ডায়মন্ডহারবারের সাহিত্য চর্চার ইতিবৃত্ত
''আইস, আমরা সকলে মিলিয়া বাঙ্গলার ইতিহাসের অনুসন্ধান করি।যাহার যতদূর সাধ্য, সে ততদূর করুক, ক্ষুদ্রকীটযোজনব্যাপী দ্বীপ নির্মাণ করে ।একের কাজ নয় সকলে মিলিয়া করিতে হইবে ।''
-------------বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ।
নৈঃশব্দ্যের গভীরে যেমন শব্দের অনন্ত সম্ভার, তেমনই কালের অতলে থাকে অতীত ঐতিহ্যের স্বর্ণভান্ডার।ডায়মন্ডহারবার একটি প্রাচীন শহর ।মহকুমা হিসেবে ডায়মন্ডহারবার যথেষ্ট ঐতিহ্যশালীও।তাছাড়া প্রখ্যাত পর্যটন কেন্দ্র হিসেবেও এর খ্যাতি বহুল প্রসারিত ।শ্রদ্ধেয় গবেষক মনোরঞ্জন রায় তাঁর পরায়ত্ত পরগনা গ্রন্থে ডায়মন্ডহারবারের জন্মকথাপ্রসঙ্গে জানাচ্ছেন-------------
প্রথম দিককার ইউরোপীয় বনিকেরা মুড়ীগঙ্গা এষ্টুয়ারীকে রোগস্- রিভার নামে চিনতো।ওখানে তখন পর্তুগীজ জলদস্যুদের ঘাঁটি ।ইংরেজ নথিতে মুড়ীগঙ্গা 'গ্যাংম্যানস্ ক্রীক ' ও 'চ্যানেল ক্রীক ' ব'লে উল্লেখ আছে ।পশ্চিম উপকূলে মোহনা থেকে 48 নটিক্যাল মাইল উত্তরে আরেকটি আর্ম্মাডা ঘাঁটি 'ডায়মন্ড ক্রীক '। 'ডায়মন্ড ক্রীক 'থেকে ডায়মন্ডহারবার ।এই নামেই মহকুমা সদর দপ্তর ।
1862 সালে ডায়মন্ডহারবার মহকুমার জন্ম ।উনবিংশ শতকের নবজাতকের সেই পদধ্বনি এখন একবিংশ শতাব্দীর ভরা জোয়ারে ঘোরতর অনুরণন তুলেছে।আমাদের অনুসন্ধিৎসা আমাদের ক্রমাগত টেনে নিয়ে চলে তার অতীত দিনের অন্দরমহলে ।ভালো করে তাকালেই সেখানে হীরকোজ্জ্বল দ্যুতিতে ঝলমল করে ওঠে এমন কিছু ঘটনা ও নাম, যা আমাদেরকে শ্রদ্ধানত গর্বিত করেনা শুধু,সাথে সাথে বুঝতে সাহায্য করে ডায়মন্ডহারবারের অতীতকে ।যা কিনা সাহিত্য চর্চার এক সুরম্য মৃগয়াক্ষেত্র বলেও প্রতিভাত হতে পারে ।মহকুমার বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে তখন সাহিত্য রচনা, পত্র- পত্রিকা প্রকাশ ঘটে চলেছিল আপন উল্লাসের আন্তরিকতায়।যার ছোঁয়া এসময়ে বিশেষ চমকপ্রদ শুধু নয় উত্তেজক উন্মাদনাও সৃষ্টি করে ।
মুদ্রণযন্ত্র প্রবর্তনের আগে লেখাপড়ার জন্য শিলালিপি, তাম্রলেখ,মৃৎফলক প্রভৃতি ছাড়াও তালপাতা, গাছের ছাল,তুলট কাগজ, কাপড়, চামড়া বা কাঠের তক্তির ওপর লেখাজোখা হত,গ্রন্থের পান্ডুলিপিও তৈরি হত।ডায়মন্ডহারবার মহকুমার কোনো কোনো অংশে সে সবের সন্ধান পাওয়া যায় ।মহকুমার মন্দির বাজার থানার জগদীশ পুর গ্রামের প্রাচীন ও বর্ধিষ্ণু খাঁ এবং নস্কর পরিবার, বাওয়ালি গ্রামের বিখ্যাত মন্ডল পরিবারের জমিদার বাড়ি এবং মগরাহাট থানার বেলে গ্রামের হরেন্দ্রনাথ প্রামাণিকের ব্যক্তিগত পুঁথি- সংগ্রহশালা থেকে এ সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে ।
পশ্চিমবঙ্গের প্রাণরাম কালিকামঙ্গলের প্রাচীনতম কবি ।প্রাণরামের কাব্যের পুঁথি ।দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার বাওয়ালি, টালিগঞ্জ, ঘাটেশ্বরে( লক্ষ্মীকান্তপুর লাইন) পাওয়া গেছে ।
দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার কবি অযোধ্যারাম দাস 'সত্যনারায়ণ পাঁচালি 'র প্রথম রচনাকার।কবির এই পাঁচালির প্রথম পরিচয় প্রকাশ করেন স্বর্গত কালিদাস দত্ত মহাশয় ।( বরেন্দ্র রিসার্চ সোসাইটির মনোগ্রাফ নং চার, পৃষ্ঠা সতেরো) পরবর্তীকালে কবি অযোধ্যারাম রচিত মহীরাবন পালার একখানি খন্ডিত পুঁথিও সংগৃহীত হয়েছে ।তিনি গোবিন্দপুরের বাসিন্দা ছিলেন । কেউ কেউ এই গোবিন্দপুরকে ডায়মন্ডহারবার মহকুমার আবার কেউ কেউ বারুইপুর মহকুমার অন্তর্ভুক্ত বলে মনে করেন। রচনা থেকে কবির বাসস্থান ও কাব্য রচনাকাল জানা গেছে ।
অযোধ্যারামেতে বলে করিয়া প্রণাম--
জাহ্নবীর পূর্ব্বেতে গোবিন্দপুর ধাম।
সমুদ্রে বাণক্ষয় দেখ তবে কত রয় হরের আনন তারপর ।
রন্ধ্রের বর্জ্জিত রাম বিধুরে থুইয়া বাস বুঝহ সকল ধীর নর।।
পশ্চিমে জাহ্নবী মাই নিত্য দরশন পাই গোবিন্দপুরেতে নিকেতন।
অযোধ্যারামেতে গায় এতদূরে হৈল মায় মহীরাবনের উপাক্ষণ।।
দয়ারাম দাশ দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার মানুষ না হলেও চাকুরিসূত্রে বহুদিন দক্ষিণ চব্বিশ পরগনায় বাস করেন এবং এখানে বসেই ভাগবতের উদ্ভবসংবাদ রচনা করেন ।উদ্ভবসংবাদ 'সন হাজার একশত একানব্বই সালের অগ্রহায়ণ মাসে সমাপ্ত হয়।গ্রন্থের শেষে তিনি দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার কিছু কথা জানিয়েছেন ।
পরগনেতে মুড়াগাছা কাছে হাত্যাগড়।
মুস্তাফীর তালুক গ্রাম গোপালনগর।।
তাহার নাইবি লয়্যা করি প্রয়োজন ।
রচিতে উদ্ভব কথা হইল সঙরণ।।
বাঞ্ছারাম মাটীর বাড়িতে করি বাস।
পূর্ব্বদ্বারী পিড়ার চালেতে নাহি ঘাস।।
কবির নিজস্ব নিবাস খোসালপুর পরগনার কাদোয়া গ্রাম।তাঁর পিতার নাম জীবন ।জাতি বৈদ্য।কুল্পীর নিকট গোপালনগর গ্রামে তিনি বাস করতেন।
ডায়মন্ডহারবার থানার কড়াইবেড়ে গ্রামের বাসিন্দা কোনো এক অজ্ঞাত কবি অষ্টাদশ দশকের শেষের দিকে 'পঞ্চানন্দের পাঁচালি ' রচনা করেন।
এসমস্ত তথ্য এ কথাই নির্দেশ করে যে বহু প্রাচীন কাল থেকে ডায়মন্ডহারবার মহকুমার মাটিতে সাহিত্য চর্চার বীজ বপন করার কাজ শুরু হয়েছিল ।
ক্রমশ
ছবি: বিধান দেব

খুব ভাল উদ্যোগ। লেখাটা পড়ছি। চমৎকার কাকু
উত্তরমুছুনপড়ে ফেললাম। শুরুটা চমৎকার। পরবর্তী অংশের অপেক্ষায় রইলাম।
উত্তরমুছুন