সাধনপর্বের নির্জনতা
১৭.
যখন খেলি তখন এমন এক খেলানোর কথা বলো যাতে দৌড়ে এসে হৃদয়কে ছুঁতে হয়
যে ছোঁয় সেই পায় ধুলোয় খেলার মজা ।
যখন পাপড়ি খোলে ফুলও তো সেই উদোম হয়
যে একেবারেই এক ফুলের মত উদোম
সে এমন একটা বৃদ্ধি পায় !
উদাহরণের পেছন ছেড়ে
যে সামনে দিয়ে ঘুরে আসে
সে-ই কলম দিয়ে লেখে
ঠিক বলে ফেলার মতো
অনুপস্থিতের হয়ে
সে-ই কিছু কথা বলে যায়।
স্বদেশ সেনের ' খেলা ' কবিতাটির পাঠপর্ব আমাকে বারবার ভাবনার সীমাবদ্ধতা থেকে অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে গেছে। প্রথম প্রথম কবিতাটি পাঠ করবার সময় প্রেমের একটা সরু সুতো সূত্রের মত খুঁজে পেতাম । সেই বালক বয়সির ভালো লাগা , ' ধুলোয় খেলার মজা ', সঙ্গে কারও হৃদয় ছুঁতে চাওয়ার দুর্মর বাসনা।
আজ আর সেদিকে মন হাঁটা দেয় না । বরং দেশ-কাল সমাজকে সামনে থেকে দেখাটাই যে বড় হয়ে ওঠে কবিতাটি পড়ার সময় । বর্তমান পরিস্থিতিতে আপামর জনগণের হৃদয় ছুঁতে চায় সে। আর যে বা যিনি ছুঁতে পারেন , তিনিই পান ' ধুলোয় খেলার মজা '। তারপর বিপরীতে যখন পাপড়ি খোলে , তখন কি হয় তা বিশ্ববাসী প্রতি মুহূর্তে দেখছেন । চোরের নেই বাটপারের ভয় । তাই উদোম হয়ে নিজ ক্ষমতার প্রকাশ করাই এখন ভবিতব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে । আর যারা তার সহযোগী তাদের জন্য রয়েছে বিশেষ পুরস্কার ---
" যে একেবারেই এক ফুলের মতো উদোম
সে এমন একটা বৃত্তি পায়! "
অর্থাৎ সঙ্গে থাকার ক্ষমতা । এই ক্ষমতাধরেরা অন্যায় করবে , তাকে কেউ ধরতে পারবে না । তারা যে সব বৃত্তিভোগী ।
কিন্তু এখানেই শেষ নয় কবির মন । সেই চিন্তাশীল হৃদয় লিখে ফেলে অমোঘ এক বার্তা । ----
" সে-ই কলম দিয়ে লেখে
ঠিক বলে ফেলার মতো
অনুপস্থিতের হয়ে
সে-ই কিছু কথা বলে যায় । "
তাহলে বলার লোক আছে । শুধু তাদের খুঁজে বার করতে হবে । এঁরা বয়স্ক বা প্রৌঢ় হতে পারে । হতে পারে কম বয়সি । আমি যে খুঁজে বার করার কথা বললাম , তা ঠিক নয় । প্রচুর মানুষ এখন ' ঠিক বলে ফেলার মতো ' অবস্থায় ।
আমি কবিতাটি আবার পড়বো। আর পড়তে পড়তে একসময় মূক হয়ে যাব । সচেতন পাঠকের মনে পড়বে শঙ্খ ঘোষের ' সম্প্রীতির সাহিত্য ' বলে তিন বন্ধুর কথোপকথনের ভাবনাটি । সেখানে সাত্যকি তার বক্তব্য রাখতে গিয়ে শুভমনকে একটি কথা বলেছে যা সময় এবং এই কবিতার সঙ্গে অদ্ভুত ভাবে মিলে যায় ।
" সংকটের এক-একটা মুহূর্ত যখন আসে জীবনে, ও-রকম হিসেব করে তখন ভাবতে পারে না কেউ, তোমার মতো। মনে রেখো, তখন তোমার আমার ওর সকলেরই কিছু-না-কিছু কাজ করবার দায় এসে যায়। যে যেটুকু পারে, সেটুকু তাকে করতেই হয় তখন। "
এ আমারও জীবনেতিহাস। হ্যাঁ আমাদেরও জীবনের ইতিহাস । নিজেকেই বলি ; ভাবো ভাবো । কেউ ভাবনা থেকে দূরে থাকলেই অসময় গ্রাস করবে পৃথিবীকে। ভারী অসুখ তার । আমরাই
ওষুধ । আমাদের ' ঠিক বলে ফেলার মতো ' ঘটনাই একদিন যন্ত্রণা অসূয়ার মধ্যে ফিরিয়ে নিয়ে আসবে নতুন এক সকাল।
১৮.
স্থির চোখ টলমল হয়ে আসে
সে তো ঘুম না
তবু ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন
স্বপ্নের মধ্যে স্মৃতি খুব বালকবেলা
একা একা কোথায় সে কোন ধু-ধু মাঠে
পথ হারিয়ে কান্না
দুচোখ ভরে জল, সেই অশ্রু, সেই দুঃখ
এমন কেন মাঝে মধ্যেই
ঘুম না তবু ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন
স্বপ্নের মধ্যে স্মৃতি
স্থির চোখ টলমল
আর সেই স্মৃতির মধ্যে দুঃখ, সেই অশ্রু
সেই দুচোখ ভরা জল
মাঝে মধ্যেই সেই ঘুম না তবু স্বপ্ন
স্বপ্নের মধ্যে স্মৃতি
আর স্থির চোখ টলমল হয়ে আসে
টলমল হয়ে আসে।
একটু যাদের বয়স হয়েছে , মহাদেব সাহার এই কবিতাটি ( ' স্থির চোখ টলমল হয়ে আসে ' ) পড়তে পড়তে হারিয়ে যেতে হবে তাঁদের । কতবার পড়েছি। তবু যেন পড়াই হল না । ওই যে স্মৃতি স্বপ্ন আর ঘুম--- তারা যেন জড়াজড়ি করে দাঁড়িয়ে আছে চৌকাঠে । এটা ধরে টান দিচ্ছে , তো কখনো অন্য একটা ধরে এনে মনের সামনে হাজির করছে ।ফেলে আসা অনুভূতিকে ছুঁয়ে যায় সে অবলীলায়। ঠিকই বলেছেন কবি , ' ঘুম না তবু ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন '।
প্রতিটি দিন আমাদের নির্মম পরিসর দেয় অতীতকে দেখবার জন্য । অবচেতনে ঘুরে আসে জীবনে হারিয়ে যাওয়া কত নাম কত ঘটনা । সে নাম মল্লিকা হতে পারে , হতে পারে সঙ্গীতা বা শৈবাল- সঞ্জয় । আবার হঠাৎ-ই মনে এলো সুভাষের নাম। সমবয়স্ক সে আমার । গুলি খেলার , টিকিট খেলার সাথী । যা কিছু জেতা-হারা সব যৌথভাবে সংঘটিত হত । চোখ না বুজেও দেখতে পাচ্ছি ; আমি , সুভাষ আর পিন্টু শীতের বেলায় সরকারি আবাসনের মাঠে বসে গুলি আর টিকিটের হিসেবে ব্যস্ত । হেরে যাওয়া বন্ধুর প্রতি দোষারোপ নয় , অথবা জেতার জন্য নেই অতিরিক্ত উচ্ছ্বাস । সেই ঘটনাই কি আজ স্থির চোখকে টলমল করে দেয় । নাকি প্রশ্ন ওঠে মনে ---- ' এমন কেন মাঝে মধ্যেই... '।
এই স্বপ্ন তো ফ্রয়েড বা ইয়ুং - এর স্বপ্ন সন্ধানী দৃষ্টি নয় । তাঁরা স্বপ্ন বলতে বোঝেন যান্ত্রিকতাকে অথবা উদ্দেশ্যকে । ফ্রয়েড যদি অতীতচারী হন ,
তবে ইয়ুং বর্তমান আর ভবিষ্যতের । সে দিক থেকে দেখলে ' চরক সংহিতা' বা বৌদ্ধ দর্শনকে বরং গ্রহণ করা যেতে পারে । সেখানে এর অনেক প্রকারের উল্লেখ রয়েছে । যেমন --- অতীত স্মৃতি , ভবিষ্যতের বার্তা , আধ্যাত্বিক নির্দেশনা , দুঃস্বপ্ন , ইচ্ছাপূরণ , জ্ঞানলাভ ইত্যাদি । আসলে এগুলো দিয়ে কখনই এই কবিতাকে সম্পূর্ণ ধরা যাবেনা । বরং যদি অন্য ভাবে দেখি । যদি মনে করি , স্বপ্ন দেখার পরিমাণ যত বয়স বাড়ে ততই কমে আসে । তাহলে...
এখানেই কবির জিৎ । স্বপ্ন যত অধরা হবে ততই স্মৃতির ঝাঁপি খুলে যাবে । দীর্ঘপথের চড়াই-উৎরাইকে সে দেখবে নিস্পৃহ মন নিয়ে ।
সেই স্থির চোখে এ কথাই স্পষ্ট জানান দেবে যে
' শুদ্ধ বিশ্বাস রাখো একদিন শাপমুক্ত হবে '।---
' তখন সুবর্ণ হবে ঘাস ।'
মানব এসেছি কাছে । ওই সহজ একটা চলন কবিতাটির মধ্যে স্নিগ্ধতা নিয়ে বয়ে গেছে যেন । তাকে ধরতে পারবো না । অথবা ধরে ফেলতে সামান্য সময়। কিন্তু তারপর... অবশ্যই ' স্থির চোখ টলমল হয়ে আসে '।
ছবি : বিধান দেব

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন