শনিবার, ৩০ জানুয়ারি, ২০২১

কবিতা ।। অজিত বাইরী

 


কত দূরে সেদিন  



একটা কোন সুসংবাদের প্রত্যাশায় থাকি

আজ, নয়তো কাল, নয়তো পরশু

একটা সুসংবাদ আসবেই।

বিফল প্রত্যাশায় দিনের-পর-দিন যায়

এমন-কী বছরের-পর-বছর;

সুসংবাদ আসে কই?


পরিবর্তে আসে কখনও ঝড়, কখনও তুফান

খরা আসে, বন্যা আসে, আসে কালান্তক মহামারি

ঘরে ঘরে ঢুকে পড়ে শোক,

মানুষের আজন্ম লালিত স্বপ্ন চুরমার হয়ে যায়।

ব্যক্তিগত শোক কখন যে সমষ্টির শোকে 

পর্যবসিত হয়? মানুষ তখন তৃণকুটির মতো

ভেসে থাকার চেষ্টা করে সময়ের স্রোতে।


ভাবি, আসবে, সুসংবাদ আসবে,

সমাজটা বদলে যাবে; ঈর্ষাকাতর মানুষেরা

ভালোবাসা শিখবে, সমাজ বিরোধীরা

হাতের নোংরা ধুয়ে ফেলবে নদীর জলে;

খুন, রাহাজানি, ধর্ষণ যা নিত্যকার ঘটনা

তা থেকে মুখ ফেরাবে ভ্রষ্ট সমাজ।


ভাবি, অনেক কিছুই ভাবি, বন্ধ হবে

রাজনৈতিক খুনোখুনি, রক্তপাত, গণধর্ষণ আর

দরিদ্র গ্রামবাসীর গৃহদাহের বহ্ণুৎসব।

কিন্তু এসব কিছুই হয় না, একটির-পর-একটি

লাশ এসে হাজির হয় থানার ফটকে।

নিরন্ন মানুষের ঢল নামে শহরের বুকে

যেসব মেয়েরা সুস্থ জীবনের স্বপ্ন দেখেছিল

বাধ্য হয় গ্রহণ করতে পতিতাবৃত্তি,

কত মেয়ে যে হারিয়ে যায় কোন্ মুলুকে!


একদিন তো স্বপ্ন দেখেছিলাম অনেক কিছুর

বাল্য থেকে বেড়ে ওঠার দিনগুলিতে।

গ্রামের প্রতিটি গৃহে অন্ন ফুটবে

রোগগ্রস্ত মানুষ চিকিৎসা পাবে, ওষুধ, পথ্য পাবে

গ্রামগুলি ভিখিরি মুক্ত হবে।

বেকার যুবকেরা, যাদের স্বপ্ন-ইচ্ছে-বাসনা

ঝরে পড়ছে শীতের শুকনো পাতার মতো,

কাজ পেয়ে হাসি ফোটাবে বাবা মার মুখে।


কোন হিসেবই তো মিললো না;

আদৌ কি অবসান হবে প্রত্যাশার?

সুসংবাদ কী আসবে? যদিও-বা আসে, কবে?

দিন, মাস, বছর ফুরিয়ে যায়, ফুরিয়ে যায়

দশকের-পর-দশক;

যৌবন, প্রৌঢ়ত্ব পেরিয়ে  পৌঁছে গেলাম বার্ধক্যে।

আজও বারান্দায় চেয়ার পেতে বসে আছি 

এই ভরসায়, আসবে, সুসংবাদ আসবে;

কিন্তু কত দূরে ক্ষেত-ভরা সোনালি

শস্যের মতো সেদিন!


মানুষ বড় একা  



মানুষ বড় একা, মানুষ  বড় নিঃসঙ্গ;

তুমি তাকে সঙ্গ দিও কাছে ডেকে।

যে তোমার বন্ধু হতে পারতো;

যে আছে দূরে, ডেকে বসাও পাশে।


মানুষ বড় দুঃখী, মানুষ  বড় অভিমানী;

তুমি কিঞ্চিৎ ভাগ নিও দুঃখের।

অভিমানকে কোরো না অবহেলা,

ঝরা পাতারও থাকে অভিমান---

তুমি অভিমানের মূল্যটুকু দিও।


মানুষ  বড় বেশি কাঙাল ভালোবাসার;

প্রশ্রয় পেলে গলে যাবে মোমের মতো।

মানুষ  যা চায়, তা হৃদয়ের উষ্ণতা;

তুমি স্বেচ্ছায় বাড়িয়ে দিও হৃদয়।


তারপর দ্যাখো, আকাশ কত নীল;

তারপর দ্যাখো, বাতাস কত নির্ভার।

মানুষ বড় এক।, মানুষ বড় নিঃসঙ্গ;

মানুষ বড় দুঃখী, মানুষ বড় অভিমানী।


 নদীপারে সন্ধ্যা 



মাথার উপর ঝুঁকে আছে মেঘ

নদী উচ্ছল পূবালী  হাওয়ায়,

ঘাটে বাঁধা নৌকো টলোমলো।


কেউ কি ভেসেছিল চোখের জলে

এমন-ই মেঘবরণ দিনে?

ক্ষণে ক্ষণে ঝিলিক দেয় তারই মুখ

ভাঙা মেঘের ফাঁকে?


নদীপারে দোলে শরবন---

পাতাগুলি না না করে কাঁপে।

ও সোনাবউ, নাও ভাসাইয়া যাও কোন্ দ্যাশে---

দরদ ঝরে ভাটিয়ালী সুরে।


ছলাৎ  ছলাৎ  পাটাতনে ভাঙে ঢেউ

দাঁড় থেকে রুপোলি তরল ঝরে।

' ঘন মেঘে ছাইল আকাশ---'

গলা ছেড়ে গাইছে একলা পাগল

বুকে এসে তার ছন্দ দোলে।


আমি কী জানি, কে যায় কত দূরে!


জলের পিছনে ধায় জল;

আঁধার ডেকে আনে কাজল মেঘে।

বিন্দু বিন্দু আলোর সংকেতে

অক্ষরের মতো জ্বলে ওঠে গ্রাম।



ছবি: বিধান দেব

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

কবিতা

সম্পাদকের কথা

দ্বিতীয় বর্ষ  ।। অষ্টম সংখ্যা ।। মার্চ ২০২২   খুব অসহায় লাগছে এবার। আমাদের ডান পাশে ধস। বায়ে গিরিখাত। মাথায় বোমারু। পায়ে পায়ে হিমানীর ব...