ডায়মন্ড হারবারের সাহিত্যচর্চার ইতিবৃত্ত
পাঁচ.
ডায়মন্ড হারবারের সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে শিশুসাহিত্য রচনার উল্লেখযোগ্য নজিরও বিশেষভাবে লক্ষ্য করা যায়।যোগীন্দ্রনাথ সরকার এবং যোগীন্দ্রনাথ বসুর নাম প্রায় সূচনা পর্বে উল্লেখ করেছি।ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে তাঁদের রচনাধারা বঙ্গসাহিত্য জগৎকে মথিত ও আন্দোলিত করলেও একথা অনস্বীকার্য যে সুসংবদ্ধভাবে কিংবা সংগঠিত সঙ্ঘবদ্ধভাবে শিশুসাহিত্য রচয়িতাগণের ধারাবাহিক কোনও পত্র-পত্রিকার সন্ধান আমাদের নজরে আসেনা। অথচ একটু লক্ষ্য করলে দেখা যায় এই অঞ্চলের বেশ কয়েকজন কবি ছড়াকার সাহিত্যিক তাঁদের চর্চার প্রধান অবলম্বন হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন শিশুসাহিত্য রচনার মধ্য দিয়ে শিশুমনের অন্তর্লোকে প্রবেশ করতে।এঁদের মধ্যে মগরাহাট অঞ্চলের নারিকেল ডাঙা গ্রামের কবি উত্থানপদ বিজলী,
কাকদ্বীপ অঞ্চলের কবি ওয়াজেদ আলি,অপূর্ব দাস,সাগর দ্বীপের আশিস ভুঁইয়া,ফলতার নীতা হালদার, বক্রেশ্বর মন্ডল, সুমিত মোদক,শিরাকোলের রাজকুমার বেরা, বাটানগরের ব্রজেন্দ্রনাথ ধর, আমতলার পরেশ সরকার, রায়দিঘির ফণিভূষণ হালদার, কিশোরীমোহন নস্কর, মথুরাপুরের সাধনচন্দ্র নস্কর, কুলপির বিশ্বনাথ ভান্ডারী,মালবিকা ভান্ডারী,হরিদেব পুরের দিলীপ চক্রবর্তী,মগরাহাট থানার আবুল বাশার হালদার, নিরাশা নস্কর, ডায়মন্ড হারবার থানার এম বাকিবিল্লা,সাকিল আহমেদ, অমলেন্দুবিকাশ দাশ,রিয়াদ হায়দার, বলাইচাঁদ হালদার, সুব্রত মন্ডল,লক্ষ্মীকান্ত পুরের শ্রীমন্ত কুমার মন্ডলের নাম সবিশেষ উল্লেখযোগ্য।এঁরা ছাড়া ডায়মন্ড হারবারের অচ্যুত হালদার, রফিক উল ইসলাম ও ফলতার অরুণ পাঠকও শিশুসাহিত্য রচনা করেছেন। অনেকেরই বেশ কিছু শিশুসাহিত্যগ্রন্থ আছে।আবার এঁদের মধ্যে অনেকেই শিশুসাহিত্য রচনার মধ্য দিয়ে এগোতে এগোতে পরিবর্তন করেছেন নিজেদের সাধনার ধারাকে। তাঁরা শিশুসাহিত্য রচনার ক্ষেত্র থেকে নিজেদের সরিয়ে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন সর্বসাধারনের উপযোগী সাহিত্য রচনায় ।এপর্যন্ত এসে মনে পড়ল আরও দুটি উল্লেখযোগ্য নাম। শ্রী নরোত্তম হালদার এবং শ্রী রামচন্দ্র ধাড়া। নরোত্তম হালদার প্রত্নতত্ত্ব গবেষণার কাজে নিরত থাকলেও 'কুসুম 'ও 'সোনার বাংলা'নামের দুখানি চমৎকার শিশুসাহিত্য গ্রন্থের রচয়িতা।আবার শ্রী রামচন্দ্র ধাড়া অধ্যাপনা ও গবেষণার কাজে ব্যস্ত থাকলেও তার ফাঁকে রচনা করেন শিশুপাঠ্যোপযোগী গ্রন্থ 'ছড়ায় গড়া 'ও 'ছড়ায় টেনস'।
শিশুসাহিত্য চর্চার পাশাপাশি আরও কিছু বিষয় ঘটনা মনে পড়ছে। সময়- কালের ধারাবাহিকতায় বিঘ্ন ঘটলেও এক্কেবারে অনুল্লেখের থেকে ভালো হবে মনে করে সেসবের উল্লেখ করতে চাই।
ডায়মন্ড হারবারের ফকিরচাঁদ কলেজের বাংলাসাহিত্যের অধ্যাপক ড.দুলাল চৌধুরী ডায়মন্ড হারবারে তাঁর কর্মজীবনে অবস্থানকালীন লোকসাহিত্য ও সংস্কৃতি নিয়ে গবেষণার কাজে ব্যস্ত থাকতেন নিরন্তর। এলাকার বাসিন্দাদের সাথে এবিষয়ে মতামত বিনিময়ের চেষ্টা করতেন বিভিন্ন উদ্যোগের মধ্য দিয়ে। ওই সময়কালে তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হল 'লোকসংস্কৃতি' পত্রিকা।পত্রিকার প্রকাশস্থল হিসেবে কলকাতার নাম থাকলেও সমস্ত কিছুই নিয়ন্ত্রিত হতো ডায়মন্ড হারবার থেকেই। ডায়মন্ড হারবার এলাকার লোকসংস্কৃতি এবং তৎসম্পর্কিত তথ্য ও তত্বে ভরা থাকত পত্রিকার পৃষ্ঠা । সেখনে বিভিন্ন গুনীজনের প্রবন্ধের সমাহার ঘটত।সাথে সাথে তাঁর লেখা লোকসাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক প্রবন্ধ ও প্রকাশিত হতো স্থানীয় পত্র পত্রিকায়।অধ্যাপক বলাইচাঁদ হালদার গবেষণা করেছেন আঞ্চলিক উপভাষা নিয়ে ।তাঁর রচিত গ্রন্থ 'ডায়মন্ডহারবার অঞ্চলের আঞ্চলিক উপভাষা ' একটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হিসেবে সমাদৃত ।শিক্ষাব্রতী কামদেব শাসমল ধারাবাহিকভাবে রচনা করে চলেছেন বিভিন্ন বিষয়ে প্রবন্ধ ।স্থানীয় পত্র- পত্রিকার পাতায় তার পরিচয় আছে ।তাঁর প্রবন্ধের বেশিরভাগ অংশ স্বামী প্রণবানন্দকে রচিত হ'লেও আরও নানা ধরনের নানান বিষয়ের ওপর প্রবন্ধ রচনা করে চলেছেন তিনি দীর্ঘদিন ধরে ।যদিও আলাদা কোনো প্রবন্ধগ্রন্থ প্রকাশিত হয়নি তাঁর ।অদূর ভবিষ্যতে সে প্রত্যাশা পূর্ণ হবে এই আশা রাখি ।
ড.দুলাল চৌধুরী ডায়মন্ডহারবার থেকে আরও দুখানি পত্রিকা সম্পাদনা ও প্রকাশ করেছিলেন ।একটি 'The Heritage 'অন্যটি 'সুন্দরবন '।দুটি পত্রিকায় অধ্যাপক দীনেন্দ্রকুমার সরকার ছাড়াও সহযোগী হিসেবে দীপক হালদারও যুক্ত থেকেছেন পত্রিকার প্রকাশকাল পর্যন্ত ।একসময় অকাদেমি অফ ফোকলোর- এর তরফে আঞ্চলিক শব্দ সংগ্রহের এক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।লোকসংস্কৃতি পত্রিকার পক্ষ থেকে দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার আঞ্চলিক শব্দ সংগ্রহের ভার দেওয়া হয় দীপক হালদারকে ।পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় ,সেই জেলার শব্দ সংগ্রাহক প্রতিনিধি নিয়োগ করা হয়। সাথে সাথে দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার প্রতিনিধি ও শব্দ সংগ্রাহক এবং লোকসংস্কৃতি প্রতিনিধি হিসাবে দীপক হালদারকে সুযোগ দেওয়া হয়। সমস্ত প্রতিনিধি শব্দ সংগ্রাহকদের সংগৃহীত কয়েক হাজার শব্দের অভিধানের একটি নমুনা সংখ্যাও প্রকাশ করে লোকসংস্কৃতি পত্রিকা ।যা সেই সময়ের বিভিন্ন পত্র- পত্রিকায় বিশেষভাবে আলোচনা ও করা হয়।
কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ রচনার বাইরে এই উদ্যোগ এবং প্রচেষ্টা তৎকালে বেশ আনন্দদায়ক অভিজ্ঞতার সৃষ্টি করে।ডায়মন্ডহারবারের সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে এর অবদান উপেক্ষনীয় নয়। কেননা স্বাভাবিক সৃজন প্রবাহের বাইরে এই প্রচেষ্টা যে যথেষ্ট অভিনবত্বের দাবিদার সে বিষয়ে সন্দেহ থাকতে পারে না।
ছবি: বিধান দেব

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন