স্কুলে ভর্তি হওয়ার আগে থেকেই তোতলামির শুরু। প্রথমদিকে একই কথা ,একই সিলেবল বলতে গিয়ে আটকে যাওয়া, বয়ঃসন্ধিতে সেই সমস্যা ভয়ানক আকার ধারণ করল।পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছালো যে কথা বলাই বন্ধ হয়ে গেল ,মুখ দিয়ে শুধু একটা অস্পষ্ট ‘উঁহু’ জাতীয় আওয়াজ। অনেক সময় দেখা যায় একটি নির্দিষ্ট বয়সের পর তোতলামি আপনাআপনি সেরে যায় এক্ষেত্রে দেখা গেল সমস্যাটা পিছু ছাড়ল না কিছুতেই। বরং জোর করে কথা বলতে গিয়ে ব্যাপারটা বিতিকিচ্ছিরি এক অবস্থায় দাঁড়াত মাঝেমাঝে। ছেলেটির তখন ষোল বছর বয়স ,স্থানীয় হাসপাতালে ক্লিনারের কাজ করে।বাড়ির থেকে বেশি দূরে নয় হাসপাতাল, আসা যাওয়ার পথে পড়ে একটি বইয়ের দোকান। সাইকেল চেপে হাসপাতাল থেকে ফেরার পথে বইয়ের দোকানের র্যাকে রাখা কয়েকটি বইয়ের দিকে চোখ আটকে গেল সেই কিশোরের। বইয়ের গায়ে লেখা তিনজন কবির নাম যথাক্রমে ম্যাকগাও ,হেনরি আর প্যাটেন তাঁদের নাম। বন্ধুর বাড়িতে ‘গ্রিম’ নামের একটা অ্যালবামে এই তিন কবির পারফরমেন্স আগেই শুনেছিল ছেলেটি ।বইটার কবিতাগুলো একইসঙ্গে মজার আবার গম্ভীর ,সারারাত বইটা ঘুমোতে দিল না তাকে। ভোর হওয়ার মুখে ছেলেটি নিজেই লিখে ফেলল তার জীবনের প্রথম কবিতা। সেই কিশোরটি জানত না কোনদিন সে স্বাভাবিক ভাবে কথা বলতে পারবে কিনা, কিন্তু একটা প্রত্যয় সেদিন জন্ম নিয়েছিল তার ভিতরে যে কথা বলতে পারুক বা না পারুক ,লিখতে সে পারবেই । সেইদিনই সে সিদ্ধান্ত নিল লেখক হওয়ার। মাত্র ষোল বছর বয়সে। এরপর কেটে গেছে অনেকগুলো বছর ,সেদিনের সেই কিশোর এখন যুবক , প্রায় ছয় বছর ধরে সে লিখল একটাই কবিতার বই ___ যে বইয়ের ভরকেন্দ্র তোতলামি , বইয়ের নাম ‘স্টাম’ ,নৈঃশব্দ্য আর যোগাযোগহীনতার ধারাবিবরণী।
যাঁর কথা বলছিলাম তিনি ডেভিড বেটম্যান।যে ব্যক্তি একসময়ে ঠিকভাবে কথা বলতে পারতেন না ,আজকে তিনিই অন্যতম জনপ্রিয় পারফরমিং পোয়েট।অনেক লড়াইয়ের শেষে স্পিচ থেরাপির সাহায্যে তোতলামির সমস্যা কাটিয়ে ওঠেন তিনি । বর্তমানে লিভারপুলের বাসিন্দা।কবিতা লেখার পাশাপাশি গল্প , চিত্রনাট্য এবং প্রবন্ধ লিখে থাকেন। পেশায় ক্রিয়েটিভ রাইটিং এর শিক্ষক। ২০০৭ সালে জেতেন লিভারপুল পোয়েট্রি স্ল্যাম চ্যাম্পিয়নশিপ। কুড়িটির বেশি কবিতা সংকলনে তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়েছে।তীব্র স্যাটায়ার তাঁর কবিতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থগুলি হল ___ The Ideal God Competition , From Jellybeans To Reprobation , Curse of the Killer Hedge এবং A Homage to Me । তাঁর লেখা রাজনৈতিক, তাঁর কবিতায় থাকে ঝাঁঝাল বিদ্রূপ। কবিতা পড়ার সঙ্গে কবিতা শোনার ধারাকে এই সময়ে মিলিয়ে দিচ্ছেন যেকজন কবি তাঁদের মধ্যে তিনি অন্যতম।সাহিত্যের বেলাভূমির পাঠকদের জন্য রইল এই কবির কয়েকটি কবিতার বাংলা অনুবাদ।
ডেভিড বেটম্যান
ঘোষণা
শান্তি প্রক্রিয়া থেকে
আমরা বিরতি চেয়ে নিচ্ছি
পরস্পরের দিকে গুলি ছোড়ার জন্য
আমাদের কিছুটা সময় ব্যয় করা উচিত
কত চালাক
আমার বাবা চালাকি একদম পছন্দ করতেন না। আচমকা রেগে গিয়ে
পাতি ঘরোয়া হিংসায় জড়িয়ে পড়তেন হামেশাই ,
সাধারণত মাথার পিছনে একটা সজোরে চাঁটি
কারণ তিনি সন্দেহ করতেন যাবতীয় চালাকির উৎসস্থল ওখানেই।
বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এমনটা ঘটত চটপট উত্তর দিলে
কিন্তু অন্যান্য ক্ষেত্রে ধূসর কোনো অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসত :
মাথার পিছন দিকে চাঁটি আর সেই প্রশ্নবাণ “নিজেকে খুব চালাক মনে করো ,তাই না?”
আর তারপরেই আপনি খুঁজতে থাকবেন যা কিছু আপনি এইমাত্র বলেছিলেন অথবা করেছিলেন
যার গায়ে চালাকির কণামাত্র লেগে আছে ,
যাতে আপনার পরবর্তী কথাবার্তা আর কাজকর্ম
আরও চালাকি-মুক্ত হয়।
আমাদের পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যেই যে কোনো মুহূর্তে
দুর্ঘটনাবশত চতুরতা থাকার প্রমাণ পাওয়া যেত
যদিও এসব চালাকির কোন ছাপ্পা দেওয়া ছিল না আমাদের মাথায়
পরে আমি এই সমস্যাটিকে ‘A A’ এই দুটি ধাপে বিন্যস্ত করেছিলাম
তা বলে সমস্যা লাঘব হয় নি
কারণ যতটা সময় আমি পড়াশোনার জন্য ব্যয় করেছিলাম
পুরোটাই ছিল চালাকির জন্য নষ্ট করা সময়;
আর আমার বাবা যদি জানতেন যে আমি বড়ো হয়ে ডিগ্রি পাব
আর বিদ্রূপাত্মক কবিতা লিখব
তিনি নির্ঘাত আমাকে বলতেন
যে আমি নিজেকে খুব চালাক ভাবতাম ,ভাবতাম না ?
কিন্তু সমস্ত চালাকিই ছিল বাজে চালাকি
আর সবচেয়ে চালাক ব্যক্তি নিঃসন্দেহে সবার চেয়ে খারাপ।
আমার বাবা যদি হেরম্যান আইনস্টাইন হতেন তাহলে নিজেকে তিনি কী ঘৃণাই না করতেন !
ক্ষুদে আইনস্টাইনের মাথার পেছনে চাঁটি মারার প্রয়োজনীয়তা সর্বক্ষণ তাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াত ,
তার কানের কাছে তিনি বলে বেড়াতেন “ নিজেকে তুমি খুব চালাক ভাবো তাই না? ,
তুমি ভাবো তুমি খুউব চালাক।’’
নাইটেংগেল পাখিদের মিষ্টতা
আমি চেটেছিলাম ছোট্ট বাদামি রঙের পাখির উড়ন্ত ডানা
যখন এটা আমার জানালার সামনে দিয়ে যাচ্ছিল।
নরম আর পালকে ঢাকা একটা ঝাঁকুনি ,
সন্ধ্যা যাকে গিলে নিল,আর ফিরল না ।
অন্তর্মুখী
আমি যে পাব-এ বসে আছি
সেখানে তিনটে লোক তর্ক করছে
তারা কত অন্তর্মুখী সেই নিয়ে।
তারা ইতিমধ্যেই একমত হয়েছে
যে , অন্তর্মুখী লোকেরা
আরও গভীর , আরও সংবেদনশীল এবং পরিপূর্ণ হয়ে থাকে।
এখন কে কতটা জোরে চিল্লিয়ে
নিজেকে সবচেয়ে অন্তর্মুখী প্রমাণ করতে পারে
সেটা শোনাই বাকি আছে।
আমি পাঁচ মিনিট আগে কিছু বলতে গিয়ে
হাল ছেড়ে ফিরে এসেছি।
আমি ব্যাপারটা ওদের উপরেই ছেড়ে দিয়েছি।
বাড়ি যাও আর এই নিয়ে একটা কবিতা লেখো।
পরের রাতে সেটা পড়ে শোনাও।
সমালোচনা করে ধুয়ে দাও ওদের।
আমি প্রকৃতই গভীর
প্রকৃত সংবেদনশীল।
এবং পরিপূর্ণ

অনুবাদ ভালো হয়েছে অরিন্দম।
উত্তরমুছুনধন্যবাদ
মুছুনএই মন্তব্যটি লেখক দ্বারা সরানো হয়েছে।
উত্তরমুছুনখুব খুব ভালো লাগলো। বেটম্যান-এর কবিতার পড়তে পেরে নতুন এক অভিজ্ঞতা হলো।
উত্তরমুছুনখুব খুব ভালো লাগলো। বেটম্যান-এর কবিতার পড়তে পেরে নতুন এক অভিজ্ঞতা হলো।
উত্তরমুছুনখুব খুব ভালো লাগলো। বেটম্যান-এর কবিতার পড়তে পেরে নতুন এক অভিজ্ঞতা হলো।
উত্তরমুছুনধন্যবাদ।
মুছুনঅসামান্য অনুবাদ। কোনো প্রশংসাই যথেষ্ট নয়। পরবর্তী পর্বের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
উত্তরমুছুনধন্যবাদ
মুছুনভাল লাগল অরিন্দমভাই । এই কাজটা আপনি খুব ভাল করছেন ।
উত্তরমুছুন