বৃহস্পতিবার, ৩০ ডিসেম্বর, ২০২১

পাঠকের হাট ।। অরুণ পাঠক


 [আমার কাব্যজ্ঞানের প্রারম্ভিক পর্যায় থেকেই দেখে আসছি অগ্রজ কবিরা তাঁদের বই অকাতরে উপহার দিচ্ছেন। মুখে তৃপ্তির হাসি দাতা ও গ্রহীতার। চার চোখে সমান আগ্রহ। আশে পাশে কৌতুহল। বয়সে অনেক ছোট হলেও বহু প্রতিষ্ঠিত বিদ্বান কবি অল্পবয়সী আমাকেও তাঁদের কাব্যগ্রন্থ উপহার দিয়েছেন। আমিও আমার কাব্যগ্রন্থ ঝোলা থেকে বের করে কাঁপা কাঁপা হাতে কোনও শ্রদ্ধেয় অথবা স্নেহভাজন কবিকে উপহার দিয়ে স্বর্গীয় তৃপ্তি উপলব্ধি করি। আজও কোনও অনুষ্ঠানে গেলে এই কাব্যগ্রন্থ দেওয়া-নেওয়ার একটি বিশেষ পর্ব অলিখিতভাবে সূচিভুক্ত থাকে। তার বাইরে ডাক বিভাগের মাধ্যমেও অনেক কবি তাঁদের কাব্যগ্রন্থ আমার ঠিকানায় পাঠান।
নবীন-প্রবীণ, পরিচিত-অপরিচিত সেইসব কবিদের কাব্যগ্রন্থ নিয়ে আমি এবার আমার অনুভবের দু-চার কথা বলতে চাইছি এখানে। তবে শুধু উপহার পাওয়া কাব্যগ্রন্থ নয় সেইসঙ্গে গাঁটের কড়ি খরচ করে যে অসংখ্য কাব্যগ্রন্থ আমি এযাবৎ কিনেছি সেইসব কাব্যগ্রন্থেরও কোনও কোনওটি এই আলোচনার উপলক্ষ্য হয়ে উঠতে পারে।]


তার ভাষা তির্যক, রক্তে মোড়া


কিছু কিছু কাব্যগ্রন্থ আছে যেগুলো প্রথমবার পড়ে মনে হয় হৃদয় আঁচড়ালো না। তারপর প্রাত্যহিকতা তার আর সবকিছু দিয়ে জীবনকে সচল রাখে। কিন্তু প্রতিক্রিয়াশীল কোনও বেদনঘনানো আকুতি যত মৃদু আয়োজন নিয়েই উচ্চারিত হোক না কেন যদি সে সত্যিই কবিতা হয় তার মোহ অতিক্রম করা দুরূহ। কবিতা আক্রান্ত কোনও মানুষকে তা হাতছানি দেবেই। তখন আবার সেই শব্দতীর্থপদে আমাদের মাথা নত করতে হয়। যেমন:

যাদের হৃদয়ে ঝড় আছে
                 তারা প্রেমের ডাক বোঝে
গোপনে স্বীকার করে পার্ক
                 দু-একদিন সিনেমার টিকিট

সে রকম প্রস্তুতি ছাড়া
রাত্রির অতিক্রম ব্যর্থ হয়
                  প্রতিদিন নতুন ঠিকানা
                  তার কাছে ফিরে আসে।       (২০)

আপাত নিরীহ এই দুটি স্তবকে খুব সাধারণভাবে বলা হয়েছে প্রেমের ডাক বোঝার জন্য হৃদয়ে ঝড় থাকার প্রয়োজন। বলা বাহুল্য এই অসামান্য সত্যটি আমি এই কবিতাটি পড়েই বুঝেছি। হৃদয়ে ঝড় অর্থাৎ নিজেকে প্রেমের জন্য তছনছ করে না ফেললে সত্যিই তার আসা-যাওয়া টের পাওয়া যায় না। কবির মতে এটা এক রকম প্রস্তুতি। সেটা ছাড়া রাত্রির অতিক্রম ব্যর্থ হয়। আর প্রতিদিন নতুন ঠিকানা তার কাছে ফিরে আসে। এই নতুন ঠিকানা কি নতুন নতুন মঙ্গল ঘট? নতুন নতুন প্রেমের? এমন সূক্ষ্ম অথচ স্বাভাবিক উচ্চারণ অনেক সময়েই আমাদের চোখে পাশ কাটিয়ে যায়। এক্ষেত্রে আমারও তাই হয়েছিল। কিন্তু চোখের স্থবিরতা মনকে আটকে রাখতে পারে না। তাই বইটিকে আবার বের করতে হল। বইটির নাম 'পথের পুরোনো ধুলো'। কবি মানসকুমার চিনি। মানসদার অধিকাংশ কাব্যগ্রন্থই তাঁর কাছ থেকে উপহার পেয়েছি। আদম থেকে প্রকাশিত এই কাব্যগ্রন্থটি তিনি আমাকে দিয়েছিলেন ১৩/০৪/২০১৪ তারিখে। মানসদাকে আমি প্রথম দেখেছিলাম ১৯৯৯ বা ২০০০ সালে কোনও একদিন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজ স্ট্রিট ক্যাম্পাসের গেটের ভেতরে বামপাশে বাঁধানো সিমেন্টের মেঝেতে। পা ঝুলিয়ে বসেছিলেন সাম্যব্রত জোয়ারদারের সঙ্গে। পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন সুদীপ্ত মাজি। প্রথম দর্শনে নজর পড়েছিল তাঁর গলায় শোভিত রুদ্রাক্ষের মালায়। কোঁকড়ানো চুলে কালো ফ্রেমের চশমায় বহুল পঠিত এই কবিকে পাশে বসা সমকালীন আরেক কবি সাম্যব্রতর নাগরিক ঘরানার আত্মস্টাইলের সঙ্গে না গেলেও বেশ মনে ধরেছিল আমার। হাসি মুখে কথাও বলেছিলেন তিনি। তারপর কত জায়গায় কতভাবে তাঁর সঙ্গে দেখা। কত কাব্যগ্রন্থ আদানপ্রদান। হিসাব নেই। তেমনই একদিন।  তেমনই এই কাব্যগ্রন্থ। মানসকুমার চিনি একজন বহুপ্রজ কবি। অসংখ্য কবিতার বই তাঁর। কাব্যগ্রন্থ ছেপে ঝোলা শূন্য করতেই তিনি ভালোবাসেন।
        

 

কিন্তু কেন মানসকুমার? গত শতাব্দীর ন'য়ের দশকের কবিতার মূল বৈশিষ্ট্য ও ভাবনার সঙ্গে তাঁর কবিতার কোনও মিল নেই। যদিও নব্বইয়ের কবি হিসেবেই তাঁর পরিচয়। যদিও নব্বইয়ের কবিতা বহুবিচিত্র পথে লিখিত হয়েছে। তথাপি তাঁর কবিতা সমসময়ে বেশ ব্যাতিক্রমই ছিল। অন্ত্যমিলযুক্ত কবিতার যে চল সে সময়ে ছিল মানসকুমার চিনি সে পথে হাঁটেননি। তাঁর কবিতা বরাবরই মিতায়তনের। পাঁচ-সাতটা পঙক্তির সম্ভার। উচ্চারণও খুব মৃদু। নিজেকে প্রমাণ করার কোনও দ্রুত তাগিদ তাঁর ছিল না। বরং তিনি বিশ্বাস করেছেন জন্মগত দুরাশার শুদ্ধ অভিনিবেশগুলোকে সত্যানুভূতির মর্ম মাখিয়ে রেখে যেতে একজীবন। আর তাতেই তাঁর তৃপ্তি। তিনি লেখেন:

ঐতিহাসিক ভাস্কর্য খোদাইয়ের পর
শিল্পীকে মৃত মনে হয়          (২৬)

শিল্পী কি একজন মানুষ শুধু? নাকি মানুষের অভ্যন্তরে শিল্পী জাগ্রত হন? আমাদের যাবতীয় দ্বিধাকে নস্যাৎ করে তিনি লেখেন:

যে কবি নরম ঘাসে শ্বাস নেয়
সে অক্ষর মাড়িয়ে চলে যায়
                               আর এক কবি। (৪৬)

আহা সময়! অলসতার কোনও স্থান নেই এ বিশ্বে। জরা-যন্ত্রণার আগেই আমাদের সমাপন করতে হবে নিজের কাজ। কীভাবে বুদবুদের মতো উদগ্রীব হয়ে উঠছে চেতনাসফল এইসব ভাষ্য। চোখের আঙিনা পেরিয়ে আমাদের জীবনের অন্ধিতে-সন্ধিতে সেঁধিয়ে যাচ্ছে আমরা এ কাব্যগ্রন্থ পড়লেই বুঝতে পারব।

কিশলয় পাঠের দিন, শিশুকাল
তোমার শরীরে মানায়
                   খেলার মতো নরম বয়স
                    নতুনপাঠ ইতিহাসে ঢাকা।

এখন উগ্রপন্থী শিশুর দল
                নিখুঁত সময়ের মতো।   (১৮)

যে শিশুজীবন আমরা পেরিয়ে এসেছি তার সঙ্গে এখনকার শিশুজীবন মেলানো যায় না। কিন্তু আমরা এই ভয়াবহ শিশুদের কি বলতে পারতাম 'উগ্রপন্থী শিশুর দল'? কবি বললেন। এবং আরও বললেন 'নিখুঁত সময়ের মতো'। ভীষণ আতঙ্কিত হওয়ার মতো এই বাস্তবতা। কিন্তু একে স্বীকার করা ছাড়া কোনও উপায় নেই।
         খুব সংবেদী, নিরাভরণ কিছু আন্তরিক দেখা এখানে কবিতা হয়ে উঠেছে। কবির যাপন যেভাবে তার সমাজকে ধ্বস্ত করে কিংবা সমাজ যেভাবে কবির যাপনকে ধ্বস্ত করে সেই উভমুখ যখন কোনও কবির কলমে স্তব্ধতার অনুশীলন করে তখন আমরা যা যা পেয়ে যাই:

১   চাঁদের ভেতরে থাকে আঘাতের স্বর
     বাতাসের ভেতর যে আলো পড়ে
                 খুব চেনা, কেউ কার!         (২২)

২   যে লেখা পড়ে হারিয়েছ পথ
      সে পাখি একদিন ফিরবে ক্ষত নিয়ে
                                                     মনের দিকে      (২৯) 

৩  কত চোখ ভিজে যায় কান্নার সাথে
     চোখের পাতা যেন ফুলের বাগান।        (৩৪)


৪  ও পূর্ণিমার পথ
     চুপি চুপি ভালোবাসা হয়ে এসো
     দেখো কীভাবে নক্ষত্র ফুটছে
                                    কোনো প্রমাণ ছাড়াই।     (৩৭)

এরকম অসংখ্য উদাহরণ দেওয়া যায়। বোঝা যায় অন্তরে ভেঙেচুরে শেষ হয়ে যাওয়া এক কবিসত্তা কীভাবে মানব শরীর নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। হাঁটাচলা করেন। শুধুমাত্র কবিতাই কীভাবে হয়ে ওঠে একজন কবির শ্বাসক্রিয়া। এলোমেলো অথচ সংঘবদ্ধ, শুদ্ধ কিছু বাক্ যেন প্রলুব্ধ চিন্তার মতো ছড়িয়ে পড়ে। প্রাথমিকভাবে পারস্পরিক কোনও অন্বয় খুঁজে পাওয়া যায় না সে সবের। কিন্তু বোঝা যায় একজন কবির কম্পিত হাতে জীবনের রসায়ন নিঙরে ওঠা কিছু ব্যথা, কিছু বিচ্ছেদ আর সর্বজনীন এক বেঁচে থাকা।

বোধের অন্তরালে থাকে নির্মাণ
টুকরো মৃত্যুখণ্ড গড়িয়ে পড়ে
যেন পৃথিবীর একভাগ স্মৃতি।

শিল্পশরীরে থাকে জীবন ও শূন্যতা
ভেতরে সন্ন্যাস, তবু পুনর্জন্ম ভেবে
ভবিষ্যদ্ বাণী মাঝে মাঝে ভুল হয়।         (স্মৃতি সন্ন্যাস)

হ্যাঁ, এসব লেখায় কিছু অসংলগ্নতা আছে। যে অসংলগ্নতা, যে হেঁয়ালিপনা কবিত্বশক্তির গুণে অনন্যতা পায়  কবিত্বশক্তির সেই জোর হয়তো সবখানে নেই। কিন্তু ঢের বাংলা কবিতাকে অকারণ স্মার্টনেস আর জটিল অসংলগ্নতার গুণে, পর্যাপ্ত হেঁয়ালিপনার গুণে উতরে যেতে দেখেছি। একজন ফকিরের অন্তর্মোচন যেমন তার গানে, যে গান কেউ শুনবে সে কখনও কল্পনা করে না কবি মানসকুমার চিনিও তদ্রূপ।

এত বাঁক শরীরের ভেতরে থাকে!
আমি মুহূর্ত বুঝে অক্ষরের নীচে
                              লুকিয়ে পড়ি

যেন কাব্যের বহুদূরে স্তব্ধতা...
সমস্ত ইন্দ্রজাল ধ্বংস হবে একদিন
রহস্যের ভেতর সব ইতিহাস চেনা যাবে।     (ইন্দ্রজাল)

বিলুপ্ত পথের আয়নার জন্য তাকিয়ে থাকা কবি, একগুচ্ছ ভয়ের শব্দ দিয়ে যৌনতাকে চিনতে চাওয়া কবি মানসকুমার চিনি এভাবেই অশোধিত অলিন্দের সমস্ত পাপকে কবিতায় শুদ্ধ করে তোলেন। আমি তাকিয়ে থাকি তাঁর ঝোলার দিকে। নতুন কোনও কবিতার বই বিলিয়ে দিতে দিতে কখন সেটি হালকা হয়ে যায়।

পথের পুরোনো ধুলো ।। মানসকুমার চিনি ।। আদম ।।  আশি টাকা

ছবি : বিধান দেব 

অরুণ পাঠক:  এই শতাব্দীর সূচনালগ্নের কবি। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ বারোটি। প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'প্রশস্তির ভিন্ন রূপ' ২০০২ সালে প্রকাশিত হয়েছিল। এখনও পর্যন্ত শেষ কাব্যগ্রন্থ ' হাসি হাসি কান্নার বরফ' প্রকাশিত হয় ২০২০ সালে কলকাতা বইমেলায়। সম্পাদিত পত্রিকা : সাহিত্যের বেলাভূমি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গভাষা ও সাহিত্য-এ স্নাতকোত্তর ও শিক্ষক শিক্ষণ ডিগ্রীপ্রাপ্ত।
পেশা : শিক্ষকতা। কবিতা লেখা ও পত্রিকা সম্পাদনার জন্য বেশ কয়েকটি পুরস্কারে ভূষিত।

1 টি মন্তব্য:

  1. বহুদিন ধরে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় তাঁর কবিতা পড়ে আসছি। তাঁর কবিতার আলোচনা এই প্রথম পড়লাম । ভালো লাগল ।

    উত্তরমুছুন

কবিতা

সম্পাদকের কথা

দ্বিতীয় বর্ষ  ।। অষ্টম সংখ্যা ।। মার্চ ২০২২   খুব অসহায় লাগছে এবার। আমাদের ডান পাশে ধস। বায়ে গিরিখাত। মাথায় বোমারু। পায়ে পায়ে হিমানীর ব...