ডায়মন্ডহারবারেসাহিত্য চর্চার ইতিবৃত্ত
২
দীপক হালদার
যে ভূমি এরকম ফলবতী হয়ে উঠছে, যার অন্তঃসলিলা উর্বরতা ক্রমশ সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রকে আরও আকর্ষণীয় আকাশের ছায়াতল বিছিয়ে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে, জানতে ইচ্ছে করে তার ভৌগোলিক অবস্থান।
পরায়ত্ত পরগনার গবেষকের সিদ্ধান্ত অনুসারে
ডায়মন্ডহারবার ভূগোলকের বাইশ ডিগ্রি এগারো মিনিট এবং বাইশ ডিগ্রি দশ মিনিট উত্তর অক্ষাংশে আর আশি ডিগ্রি এগারো মিনিট এবং আশি ডিগ্রি বারো মিনিট পূর্ব দ্রাঘিমাংশে অবস্থিত ।কলকাতা ফোর্ট উইলিয়াম থেকে চিংড়ি খাল ফোর্ট, ডায়মন্ডহারবার, হুগলি নদীপথে একচল্লিশ নটিক্যাল মাইল বা পঁচাত্তর দশমিক ছ'শ পঁয়তাল্লিশ কিলোমিটার দূরত্ব।এখান থেকে আটচল্লিশ নটিক্যাল মাইল দূরে নদীর সমুদ্র সঙ্গম স্থল ,যেখানে সাংখ্য দর্শন প্রণেতা নিরীশ্বরবাদী মহামুনি কপিল খ্রিস্টপূর্ব পাঁচ শ চল্লিশ অব্দে আর্য ভারতের মুনিঋষিগণ কর্তৃক নির্বাসিত হয়ে এসেছিলেন। সারা ভারতের পূজিত কপিলের আশ্রম ডায়মন্ডহারবার মহকুমার অন্তর্গত দক্ষিণ সাগর ভূখেন্ডর অংশবিশেষ ।
ইতিহাসের উপাদানের মতো সাহিত্য চর্চার উপাদানও যোগান দেয় দেশ জাতি সময় কাল ও মানুষ ।স্থানিক প্রাকৃতিক পরিবেশ, সামাজিক গঠন ও অবস্থা ,তার ইতিহাস ঐতিহ্য, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও সম্পদ, লৌকিক দেবদেবী, উৎসব, আচার আচরণ, অনুষ্ঠান,পোশাক পরিচ্ছদ ,ভাষা স- ব সমস্ত কিছু সাহিত্য চর্চার শরীরে রসদ যোগায়।যেখানে, যে ভূমিতে ওসবের আধিক্য বেশি সেখানকার সাহিত্য তত বেশি রসসিক্ত ও উপাদেয় হয়ে ওঠে ।
ডায়মন্ডহারবারের অবস্থানে প্রকৃতি দুহাত উপুড় করে ধরে দিয়েছেন তাঁর দাক্ষিণ্য।
এই মহকুমার দক্ষিণাংশের খাড়ি পরগনা, পাল যুগের খাড়ি মন্ডল এবং সেন যুগের ব্যাঘ্রতটি মন্ডল ।এর ভূ গঠনে অস্থিরতার ইতিহাস, নদীগুলির ভাঙাগড়ার প্রক্রিয়ায় নির্ভরশীল এগুলো ছিল সুন্দরবন । এই বন, মহাভারতের তেরটা মহাবনের একটি, আঙ্গিরিয়া অরণ্যের একাংশ । অয়নবৃত্তীয় প্রভাবিত বন। লিটোরাল ফরেস্ট । সুন্দরী বৃক্ষের আধিক্য হেতু নাম সুন্দরবন ।
মহাভারতে, রঘুবংশে এবং কয়েকটি পুরাণে গাঙ্গেয় বদ্বীপের এই অংশের উল্লেখ আছে । টলেমি এবং পেরিপ্লাস থেকে জানা যায় গঙ্গারিদের রাজা গঙ্গে বন্দরে বাস করতেন।
কাকদ্বীপ অঞ্চলের অধিবাসী গবেষক
শ্রী নরোত্তম হালদার মহাশয় গঙ্গারিদ বা গঙ্গারিড নিয়ে খুব উল্লেখযোগ্য গবেষণা করেছেন ।প্রামাণ্য গ্রন্থ রচনাসহ বহু প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও সংগ্রহ করেছেন ।তিনি এভাবেই তাঁর চর্চার রসদ সংগ্রহ করেছেন ।
ডায়মন্ডহারবারের নদী তীরবর্তী দেউলপোতা প্রাচীন কাব্যের বিষয় ।এখানে প্রস্তর যুগ থেকে প্রাচীন হিন্দু যুগের পুরা উপকরণ পাওয়া গেছে বিভিন্ন সময়ে ।
প্রাচীন ভাগীরথী এবং আদি গঙ্গা ও তার শতধাবিভক্ত শাখা ও উপনদীগুলি এর সমতলভূমিকে বারবার নিয়ন্ত্রিত করেছে এবং নিজেরা তাদের প্রবাহ পথে পলি জমিয়ে ভূগঠন ক'রে নদী প্রবাহ অন্য পথ খুঁজে নিয়েছে।
বিপ্রদাস পিপলাই এর মনসামঙ্গল কাব্যে,কবিকঙ্কণ মুকুন্দরামের চন্ডীমঙ্গল কাব্যে,চৈতন্যভাগবতে এসমস্ত ভূখেন্ডর গ্রামগুলোর বিবরণ পাওয়া যায় ।
1845 সালে সারা বাংলার জেলাগুলোতে মহকুমা সৃষ্টি হয় ।তারই ফলশ্রুতি হিসেবে 1862 সালে ডায়মন্ডহারবার নামে মহকুমা সৃষ্টি হয়।মহকুমা সদরের প্রয়োজন মত ডায়মন্ডহারবারে চারটি মুন্সেফ কোর্ট, একটি সাব রেজেস্ট্রি অফিস, একটি নতুন ডাকঘর, ইলেক্ট্রিক টেলিগ্রাফ অফিস, একটি চ্যারিটেবল ডিসপেনসারি এবং একটি হাইস্কুল গড়ে ওঠে ।ওই সমস্ত কাজের জন্য বিভিন্ন অফিসের অফিসার ও নিযুক্ত হন ।
1864 সালে ডায়মন্ডহারবারে ভয়াবহ সাইক্লোন ও জলোচ্ছ্বাস হয়।ওই জলোচ্ছ্বাসে ও ঝড়ে জন এইটকেন নামে একজন ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ, তাঁর স্ত্রী এবং শিশুপুত্র মারা যায় ।
ওই প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর ইংরেজ সরকার দুর্যোগকবলিত এলাকায় সেবাকার্যের সুবিধার জন্য একজন বাঙালি অফিসার পাঠানোর প্রয়োজন অনুভব করেন ।সেইমতো যে বাঙালি অফিসার এখানে ডেপুটি ম্যাজিসেট্রটের দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তিনি হলেন সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ।তখন তাঁর বয়স ছাব্বিশ বছর ।সেসময়ে তাঁর প্রথম উপন্যাস 'Rajmohan's Wife' ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছিল কিশোরীমোহন মিত্র মহাশয় সম্পাদিত 'ইন্ডিয়ান ফিল্ড' পত্রিকায়। কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিধ্বস্ত ডায়মন্ডহারবারের জলহাওয়া তাঁর শরীরের পক্ষে অনুকূল না হওয়ায়, তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতি হওয়ায় তাঁকে তিন মাস পরে অন্যত্র বদলি করা হয়।এই অন্যত্র বারুইপুর বলে অনুমান করা হয়ে থাকে ।
নেহাত কাকতালীয় বলে মনে হলেও,বঙ্কিমচন্দ্রের ছোঁয়া পেয়ে ডায়মন্ডহারবারের সাহিত্য চর্চায় উৎসুক প্রাণ যেন নতুন করে নিজেকে ফিরে পেল।শুরু হলো আত্মপ্রকাশের পথ অন্বেষণ ।কিছুটা দেরিতে হলেও 1906 খ্রিস্টাব্দে ডায়মন্ডহারবার থেকে প্রথম পত্রিকা প্রকাশিত হয় ।হরিপদ ঘোষ এর সম্পাদনায় সাপ্তাহিক পত্রিকা 'চব্বিশ পরগনার বার্তাবহ' আত্মপ্রকাশ করে ।নবজাতকের উচ্ছ্বাসে ডায়মন্ডহারবারে তখন 'বসন্তের দখিনা পবন বলিতেছে,পাল উড়াইয়া দেও ' অবস্থা ।মূলত সংবাদ পরিবেশন পত্রিকাটির ধর্ম হ'লেও,সেই ধর্মে দীক্ষিত মানুষজনের মধ্যে যে আলোড়নের সৃষ্টি হলো তা অভাবনীয়, অতুলনীয় ।পত্রিকার সম্পাদকীয়তে যে সব রচনা থাকতো, পত্রিকায় যেসব মতামত বিশ্লেষিত হতো, তাতে যে অনুপরিমান সাহিত্যের স্বাদ থাকতো, সেই স্বাদে যে দুধের স্বাদ ঘোলে মিটত তা বলাই বাহুল্য ।
1912খ্রিস্টাব্দে ডায়মন্ডহারবার থেকে প্রকাশিত হয় ভিন্নধর্মী একটি পত্রিকা, নাম 'মাহিষ্য সুহৃদ '।সম্পাদক ছিলেন হরিপদ হালদার ।মাহিষ্য শ্রেণীর মানুষজনের মধ্যে পত্রিকাটির প্রচার - প্রসার যে আধিক্য পাবে তা স্বাভাবিক, কিন্তু অন্যান্য পাঠপিপাসু মানুষের কাছেও পত্রিকাটি বিশেষ আগ্রহের উদ্রেক ঘটিয়েছিল ।
1913খ্রিস্টাব্দের 22 শে মার্চ পন্ডিত মহেন্দ্রনাথ তত্ত্বনিধি সম্পাদিত 'ডায়মন্ডহারবার হিতৈষী ' পত্রিকা প্রকাশিত হয় ।ডায়মন্ডহারবারের নিকটস্থ পারুলিয়া গ্রামের বাসিন্দা মহেন্দ্রনাথকে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর স্বয়ং 'তত্ত্বনিধি ' উপাধি প্রদান করেছিলেন ।রানী রাসমণির স্নেহধন্য মহেন্দ্রনাথ তত্ত্বনিধি সমগ্র ডায়মন্ডহারবারের গর্ব ।শোনা যায় আলামোহন দাশের সাথেও তাঁর সম্পর্ক ছিল তাঁর ঐকান্তিক চেষ্টায় তাঁরই কর্ষিত ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে সাহিত্যের ফসল ফলতে শুরু করে ।
দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলা সংস্কৃতি পরিষদ্ বিগত বহু বছর ধরে পন্ডিত মহেন্দ্রনাথ তত্ত্বনিধির নামে এক সাহিত্য পুরস্কার ও সম্মাননা চালু রেখেছে ।প্রত্যেক প্রজাতন্ত্র দিবসে হুগলি নদীর তীরবর্তী ঋষি অরবিন্দ উদ্যানে মধ্যাহ্ন বেলায় দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার কোনো কবি, গল্প লেখক, ঔপন্যাসিক ,গবেষক বা প্রবন্ধকারকে পন্ডিত মহেন্দ্রনাথ তত্ত্বনিধি পুরস্কার ও সম্মাননা দিয়ে সম্বর্ধনা করা হয়ে থাকে ।
ঋষি অরবিন্দ উদ্যানে বটবৃক্ষের তলায় ঋষি অরবিন্দের চিতাভস্ম রক্ষিত আছে ।বিপ্লবী ঋষি অরবিন্দের নামানুসারে তাঁর জন্ম শতবর্ষে শহীদ স্তম্ভ স্থাপন এবং ওই স্থানটির নামকরণ করা হয় ঋষি অরবিন্দ উদ্যান ।
মাটির তলায় যেমন জলের সম্ভার,তেমনই অতীতের অতলে সম্পদের অপরিমান সমাহার ।ডায়মন্ড হারবারের অতীত যে কতো হীরকদ্যুতিতে উজ্জ্বল তা ভাবলে বিস্মিত হতে হয় ।
ডায়মন্ড হারবারের নিকটস্থ বড়িয়া গ্রাম সেরকম একটি স্বর্ণপ্রসু ক্ষেত্র।বড়িয়াকে সাধারণভাবে এলাকার লোকজন বোড়ে বলে ডেকে থাকে ।বোড়ের সাথে সাথে বোলসিদ্ধি নামটিও উচ্চারিত হয়ে থাকে । আসলে বোলসিদ্ধি পাশ্ববর্তী লাগোয়া একটি গ্রাম ।
এই বড়িয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন বাংলা শিক্ষা ও সংস্কৃতি জগতের এক প্রণম্য ও উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব স্যার গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায় ।শুধু উল্লেখযোগ্য বললে কম বলা হয় ।ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয় সমূহের তিনিই প্রথম ভারতীয় ভাইস চ্যান্সেলর ( 1890---1892 ) ।অনেক কীর্তিতে কীর্তিমান এই মানুষটির মেধা ও মনীষার পরিচয় তাঁর সৃষ্টিসমূহে বিদ্যমান ।তাঁর রচিত 'জ্ঞান ও কর্ম ', ' শিক্ষা ', 'এ ফিউ থটস্ অন এডুকেশন ' এবং ' দি এডুকেশন প্রব্লেম ইন ইন্ডিয়া ' বিখ্যাত । এছাড়া ঠাকুর আইন অধ্যাপক হিসেবে তাঁর প্রদত্ত বক্তৃতা 'হিন্দু ল অফ ম্যারেজ এন্ড স্ত্রীধন 'পুস্তক আকারে প্রকাশিত এবং এ বিষয়ে একটি প্রামাণ্য দলিল হিসেবে সবিশেষ উল্লেখযোগ্য।স্যার গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামানুসারে ডায়মন্ডহারবারের পরের স্টেশনের নামকরণ করা হয় গুরুদাস নগর ।জানা যায় গুরুদাসবাবু পরবর্তীকালে কলকাতার নারকেল ডাঙায় মামার বাড়িতে থাকতে শুরু করেন।
স্বর্ণপ্রসূ ডায়মন্ডহারবারের অতীত যে আরও কতো মুক্তো বুকে ধারণ করেছে তা জানলে বিস্ময়র অবকাশ থাকেনা।
ডায়মন্ডহারবারের নিকটবর্তী আরও একটি গ্রাম নেতড়া বা নিতাড়া কিংবা ন্যাতড়া। বড়িয়ার লাগোয়া বোলসিদ্ধি গ্রামও একটি রত্নপ্রসবিনী গ্রাম।
' হাসিখুশি ' 'খুকুমনির ছড়া ' গ্রন্থের জনক প্রখ্যাত শিশুসাহিত্যিক যোগীন্দ্রনাথ সরকার ছিলেন নেতড়া বা ন্যাতড়া গ্রামের কৃতী সন্তান ও বাসিন্দা ।তাঁর রচিত তিরিশখানি ছড়াগ্রন্থ ও গল্পগ্রন্থ শিশুসাহিত্যের অমূল্য সম্পদ ।এছাড়া শিশুদের উপযোগী একুশখানি পৌরানিক কাহিনী নির্ভর গ্রন্থ রচনাও তাঁর উল্লেখযোগ্য কীর্তির সাক্ষ্য বহন করে ।ওসব ছাড়াও তের- চোদ্দ খানা স্কুলপাঠ্য গ্রন্থও রচনা করেন যোগীন্দ্রনাথ সরকার ।
নেতড়া গ্রামের আর এক কৃতবিদ্য সন্তান যোগীন্দ্রনাথ বসু ।বাংলা সহিত্যের
খ্যাতিমান জীবন চরিতকার এই মানুষটিকে
সম্মাননা জানানোর জন্য স্যার আশুতোষ, স্যার গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়প্রমুখ মনীষীগণ প্রকাশ্য সভায় তাঁকে ' কবিভূষণ ' উপাধিতে ভূষিত করেন । তাঁর রচিত 'মাইকেল মধুসূদন দত্তের জীবন চরিত্র 'গ্রন্থটি বর্তমানকাল পর্যন্তও গবেষণামূলক প্রামাণ্য গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হয়।এছাড়া তাঁর উল্লেখযোগ্য অন্যান্য গ্রন্থসমূহ হলো 'অমর কীর্তি অথবা ফাদার দামিয়েনের জীবন চরিত্র ' , 'অহল্যাবাঈ ', ' শিবাজী ', 'পৃথ্বীরাজ ', 'তুকারাম চরিত্র ', 'দেববালা 'প্রভৃতি ।'সুরভি 'নামে একটি সাপ্তাহিকপত্রিকা ও সম্পাদনা করতেন যোগীন্দ্রনাথ বসু । 'ভারতের মানচিত্র ' শীর্ষক একটি প্রসিদ্ধ কবিতার ও তিনি রচয়িতা ।
এই সমস্ত কৃতী মানুষজনের কর্ষিত ক্ষেত্রেসময়ে ডায়মন্ডহারবারের মাটিতে সাহিত্য চর্চার নিত্যনতুন ফসল ফলতে শুরু করে ।উদ্ভাবনা দেখা দেয় নব উদ্যমে পত্রিকা প্রকাশ করায়। যার পরিধি বর্তমান সময়কাল পর্যন্ত বিস্তৃত ।
মাটির গভীরে যেমন জলের অফুরন্ত সঞ্চয় আমাদের তৃষ্ণা নিবারণে এবং প্রয়োজন মেটাতে সদা সচেষ্ট তেমনই অতীত তার অন্তর্জগতে যে অপরিসীম ভান্ডার সঞ্চিত রেখেছে তার পরিমাণও কম নয় ।
স্যার গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামানুসারে ডায়মন্ডহারবারের পরবর্তী গুরুদাস নগর স্টেশনে গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের আবক্ষ মর্মর মূর্তি ও ফলক স্থাপিত হয়েছে।
শিশু সাহিত্যের যাদুকররূপে খ্যাতিমান যোগীন্দ্রনাথ সরকার দারিদ্র্যের কারনে কলকাতার সিটি কলেজে এম এ পড়া অসমাপ্ত রেখে সিটি কলেজিয়েট স্কুলে শিক্ষকতার কাজে ব্রতী হন।পরে চাকরি ছেড়ে দিয়ে ' সিটি বুক সোসাইটি ' নামে একটি পুস্তক প্রকাশন সংস্থা গড়ে তোলেন ।শিশুদের বর্ণপরিচয় নতুনভাবে লিখতে গিয়ে লেখেন-------
'অ--- অজগর আসছে তেড়ে ,' 'আ------ আমটি আমি খাব পেড়ে ', ' ক------ কাকাতুয়ার মাথায় ঝুঁটি, ' 'খ------- খেঁকশিয়ালী পালায় ছুটি 'কিংবা 'হারাধনের দশটি ছেলে ' ইত্যাদি । আঠারো শ একানব্বই সালে প্রকাশিত 'হাসি ও খেলা' , আঠারো শ সাতানব্বই সালে প্রকাশিত হাসিখুশি প্রথম ভাগ,খুকুমনির ছড়া ছাড়াও তাঁর লেখা 'বনে জঙ্গলে ' , 'জানোয়ারে জানোয়ারণ্য' অত্যন্ত শিশুতোষ বই হিসেবে পরিচিত ।পন্ডিত শিবনাথ শাস্ত্রীর প্রেরণায় তাঁর 'মুকুল ' পত্রিকায় শিশুদের উপযোগী লিখে তিনি যথেষ্ট খ্যাতি ও জনপ্রিয়তা অর্জন করেন ।
ডায়মন্ডহারবার মহকুমার অন্তর্গত শ্যামবসুর চক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন চারুচন্দ্র ভান্ডারী ।জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এই ত্যাগী অহিংস আন্দোলনের যোদ্ধা 'সর্বোদয় 'নামে একটি পত্রিকা সম্পাদনা করতেন ।অর্থনীতিতে এম এ চারুচন্দ্র পরে এল এল বি পাশ করে জনপ্রিয় আইনজীবী হিসেবেও খ্যাতি অর্জন করেন ।ঊনিশ শ তিরিশ সালে মহাত্মা গান্ধীর ডাকে লবণ সত্যাগ্রহ আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন ।দশবছর কারাবরণও করেন তিনি ।স্বাধীনতার পর পশ্চিমবঙ্গের খাদ্যমন্ত্রীর পদও অলংকৃত করেছিলেন ।পরে কংগ্রেস ছেড়ে কৃষক মজদুর প্রজা পার্টির হয়ে অংশ গ্রহণ করেন এবং বিজয়ী হন।পরবর্তী সময়ে আচার্য বিনোবাভাবের আহ্বানে সাড়া দিয়ে বিধানসভার পদ সহ সমস্তরকম দলীয় রাজনীতি থেকে অব্যাহতি গ্রহণ করেন ।
দীপক হালদার
যে ভূমি এরকম ফলবতী হয়ে উঠছে, যার অন্তঃসলিলা উর্বরতা ক্রমশ সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রকে আরও আকর্ষণীয় আকাশের ছায়াতল বিছিয়ে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে, জানতে ইচ্ছে করে তার ভৌগোলিক অবস্থান।
পরায়ত্ত পরগনার গবেষকের সিদ্ধান্ত অনুসারে
ডায়মন্ডহারবার ভূগোলকের বাইশ ডিগ্রি এগারো মিনিট এবং বাইশ ডিগ্রি দশ মিনিট উত্তর অক্ষাংশে আর আশি ডিগ্রি এগারো মিনিট এবং আশি ডিগ্রি বারো মিনিট পূর্ব দ্রাঘিমাংশে অবস্থিত ।কলকাতা ফোর্ট উইলিয়াম থেকে চিংড়ি খাল ফোর্ট, ডায়মন্ডহারবার, হুগলি নদীপথে একচল্লিশ নটিক্যাল মাইল বা পঁচাত্তর দশমিক ছ'শ পঁয়তাল্লিশ কিলোমিটার দূরত্ব।এখান থেকে আটচল্লিশ নটিক্যাল মাইল দূরে নদীর সমুদ্র সঙ্গম স্থল ,যেখানে সাংখ্য দর্শন প্রণেতা নিরীশ্বরবাদী মহামুনি কপিল খ্রিস্টপূর্ব পাঁচ শ চল্লিশ অব্দে আর্য ভারতের মুনিঋষিগণ কর্তৃক নির্বাসিত হয়ে এসেছিলেন। সারা ভারতের পূজিত কপিলের আশ্রম ডায়মন্ডহারবার মহকুমার অন্তর্গত দক্ষিণ সাগর ভূখেন্ডর অংশবিশেষ ।
ইতিহাসের উপাদানের মতো সাহিত্য চর্চার উপাদানও যোগান দেয় দেশ জাতি সময় কাল ও মানুষ ।স্থানিক প্রাকৃতিক পরিবেশ, সামাজিক গঠন ও অবস্থা ,তার ইতিহাস ঐতিহ্য, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও সম্পদ, লৌকিক দেবদেবী, উৎসব, আচার আচরণ, অনুষ্ঠান,পোশাক পরিচ্ছদ ,ভাষা স- ব সমস্ত কিছু সাহিত্য চর্চার শরীরে রসদ যোগায়।যেখানে, যে ভূমিতে ওসবের আধিক্য বেশি সেখানকার সাহিত্য তত বেশি রসসিক্ত ও উপাদেয় হয়ে ওঠে ।
ডায়মন্ডহারবারের অবস্থানে প্রকৃতি দুহাত উপুড় করে ধরে দিয়েছেন তাঁর দাক্ষিণ্য।
এই মহকুমার দক্ষিণাংশের খাড়ি পরগনা, পাল যুগের খাড়ি মন্ডল এবং সেন যুগের ব্যাঘ্রতটি মন্ডল ।এর ভূ গঠনে অস্থিরতার ইতিহাস, নদীগুলির ভাঙাগড়ার প্রক্রিয়ায় নির্ভরশীল এগুলো ছিল সুন্দরবন । এই বন, মহাভারতের তেরটা মহাবনের একটি, আঙ্গিরিয়া অরণ্যের একাংশ । অয়নবৃত্তীয় প্রভাবিত বন। লিটোরাল ফরেস্ট । সুন্দরী বৃক্ষের আধিক্য হেতু নাম সুন্দরবন ।
মহাভারতে, রঘুবংশে এবং কয়েকটি পুরাণে গাঙ্গেয় বদ্বীপের এই অংশের উল্লেখ আছে । টলেমি এবং পেরিপ্লাস থেকে জানা যায় গঙ্গারিদের রাজা গঙ্গে বন্দরে বাস করতেন।
কাকদ্বীপ অঞ্চলের অধিবাসী গবেষক
শ্রী নরোত্তম হালদার মহাশয় গঙ্গারিদ বা গঙ্গারিড নিয়ে খুব উল্লেখযোগ্য গবেষণা করেছেন ।প্রামাণ্য গ্রন্থ রচনাসহ বহু প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও সংগ্রহ করেছেন ।তিনি এভাবেই তাঁর চর্চার রসদ সংগ্রহ করেছেন ।
ডায়মন্ডহারবারের নদী তীরবর্তী দেউলপোতা প্রাচীন কাব্যের বিষয় ।এখানে প্রস্তর যুগ থেকে প্রাচীন হিন্দু যুগের পুরা উপকরণ পাওয়া গেছে বিভিন্ন সময়ে ।
প্রাচীন ভাগীরথী এবং আদি গঙ্গা ও তার শতধাবিভক্ত শাখা ও উপনদীগুলি এর সমতলভূমিকে বারবার নিয়ন্ত্রিত করেছে এবং নিজেরা তাদের প্রবাহ পথে পলি জমিয়ে ভূগঠন ক'রে নদী প্রবাহ অন্য পথ খুঁজে নিয়েছে।
বিপ্রদাস পিপলাই এর মনসামঙ্গল কাব্যে,কবিকঙ্কণ মুকুন্দরামের চন্ডীমঙ্গল কাব্যে,চৈতন্যভাগবতে এসমস্ত ভূখেন্ডর গ্রামগুলোর বিবরণ পাওয়া যায় ।
1845 সালে সারা বাংলার জেলাগুলোতে মহকুমা সৃষ্টি হয় ।তারই ফলশ্রুতি হিসেবে 1862 সালে ডায়মন্ডহারবার নামে মহকুমা সৃষ্টি হয়।মহকুমা সদরের প্রয়োজন মত ডায়মন্ডহারবারে চারটি মুন্সেফ কোর্ট, একটি সাব রেজেস্ট্রি অফিস, একটি নতুন ডাকঘর, ইলেক্ট্রিক টেলিগ্রাফ অফিস, একটি চ্যারিটেবল ডিসপেনসারি এবং একটি হাইস্কুল গড়ে ওঠে ।ওই সমস্ত কাজের জন্য বিভিন্ন অফিসের অফিসার ও নিযুক্ত হন ।
1864 সালে ডায়মন্ডহারবারে ভয়াবহ সাইক্লোন ও জলোচ্ছ্বাস হয়।ওই জলোচ্ছ্বাসে ও ঝড়ে জন এইটকেন নামে একজন ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ, তাঁর স্ত্রী এবং শিশুপুত্র মারা যায় ।
ওই প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর ইংরেজ সরকার দুর্যোগকবলিত এলাকায় সেবাকার্যের সুবিধার জন্য একজন বাঙালি অফিসার পাঠানোর প্রয়োজন অনুভব করেন ।সেইমতো যে বাঙালি অফিসার এখানে ডেপুটি ম্যাজিসেট্রটের দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তিনি হলেন সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ।তখন তাঁর বয়স ছাব্বিশ বছর ।সেসময়ে তাঁর প্রথম উপন্যাস 'Rajmohan's Wife' ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছিল কিশোরীমোহন মিত্র মহাশয় সম্পাদিত 'ইন্ডিয়ান ফিল্ড' পত্রিকায়। কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিধ্বস্ত ডায়মন্ডহারবারের জলহাওয়া তাঁর শরীরের পক্ষে অনুকূল না হওয়ায়, তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতি হওয়ায় তাঁকে তিন মাস পরে অন্যত্র বদলি করা হয়।এই অন্যত্র বারুইপুর বলে অনুমান করা হয়ে থাকে ।
নেহাত কাকতালীয় বলে মনে হলেও,বঙ্কিমচন্দ্রের ছোঁয়া পেয়ে ডায়মন্ডহারবারের সাহিত্য চর্চায় উৎসুক প্রাণ যেন নতুন করে নিজেকে ফিরে পেল।শুরু হলো আত্মপ্রকাশের পথ অন্বেষণ ।কিছুটা দেরিতে হলেও 1906 খ্রিস্টাব্দে ডায়মন্ডহারবার থেকে প্রথম পত্রিকা প্রকাশিত হয় ।হরিপদ ঘোষ এর সম্পাদনায় সাপ্তাহিক পত্রিকা 'চব্বিশ পরগনার বার্তাবহ' আত্মপ্রকাশ করে ।নবজাতকের উচ্ছ্বাসে ডায়মন্ডহারবারে তখন 'বসন্তের দখিনা পবন বলিতেছে,পাল উড়াইয়া দেও ' অবস্থা ।মূলত সংবাদ পরিবেশন পত্রিকাটির ধর্ম হ'লেও,সেই ধর্মে দীক্ষিত মানুষজনের মধ্যে যে আলোড়নের সৃষ্টি হলো তা অভাবনীয়, অতুলনীয় ।পত্রিকার সম্পাদকীয়তে যে সব রচনা থাকতো, পত্রিকায় যেসব মতামত বিশ্লেষিত হতো, তাতে যে অনুপরিমান সাহিত্যের স্বাদ থাকতো, সেই স্বাদে যে দুধের স্বাদ ঘোলে মিটত তা বলাই বাহুল্য ।
1912খ্রিস্টাব্দে ডায়মন্ডহারবার থেকে প্রকাশিত হয় ভিন্নধর্মী একটি পত্রিকা, নাম 'মাহিষ্য সুহৃদ '।সম্পাদক ছিলেন হরিপদ হালদার ।মাহিষ্য শ্রেণীর মানুষজনের মধ্যে পত্রিকাটির প্রচার - প্রসার যে আধিক্য পাবে তা স্বাভাবিক, কিন্তু অন্যান্য পাঠপিপাসু মানুষের কাছেও পত্রিকাটি বিশেষ আগ্রহের উদ্রেক ঘটিয়েছিল ।
1913খ্রিস্টাব্দের 22 শে মার্চ পন্ডিত মহেন্দ্রনাথ তত্ত্বনিধি সম্পাদিত 'ডায়মন্ডহারবার হিতৈষী ' পত্রিকা প্রকাশিত হয় ।ডায়মন্ডহারবারের নিকটস্থ পারুলিয়া গ্রামের বাসিন্দা মহেন্দ্রনাথকে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর স্বয়ং 'তত্ত্বনিধি ' উপাধি প্রদান করেছিলেন ।রানী রাসমণির স্নেহধন্য মহেন্দ্রনাথ তত্ত্বনিধি সমগ্র ডায়মন্ডহারবারের গর্ব ।শোনা যায় আলামোহন দাশের সাথেও তাঁর সম্পর্ক ছিল তাঁর ঐকান্তিক চেষ্টায় তাঁরই কর্ষিত ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে সাহিত্যের ফসল ফলতে শুরু করে ।
দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলা সংস্কৃতি পরিষদ্ বিগত বহু বছর ধরে পন্ডিত মহেন্দ্রনাথ তত্ত্বনিধির নামে এক সাহিত্য পুরস্কার ও সম্মাননা চালু রেখেছে ।প্রত্যেক প্রজাতন্ত্র দিবসে হুগলি নদীর তীরবর্তী ঋষি অরবিন্দ উদ্যানে মধ্যাহ্ন বেলায় দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার কোনো কবি, গল্প লেখক, ঔপন্যাসিক ,গবেষক বা প্রবন্ধকারকে পন্ডিত মহেন্দ্রনাথ তত্ত্বনিধি পুরস্কার ও সম্মাননা দিয়ে সম্বর্ধনা করা হয়ে থাকে ।
ঋষি অরবিন্দ উদ্যানে বটবৃক্ষের তলায় ঋষি অরবিন্দের চিতাভস্ম রক্ষিত আছে ।বিপ্লবী ঋষি অরবিন্দের নামানুসারে তাঁর জন্ম শতবর্ষে শহীদ স্তম্ভ স্থাপন এবং ওই স্থানটির নামকরণ করা হয় ঋষি অরবিন্দ উদ্যান ।
মাটির তলায় যেমন জলের সম্ভার,তেমনই অতীতের অতলে সম্পদের অপরিমান সমাহার ।ডায়মন্ড হারবারের অতীত যে কতো হীরকদ্যুতিতে উজ্জ্বল তা ভাবলে বিস্মিত হতে হয় ।
ডায়মন্ড হারবারের নিকটস্থ বড়িয়া গ্রাম সেরকম একটি স্বর্ণপ্রসু ক্ষেত্র।বড়িয়াকে সাধারণভাবে এলাকার লোকজন বোড়ে বলে ডেকে থাকে ।বোড়ের সাথে সাথে বোলসিদ্ধি নামটিও উচ্চারিত হয়ে থাকে । আসলে বোলসিদ্ধি পাশ্ববর্তী লাগোয়া একটি গ্রাম ।
এই বড়িয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন বাংলা শিক্ষা ও সংস্কৃতি জগতের এক প্রণম্য ও উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব স্যার গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায় ।শুধু উল্লেখযোগ্য বললে কম বলা হয় ।ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয় সমূহের তিনিই প্রথম ভারতীয় ভাইস চ্যান্সেলর ( 1890---1892 ) ।অনেক কীর্তিতে কীর্তিমান এই মানুষটির মেধা ও মনীষার পরিচয় তাঁর সৃষ্টিসমূহে বিদ্যমান ।তাঁর রচিত 'জ্ঞান ও কর্ম ', ' শিক্ষা ', 'এ ফিউ থটস্ অন এডুকেশন ' এবং ' দি এডুকেশন প্রব্লেম ইন ইন্ডিয়া ' বিখ্যাত । এছাড়া ঠাকুর আইন অধ্যাপক হিসেবে তাঁর প্রদত্ত বক্তৃতা 'হিন্দু ল অফ ম্যারেজ এন্ড স্ত্রীধন 'পুস্তক আকারে প্রকাশিত এবং এ বিষয়ে একটি প্রামাণ্য দলিল হিসেবে সবিশেষ উল্লেখযোগ্য।স্যার গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামানুসারে ডায়মন্ডহারবারের পরের স্টেশনের নামকরণ করা হয় গুরুদাস নগর ।জানা যায় গুরুদাসবাবু পরবর্তীকালে কলকাতার নারকেল ডাঙায় মামার বাড়িতে থাকতে শুরু করেন।
স্বর্ণপ্রসূ ডায়মন্ডহারবারের অতীত যে আরও কতো মুক্তো বুকে ধারণ করেছে তা জানলে বিস্ময়র অবকাশ থাকেনা।
ডায়মন্ডহারবারের নিকটবর্তী আরও একটি গ্রাম নেতড়া বা নিতাড়া কিংবা ন্যাতড়া। বড়িয়ার লাগোয়া বোলসিদ্ধি গ্রামও একটি রত্নপ্রসবিনী গ্রাম।
' হাসিখুশি ' 'খুকুমনির ছড়া ' গ্রন্থের জনক প্রখ্যাত শিশুসাহিত্যিক যোগীন্দ্রনাথ সরকার ছিলেন নেতড়া বা ন্যাতড়া গ্রামের কৃতী সন্তান ও বাসিন্দা ।তাঁর রচিত তিরিশখানি ছড়াগ্রন্থ ও গল্পগ্রন্থ শিশুসাহিত্যের অমূল্য সম্পদ ।এছাড়া শিশুদের উপযোগী একুশখানি পৌরানিক কাহিনী নির্ভর গ্রন্থ রচনাও তাঁর উল্লেখযোগ্য কীর্তির সাক্ষ্য বহন করে ।ওসব ছাড়াও তের- চোদ্দ খানা স্কুলপাঠ্য গ্রন্থও রচনা করেন যোগীন্দ্রনাথ সরকার ।
নেতড়া গ্রামের আর এক কৃতবিদ্য সন্তান যোগীন্দ্রনাথ বসু ।বাংলা সহিত্যের
খ্যাতিমান জীবন চরিতকার এই মানুষটিকে
সম্মাননা জানানোর জন্য স্যার আশুতোষ, স্যার গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়প্রমুখ মনীষীগণ প্রকাশ্য সভায় তাঁকে ' কবিভূষণ ' উপাধিতে ভূষিত করেন । তাঁর রচিত 'মাইকেল মধুসূদন দত্তের জীবন চরিত্র 'গ্রন্থটি বর্তমানকাল পর্যন্তও গবেষণামূলক প্রামাণ্য গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হয়।এছাড়া তাঁর উল্লেখযোগ্য অন্যান্য গ্রন্থসমূহ হলো 'অমর কীর্তি অথবা ফাদার দামিয়েনের জীবন চরিত্র ' , 'অহল্যাবাঈ ', ' শিবাজী ', 'পৃথ্বীরাজ ', 'তুকারাম চরিত্র ', 'দেববালা 'প্রভৃতি ।'সুরভি 'নামে একটি সাপ্তাহিকপত্রিকা ও সম্পাদনা করতেন যোগীন্দ্রনাথ বসু । 'ভারতের মানচিত্র ' শীর্ষক একটি প্রসিদ্ধ কবিতার ও তিনি রচয়িতা ।
এই সমস্ত কৃতী মানুষজনের কর্ষিত ক্ষেত্রেসময়ে ডায়মন্ডহারবারের মাটিতে সাহিত্য চর্চার নিত্যনতুন ফসল ফলতে শুরু করে ।উদ্ভাবনা দেখা দেয় নব উদ্যমে পত্রিকা প্রকাশ করায়। যার পরিধি বর্তমান সময়কাল পর্যন্ত বিস্তৃত ।
মাটির গভীরে যেমন জলের অফুরন্ত সঞ্চয় আমাদের তৃষ্ণা নিবারণে এবং প্রয়োজন মেটাতে সদা সচেষ্ট তেমনই অতীত তার অন্তর্জগতে যে অপরিসীম ভান্ডার সঞ্চিত রেখেছে তার পরিমাণও কম নয় ।
স্যার গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামানুসারে ডায়মন্ডহারবারের পরবর্তী গুরুদাস নগর স্টেশনে গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের আবক্ষ মর্মর মূর্তি ও ফলক স্থাপিত হয়েছে।
শিশু সাহিত্যের যাদুকররূপে খ্যাতিমান যোগীন্দ্রনাথ সরকার দারিদ্র্যের কারনে কলকাতার সিটি কলেজে এম এ পড়া অসমাপ্ত রেখে সিটি কলেজিয়েট স্কুলে শিক্ষকতার কাজে ব্রতী হন।পরে চাকরি ছেড়ে দিয়ে ' সিটি বুক সোসাইটি ' নামে একটি পুস্তক প্রকাশন সংস্থা গড়ে তোলেন ।শিশুদের বর্ণপরিচয় নতুনভাবে লিখতে গিয়ে লেখেন-------
'অ--- অজগর আসছে তেড়ে ,' 'আ------ আমটি আমি খাব পেড়ে ', ' ক------ কাকাতুয়ার মাথায় ঝুঁটি, ' 'খ------- খেঁকশিয়ালী পালায় ছুটি 'কিংবা 'হারাধনের দশটি ছেলে ' ইত্যাদি । আঠারো শ একানব্বই সালে প্রকাশিত 'হাসি ও খেলা' , আঠারো শ সাতানব্বই সালে প্রকাশিত হাসিখুশি প্রথম ভাগ,খুকুমনির ছড়া ছাড়াও তাঁর লেখা 'বনে জঙ্গলে ' , 'জানোয়ারে জানোয়ারণ্য' অত্যন্ত শিশুতোষ বই হিসেবে পরিচিত ।পন্ডিত শিবনাথ শাস্ত্রীর প্রেরণায় তাঁর 'মুকুল ' পত্রিকায় শিশুদের উপযোগী লিখে তিনি যথেষ্ট খ্যাতি ও জনপ্রিয়তা অর্জন করেন ।
ডায়মন্ডহারবার মহকুমার অন্তর্গত শ্যামবসুর চক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন চারুচন্দ্র ভান্ডারী ।জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এই ত্যাগী অহিংস আন্দোলনের যোদ্ধা 'সর্বোদয় 'নামে একটি পত্রিকা সম্পাদনা করতেন ।অর্থনীতিতে এম এ চারুচন্দ্র পরে এল এল বি পাশ করে জনপ্রিয় আইনজীবী হিসেবেও খ্যাতি অর্জন করেন ।ঊনিশ শ তিরিশ সালে মহাত্মা গান্ধীর ডাকে লবণ সত্যাগ্রহ আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন ।দশবছর কারাবরণও করেন তিনি ।স্বাধীনতার পর পশ্চিমবঙ্গের খাদ্যমন্ত্রীর পদও অলংকৃত করেছিলেন ।পরে কংগ্রেস ছেড়ে কৃষক মজদুর প্রজা পার্টির হয়ে অংশ গ্রহণ করেন এবং বিজয়ী হন।পরবর্তী সময়ে আচার্য বিনোবাভাবের আহ্বানে সাড়া দিয়ে বিধানসভার পদ সহ সমস্তরকম দলীয় রাজনীতি থেকে অব্যাহতি গ্রহণ করেন ।
ক্রমশ
ছবি: বিধান দেব

ডায়মণ্ডহারবার মহকুমা সম্পর্কে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আছে। আশাকরি আগামী দিনে আরো অনেক অনেক তথ্য জানা যাবে। অপেক্ষায় রইলাম।
উত্তরমুছুন