শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২০

সম্পাদকের কথা




আমরা যখন আমাদের কৈশোর অথবা যৌবনের শুরুতে লিখতে শুরু করি তখন আমাদের মধ্যে থাকে শুধু লেখার আনন্দ আর প্রকাশের তীব্র বাসনা। কিন্তু লিখতে লিখতে যখন কবি বা লেখক সমাজের মধ্যে প্রবেশ করে তখনই আমাদের মধ্যে যুক্ত হয় অপরকে অতিক্রম করে প্রতিষ্ঠার চাহিদা। অর্থাৎ লেখালেখিও আমাদের জীবন চক্রের সঙ্গে এক হয়ে যায়। সদ্য কৈশোরের নিষ্পাপ বিকশিত হয়ে ওঠার মানসিকতা রূপ নেয় সমাজ, রাষ্ট্র, দেশপ্রেম, ধর্ম প্রভৃতি বহুবিধ বিষয়ের ব্যক্তিগত ভিন্ন ভিন্ন অবস্থানে। শিল্পের জন্য শিল্প তখন দায়বদ্ধতায় পরিণত হয়। নিতান্ত ব্যক্তিগত প্রেমও তখন মাত্রায়িত হয়ে যায় অন্য কোনও বৃহৎ প্রেমের সরোবরে। সেই সরোবরে কী কী ফুল ফুটবে তাও আমরা নিজেরাই ঠিক করে নিই। আমরা নিজেরাই হয়ে উঠি এক একটি শিল্পবৃক্ষ। চেতনার সমুদ্রের পাড়ে সুদীর্ঘ অতীত থেকে এইরূপ বহু বৃক্ষ জন্ম নিয়েছে। পৃথিবীর বাতাসে তাদের দেহগন্ধ আর মনের কথাগুলি মিশে আছে। মতাদর্শগত পার্থক্য, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও রুচি নিশ্চয়ই বৈচিত্র্য এনেছে মানব এষণায়। চার্বাক না সাংখ্য, সার্ত্র না দেরিদা---- তা হয়তো আমরা বেছে নিতে পারি; কিন্তু চরম বিপরীত অবস্থানে আমরা তখনই থাকতে পারি যখন আমরা উভয় দিক সম্পর্কে সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল। ধ্বন্যাত্মক ও ঋণাত্মক এই দুটি দিক নিয়েই এই জগৎ। অশুভর বিরুদ্ধে লড়াই করতে করতে শুভচিন্তাবাদী মানুষ যতদূর এগিয়েছে প্রায় ততদূর মানব সমাজ। ততদূর শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি। এই পৃথিবীকে চিরকাল যারা ভালোবেসেছে তারা কিছুই পায়নি। "রক্ত করবী"-তে নন্দিনী যেমন বিশু পাগলকে বলেছিল, "পাগল, যখন তুমি গান কর তখন কেবল আমার মনে হয় অনেক তোমার পাওনা ছিল, কিন্তু কিছু তোমাকে দিতে পারিনি।" বিশু কিছু পায়নি। কারণ, সে ভালোবেসেছে। কারণ, সে নিজের সুন্দর দিয়ে সুন্দর করতে চেয়েছে মানব জাতির ইতিহাসকে। আমাদের সকলের মধ্যেই আছে কম-বেশি শিল্পসত্তা। আমাদের উচিত সেই শিল্পসত্তাকে জাগিয়ে তোলা। কাজেই মতান্তর যদি শিল্প -দর্শন -সাহিত্যের মধ্যে থাকেও তার সবটাই আমাদের গ্রহণীয়। নিছক অভিসন্ধিগত শিল্প ক্রমশই তার উদ্দেশ্য হারায়। বাদবাকি অভিমানহীন, ঔদাস্যহীন বিশুপাগলেরা চিরকালই পৃথিবীকে ভালোবেসে পৃথিবীর প্রান্তে প্রান্তে নিজের সঙ্গে নিজের যুদ্ধ চালিয়েই যাবে।



চিত্র গ্রাহক:  অনিরুদ্ধ মান্না

শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২০

গদ্য।। রাজীব ঘোষাল


 মহালয়া তর্পণ ও অন্যান্য 


বর্ষা প্রায় ফুরিয়ে এসেছে। ইতিউতি কোদালকোপানো শাদা মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে। দিগন্তজুড়ে কাশের চামর দোলাচ্ছে কেউ। খালবিলগুলিতে খলবল করছে মাছেরা। জেলেদের ফেলে দেওয়া ডালে ধ্যানমগ্ন বক। এসবই দেখে উদাসীন নিরতিশয়ানন্দ। তিনি এসে দাঁড়িয়েছেন ছোট এক নদীর কাছে।মনে পড়ছে তার অতীত জীবনের কথা। নাম ছিল নিরঞ্জন। স্কুলে নাম ছিল অতীশ। আর মামাবাড়ির দাদু নাম দিয়েছিলেন আনন্দ। শরৎ বরাবরই তার প্রিয় ঋতু। কেমন ভাদ্রের শেষদিনে ছাতাপরবের কথা মনে পড়ে তার মনে পড়ে বিশ্বকর্মার আবহজুড়ে আশ্বিনের শারদপ্রাতের অপেক্ষা। বড় আনন্দ জাগে মনে যখন কোনো গৃহস্থ, বাড়িতে আমন্ত্রণ জানান। কখনো কোনো পাড়ার ক্লাবের যুবারাও তাকে খাইয়ে দাইয়ে উপঢৌকন সঙ্গে দিয়ে ডেরায় পৌঁছানোর ব্যবস্থা পর্যন্ত করে দেয়। সনাতনী রীতিতে গভীর আস্থা তার কখনো কাউকে বিমুখ করতে পারেননি। একটা সময় ছিল মহালয়ার ভোরে দাদুর আমলের রেডিওর সামনে ভোর চারটেয় বসে পড়তেন তিনি। শোনা যেত বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের গলায় মহিষাসুরমর্দিনী। দেবী বন্দনা। এখন কাঁচাপাকা দাড়ি। প্যান্টশার্ট ছেড়ে গায়ে জড়িয়ে নিয়েছেন গেরুয়া বসন। নাম নিয়েছেন নিরতিশয়ানন্দ। তবুও মাঝেমধ্যে সদ্য যৌবনে পা দেওয়া দিনগুলির কথা মনে পড়ে যায়।মনে পড়ে যায় কাব্য প্রয়াসের দিনগুলি। কাব্য পাঠ ও কাব্যচর্চায় কত রাত জেগে কাটিয়েছেন তিনি!  কবি প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়ের "উত্তর কোলকাতার কবিতা" পড়তে গিয়ে বারবার নতুন নতুন দৃশ্যকল্প গড়ে উঠত মনে। সেই যে প্রবেশক কবিতাটি "অতিকাল যাও... আমার অপর এই গঙ্গাধ্ধারে/ বটবৃক্ষমূলে দ্যাখো গামছা পেতেছে... বাঁকুড়ার/ গোলাপী গামছা... আহা কী শীতল... অতিকাল/ যাও...ওকে একটু শুতে দাও বিরক্ত কোরোনা...  " এই কবিতাটি পড়ে একবার কেবলই মহালয়ার কথা মনে পড়ছিল নিরতিশয়ানন্দের। মহালয়ায় এক পা পাথরে এক পা জলে অথবা নাভি পর্যন্ত জলে নেমে সেই স্বর্গীয় উচ্চারণ! "ওঁ দেবা যক্ষাস্তুথা নাগা গন্ধর্ব্বাপ সরসোহসুরাঃ।ত্রুরা সর্পা সুপর্ণাশ্চ তরবো জিহ্মাগা খগাঃ।" অথবা রামতর্পণের সেই অংশটি "ওঁ অগ্নিদগ্ধাশ্চ যে জীবা যেহপ্যদগ্ধাঃ " এইসবই মামাবাড়ির দাদুর সৌজন্যে শোনা এবং জানা।যেমন জেনেছিল পিতৃপক্ষে তর্পণ শুরু হয়েছিল মহাভারতের চরিত্র কর্ণের কারণে, কর্ণ স্বর্গবাসী হবার পর তাকে সোনা রুপো ধনরত্ন খেতে দেওয়া হয়।তিনি একথা যমলোকে অভিযোগের আকারে জানালে তাকে বলা হয় তিনি সারা জীবন ধনরত্ন দান করলেও পূর্বপুরুষদের খাদ্য জল ইত্যাদি দেন নি তাই তাকে খেতে খাদ্য দেওয়া সম্ভব নয়। কথপোকথন শেষে দেখা যায় কর্ণ ছিলেন নির্দোষ তাই তাকে  পৃথিবীতে ১৫ দিনের জন্য ফিরে গিয়ে পিতৃপুরুষদের জল দানের অনুমতি দেওয়া হয়। এই ১৫ দিনই পরে পিতৃপক্ষ হয়ে ওঠে। এই প্রসঙ্গেই তার জানা হয়েছিল সুপর্ণা শব্দের ভিন্ন ভিন্ন অর্থ।  মোহিত হয়ে সেদিন জেনেছিল এই মন্ত্রের ভেতর দিয়ে দেব দানব রক্ষ যক্ষ পাখি সাপ অপুত্রক ভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ পাহাড় নদী সাতসমুদ্র পারের দ্বীপবাসী সমস্ত পূর্বপুরুষ এবং পিতৃপুরুষদের জল দান করা হয়ে থাকে। তার মুখে ফুটে উঠেছিল অসামান্য আলোকদীপ্তি। প্রসন্ন মুখে জমে উঠেছিল তৃপ্তি।আজ আবারো এক চিলতে হাসি ফুটে ওঠা মুখে যেন ধ্বনিত হতে থাকে "ইয়া দেবী সর্ব্বভূতেষু শক্তিরূপেণ সংস্থিতা"।কানে বেজে ওঠে " বাজলো তোমার আলোর বেণু "। নিরতিশয়ানন্দ হারিয়ে যেতে থাকেন শৈশবে। নদীসাঁতারে। কলাবউয়ের স্মৃতি ঘিরে ধরে তাকে। কলা কচু মান ধান হলুদ জয়ন্তী ডালিম বেল অশোক একসঙ্গে অপরাজিতা দিয়ে বেঁধে নতুন বস্ত্রে ঢাকা দেওয়া। এঁকে রাখা দুর্গার রূপ।পুজো তো হবেই কিন্তু বাচ্চারা কই! কোথায় সেই উন্মুক্ত প্রকৃতি! পাহাড় ঠেলে ঢাকিরাই বা ঢাকের শব্দ তুলছে কোথায়! দেবীপক্ষের মঙ্গলালোক তিনি তো জ্বালিয়ে রাখবেন আজীবন। মনে মনে বলতে থাকেন মাঠে মাঠে ধান্যগরবিনী হোক ধানগাছ। শরতের বেলের মতই ঢলে উঠুক দশদিক। সুজলা সুফলা ধরিত্রীর বুকে সমস্ত গ্লানি মুছে গিয়ে সমৃদ্ধ হোক চরাচর... মালিনীর জলে ছায়া পড়ুক বেনেবউয়ের। নিরতিশয়ানন্দ আর নিরঞ্জনে ফিরতে চান না। এক আঁজলা জল তুলে নিয়ে যুবা সন্ন্যাসী দেখতে থাকেন নিজের মুখ আর ভাবতে থাকেন নিরতিশয়ানন্দ ও নিরঞ্জন আসলে একই মানুষ...  অথচ নিরঞ্জন তো অমোঘ!  অবধারিত। কেমন যেন নির্ভার লাগে তার!


ছবি: বিধান দেব 

শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২০

ধারাবাহিক গদ্য। । অভিজিৎ দাশগুপ্ত


 

সাধনপর্বের নির্জনতা 


ভোর হল। বললেন , ' নদী থেকে স্নান করে আসি'।
পাশের ঘরেই ছিল মেয়ে, সেও কিছু জানলো না ।
জলে নামলেন আর পরক্ষণে মাঠ বৃক্ষ পাখি জনপদ কোনদিকে কিছু নেই , জল শুধু জল শুধু জল ...
                                                               সেই জলে  
শুয়ে পড়লেন শক্তি , চিৎসাঁতারে ভাসবেন বলে...

নাভিতে এবার একটি পদ্ম জেগে উঠল তার সব কটি            
                                                      পাপড়ি খুলে ধরে।
আকাশও একপাত্র মদ বিনাবাক্যে তৎক্ষণাৎ ঢেলে  
                                                দিল পদ্মের ভেতরে! 
                                             ( ' শক্তি চট্টোপাধ্যায় ' )

এই কবিতাটি যদি এপিটাফ  হয় , তাহলে এর মধ্যে সত্যের অংশই বেশি । ব্যক্তিগত সম্পর্ক যেখানে ধ্বজাধারী হয়ে ওঠে মৃত ব্যক্তির মূল্যায়নে , সেখানে জয় গোস্বামীর  উচ্চারণ যথার্থ , স্বকীয় এবং প্রতীকীও  ।  তাঁদের পরিচয় সময়ের হিসেবে দীর্ঘ। অপ্রত্যক্ষ এবং প্রত্যক্ষ । প্রথমে কবিতা , পরে কবি। একই পত্রিকা অফিসে কাজের সূত্রে  কাছাকাছি আসা। ফলে শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে যদি কেউ প্রকৃতই চিনে থাকেন  তবে সে নামটা অবশ্যই জয় গোস্বামী।

জ্যেষ্ঠ এই কবির  অনুভূতিমালা গ্রহণের ক্ষমতা তো সকলের ছিল না , অথবা যাঁদের ছিল তাঁরাও নিজস্ব প্রয়োজনে অথবা অপ্রয়োজনে তাঁকে ব্যবহার করেছেন। তাৎক্ষণিক কথাবার্তার আড়ালে গুলিয়ে দিয়েছেন প্রকৃত সত্য বা সত্তাটিকে । জয় গোস্বামী  সে পথের পথিক নন । তিনি কখনও তা হতেও চান নি। শক্তির কবিতায় যে উত্তরণের মার্গটি রয়েছে , তাকেই খুঁড়ে গেছেন অনুসন্ধিৎসু হৃদয়ে।

মৃত্যুর দিনটিকে সামনে রেখে শুরু হয়েছে কবিতাটি । শক্তির চলে যাওয়ার দিনটির সঙ্গে কখনোই তাকে মেলানো যাবে না । যাওয়া উচিত নয় । কবিতায় কখনো সেটি হয়  না । ভোরবেলায় জলে নেমেছেন শক্তি । স্নান করবেন । তাঁর মেয়ে জানতে পারেনি বাবার এই একা চলে যাওয়ার মুহূর্তকে । প্রসঙ্গত বলি, শান্তিনিকেতনে কবির  মৃত্যুর সময় তাঁর কন্যা উপস্থিত ছিলেন । এটুকুই , হ্যাঁ  কন্যার এই অবস্থানটুকুই  এ কবিতায় প্রত্যক্ষ ।  বাকি ছটি পংক্তি ঈশ্বর - উচ্চারিত।

জলে নামবার পর মাঠ বৃক্ষ পাখি জনপদ সব ডুবে গেল কোন এক কালচক্রে ।  সৃষ্টির আদিতে পৌঁছে গেলাম আমরা ।  কবি নিয়ে চলেছেন আমাদের ।   'কোনদিকে কিছু নেই , জল শুধু জল শুধু জল ...'।সেই অনন্ত সলিল শুধু ভাসিয়ে রাখলো আমাদের প্রিয় কবিকে । যেভাবে পুরাণে কথিত নারায়ণ ( যার অর্থ --- যিনি জলের উপর শয়ন করেন ) ক্ষীরোদ সাগরে  শায়িত  ছিলেন । এই অবস্থাতেই তিনি সৃষ্টি করেছেন অসংখ্য জগত ।  শক্তিও কি ওই  অনন্তনাগ সদৃশ তরঙ্গায়িত জলে শুয়ে শেষ কবিতাটি মনে মনে উচ্চারণ করেছিলেন ? আমরা জানি না ।  তবু জানি, তাঁর চিকচিক করে ওঠা চোখ শব্দের কিছু-না-কিছু সংকেত প্রেরণ করেছিল উত্তরপুরুষের উদ্দেশ্যে।     'নাভিতে এবার একটি পদ্ম জেগে উঠলো তার সবকটি পাপড়ি  খুলে ধরে '। এও তো সৃষ্টি । নারায়ণের চোদ্দটি জগৎ তৈরির মতোই শতদল জন্ম নিল কবির শিল্পকর্মে। হ্যাঁ , এখানে আরেকটিও প্রত্যক্ষ বিষয় এসেছে । সেটি মদ । এ তাঁর জীবনবেদ। কিন্তু অনুজ কবি সেই মদের ভেতর ঢেলে দিয়েছেন সৃষ্টির অপার রহস্য । যিনি প্রকৃত শিল্পী , তিনি প্রতিদিন প্রতিমুহূর্তে এই মদ পান করেন। এ মদের স্বাদ বা গন্ধ যিনি শিল্পী নন, তার অধরাই থেকে যাবে চিরকাল । কবির শিল্পীসত্তা বাহ্যজ্ঞান লুপ্ত করে পৌঁছে যায় অন্য এক অভিমুখে । যেখানে শাশ্বত বিচ্ছুরিত আলো এসে পড়ে হৃদয়ে।

জন্মের মুহূর্তে সেই ' মদ ' কবি গ্রহণ করেছিলেন। নাভিপদ্মের ভেতরে আকাশ মদ ঢেলে দিচ্ছে , এই যদি হয় ভাবনা , তবে তা আরো আরো  পশ্চাতে টেনে নেবে আমাদের। সে হলো মাতৃগর্ভ । সেখানেই তৈরি হয়েছে কবির  প্রথম চেতনা ।  মনোজগতের কোষগুলো পরিপুষ্ট হয়েছে একটি একটি করে । মৃত্যু আর জন্ম , জন্ম আর মৃত্যু --- দুইই  এক সুতোয় বাঁধা পড়ে গেছে কবিতাটিতে । যতবার পড়ি ,  ততবার কবি শক্তির আসল চেহারাটি  সীমাবদ্ধ কুয়ো থেকে চিৎ সাঁতারে  ভেসে ওঠে অনন্ত জলে। 




