বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২০

আগা শাহিদ আলি।। অনুবাদ: সায়ন রায়


 

বিদায়

একটা সময় আমি তোমার হদিস হারিয়ে ফেলি।

ওরা,উচ্ছেদ নিয়ে আসে আর একে নাম দেয় শান্তি।

যখন তুমি চলে যাও এমনকি পাথরদেরও কবর দেওয়া হয়েছিল :

অসহায়দের কোনো অস্ত্র ছিল না।


যখন বন্য পাহাড়ি ছাগল পাথরের গায়ে শরীর ঘষে,পাহাড়ের ঢালে ঝরে পড়া

তার পশমগুলি কে জড়ো করে রাখে?

ও তাঁতি,যার ফোঁড়গুলো পুরোপুরি লুপ্ত হয়ে গেছে,কে চুলের ওজন 

চাপাবে স্বর্ণকারের দাঁড়িপাল্লায়?

ওরা উচ্ছেদ নিয়ে আসে আর একে নাম দেয় শান্তি।  

স্বর্গোদ্যানের দরজায় কে আজ রাতের অভিভাবক? 


আমার স্মৃতি পুনর্বার তোমার ইতিহাসের মুখোমুখি।

মরুর ক্যারাভানের মত সেনাদের গাড়িগুলি টহল দেয় সারারাত :

মৃদু হেডলাইটগুলোর ধোঁয়া ওঠা তেলে সময় গলে যায় –-সারা শীত

জুড়ে -–তছনছ করে মৌরিফুলের গাছ।

আমরা ওদের প্রশ্ন করতে পারি না : পৃথিবীকে শেষ করা কি তোমাদের সম্পূর্ণ হয়েছে?


হ্রদের জলে মন্দির ও মসজিদের হাতগুলি পরস্পরের প্রতিচ্ছবিতে 

আষ্টেপৃষ্ঠে আটকে আছে।

তুমি কি গেরুয়া জাফরান শুষে নিয়েছ ওদের ওপর ঢেলে দেবার জন্য,

বহু শতাব্দী পর যখন তাদের এমনভাবেই দেখা যাবে এই দেশে,

যে দেশকে আমি তোমার ছায়ার সাথে সেলাই করেছি?

এই দেশে আমরা ঘর হতে বার হই দরজাগুলো হাতে নিয়ে।

শিশুরা ঘর হতে দৌড়ে যায় জানলাগুলো হাতে নিয়ে।

তুমি তোমার পিছনে তা টেনে আনো আলোকিত করিডরে।

যদি সুইচের হাতলে পড়ে টান,তুমি ছিঁড়ে যাবে সবকিছু থেকে।


একটা সময় তোমার হদিস আমি হারিয়ে ফেলি।

আমাকে তোমার প্রয়োজন ছিল।তোমার প্রয়োজন ছিল আমাকে নিখুঁত করার :

তোমার অনুপস্থিতিতে আমাকে তুমি মেজে ঘষে শত্রু করে তুলেছ।

তোমার ইতিহাস আমার স্মৃতির মুখোমুখি। 

আমিই সেই সবকিছু যা তুমি হারিয়েছ।আমায় তুমি ক্ষমা করতে পার না।

আমিই সেই সবকিছু যা তুমি হারিয়েছ। তোমার প্রকৃত শত্রু।

তোমার স্মৃতি আমার স্মৃতির মুখোমুখি :


স্বর্গোদ্যানের মধ্যে দিয়ে নরকের এক নদীর বুকে আমি নৌকো বাইছি :

অসাধারণ এক প্রেত,এখন রাত্রি।

বইঠা এক হৃদয় ;তা,ভেঙে দিচ্ছে পোর্সিলিন ঢেউগুলিকে :

এখনও রাত্রিকাল। বইঠাটি এক পদ্ম :

তা যত শুকিয়ে যাচ্ছে,আমি দাঁড় বেয়ে চলেছি মৃদুমন্দ বাতাসের দিকে

তা নরম ও কোমল যেন সে আমার প্রতি সহানুভূতিশীল। 


যদি তুমি কোনোভাবে আমার হতে পারতে,তাহলে এই পৃথিবীতে 

কোনো কিছু ঘটা বাকি থাকতো কি?

আমিই সেই সবকিছু যা তুমি হারিয়েছ। তুমি আমায় ক্ষমা করনি।

আমার স্মৃতি তোমার ইতিহাসের মুখোমুখি হয়েই চলেছে।

এখানে ক্ষমার কিছু নেই।তুমি আমায় ক্ষমা করনি।

আমার বেদনাকে এমনকি নিজের কাছেও লুকিয়ে রাখি;আমার বেদনাকে

কেবল নিজের কাছেই প্রকাশ করি।

এখানে সবকিছুই ক্ষমার যোগ্য।তুমি আমায় ক্ষমা করতে পার না।

যদি কোনোভাবে তুমি আমার হতে পারতে, 

এই পৃথিবীতে কোনো কিছুই অসম্ভব হত কি?


( প্যাট্রিসিয়া ও' নিল- এর জন্য) 



মৃত্যুর সারি


কোনো একজন এই পৃথিবীতে তোমার কথা বলে চলেছে,


জড়ো করছে খবর,বিষয় অনুযায়ী সাজিয়ে নিচ্ছে তোমার জীবন 

একটা নথির জন্য যা তুমি কখনোই দেখতে পাবে না।সে ইতিমধ্যে জানে


কোন জন্মে তুমি খুঁজে পাওনি সেই বস্তু যা আবার 

এই জন্মে তুমি হারাবে।


সে হদিস রেখেছে তোমার প্রত্যেকটা 

মৃত্যুর। তোমার এখন তাকে দরকার, কিন্তু সে এখনও তোমায় প্রশ্ন


করে যাচ্ছে,আর তার প্রত্যেকটা প্রশ্নে শেষ হয়ে যাচ্ছে তাকে খুঁজে 

পাবার তোমার শেষ সম্ভাবনা। তিনিই সেই


যাকে তুমি হারিয়েছ গত রাতে

গত জন্মের জীবনে : তিনি প্রবেশ করেছিলেন 


তোমার ঘরে আর ওই রাতের জন্য তুমি পুনরায় জন্ম

নিয়েছিলে সেই রূপে যা তিনি চান : একজন নারী 


যখন তিনি চাইলেন নারীর ভালবাসা। 


( হালা মদেলমগ-এর জন্য)


গজল

( মখদুম মহিউদ্দিন -এর লেখা থেকে গৃহীত ) 

গুজব বসন্তের --- তারা টিকে থাকে ভোর হতে গোধূলি---

সব চোখ শাখা-প্রশাখাকে ফুল ভেবে ভুল করে।


তোমার কাহিনি হয়ে ওঠে সমতুল আমাদের তৃষ্ণার, প্রিয়—

তোমার কথারা ছড়িয়ে পড়েছে ভেঙে পড়া দেশ জুড়ে। 


প্রতি রাতে আমি যখনই নিজেতে গুটিয়ে যাই,

আমার কাছে শোনে তারা তার কথা--- একা নির্জন দেশ।


ফুরিয়েছে আশা,এখন বাকি নেই তো আর কিছুই ---

যন্ত্রণার রাত শুধুই, এই ফ্যাকাশে হলদে ভোর। 


বাগানের চোখ খুলে যায়,ফুলের হৃদয়ে স্পন্দন 

যখন আমরা কথা বলি,শুধু কথা বলি হায়!চিরদিনের।


তা ছিল এবং চিরকাল তা থাকবে নিশ্চিত ---

প্রিয় তোমার এই গুজব ভাগ করে নেয় আমাদের দুঃখ।


কাশ্মীরি কবি আগা শাহিদ আলির কবিতা



আগা শাহিদ আলি (১৯৪৯-২০০১):  নিজেকে কাশ্মীরি আমেরিকান কবি হিসেবে পরিচয় দিতেন। শ্রীনগরের উচ্চশিক্ষিত সম্ভ্রান্ত আগা  পরিবারে তার জন্ম।বাবা আগা আশরফ আলি ছিলেন জম্মু ও কাশ্মীরের একজন খ্যাতনামা শিক্ষাবিদ। তার ঠাকুমা বেগম জাফর আলি কাশ্মীরের প্রথম মহিলা ম্যাট্রিকুলেট।দিল্লিতে জন্মগ্রহণ করলেও শাহিদ বড় হয়ে ওঠেন শ্রীনগরে।পরে উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি দেন আমেরিকায়। সেখানেই বসবাস শুরু করেন।অধ্যাপনা করেছেন আমেরিকার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে।পরে ব্রেণ ক্যানসারে মারাও যান সেখানে।সত্তর দশকের গোড়া থেকেই লেখা প্রকাশিত হতে থাকলেও ১৯৮৭ তে প্রকাশিত A Walk Through the Yellow pages – এই বইটি-ই তাকে প্রথম ব্যাপকভাবে পরিচিত করে তোলে।এরপর একে একে প্রকাশ পেয়েছে : A Nostalgist's Map of America (1991), The Country Without a Post Office (1997), Rooms Are Never Finished (2001), Call Me Ishmael Tonight : A Book of Ghazals (2003)।মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয় তার নির্বাচিত কবিতা : The Veiled Suite (2009)।এই বইটির সম্পাদনা ও ভূমিকা লেখেন বিশিষ্ট কবি ডোনাল্ড হল।প্রখ্যাত সমালোচক ব্রুস কিং বলেছেন : আলির কবিতা আবর্তিত হয় নিরাপত্তাহীনতা,স্মৃতিকাতরতা,মৃত্যু,ইতিহাস,পারিবারিক পূর্বসূরি,অতীতচারিতা,স্বপ্ন,বন্ধুত্ব এবং তার কবিসত্তাকে নিয়ে এক আত্মচেতনাকে ঘিরে।তিনি প্রভাবিত হয়েছেন উর্দু কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের কবিতার দ্বারা।ফয়েজের কবিতা ইংরেজিতে অনুবাদও করেন : The Rebel's Silhouette  (1992)।গজলের একটি সংকলনও তিনি সম্পাদনা করেন : Ravishing DisUnities :Real Ghazals in English (2000)।সমালোচক অমরদীপ সিং শাহিদ আলির শৈলিটিকে সাধারণ ভাবে ‘ghazalesque' বলে চিহ্নিত করেছেন।তার মতে গজলের মত ইন্দো-ইসলামিক  ঐতিহ্যের এই আঙ্গিকটিকে তিনি সার্থকভাবে  মিশিয়েছেন গল্পবলার আমেরিকান ধরনটির সঙ্গে।এখানে অনুদিত কবিতাগুলি তার The Country Without a Post Office বইয়ের অন্তর্ভুক্ত।




1 টি মন্তব্য:

কবিতা

সম্পাদকের কথা

দ্বিতীয় বর্ষ  ।। অষ্টম সংখ্যা ।। মার্চ ২০২২   খুব অসহায় লাগছে এবার। আমাদের ডান পাশে ধস। বায়ে গিরিখাত। মাথায় বোমারু। পায়ে পায়ে হিমানীর ব...