মঙ্গলবার, ২৯ ডিসেম্বর, ২০২০

ধারাবাহিক গদ্য ।। চন্দন মিত্র

 


জন্মের আগের মুখ : জেন তত্ত্ব ও জেন গল্পের অমায়িক ভুবন


হুইনেং-এর আখ্যান অথবা এক অকুলীন নিরক্ষরের আত্মান্বেষণ 

                                                 

                                         দুই 

জন্মের আগের মুখ, তাও আবার বাবা-মায়ের যখন জন্ম হয়নি সেই সময়ের – হুইমিং এর আগে  কখনও   এমন হতচ্ছাড়া অথচ সত্তা-টলানো ধাঁধার সম্মুখীন হয়নি। সে আক্ষরিক অর্থে  হতভম্ব হয়ে অবোধ শিশুর মতো হুইনেং-এর পা ধরে পড়ে থাকে। কেবল হুইমেং ? আমরাও কি এই ধাঁধার সম্মুখীন হয়ে বিপন্ন বোধ করি না ? আমরাও কি জন্মের আগের মুখ সংক্রান্ত রহস্য উদঘাটনে উদগ্রীব হয়ে উঠি না ? এ এক এমন ধাঁধা যা আমাদের অনায়াসে অলীক কল্পনার গহীন অরণ্যে পৌঁছে দিয়ে এক খেই-হারানো জীবন উপহার দিতে পারে। বস্তুতপক্ষে আমাদের নাগালে থাকা তথাকথিত ধর্মজ্ঞগণ আমাদের সামনে এমন অলীককল্পনার সুস্বাদু গাজর ঝুলিয়ে স্বাভাবিক বোধবুদ্ধির ধারণাকে ধ্বস্ত করে। আমরা তাঁদের কথিত বাণী অস্বীকার করার মতো যুক্তি ও সাহসের অভাব বোধ করি। আমরা ভাবি জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত যে জীবৎকাল সেই সীমারেখার আগের ও পরের পথটুকু সম্পর্কে আমাদের জানতে হবে। আর এই পথের হদিশ রয়েছে বাক্যবাগীশ বাবাজি-মাতাজিদের অমোঘ ঝুলিতে। আমাদের এমন বিশ্বাসের কারণ, তথাকথিত ধর্মব্যাপারীদের ভান। তাঁরা এমন গদগদ ভাব নিয়ে এসব বিষয়ে ভাষ্য দেন যে মনে হয় হাতেগরম অভিজ্ঞতা বিতরণ করছেন। আহাম্মক আমরা ভেবেও দেখি না জন্মের আগের ও মৃত্যুর পরের অভিজ্ঞতা কারোর ভাঁড়ারে থাকা সম্ভব নয়। যারা বলেন এমন অভিজ্ঞতার মালিক বা মালকিন তাঁরা হয় মনোবিকারের শিকার অথবা চ্যালা-শিকারের টোপ ছড়াচ্ছেন। তাঁদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আমরা ভাবতে থাকি জন্মের আগে কেমন ছিলাম বা কোথায় ছিলাম  আর মৃত্যুর পরে কী হব বা কোথায় যাব এটা জানাই হল জীবনের লক্ষ্য । আর এই যে প্রতিদিনের সংগ্রামমুখর জীবন এটা নিছক মায়া! এভাবেই প্রাক-জন্ম ও মৃত্যুপরবর্তী জীবন সম্পর্কে ধারণালাভের আকুতিকে আধ্মাত্মিকতা ভেবে আমরা মূল্যবান মানব্জীবন অপচয় করি। আমাদের জীবনযাপনকে সুন্দর করে তোলার ক্ষেত্রে প্রকৃত আধ্যাত্মিকতাকে কাজে লাগাই না। অথচ যাবতীয় আপ্তবাক্যের ঠুলি খুলে জীবনের দিকে সটান তাকালে জন্ম-মৃত্যু নিয়ে চাপিয়ে দেওয়া ধাঁধা থেকে আমরা নিষ্কৃতি পেতে পারি। 

         হুইনেং ধর্মব্যাপারী হতে চায়নি , তাই চায়নি হুইমিংকে তার অন্ধ-অনুসারী বানাতে। সে চেয়েছিল হুইমিং  প্রথাগত ধারণা ও  সংস্কারের বাইরে বেরিয়ে জীবনকে বুঝে নিক; বুঝে নিক জন্মের আগে ও মৃত্যুর পরে অপার শূন্যতা ছাড়া আর কিছু না-থাকার সত্যতাকে। তাই সে এমন ধাঁধার অবতারণা করেছে যা হুইমিং-এর বোধির স্থিতিশীলতাকে প্রবল জাড্য দিয়ে জাগরিত করতে পারে। হুইমেংএর এতদিনের অর্জিত প্রথাগত জ্ঞানের বেলুন থেকে সব হাওয়া বেরিয়ে গেছে। সে আজ এক নিরক্ষর দখনো ছেলের কাছে নতজানু। সে জানতে চায় জন্মের আগের মুখের আসল রহস্যের হদিস। হুইনেং তাকে হতাশ করে জানায় – নিজের ভিতরে খোঁজ করো, যেদিন প্রকৃত আলোকপ্রাপ্ত হবে সেদিন বুঝবে তোমার ভিতরেই সব  আছে, বাইরে কোথাও খোঁজার দরকার নেই। এযেন আমাদের বাউল-ফকিরদের কথা, যা আছে ব্রহ্মাণ্ডে  তা আছে দেহ ভাণ্ডে । আর এই কথার উপর ভিত্তি করে তাঁরা দেহের মধ্যেই জন্ম-মৃত্যু, স্বর্গ-নরক, মক্কা-মদিনা-কাবা-কাশী- বৃন্দাবন, ঈশ্বর-আল্লা-গড-খোদার খোঁজ করেন। ফলত তাঁরা প্রবলভাবে প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মসমূহের অলৌকিক অনুমানগুলিকে নস্যাৎ করার হিম্মত ও আলো ধারণ করেন। লালনের গানে পাই – 

মলে ঈশ্বরপ্রাপ্ত হয় কেন বলে ?

মলে হয় ঈশ্বরপ্রাপ্ত সাধু-অসাধু সমস্ত

তবে কেন এত জপতপ জলেস্থলে ?

যে পঞ্চে পঞ্চভূত হয় 

মলে তা যদি তাতে মিশায় 

তবে ঈশ্বর অংশ ঈশ্বরে যায় 

স্বর্গ-নরক কার মেলে ?  


লালন অনুমানসর্বস্ব ভাববাদকে নাকচ করে বর্তমানকে গভীরভাবে আঁকড়ে ধরেছেন। তাঁর সুযোগ্য  অনুসারী দুদ্দু শা সমস্ত ঐশীগ্রন্থকে মানবরচিত বলে ঘোষণা দিয়েছেন। তাঁর যুক্তিটা দেখে নেওয়া যাক –


এক দেশে এক এক বাণী কোন খোদা পাঠায় ?

যদি একই খোদার হয় বর্ণনা 

তাতে তো ভিন্ন থাকে না

মানুষের সকল রচনা তাই তো ভিন্ন হয়। 


আমরা পুথি-পোড়ো বিশ্বাসীরা এইসব যুক্তির কাছে অসহায় বোধ করি , কিন্তু হার স্ব্বীকার করার গ্লানি ঢাকতে বেদ-বাইবেল-কোরান-পুরাণ-স্মৃতি থেকে গনগনে পবিত্র শ্লোক-আয়াত উদগীরণ করি। আসলে শূন্যের সঙ্গে যতই চোখধাঁধানো মনোহারী পবিত্রতাকে গুণ করি না কেন তা শূন্যতায় পর্যবসিত হতে বাধ্য। কিন্তু মোহ সহজে ঘোচার নয়। বরং মোহ মিথ্যা হিসাবে প্রমাণিত হওয়ার পর মোহান্ধরা অস্ত্রশস্ত্র শানাতে শুরু করে বিরুদ্ধবাদীদের নিকেশ করার জন্য। ইরানি সুফিসাধক ও কবি মনসুর হাল্লাজ ( ৮৫৮ – ৯২২ খ্রিস্টাব্দ )-এর কথা প্রসঙ্গত এসে পড়াই স্বাভাবিক। এই প্রবাদপুরুষ, খলিফা আল মুকতাদির   আমলে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হন। কী ছিল তাঁর অপরাধ ? তেমন কিছুই নয় তিনি বলেছিলেন –  আনাল হক  অর্থাৎ আমিই সত্য। সবাই যেখানে বলছে আল্লা সত্য ঈশ্বর সত্য আর তুমি কিনা বলছ তুমিই সত্য! তুমি একটা তুচ্ছ মানুষ, তুমি আবার সত্য হলে কীভাবে ? তুমি তো চরম মিথ্যা ? তুমি সেই পরমকে চরম  সত্য ভেবে ভিতরে ভিতরে গরম হয়ে উঠবে আর তাঁর নামে উষ্ণ স্লোগান দেবে তা না-করে তুমি কিনা!ছি ! কুলাঙ্গার কোথাকার ! সেই ট্র্যাডিশন এখনও চলছে। যে যুক্তিতে শান দিতে অপারগ সে তো অস্ত্রেই শান দেবে!   

             প্রচলিত আপ্তবাক্যের উপর আস্থা না-রেখে এই স্বরূপসন্ধান বা আত্মজ্ঞানের পথে পদচারণা আমাদের সভ্যতাকে আলোকিত ভবিতব্যের দিকে এগিয়ে দিয়েছে। আমরা বিবিধ মাথাভারী সংস্কারের  বোঝা নামিয়ে জীবন ও জগতের দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকাতে শিখেছি। বুঝেছি উপরের দিকে তাকাতে হলে দূরবিনের ভিতর দিয়ে দেখা ভালো শাস্ত্রগ্রন্থের চশমা পরে নয়। বুঝেছি জীবন ও মৃত্যুর মতো জাগতিক সহজ বিষয়কে অযথা কল্পনার মিশেলে যে অপার্থিব মহিমা দান করা হয়েছে তা নিছক কাহিনি হিসাবে চিত্তাকর্ষক হলেও সত্য ভেবে জীবনের অংশ করে নিতে গেলে ঠকে যাওয়াই স্বাভাবিক। যথার্থ গুরু তিনি যিনি নিজে ঠকেন না অন্যকেও ঠকান না। হুইনেং তেমন একজন। সে নিরক্ষর কাঠুরে, কৌলীন্যের  ছিটেফোঁটা তার মধ্যে নেই। কিন্তু তার আছে আত্মদীপ প্রজ্বলনের সুতীব্র আকুতি যা তাকে জীবনভর ছুটিয়ে নিয়ে গেছে থামতে দেয়নি। সে হুইমিংকেও চরৈবেতি মন্ত্রে দীক্ষিত করে দিয়েছে । বাইরে চলা ও  ভিতরে চলা দুই চলাতেই তাকে প্ররোচিত করেছে। কৃতার্থ হুইমিং জানায়, সে এতদিন ডংশান মঠে দিন  গুজরান করলেও কখনও নিজেকে নিয়ে ভাবেনি, ফলে জন্মের আগের মুখের কথাও তার অজানা ছিল। এখন হুইনেং-এর উপদেশে সে নিজেকে চেনার ব্রতে নিযুক্ত হতে পেরেছে। সে এমন লোকের সঙ্গে  নিজের তুলনা করেছে, যে জল পানের সময় বুঝতে পারে তা উষ্ণ, না শীতল। সুতরাং এমন আলোকদর্শী  একজনকে হুইমিং গুরু না-মেনে পারে! কিন্তু হুইনেং গুরুত্ব স্বীকার করল না। সে বলল, তুমি-আমি দুজনেই সতীর্থ, আমাদের দুজনেরই গুরু আচার্য হং-জেন । তবুও নাছোড়বান্দা হুইমিং – 

প্রভু! আমি এখন কী করব ? 

