বুধবার, ৩০ ডিসেম্বর, ২০২০

সম্পাদকের কথা


 ৩১ ডিসেম্বর ২০২০


কবিতা ঠিক কী রকম হবে এ নিয়ে আমাদের মনে বিস্তর প্রশ্ন। আর প্রশ্ন থাকলে তার উত্তরও খুঁজতে চেষ্টা করি আমরা। কবিতার স্বরূপ সম্পর্কে কোনও নির্দিষ্ট ধারণা নেই বলেই যুগ যুগ ধরে নানা মুনি ( সমালোচক) তাদের নানা মত ব্যাক্ত করেছেন এবং এখনও করছেন। বলা বাহুল্য সৎ কবি মাত্রেই এসবের ধার না ধেরে নিজের প্রজ্ঞা অনুযায়ী কবিতা লিখে ভবিষ্যতের কাছে এক একটা দিশা রেখে গেছেন। তবে কবিতা যেহেতু আত্মপ্রকাশেরও একটি মাধ্যম তাই একজন কবির কাছে তাৎক্ষণিক গ্রহণযোগ্যতাও কবিতার উপযুক্ত মানদণ্ড হিসেবে দেখা দিতে পারে আর পরবর্তীদের কাছে সেই মানদণ্ড অধিক সহজ বলেও গৃহীত হতে পারে। আর সেইখানেই যত ধোঁয়াশা। মানব সভ্যতার ইতিহাসে কবিতা কখনও কখনও হয়েছে আত্মগূঢ় । আবার কখনও কখনও গণযোগের মাধ্যম। কাজেই সময়ের প্রয়োজন কবির কাছে গুরুত্বপূর্ণ। জনসংযোগ যখন কবিতার উদ্দেশ্য তখন কবিতার রূপ একরকম আবার নিছক বিত্তশালী মূর্খ সমাজকে যখন খুশি করতে হয় কবিতাকে তার রূপ আরেক রকম। আজকের গণকবিতাচর্চার যুগে যখন প্রযুক্তি মানুষকে তার সমস্ত কিছু ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষা পূরণে সমর্থ, যখন বিনোদন আর জনসংযোগ আর কবিতার ওপর নির্ভর করে না তখন কবিতার সামাজিক উদ্দেশ্য পূরণের দায় আর নেই বললেই হয়। তাহলে কবিতার এখন কাজ কী? কেনই বা লিখিত হবে তা? সময়ের চিহ্ন কবিতায় রাখতেই হবে এরূপ যাদের মত তাদের বলি সময়ের চিহ্ন ধরে রাখার জন্য এখন বৌদ্ধিকচর্চার নানা দিক আছে। ইতিহাস ভূগোল অর্থনীতি সমাজবিজ্ঞান ভাষাবিজ্ঞান ইত্যাদি ইত্যাদি। আবার সাহিত্যেরও বিবিধ শাখা যেমন গল্প উপন্যাস নাটক প্রবন্ধ ইত্যাদি। সংবাদ মাধ্যম সিনেমা সমাজের কলুষ কালিমা আর আলোক উদ্ভাস নিয়েই আমাদের সঙ্গে চির আয়ুষ্মান। ফলে এই মুহূর্তে যারা কবিতা দিয়েই সমস্ত বিষয়ভিত্তিক সমস্যার সমাধান চান তারা হয়ত ভুল করছেন। যারা অনেক বেশি মানুষের কাছে কবিতাকে গ্রহণযোগ্য করে তুলবার জন্য প্রাণপাত করছেন তারাও হয়ত ভুল করছেন। কারণ কবিতার অন্তর্নিহিত সত্যই হয়ত তার বিরুদ্ধে। একমাত্র বড় কোনও উদ্দেশ্যসাধন ছাড়া আর কোনও কারণেই কবিতাকে সমাজ সংস্কারে ( মধ্যযুগে অনুবাদ ও মঙ্গল কাব্যসাহিত্য ) অংশগ্রহণ করতে দেখা যায়নি। কবিতার পাঠক চিরকালই খুব কম। তাহলে দেশে দেশে কালে কালে কবিতা লেখার জন্য এত মানুষের আগ্রহ কেন? এর উত্তর দুভাবে দেওয়া যায়। এক. কবিতা আমাদের জীবন সত্তায় অতি দুর্মূল্য একটি সম্পদ। তা লেখা এবং পড়া দুটোই আমজনতার জন্য নয়। দুই. পরিশ্রম ও অনুশীলন ছাড়াই কবিতার মতো করে কিছু কথা লিখে ফেলা যায়।যার সঙ্গে অনুভূতি দেশ থেকে আসা কোনও আলোর সম্পর্ক থাকে না। বলাবাহুল্য শেষোক্ত লেখাই কবিতার রূপ ধরে বাজারে সচল। প্রতিভার পরিবর্তে পরিচিতি, আন্তরিকতার পরিবর্তে ক্ষমতা প্রকৃত কবির পরিবর্তে সাজা কবিকে গুরুত্ব দিয়ে থাকে। কবিতার অনুষ্ঠানগুলিতে একজন প্রথম শ্রেণির কবির পরিবর্তে তৃতীয় শ্রেণির একজন গায়ক কিংবা আবৃত্তিকার বেশি গুরুত্ব পান। কবিতা দিয়ে কী হয়? তা কি সমাজ পরিবর্তন করে? ক্ষুধার্তের মুখে অন্ন তুলে দেয়? স্বজন হারানো মানুষের বুকে তার স্বজনকে ফিরিয়ে দেয়? এই সব কটি প্রশ্নের উত্তর অনেক বড় মাপের কবিরা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ভাবে দিয়েছেন। এবং সবগুলোই নঞর্থক। কিন্তু কবিতার তো কোনও না কোনও কাজ আছেই। আর সেই কাজ করে মকসোহীন, উদ্দেশ্যহীন কিছু না-পেতে আসা কবিতা। পৃথিবীতে এমন কতিপয় অভিশাপগ্রস্ত সংবেদনশীল মানুষ জন্মান যাদের বেঁচে থাকার বোধ অধিকাংশের সঙ্গে মেলে না। কবিতার মতোই তারাও স্বতঃস্ফূর্ত, উদ্দেশ্যহীন, পৃথিবীর অধিকাংশ মোটা দাগের মানুষের সঙ্গে তাদের মেলানো যায় না। কবিতা শুধুমাত্র তাদের সত্তাকেই পোষণ দেয়। তার সংক্রমণ এত সূক্ষ্ম কোনও বিচলনই হয় না। মানব অস্তিত্বের ধারণাকে শুদ্ধ ও বৃহৎ করতে করতে তা আমাদের এতদূর পৌঁছে দিয়েছে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন