মঙ্গলবার, ২৯ ডিসেম্বর, ২০২০

সুধীর চক্রবর্তী ।। স্মরণ : অনিন্দিতা গোস্বামী


 

শেষ প্রণাম 


পনেরো ডিসেম্বর। বিকেল সাড়ে পাঁচটা। সদ্য খবর পেয়েছি কৃষ্ণনগরবাসীর পরম গর্বের মানুষ, একজন সত্যিকারের বাঙালি পুরুষ, অসামান্য গদ্যকার, প্রাবন্ধিক অধ্যাপক সুধীর চক্রবর্তী আর নেই। বিকেল চারটে নাগাদ আমাদের ছেড়ে, এই বিশ্ব ছেড়ে তিনি অন্য লোকে পাড়ি জমিয়েছেন। বেশ কিছুদিন ফোন করা হয়নি, কেন করিনি আমার কাছে তার সদুত্তর নেই। প্রায়ই ভেবেছি করব কিন্ত নানান কাজের চাপে ভুলে গিয়েছি। আসলে কাকিমার সঙ্গে টুকটাক হোয়াটস অ্যাপে কথা হয়ে যায়। কিন্ত বেশ কিছুদিন কাকিমাও যে চুপচাপ বেখেয়ালে তা-ও লক্ষ্য করিনি। খবরটা পেতেই চোখে জল চলে এল। প্রথমেই মনে হল ফোন করলে কেউ আর ফোনের ওপ্রান্ত থেকে সামান্য ভাঙা গলায় বলবেন না, বল অনিন্দিতা, খবর বল। হ্যাঁ শেষদিকে বয়সজনিত কারণে সামান্য শ্লেষ্মা জমত গলায়। তবে কিছুক্ষণ কথা বললেই গলাটা পরিষ্কার হয়ে যেত। হবেই তো তিনি ছিলেন সুগায়ক।
        ফোন করলাম। স্যারের নাম্বারেই। ওপাশ থেকে কথা বললেন তাঁর ছোট মেয়ে। সামান্য কথা। এখনও তারা সামলে উঠতে পারেননি কিছুই। কৃষ্ণনগরে নিয়ে যাবার কথা চলছে। রেনাল ফেলিওর হয়েছিল। ভর্তি  ছিলেন কলকাতার নামী হাসপাতালে, ভালোও হয়ে গিয়েছিলেন খানিক। এসেছিলেন মেয়ের ফ্ল্যাটে। কিন্ত আবার হঠাৎ বাড়াবাড়ি, ভেন্টিলেশন, ব্যাস। সব খবর ঠিকঠাক পাইনি। তথ্যে কিছু ভুল থাকতে পারে। কিন্ত স্মৃতিতে তো ভুল থাকে না। এখন রাত দেড়টা। জানি না স্যারের দেহ দাহ করা হয়ে গেল কি না। সদ্য প্রয়াত আত্মা হয়ত এখনও বিচরণ করছে এই ধরাধামে। আমার চোখের সামনে ভাসে ধুতি পাঞ্জাবি পরিহিত দীর্ঘদেহী গৌরবর্ণ একজন আদর্শ বাঙালি মানুষ যিনি ছিপছিপে মেদহীন শরীরে দীপ্ত পদক্ষেপে হেঁটে চলেছেন। কী জোর ছিল সেই পদচারণায়, তিনি বলতেন আমাদের কলকাতায় যেতে হবে কেন? কলকাতা আসবে আমাদের কাছে।
           হ্যাঁ তিনি পেরেছিলেন। আজীবন কৃষ্ণনগরে বসবাস করেও কলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গবাসীর হৃদয়ের মণিকোঠায় স্থান করে নিয়েছিলেন। তার সঙ্গে দেখা করতে নিত্যদিন রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লোক আসত আর তিনি ভেজা গামছা মাথায় দিয়ে রোদ জল উপেক্ষা করে ছুটতেন বাউল ফকিরের কাছে। তাঁর বাউল-ফকির কথা এক অসম্ভব পরিশ্রম আর অধ্যাবসায়ের ফসল। বইটি ২০০২ সালে আনন্দ পুরস্কারে সম্মানিত হয়।



পুরস্কার তিনি অনেক পেয়েছেন। শিরোমণি পুরস্কার (১৯৯৩), আচার্য দিনেশচন্দ্র সেন পুরস্কার, দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয়ের নরসিংহ দাস পুরস্কার, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সরোজিনী বসু স্বর্ণপদক (২০০৩), সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার (২০০৪), আরও অনেক পুরস্কার। কিন্ত তাই নিয়ে তাঁর কোনও মাথাব্যথা ছিল না। তিনি জানতেন তাঁকে কাজ করে যেতে হবে। প্রতিদিন নিয়ম করে লিখতেন। প্রায় পঞ্চাশ বছর বয়সে তাঁর প্রথম বই প্রকাশিত হয় অথচ তাঁর গ্রন্থ সংখ্যা পঞ্চান্নরও বেশি। সম্পাদনা করেছেন ধ্রুবপদ পত্রিকা। এছাড়াও তাঁর সম্পাদিত বই ও পত্রপত্রিকার সংখ্যা অনেক। যেমন জন পদাবলি, দ্বিজেন্দ্রগীতি সমগ্র, বালা দেহতেত্বের গান।
কিন্ত এসব তো হল তথ্য। মানুষ সুধীর চক্রবর্তীর জানতে হলে যে প্রথমেই মনে পড়ে আড্ডাপ্রিয় রসিক মানুষটির কথা। যেন একটা যুগ চলে গেল। কত গল্প যে তাঁর ভাঁড়ারে। তাঁর দোতলা বাড়ির সিঁড়ি দিয়ে উঠেই বাইরের ঘরে কখনও খাটের ওপর আধ শোয়া হয়ে কখনও সোজা হয়ে বসে চলে আড্ডা। কাকিমাও এসে যোগ দিতেন সেই আড্ডায়। সিঙ্গারা খেতে খুব ভালোবাসতেন। গরম সিঙ্গারা নিয়ে ঢুকলে শিশুর মত খুশি হতেন। আড্ডার সঙ্গে সঙ্গে সমানে আসত চা, মিস্টি, ফল। আমার দিদা মারা যাবার পর যখন কৃষ্ণনগরের সঙ্গে সব যোগাযোগ ছিন্ন হলো তখন কৃষ্ণনগরের একমাত্র আকর্ষণ ছিলেন স্যারই। বছরে একবার অন্তত যেতাম বিজয়ার প্রণাম করতে।




            সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ছিলেন তাঁর বন্ধু। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের চলে যাওয়াটাও হয়ত স্যার নিতে পারেন নি। স্যারের কাছ থেকেই সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের ব্যক্তিজীবনের কত ছোট ছোট গল্প শুনেছি। গল্প শুনেছি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের। একবার নাকি এক বক্তৃতা সভায় অন্নদাশঙ্কর রায় বক্তৃতা দিয়েই যাচ্ছেন থামছেন না। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা পাঠ ছিল তার পরে। অনেকক্ষণ থেকে উসখুস করছেন সবাই। শক্তি চট্টোপাধ্যায় বললেন দাঁড়া আমি ব্যবস্থা করছি, বলে টলতে টলতে সটান মঞ্চে উঠে পড়ে চেঁচিয়ে বলতে লাগলেন, এই কখন শেষ হবে এসব? আমরা কবিতা পড়ব। সবাই তো তাকে ধরাধরি করে মঞ্চ থেকে নামিয়ে দিলেন। বক্তৃতাও শেষ করে তড়িঘড়ি নেমে এলেন অন্নদাশঙ্কর রায়। এরকম কত মজার মজার গল্প যে শুনেছি।
            আবার কোনও গান সম্পর্কে জানতে চাইলে সঙ্গে সঙ্গে ব্ই নামিয়ে দেখিয়ে দিতেন গানটা কত সালে রচিত,কোন রাগ, কোন তাল, অন্য কোনও গানের প্রভাব আছে কি নেই ইত্যাদি ইত্যাদি। একদিন তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম লোকগানের কি অনুবাদ সম্ভব? তিনি বলেছিলেন 'গভীর নির্জন পথে' বইটার মধ্যে যে গানগুলো আছে সেগুলোর অনুবাদ সম্ভব না।লোকগানের যে মিস্টিসিজম, ভাষার দোলাচল এগুলো কখনও বাংলা থেকে ইংরাজীতে আনা যায় না। যেমন গৌর কথার অর্থ কিন্ত গৌরাঙ্গ নয়। 'কবে গৌরাঙ্গ পাব'---- এই জি নিস গুলি বিদেশি ভাষায় আনা সম্ভব না। 
              দ্বিজেন্দ্রলাল, রজনীকান্ত, অতুলপ্রসাদের গান নিয়ে তাঁর যে প্রবন্ধগুলো বিভিন্ন জায়গায় প্রকাশিত হতো গোগ্রাসে পড়তাম। পড়তাম সংবাদ প্রতিদিন দৈনিক পত্রের রোববার পুস্তিকায় 'দেখা না দেখায় মেশা'। চলাচলের পথে কত মানুষের সঙ্গে ওঠা বসার গল্পের কী সরস উপস্থাপন।
          খুব ছোটবেলা থেকে স্যার আমাকে দেখেছেন। যদিও তখন ওঁর ধারেকাছে ঘেষতাম না আমি। আমাদের বাড়ির নীচের তলায় ভাড়া থাকতেন লেখক দীপঙ্কর দাস। দীপঙ্কর কাকুর বাসায় মাঝে মাঝে আসতেন স্যার। মা বলতেন ওই দেখো স্যার এলেন। খুব পণ্ডিত ব্যক্তি। আমি উপর থেকে ঝুঁকে একবার দেখতাম, ব্যাস। যখন লিখতে এলাম বিভিন্ন সাহিত্য বাসরে দেখা হয়ে যেত। আমি ভয়ে সুরুৎ করে পালিয়ে যেতাম দূরে। তিনি কৃষ্ণনগর গভঃ কলেজের অধ্যাপক ছিলেন। তাঁর ক্লাসগুলো নাকি এত সুন্দর যে শুনতে যাবার মতো। আমি তো ওই কলেজে পড়ি না আর আমার বিষয়ও বাংলা নয় আমি কেমন করে যাব! তবু খুব ইচ্ছে করল। একবার এক সাহিত্য বাসরে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে লেখা আমার একটা প্রবন্ধের খুব প্রশংসা করলেন স্যার। সাহস বাড়ল। টপ করে গিয়ে প্রণাম করলাম। সেই শুরু। তবে ওই প্রণামটুকুই। আর সঙ্গে বসে আড্ডা দেওয়া, গল্প করা সে সাহস পেতে আমায় অনেক বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। যখন ধীরে ধীরে আমি সহজ হয়েছি দেখেছি স্যার আরও সহজ। কী আন্তরিক। আমাদের বাড়ি যখন বিক্রি হয়ে গেল স্যার বলতেন আসবে, আমার বাড়িতে থাকবে। কাকিমা বলতেন একদিন ভাত খেয়ে যাবে।
          কত কষ্ট ছিল স্যারের বুকে। তাঁর প্রথম কন্যা খুব অসুস্থ। এই যে প্রতিবন্ধী সন্তান যে নিজের নামটাও বলতে পারে না, মা বাবাকে চেনে না, পোশাক আশাক,  খাওয়া দাওয়া কোনও বোধ বুদ্ধিই নেই তার। লোক হয়ত আছে সাহায্যের তবু নিজ হাতে সব সামলাতেন স্যার। হয়ত সেই কষ্ট থেকে মুক্তি পেতেই নিয়েছেন লেখার আশ্রয়।
          কিন্ত এমন কথা তো ছিল না স্যার। কথা ছিল তো একশত বছর পথ হাঁটার। আমরা সবাই মিলে সেই জন্মদিন পালন করব এমনই তো ভেবে এসেছি সব সময়। এই চলে যাওয়াটা তো কিছুতেই মানতে পারছি না স্যার। অনেক গল্প বাকি রয়ে গেল। যেখানেই থাকবেন ভালো থাকবেন স্যার। কত কিছু জানবার প্রয়োজন হবে, আপনাকে ফোন করব, আপনি শুনতে পাবেন তো? বলবেন তো বল অনিন্দিতা!


ছবি: ফেসবুক থেকে সংগৃহীত 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন