শনিবার, ৩০ জানুয়ারি, ২০২১

ধারাবাহিক গদ্য ।। অভিজিৎ দাশগুপ্ত

 


সাধনপর্বের নির্জনতা



৯.

মানুষখেকো বাঘেরা বড়  লাফায়

মানুষখেকো বাঘেরা বড় লাফায়
হেঁড়ে গলায় ঘর  দুয়ার কাঁপায় ।
যখন তারা হাঁক পাড়ে , বাপস্ রে !
আকাশ যেন  মাথায় ভেঙে পড়ে ;
ভয়ের চোটে খোকাখুকুরা হাঁপায়!
              

ছয় পংক্তির এই কবিতাটি কতবার যে পড়েছি , যতবার পড়েছি , ঠিক ততবারই মনে হয়েছে , এত বড় বাস্তব বুঝি আর কিছু নেই । প্রতিদিনের খবরের কাগজ পড়ি আর ভাবি , সত্যি  ' মানুষখেকো বাঘেরা বড় লাফায় ' । উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে ঠোঁটে কৌণিক হাসি দেখা দেয় । সে হাসি ততক্ষণ থাকে যতক্ষণ না বিপরীত কোন চিন্তা এসে মনটাকে বিক্ষিপ্ত করে।

রাজনীতির ক্ষেত্রে কথাটা খুব সত্য । অন্য অনেক ক্ষেত্র অবশ্যই আছে । যেমন , যেকোনো মানুষের মধ্যেও ওই পংক্তিগুলো সময়ে সময়ে কিলবিল করে উঠতে দেখি ।  তবে সবচেয়ে বেশি অবশ্যই , রাজনীতি ও তার কর্মকর্তাগণ। বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সারা জীবন  এক সত্য নীতিতে বিশ্বাস স্থাপন করে এসেছেন । তবে সে ' রাজনীতি 'কে যদি বর্তমানের সঙ্গে কেউ মেলান , তাহলে তাঁকে পদে পদে ঠোক্কর  খেতে হবে । কবির  ইচ্ছা-অনিচ্ছার দাম কোনোকালেই কোন সমাজ বা রাষ্ট্র দেয়নি । অথচ কবির ভাবনাই সমাজের শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষকে  চালনা করে । তাকে  ' মনে মনে ' বুঝতে শেখায় ঠিক ও ভুলের পার্থক্য । কিন্তু সাধারণ মানুষের 'প্রতিবাদ'
শব্দে সবচেয়ে বড় অনীহা ।  সে মেনে নিতে জানে , সে আগুনকে বুকের ভেতর  চেপে রাখার কৌশল শিখেছে  ;  তাই তার সকালে বাজার আছে , আছে অফিস যাওয়া বা বিকেলে আড্ডা অথবা সন্তানকে পড়ানো আর ' উইক এন্ডে ' কাছে - দূরে ঘুরতে যাওয়া ।

এত সব কিছুর মধ্যে কিন্তু ভুলে যায়  'মানুষখেকো' সেই বাঘটার কথা । সে কিন্তু ভোলে না আমাদের। তাই হেঁড়ে গলায়  ডাক  ছাড়ে , লাফায় । আসলে সকলেই শান্তিতে থাকতে চায় । সেই শান্তি যদি শ্মশানের নিস্তব্ধতা হয় , তাহলে কেল্লাফতে। 'মানুষখেকো '-র  সুবিধা হয় ক্ষমতার অলিন্দে ঘোরাঘুরি করার ।  ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স বাড়ানোর।

কিন্তু এই কবিতায় একটা  প্রতিবাদও রেখেছেন
কবি । ভয়টা কে পাচ্ছে ? পাচ্ছে খোকা-খুকুরা। অর্থাৎ ভীতু মানুষ । তারাই হাঁপায় । তারাই ভাবে  'আকাশ যেন মাথায় ভেঙে পড়ে '।  যদি বাস্তবটা তারা বুঝতো  ; তাহলে 'মানুষখেকো'-র  লাফালাফিতে এতটা ভয় পাওয়ার কিছু যে নেই তা জানত। কারণ এদের লাফানোতেই সব । আদতে এই ধরনের ক্ষমতাশালীরা শেষ পর্যন্ত উঞ্ছবৃত্তি করে চলে ।

হেঁড়ে , হাঁক, হাঁপায় ---- শব্দ তিনটি আমার মত পাঠকের  শ্রুতিযন্ত্রকে আকর্ষণ করেছে । চলতি শব্দের ব্যবহার করে কবি তাঁর ভাবনাকে আমজনতার মাঝখানে নিয়ে এসেছেন । মানুষখেকোরা  আদতে ভয় দেখায় এবং ভয় পায় মানুষকেই। তারা সংঘটিত হলে যে ' মানুষখেকো' - দের ধান্দা বন্ধ হয় যাবে । তাই লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে ভয় দেখাতে ওস্তাদ তারা ।

১০.

জানোয়ার
প্রতি শনিবার আসো । এসে বসে থাকো । আমার প্রত্যেকটা হাসি , প্রত্যেকটা লোভ , এই যে বারবার  ঘাড় ঘুরিয়ে দেখা ...  তুমি ক্যামেরা লুকিয়ে রাখো জঙ্গলে । চলে যেতে বলি , হারিয়ে যেতে বলি ---- ধরতে চাও । কুঁকড়ে যাই ভয়ে। এই শহর তোমাকে ফাঁকা বাথরুমের মধ্যে একলা পেয়েছিল একদিন। পুরোনো ডানার নিচে লুকোনো  ছিল পালতোলা টিনের সংসার । ছিল  নগ্ন নর্তকী আর তার বোকা ম্যানেজার । তুমি ছুরি মুছে রাখতে প্রতি রাতে। বেলুনের সাথে উড়িয়ে দিয়েছিলে তোমার চিৎকার ঔ রক্তাক্ত পলিথিনে ।  চলে যেতে বলি , হারিয়ে যেতে বলি ... অন্ধকার সরীসৃপ হেসে ওঠে ----
সবটাই ম্যাজিক জানি , তবু , যতবার কাছে আসো ততবার গর্ভ এসে যায় ----

শনিবার । এই একটি বারের ভেতর যত স্বপ্ন লুকোনো আছে , তা বুঝি অন্য কারো সংগ্রহে  পাওয়া সম্ভব নয় । ঠিক , আবার ঠিক নয় । আমাদের কাছে শনিবার মহার্ঘ। আমি পলাশ প্রসূন শুভ । এই শনিবার পলাশের বাড়ি আড্ডা । এই শনিবার কফি হাউস । এই শনিবারেই  পৌঁছে যাওয়া তরুণ কবির স্বপ্ন নিয়ে প্রবীণ কোন কবির  কাছে অথবা চিরপরিচিত পাতিরামে ।  আমার ক্ষেত্রে শনিবারের অতীত আর একটু অন্যরকম  ।  শিবপুরে চাকরি । শনিবার ছুটির হাতছানি । উৎসাহ দেখা দিত । পরে স্কুলে পড়ানোর সময়  উত্তরপাড়া থেকে ট্রেন ধরে হাওড়া ।  সেখান থেকে বাসে কলেজস্ট্রিট। দুর্মর বাসনাই বলতে হবে তাকে ।

আর এখন মধ্যে মধ্যে ' যাপনচিত্র '- র আড্ডা ।  মাসে যে কোনো এক শনিবার । তবু ...

কিন্তু এত যে শনিবার শনিবার করছি , সুদীপ বসুর এই কবিতা তো  তা থেকে বহুদূরে। সাবলীল মিশেলে ধরা পড়েছে ' প্রত্যেকটি লোভ ', 'নগ্ন নর্তকী ', 'ছুরি', ' অন্ধকার সরীসৃপ ', 'রক্তাক্ত পলিথিন ' ইত্যাদির সঙ্গে 'ম্যাজিক 'শব্দটি । কবিতাটি পড়তে পড়তে এক রিরংসা মনে বাসা বাঁধে। প্রেমিক কি প্রেমিকাকে আর চাইছে না ? তাকে ফেরত যেতে বলছে অনালোচিত জীবনে ? একাগ্র থাকতে চেয়ে এ যেন আলো ঘুরে যাওয়ার মতো ঘটনা । মানুষের মন কত বিচিত্রতায় ভরা ।  ' এই শহর তোমাকে ফাঁকা বাথরুমের মধ্যে একলা পেয়েছিল একদিন।' অথবা ' পুরোনো ডানার নিচে লুকোনো ছিল পালতোলা টিনের সংসার।'  প্রতিরাতে ছুরি মুছে রাখার একটা প্রক্রিয়া ।  সতর্ক থাকতে হবে পাঠককে। এখানে প্রতিটি শব্দের ভেতর লুকিয়ে রয়েছে অস্বস্তি। অপরিমেয় বাসনা কীভাবে লক্ষ্যচ্যুত হয়, তার বর্ণনাই যেন দিতে চেয়েছেন কবি সুদীপ বসু ।

ম্যাজিক ম্যাজিক  ।  আমাদের জীবনটাই তো ম্যাজিকে  ভরপুর । আধুনিকতার বীজ লুকোনো আছে ওই শব্দে । কবি যেন ভারসাম্যের খেলার সৈনিক । দড়ির ওপর দিয়ে চলেছেন । হাতে ধরা সেই দীর্ঘ লাঠি , যার বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে তাঁর জীবন মরণ। এই ম্যাজিককে  মেনে নিতে বাধ্য আমরা ।  কিন্তু সেটাই কি শেষ
কথা । তা নয় নিশ্চয়ই । সেই কারণেই  ' যতবার কাছে আসো ততবার গর্ভ এসে যায় ' ----, উচ্চারণ করতে হয়েছে ।

কবিতাটি পড়তে পড়তে  জয় গোস্বামীর 'বৃষ্টি' কবিতার দুটি পংক্তি হঠাৎই চলে এলো মনে । এমনিই । তবু কেন এই আসা ! হয়তো কোনো বার্তা দিতে চায় । চায় বিষয়ের বিস্তার । কি আছে তাতে। দেখে নি ----
" সমস্ত উদ্ভিদলতা  প্রাণীপ্রজাতিকে সাক্ষী রেখে আবার তোমার মধ্যে সম্পূর্ণ প্রবেশ করতে পারি। "  


ছবি: বিধান দেব 

    

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

কবিতা

সম্পাদকের কথা

দ্বিতীয় বর্ষ  ।। অষ্টম সংখ্যা ।। মার্চ ২০২২   খুব অসহায় লাগছে এবার। আমাদের ডান পাশে ধস। বায়ে গিরিখাত। মাথায় বোমারু। পায়ে পায়ে হিমানীর ব...