলেই যুগ যুগ ধরে নানা মুনি ( সমালোচক) তাদের নানা মত ব্যাক্ত করেছেন এবং এখনও করছেন। বলা বাহুল্য সৎ কবি মাত্রেই এসবের ধার না ধেরে নিজের প্রজ্ঞা অনুযায়ী কবিতা লিখে ভবিষ্যতের কাছে এক একটা দিশা রেখে গেছেন। তবে কবিতা যেহেতু আত্মপ্রকাশেরও একটি মাধ্যম তাই একজন কবির কাছে তাৎক্ষণিক গ্রহণযোগ্যতাও কবিতার উপযুক্ত মানদণ্ড হিসেবে দেখা দিতে পারে আর পরবর্তীদের কাছে সেই মানদণ্ড অধিক সহজ বলেও গৃহীত হতে পারে। আর সেইখানেই যত ধোঁয়াশা। মানব সভ্যতার ইতিহাসে কবিতা কখনও কখনও হয়েছে আত্মগূঢ় । আবার কখনও কখনও গণযোগের মাধ্যম। কাজেই সময়ের প্রয়োজন কবির কাছে গুরুত্বপূর্ণ। জনসংযোগ যখন কবিতার উদ্দেশ্য তখন কবিতার রূপ একরকম আবার নিছক বিত্তশালী মূর্খ সমাজকে যখন খুশি করতে হয় কবিতাকে তার রূপ আরেক রকম। আজকের গণকবিতাচর্চার যুগে যখন প্রযুক্তি মানুষকে তার সমস্ত কিছু ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষা পূরণে সমর্থ, যখন বিনোদন আর জনসংযোগ আর কবিতার ওপর নির্ভর করে না তখন কবিতার সামাজিক উদ্দেশ্য পূরণের দায় আর নেই বললেই হয়। তাহলে কবিতার এখন কাজ কী? কেনই বা লিখিত হবে তা? সময়ের চিহ্ন কবিতায় রাখতেই হবে এরূপ যাদের মত তাদের বলি সময়ের চিহ্ন ধরে রাখার জন্য এখন বৌদ্ধিকচর্চার নানা দিক আছে। ইতিহাস ভূগোল অর্থনীতি সমাজবিজ্ঞান ভাষাবিজ্ঞান ইত্যাদি ইত্যাদি। আবার সাহিত্যেরও বিবিধ শাখা যেমন গল্প উপন্যাস নাটক প্রবন্ধ ইত্যাদি। সংবাদ মাধ্যম সিনেমা সমাজের কলুষ কালিমা আর আলোক উদ্ভাস নিয়েই আমাদের সঙ্গে চির আয়ুষ্মান। ফলে এই মুহূর্তে যারা কবিতা দিয়েই সমস্ত বিষয়ভিত্তিক সমস্যার সমাধান চান তারা হয়ত ভুল করছেন। যারা অনেক বেশি মানুষের কাছে কবিতাকে গ্রহণযোগ্য করে তুলবার জন্য প্রাণপাত করছেন তারাও হয়ত ভুল করছেন। কারণ কবিতার অন্তর্নিহিত সত্যই হয়ত তার বিরুদ্ধে। একমাত্র বড় কোনও উদ্দেশ্যসাধন ছাড়া আর কোনও কারণেই কবিতাকে সমাজ সংস্কারে ( মধ্যযুগে অনুবাদ ও মঙ্গল কাব্যসাহিত্য ) অংশগ্রহণ করতে দেখা যায়নি। কবিতার পাঠক চিরকালই খুব কম। তাহলে দেশে দেশে কালে কালে কবিতা লেখার জন্য এত মানুষের আগ্রহ কেন? এর উত্তর দুভাবে দেওয়া যায়। এক. কবিতা আমাদের জীবন সত্তায় অতি দুর্মূল্য একটি সম্পদ। তা লেখা এবং পড়া দুটোই আমজনতার জন্য নয়। দুই. পরিশ্রম ও অনুশীলন ছাড়াই কবিতার মতো করে কিছু কথা লিখে ফেলা যায়।যার সঙ্গে অনুভূতি দেশ থেকে আসা কোনও আলোর সম্পর্ক থাকে না। বলাবাহুল্য শেষোক্ত লেখাই কবিতার রূপ ধরে বাজারে সচল। প্রতিভার পরিবর্তে পরিচিতি, আন্তরিকতার পরিবর্তে ক্ষমতা প্রকৃত কবির পরিবর্তে সাজা কবিকে গুরুত্ব দিয়ে থাকে। কবিতার অনুষ্ঠানগুলিতে একজন প্রথম শ্রেণির কবির পরিবর্তে তৃতীয় শ্রেণির একজন গায়ক কিংবা আবৃত্তিকার বেশি গুরুত্ব পান। কবিতা দিয়ে কী হয়? তা কি সমাজ পরিবর্তন করে? ক্ষুধার্তের মুখে অন্ন তুলে দেয়? স্বজন হারানো মানুষের বুকে তার স্বজনকে ফিরিয়ে দেয়? এই সব কটি প্রশ্নের উত্তর অনেক বড় মাপের কবিরা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ভাবে দিয়েছেন। এবং সবগুলোই নঞর্থক। কিন্তু কবিতার তো কোনও না কোনও কাজ আছেই। আর সেই কাজ করে মকসোহীন, উদ্দেশ্যহীন কিছু না-পেতে আসা কবিতা। পৃথিবীতে এমন কতিপয় অভিশাপগ্রস্ত সংবেদনশীল মানুষ জন্মান যাদের বেঁচে থাকার বোধ অধিকাংশের সঙ্গে মেলে না। কবিতার মতোই তারাও স্বতঃস্ফূর্ত, উদ্দেশ্যহীন, পৃথিবীর অধিকাংশ মোটা দাগের মানুষের সঙ্গে তাদের মেলানো যায় না। কবিতা শুধুমাত্র তাদের সত্তাকেই পোষণ দেয়। তার সংক্রমণ এত সূক্ষ্ম কোনও বিচলনই হয় না। মানব অস্তিত্বের ধারণাকে শুদ্ধ ও বৃহৎ করতে করতে তা আমাদের এতদূর পৌঁছে দিয়েছে।

মঙ্গলবার, ২৯ ডিসেম্বর, ২০২০

সুধীর চক্রবর্তী ।। স্মরণ : অনিন্দিতা গোস্বামী


 

শেষ প্রণাম 


পনেরো ডিসেম্বর। বিকেল সাড়ে পাঁচটা। সদ্য খবর পেয়েছি কৃষ্ণনগরবাসীর পরম গর্বের মানুষ, একজন সত্যিকারের বাঙালি পুরুষ, অসামান্য গদ্যকার, প্রাবন্ধিক অধ্যাপক সুধীর চক্রবর্তী আর নেই। বিকেল চারটে নাগাদ আমাদের ছেড়ে, এই বিশ্ব ছেড়ে তিনি অন্য লোকে পাড়ি জমিয়েছেন। বেশ কিছুদিন ফোন করা হয়নি, কেন করিনি আমার কাছে তার সদুত্তর নেই। প্রায়ই ভেবেছি করব কিন্ত নানান কাজের চাপে ভুলে গিয়েছি। আসলে কাকিমার সঙ্গে টুকটাক হোয়াটস অ্যাপে কথা হয়ে যায়। কিন্ত বেশ কিছুদিন কাকিমাও যে চুপচাপ বেখেয়ালে তা-ও লক্ষ্য করিনি। খবরটা পেতেই চোখে জল চলে এল। প্রথমেই মনে হল ফোন করলে কেউ আর ফোনের ওপ্রান্ত থেকে সামান্য ভাঙা গলায় বলবেন না, বল অনিন্দিতা, খবর বল। হ্যাঁ শেষদিকে বয়সজনিত কারণে সামান্য শ্লেষ্মা জমত গলায়। তবে কিছুক্ষণ কথা বললেই গলাটা পরিষ্কার হয়ে যেত। হবেই তো তিনি ছিলেন সুগায়ক।
        ফোন করলাম। স্যারের নাম্বারেই। ওপাশ থেকে কথা বললেন তাঁর ছোট মেয়ে। সামান্য কথা। এখনও তারা সামলে উঠতে পারেননি কিছুই। কৃষ্ণনগরে নিয়ে যাবার কথা চলছে। রেনাল ফেলিওর হয়েছিল। ভর্তি  ছিলেন কলকাতার নামী হাসপাতালে, ভালোও হয়ে গিয়েছিলেন খানিক। এসেছিলেন মেয়ের ফ্ল্যাটে। কিন্ত আবার হঠাৎ বাড়াবাড়ি, ভেন্টিলেশন, ব্যাস। সব খবর ঠিকঠাক পাইনি। তথ্যে কিছু ভুল থাকতে পারে। কিন্ত স্মৃতিতে তো ভুল থাকে না। এখন রাত দেড়টা। জানি না স্যারের দেহ দাহ করা হয়ে গেল কি না। সদ্য প্রয়াত আত্মা হয়ত এখনও বিচরণ করছে এই ধরাধামে। আমার চোখের সামনে ভাসে ধুতি পাঞ্জাবি পরিহিত দীর্ঘদেহী গৌরবর্ণ একজন আদর্শ বাঙালি মানুষ যিনি ছিপছিপে মেদহীন শরীরে দীপ্ত পদক্ষেপে হেঁটে চলেছেন। কী জোর ছিল সেই পদচারণায়, তিনি বলতেন আমাদের কলকাতায় যেতে হবে কেন? কলকাতা আসবে আমাদের কাছে।
           হ্যাঁ তিনি পেরেছিলেন। আজীবন কৃষ্ণনগরে বসবাস করেও কলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গবাসীর হৃদয়ের মণিকোঠায় স্থান করে নিয়েছিলেন। তার সঙ্গে দেখা করতে নিত্যদিন রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লোক আসত আর তিনি ভেজা গামছা মাথায় দিয়ে রোদ জল উপেক্ষা করে ছুটতেন বাউল ফকিরের কাছে। তাঁর বাউল-ফকির কথা এক অসম্ভব পরিশ্রম আর অধ্যাবসায়ের ফসল। বইটি ২০০২ সালে আনন্দ পুরস্কারে সম্মানিত হয়।



পুরস্কার তিনি অনেক পেয়েছেন। শিরোমণি পুরস্কার (১৯৯৩), আচার্য দিনেশচন্দ্র সেন পুরস্কার, দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয়ের নরসিংহ দাস পুরস্কার, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সরোজিনী বসু স্বর্ণপদক (২০০৩), সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার (২০০৪), আরও অনেক পুরস্কার। কিন্ত তাই নিয়ে তাঁর কোনও মাথাব্যথা ছিল না। তিনি জানতেন তাঁকে কাজ করে যেতে হবে। প্রতিদিন নিয়ম করে লিখতেন। প্রায় পঞ্চাশ বছর বয়সে তাঁর প্রথম বই প্রকাশিত হয় অথচ তাঁর গ্রন্থ সংখ্যা পঞ্চান্নরও বেশি। সম্পাদনা করেছেন ধ্রুবপদ পত্রিকা। এছাড়াও তাঁর সম্পাদিত বই ও পত্রপত্রিকার সংখ্যা অনেক। যেমন জন পদাবলি, দ্বিজেন্দ্রগীতি সমগ্র, বালা দেহতেত্বের গান।
কিন্ত এসব তো হল তথ্য। মানুষ সুধীর চক্রবর্তীর জানতে হলে যে প্রথমেই মনে পড়ে আড্ডাপ্রিয় রসিক মানুষটির কথা। যেন একটা যুগ চলে গেল। কত গল্প যে তাঁর ভাঁড়ারে। তাঁর দোতলা বাড়ির সিঁড়ি দিয়ে উঠেই বাইরের ঘরে কখনও খাটের ওপর আধ শোয়া হয়ে কখনও সোজা হয়ে বসে চলে আড্ডা। কাকিমাও এসে যোগ দিতেন সেই আড্ডায়। সিঙ্গারা খেতে খুব ভালোবাসতেন। গরম সিঙ্গারা নিয়ে ঢুকলে শিশুর মত খুশি হতেন। আড্ডার সঙ্গে সঙ্গে সমানে আসত চা, মিস্টি, ফল। আমার দিদা মারা যাবার পর যখন কৃষ্ণনগরের সঙ্গে সব যোগাযোগ ছিন্ন হলো তখন কৃষ্ণনগরের একমাত্র আকর্ষণ ছিলেন স্যারই। বছরে একবার অন্তত যেতাম বিজয়ার প্রণাম করতে।




            সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ছিলেন তাঁর বন্ধু। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের চলে যাওয়াটাও হয়ত স্যার নিতে পারেন নি। স্যারের কাছ থেকেই সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের ব্যক্তিজীবনের কত ছোট ছোট গল্প শুনেছি। গল্প শুনেছি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের। একবার নাকি এক বক্তৃতা সভায় অন্নদাশঙ্কর রায় বক্তৃতা দিয়েই যাচ্ছেন থামছেন না। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা পাঠ ছিল তার পরে। অনেকক্ষণ থেকে উসখুস করছেন সবাই। শক্তি চট্টোপাধ্যায় বললেন দাঁড়া আমি ব্যবস্থা করছি, বলে টলতে টলতে সটান মঞ্চে উঠে পড়ে চেঁচিয়ে বলতে লাগলেন, এই কখন শেষ হবে এসব? আমরা কবিতা পড়ব। সবাই তো তাকে ধরাধরি করে মঞ্চ থেকে নামিয়ে দিলেন। বক্তৃতাও শেষ করে তড়িঘড়ি নেমে এলেন অন্নদাশঙ্কর রায়। এরকম কত মজার মজার গল্প যে শুনেছি।
            আবার কোনও গান সম্পর্কে জানতে চাইলে সঙ্গে সঙ্গে ব্ই নামিয়ে দেখিয়ে দিতেন গানটা কত সালে রচিত,কোন রাগ, কোন তাল, অন্য কোনও গানের প্রভাব আছে কি নেই ইত্যাদি ইত্যাদি। একদিন তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম লোকগানের কি অনুবাদ সম্ভব? তিনি বলেছিলেন 'গভীর নির্জন পথে' বইটার মধ্যে যে গানগুলো আছে সেগুলোর অনুবাদ সম্ভব না।লোকগানের যে মিস্টিসিজম, ভাষার দোলাচল এগুলো কখনও বাংলা থেকে ইংরাজীতে আনা যায় না। যেমন গৌর কথার অর্থ কিন্ত গৌরাঙ্গ নয়। 'কবে গৌরাঙ্গ পাব'---- এই জি নিস গুলি বিদেশি ভাষায় আনা সম্ভব না। 
              দ্বিজেন্দ্রলাল, রজনীকান্ত, অতুলপ্রসাদের গান নিয়ে তাঁর যে প্রবন্ধগুলো বিভিন্ন জায়গায় প্রকাশিত হতো গোগ্রাসে পড়তাম। পড়তাম সংবাদ প্রতিদিন দৈনিক পত্রের রোববার পুস্তিকায় 'দেখা না দেখায় মেশা'। চলাচলের পথে কত মানুষের সঙ্গে ওঠা বসার গল্পের কী সরস উপস্থাপন।
          খুব ছোটবেলা থেকে স্যার আমাকে দেখেছেন। যদিও তখন ওঁর ধারেকাছে ঘেষতাম না আমি। আমাদের বাড়ির নীচের তলায় ভাড়া থাকতেন লেখক দীপঙ্কর দাস। দীপঙ্কর কাকুর বাসায় মাঝে মাঝে আসতেন স্যার। মা বলতেন ওই দেখো স্যার এলেন। খুব পণ্ডিত ব্যক্তি। আমি উপর থেকে ঝুঁকে একবার দেখতাম, ব্যাস। যখন লিখতে এলাম বিভিন্ন সাহিত্য বাসরে দেখা হয়ে যেত। আমি ভয়ে সুরুৎ করে পালিয়ে যেতাম দূরে। তিনি কৃষ্ণনগর গভঃ কলেজের অধ্যাপক ছিলেন। তাঁর ক্লাসগুলো নাকি এত সুন্দর যে শুনতে যাবার মতো। আমি তো ওই কলেজে পড়ি না আর আমার বিষয়ও বাংলা নয় আমি কেমন করে যাব! তবু খুব ইচ্ছে করল। একবার এক সাহিত্য বাসরে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে লেখা আমার একটা প্রবন্ধের খুব প্রশংসা করলেন স্যার। সাহস বাড়ল। টপ করে গিয়ে প্রণাম করলাম। সেই শুরু। তবে ওই প্রণামটুকুই। আর সঙ্গে বসে আড্ডা দেওয়া, গল্প করা সে সাহস পেতে আমায় অনেক বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। যখন ধীরে ধীরে আমি সহজ হয়েছি দেখেছি স্যার আরও সহজ। কী আন্তরিক। আমাদের বাড়ি যখন বিক্রি হয়ে গেল স্যার বলতেন আসবে, আমার বাড়িতে থাকবে। কাকিমা বলতেন একদিন ভাত খেয়ে যাবে।
          কত কষ্ট ছিল স্যারের বুকে। তাঁর প্রথম কন্যা খুব অসুস্থ। এই যে প্রতিবন্ধী সন্তান যে নিজের নামটাও বলতে পারে না, মা বাবাকে চেনে না, পোশাক আশাক,  খাওয়া দাওয়া কোনও বোধ বুদ্ধিই নেই তার। লোক হয়ত আছে সাহায্যের তবু নিজ হাতে সব সামলাতেন স্যার। হয়ত সেই কষ্ট থেকে মুক্তি পেতেই নিয়েছেন লেখার আশ্রয়।
          কিন্ত এমন কথা তো ছিল না স্যার। কথা ছিল তো একশত বছর পথ হাঁটার। আমরা সবাই মিলে সেই জন্মদিন পালন করব এমনই তো ভেবে এসেছি সব সময়। এই চলে যাওয়াটা তো কিছুতেই মানতে পারছি না স্যার। অনেক গল্প বাকি রয়ে গেল। যেখানেই থাকবেন ভালো থাকবেন স্যার। কত কিছু জানবার প্রয়োজন হবে, আপনাকে ফোন করব, আপনি শুনতে পাবেন তো? বলবেন তো বল অনিন্দিতা!


ছবি: ফেসবুক থেকে সংগৃহীত 

অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত ।। স্মরণ : রজতকান্তি সিংহচৌধুরী

 



দোলায় আছে ছ'পণ কড়ি

এক

হেমন্তের গোধূলি আর সন্ধ্যার ভেতরে তেমন তো কোনও ফারাক থাকে না। ১৭ নভেম্বর ২০২০ হির্শবার্গের সন্ধ্যা আর কলকাতার রাত্রির দ্বিতীয় যামের তফাৎ লুপ্ত করে দিয়ে চলে গেলেন কবি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত (৬ অক্টোবর, ১৯৩৩--- ১৭ নভেম্বর, ২০২০)। রবীন্দ্রনাথ এবং অমিয় চক্রবর্তীর পরে আমাদের সাম্প্রতিকতম বিশ্বকবি। তাঁর কবিতায় স্থানকালের ক্রমিক প্রসার আমাদের মাতৃভাষা, আমাদের দুঃখিনী বর্ণমালার বৈভব। কাব্যভাষার অকুতোভয় প্রয়োগে নতুন বাক্ রীতির, বাক্ স্পন্দের দুনিয়া রচনা করে কবি শ্রীমধুসূদনের পরে আর কেই বা বাংলা ভাষার আকম্র সীমারেখাকে এমন হাট করে খুলে দিয়েছেন?
"দোলায় আছে ছ'পণ কড়ি "(২০১৬ অভিযান)। অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের কবিতার উত্তর পর্বের এক উজ্জ্বল প্রস্থানবিন্দু। সদ্যপ্রস্থিত কবির ছ'দশক ছাপানো কবিতাযাত্রার শিখরে যে শেষ পঞ্চক, তার সূচনা কিন্তু এই হার্দ্যমধুর কবিতার বইটি দিয়েই। 'সাহিত্যের বেলাভূমি'-র পাঠক লক্ষ্য করবেন, অলোকরঞ্জনের অধিকাংশ কবিতার বইয়ের নামও কিন্তু ছন্দোময়, তাঁর কবিতার মতোই। মালার্মের মতো তিনি বিশ্বাস করেন, সরকার আসবে যাবে, কিন্তু ছন্দ থেকে যাবে। বক্ষ্যমাণ কবিতার বইটির নামকরণে এসে গেছে একেবারে ঘরোয়া, লোকায়়ত, প্রায় সবার জানা বাংলার এক ছেলে ভুলানো ছড়ার চরণ এবং ছন্দ, শ্বাসাঘাতপ্রধান স্বরবৃত্ত।
বইয়ের নামে এবং অনেক কবিতার বেলাশেষের বা বিদায়ের ছবি, অন্তময়তার রেশ। কিন্তু সে বিদায়সুর কোনও নিরাশায় তলিয়ে যায় না। সে সুর, আমাদের সৌভাগ্যক্রমে, মধুর, কৃতজ্ঞতার, মুগ্ধতার। এই আলো, এই সৌন্দর্যভরা পৃথিবীর মাঝখানে তিনি হয়তো শারীরিকভাবে থাকবেন না। কিন্তু কীই বা তাতে আসে যায়! এইখানে তাঁর জীবন দেবতা রবীন্দ্রনাথের সুরে সুর মিলিয়ে গেয়ে উঠতেই পারেন সুধাকণ্ঠ অলোকরঞ্জন, 'মধুর তোমার শেষ যে না পাই, প্রহর হল শেষ '। অঙ্গবিহীন আলিঙ্গনে সকল অঙ্গ ভরিয়ে তোলবার নেশায় হলই বা সেটা সায়ন্তনের 'ক্লান্ত ' ফুলের গন্ধ। যে গানটি তিনি একদিন গেয়ে শুনিয়েছিলেন হাইডেলবার্গের অহংকার এবং বিশ্ববিশ্রুত দার্শনিক হান্স-গেয়র্গ গাদামারকে। বস্তুত এ গানটি লেখাও হয়েছিল জার্মানির স্টুটগার্টে। ২১ সেপ্টেম্বর, ১৯২৬। রবীন্দ্রনাথ তখন ইউরোপ সফরে। ইতালির আতিথ্যগ্রহণ নিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে ছুটে আসা ছোট কথার ঝাঁক থেকে বেরিয়ে আসতে গানের সুরের মুক্তি খুঁজছেন, ছন্দে স্পন্দিত হয়ে উঠছে আলোক-অন্ধকার।

দুই

মূলত 'যৌবন বাউল'(১৯৫৯) এবং অংশত তার প্রথম ও দ্বিতীয় পর্বের কবিতা নিয়েই অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের কবিতার অধিকাংশ আলোচনা শেষ হয়, 'মরমী করাত'(১৯৯০) অথবা 'রক্তমেঘের স্কন্দপুরাণ'(১৯৯৩) পর্যন্ত যার অন্তিম সীমা। এর একটা কারণ হয়তো, তাঁর অনেক বইয়ের অলভ্যতা। 'কবিতাসংগ্রহ'-এর তিনটি খণ্ডই আপাতত প্রকাশিত, 'রক্তমেঘের স্কন্দপুরাণ'(১৯৯৩) অবধিই যেখানে বিধৃত। 'শ্রেষ্ঠ কবিতা' নিঃশেষিত বহুকাল। এই সব কারণেই এর পর থেকে বুঝি শুরু হয়ে যায় পূর্বজ আর এক দাশগুপ্ত কবির মতো পাঠক হারানোর বৃত্তান্ত। উত্তর পর্বের পরিণত জীবনানন্দ বিষয়ে বুদ্ধদেব বসুর অনাগ্রহ কি একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ নয়? এক নদীতে দুবার স্নান করা যায় না। কৈশোরে ঠাকুর্দার মুখে শোনা গ্রিক দার্শনিক হিরাক্লিটাসের এই ভ্রূভর্ৎসনা মেনে কবিতা থেকে কবিতার উজাড় গাঙে ক্লিষ্ট পুনরুক্তি খারিজ করতে করতে এগিয়ে চলেন কবি। তাঁর কবিতার ধরতাই এখনও অনেক কবিতাপ্রেমিক পাঠকের কাছে অধরা।
তাই এ শহরে তাঁর লেখালেখি নিয়ে আলোচনা নজরে পড়ে কম। শুধুমাত্র শেষ পাঁচটি কবিতা-বইয়ের ঋদ্ধিঋণ বাংলা ভাষাভাষী হিসেবে বর্তমান বিনীত প্রতিবেদককে কৃতজ্ঞ করে।
রবীন্দ্রনাথের শেষ দশকের কবিতা তাঁর নিবিড় বন্ধু শঙ্খ ঘোষের মতো তাঁরও গভীর আগ্রহের বিষয়। আমাদের বিনীত বিবেচনায়, তাঁর জীবন দেবতা রবীন্দ্রনাথের মতো অলোকরঞ্জনের কবিতা-যাত্রায় শেষ দশকটি নব নব উন্মেষশালিনী কল্পনা-প্রতিভায় বেড়াডিঙোনো দৌড়বীরের মতো বাংলা কবিতার কম্প্র সীমারেখাকে দিকে দিগন্তরে বিসর্পিত করবার বিবরণ। একটি দ্রবপাত্রের মতো অস্থির আয়তনের ভেতরে বসেও কবি বজায় রাখছেন তাঁর এপিক শ্বাস, বাংলার অজস্র লিটল ম্যাগাজিনের সম্পাদক, ছোট ছোট প্রকাশকের হাতে উজাড় করে বিলিয়ে দিচ্ছেন তাঁর অমূল্য সব কবিতা, গদ্য। স্রোতের ভেতরে ধ্রুবতারার আদলের মতো কবিতার শাশ্বত ফুটে বেরুচ্ছে নৈমিত্তিকের ভেতরে। ঘরোয়া তাঁর শিকড়চেতনা এসে মিশছে দুনিয়াজোড়া তাঁর শরণার্থী চেতনায়। 'তোমরা কি চাও, শিউলি না টিউলিপ'(২০১৭) বইয়ের বিভাব কবিতায় কবি তাই লিখলেন, 'বসতবাড়ির শেষবারকার পুজোয়/ শেফালিকার শুভ্র আগুনটাকে/ চ্য়ন করে বেড়িয়ে পড়লাম নিরঞ্জনের আগে'। পৌঁছলেন কোথায়? পৌঁছলেন ভিনদেশের গাঁয়ে, 'সেখানে শুধু অজস্র টিউলিপ/যা শুধু লাগে নশ্বরের কাজে'। আমরা জানি ১৯৫৭-৭১ পর্বে যাদবপুরের জনপ্রিয় অধ্যাপক কবি গত শতকের সাতের দশকে জার্মানির হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। তখন থেকেই তাঁর সময় কলকাতা ও জার্মানির মধ্যে দ্বিধাবিভক্ত। রিখিয়ায় তাঁদের একান্নবর্তী ভিটেবাড়ির পুজোর শিউলি ফুল এসে মিলল ইউরোপীয় টিউলিপে। প্রথম পর্বের শাশ্বত হতে চাওয়া কবিতা ব্যস্ত হল নশ্বর নৈমিত্তিকে। যুদ্ধের বিরুদ্ধে তাঁর নাছোড় জেহাদে।

তিন

পার্থপ্রতিম দাসের অসামান্য প্রচ্ছদ শোভিত পাঁচ ফর্মা ছাপানো এই 'দোলায় আছে ছ'পণ কড়ি' বইটার বিভাগ কবিতায় কবি বলেছেন, "মনের ভেতর গুমরে ওঠে/ ধাইমার সেই দাবি/ মাছের কাঁটা পায়ে বিঁধলে/ দোলায় চেপে যাবি/ দোলায় আছে ছ'পণ কড়ি/ গুনতে গুনতে যাবি'..."
প্রথম কবিতার নাম '২০২'। বুদ্ধদেব বসুর স্মৃতিধন্য ২০২, রাসবিহারী অ্যাভিনিউ ঘিরে "আমাদের তারুণ্যের শেষ তীর্থ 'কবিতা ভবন'।" শ্মশানের জন্য নাম 'পিতৃবন'। এ বইয়ের 'পিতৃবন' কবিতায় তাই পেয়ে যাই তাঁর স্নেহাপ্লুত বাবা বিভূতিরঞ্জনকে। তাঁর পিতার পিছনেই দাঁড়িয়ে পিতামহ দক্ষিণারঞ্জন দাশগুপ্ত, 'যৌবন বাউল'-এর সেই সুখ্যাত 'আমার ঠাকুমা' কবিতার 'শহর বিদ্বেষী মানুষটি, যিনি সাঁওতাল পরগনায় ভিটে পত্তন করে তাঁর বড় নাতি অলোকের বয়স যখন 'বড়জোর পনেরো', তখনই সেই জ্যেষ্ঠ পৌত্রের হাতে পারিবারিক দুর্গাপূজার ভার তুলে দিয়েছিলেন। এভাবেই অলোকরঞ্জনের পরিজনেরা ঘুরে ঘুরে আসেন তাঁর কবিতার প্রবাহে। আর যেই পরিজনদের সীমা বিস্তারিত হতে থাকে দুনিয়াভর রক্তসম্পর্কহীন দীনতম মানুষটি অবধি।দুঃখতাপের উপত্যকায় উপচে পড়ে স্বাধীনতার পুষ্পোলিবাহার।



আর এ বইতেই টানা গদ্যে লেখা 'অনাবাসী যদি অনুবাদ করে' কবিতায় লিখলেন, 'তুলসীতলার আজলকাজল মায়ামদির নিরাপত্তার ঘেরাটোপ থেকে একবার বেরিয়ে পড়লে ইহমানুষের কপাল থেকে বাস্তুদেবতার আশীর্বাদ চিরতরে অবলুপ্ত হয়ে যায়,তার বরাতে তখন চলতে থাকার চালচিত্তির ছাড়া অন্যতর কোনো বিধিলিপি অবশিষ্ট থাকে না। তখন থেকেই সম্ভবত ভাষাই হয়ে ওঠে মানুষের একমাত্র আবাসন।' হাইডেগার-অনুরণিত এই আভাষণ অলোকরঞ্জনেরই সিলমোহর হয়ে ওঠে। ভারতীয় নাগরিকত্বের মতো বাংলা ভাষার আবাসন তিনি ছেড়ে যাননি। নতুন নতুন সমাসবদ্ধ পদের জোড়কলম, নতুন পরিভাষা, প্রতিশব্দ নির্মাণ তাঁর নিত্যকৃত্য।

এ বইয়ের 'কবিতা লেখার গরজে' কবিতায় আমরা পাচ্ছি আশৈশব সুহৃদ শঙ্খ ঘোষকে:
'দুপুরের কাছে নিরপেক্ষতা শিখি
দুপুর যেন বা আশৈশব সুহৃদ
শঙ্খ ঘোষের মতো'
একই কবিতায় আসছেন নিভৃতচারী কবিবন্ধু আলোক সরকার:
'বিকেলের দিকে আলোক সরকারের
প্রজ্ঞা ও পারমিতা
শিখে নিয়ে আমি থেকে যাই অনাহত'...
আর তারপর?
'ধু-ধু সন্ধ্যায় আমি তো নিরক্ষর /কেননা তখন যাপিত দিনের অর্জন মুছে ফেলে / কবিতা লেখার গরজে নিজেকে করি ক্ষতবিক্ষত...'
মনে পড়ছে, দূরভাষে দৈববানীর মতো এই চরণগুলি ভেসে এসেছিল আমার কাছে। 'মাঝি' সম্পাদক প্রশান্ত রায়ের হাতে তুলে দেবার গরজে। কবি যখন জার্মানিতে থাকতেন, তখন মাঝে মাঝেই তাঁর ফোন পেতাম, ক্বচিৎ কখনও লোকোত্তর কবিতাও। শ্রুতিলিখনে তুলে দেওয়া যেত নানা সম্পাদকের হাতে।
বইয়ের উপান্ত্য কবিতা ' পালকি করে যারা আমায় নিয়ে চলেছে' যেই না পাঠক সজলচক্ষু হতে যাবেন, অমনি আসে অমোঘ শৈলীতে অলৌকিক আশ্বাসন, বইটির সব শেষ কবিতায়:
আমার জন্য হা-হুতাশন কোরো না, অরুণাভ
উত্তরাধিকারসূত্রে পুণ্য পারমিতার
ছ'পণ কড়ি সঞ্চয়িত আছে আমার দোলায়,
বাকিটা পথ গুনতে গুনতে যাব।


ছবি: লেখক 





নাসের হোসেন ।। স্মরণ : আবু রাইহান

 



কবি নাসের হোসেনের  যাপিত জীবনে ছিল শুধু কবিতা আর চিত্রশিল্প নির্মাণ


অকৃতদার কবি নাসের হোসেনের যাপিত জীবনে ছিল শুধু কবিতা আর চিত্রশিল্প নির্মাণ! তাই তিনি ‘আকাশ কিংবা সমুদ্র’ নামক কবিতায় সাহস করে বলতে পেরেছিলেন- 

“আমার সঙ্গে সব সময় একজন নারী থাকে 

অনেকেই বলে সব সময় নারী, এটা কীরকম যেন? 

আমি বলি, নারী তো থাকবেই, তোমরা তো বলেই থাকো 

নারী অর্ধাঙ্গিনী- সুতরাং অর্ধেক শরীর নিয়ে কী করে 

হাঁটি চলি? 

আমার সঙ্গে সব সময় একজন নারী থাকে 

চার হাত চার পা একত্র হলে তবেই না 

সম্পূর্ণ মানুষ-”

বাংলা ভাষায় আশির দশকের অন্যতম প্রধান কবি নাসের হোসেন বাংলা কবিতায় নিজস্ব একটি জগত নির্মাণ করতে পেরেছেন! যেখানে ভিন্ন , ভিন্ন বাকভঙ্গিমা ,নতুন বিষয়বস্তু আর সেইসঙ্গে মহৎ কিছু অনুভূতি কবিতায় উপস্থাপন করতে সমর্থ হয়েছিলেন! যা তাঁর কবিতাকে মহৎ উত্তরণের পথে নিয়ে গেছে!জীবজগতের যা-কিছু বৈপরীত্য সেসবকে একসূত্রে গেঁথে বেঁধে জীবনের প্রবহমানতার সঙ্গে মিশিয়ে নাসের হোসেন বাংলা কবিতায় নির্মাণ করেছেন স্বতন্ত্র, আশ্চর্য এক কবিতা জগত। সহজ সত্য সুন্দরের মত বিরাজিত এই কবির মাথার উপরে বিস্তৃত এক ব্রহ্মাণ্ড, চারপাশে দিগন্তরেখা ছুঁয়ে গভীর শূন্যতা। অথচ তিনি কখনোই ব্রহ্মাণ্ড ও শূন্যতা নিয়ে ‘অপার হয়ে বসে’ থাকেননি। তাঁর দীর্ঘ  কবিতা যাপনে তিনি তৈরি করেছেন এক অলৌকিক  সাঁকো ।

 “ভেসে আছি, ওই যে দূরে পৃথিবী, চাঁদ আর গ্রহতারকা

হাতের দিকে তাকালাম- শূন্য। পায়ের দিকে তাকালাম- শূন্য।”

                                    (শূন্য)                                                                         

নিজের কবিতায় যেমন ছিল তাঁর মৃদু উচ্চারণ, তেমনি জীবন যাপনে ছিলেন শুভদ্র,মৃদুভাষী ,শান্ত অথচ আত্মপ্রত্যয়ী!সব কবির জীবনেই স্বপ্ন ও শূন্যের মধ্যে এক বিস্তৃত প্রাঙ্গণ অনাবৃত পড়ে থাকে! সব সাধ  রূপ পায় না! আবার সব শূন্য ও ফাঁকি হয়ে যায় না! কবি নাসের হোসেন তাঁর কবি জীবনের অধরা মাধুরী প্রসঙ্গে এক স্বাক্ষাৎকারে বলেছেন- ‘স্মৃতি ও শূন্যতা! যে কোনো ভালো কবিতার ভিতরে সব সময় ক্রিয়া করে এর অভিঘাত! শিল্পকে তার জমাট দমবন্ধতা থেকে মুক্তি দেয়! যার ফলে হাওয়া বাতাস খেলে! খেলতে থাকে কুয়াশার নিভৃত ব্যাপ্তি! শিল্প তার একরূপতা থেকে এগিয়ে যেতে পারে বহুরূপতার দিকে! এক ধরনের অন্তর্হিনতা সারা শরীরে! কবিতার সীমার মধ্যে অসীম বিচ্ছুরিত হয়! কবিতা এভাবেই গড়ে উঠতে চেয়েছে আমার হাতে! নানান ভাবে রূপ পাল্টাতে চেয়েছে, গতি পাল্টাতে চেয়েছে! নদীর মতো! আমি নিজেও একটা প্রবহমান নদীর মতো সেইসব নানা রূপ ও গতিকে নিয়ে ক্রমাগত বয়ে গেছি! বয়ে যেতে চেয়েছি!’

“বৃক্ষের পাশে দাঁড়িয়ে আছে পা, চতুর্দিকে 

ঝরে যাচ্ছে বৃষ্টি, অবিশ্রাম.... 

প্রতিটি মুহূর্তের মধ্যে বয়ে যায় হাড়গোড়, কার্বনকনা...

মাথার উপর আরো বেশি কানায়-কানায় জমে ওঠে জল... 

অন্ধকারে পিঁপড়েরা সারিবদ্ধ ভাবে বের হয়ে আসে- 

যেন স্মৃতি, স্মৃতির অবগুণ্ঠনে তেজস্বী স্তব্ধতা! 

হায়, মানুষের কত রকম রূপ থাকে, কত পিচ্ছিল সাধ!” 

                             (অবগুন্ঠন)                                                                   

কবি নাসের হোসেনের জন্ম 2 জানুয়ারী 1958 সালে কলকাতায় (মৃত্যু 9 নভেম্বর 2020)!কলকাতায় কর্মরত থাকলেও শৈশব-কৈশোর স্কুল কলেজ সবই কেটেছে বহরমপুরে!নাসের হোসেন শুধু কবি নন, চিত্রশিল্পীও ছিলেন! তাঁর একক চিত্র প্রদর্শনী হয়েছিল 1984 সালে কলকাতার বিড়লা অ্যাকাডেমিতে!কলেজে পড়ার সময় ‘দ্য লাস্ট পেজ’ নামে একটি  দ্বিভাষিক পত্রিকা সম্পাদনা করতেন! দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় 

ধরে ‘কবিতা পাক্ষিক’ পত্রিকা সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন! 






তাঁর  প্রকাশিত কবিতার বইয়ের সংখ্যা 26 টি!

তাঁর প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ:  ‘অপারেশন থিয়েটার’(1990)! পরবর্তী কাব্যগ্রন্থ গুলি হল-‘ডানা’(1994), ‘জামার ভুবন’(1994), ‘কৃষ্ণগহ্বর’(1995), ‘আলপিননামা’(1996), ‘গ্যাব্রিয়েল’(1997), ‘জবরদখল’(1998), ‘ছায়াপুরাণ’(2000), ‘কপিলা ও পিতৃতন্ত্র’(2001), ‘আছে এত’(2002), নির্বাচিত কবিতা-প্রথম খন্ড(2004), ‘কিছুদিন, তবেই’(2006), ‘কোমা, অন্তিম পর্যায়’(2006), ‘প্রেম পদাবলী’(2006), ‘বেঁচে, বর্তে’(2006), ‘দ্রাবিড় সোনাটা’(2009), ‘স্ক্র্যাপস অফ স্কুলবুকস’(2009), ‘লাফ’(2012), ‘শো-কেস(2013), ‘ইষ্টিকুটুম বেড়ালছানা’(2014),’এগারো লাইনের কবিতা’(2014), ‘কথা আছে, ধ্বনিও আছে’(2015), ‘জিমন্যাশিয়াম’(2015), ‘লহমা’(2015), ‘আবার অপেরেশন থিয়েটার’(2016), ‘ছায়ালাহারী সিরিজ ও অন্যান্য কবিতা’(2017), ‘ফেটে যাওয়া গ্রহ’(2017), ‘মিশে থাকা দৃশ্য সিরিজের কবিতা’(2018), নির্বাচিত কবিতা-দ্বিতীয় খন্ড(2019)! কবিতা লেখার পাশাপাশি কবিতা চিত্রভাস্কর্য নিয়ে গদ্য লিখছেন।

তাঁর কবিতায় উপজীব্য মানুষ এবং মাটি ।তাঁর কবিতার অনুভবে উচ্চারিত হয়েছে আনন্দ- বেদনা, সুখ-দুঃখ, জীবন-মৃত্যু, নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস এবং আলো-অন্ধকার।কবি নাসের হোসেনের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘অপারেশন থিয়েটার’ এর ব্লার্ব এ লেখা হয়েছিল- ‘এই কাব্যগ্রন্থটি গ্রথিত হয়ে রইল এই সময়ের স্বপ্ন ও শূন্যতা! সংশয়দীর্ণ মানষ ভূমন্ডল! অপারেশন থিয়েটারের সার্জারিতে উন্মুক্ত ক্ষোভ ও ভালোবাসা, ঘৃণা ও প্রেমের আশ্চর্য দোলাচল! আধুনিক অমঙ্গলবোধের পাশেপাশেই এক তীব্র শুভবোধের অভ্যুত্থান!’

“অন্ধকারের মধ্যে যে আলো

আমি তার অনুসন্ধানে আছি।

গাছের ভিতরে যে অনুভব, পাথরের ভিতরে

যে অনুভব আমি তার অনুসন্ধানে।

হঠাৎ দু হাত টুকরো হয়ে গেলে

কীভাবে মানুষ বেঁচে থাকে,

এ এক অনন্ত জিজ্ঞাসা।

প্রতিটি কোষের মধ্যে যে জীবন-স্পৃহা

তাকে আমি প্রণাম করেছি।”

                 (স্পৃহা)


তাঁর কবিতা বিবৃতিমূলক, টানা গদ্য ফর্মে লেখা!বাংলা কবিতার প্রচলিত ও জনপ্রিয় পংক্তি বিন্যাস রীতি থেকে কবি নাসের হোসেন সরে গিয়েছিলেন।

“আমরা যা কিছুই দেখি তার সংখ্যা অসীম

তার মানে প্রতিটি জিনিসেরই কোনো সীমা-পরিসীমা নেই

এইমাত্র যে জিনিসটা দেখা গেল বা জন্মগ্রহণ করলো

আসলে সে অজস্র

আমাদের চোখ তো পুঞ্জাক্ষি নয়, এমন কী ইন্দ্রের মতো

সহস্রলোচনও নয়

তবু তা দেখতে পায়, ইচ্ছে করলেই দেখতে পায়

চারপাশের এই শত সহস্র অভিযান

তা দৃশ্য হোক বা অদৃশ্য”

                         (অগণ্য)

তাঁর  কবিতা স্টান্টবাজির চমক থেকে মুক্ত। তিনি যা দেখেছেন,যা কিছু ঘটছে, সেগুলোকেই তিনি এক মরমিয়া সাধকের মত কবিতায় লিরিক্যাল রূপ দিয়েছেন।

“এখন কি পাতা খসানোর পালা,ওই তো গাছেরা

তাদের বাকল ছেড়ে দিচ্ছে,পাতা ছেড়ে দিচ্ছে

পাতা ছেড়ে দেওয়ার দৃশ্যটাও সত্যি অদ্ভুত সুন্দর

অনর্গল গাছেদের উপর থেকে নেমে আসছে

শুকনো পাতাদের অবতরণমালা,এবং সে অবতরণ 

নিহিত নিশ্চুপ, তুমি এসময় কথা বলো না,শুধু দ্যাখো

হঠাৎই মনে হল, পাখিরা সব গেল কোথায়,কোন্

দূর দেশে,একটু আগেও তাদের কণ্ঠ

শুনতে পেলাম মনে হল।”

                    (পাতা খসে পড়ছে)


তাঁর কবিতায় স্বেচ্ছাকৃতভাবে কবিতাকে কঠিন করার প্রবণতা নেই! কবিতা তার নিজস্ব আদলে ধরা দেয়! মানুষের জীবন চেনা ও অচেনা, নির্দিষ্ট ও অনির্দিষ্ট উপকরণ দিয়ে তৈরি! কবি নাসের হোসেন তাঁর কবিতায় অনেক সময়ই আশ্রমিক পৃথিবী থেকে সংকেত পৃথিবীর দিকে চলে গেছেন! তাঁর কবিতায় কোমল পরিবেশের ভিতর দিয়ে পাঠকেরা এক দুর্নিরীক্ষ্য জীবনবোধের দিকে চলে যেতে পারে!নিজের কবিতা বিষয়ে কবির বিশ্লেষণ ছিল, ‘আশ্রমিক বা গার্হস্থ্য পৃথিবী থেকে আমার সরে যাবার কোনো বাসনা নেই! শুধুমাত্র সংকেত আমার কাছে কষ্টকর অভিজ্ঞতা হবে, যদি সেখানে মানুষের স্পর্শ না থাকে! এই রূপ রস গন্ধের পৃথিবীতে মানুষের হাসি, মানুষের কান্না, নানান চিত্রকল্পে প্রতিষ্ঠা পেতে চায়! আর এই প্রতিষ্ঠা আমার বিশ্বাস আমার কবিতায় কিছু কিছু বদল নিয়ে আভাসিত হতে থাকে! এভাবেই আমার আগের কবিতা থেকে পরের কবিতায় অনেকখানি তফাৎ দেখা যায় ভাষা ব্যবহারে, চিত্রকল্প রচনায়!... আমি সব সময় চেয়েছি আমার দেখা পৃথিবীর সঙ্গে না দেখা পৃথিবীকে মেলাতে! আমার মানষ-অভিজ্ঞতার ভান্ডারটিকে উজাড় করে নানান রঙে ভরিয়ে তুলতে বিশাল ক্যানভাসে! সেখানে রঙের পাশেই থাকছে বে-রঙ, বস্তুর পাশেই থাকছে শূন্যতা, স্মৃতিও স্বপ্নের মৌন মিশেল!’

“সকলকে আমার রক্তাক্ত ভালোবাসা 

দিয়ে যেতে চাই!  

কোন সম্পর্কই সম্পর্ক নয় 

শুধু এক উপলব্ধি, দহন! 

বুকের ভিতর পুড়ছে ধুপগন্ধ 

ধাক্কা মারছে শরীরে! 

একটু পরেই দগ্ধ গলিত শব 

ভেসে যাবে নীল দরিয়ায়! 

সম্পর্ক বলে কিছু নেই 

শুধু আছে ধুপগন্ধ! আর 

একটা পাহাড়ের স্বপ্ন 

যা মাঝে মাঝেই ধাক্কা দেয়, যেখান থেকে 

শেষ পর্যন্ত ছুড়ে দেওয়া হবে আমাকে 

সমুদ্রের ফেনায়!” 

                (সম্পর্ক)

‘সুন্দর কে সব সময় নতুন করে নির্মাণ করে যেতে হয়! সুন্দর আসলে মহাসমুদ্রের বিশালতায় ব্যাপ্ত, অধরা মাধুরীর মতো! শিল্পী তার থেকে কণামাত্র সংগ্রহ করতে পারেন! এভাবেই পূর্ণতা ও অপূর্ণতার খেলা ক্রমান্বয়ে ক্রিয়াশীল থাকে, থাকতে চায়!’

“আমরা দুই ভবঘুরে  অনেক দেশ ঘুরে 

শেষ পর্যন্ত হাজির হলাম ভারতবর্ষে 

আমি বললাম এখানে একটা শানদার মন্দির বানাবো 

তুমি বললে, এখানে বরং হোক একটা বিশাল মসজিদ 

আমি মুসলমান আর তুমি হিন্দু 

তাতে কী, আমাদের চাওয়াটাই এমন উদ্ভট 

মুসলমান চাইছে মন্দির,আর হিন্দু চাইছে মসজিদ 

কিন্তু আমাদের হাতে ছিল আরো অনেক কাজ 

মাঝে মাঝে মন্দির ও মসজিদের  প্রসঙ্গ যে উঠত না এমন নয় 

তবু তা ওই পর্যন্তই, আমরা চাষবাসে প্রযুক্তিবিদ্যায় 

চিকিৎসায় জ্ঞান-বিজ্ঞান সৌন্দর্যের অধিকারে 

নিজেদের ক্ষমতা বারংবার প্রমাণ করলাম 

গ্রামে গ্রামান্তরে পৌঁছে দিলাম শিক্ষার উজ্জ্বল আলো 

আর প্রতিটি দেহে যুক্তির জাদুকাঠি ছুঁইয়ে করে তুললাম স্বাস্থ্যবান 

এখন আমাদের সমস্ত কিছুই বড় কর্মমুখর ”

                      (ভারতবর্ষ)

                                                                      অনেকেই কবি নাসের হোসেনকে শুধুমাত্র পোস্টমডার্ন কবি হিসেবে চিহ্নিত করতে চান!যাঁরা এই ধরনের তকমায় বিশ্বাস করেন,তাঁরা আসলে কবি নাসের হোসেনকে সমগ্রতার পরিবর্তে খন্ডিত রূপে দেখতে চান।একথা সত্য তিনি পোস্টমডার্ন কবিতা আন্দোলনের পথিক ছিলেন! সেইসঙ্গে কবিতা নিয়ে তাঁর পরীক্ষা-নিরীক্ষা সর্বজনগ্রাহ্য হয়ে উঠেছিল! এ বিষয়ে কবির নিজস্ব বক্তব্য, ‘কবিতা লেখা বা যে কোন শিল্প সৃজন মানুষের জন্য! এই মানুষ কারা? যাঁরা কবিতাটা অনুভব করেন, শিল্পটা অনুভব করেন!কেননা অনুভব করাটা প্রধান ব্যাপার! কবিতা বা শিল্প হচ্ছে যাঁরা এটাকে অনুভব করেন তাঁদের জন্য! একজন কবির প্রথম পাঠক তিনি নিজে! এর পরেই তিনি খোঁজ করেন নানান ছোট-বড় পত্রপত্রিকা, যাদের মাধ্যমে বেশকিছু পাঠকের কাছে পৌঁছে যেতে পারেন! এখানে মাধ্যম হিসেবে বেশিটাই লিটিল ম্যাগাজিন, তারপরেই বাণিজ্যিক কাগজ! ভালো কবিতার প্রকৃত পাঠকের সংখ্যা চিরকাল কম! একজন সত্যিকারের সৃজনশীল কবি চিরকালের পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রত্যাশী, নতুন নতুন দিগন্ত উন্মোচনের কারিগর! আমি কতটা সফল তা জানি না! শুধু এটুকু জানি শুরু থেকেই আমি কোন পত্র-পত্রিকাকে অগম্য মনে করিনি! এটাকেই যদি সর্বজনগ্রাহ্য হওয়া বলে ভেবে থাকেন, তা ভাবতে পারেন! তবে আমি সর্বজনগ্রাহ্য হব এরকম ভেবে কিন্তু লিখি না! কবিতায় আমি সব সময় নিজের কাছে বিশ্বস্ত থাকতে চেয়েছি!’

“চাবির আশেপাশে হাঁটি,যদি কোন তালা পাই ঢুকে যাব 

খোলা-বন্ধ যাই হোক না কেন, চাবি যা এক অনন্ত মহিমা 

কত কিছু খুলে দেয় বন্ধ করে দেয়,-- 

জানালার বাইরে ধীরে ধীরে জেগে উঠছে চাঁদ, গোল, 

মহামহিম-- চাবির অদ্ভুত ছায়া তার বুক ভেদ করে চলে গেল, চারপাশে ঝরে পড়ছে ঢেউ, ঝরে পড়ছে ছাই ও ওষুধ, 

তর তর তর তর বাতাস বইছে” 

                             (ছাই ও ওষুধ)

বদলে যাওয়াটাই নিয়ম!কিন্তু সবটাই কি বদলায়?এমন কিছু থাকে সেসবের মধ্যে যা কখনোই বদলায়! না শত পরিবর্তনেও বদলায় না! সেটা হচ্ছে ভালোবাসা! ভালোবাসা কখনো বদলায় না! এটা শুধু বিশ্বাস বললে ভুল হবে, এটা আসলে অভিজ্ঞতা! মানুষ তার দীর্ঘকালের অভিজ্ঞতা থেকেই বুঝেছি ভালোবাসার অপরিমেয় শক্তি, যা যে কোনো ধ্বংসের কবল থেকে উদ্ধার করে মানুষকে নিয়ে যায় শান্তির আশ্রয়ে! আসলে নাস্তিক বলে প্রকৃত অর্থে কিছু হয়না, সকলেই আস্তিক! জীবনকে যে ভালোবাসে সে যদি পৃথকভাবে ঈশ্বরের অস্তিত্ব না-ই স্বীকার করে, জীবনকে ভালোবাসার কারণেই সে আস্তিক! আমি সারা জীবনে বহু নাস্তিক দেখেছি যাঁরা নিজেদের নাস্তিক ঘোষণা করে স্বস্তি পান, অথচ জীবনকে ঘোরতর ভালোবাসায় তাঁরা  যে কোনো ঘোষিত আস্তিককে হার মানাতে পারেন!....শ্রেষ্ঠ গুণাবলী আরোপ করে মানুষ তৈরি করেছে তাঁর ঈশ্বর, একটি মহান অস্তিত্ব এবং না অস্তিত্ব! মানুষকে ভালো না বাসলে সে অস্তিত্ব অথবা না অস্তিত্বকে অনুভব করা যায় না! কবি তারই মত! নানান রূপকল্পে বারবার বদলে যায় পরিপার্শ্ব ও কবিতার চেহারা! কিন্তু হৃদয় যেন না বদলায়!মানুষ যেন চিরকালের মমত্বকে অনুভব করতে পারে!

“..................................শুভবোধ 

এমনই একটা জিনিস যা বিনয়ের নির্মাণ করে

জগতের প্রতিটি সৃষ্টির প্রতি শ্রদ্ধাশীল করে তোলে

যা বহুপূর্বে জন্মগ্রহণ করেছে অথবা সদ্য-সদ্য

জন্মগ্রহণ করলো, সব-সবকিছুর প্রতি শ্রদ্ধাবনত

থাকতে হবে, এটাই হচ্ছে ভালোবাসা, এটাই হচ্ছে

সুন্দর, এই ভালোবাসারই অপর নাম ঈশ্বর, তাই

কেউ যদি স্বঘোষিত নাস্তিকও হয়, সেও আসলে

জগতের সবকিছুকে ভালোবাসছে বলেই সব কর্তব্যগুলোকে

সমাধার প্রচেষ্টায় রত আছে বলেই, আস্তিক, আর

যে স্বঘোষিত আস্তিক সে আস্তিক্যের শত দাবি করলেও

যদি সে জগতের সমস্ত সৃষ্টিকে  ভালো না বাসে

সংসার ও সমাজের করণীয় কর্তব্যগুলোকে না করে 

তাহলে তার শত ইবাদাত-আচার সত্ত্বেও সে-ই প্রকৃত

নাস্তিক। আসলে ভালোবাসা আর নমনীয়তা আর

কর্তব্যবোধটাই হচ্ছে বড়ো কথা, সবচেয়ে বড়ো ইবাদাত।

আর, সবচেয়ে বড়ো ইবাদাত হচ্ছে জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা

করা, ললিতকলার চর্চা করা, নন্দনতত্ত্বই রুচি গড়ে তোলে।”

                                (তিনি বলেছিলেন)

কবি নাসের হোসেন ব্যক্তিগত জীবন চর্চায় সারাক্ষণ কিভাবে প্রশান্ত মনে এবং সদা হাস্যময় থাকেন? এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি প্রত্যেকেরই মধ্যে কিছু ভালো দ্বিগুণ দেখতে পাই!আর তাতেই সন্তুষ্ট থাকি! একজন মানুষ বহু রকম চেহারায় সজ্জিত! আমি এইসব চেহারা একটার পর একটা আবিস্কার করি, আর রোমাঞ্চিত হই! এবং শেষমেষ প্রত্যেকের মধ্যেই ভালোবাসাকে সনাক্ত করি! এই কারণেই হয়ত কেউ আমাকে ভুল বুঝে আমার সঙ্গে কথা না বললে আমার কষ্ট হয়! তাঁর সঙ্গে জোর করে কথা বলি! কেননা আমি বুঝি মানুষের সঙ্গে এই পারস্পরিকতা খুব জরুরী শিল্প রচনার ক্ষেত্রে!’

“ভুল হয়তো বা জড়িয়ে ধরছে চারপাশ, হয়তো এটাই সত্যি 

আকাশে ঝিকমিক করছে যে তারাগুলো এবং চাঁদ-ওগুলো তো 

ওরকমই নয়, একটি মিথ্যে দৃশ্য দেখে তাহলে এতখানি শিহরিত 

হতে হয়, হওয়া যায়, তাহলে এর থেকে বড় শক্তি আর কী হতে 

পারে, সুতরাং ওটাও সত্যি, সমস্ত মিথ্যে আর সত্যি মিলিয়ে 

কোনো বড়ো সত্যি, সত্যি কত বড়ো হয়, মিথ্যে কত বড়ো হয়,কে 

কতখানি বুক ভেঙে দিতে পারে, কে কতখানি উল্লসিত করতে 

পারে, এত প্রেম ছড়িয়ে আছে, এত অপ্রেম ছড়িয়ে আছে, চারিদিকে”                  

                                  (আছে, এত)

কবি নাসের হোসেনের এই চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলা সাহিত্য ও শিল্পসংস্কৃতির বিস্তৃত প্রাঙ্গণ থেকে চিরতরে হারিয়ে গেল একটা সদাহাস্যময় দয়ালু মায়াময় মুখ । সাহিত্যের বিশুদ্ধ ধারার মহৎপ্রাণ কবি নাসের হোসেনের  প্রয়ানের সাথে শেষ হয়ে গেল বাংলা কবিতা চর্চার একটি অধ্যায়!তাঁর কবিতা পাঠের মধ্য দিয়েই আশির দশকের এই শক্তিশালী কবির সঙ্গে আমার আত্মিক পরিচয়! আমি তাঁর কবিতার মুগ্ধ পাঠক! 

দৈনিক দিনদর্পণ পত্রিকার ঈদ সংখ্যায় বছর দুই আগে স্বাধীনতা-উত্তর পশ্চিমবঙ্গে আধুনিক মুসলিম কবিদের নিয়ে একটি প্রবন্ধ লিখতে গিয়ে কবি নাসের হোসেনের প্রকাশিত সমস্ত কাব্যগ্রন্থ গুলির কবিতা নিবিড় ভাবে পাঠ করতে হয়েছিল! যা তাঁর কবিতার প্রতি আমার মুগ্ধতাকে আরো বাড়িয়ে তোলে! দৈনিক দিনদর্পণ পত্রিকার সাহিত্য পাতার সম্পাদক হিসাবে তাঁর কাছে কবিতা চাওয়ার সূত্রে প্রিয় কবি নাসেরদার সঙ্গে প্রাথমিকভাবে ফোনে আলাপ হয়েছিল! পরবর্তীতে কলকাতায় এক সাহিত্যের অনুষ্ঠানে মুখোমুখি আলাপ হওয়ার পর আন্তরিক ভালোবাসায় তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরেছিলেন! ফেসবুকে তিনি আমার সঙ্গে সংযুক্ত ছিলেন! ফেসবুকের মেসেজ বক্সে কবিতা চেয়েও সঠিক সময়ে না পাওয়ার অভিযোগ করায় নাসেরদা বলেছিলেন, ‘আমি আসলে নিয়ম করে ফেসবুক দেখিনা! যখন তোমার কবিতার দরকার হবে আমাকে ফোন করবে, আমি ঠিক কবিতা দিয়ে দেবো!’ নাসেরদা তাঁর কথা রেখেছিলেন! এরপর থেকে নাসেরদা কাছে ফোনে কবিতা চাইলেই তিনি হোয়াটস্যাপ এ আমাকে কবিতা পাঠাতেন! আমাদের দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য পাতায় এ মাসের কবি শিরোনামে নাসেরদার পছন্দের একগুচ্ছ কবিতা প্রকাশিত হয়েছিল! অসুস্থ অবস্থায় মাঝেমধ্যে তাঁর সঙ্গে ফোনে কথা হতো! বলতেন পনেরো দিন ছাড়া ছাড়া হাসপাতালে চেকআপে যাওয়ার বিড়ম্বনার জন্য কলকাতা ছেড়ে কোথাও যেতে পারছেন না! আমাদের মত তাঁর অনুজ গুণগ্রাহীরা নিশ্চিত ছিলাম নাসেরদা সুস্থ হয়ে আবারও স্বমহিমায় কবিতার জগতে ফিরে আসবেন! হায় আমাদের নিঃস্ব করে অমোঘ মৃত্যু আমাদের প্রিয় নাসেরদাকে নিয়ে অনন্তকালের জন্যে না ফেরার দেশে পাড়ি দিয়েছে! আর বিশুদ্ধ সান্ত্বনার মতো তিনি আমাদের কাছে রেখে দিয়ে গেছেন তাঁর কবিতার মায়াময় ভুবন!

“যেতে পারো, তবু যেতে পারো না, এখন তুমি যে পরিসরে  

অবস্থান করছো সেখানকার সব কাজ সব কর্তব্য

সমাধা না করে তুমি যেতে পারো না, একটা পরিসরের

কাজ শেষ করে, সুষ্ঠুভাবে শেষ করে, তবেই পরবর্তী 

পরিসরে ঢোকা, তা নইলে সব কাজই থেকে যাবে অসমাপ্ত 

আর সকলেই  জানে, অসমাপ্ত  করে রাখা মোটেই

মানুষের  পক্ষে সমীচীন  কাজ নয়, তবু কিছু

অসমাপ্তি থেকেই যায়।”

                      (কিছু অসমাপ্তি)


ছবি: লেখক 


বিশেষ গদ্য ।। রাজীব ঘোষাল

 



ছাতা পরব 


পুরুলিয়ার জনজাতীয় উৎসবগুলির মধ্যে জনপ্রিয় একটি লোকউৎসব হল ছাতা পরব। সমগ্র মানভূমের বিভিন্ন জায়গায় ভাদ্র সংক্রান্তির দিন এই উৎসব হয়ে থাকে।এই উৎসবের বয়স আনুমানিক পাঁচশ বছর,হাজার বছর,দু-হাজার বছরও হতে পারে। প্রাচীন রেওয়াজ মেনে পঞ্চকোট রাজপরিবারের সদস্যদের হাতে পুরুলিয়া শহরের কাছে চাকোলতোড় গ্রামে ছাতা খোলার মধ্য দিয়ে এই উৎসবের সূচনা হয়।সারা রাত ধরে চলে নাচ গান হুল্লোড়। বিকেলে সূর্যাস্তের মুখে ছাতা তোলার মধ্যে দিয়ে প্রতীকী বর্ষা শেষের ঘোষণা করা হয় বলে বিশেষজ্ঞদের মত। তবে আদিবাসী মতে বর্ষার দেবতাকে তুষ্ট করতেই এই ছাতা পরব করা হয়ে থাকে। পশ্চিমবঙ্গ ছাড়াও পড়শি বিহার ওড়িশা ঝাড়খণ্ড থেকেও অনেকে এসে এই উৎসবে  অংশগ্রহণ করে থাকেন। কারোর কারোর মতে এটা অবিবাহিত আদিবাসী যুবক যুবতীদের কাছে জীবনসঙ্গী বেছে নেবার পরব। সে কারণেই ছাতাপরবকে সামাজিক স্বয়ম্বর সভাও বলা চলে। বিশাল শালগাছের খুঁটির উপর তুলে দেওয়া ছাতার নিচে জড়ো হয় কয়েক হাজার মানুষ।

  সমগ্র ছোটনাগপুর এলাকা জুড়ে ভাদ্রমাসে অনুষ্ঠিত প্রধান দুটি পরব হল ইঁদ পরব আর ছাতা পরব। ঠিক এই সময়েই উদযাপন হয় করম পরবও। করমের উদযাপনের দিনে হয় ইঁদ পরব। ইঁদ পরব শব্দটি সম্ভবত ইন্দ্রদেবতাকে তুষ্ট করার পরব ধারণা থেকেই এসেছে। কারোর কারোর মতে পঞ্চকোট রাজা পার্শ্ববর্তী  রাজ্য ছত্রিণানগর বা ছাতনার রাজাকে যুদ্ধে পরাজিত করার ঘটনাটি স্মরণে রাখার জন্যই ছাতা পরবের সূচনা করেছিলেন। তবে আদিবাসীদের মতে এই পরব অনেক অনেক প্রাচীন এবং এটি করমের ইঁদ পরবের সঙ্গে সম্পর্কিত। করমের জাওয়ার নতুন শস্য নিবেদনের মধ্যে দিয়ে এখানে নিজেকে প্রকৃতির দেবতার কাছে মতান্তরে ইন্দ্র দেবতার কাছে সমর্পণের একটা রেখাচিত্র ফুটে ওঠে। ছাতা পরবে কেবল ছাতা ওঠার দিনটি পৃথক ভাবে নির্ধারিত হয়েছে এই যা। অনেকেই এই ছাতাডাঙ বা শালের খুঁটিকে প্রণাম করে শ্রদ্ধা জানায়।

  ভালো করে লক্ষ করলে দেখা যায় প্রায় সমস্ত ছাতা পরবগুলিই জমিদার বা রাজাদের অধীনস্ত এলাকায় তাদের তত্ত্বাবধানেই হয়ে থাকে। এর মধ্যে দিয়ে হয়ত বা প্রজাদের সঙ্গে সম্পর্কের ভিত্তিও সুদৃঢ় করার কাজটিও সম্পন্ন হত।প্রজারা রাজাদের শ্রদ্ধা নিবেদন করতেন আর রাজারা প্রজা হিতৈষী হবার সংকল্প নিতেন। এখনো মেলাগুলিতে সাঁওতাল কুড়মি সম্প্রদায়ের উপস্থিতির আধিক্য লক্ষ করা যায়। তবে যেহেতু দীর্ঘকাল ধরেই ভারতবর্ষ তথা মানভূম অঞ্চলের লিখিত ইতিহাস নেই তাই এই উৎসবের প্রাচীনত্ব বিষয়ে সঠিক তথ্য সংগ্রহ করা খুবই জটিল। তবু এরই মধ্যে চেষ্টা জারি থাকবে। মানুষে মানুষে সম্পর্কের ভিত্তি মজবুত হবে এই আশা রয়ে যায়। রয়ে যায় শস্য নির্ভর সভ্যতার কোনো যোগসূত্র উঠে আসার ক্ষীণ আশা।
  
  আর মানুষ অবাক হয়ে দেখে পঞ্চকোট রাজপরিবারের বর্তমান প্রতিনিধি অমিত সিং দেও হাতির চেপে পুরুলিয়া শহরের কাছে চাকোলতোড়ের মাঠে হাজির হচ্ছেন ছাতা তোলার জন্য। চলছে শস্য ফলনের আরাধনা... 



ছবি: লেখক 

ধারাবাহিক গদ্য ।। দীপক হালদার

 



ডায়মন্ড হারবারের সাহিত্য চর্চার        ইতিবৃত্ত 



চার .

কবি রফিক উল ইসলাম গ্রামনগর ছাড়া রবীন্দ্র জন্মদিনকে  স্মরণ করে  'এসো এসো এসো হে বৈশাখ ' নামে আরও একটি পত্রিকা প্রকাশ করতেন। দুটি পত্রিকাতেই প্রখ্যাত কবি সাহিত্যিকদের কবিতা,প্রবন্ধ ও পুস্তক পর্যালোচনা প্রকাশিত হতো। প্রয়োজনীয় অর্থাভাবে অর্কেস্ট্রার প্রকাশ ও প্রায় নিভু নিভু সেসময়।
                                         ততদিনে কবি বাসুদেব দেব আরও কাছে টেনে নিলেন অর্কেস্ট্রার তিন সম্পাদক অর্থাৎ সুব্রত, বলরাম, দীপককে।আমাদেরকে বিস্মিত করে তাঁর সম্পাদিত কালপ্রতিমা ছাপার দেখভাল করার দায়িত্ব দিলেন আমাদের ওপর।পন্ডিত মহেন্দ্রনাথ তত্ত্বনিধির বংশধর জগদীশ হালদারের শক্তি প্রেস-এ ছাপার ব্যবস্থা হলো।শক্তি প্রেসের কর্ণধার জগদীশদার বানান জ্ঞান এবং রুচিশীল কাজ আমাদেরকে যেমন সুবিধা করে দিল, তেমনই বাসুদেবদার স্নেহ ভালোবাসা বিশ্বাস অনেক বেশি বর্ষিত হতে লাগল আমাদের মাথায়।বাসুদেবদা যতদিন ডায়মন্ড হারবারে ছিলেন ততদিন ডায়মন্ড হারবারে সাহিত্য চর্চার বিশেষ করে সাহিত্য বিষয়ক অনুষ্ঠান ও আলোচনার জোয়ার এসেছিল বলা যায়।তাঁর সান্নিধ্যে যাওয়ার অবাধ ছাড়পত্র দিয়েছিলেন তিনি। বলেছিলেন, প্রত্যেক রবিবার সকালে আসবে আমার কাছে। অবশ্যই সাতদিনে সাতটি কবিতা লিখে আনতে হবে।এলে চা পাবে, বিস্কিট পাবে, বাড়িতে থাকলে মিষ্টিও পেতে পারো,কিন্তু কবিতা ভালো না হ'লে, খারাপ হ'লে চড়- চাপড় পাবে। রবিবার সকাল হলেই আমরা হাজির হতাম বাসুদেবদার কাছে।শুনতেন আমাদের কবিতা,শোনাতেন নিজের লেখা টাটকা কবিতা। প্রতিবেশী সাহিত্য, বিদেশী সাহিত্য ও কবিতা নিয়ে আলোচনা করতেন। এছাড়াও প্রায় প্রত্যেকদিন সন্ধ্যায়ও তাঁর কাছে বসত সাহিত্য পাঠ ও আলোচনার আসর। বৌদি অকাতরে যোগান দিতেন চা স্ন্যাকস্। দীপক, বলরাম, সুব্রত ছাড়া সেখানে উপস্থিত থাকতেন সাহিত্য তথা কবিতাপ্রেমী ডাক্তার অরুণ বসু,আবৃত্তি শিল্পী অনিল দত্ত, অধ্যাপক সুনীলরঞ্জন বশিষ্ঠ, সঙ্গীতশিল্পী ডাক্তার অরবিন্দ দাশ প্রমুখ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।কোনও কোনও দিন কাকদ্বীপ থেকে আসতেন কবি সামসুল হক,কবি তপন বন্দ্যোপাধ্যায়, ( তপন বন্দ্যোপাধ্যায় তখন কাকদ্বীপের ব্লক উন্নয়ন আধিকারিক) আসতেন কবি মানস রায়চৌধুরী,ধ্রুপদী পত্রিকার সম্পাদক কবি  সুশীল রায়,গল্পকার প্রভাত দেবসরকার প্রমুখ বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বগণ।কোনোদিন আসতেন সাহিত্যিক ঝড়েশ্বর চট্টোপাধ্যায় এবং অমিতাভ দত্ত। বেশ জমজমাট আলোচনা হতো সেসময়।
            কখনও কখনও  সকাল বেলাতেই  মেদিনীপুর থেকে আসতেন বররুচি পত্রিকার সম্পাদক  কবি মদনমোহন বৈতালিক এবং কবি শ্যামলকান্তি দাশ।আসতেন কবি রতনতনু ঘাটি,কবি শোভন মহাপাত্র প্রমুখ কবিগণ।আসতেন জলাভূমি পত্রিকার সম্পাদক পূর্ণচন্দ্র মুনিয়ান।কাকদ্বীপ থেকে পূর্ণেন্দু ভরদ্বাজ ও আসতেন। কবি বাসুদেব দেব- এর উপস্থিতি ডায়মন্ড হারবারকে একটা সাহিত্য সংস্কৃতির পীঠস্থানে পরিনত করেছিল।
                      নেহরু যুব কেন্দ্রের উদ্যোগে এবং কবি বাসুদেব দেব এর সপ্রযত্ন সহযোগিতায় ডায়মন্ড হারবারে আয়োজিত হলো জেলা যুব উৎসব। তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী উদ্বোধন করেছিলেন উৎসব।ওই উপলক্ষ্যে অনুষ্ঠিত হলো বড়ো মাপের এক কবি সম্মেলন। অনুষ্ঠানে  ডায়মন্ড হারবারের কবিগণসহ কলকাতা থেকে প্রতিষ্ঠিত কবিগণ , আশেপাশের সাহিত্যসেবীগণ,কাকদ্বীপ থেকে আগত কবিগণের যোগদানে বেশ উল্লেখযোগ্য এক সমাবেশ ও অনুষ্ঠান হয়েছিল ।            
          ঊনিশ শ ছিয়াত্তর সালের আটাশে মার্চ দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলা সংস্কৃতি পরিষদের উদ্যোগে এবং নেহরু যুব কেন্দ্রের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় ও বাসুদেবদার আন্তরিক প্রচেষ্টায় জয়নগরের রূপ ও অরূপ মঞ্চে এক কবি সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির আসন অলঙ্কৃত করেন রবীন্দ্র পুরস্কার প্রাপ্ত প্রখ্যাত লোকসংস্কৃতি গবেষক গোপেন্দ্রকৃষ্ণ বসু।অনুষ্ঠানে উদ্বোধন সঙ্গীত পরিবেশন করেন আধুনিক কবিতার গীতিকার অজিত পান্ডে। ওই অনুষ্ঠান চলাকালীন সংবাদ আসে চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব ঋত্বিক ঘটক প্রয়াত হয়েছেন। ওখানে বসে বসেই কবি বাসুদেব দেব ঋত্বিক ঘটক স্মরণে একটি কবিতা রচনা করেন। যার প্রথম লাইন ছিল এরকম------ 'একখন্ড মেঘ এসে ঢেকে দিল ঋত্বিকের মুখ  '।কবিতাটি নিয়ে শিল্পী অজিত পান্ডে 
সঙ্গে সঙ্গে সুরারোপ করে সঙ্গীতটি অনুষ্ঠানে পরিবেশন করেন। অনুষ্ঠানে কবিতা পাঠে অংশগ্রহণ করেন কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়,মানস রায়চৌধুরী,অমিতাভ দাশগুপ্ত, বাসুদেব দেব, মলয়শংকর দাশগুপ্ত, সামসুল হক,তপন বন্দ্যোপাধ্যায়,দীপক হালদার, নিখিল চন্দ, কে এম শহীদুল্লাহ প্রমুখ কবিগণ।
                                 নেহরু যুব কেন্দ্র ও কবি বাসুদেব দেব এর সহযোগিতায় ডায়মন্ড হারবারে আয়োজিত হলো আরও একটি উল্লেখযোগ্য কবি সম্মেলন। প্রেক্ষাগৃহ ডায়মন্ড টকীজ ভাড়া করে সারা রাতের কবি সম্মেলন। উপরোক্ত কবিগণের মুখ্য অংশের উপস্থিতি ঘটেছিল উক্ত অনুষ্ঠানে। ওঁরা ছাড়া এসেছিলেন কবি সুশীল রায়, গল্পকার প্রভাত দেবসরকার, কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়, কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়,অজিত পান্ডে,অমিতাভ দাশগুপ্ত,কবি সামসুল হক,কবি দেবী রায়, সময়ানুগ ও দর্শক পত্রিকার সম্পাদক এবং বিশ্বজ্ঞান প্রকাশনীর কর্ণধার দেবকুমার  বসু,কবি উত্তম দাশ, কবি শ্যামলকান্তি দাশ, কবি ওয়াজেদ আলি, কবি ইন্দ্রনীল দাশ প্রমুখ কবিগণ। অংশগ্রহণ করেছিলেন ডায়মন্ড হারবারের কবি ও সাহিত্যিকগণ।
                  ওইসব অনুষ্ঠান ও ঘটনাপ্রবাহ ডায়মন্ড হারবারের সাহিত্য চর্চায় সবিশেষ উদ্দীপনার সৃষ্টি করেছিল। 
                        যুগান্তর ও অমৃত বাজার পত্রিকার সাংবাদিক অনল মন্ডলের সম্পাদনায় একসময় প্রকাশিত হলো পাক্ষিক সংবাদপত্র 'নতুন পথ '।অর্কেস্ট্রার স্বর তখন অস্তমিত।নবোদ্যমে এগিয়ে চলেছে বাসুদেবদার কালপ্রতিমা।পঁচিশে বৈশাখ ও শারদীয় উৎসব উপলক্ষে প্রকাশিত হচ্ছে কালপ্রতিমার মেদবহুল বিশেষ সংখ্যা। ধারে ও ভারে আদৃত হচ্ছে  উৎসুক ও রসিক মানুষজনের  কাছে। একদিন হঠাৎ জানা গেল গল্পকার সত্যেশ্বর চট্টোপাধ্যায় জয় করেছেন শরৎচন্দ্র স্মৃতি পুরস্কার।মাথা খোলা গাড়িতে সত্যেশ্বর চট্টোপাধ্যায়কে প্রায় বরবেশে সুসজ্জিত করে নিয়ে যাওয়া হলো পুরস্কার প্রদান স্থলে। দেবানন্দপুরে  শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বাসভবনে এই পুরস্কার প্রদান করা হয়।ডায়মন্ড হারবারবাসী হিসেবে গর্বে বুক ভরে গেল আমাদের। তাঁর সহোদর ঝড়েশ্বর চট্টোপাধ্যায় ও নিজেকে সবার সামনে তুলে ধরছেন সমান উদ্যমে। ঝড়েশ্বর পেলেন প্রতিশ্রুতি পুরস্কার। সাহিত্য চর্চায় ডায়মন্ড হারবার তখন ফুটছে টগবগ করে। গল্প লিখছেন অমিতাভ দত্ত। ঝড়েশ্বর এবং অমিতাভর গল্প প্রকাশিত হচ্ছে দেশ, আনন্দ বাজারসহ কলকাতার বহু নামিদামি প্রতিষ্ঠিত পত্র- পত্রিকায়।দীপক হালদারের কবিতা দেখা যেতে লাগল এক্ষণ, অমৃত,প্রতিক্ষণ, বারোমাস প্রভৃতি পত্র- পত্রিকায়।
প্রকাশিত হলো বলরাম বাহাদুরের কাব্যগ্রন্থ ' বেঁচে আছি '।রফিক উল ইসলাম ততদিনে কবি হিসেবে পরিচিত ও প্রতিষ্ঠিত। কলকাতার কাগজে তাঁর কবিতা প্রকাশিত হচ্ছে তখন নিয়মিত। প্রকাশিত হলো তাঁর কাব্যগ্রন্থ 'জলের মত সুখে আছি '।তাজিমুর রহমান , অরূপ দত্ত,রিয়াদ হায়দার  নামের তিন তরুণ কবির সাক্ষাৎ পাওয়া গেল প্রায় এসময়েই।প্রকাশিত হলো অমিতাভ দত্তর গল্পগ্রন্থ  'অসুখে অনসুখে '।যদিও ঝড়েশ্বর তখন লিখে চলেছেন পুরোদস্তুর। বহু গ্রন্থ প্রকাশিত তাঁর। সহিস,স্বজনভূমি,নতুন মেম,পূবের মেঘ দক্ষিণের আকাশ ' ইত্যাদি গ্রন্থের জন্য তিনি বেশ উল্লেখযোগ্য গল্পকারও ঔপন্যাসিক  হিসেবে পরিচিতি অর্জন করেছেন। তাঁর গল্প ও উপন্যাস মনোরঞ্জন করছে রসিক হৃদয়। তারই স্বীকৃতি স্বরূপ তিনি পেলেন বঙ্কিমচন্দ্র স্মৃতি পুরস্কার, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা অকাদেমি থেকে। 
                         সমসময়ে আরও কয়েকটি নতুন মুখ দেখা দিল সাহিত্য চর্চা ক্ষেত্রে। গৌতম ব্রম্ভর্ষি,তপন ত্রিপাঠী,সুপ্রকাশ ঘোষ, অমলেন্দু বিকাশ দাশ,সাকিল আহমেদ ,নিখিল রঞ্জন হালদার প্রমুখ ধীরে ধীরে প্রকাশিত হচ্ছেন সাহিত্য অঙ্গনে।
                      কবিতা, গল্প- উপন্যাস নিয়ে চর্চা চললেও সাহিত্যের অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা প্রবন্ধসাহিত্য নিয়ে চর্চার তেমন কোনও অগ্রগতি দেখা যাচ্ছিল না। অতীতে তাকালে দেখতে পাই ওই শাখাকে সমৃদ্ধ করতে সচেষ্ট হয়েছিলেন ডক্টর শিবপ্রসাদ হালদার, ডক্টর দুলাল চৌধুরী,অধ্যাপক গোপাল বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বগণ। পরবর্তীকালে ডাক্তার অরুণ বসু,বিভুপ্রসাদ বসু,শিশির দাস প্রমুখ ব্যক্তিত্বগণ। 
               বিভুপ্রসাদ বসু এবং শিশির দাস- এর নাম সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রে আলাদা করে সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। বিভুপ্রসাদ বসু কবি হিসেবে যেমন প্রতিষ্ঠিত ছিলেন তেমনই বসুধারা নামে একটি সুন্দর ও সম্মানজনক সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনা করতেন। বিখ্যাত লেখকদের লেখায় ভরা থাকত বসুধারার অন্দর মহল।শিশির দাস সর্বোতভাবে আর এক সাহিত্যের সাধক।তাঁর রচিত 'আগুনের শাখা প্রশাখা ', 'ত্রিশূল ',ছাড়াও কাকদ্বীপের তেভাগা আন্দোলন নিয়ে রচিত উপন্যাস 'শৃঙ্খলিত মৃত্তিকা 'বাংলা সাহিত্যে উল্লেখযোগ্য সংযোজন। ওসব ছাড়াও ইসলাম ধর্ম নিয়ে তাঁর গবেষণাধর্মী গ্রন্থ  ' প্রিয়তম নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম  'উল্লেখযোগ্য কীর্তি সাক্ষ্য বহন করে।এছাড়া বুদ্ধদেব এর জীবন ও দর্শন নিয়ে রচনা করেছেন গ্রন্থ। শ্রেষ্ঠ মানুষ তৈরির লক্ষে রচনা করেন জগন্নিবাস।বেশ কয়েকটি কাব্যগ্রন্থও রচনা করেছেন তিনি।তাঁর একাগ্রতা, নিষ্ঠা,পান্ডিত্য শ্রদ্ধা এবং সমীহ সঞ্চারক।ডক্টর গৌরাঙ্গ চক্রবর্তী রচনা করলেন  'কাকদ্বীপে তেভাগার লড়াই 'নামে এক নিরপেক্ষ, প্রামাণ্য ও গবেষণামূলক গ্রন্থ। 


ছবি: বিধান দেব

ধারাবাহিক গদ্য ।। অভিজিৎ দাশগুপ্ত

 


সা ধ ন প র্বে র  নি র্জ ন তা


৭.

ধৈর্য
একটা কালো ছাতার নীচে আমরা বসে আছি
স্ত্রীকে বলছি ঝড় এলে বিচলিত না হতে
ছেলেকে বলছি বৃষ্টি এলে ছাতার নিচে গুটিসুটি     
                                                  বসে থাকতে
এক শীতকালের রাত্তিরে ফুলে উঠছে মেঘ, 
                                            বিপদআপদ
একটা কালো ছাতার  নীচে
বেপরোয়া  ধৈর্য  নিয়ে বসে আছি

জীবন কবিকে যা দেয় , কবিও  তাই ফিরিয়ে দেন জীবনকে । এই বোধ থেকেই দেবদাস আচার্য বলেন, ' এর বেশি শিল্প আমি পারি না , এর বেশি অঙ্গীকার আমি করিনি । '

' ধৈর্য '  কবিতাটি পড়ার পর একটা ছবি চোখের সামনে বড় বেশি ফুটে উঠতে থাকে ।  বাংলাদেশ থেকে চলে আসা উদ্বাস্তু পরিবার আর তাদের শূন্য দৃষ্টি । বাংলাদেশের বিরাট পরিবার থেকে উদ্বাস্তু হয়ে এদেশে আসেন তাঁরা । সেই নিঃস্ব জীবনের প্রত্যক্ষদর্শী সে। তাঁদের বেঁচে থাকার লড়াই , তাঁর কবি হয়ে ওঠার পথ---- সব যেন সময়- চিহ্নিত । মনে পড়ে ,  আমার বাবা-জ্যাঠার  কথা।  কীভাবে  দুর্ভিক্ষ আর দেশভাগের যন্ত্রণাকে তাঁরা একপ্রকার চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করে গেছেন  পরদেশে।  ধীরে ধীরে ,  ধীরে ধীরে এই দেশ তার স্বজন হয়েছে ,  আশ্বস্ত  হয়েছেন জীবনের সম্বলটুকু পেয়ে। অর্থনৈতিক পুনর্বাসন , শিক্ষা আর আশ্রয় ---- এই ছিল তাদের সামান্য চাহিদা।

কবিতায়  ধরা পড়েছে সেই স্মৃতি ও ভবিষ্যতের কথা। ' কালো ছাতা ' যেমন আশ্রয়ের প্রতীক , আবার তার রঙে রয়েছে এক ধরনের বিষাদ । সেই ছাতাকেই যা হোক  আশ্রয় করে নিয়েছেন কবি। স্ত্রী-পুত্র নিয়ে  এ  কি তাহলে তাঁবু জীবন ।  যে জীবন রানাঘাট নৈহাটি খড়দহ রাজারহাট যাদবপুর চকপাড়ায় গড়ে উঠেছিল ।

নাকি অতীতের নিশ্চয়তার কথা মনে পড়ে এমনটা বলেছেন । যে কারণেই ' রাত্তিরে ফুলে উঠছে মেঘ ' বলে ' বিপদআপদ ' শব্দটি জুড়ে দিয়েছেন  কবি। কারণ ,  নিশ্চিন্ত ঐ জীবন  তো  শীত ঋতুর  মতোই শান্ত নরম ছিল  ।  ছিল পারস্পরিক সৌহার্দ্যের। কিন্তু সেই ঋতুতেও প্রকৃতি  অসহিষ্ণু হয়ে ওঠে ।  তার উথালপাথাল শতশত পরিবারকে  ছিন্নমূলে পরিণত  করে  ।  হাহাকার আর যন্ত্রণায় ডুবে  যায়  স্বাধীনতার আনন্দ ।  চারদিকে আলোর রোশনাই-এর  মধ্যে এক টুকরো কালো  ছাতার মতো  সারি  দেওয়া অস্থায়ী তাঁবু ।  সব হারানো মানুষগুলো  শুধু জানে একটি শব্দের অর্থ ---- ধৈর্য ।

বেপরোয়া ধৈর্য নিয়ে  বসে থাকতে হয় সব হারানো  মানুষগুলোকে ।  মরে যাওয়া মানে তো জীবন থেকে হারিয়ে যাওয়া । পরাজয়ের গ্লানি স্মরণযোগ্য নয়। বরং ওই  ধৈর্যের পরীক্ষা দিতে দিতে ...

সারদা মা বলেছিলেন ,  যে সয় সে রয় । সত্যি , আমরা তো রয়ে গেলাম । এবং এই থাকা নিত্য  দিনযাপনের  কিছু বেশি ।  সত্তার ক্রমোন্নতি।


৮.

এই আমি চাই
রামগিরি পাহাড়ের যক্ষ নয়---- আমি
যেন সিংভূমের কৃষকের চোখে দেখি মেঘ ,
কোন বার্তা নয় ,শুধু আর্তকণ্ঠে বলি জল দাও ,
আমার কবিতা হয় যে সময়ে
সবুজ ধানেতে জমে  দুধ
লক আউট প্রত্যাহারে আবার মেশিন হয় চালু
আবারো কলের ঘোরে চাকা
কুটির শিল্পে যদি লাভ হয় দুই পাঁচ টাকা ,তবে
তাহলেই গান গাইবো সকলের সুখের নবান্নে
উৎপন্ন দ্রব্যের বেচাকেনা  রবি শস্যে ধান্যে,এই ---
অথচ কি যে হয়, মাঝে মাঝে ঘুলিয়ে ওঠে হাওয়া   ঘুঘু কালোবাজারীরা বানচাল করে দেয় দরদাম খাবারে মিশোয় ভেজাল , এমন কি ওষুধেও
নিকটবর্তী ল্যাম্পপোস্টে ঝোলে বন্ধের নোটিশ
জমে ওঠে বিশাল জনতা ঠিক মে মাসেই।

মে-দিনের সেই বিশাল মিছিলে শামিল আমি
ওড়াতে চেয়েছি শার্ট নয় ---- আমার রক্তমাখা আত্ম।

কালিদাসের সময় আমরা পার হয়ে  এসেছি। 'মেঘদূত ' - এর যক্ষ অত্যধিক পত্নীপ্রেমের কারণে নিজের কর্তব্যকর্মে অবহেলা করে।  ফলস্বরূপ তাকে সমস্ত ক্ষমতা শূন্য  পত্নীবিরহিত জীবন কাটাতে হয় রামগিরির  আশ্রমে  । অভিশপ্ত যক্ষের বিরহবেদনা শ্রাবণ মেঘের সাহায্য নেয়। নিজের কুশল বার্তা প্রেরণ করে প্রিয়াকে । সেখানে জলধর প্রেমের ইচ্ছাপূরণের সঙ্গী। কিন্তু এই কবিতায় তুষার রায় ভাবনাটাকে সম্পূর্ণ  ওলট - পালট করে দিয়েছেন। সিংভূমের  কৃষকের চোখ দিয়ে তিনি দেখাতে চান তার অভীষ্টকে। যে লক্ষ্য অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা মানুষের সঙ্গ দাবি করে।

মে দিবসের ভাবনা এই লেখাটির গঠনকে তৈরি করেছে । কোনও  রকম ফ্যান্টাসির জগতে তিনি বিচরণ করতে চান না ।  লক আউট , কুটির শিল্পের খরা, অনাবৃষ্টি , কালোবাজারির দৌরাত্ম্য ----  এসব দেখে দেখে ভয়ে শঙ্কায় রাগে  তার কলম অগ্নিবর্ষী হয়ে ওঠে ।  এর প্রতিকার চাই ।  চাই  নতুন এক সমাজ বিপ্লবের ।  তাই মে মাস  অথবা  দিবসটি  ব্যঞ্জনাধর্মী এখানে।

কবিতাটি পড়তে পড়তে অনেকগুলো কথা মনে  ভিড় করে আসে । তাদের নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে অবশ্যই ।  তা না হলে হলে এমনভাবে বারে বারে  অস্তিত্বের জানান দেবে কেন !  আপসকামী রাজনীতি একদিন  নিজেকেই গিলে ফেলে ।  সে তার শক্তি পরীক্ষা করতে করতে নিজের ভেতরে প্রবৃষ্ট  হয় এবং রহস্যকাহিনীর মত সত্যকে ছদ্ম- আড়ালের মধ্যে রেখে মানুষকে ' অন্য ' কথা বলে । আসলে আমরা তো এখনো বণিকশাসনে বদ্ধ  ।তাকে ছিন্ন করে নতুন এক সমাজ তৈরি করব , এমন ' ইউটোপিয়া ' শুধু দেখাই হয় , কাজে-কর্মে কখনো নয় । তাই বামপন্থী দলগুলির ' ঐতিহাসিক ভুল '-এর সংখ্যা বাড়তে থাকে ।  বাড়তে বাড়তে সে সমস্ত ধরা ছোঁয়ার বাইরে চলে যায় ।

হঠাৎ কেন জানি জয়দেব বসুর ' মেঘদূত '-এর কয়েকটি ভাবনা মনে এলো ----
"এগোও  এগোও  মেঘ, শুধু এ চূড়া নয়,
                         সারাটা  দেশ জুড়ে বালুকাতাপ   শহরে - গঞ্জে সেই শিশিরসিক্ততা  কবেই  অপহত,   
                                                        কুহকরাত
জমাট - অন্ধ - মূক  মূর্ত হয়ে ওঠে যত্নে কুঁদে তোলা   
                                                         শবের চোখ
তন্বী ডোমনী তার গভীর কামরূপে লাস্যে খুলে দেয়
                                                        বিপণীদ্বার "
                                                       ।। ৩ ।।

এ যেন সেই ভয় ধরানো সময় । যে সময়ে  সবকিছু কালো এবং বিষাক্ত ।  সৃষ্টিকর্তা  তাঁর সৃজনের  মাঝে যেটুকু সুযোগ  আমাদের জন্য রেখেছিলেন , তা-ও আমরা আত্মমুগ্ধতায় বশবর্তী হয়ে নষ্ট করেছি। নিজস্ব বলয় থেকে বেরিয়ে আসিনি কেউ-ই । একদল আসেনি ভয়ে । আর অন্য দল স্বার্থচিন্তায়।ফলে দুয়ে দুয়ে বাইশ  হয়ে দাঁড়িয়েছে ।  আজ আর শ্রেণি সংগ্রামের ডাকে সমাজতন্ত্রের স্বপ্নে কেউ লাল পতাকা হাতে তুলে নিতে চায় না । ' রক্তমাখা আত্মা ' এখন  শুধুই  নৃশংসতার  কথা  বলে ।

সমাজ পাল্টে দেওয়ার স্বপ্ন একদিন দেখেছিল বামপন্থা অবলম্বনকারীরা । সেই পথকে  বিস্তৃত করার জন্য আরও  নিষ্ঠা আরো  ধৈর্য আরো সময় মেপে  কাজ করা উচিত ছিল তাদের ।  মানুষের মন পরিবর্তনশীল । বিশেষত ভারতবর্ষের মতো আধা গরিব আধা  ধনীর দেশে । এখানে সব  দলই সমাজতান্ত্রিক আদর্শকে মান্যতা দিয়েছে । একই সঙ্গে বাজার অর্থনীতিও চালু করে  বিশ্বের সঙ্গে নিজের পদচারণাকে এক করে নিয়েছে । ফলে ভোটের ময়দানে জয়জয়কার  ।  আর পতাকা হাতে শতাব্দীপ্রাচীন দু-চারটি মানুষ এখনো  ' পাল্টে দেবার ' স্বপ্ন দেখে পুরনো ভুলকে না শোধরানোর প্রতিজ্ঞা নিয়ে।

এ যেন আলোর কুয়াশা । আলো আছে , অথচ কুয়াশার জন্য কিছুই দেখা যাচ্ছে না ।  বোধের জায়গায় বুদ্ধির জায়গায় ওই কুয়াশা  জমাট বেঁধে আছে ।  যা বিপ্লবের আলোকেও ঢেকে ফেলে গাঢ় অভিমানে।
      
ছবি : বিধান দেব




 

ধারাবাহিক গদ্য ।। অরিন্দম রায়


 ভি ন দে শি  তা রা


রেজি ক্যাবিকো 


তিনি মনে করেন তাঁর কবি হওয়াটা নেহাতই একটা দুর্ঘটনা । তিনি মনে করেন যদি কেউ না জানে কিভাবে লিখতে হয় তাহলে সেই ব্যক্তির উচিত কবিতা লেখা। যে কথা নিজের মাকে বলা যায় না , বাবাকে বলা যায় না , কাউকেই বলা যায় না সেইসব কথাগুলো অনায়াসে বলে ফেলা যায় কবিতার মধ্যে দিয়ে। রক্ষণশীল ফিলিপিনো আমেরিকান- পরিবারে জন্ম এই কবির। নিজের সমকামী পরিচয় কোনোদিন লুকোতে চান নি।  বরং তিনি একজন ঘোষিত এবং গর্বিত সমকামী। যদিও তাঁর এই সত্তার জন্য আফ্রিকান-আমেরিকান গোষ্ঠীর মধ্যে জায়গা করে নিতে , মিলেমিশে যেতে তাঁকে রীতিমতো সংগ্রাম করতে হয়েছে । কারণ , ‘সমকাম’ ব্যাপারটা খুব একটা ‘স্বাভাবিক’ চোখে দেখা হত না তাঁর সমাজে , অন্যান্য সমাজের মতোই। কবিতা কখনই তাঁর প্রথম এবং একমাত্র গন্তব্য ছিল না। নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটি থেকে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে নিজেকে প্রকাশ করার মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন থিয়েটারকে। কিন্তু সফল হলেন না । মরিয়া হয়ে চেষ্টা করলেন স্ট্যান্ড আপ কমেডিয়ান হওয়ার  সেখানেও ব্যর্থতা পিছু ছাড়ল না তাঁর। হঠাৎ করেই একদিন অংশ নিলেন পোয়েট্রি স্ল্যামে ---- যেখানে কবি একজন পারফর্মার , দর্শক তথা শ্রোতাই সেখানে বিচারকের ভূমিকায়। এই কবি আবির্ভাবেই জয় করলেন শ্রোতাদের হৃদয় । তারপর তিরিশটির বেশি সংকলনে জায়গা করে নিয়েছে তাঁর কবিতা। তিনি পারফর্ম করেছেন এইচ.বি.ও -র মতো বিখ্যাত চ্যানেলে। তিনি রেজি ক্যাবিকো। তাঁর কবিতায় তিনি বলেন জাতিগত বৈষম্য আর হোমোফোবিয়ার কথা, যা আসলে তাঁর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাসঞ্জাত।  


গোধূলিবেলার গল্পগুলি

কবিতা 

আমি আমার কবিতাকে একটা গবেষণাগারে নিয়ে গেলাম। কবিতাটার গন্ধ চন্দ্রমল্লিকার মতো। গ্যাস-মুখোশ পরা ডাক্তারদের একটি দল আমাকে বলল কবিতা হল সমাধান আছে এমন এক সমীকরণ। শেষ পঙক্তিটি জীবন বাঁচাতে পারবে না। তারা আমার কবিতাটাকে একটা বিকারে রাখল। তাদের উচিত ছিল কবিতাটাকে একটা পোর্সেলিনের পাত্রে রাখা।


চ্যাপস্টিক

আমি আমার শোওয়ার ঘরে সবকটা কোটের পকেটে হন্নে হয়ে চ্যাপস্টিক খুঁজছিলাম। আমি শুনতে পাচ্ছিলাম পার্টি আমার দিকে উর্ধশ্বাসে দৌড়ে আসছে। আমি আমার কোটগুলোর নিচে লুকিয়ে ছিলাম , একটা গুহার ভিতরে পড়ে গিয়ে আমি শুনতে পাচ্ছিলাম উঙ্গা বুঙ্গা কিচিরমিচির। সেই শব্দগুলো ছিল নিয়ান্ডারথালসদের যারা একমত হচ্ছিল যে আমার একজোড়া সেক্সি পাতলা ঠোঁট আছে। 


পিটার প্যান বাস সার্ভিস 

টিভিতে ফ্রি উইলি  চলছিল আর ষাট পাউন্ডের একটা বাচ্চা আমার কাঁধ চিবুচ্ছিল। অন্য যাত্রীরা কাশির ওষুধ বিলি করছিল। বাচ্চাটার মা ড্রাইভারকে বললেন যে তিনি তিমিদের ভালোবাসেন এবং এটি তার প্রিয় সিনেমা। যখন আমার ঘুম ভাঙল তখন বাচ্চাটা আর নেই আর আমার কোলের উপর একব্যাগ বই। 


চুল 

কুশীলবেরা নগ্ন দৃশ্যে অভিনয়ের সময় চামড়ার রঙের বডি-স্টকিং পরেন। একজন অভিনেতা তাঁর যৌনাঙ্গ অনাবৃত করে ব্যাখ্যা দিচ্ছিলেন যে তিনি আসলে দেখতে চাইছিলেন যে তাঁর পুরুষাঙ্গটি স্বাভাবিক আকারের কিনা। আমি লোকটিকে ধাওয়া করে করিডরের দিকে নিয়ে গেলাম। আমরা কেবলমাত্র অভিনয় করছিলাম। আমি তাকে বললাম। মনে করো আমি একটা পুষি বিড়াল যে তোমায় চাটতে চায়। 


আলফ্রেড হিচকক 

টিপ্পি হেড্রেন কোট রাখার তাক দিয়ে পিটিয়ে একটা হাতিকে মেরে ফেলেছিল। একজন গোয়েন্দা তার বাড়িতে এল। আমি অস্ত্রটা গিলে ফেললাম আর তদন্তকারীর কোটটা ধরে থাকলাম যখন তারা দুজনে কর্নিশ মুরগি সহযোগে নৈশভোজ সারছিল। আমি শাওয়ারের দিকে দৌড়লাম প্রাণীটি কেমন আছে দেখার জন্য। সে আমাকে ধন্যবাদ জানাল তাকে না খাওয়ার জন্য। 




স্ট্যানলি কুব্রিক

আলিয়া আমাকে তার নাম বাথরুমের আয়ানায় লিপস্টিক দিয়ে লিখতে বলেছিল। অক্ষরগুলি পড়ার সময় শোনাচ্ছিল অ্যালেলুইয়া। এখন তুমি পার্টির গোপন পাসওয়ার্ড জেনে গেলে। আমি পরে ছিলাম ভারতীয় পাগড়ি আর ভেনিসের সুক্ষ্ম খাটো কাপড়। একজন নগ্ন মহিলা আমার কাছে এলেন এবং আমায় বললেন এখনও অবধি তার দেখা সেরা পুরুষ বন্ধু আমিই।  







চ্যাপস্টিক – ঠোঁটে লাগাবার পেট্রোলিয়াম জেলি বিশেষ  


ধারাবাহিক গদ্য ।। চন্দন মিত্র

 


জন্মের আগের মুখ : জেন তত্ত্ব ও জেন গল্পের অমায়িক ভুবন


হুইনেং-এর আখ্যান অথবা এক অকুলীন নিরক্ষরের আত্মান্বেষণ 

                                                 

                                         দুই 

জন্মের আগের মুখ, তাও আবার বাবা-মায়ের যখন জন্ম হয়নি সেই সময়ের – হুইমিং এর আগে  কখনও   এমন হতচ্ছাড়া অথচ সত্তা-টলানো ধাঁধার সম্মুখীন হয়নি। সে আক্ষরিক অর্থে  হতভম্ব হয়ে অবোধ শিশুর মতো হুইনেং-এর পা ধরে পড়ে থাকে। কেবল হুইমেং ? আমরাও কি এই ধাঁধার সম্মুখীন হয়ে বিপন্ন বোধ করি না ? আমরাও কি জন্মের আগের মুখ সংক্রান্ত রহস্য উদঘাটনে উদগ্রীব হয়ে উঠি না ? এ এক এমন ধাঁধা যা আমাদের অনায়াসে অলীক কল্পনার গহীন অরণ্যে পৌঁছে দিয়ে এক খেই-হারানো জীবন উপহার দিতে পারে। বস্তুতপক্ষে আমাদের নাগালে থাকা তথাকথিত ধর্মজ্ঞগণ আমাদের সামনে এমন অলীককল্পনার সুস্বাদু গাজর ঝুলিয়ে স্বাভাবিক বোধবুদ্ধির ধারণাকে ধ্বস্ত করে। আমরা তাঁদের কথিত বাণী অস্বীকার করার মতো যুক্তি ও সাহসের অভাব বোধ করি। আমরা ভাবি জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত যে জীবৎকাল সেই সীমারেখার আগের ও পরের পথটুকু সম্পর্কে আমাদের জানতে হবে। আর এই পথের হদিশ রয়েছে বাক্যবাগীশ বাবাজি-মাতাজিদের অমোঘ ঝুলিতে। আমাদের এমন বিশ্বাসের কারণ, তথাকথিত ধর্মব্যাপারীদের ভান। তাঁরা এমন গদগদ ভাব নিয়ে এসব বিষয়ে ভাষ্য দেন যে মনে হয় হাতেগরম অভিজ্ঞতা বিতরণ করছেন। আহাম্মক আমরা ভেবেও দেখি না জন্মের আগের ও মৃত্যুর পরের অভিজ্ঞতা কারোর ভাঁড়ারে থাকা সম্ভব নয়। যারা বলেন এমন অভিজ্ঞতার মালিক বা মালকিন তাঁরা হয় মনোবিকারের শিকার অথবা চ্যালা-শিকারের টোপ ছড়াচ্ছেন। তাঁদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আমরা ভাবতে থাকি জন্মের আগে কেমন ছিলাম বা কোথায় ছিলাম  আর মৃত্যুর পরে কী হব বা কোথায় যাব এটা জানাই হল জীবনের লক্ষ্য । আর এই যে প্রতিদিনের সংগ্রামমুখর জীবন এটা নিছক মায়া! এভাবেই প্রাক-জন্ম ও মৃত্যুপরবর্তী জীবন সম্পর্কে ধারণালাভের আকুতিকে আধ্মাত্মিকতা ভেবে আমরা মূল্যবান মানব্জীবন অপচয় করি। আমাদের জীবনযাপনকে সুন্দর করে তোলার ক্ষেত্রে প্রকৃত আধ্যাত্মিকতাকে কাজে লাগাই না। অথচ যাবতীয় আপ্তবাক্যের ঠুলি খুলে জীবনের দিকে সটান তাকালে জন্ম-মৃত্যু নিয়ে চাপিয়ে দেওয়া ধাঁধা থেকে আমরা নিষ্কৃতি পেতে পারি। 

         হুইনেং ধর্মব্যাপারী হতে চায়নি , তাই চায়নি হুইমিংকে তার অন্ধ-অনুসারী বানাতে। সে চেয়েছিল হুইমিং  প্রথাগত ধারণা ও  সংস্কারের বাইরে বেরিয়ে জীবনকে বুঝে নিক; বুঝে নিক জন্মের আগে ও মৃত্যুর পরে অপার শূন্যতা ছাড়া আর কিছু না-থাকার সত্যতাকে। তাই সে এমন ধাঁধার অবতারণা করেছে যা হুইমিং-এর বোধির স্থিতিশীলতাকে প্রবল জাড্য দিয়ে জাগরিত করতে পারে। হুইমেংএর এতদিনের অর্জিত প্রথাগত জ্ঞানের বেলুন থেকে সব হাওয়া বেরিয়ে গেছে। সে আজ এক নিরক্ষর দখনো ছেলের কাছে নতজানু। সে জানতে চায় জন্মের আগের মুখের আসল রহস্যের হদিস। হুইনেং তাকে হতাশ করে জানায় – নিজের ভিতরে খোঁজ করো, যেদিন প্রকৃত আলোকপ্রাপ্ত হবে সেদিন বুঝবে তোমার ভিতরেই সব  আছে, বাইরে কোথাও খোঁজার দরকার নেই। এযেন আমাদের বাউল-ফকিরদের কথা, যা আছে ব্রহ্মাণ্ডে  তা আছে দেহ ভাণ্ডে । আর এই কথার উপর ভিত্তি করে তাঁরা দেহের মধ্যেই জন্ম-মৃত্যু, স্বর্গ-নরক, মক্কা-মদিনা-কাবা-কাশী- বৃন্দাবন, ঈশ্বর-আল্লা-গড-খোদার খোঁজ করেন। ফলত তাঁরা প্রবলভাবে প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মসমূহের অলৌকিক অনুমানগুলিকে নস্যাৎ করার হিম্মত ও আলো ধারণ করেন। লালনের গানে পাই – 

মলে ঈশ্বরপ্রাপ্ত হয় কেন বলে ?

মলে হয় ঈশ্বরপ্রাপ্ত সাধু-অসাধু সমস্ত

তবে কেন এত জপতপ জলেস্থলে ?

যে পঞ্চে পঞ্চভূত হয় 

মলে তা যদি তাতে মিশায় 

তবে ঈশ্বর অংশ ঈশ্বরে যায় 

স্বর্গ-নরক কার মেলে ?  


লালন অনুমানসর্বস্ব ভাববাদকে নাকচ করে বর্তমানকে গভীরভাবে আঁকড়ে ধরেছেন। তাঁর সুযোগ্য  অনুসারী দুদ্দু শা সমস্ত ঐশীগ্রন্থকে মানবরচিত বলে ঘোষণা দিয়েছেন। তাঁর যুক্তিটা দেখে নেওয়া যাক –


এক দেশে এক এক বাণী কোন খোদা পাঠায় ?

যদি একই খোদার হয় বর্ণনা 

তাতে তো ভিন্ন থাকে না

মানুষের সকল রচনা তাই তো ভিন্ন হয়। 


আমরা পুথি-পোড়ো বিশ্বাসীরা এইসব যুক্তির কাছে অসহায় বোধ করি , কিন্তু হার স্ব্বীকার করার গ্লানি ঢাকতে বেদ-বাইবেল-কোরান-পুরাণ-স্মৃতি থেকে গনগনে পবিত্র শ্লোক-আয়াত উদগীরণ করি। আসলে শূন্যের সঙ্গে যতই চোখধাঁধানো মনোহারী পবিত্রতাকে গুণ করি না কেন তা শূন্যতায় পর্যবসিত হতে বাধ্য। কিন্তু মোহ সহজে ঘোচার নয়। বরং মোহ মিথ্যা হিসাবে প্রমাণিত হওয়ার পর মোহান্ধরা অস্ত্রশস্ত্র শানাতে শুরু করে বিরুদ্ধবাদীদের নিকেশ করার জন্য। ইরানি সুফিসাধক ও কবি মনসুর হাল্লাজ ( ৮৫৮ – ৯২২ খ্রিস্টাব্দ )-এর কথা প্রসঙ্গত এসে পড়াই স্বাভাবিক। এই প্রবাদপুরুষ, খলিফা আল মুকতাদির   আমলে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হন। কী ছিল তাঁর অপরাধ ? তেমন কিছুই নয় তিনি বলেছিলেন –  আনাল হক  অর্থাৎ আমিই সত্য। সবাই যেখানে বলছে আল্লা সত্য ঈশ্বর সত্য আর তুমি কিনা বলছ তুমিই সত্য! তুমি একটা তুচ্ছ মানুষ, তুমি আবার সত্য হলে কীভাবে ? তুমি তো চরম মিথ্যা ? তুমি সেই পরমকে চরম  সত্য ভেবে ভিতরে ভিতরে গরম হয়ে উঠবে আর তাঁর নামে উষ্ণ স্লোগান দেবে তা না-করে তুমি কিনা!ছি ! কুলাঙ্গার কোথাকার ! সেই ট্র্যাডিশন এখনও চলছে। যে যুক্তিতে শান দিতে অপারগ সে তো অস্ত্রেই শান দেবে!   

             প্রচলিত আপ্তবাক্যের উপর আস্থা না-রেখে এই স্বরূপসন্ধান বা আত্মজ্ঞানের পথে পদচারণা আমাদের সভ্যতাকে আলোকিত ভবিতব্যের দিকে এগিয়ে দিয়েছে। আমরা বিবিধ মাথাভারী সংস্কারের  বোঝা নামিয়ে জীবন ও জগতের দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকাতে শিখেছি। বুঝেছি উপরের দিকে তাকাতে হলে দূরবিনের ভিতর দিয়ে দেখা ভালো শাস্ত্রগ্রন্থের চশমা পরে নয়। বুঝেছি জীবন ও মৃত্যুর মতো জাগতিক সহজ বিষয়কে অযথা কল্পনার মিশেলে যে অপার্থিব মহিমা দান করা হয়েছে তা নিছক কাহিনি হিসাবে চিত্তাকর্ষক হলেও সত্য ভেবে জীবনের অংশ করে নিতে গেলে ঠকে যাওয়াই স্বাভাবিক। যথার্থ গুরু তিনি যিনি নিজে ঠকেন না অন্যকেও ঠকান না। হুইনেং তেমন একজন। সে নিরক্ষর কাঠুরে, কৌলীন্যের  ছিটেফোঁটা তার মধ্যে নেই। কিন্তু তার আছে আত্মদীপ প্রজ্বলনের সুতীব্র আকুতি যা তাকে জীবনভর ছুটিয়ে নিয়ে গেছে থামতে দেয়নি। সে হুইমিংকেও চরৈবেতি মন্ত্রে দীক্ষিত করে দিয়েছে । বাইরে চলা ও  ভিতরে চলা দুই চলাতেই তাকে প্ররোচিত করেছে। কৃতার্থ হুইমিং জানায়, সে এতদিন ডংশান মঠে দিন  গুজরান করলেও কখনও নিজেকে নিয়ে ভাবেনি, ফলে জন্মের আগের মুখের কথাও তার অজানা ছিল। এখন হুইনেং-এর উপদেশে সে নিজেকে চেনার ব্রতে নিযুক্ত হতে পেরেছে। সে এমন লোকের সঙ্গে  নিজের তুলনা করেছে, যে জল পানের সময় বুঝতে পারে তা উষ্ণ, না শীতল। সুতরাং এমন আলোকদর্শী  একজনকে হুইমিং গুরু না-মেনে পারে! কিন্তু হুইনেং গুরুত্ব স্বীকার করল না। সে বলল, তুমি-আমি দুজনেই সতীর্থ, আমাদের দুজনেরই গুরু আচার্য হং-জেন । তবুও নাছোড়বান্দা হুইমিং – 

প্রভু! আমি এখন কী করব ? 

-উত্তরে চলতে শুরু কর। যখন নিজেকে খুব বড় মনে হবে থেমে যাবে; যখন নিজেকে খুব ছোটো মনে হবে থেমে যাবে। হুইমিং পাকদণ্ডীর বাঁকে হারিয়ে যায়। পরবর্তী কালে গুরুর প্রতি শ্রদ্ধায় নিজের নাম থেকে হুই অংশটি খণ্ডিত করে ‘দাও’ শব্দটি জুড়ে নেয়। দাওমিং নামে সে প্রসিদ্ধ হয়ে ওঠে। 

         হুইনেং এগিয়ে চলে প্রব্রজ্যায় । হাঁটতে হাঁটতে সে পৌঁছে যায় কাওকি নামক স্থানে। সেখানে ভিড়ে  যায় একটি নিষাদগোষ্ঠীতে।  নিষাদেরা স্বভাব-শিকারী, পশুপাখি বধ করেই তাদের জীবনযাত্রা নির্বাহ হয়।  হুইনেং বুদ্ধের অহিংসা নীতিতে আস্থাশীল। ফাঁদেপড়া পশুপাখি দেখলেই সে মুক্ত করে দেয়। রন্ধনশালার দায়িত্ব পেয়ে আমিষের বদলে নিরামিষ রান্না করে বিড়ম্বনা তৈরি করে। এক দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে হুইনেং তার আদর্শনিষ্ঠা দিয়ে গোষ্ঠীর মন জিতে নেয়। পনেরো বছরের নিরলস প্রচেষ্টায় সে নিষাদদের  পেশা থেকে তাদের বিচ্ছিন্ন করে কৃষিনির্ভর স্থায়ী জীবনে পৌঁছে দেয়। অতঃপর হুইনেং ভাবে তাকে এবার তো ধর্ম প্রচারে বেরোতে হবে। যেমন ভাবা তেমন কাজ । পনেরো বছরের সাহচর্যে আমূল পরিবর্তিত  নিষাদবন্ধুদের কাঁদিয়ে সে গুয়াংজৌ প্রদেশের বিখ্যাত ফাশিংশাই মঠের উদ্দ্যেশ্যে রওনা হয়।  

            হুইনেং মঠচত্বরে প্রবেশ করে দেখে দুই সন্ন্যাসীর মধ্যে তুমুল তর্ক চলছে। তাদের দুজনকে ঘিরে বাকি সন্ন্যাসীরা দুইভাগে ভাগ হয়ে পড়েছে। এক সন্ন্যাসী বলছে , পতাকাটি নড়ছে । আর প্রতিপক্ষ সন্ন্যাসী বলছে, না, হাওয়া নড়ছে ।  হুইনেং বুঝতে পারে মঠের উড়ন্ত নিশানটি নিয়ে তাদের মধ্যে গোল বেধেছে। হুইনেং তার আশ্চর্য শান্ত অথচ গভীর কণ্ঠে বলে ওঠে, থামো তোমরা। মুহূর্তে সবাই মন্ত্রমুগ্ধের মতো থেমে যায়। আগন্তুক তরুণকে তারা সমীহ দেখায়। হুইনেং বলে, না নিশান নড়ছে, না বাতাস নড়ছে; নড়ছে তোমাদের মন। মঠাধ্যক্ষ ইংজন এগিয়ে আসেন। তর্কের এই অপূর্ব নিষ্কৃতি শুনে তিনি বুঝতে পারেন এতদিনে তার প্রিয় এই মঠ একজন প্রকৃত আচার্য পেতে চলেছে। তিনি হুইনেংকে বক্তব্য-মঞ্চে নিয়ে যান। একটু আগেই তিনি নির্বাণতত্ত্ব সম্পর্কে বক্তব্য রাখছিলেন। তাঁর বক্তব্য চলাকালীন সময়ে তর্ক বাধায় সেই বক্তব্যে ছেদ পড়ে। অধ্যক্ষ হুইনেংকে বলেন, আপনাকে সাধারণ সন্ন্যাসী বলে মনে হচ্ছে না। বহুদিন আগে শুনেছিলাম পঞ্চম আচার্য হং-জেন, তাঁর চীবর ও ভাণ্ড কোনো সুযোগ্য ব্যক্তির হাতে  তুলে দিয়েছেন। আপনিই কি সেই ব্যক্তি? আপনিই কি ষষ্ঠ আচার্য ? হুইনেং মাথা নত করে স্বীকৃতি জ্ঞাপন করে।   


ছবি: বিধান দেব

                


কবিতা ।। দীপক হালদার

 



দোহার 


কুয়াশা ঘোমটা মোড়া নববধূ লোহিত শালুক 
সখীগণসহ করে প্রাতঃস্নান নিঝুম পুকুরে 
আনন্দ পুলকে খিলখিল জল 

পাড়ে সারসেরা একপায়ে স্থির 
যেন পাহারায় 

সকালিক কাজে 
খেজুরের গাছ থেকে নামায় রসের ভাঁড় 
শিউলিরা যত 

ইতস্তত প্রাতর্ভ্রমণে হয়তোবা কজন মানুষ 
হাঁটে পথ 
কেউ ঠিক দ্যাখেনা কাউকে 

সেসময় আস্তরণ সরাতে সরাতে টকটকে মুখে 
সূর্য এসে উঁকি দেয় চত্বরে চিবুকে 

মেখে তার অদম্য গরিমা 
সদ্যস্নাতা লোহিত শালুক বধূ ক্রমশ রঙিন 
পাপড়ি মেলে নিজেকে রাঙায় খুব 

ডুবে থাকা ওই দৃশ্যালোকে 
কাকে যেন দেখে অকস্মাৎ ঠোঁটের রেখায় বধূ 
ছিলার মতন টানে হাসির অমোঘ কথকতা 

দেখেশুনে সব 
দোহারে মেলায় গলা চোখফোটা  দিনের শৈশব

             

কবিতা ।। অরণ্য আপন

 



পঁচাত্তর


বুদ্ধিজীবি খুনিরা খুব ভয়ংকর হয় 
তাদের বুদ্ধি বড় গুলি 
তাদের একটা দুর্বল দিকও আছে 
তারা বেছে বেছে এমন লোকের মাথার খুলিতে গুলি করে
যারা দেশ নিয়ে চিন্তা করে
যদি বুলেটের গর্ত থেকে তাদের চিন্তা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে! 
তারা ভয় করে

সোমবার, ২৮ ডিসেম্বর, ২০২০

কবিতা ।। সন্দীপন দাস

 



ধ্রুপদ

    


জানলা গলে তোমার আঁচলে যে আকাশটুকু আসে,তা কি তোমার নিজস্ব?

আগুন ঠেলে যে জল তোমার পায়ের পাতা ভেজায়, সেটুকুও?

জল ঘুমোচ্ছে, নৌকা ঘুমাচ্ছে…কেবল শূন্যতা জেগে আছে

জেগে আছে নানান গন্তব্যের নানান পথ…

গাছ ঘুমোচ্ছে,গান ঘুমোচ্ছে…শুধু বাসি কিছু বেলফুল দেখছে …

দেখছে ধোঁয়া বেরোচ্ছে ওভারব্রিজের ওপরে

প্রাচীন দেবতার গা থেকে ধোঁয়া বেরোচ্ছে

শহর জাগছে না, নদী জাগছে না

জাগছে না ভালোবাসা…

ধোঁয়া ছড়াচ্ছে,ছড়িয়ে যাচ্ছে সাঁকো জুড়ে-

মাঠ জুড়ে, আঙুলগুলো ছুঁয়ে, গোপন ব্যথা ছাড়িয়ে…


এ মাঝরাতের অন্ধকার গলে তোমার মুখে যে আলোটুকু আসে…

ভিড় ঠেলে যে চোখ তোমার চশমার কাঁচ ভেজায়

তাও…







গুচ্ছ কবিতা ।। উৎপল মান

 




খনন


শব্দে বসানো বিষ তোমারই রচনা

আমি তার সংকেত চিনি

তুমিও জানো কতখানি

আগুন ও অভিপ্রেত দিয়েছে হানা

তবে কি প্রেম না, কেবলই নিঃসঙ্গতা

সবুজ পোশাক পরে

মৃদুভাষ ক্ষয় লেখে আত্মখননের

                   পাতা!


মেঘ


তোমার মেঘ এখান থেকে বেশি দূরে নয়

ইচ্ছে হলেই নেমে আসা যায়, ঝুঁকে যাওয়া

ইচ্ছে করলেই তুমি আমার বয়েসে একটা আবরণ

লাগিয়ে দিতে পার

আমি কি তেমন কিছুর অপেক্ষা করি? ওই শীর্ষ

মহল, ওই গাছের পাতার মতো রূপালি ছক, ঘরবাড়ি

আমার চেনা মনে হয় খুব- যেন এই কবেকার 

ছেলেবেলা, শৈশব, দলবাঁধা বন্ধুর পায়ে ধুলোর জুতো

তোমার মেঘ এখান থেকে খুব দূরে নয়

বিশেষত আজকের দিনে, যখন কুয়াশা আর মেঘ

ভালবাসা নামক সূক্ষ্ম এক পথের ওপর 

মোলায়েম ছড়িয়ে আছে, নরম, অবনত


শস্য 


তীক্ষ্ণ ফলার মতো ফুঁড়ে আছে কেউ

এগোতে দিচ্ছে না, পিছোতেও না


বসে বসে রক্ত দেখছি

নিজের 

এবং অন্যেরও একটু একটু


গোপনে গড়িয়ে যায়, ঠাণ্ডা লাগে

নিজেরই ঠোঁটে আঙুল ঠেকাই, চুপ


আমি যেমন তোমাকে বলছি না

তুমিও আমাকে না


এই একটি খেলা

এই একটি খেলা


দরজা যেমন বন্ধ আছে, থাক

নিজে নিজে ফেটে যাচ্ছ না, ব্র্যাভো


উর্বর বেদনা এই, বিষাদে

বীজ ফেলে রাখি, রাখো 

তুমিও


বসে বসে একদিন শস্য দেখব



সংঘাত 


কেবলই সংঘাত বাড়ির হাওয়ায়

ভেঙে যায় বিশ্বাস

অনতিদূরে আচমকা দাঁড়িয়ে থাকে কেউ

সে আমার আনন্দ নিয়ে যাবে

সে যা রেখে যাবে, তা-ই তো পৃথিবী

সুন্দর, মখমলি দুঃখের তুলোয় মোড়া

কথায় সাজানো কটু রাজনীতির মতো-

তবু আমি নিরাময় খুঁজি

দরজা খুলে তাকিয়ে দেখি পথ

বাঁক, সরলতা, জ্যোৎস্নার মায়া

ঘুমিয়ে থাকা সর্পিল আলোড়ন

যেন আমারই পৃথিবী, একবার ছুটতে

শুরু করলেই 

ভেঙে যাবে পথের সৌন্দর্য, মোহ 


চমৎকার


এই জীবন থেকে কবিতা নিতে নিতে

একদিন হারিয়ে যাবে ঘোড়া

ঘাস ফুরোবে না

জীবনের অনন্ত ঘাম মলমূত্র নর্দমা ফুরোবে না

ঘোড়া এই জীবন পেরিয়ে

আগুন ও সমুদ্র পেরিয়ে

কোথাও চলে যাবে একদিন

তখনও তার জামায় ঝুলবে চাবুকের দাগ

অপমান ও নিঃসঙ্গতা

জখম লেখালেখির ভিতর না-শুকোনো রক্ত

তুমি তা দেখে বলবে চমৎকার

একটা ব্যাং, সে-ও বলবে চমৎকার

হাজার হাজার ভিখিরিকবি

হাততালি দিয়ে বলে উঠবে চমৎকার চমৎকার  





গুচ্ছ কবিতা ।। জিৎ পাল

 



কুমড়ো ফুলের আলো 

                      
                           
     


১৯
গ্রামের মানুষ সব পোশাক আশাক নিয়ে অতটা ভাবে না 
প্রসাধন না থাকারই মতো 
শুধু কোনো উৎসবের দিন 
আলমারি খোলে টিনের তোরঙ্গ খোলে 
ন্যাপথলিন মাখামাখি আগের নতুন জামা শাড়ি বের হয় 
যেন এই উৎসবের জন্যই শাড়িটি 
এতদিন অপেক্ষায় ছিল অন্ধকারে 

অথচ শহরে এসে দেখি 
এত এত প্রসাধন চকচকে শাড়ি আর জামার বাহারে 
সমস্ত মানুষ ঢাকা থাকে 

কখনো কখনো সেই অন্ধকার তোরঙ্গের অচিন মানুষ 
হিরকদ্যুতির মতো কিছুটা সম্মুখে এসে 
পুনরায় চলে যায় প্রিয় আবরণে 

বাতাসে তখনো কিছু ন্যাপথলিন গন্ধ ভেসে থাকে

২০
গাছের মালিক তুমি তবে 
ঝড়ে আম পড়ে গেলে সেখানে তোমার কোনো অধিকার নেই
কতগুলি বালক বালিকা শুধু ঝড়ের মতন
ছোটাছুটি ক'রে 
কুড়োবে সদলবলে 
সমস্ত মাটিতে পড়া ফেঁটে যাওয়া আম 

কাঁপতে কাঁপতে বাড়ি ফিরে 
আমগুলি কাটা হবে ঝিরিঝিরি ক'রে
মায়ের বকুনি আর নুন লঙ্কা কিছুটা কাসুন্দি দিয়ে মেখে 
বারবার টেস্ট হবে সবকিছু ঠিকঠাক কিনা 
সবচেয়ে ছোটজন ছুটে যাবে কাগজি লেবুর 
কচিপাতা ছিঁড়ে নিতে 
কে কতটা ঝোল নেবে তাই নিয়ে এক আধটু গন্ডগোল হবে 

এখন বাজার থেকে আম কিনে বাড়িতে মাখালে 
মনে হয় কিছু যেন কম পড়ে গেছে 

হাতের কাছেও কেউ নেই 
যে হঠাৎ ছুটে গিয়ে ছেলেবেলা থেকে সেই 
কাগজি লেবুর পাতা ছিঁড়ে এনে দেবে

২১
গ্রামের মানুষ সব হাওয়া বুঝে যেদিকে বাতাস 
শিথিল ঘাসের মতো সেদিকেই ঝুঁকে পড়ে ক্রমে
দু'এক গোঁয়ার থাকে হাওয়ার বিরোধী কথা বলে
হাত ভাঙে মাথা ভাঙে কখনোবা মিছিমিছি কেসে থাকে জেলের ভেতরে 
তবুও গোঁয়ারপনা যাবে না তাদের 

গ্রামের সমস্ত লোক চুরি দেখে রাহাজানি
ক্ষমতার আস্ফালন সব দেখে, দেখেও দেখে না 
সকলে নিশ্চুপ হয়ে নতুন বাতাস খোঁজে 
যদি মেলে যদি মেলে আবার সেদিকে ঝুঁকে যায় 

গ্রামীণ বাতাস আর ততটা বিশুদ্ধ নেই আজ


গুচ্ছ কবিতা ।। শান্তনু দাস

 



নাব্যতা নাকি ক্ষয়ের ট্যুইশন


ঝকঝকে একটা বিকেল লিখছি

পিয়ানো পাখির হ্রদ যত্ন ছড়ায় আকাশে

ছেনির আদল পেরিয়ে বেজে যায় টগর লিবিডো

ভূমির চিৎকারে ঝিঁঝি কাটে যমুনার রেণু।   

অসংখ্য লোহিতান্ন মাংস ডুবিয়ে খায়

নিষ্পাপ ছিল আঙুলে ভ্রম

বাসন্তী এঁকে গভীরে গেছে তল-বাঘিনি

নিশ্চিত তৃষ্ণা জেনে জলদস্যু 

খোঁড়া মাছি ভাসায় হুমড়ি জিহ্বায়

ব্যাঙের ফিঁকে নিয়ে বর্ষার ধু-ধু 

জুড়ে জুড়ে গেছে নাভির বারকোডে। 

কামড় চিবিয়ে খায় আপেলের পাপ। 

গোঙানি ঝুঁকে আছে সদ্য ঝিনুকে। 

ঘুঙুরের রাজহাঁস বেজে ওঠে মাফিয়া জংশনে।

বিদ্যুৎ ভূমিষ্ঠ হবে ড্রপ ড্রপ সন্ধ্যায়।


দুঃস্বপ্নে কুড়োব তোমাকে



একটা নির্জন গাছ মধু ডিঙিয়ে 

জমে ওঠে

একটা ভাললাগা রাত হয়ে ওঠে 

মুখস্থ রেশম 

শংসাপত্রের চিবুক বেয়ে গড়িয়ে পড়ে

জল

বয়সের কাছে কাছে পড়শি পেতে রাখে 

অতিবর্ষণ চুম্বক

মাখামাখি অঞ্চল ক্রিয়া-বিশেষণে ধুয়ে গেলে

দুঃস্বপ্নে কুড়োব তোমাকে

আর ধারালো বায়স্কোপের কাছে গেলে এলোমেলো 

হয়ে যায় ফুসফুস; মাথা ভর্তি কুসুম ক্লান্তি ভিতু মাংসের 

দোয়াতে চুবিয়ে নিচ্ছে ভাঙা পালকের অক্ষর৷

মন্ত্রের মতো কে এত অরণ্য বিছিয়ে দিল। 

মোরগের ঝুঁটি জাগিয়ে দেয় ভোরের পৌষ। 

গম গম বজ্রপাত এঁকে দেয় মধ্যাহ্ন। 

দূরসম্পর্কের চুম্বন ধ্বংস করছে বাঘিনির বয়স। 

ফুলের ভূষণ খুলে কুঁড়ি যেন স্বরচিত ইশারা হয়ে আছে।


সংক্রমণ


নখও কাদা হয় যেন অসংখ্য ভেতর 

টপকে গেছে ছেঁড়া গ্রন্থের মধ্যরাত 

ঝাড়বাতির উত্তরপুরুষ পিছলে একী

দু’ভাগ আঁধার এল। প্রাচীন ক্ষুধান্নের ভিতর

পাশ ফিরে শুয়ে আছে এলোপাথাড়ি জীবন

গুছিয়ে তুলেছে রোপণের পূর্বাভাস 

জল তার পর্যটনকে সন্ধ্যার দিকে নিয়ে যায়

আর বকফুলের বহুবচন দিক-ভুল করে দেয় 

পেকে যাওয়া ঘুঁটির। নষ্টের খোঁপা খুলে 

দাঁড়িয়েছে যে তার পূর্বাহ্নের কাছে আমার 

একটা ক্লাস বাঙ্ক হয়ে আছে। 

এখন জলকোটের নীচে প্রদীপ জ্বলে

নোটবইয়ের তিনতলায় বান্ধবীর পায়রা অসাবধান হচ্ছে

ওষুধের ঊর্ধ্বক্রম গুঁড়ো গুঁড়ো অডিসির তুখোড় নিয়ে

হয়ে ওঠে কুরুশের পাঠশালা 

তীক্ষ্ণ সম্পাদ্যের ড্রয়ারে চাবির ঠোঁট টিপে ধরি

দেখি, কীভাবে প্রমাণ হয় অতিভুজের সংক্রমণ।

 

ভাঙা ট্যাবলেট ও অভিযোজিত জ্বর 



এক পয়সার অন্ধকারে আলো নাজেহাল 

সুসিদ্ধ সাঁতারগুলো চতুর হিমালয়ের গায়ে 

আপাদমস্তক হয়ে আছে। স্নায়ুর গলনাঙ্ক

ফোটে, হয়ে ওঠে বিন্দু বিন্দু এসকর্ট: একটা

হেলানো বসন্ত চিতাবাঘ পেরিয়ে ঘুমিয়ে আছে 

থাবায়। টিলার ঝিম ছড়িয়ে আছে জঙ্গলে

আর অক্ষয় দোয়েলে নাভিজ্বর নিয়ে ঘেমে

উঠছে বিধর্মী আগুন। পোড়া আঙুরের খেতে 

ভাঙা ক্র্যাচের দৃশ্য আহত শুক্ল দশা মেখে

ফিরে গেছে হাসপাতালের খনিজে। শিকড়ে 

শিকড়ে আলজিভ দৃশ্য ভাঙে, ভেঙে যায় সিঁড়ির 

চাপা পাললিক। অখণ্ড মণ্ডল ছিঁড়ে ডাকবাক্স

রাস্তা চিনে নেয়। হাতে হাতে পাতানো বিকেল, 

মাথায় দিব্য ফড়িং, থিরথির রানওয়েতে কেঁপে 

ওঠে ভূমধ্য চিবুক ও বজ্রপাত।

গুচ্ছ কবিতা ।। অনিন্দিতা গোস্বামী

 


মায়া


এক বুক গলাজলে দাঁড়িয়ে আমি

প্রথম অনুধাবন করলাম,

যাকে আমি মহাসাগর ভেবেছিলাম 

সে আসলে আদিগন্ত বিছানো মরুভূমি। 

আমি তাই গাছ হয়ে যাই,

জল হয়ে যাই,

মরুদ্যান হয়ে উঠি

ওর ফুসফুসে বাতাস ভরে দিতে।

মায়া।

এ পৃথিবীতে মায়া বড় ভীষণ জিনিস।


মোহ


গান ফুরিয়েছে যবে

তবে পিঞ্জর নিয়ে আর

টানাটানি করে লাভ নেই--

যাও পাখি,উড়ে যাও

আজ তোমাকে মুক্তি দিলাম।

মুঠি ভর্তি দানা পানি দিয়ে।

এই গাছ,শীতল হাওয়া, 

সূর্যাস্তের শেষ রাঙা রাগ,

সব তুমি নিয়ে যাও।

যা তুমি দিয়েছিলে

সেটুকুই কেউ আর কখনো

দেয়নি আমাকে।

আমি ভিখারি, 

কাঙাল --

কারো প্রতি কোন অভিযোগ নেই

আমার এই পৃথিবীতে। 

দাও দাও এবার বিদায় দাও

এ মোহ মায়ার।


 একাকার 


রাতের কুহক শেষে

মঙ্গলকাব্য রচিত হয় দিনের বেলা।

স্নেহ মায়া মমতা 

পবিত্র পবিত্র। 

যারা দিন রাতের তফাৎ বোঝে না

হায় তারা বোকা।

বোকা মেয়ে পৃথিবীতে কত্ত আছে,

যারা শিরা কেটে

ঘুমিয়ে পড়েছে একা একা।

আমি বেঁচে গেছি ঝরনা কলম

দিন নেই রাত নেই

সব একাকার 

সাদা খাতা।

 

উত্তরাধুনিক


একমুখীনতা বলে

হয় না কিছুই, 

ক্রমে এই উপলব্ধিতে 

পোঁছলাম আমি।

শুধু হাত!

তার জন্য এত আকুলতা? 

কি আছে ওতে?

মদের গেলাস থেকে

নিকোটিনে মুড়ানো কাগজ--

তার মধ্যে তুমি নৌকো

জায়গা পেলে কি পেলে না

ওকে আর জ্বালিয়ো না--

ওর অনন্ত সুখ থেকে

এক ফোঁটা উপচে পড়েছিল ওই গায়ে,

তুমি তাতে সর্বস্ব দিয়ে আরাধিকা হলে,

সেটা তোমার দোষ। 


তুমি আধুনিকতার কোন সংজ্ঞা জানোনা।

 

বেহিসাবি


তুল্যমূল্য বিচারে

এ পৃথিবীতে কিচ্ছু আসেনি।

তুমি ভালোবেসেছ,তুমি দিয়েছ

এই মাঠকে,এই নদীকে।

সে-ও তোমাকে ফিরিয়ে দেবে কিছু।

কিন্তু কি দেবে,কতটুকু দেবে

সেটা তার নিজের হিসেব। 


দেওয়ার আনন্দ শিখিয়েছে তোমাকে যে প্রকৃতি 

তার কাছে তুমি শুধু নতজানু হও।


অন্তর্লীন


কি দরকার তোমাকে আমার,

তোমার প্রতিটি অক্ষরমালা আমি সঙ্গে নিয়ে ঘুরি।

কি দরকার তোমাকে আমার, 

তোমাতে অন্তর্লীন ভালোবাসর স্রোত 

আমাকে ঘিরে রাখে অবিরত,

পারিপার্শ্বিক বলয়ে।

তুমি সুর দাও,সুর দাও,সুর দাও,

যা কিছু মাধ্যম স্বচ্ছ হয়ে ওঠে

কাচের মতই। ক্রমশ।

 

নিবেদন 


তুমি কি জানতে পেরেছিলে এই ধারা?

টের পেয়েছিলে?

ঠিক এই ভাবেই লুক্কায়িত আছে তোমার

আরো সম্ভাবনা। 

যদি লেখাটাই কাজ হয়,

তবে লেখো।

আর কিছু নিয়ে তুমি

ভেবো না,ভেবো না।

এই পথ বেয়ে দেখবে

আসবে তোমার কাছে প্রেম

সুধাময়। মায়াময়

এই পৃথিবীতে। 


সব দিতে হবে,সব দিতে হবে।