-উত্তরে চলতে শুরু কর। যখন নিজেকে খুব বড় মনে হবে থেমে যাবে; যখন নিজেকে খুব ছোটো মনে হবে থেমে যাবে। হুইমিং পাকদণ্ডীর বাঁকে হারিয়ে যায়। পরবর্তী কালে গুরুর প্রতি শ্রদ্ধায় নিজের নাম থেকে হুই অংশটি খণ্ডিত করে ‘দাও’ শব্দটি জুড়ে নেয়। দাওমিং নামে সে প্রসিদ্ধ হয়ে ওঠে। 

         হুইনেং এগিয়ে চলে প্রব্রজ্যায় । হাঁটতে হাঁটতে সে পৌঁছে যায় কাওকি নামক স্থানে। সেখানে ভিড়ে  যায় একটি নিষাদগোষ্ঠীতে।  নিষাদেরা স্বভাব-শিকারী, পশুপাখি বধ করেই তাদের জীবনযাত্রা নির্বাহ হয়।  হুইনেং বুদ্ধের অহিংসা নীতিতে আস্থাশীল। ফাঁদেপড়া পশুপাখি দেখলেই সে মুক্ত করে দেয়। রন্ধনশালার দায়িত্ব পেয়ে আমিষের বদলে নিরামিষ রান্না করে বিড়ম্বনা তৈরি করে। এক দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে হুইনেং তার আদর্শনিষ্ঠা দিয়ে গোষ্ঠীর মন জিতে নেয়। পনেরো বছরের নিরলস প্রচেষ্টায় সে নিষাদদের  পেশা থেকে তাদের বিচ্ছিন্ন করে কৃষিনির্ভর স্থায়ী জীবনে পৌঁছে দেয়। অতঃপর হুইনেং ভাবে তাকে এবার তো ধর্ম প্রচারে বেরোতে হবে। যেমন ভাবা তেমন কাজ । পনেরো বছরের সাহচর্যে আমূল পরিবর্তিত  নিষাদবন্ধুদের কাঁদিয়ে সে গুয়াংজৌ প্রদেশের বিখ্যাত ফাশিংশাই মঠের উদ্দ্যেশ্যে রওনা হয়।  

            হুইনেং মঠচত্বরে প্রবেশ করে দেখে দুই সন্ন্যাসীর মধ্যে তুমুল তর্ক চলছে। তাদের দুজনকে ঘিরে বাকি সন্ন্যাসীরা দুইভাগে ভাগ হয়ে পড়েছে। এক সন্ন্যাসী বলছে , পতাকাটি নড়ছে । আর প্রতিপক্ষ সন্ন্যাসী বলছে, না, হাওয়া নড়ছে ।  হুইনেং বুঝতে পারে মঠের উড়ন্ত নিশানটি নিয়ে তাদের মধ্যে গোল বেধেছে। হুইনেং তার আশ্চর্য শান্ত অথচ গভীর কণ্ঠে বলে ওঠে, থামো তোমরা। মুহূর্তে সবাই মন্ত্রমুগ্ধের মতো থেমে যায়। আগন্তুক তরুণকে তারা সমীহ দেখায়। হুইনেং বলে, না নিশান নড়ছে, না বাতাস নড়ছে; নড়ছে তোমাদের মন। মঠাধ্যক্ষ ইংজন এগিয়ে আসেন। তর্কের এই অপূর্ব নিষ্কৃতি শুনে তিনি বুঝতে পারেন এতদিনে তার প্রিয় এই মঠ একজন প্রকৃত আচার্য পেতে চলেছে। তিনি হুইনেংকে বক্তব্য-মঞ্চে নিয়ে যান। একটু আগেই তিনি নির্বাণতত্ত্ব সম্পর্কে বক্তব্য রাখছিলেন। তাঁর বক্তব্য চলাকালীন সময়ে তর্ক বাধায় সেই বক্তব্যে ছেদ পড়ে। অধ্যক্ষ হুইনেংকে বলেন, আপনাকে সাধারণ সন্ন্যাসী বলে মনে হচ্ছে না। বহুদিন আগে শুনেছিলাম পঞ্চম আচার্য হং-জেন, তাঁর চীবর ও ভাণ্ড কোনো সুযোগ্য ব্যক্তির হাতে  তুলে দিয়েছেন। আপনিই কি সেই ব্যক্তি? আপনিই কি ষষ্ঠ আচার্য ? হুইনেং মাথা নত করে স্বীকৃতি জ্ঞাপন করে।   


ছবি: বিধান দেব

                


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন