মঙ্গলবার, ২৯ ডিসেম্বর, ২০২০

ধারাবাহিক গদ্য ।। দীপক হালদার

 



ডায়মন্ড হারবারের সাহিত্য চর্চার        ইতিবৃত্ত 



চার .

কবি রফিক উল ইসলাম গ্রামনগর ছাড়া রবীন্দ্র জন্মদিনকে  স্মরণ করে  'এসো এসো এসো হে বৈশাখ ' নামে আরও একটি পত্রিকা প্রকাশ করতেন। দুটি পত্রিকাতেই প্রখ্যাত কবি সাহিত্যিকদের কবিতা,প্রবন্ধ ও পুস্তক পর্যালোচনা প্রকাশিত হতো। প্রয়োজনীয় অর্থাভাবে অর্কেস্ট্রার প্রকাশ ও প্রায় নিভু নিভু সেসময়।
                                         ততদিনে কবি বাসুদেব দেব আরও কাছে টেনে নিলেন অর্কেস্ট্রার তিন সম্পাদক অর্থাৎ সুব্রত, বলরাম, দীপককে।আমাদেরকে বিস্মিত করে তাঁর সম্পাদিত কালপ্রতিমা ছাপার দেখভাল করার দায়িত্ব দিলেন আমাদের ওপর।পন্ডিত মহেন্দ্রনাথ তত্ত্বনিধির বংশধর জগদীশ হালদারের শক্তি প্রেস-এ ছাপার ব্যবস্থা হলো।শক্তি প্রেসের কর্ণধার জগদীশদার বানান জ্ঞান এবং রুচিশীল কাজ আমাদেরকে যেমন সুবিধা করে দিল, তেমনই বাসুদেবদার স্নেহ ভালোবাসা বিশ্বাস অনেক বেশি বর্ষিত হতে লাগল আমাদের মাথায়।বাসুদেবদা যতদিন ডায়মন্ড হারবারে ছিলেন ততদিন ডায়মন্ড হারবারে সাহিত্য চর্চার বিশেষ করে সাহিত্য বিষয়ক অনুষ্ঠান ও আলোচনার জোয়ার এসেছিল বলা যায়।তাঁর সান্নিধ্যে যাওয়ার অবাধ ছাড়পত্র দিয়েছিলেন তিনি। বলেছিলেন, প্রত্যেক রবিবার সকালে আসবে আমার কাছে। অবশ্যই সাতদিনে সাতটি কবিতা লিখে আনতে হবে।এলে চা পাবে, বিস্কিট পাবে, বাড়িতে থাকলে মিষ্টিও পেতে পারো,কিন্তু কবিতা ভালো না হ'লে, খারাপ হ'লে চড়- চাপড় পাবে। রবিবার সকাল হলেই আমরা হাজির হতাম বাসুদেবদার কাছে।শুনতেন আমাদের কবিতা,শোনাতেন নিজের লেখা টাটকা কবিতা। প্রতিবেশী সাহিত্য, বিদেশী সাহিত্য ও কবিতা নিয়ে আলোচনা করতেন। এছাড়াও প্রায় প্রত্যেকদিন সন্ধ্যায়ও তাঁর কাছে বসত সাহিত্য পাঠ ও আলোচনার আসর। বৌদি অকাতরে যোগান দিতেন চা স্ন্যাকস্। দীপক, বলরাম, সুব্রত ছাড়া সেখানে উপস্থিত থাকতেন সাহিত্য তথা কবিতাপ্রেমী ডাক্তার অরুণ বসু,আবৃত্তি শিল্পী অনিল দত্ত, অধ্যাপক সুনীলরঞ্জন বশিষ্ঠ, সঙ্গীতশিল্পী ডাক্তার অরবিন্দ দাশ প্রমুখ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।কোনও কোনও দিন কাকদ্বীপ থেকে আসতেন কবি সামসুল হক,কবি তপন বন্দ্যোপাধ্যায়, ( তপন বন্দ্যোপাধ্যায় তখন কাকদ্বীপের ব্লক উন্নয়ন আধিকারিক) আসতেন কবি মানস রায়চৌধুরী,ধ্রুপদী পত্রিকার সম্পাদক কবি  সুশীল রায়,গল্পকার প্রভাত দেবসরকার প্রমুখ বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বগণ।কোনোদিন আসতেন সাহিত্যিক ঝড়েশ্বর চট্টোপাধ্যায় এবং অমিতাভ দত্ত। বেশ জমজমাট আলোচনা হতো সেসময়।
            কখনও কখনও  সকাল বেলাতেই  মেদিনীপুর থেকে আসতেন বররুচি পত্রিকার সম্পাদক  কবি মদনমোহন বৈতালিক এবং কবি শ্যামলকান্তি দাশ।আসতেন কবি রতনতনু ঘাটি,কবি শোভন মহাপাত্র প্রমুখ কবিগণ।আসতেন জলাভূমি পত্রিকার সম্পাদক পূর্ণচন্দ্র মুনিয়ান।কাকদ্বীপ থেকে পূর্ণেন্দু ভরদ্বাজ ও আসতেন। কবি বাসুদেব দেব- এর উপস্থিতি ডায়মন্ড হারবারকে একটা সাহিত্য সংস্কৃতির পীঠস্থানে পরিনত করেছিল।
                      নেহরু যুব কেন্দ্রের উদ্যোগে এবং কবি বাসুদেব দেব এর সপ্রযত্ন সহযোগিতায় ডায়মন্ড হারবারে আয়োজিত হলো জেলা যুব উৎসব। তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী উদ্বোধন করেছিলেন উৎসব।ওই উপলক্ষ্যে অনুষ্ঠিত হলো বড়ো মাপের এক কবি সম্মেলন। অনুষ্ঠানে  ডায়মন্ড হারবারের কবিগণসহ কলকাতা থেকে প্রতিষ্ঠিত কবিগণ , আশেপাশের সাহিত্যসেবীগণ,কাকদ্বীপ থেকে আগত কবিগণের যোগদানে বেশ উল্লেখযোগ্য এক সমাবেশ ও অনুষ্ঠান হয়েছিল ।            
          ঊনিশ শ ছিয়াত্তর সালের আটাশে মার্চ দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলা সংস্কৃতি পরিষদের উদ্যোগে এবং নেহরু যুব কেন্দ্রের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় ও বাসুদেবদার আন্তরিক প্রচেষ্টায় জয়নগরের রূপ ও অরূপ মঞ্চে এক কবি সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির আসন অলঙ্কৃত করেন রবীন্দ্র পুরস্কার প্রাপ্ত প্রখ্যাত লোকসংস্কৃতি গবেষক গোপেন্দ্রকৃষ্ণ বসু।অনুষ্ঠানে উদ্বোধন সঙ্গীত পরিবেশন করেন আধুনিক কবিতার গীতিকার অজিত পান্ডে। ওই অনুষ্ঠান চলাকালীন সংবাদ আসে চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব ঋত্বিক ঘটক প্রয়াত হয়েছেন। ওখানে বসে বসেই কবি বাসুদেব দেব ঋত্বিক ঘটক স্মরণে একটি কবিতা রচনা করেন। যার প্রথম লাইন ছিল এরকম------ 'একখন্ড মেঘ এসে ঢেকে দিল ঋত্বিকের মুখ  '।কবিতাটি নিয়ে শিল্পী অজিত পান্ডে 
সঙ্গে সঙ্গে সুরারোপ করে সঙ্গীতটি অনুষ্ঠানে পরিবেশন করেন। অনুষ্ঠানে কবিতা পাঠে অংশগ্রহণ করেন কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়,মানস রায়চৌধুরী,অমিতাভ দাশগুপ্ত, বাসুদেব দেব, মলয়শংকর দাশগুপ্ত, সামসুল হক,তপন বন্দ্যোপাধ্যায়,দীপক হালদার, নিখিল চন্দ, কে এম শহীদুল্লাহ প্রমুখ কবিগণ।
                                 নেহরু যুব কেন্দ্র ও কবি বাসুদেব দেব এর সহযোগিতায় ডায়মন্ড হারবারে আয়োজিত হলো আরও একটি উল্লেখযোগ্য কবি সম্মেলন। প্রেক্ষাগৃহ ডায়মন্ড টকীজ ভাড়া করে সারা রাতের কবি সম্মেলন। উপরোক্ত কবিগণের মুখ্য অংশের উপস্থিতি ঘটেছিল উক্ত অনুষ্ঠানে। ওঁরা ছাড়া এসেছিলেন কবি সুশীল রায়, গল্পকার প্রভাত দেবসরকার, কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়, কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়,অজিত পান্ডে,অমিতাভ দাশগুপ্ত,কবি সামসুল হক,কবি দেবী রায়, সময়ানুগ ও দর্শক পত্রিকার সম্পাদক এবং বিশ্বজ্ঞান প্রকাশনীর কর্ণধার দেবকুমার  বসু,কবি উত্তম দাশ, কবি শ্যামলকান্তি দাশ, কবি ওয়াজেদ আলি, কবি ইন্দ্রনীল দাশ প্রমুখ কবিগণ। অংশগ্রহণ করেছিলেন ডায়মন্ড হারবারের কবি ও সাহিত্যিকগণ।
                  ওইসব অনুষ্ঠান ও ঘটনাপ্রবাহ ডায়মন্ড হারবারের সাহিত্য চর্চায় সবিশেষ উদ্দীপনার সৃষ্টি করেছিল। 
                        যুগান্তর ও অমৃত বাজার পত্রিকার সাংবাদিক অনল মন্ডলের সম্পাদনায় একসময় প্রকাশিত হলো পাক্ষিক সংবাদপত্র 'নতুন পথ '।অর্কেস্ট্রার স্বর তখন অস্তমিত।নবোদ্যমে এগিয়ে চলেছে বাসুদেবদার কালপ্রতিমা।পঁচিশে বৈশাখ ও শারদীয় উৎসব উপলক্ষে প্রকাশিত হচ্ছে কালপ্রতিমার মেদবহুল বিশেষ সংখ্যা। ধারে ও ভারে আদৃত হচ্ছে  উৎসুক ও রসিক মানুষজনের  কাছে। একদিন হঠাৎ জানা গেল গল্পকার সত্যেশ্বর চট্টোপাধ্যায় জয় করেছেন শরৎচন্দ্র স্মৃতি পুরস্কার।মাথা খোলা গাড়িতে সত্যেশ্বর চট্টোপাধ্যায়কে প্রায় বরবেশে সুসজ্জিত করে নিয়ে যাওয়া হলো পুরস্কার প্রদান স্থলে। দেবানন্দপুরে  শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বাসভবনে এই পুরস্কার প্রদান করা হয়।ডায়মন্ড হারবারবাসী হিসেবে গর্বে বুক ভরে গেল আমাদের। তাঁর সহোদর ঝড়েশ্বর চট্টোপাধ্যায় ও নিজেকে সবার সামনে তুলে ধরছেন সমান উদ্যমে। ঝড়েশ্বর পেলেন প্রতিশ্রুতি পুরস্কার। সাহিত্য চর্চায় ডায়মন্ড হারবার তখন ফুটছে টগবগ করে। গল্প লিখছেন অমিতাভ দত্ত। ঝড়েশ্বর এবং অমিতাভর গল্প প্রকাশিত হচ্ছে দেশ, আনন্দ বাজারসহ কলকাতার বহু নামিদামি প্রতিষ্ঠিত পত্র- পত্রিকায়।দীপক হালদারের কবিতা দেখা যেতে লাগল এক্ষণ, অমৃত,প্রতিক্ষণ, বারোমাস প্রভৃতি পত্র- পত্রিকায়।
প্রকাশিত হলো বলরাম বাহাদুরের কাব্যগ্রন্থ ' বেঁচে আছি '।রফিক উল ইসলাম ততদিনে কবি হিসেবে পরিচিত ও প্রতিষ্ঠিত। কলকাতার কাগজে তাঁর কবিতা প্রকাশিত হচ্ছে তখন নিয়মিত। প্রকাশিত হলো তাঁর কাব্যগ্রন্থ 'জলের মত সুখে আছি '।তাজিমুর রহমান , অরূপ দত্ত,রিয়াদ হায়দার  নামের তিন তরুণ কবির সাক্ষাৎ পাওয়া গেল প্রায় এসময়েই।প্রকাশিত হলো অমিতাভ দত্তর গল্পগ্রন্থ  'অসুখে অনসুখে '।যদিও ঝড়েশ্বর তখন লিখে চলেছেন পুরোদস্তুর। বহু গ্রন্থ প্রকাশিত তাঁর। সহিস,স্বজনভূমি,নতুন মেম,পূবের মেঘ দক্ষিণের আকাশ ' ইত্যাদি গ্রন্থের জন্য তিনি বেশ উল্লেখযোগ্য গল্পকারও ঔপন্যাসিক  হিসেবে পরিচিতি অর্জন করেছেন। তাঁর গল্প ও উপন্যাস মনোরঞ্জন করছে রসিক হৃদয়। তারই স্বীকৃতি স্বরূপ তিনি পেলেন বঙ্কিমচন্দ্র স্মৃতি পুরস্কার, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা অকাদেমি থেকে। 
                         সমসময়ে আরও কয়েকটি নতুন মুখ দেখা দিল সাহিত্য চর্চা ক্ষেত্রে। গৌতম ব্রম্ভর্ষি,তপন ত্রিপাঠী,সুপ্রকাশ ঘোষ, অমলেন্দু বিকাশ দাশ,সাকিল আহমেদ ,নিখিল রঞ্জন হালদার প্রমুখ ধীরে ধীরে প্রকাশিত হচ্ছেন সাহিত্য অঙ্গনে।
                      কবিতা, গল্প- উপন্যাস নিয়ে চর্চা চললেও সাহিত্যের অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা প্রবন্ধসাহিত্য নিয়ে চর্চার তেমন কোনও অগ্রগতি দেখা যাচ্ছিল না। অতীতে তাকালে দেখতে পাই ওই শাখাকে সমৃদ্ধ করতে সচেষ্ট হয়েছিলেন ডক্টর শিবপ্রসাদ হালদার, ডক্টর দুলাল চৌধুরী,অধ্যাপক গোপাল বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বগণ। পরবর্তীকালে ডাক্তার অরুণ বসু,বিভুপ্রসাদ বসু,শিশির দাস প্রমুখ ব্যক্তিত্বগণ। 
               বিভুপ্রসাদ বসু এবং শিশির দাস- এর নাম সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রে আলাদা করে সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। বিভুপ্রসাদ বসু কবি হিসেবে যেমন প্রতিষ্ঠিত ছিলেন তেমনই বসুধারা নামে একটি সুন্দর ও সম্মানজনক সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনা করতেন। বিখ্যাত লেখকদের লেখায় ভরা থাকত বসুধারার অন্দর মহল।শিশির দাস সর্বোতভাবে আর এক সাহিত্যের সাধক।তাঁর রচিত 'আগুনের শাখা প্রশাখা ', 'ত্রিশূল ',ছাড়াও কাকদ্বীপের তেভাগা আন্দোলন নিয়ে রচিত উপন্যাস 'শৃঙ্খলিত মৃত্তিকা 'বাংলা সাহিত্যে উল্লেখযোগ্য সংযোজন। ওসব ছাড়াও ইসলাম ধর্ম নিয়ে তাঁর গবেষণাধর্মী গ্রন্থ  ' প্রিয়তম নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম  'উল্লেখযোগ্য কীর্তি সাক্ষ্য বহন করে।এছাড়া বুদ্ধদেব এর জীবন ও দর্শন নিয়ে রচনা করেছেন গ্রন্থ। শ্রেষ্ঠ মানুষ তৈরির লক্ষে রচনা করেন জগন্নিবাস।বেশ কয়েকটি কাব্যগ্রন্থও রচনা করেছেন তিনি।তাঁর একাগ্রতা, নিষ্ঠা,পান্ডিত্য শ্রদ্ধা এবং সমীহ সঞ্চারক।ডক্টর গৌরাঙ্গ চক্রবর্তী রচনা করলেন  'কাকদ্বীপে তেভাগার লড়াই 'নামে এক নিরপেক্ষ, প্রামাণ্য ও গবেষণামূলক গ্রন্থ। 


ছবি: বিধান দেব

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন