রবিবার, ২৩ মে, ২০২১

গদ্য ।। পার্থজিৎ চন্দ


 


‘পঞ্চায়েতের নিকট চৌকিদারের আর্জি’ ও তারাপদ রায়ের কবিতা 



‘Comrades,’ he said, ‘here is a point that must be settled. The wild creatures, such as rats and rabbits – are they our friend or our enemies? Let us put it to the vote. I propose this question to the meeting: Are rats comrades?’

The vote was taken at once, and it was agreed by an overwhelming majority that rats were comrades. There were only four dissentients, the three dogs and the cat, who was afterwards discovered to have voted on both sides. 

(Animal Farm/George Orwell)


জর্জ অরওয়েলের আদ্যন্ত রাজনৈতিক এই উপন্যাসটি বারবার পড়ি। পড়ি কারণ এই লেখাটির ছত্রে ছত্রে লুকিয়ে রয়েছে ‘অসম্ভব বেদনার’ সঙ্গে যুক্ত হয়ে থাকা অমোঘ আমোদ বা অসম্ভব আমোদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে থাকা অমোঘ বেদনা। 

আমাদের দুর্ভাগ্য যে আমাদের ভাষায় (সম্ভবত ‘রেঁনেসা’ নামক এক ঘটনার কারণেই কিছুটা) ছদ্মগাম্ভীর্যের মুখোশটিকে কিছুতেই খুলে ফেলা গেল না। বিশেষ করে ঊনবিংশ শতাব্দীর পর থেকে সেটি এক কালান্তক ব্যাধি হয়ে রইল, চিনের প্রাচীরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। কিছুতেই সে প্রবেশ করতে দিল না অন্য প্রবণতাকে। এক-দু’জন ঈশ্বর গুপ্ত জন্মালেন, দাদাঠাকুর জন্মালেন। ঈশ্বর গুপ্ত-কৃত সাহিত্যের হয়তো সু-উচ্চ সাহিত্য মূল্য নেই, ‘মেনে নেওয়া গেল’ অনেক দূর পর্যন্ত। কিন্তু কবিতার ক্ষেত্রে, এতদূর হেঁটে চলে আসা বাংলা ভাষার দিকে তাকিয়ে বেশ অবাকই লাগে। তার যাবতীয় ভাঙচুর শাস্ত্রবিরোধীতা থেকে শুরু করে দিন-বদলের কাব্য – সবই সীমাবদ্ধ হয়ে রইল ওই ঘুরে-ফিরে চলা একটি-দুটি ডিকশনের মধ্যে। অথচ চর্যাপদ থেকে শুরু করে রেঁনেসা-পূর্ব বাংলা কবিতার মধ্যে এই প্রবণতা প্রায় ছিলই না। ছদ্ম-ভাষার মধ্যে প্রবেশ করিয়ে দেওয়া এক sobriety হয়ে উঠল আমাদের ভাষার মৌল-লক্ষণ। অনেকাংশে এটি ইউরোপের অবদান। 

এই ধাঁচ ভেঙে বেরিয়ে আসার কিছু উদাহরণ তবুও গদ্যের ক্ষেত্রে দেওয়া সম্ভব। কিন্তু কবিতার ক্ষেত্রে ব্যাপারটি প্রায় অপরিবর্তনীয় থেকে গেল। জীবনানন্দ-পরবর্তী সময়ে সেটি হয়ে দাঁড়াল বেশ মজার। বাহ্যিক কিছু আলগা-খড়’কে ধরে যারা টান মারলেন তাদের বেশ প্রথা-বিরোধী ও ভাষাকে আক্রমণ করে ছিন্নবিছিন্ন করে দেওয়া কবি বলে মাণ্যতা দেওয়া হল। কিন্তু আজ পিছনের দিকে তাকালে অবাক হয়ে যেতে হয়। অন্তত এই একটা প্রশ্নে তারা চিরাচরিত – সবাই গম্ভীর এক ভাষায় কথা বলে গেলেন। শেষ পর্যন্ত তাদের বেশিরভাগই ঘুরেফিরে ভাষার মূল কাঠামোটি অক্ষুন্ন রেখে তার ‘গাম্ভীর্য’কে অক্ষুন্ন রেখে বিচ্ছিন্নভাবে কয়েকটি শব্দ ও প্রকরণ প্রয়োগের দিকে ধ্যা্ন দিলেন। যাবতীয় ভাঙচুর ওই পরিসরেই থেমে গেল।

ঠিক এই জায়গায় এসে তারপদ রায়’কে অসামান্য বলে মনে হয়। তিনি এমন এক পবিত্র-পাইরেট যিনি তাঁর সমস্ত মেধা ও ক্ষমতা নিয়ে ‘গাম্ভীর্যের ভারে এক ডুবো-ভাষার এক ডুবো-জাহাজের খোলের মধ্যে ঝাঁপ দিয়েছিলেন। তুলে এনেছিলেন অসামান্য সব রত্ন। এবং সেগুলিকে যত্ন করে রেখে দিয়েছিলেন এক রত্নদ্বীপে, ভবিষ্যত-পাঠকের জন্য। 

কবির ভবিষ্যত এমনই, আজ তা্রাপদ আবিষ্কৃত হচ্ছেন নতুন করে। তরুণ কবিরা ফিরে পড়ছে তাঁর লেখা। বাংলা কবিতা অন্তত একটি ক্ষেত্রে একটু একটু করে শাপমুক্ত হচ্ছে তাঁরই হাত ধরে। এর থেকে বড় বেঁচে ওঠা একজন কবির ক্ষেত্রে আর কিছুই হতে পারে না। 


তারপদ রায় একটু মন দিয়ে পড়লে দেখা যাবে, তাঁর কবিতার দর্শনগত ভিত্তিটি বেশ জটিল। এখানে অনেক পাঠক ভুল বুঝতে পারেন, তাঁর কবিতা ‘জলের মতো সহজ’ মনে হলেও দর্শনগত ভিত্তির কথা বলা হচ্ছে এখানে। এই বাংলার এক বড় অংশের চিন্তক ও সমালোচক শিল্পের মূল্যা্য়নের ক্ষেত্রে ‘হিস্টোরিসিজম’-এর বাইরে  বেরুতে পারলেন না। এই যে ‘ইজম’দিকে কবিতার ক্ষেত্রটিকে এক কাল্পনিক ও অশ্লীল সীমারেখায় বেঁধে দেওয়া, এটিও সম্পূর্ণ বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়েছে গত দুই শতাব্দীতে। কবিতা-লেখকেরাও দ্রুত এই জিনিসটি বুঝে যান ও তাদের কলমে বারবার লিখিত হতে থাকে সেই কবিতা যা এই ধারণাকে জাস্টিফ্যাই করে। Homo Faber থেকে Homo Aestheiticus হয়ে ওঠার মসৃণ জার্নিটুকু ছাড়া যেন আর কিছুই নেই ও ছিল না পৃথিবীতে। এমনই এক মৌলবাদী ধারণা গড়ে উঠেছে আমাদের অনেকের। এই মৌলবাদ অনেক সময়ে জন্ম দিয়েছে আরেক মৌলবাদের, সেখানে আবার জীবনের প্রত্ন-ছায়াপাত ছাড়া আর কিছুকেই শিল্পের উপকরণ হিসাবে গণ্য করা হয়নি। 

তারপদ রায় এই দুই-প্রবণতার বিরুদ্ধে যে খুব কালাপাহাড়ী বিদ্রোহ চালিয়ে ছিলেন তা নয়; তিনি এই দুই প্রবণতা সম্পর্কে অতিশয় সচেতন ছিলেন অবশ্যই। ছিলেন বলেই, অনেকটা কৌশলগত কারণে হয়তো বেছে নিয়েছিলেন এক অপেক্ষাকৃত কম ব্যবহৃত অ্যভেনিউ। এটিই তাঁকে স্বাধীনতা দিয়েছে সব থেকে বেশি। 

তারপদ’র পুনরুক্তি নেই।

তারাপদ’র ভাবালুতা নেই।

তারাপদ’র নিছক ‘বাক-নির্মিতির’ প্রচেষ্টা ছিল না। 

অনেকেই বলে থাকেন তারাপদ’র কবিতার মূল উপকরণ শ্লেষ ও হিউমার। এটি অংশত মানা গেলেও সর্বাংশে সঠিক নয়। তারাপদ’র কবিতায় সব থেকে বেশি আছে এক মায়াচ্ছন্নতা ও আধুনিক মানুষের খণ্ডিত অস্তিত্ত্বের যন্ত্রণা। নিজেকে ‘হাসির উপকরণ’ করে তোলা আধুনিক শিল্পের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রবণতা। তারপদও তাই করেছেন,

‘দাঁতাল শুয়োর দিয়ে খেলা করা,

একমাত্র তোমাকেই তোমাকে মানায়,

বদ্ধঘরে মুখোমুখি চকচকে আয়নায়

নিজের ছায়ার সামনে পরিতৃপ্ত তারাপদ রায়।‘ (একমাত্র তোমাকেই)


-এই চারলাইনের কবিতাটি যতবার পড়েছি মনে হয়েছে এক ক্যানভাসের কথা। রঙ-তুলি হাতে বসে রয়েছেন এক শিল্পী। ক্যানভাসের মধ্যে দুমড়ে-মুচড়ে গলে যাচ্ছে ঘড়ি ও সময়। ক্যানভাসের মধ্যে একবার ঢুকে পড়ছেন ও বেরিয়ে আসছেন পেইন্টার। ক্যানভাসের মধ্যে ফুটে ওঠা পেইন্টার ও ক্যানভাসটিকে মোটা ব্রাশের স্ট্রোক দিয়ে, কোনও রকম পূর্ব-পরিকল্পনা ছাড়া, ভরিয়ে চলা পেইন্টার একে অপরকে যুগপৎ দেখে চলেছে। 

শিল্প কি তাহলে সেই ‘দাঁতাল শুয়োর’? কিন্তু ‘তারপদ রায়’ পরিতৃপ্ত কেন? তিনি পরিতৃপ্ত নিজের ছায়ার সামনে।শিল্পবস্তুকে শিল্পবোধে রূপান্তরিত করার এক নিজস্ব প্রক্রিয়া ছিল তাঁর। অনেক কবিই এই দুই সম্পর্কের মধ্যে যোগসূত্রটিকে মাণ্যতা দেন না। তারাপদ’র কবিতা আপাতভাবে ‘সহজ’ মনে হলেও তিনি যে বিষয়টি সম্পর্কে অতি-সচেতন ছিলেন তা এই লেখাটিতেই পরিষ্কার। 

তারাপদ’র কবিতায় বস্তুভার বেশ কম। অর্থাৎ তিনি প্রায় শূন্য থেকে শুরু করে একটি কবিতা নির্মাণ করতে পারতেন। যেমন ‘নিঝুমপুর’এর দিকে চলে যাওয়া একজন মানুষ। নিঝুমপুর কোথায় সেখানে শালফুল ফুটেছে কী-ফোটেনি তাও জানেন না কবি। শুধু এক চলা। তারাপদ লিখলেন,

‘পথের পাশে শোভা আকাশ বা পাখি

বাদাম গাছের নীচে বাদামি আঁধার


কিছুই দ্রষ্টব্য নয়।

নিঝুমপুর গ্রাম না শহর

কিছুই জানিনা শুধু

নিঝুমপুর চলো, চলো, চলো।‘ (নিঝুমপুর)

-আরোপিত দর্শনের দ্বারা আক্রান্ত হবার চূড়ান্ত সম্ভাবনা থাকা স্বত্তেও তারাপদ সে পথ পরিহার করলেন। কয়েকটি অতি-চেনা শব্দকে নিয়ে প্রায় জাগলিং করতে করতে তিনি হেঁটে গেলেন। এবং পাঠক’কে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন এক সফরে। 

অথবা ধরা যাক ‘শ্রীচরণকমলেষু’ কবিতাটির কথা,

‘পথে নিমগাছ

নীচের পুকুরে, 

সবুজ জলের নীচে সাদা পুঁটি মাছ,

ঘুরে ঘুরে

জলে ঝরে পড়া সাদা ফুল।

নিমের ফুলের তুমি, সবুজ জলের তুমি, শ্রীচরণকমলেষু, হায় জন্মভূমি,

সাদা ফুল,

বহুদিন চিঠি নেই, পত্র নেই,

প্রাণের অতুল।‘

-একটি জলরঙের ক্যানভাস। শুধু কয়েকটি অতিচেনা ছবি। আর কিছু নেই। কিন্তু ছিন্নমূলের কান্নার জন্য সে ক্যানভাসটিকেও ছোট বলে মনে হয়। 

হায় বাংলা কবিতা, ‘কালুর বাড়ি’ কবিতাটির মধ্য তীব্র মাইনের মতো বিস্ফোরণ’কে চিনে নিতে এত দেরি হয়ে গেছে আমাদের! অ্যন্টিপোয়েট্রি ভাঙচুরের কবিতা নতুনধারার কবিতা ইত্যাদি অভিধাতে নিজের কবিতাকে অভিহিত করেননি বলেই কি তারাপদ’র এই ভাঙচুরের দিকে আমরা চোখ ফেরালাম না? নজর দিলাম না? তারপদ লিখছেন,

‘কিছুদিন বেশ চুপচাপ।

তারপর একদিন কালুর বাড়িতে কারা আসে,

বেল বাজে।


আমি শুয়ে শুয়ে বেল শুনে টের পাই,

লোকগুলো সুবিধের নয়;

আজ খুব হল্লা হবে কালুর বাড়িতে।


আমি শুয়ে শুয়ে নাকে অমল স্কচের গন্ধ পাই

মাংসের কিমার বড়া, ডিম ভাজা

এরই মধ্যে একজন গেয়ে ওঠে,

‘আমি অকৃতী অধম’,

সকলেই একসঙ্গে গেয়ে ওঠে,

‘আমি অকৃতী অধম।‘

কালু আর কালুর বৌয়ের গলা আমি টের পাই।


কালুদের আদিখ্যেতা বড় বেশী,

বিছানায় শুয়ে শুয়ে আমি রেগে যাই,

খুব রেগে যাই।‘

-অমল স্কচের মধ্যে ভেসে থাকা জীবনের থেকে উঠে আসে, ‘আমি অকৃতী অধম’… সেই গান। প্রথমে একজনের গলায়। তারপর সবার গলায় খেলা করে সেই গান। একটি সহজ আনন্দ-মাছ যেন খেলা করতে শুরু করেছে নীল জলের মধ্যে। আর কিছুই নেই। জীবনের সব আনন্দ বিষাদ পেরিয়ে এক সমর্পণের দিকে ছুটে যাচ্ছে আমাদের সব গান ও প্রহর। 

কিন্তু আমাদের আধুনিক মনন কি এই ‘গ্রাম্য স্থূল অপরিশুদ্ধ’ (স্কচের বাস্তবতাটুকু বাদ দিলে) আনন্দকে গ্রহণ করতে অপারগ? কালু ও তার বউয়ের আচরণের মধ্যে আমরা কি অবিরাম লক্ষ্য করে যাব নাগরিক-মননের অভাব? দোয়েল-ফড়িং-এর জীবনের সঙ্গে যেমন আমাদের আর দেখা হবে না ঠিক তেমনই আর দেখা হবে না কালু ও তার বউ-য়ের জীবনের সঙ্গেও। আমাদের মধ্যে থাকবেন একজন তারাপদ রায় যিনি বারবার দেখিয়ে দেবেন এক মেকি জীবনের অন্তঃসারশূন্যতা। 

কী জাদু থাকে একটি লেখায় যা দিনের পর দিন সন্ধ্যামালতীর মতো ফুটে থাকে আমাদের কাছে? কোন জাদুবলে? যে লেখা থাকে তা নিজের নিয়মেই থাকে। পৃথিবীতে আর দ্বিতীয় কোনও লেখা সে নিয়ম মেনে সময়কে অতিক্রম করে যেতে পারে না। তারাপদ’র লেখার মধ্যে সেই জাদু লুকিয়ে রয়েছে তীব্রভাবে। সব জটিলতা আর ‘ইজম’তাড়িত পাঠাভ্যাসকে একটু সরিয়ে রেখেই আসতে হয় তারপদ’র কবিতার কাছে। আর একবার এসে পড়লে সম্ভবত ফেরার সব পথ বন্ধ হয়ে যায়। পরম মমতায়, অনেকটা শিশু যেমন মগ্ন হয়ে থাকে তার খেলায়, সেই সারল্যে একটি একটি করে শব্দ এনে তিনি বসিয়ে চলেছেন। খুব সাধারণ আটপৌরে সব শব্দ,

‘অনেকদিন দেখা হয় না। 

তারপর একদিন দেখা হবে।

দু’জনেই দু’জনকে বলবো,

‘অনেকদিন দেখা হয়নি।’

এইভাবে যাবে দিনের পর দিন

বৎসরের পর বৎসর।

তারপর একদিন হয়তো জানা যাবে

হয়তো জানা যাবে না,

যে

তোমার সঙ্গে আমার 

অথবা আমার সঙ্গে তোমার 

আর দেখা হবে না।’ (এক জন্ম)

-মহাবিস্ফোরণের কালে এক সেকেন্ড সময়ের মিলিয়ন মিলিয়ন মিলিয়ন ভাগের এক-ভাগ হেরফেরে এই ব্রহ্মাণ্ডের পরিণতি অন্যরকম হয়ে উঠত। কোন সে মায়াজাল, কোন সে শিকল যার এক একটি বালা আমরা! কোন গূঢ় কারণে ও অকল্পনীয় সমাপতনের ফলে আমাদের দেখা হয়ে গেল! 

তারাপদ’র এই কবিতাটি পড়ে গা ছমছম করে ওঠে। কারণ আমাদের যে দেখা হবে না আর তা সুনিশ্চিত। কিন্তু কবিতাটির সব থেকে ঘাতক অংশ ঠিক তার আগে, ‘তারপর একদিন হয়তো জানা যাবে/ হয়তো জানা যাবে না।’

অর্থাৎ দুটি সম্ভাবনা – এই কোটি কোটি তারার মাঝে আমরা দেখা না-হবার বিষয়ে নিশ্চিত হব। অথবা দেখা আর হবে না সেটি নিশ্চিত; কিন্তু সেটি আমাদের জানার বাইরে রয়ে যাবে। 

মহা-অন্ধকারে হয়তো ঘুরে বেড়াবে দুটি অস্তিত্ব। বারবার সে ভাববে আবার দেখা হবে। কিন্তু আর যে দেখা হবে না সেটি তার জানার বাইরে। এই অবস্থাটি আরও ভয়ংকর। আরও অসহায়তার দিকে ঠেলে দেওয়া। এবং তারাপদ এক শান্ত ডোরাকাটা বাঘের মতো আমাদের উঠোনের ঘাস-বন থেকে বেরিয়ে এসে এভাবেই ছারখার করে দিতে পারেন। কোনও দুষ্প্রবেশ্য বনাঞ্চলের প্রয়োজন না তাঁর। 

শোনা যায়, নিজেকে নিয়ে ‘মসকরা’ করা পৃথিবীর সব থেকে দুরুহ কাজ। আধুনিক মানুষের মধ্যে নার্সিসাস-প্রবণতা সব থেকে বেশি। ইতিহাসের আর কোনও সময়ে মানুষ এতটা নার্সিসাস হয়ে ওঠেনি। তার একটা বড় কারণ হয়তো, আজ আর তার প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে থাকার অবসর নেই। তাই সে ধীরে ধীরে হয়ে উঠছে নার্সিসাস। তার যাবতীয় শিল্পের প্রতি সে অতি-নার্সিসাস। এটিকে হাসতে হাসতে নস্যাৎ করে দিয়েছিলেন তারাপদ রায়’

‘সিমেন্টের বাঁধানো চত্বরে

তিরিশ বছর আগের এক বেড়ালের

সামনের দুই থাবার স্পষ্ট ছাপ জমাট হয়ে আছে

এই রকম সামান্য দৃশ্য, এই রকম তুচ্ছ জিনিস

এর জন্যেও অনন্তকাল অপেক্ষা করতে হলো।


এমন কি এই যে এলোমেলো তুচ্ছাতিতুচ্ছ কবিতা

তার জন্যেও অপেক্ষা করতে হলো

বহুদিন অপেক্ষা করতে হলো।’  (তুচ্ছাতিতুচ্ছ)

-তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছিল নিসর্গসুন্দরী দেবীর। তিনি ভয় পেয়েছিলেন। হ্যাঁ, তারপদ রায়’ও ভয় পান,

‘শ্রীচরণেষু,

ভারতবর্ষ,

এতদিন পরে আমার আবার ভয় হয়,

আমি স্বদেশী না আমি বিদেশী?’ (‘শ্রীচরণেষু ভারতবর্ষ)

-কবিরা ক্রান্তদর্শী, এমন একটি কথা প্রচলিত আছে। তিনি কি এই ভারতবর্ষকেও দেখতে পেয়েছিলেন? 

পেয়েছিলেন, শুধু কোনও ‘ডিসকোর্স’ খাড়া করতে চাননি কবিতায়। শুধু বহুদিন পর একজন বাঙালী কবির ‘বাঙলা কবিতা’ লিখিত হয়েছিল তাঁর হাত ধরে। 

কবিতা-প্রতিকবিতা ইত্যাদি তো অনেক দূরের জিনিস; একজন মানুষ ঠিক কতটা জোরে হাসবেন বা কাঁদবেন সেটাও যে ইতিমধ্যে ঠিক করে দিয়েছেন বাংলা কবিতার ‘স্কলার’রা... তারাপদ রায়ের কবিতা পড়তে পড়তে সেটিও মনে পড়ে যায় বারবার। আর বারবার শিউরে উঠতে হয়। 

তিনি যথার্থ বলেছেন, ‘পঞ্চায়েতের নিকট চৌকিদারের আর্জি’। খাপ-পঞ্চায়েত ঘেরা বাংলা কবিতার দুরারোগ্য কর্কটরোগ সহজে সারে না। তারপদ রায় তার প্রমাণ।


ছবি : বিধান দেব 


৩টি মন্তব্য:

  1. স্তব্ধ দাঁড়াতে হয় এখানে এসে। খুব ভালো লাগলো। মনে হয় কিছু শিখলাম।

    উত্তরমুছুন
  2. আহা!খাপ পঞ্চায়েত ঘেরা বাংলা কবিতার দুরারোগ্য কর্কট রোগ ....তোমার নির্ণয় অব্যর্থ।

    উত্তরমুছুন

কবিতা

সম্পাদকের কথা

দ্বিতীয় বর্ষ  ।। অষ্টম সংখ্যা ।। মার্চ ২০২২   খুব অসহায় লাগছে এবার। আমাদের ডান পাশে ধস। বায়ে গিরিখাত। মাথায় বোমারু। পায়ে পায়ে হিমানীর ব...