বৃষ্টির পুনর্জন্মকালে নেমেছে ধারাস্নান
ত্রিভুবন উদ্ভিদের মতো শান্ত হতে চায় ,
বিদায় যুদ্ধজয় , বলো, বিদায় মলিনতা ,
আমার , তোমার , তার  সব রক্তরেখাগুলি
দেখো , সচল হয়ে শরীর থেকে নেমে যাচ্ছে ;
নিয়ে চলে যাও , মেঘরাজ , সব রক্তিমতা
এই নির্ঘোষ থেকে লুটিয়ে পড়েছে রাগিনী ,
আমি পুত্র , আজ দিগম্বর , দিব্যস্নানরত ,
একটি কূট প্রশ্নে  পথরোধ করি তোমার ,
এত হরিদ্বর্ণ কেন ফেলে গেলে জগতে !
                         ( ' নঙপোহ্  , শিলঙের পথ ' )
আগে একটা গল্প বলে নি । সে গল্পের প্রধান চরিত্র শরতের শিলং ।  পৌঁছাতে পৌঁছাতে সন্ধ্যা উতরে গেল। সেদিনের মতো আশ্রয় দেশজ কুটিরে ।  তরুলতা সদৃশ নির্মেদ এক নারী এসে বুঝিয়ে  গেল থাকবার নিয়ম-নীতিগুলো । নিজের পরিবার - সন্তান নিয়ে কর্মহীন কয়েকটি দিন কাটাবো বলে সত্বর আশ্রয় নিলাম আমি।

রাত্রি কেটে গিয়ে ভোর হলো ।  একা বাইরে বেরিয়ে এলাম ।  চোখের সামনে এতক্ষণ কৌতূহলের যে পর্দাটি ছিল , তা সেই সূর্য না ওঠা ভোরে কেউ যেন সরিয়ে দিলে ।  শুধু সরিয়েই  দিলো না , কানে কানে  এসে বলে গেল , আমি এসেছি । এই সবুজ আর বৃষ্টির আলো-আঁধারি আমার সমস্ত শরীরে । যদি চোখ থাকে তবে তুমি এখানেই খুঁজে পাবে বেদ উপনিষদ পুরাণ থেকে শুরু করে লোকসাহিত্য ।

তার বলা কথাগুলো অনুরণিত হয়ে ওঠে মগজে । আহা সবুজ বলে সবুজ ! অমোঘ এক বার্তা যেন অনবরত সে পাঠিয়ে চলেছে তীক্ষ্ণ উচ্চারণে । কেন তীক্ষ্ণ বললাম ! তার কারণ আছে। শিলংয়ের বৃষ্টিধোয়া সবুজ প্রকৃতি অন্য কারো সঙ্গে মেলে না যে। সে অনেকটা এই পৃথিবীর মতোই । জিয়র্ড। পথে পথে এগিয়ে গেছি , অথচ  পাহাড়ের সচ্ছল সংসারে তার এতটুকু হেলদোল নেই । সবুজের চাষ হয় এখানে ।  আর বৃষ্টি । ' বরিষধারামাঝে ' গানটির সার্থকতা এখানে  এলে টের পাওয়া যায়। রবীন্দ্রনাথ তো এসেছিলেন শিলং পর্বতে। তাহলে কি...

কোনও প্রশ্নেরই উত্তর মিলছে না যেন। অথবা উত্তরের কাছাকাছি গিয়ে কেমন এক অনীহা তৈরি হয় মনে । থাক না ! আমি তো অন্য এক উদ্দেশ্য নিয়ে বসেছি । তার অনুভূতিমালা সাজানোই কাজ  আমার। 'এত হরিদ্বর্ণ কেন ফেলে গেলে জগতে ' --- কে বলছেন ? কবি গৌতম বসু ।  কবিতাটি পড়তে পড়তে এর অন্য কোনো অর্থ আছে কিনা একবারের জন্য  মনে হয়নি আমার ।  চিন্তায় আসেনি আলংকারিক অথবা রস বিশেষজ্ঞদের কথাও।  ঈশ্বর বিষয়ক ভাবনাটিও ক্লিশে মনে হয়েছে ।  ভালো কবিতা পড়ার সুখস্মৃতি  নিয়ে সম্মোহিতের মত শুধু পড়ে গেছি  কবিতাটি ( ' নঙপোহ্ , শিলংয়ের পথে ' ) ।  হ্যাঁ শুধুই পড়ে গেছি।

বৃষ্টিভেজা এবং বৃষ্টিস্নান সেই সকাল-দুপুর-বিকেল পথে পথে কাটিয়ে এলাম আমরা । আর ঘর ও প্রান্তরকে এক করে  অচেনা সেই মার্গে আমি খুঁজে পেলাম কবিতার নিবিড় দুটি পংক্তি ---

" নিয়ে চলে যাও ,  মেঘরাজ , সব রক্তিমতা
  এই নির্ঘোষ থেকে লুটিয়ে পড়েছে রাগিণী।"

সত্যি ! দিব্যস্নানরতা সেইসব পাহাড়-নদী-প্রান্তর- বনভূমি শুভেচ্ছা বিনিময়ের মত শুধু ডেকে গেছে আমাকে । যেমন গৌতম বসু শুনেছিলেন অন্তর্লীন সেই ভাষা ।  সে ভাষাই আমারও দীর্ঘ করেছে অনুভব। এই কবিতার শব্দে এমন এক অন্তর্দ্যুতি আছে ,  যার নেশায়  পাঠক পৌঁছে যান ধারাস্নানে। বৃষ্টির পুনর্জন্মকালে  একমাত্র , হ্যাঁ সে ই পারে ত্রিপাদ দুঃখকে দূর করতে ।  কবিতা প্রাণবায়ু প্রতিবাদী হয়েও কত মহতী!

আমার দ্বিতীয় সকাল শুধু জিজ্ঞেস করে ---
' এত হরিদ্বর্ণ কেন ফেলে গেলে জগতে ! '
        
                                                                           ক্রমশ


ছবি:  বিধান দেব 
 
         



 

ধারাবাহিক গদ্য। । দীপক হালদার


 

ডায়মন্ডহারবারের সাহিত্য চর্চার ইতিবৃত্ত 



''আইস, আমরা সকলে মিলিয়া বাঙ্গলার ইতিহাসের অনুসন্ধান করি।যাহার যতদূর সাধ্য, সে ততদূর করুক, ক্ষুদ্রকীটযোজনব্যাপী দ্বীপ নির্মাণ করে ।একের কাজ নয় সকলে মিলিয়া করিতে হইবে ।''
                  -------------বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ।

নৈঃশব্দ্যের গভীরে যেমন শব্দের অনন্ত সম্ভার, তেমনই কালের অতলে থাকে অতীত ঐতিহ্যের স্বর্ণভান্ডার।ডায়মন্ডহারবার একটি প্রাচীন শহর ।মহকুমা হিসেবে ডায়মন্ডহারবার যথেষ্ট ঐতিহ্যশালীও।তাছাড়া প্রখ্যাত পর্যটন কেন্দ্র হিসেবেও এর খ্যাতি বহুল প্রসারিত ।শ্রদ্ধেয় গবেষক মনোরঞ্জন রায় তাঁর পরায়ত্ত পরগনা গ্রন্থে ডায়মন্ডহারবারের জন্মকথাপ্রসঙ্গে জানাচ্ছেন-------------
প্রথম দিককার ইউরোপীয় বনিকেরা মুড়ীগঙ্গা এষ্টুয়ারীকে রোগস্- রিভার নামে চিনতো।ওখানে তখন পর্তুগীজ জলদস্যুদের ঘাঁটি ।ইংরেজ নথিতে মুড়ীগঙ্গা 'গ্যাংম্যানস্ ক্রীক ' ও 'চ্যানেল ক্রীক ' ব'লে উল্লেখ আছে ।পশ্চিম উপকূলে মোহনা থেকে 48 নটিক্যাল মাইল উত্তরে আরেকটি আর্ম্মাডা ঘাঁটি  'ডায়মন্ড ক্রীক '। 'ডায়মন্ড ক্রীক 'থেকে ডায়মন্ডহারবার ।এই নামেই মহকুমা সদর দপ্তর ।
1862 সালে ডায়মন্ডহারবার মহকুমার জন্ম ।উনবিংশ শতকের নবজাতকের সেই পদধ্বনি এখন একবিংশ শতাব্দীর ভরা জোয়ারে ঘোরতর অনুরণন তুলেছে।আমাদের অনুসন্ধিৎসা আমাদের ক্রমাগত টেনে নিয়ে চলে তার অতীত দিনের অন্দরমহলে ।ভালো করে তাকালেই সেখানে হীরকোজ্জ্বল দ্যুতিতে ঝলমল করে ওঠে এমন কিছু ঘটনা ও নাম, যা আমাদেরকে শ্রদ্ধানত গর্বিত করেনা শুধু,সাথে সাথে বুঝতে সাহায্য করে ডায়মন্ডহারবারের অতীতকে ।যা কিনা সাহিত্য চর্চার এক সুরম্য মৃগয়াক্ষেত্র বলেও প্রতিভাত হতে পারে ।মহকুমার বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে তখন সাহিত্য রচনা, পত্র- পত্রিকা প্রকাশ ঘটে চলেছিল আপন উল্লাসের আন্তরিকতায়।যার ছোঁয়া এসময়ে বিশেষ চমকপ্রদ শুধু নয় উত্তেজক উন্মাদনাও সৃষ্টি করে ।

মুদ্রণযন্ত্র প্রবর্তনের আগে লেখাপড়ার জন্য শিলালিপি, তাম্রলেখ,মৃৎফলক প্রভৃতি ছাড়াও তালপাতা, গাছের ছাল,তুলট কাগজ, কাপড়, চামড়া বা কাঠের তক্তির ওপর লেখাজোখা হত,গ্রন্থের পান্ডুলিপিও তৈরি হত।ডায়মন্ডহারবার মহকুমার কোনো কোনো অংশে সে সবের সন্ধান পাওয়া যায় ।মহকুমার মন্দির বাজার থানার জগদীশ পুর গ্রামের প্রাচীন ও বর্ধিষ্ণু খাঁ এবং নস্কর পরিবার, বাওয়ালি গ্রামের বিখ্যাত মন্ডল পরিবারের জমিদার বাড়ি এবং মগরাহাট থানার বেলে গ্রামের হরেন্দ্রনাথ প্রামাণিকের ব্যক্তিগত পুঁথি- সংগ্রহশালা থেকে এ সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে ।

পশ্চিমবঙ্গের প্রাণরাম কালিকামঙ্গলের প্রাচীনতম কবি ।প্রাণরামের কাব্যের পুঁথি ।দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার বাওয়ালি, টালিগঞ্জ, ঘাটেশ্বরে( লক্ষ্মীকান্তপুর লাইন) পাওয়া গেছে ।
           দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার কবি অযোধ্যারাম দাস 'সত্যনারায়ণ পাঁচালি 'র প্রথম রচনাকার।কবির এই পাঁচালির প্রথম পরিচয় প্রকাশ করেন স্বর্গত কালিদাস দত্ত মহাশয় ।( বরেন্দ্র রিসার্চ সোসাইটির মনোগ্রাফ নং চার, পৃষ্ঠা সতেরো) পরবর্তীকালে কবি অযোধ্যারাম রচিত মহীরাবন পালার একখানি খন্ডিত পুঁথিও সংগৃহীত হয়েছে ।তিনি গোবিন্দপুরের বাসিন্দা ছিলেন । কেউ কেউ এই গোবিন্দপুরকে ডায়মন্ডহারবার মহকুমার আবার কেউ কেউ বারুইপুর মহকুমার অন্তর্ভুক্ত বলে মনে করেন। রচনা থেকে কবির বাসস্থান ও কাব্য রচনাকাল জানা গেছে ।
অযোধ্যারামেতে বলে করিয়া প্রণাম--
জাহ্নবীর পূর্ব্বেতে গোবিন্দপুর ধাম।
সমুদ্রে বাণক্ষয় দেখ তবে কত রয়       হরের আনন তারপর ।
রন্ধ্রের বর্জ্জিত রাম বিধুরে থুইয়া বাস       বুঝহ সকল ধীর নর।।
পশ্চিমে জাহ্নবী মাই নিত্য দরশন পাই      গোবিন্দপুরেতে নিকেতন।
অযোধ্যারামেতে গায় এতদূরে হৈল মায়      মহীরাবনের উপাক্ষণ।।
  দয়ারাম দাশ দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার মানুষ না হলেও চাকুরিসূত্রে বহুদিন দক্ষিণ চব্বিশ পরগনায় বাস করেন এবং এখানে বসেই ভাগবতের উদ্ভবসংবাদ রচনা করেন ।উদ্ভবসংবাদ 'সন হাজার একশত একানব্বই সালের অগ্রহায়ণ মাসে সমাপ্ত হয়।গ্রন্থের শেষে তিনি দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার কিছু কথা জানিয়েছেন ।

পরগনেতে মুড়াগাছা কাছে হাত্যাগড়।
মুস্তাফীর তালুক গ্রাম গোপালনগর।।
তাহার নাইবি লয়্যা করি প্রয়োজন ।
রচিতে উদ্ভব কথা হইল সঙরণ।।
বাঞ্ছারাম মাটীর বাড়িতে করি বাস।
পূর্ব্বদ্বারী পিড়ার চালেতে নাহি ঘাস।।

        কবির নিজস্ব নিবাস খোসালপুর পরগনার কাদোয়া গ্রাম।তাঁর পিতার নাম জীবন ।জাতি বৈদ্য।কুল্পীর নিকট গোপালনগর গ্রামে তিনি বাস করতেন।
ডায়মন্ডহারবার থানার কড়াইবেড়ে গ্রামের বাসিন্দা কোনো এক অজ্ঞাত কবি অষ্টাদশ দশকের শেষের দিকে 'পঞ্চানন্দের পাঁচালি ' রচনা করেন।
এসমস্ত তথ্য এ কথাই নির্দেশ করে যে বহু প্রাচীন কাল থেকে ডায়মন্ডহারবার মহকুমার মাটিতে সাহিত্য চর্চার বীজ বপন করার কাজ শুরু হয়েছিল ।
                                    
                                                                            ক্রমশ


ছবি:  বিধান দেব 



বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২০

ইসমাইল হোসেন।। অনুবাদ: বাসুদেব দাস

 






 বিজ্ঞাপণ


আমার একজন পাত্রীর প্রয়োজন

বয়স আমার পঁচিশ,গায়ের রঙ বাদামি,

উচ্চতা পাঁচ ফুট পাঁচ ইঞ্চি।

আমার পরিচয় এমনিতেই সহজঃ

সমস্ত জাতি-উপজাতি আমার স্ব-জাতি ,

পৃ্থিবীর মানুষের অস্ফুট কথা আমার নিজের ভাষা,

আমার ঠিকানা কয়াকুচি,জেলা বরপেটা,

নদীর তীরে আমার ছোট একটি ঘর।



পাত্রী হতে পারে ফর্সা,বাদামি অথবা কালো,

সে কোন ধর্মের প্রার্থনাকারী,তার জিভের ভাষা কী,

কোথায় ফেলে এসেছে তার তার বাড়ি,কী তার জাত 

এই সমস্ত কিছুর সংজ্ঞা আমার বিবেকের কাছে  তুচ্ছ হতে পারে।


তার সঙ্গে সহবাসের রাতে জিজ্ঞেস করব না তার সতীত্বের কথা,

তার সঙ্গে ফুলশয্যার রাতে তীক্ষ্ণ চোখে দেখব না তার কায়া,

কারণ এখানে জাতি-ধর্মের নামে ধর্ষিত হয় আমার মা

হিংসার আগুনে পোড়ে তার সমস্ত মুখ,বিবস্ত্র হয় গা।


আমার একজন মননশীল পাত্রীর বড় প্রয়োজন-

যার জীবন-পঞ্জীতে লেখা আছে পৃথিবীর ধর্ষিতা নারীর ঠিকানা,

যে হাতে হাতে তুলে দিতে পারে বিক্ষোভের আগুন শিখা,

মোটের ওপর নির্ভয়ে উড়াতে পারে বিদ্রোহের পতাকা।



আমি এমনিতেই একজন দরিদ্র যুবক ,বুকে অযুত আঘাতের ঘা,

আমার অরণ্যের চারপাশে এখন মৃত্যুর জরুরি পরোয়ানা।


আমার একজন বিশ্বস্ত পাত্রীর একান্ত প্রয়োজন-

যার মুক্ত বুকের মাঠেও শস্যের উল্লাস,

উইনি মেণ্ডেলার বুকের মতো যার বুক গভীর,

সাতাশটা বসন্তের অপেক্ষারত একটি সুগন্ধি গোলাপ।


আরও দুটি বসন্তের শেষে আমার বয়স হবে সাতাশ,

ঋতুর ভেজা পলিতে বুকে অনুভব করছি চরম উত্তাপ,

আমার ঘরের চারপাশে জান্তব  

অবক্ষয়ী উৎসব।


আমার একজন আদর্শ পাত্রীর প্রয়োজন-

যে মানুষের কঠিন যাত্রাতেও আমার সঙ্গে হতে পারে 

দুর্গম পথের বিশ্বাসী সহচর।           





একটি ভয়ঙ্কর দৈত্যের বিরুদ্ধে




একটি ভয়ঙ্কর দৈত্য আমাদের তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে 

দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে দৈত্যটির বিচরণ।

দৈত্যটির নির্দিষ্ট আকার নেই বর্ণ নেই 

কখনও কাজল রঙের কখনও কালো কখনো লাল 

কখন ও বিচিত্র বর্ণের কখন ও ধোঁয়া বর্ণের কিন্তু সাদা নয়।

তার নির্দিষ্ট হাত নেই চোখ নেই পা নেই কান নেই

সে কখনও বোবা কখন ও কখনও কালো কখনও অন্ধ।

দৈত্যটির হাতে থাকে আগুন অথবা আগ্নেয়াস্ত্র 

চোখে থাকে ঘৃণা অথবা হিংসা 

শিলসম হৃদয়ে তার ছাই রঙের বর্বরতা।

দৈত্যটাকে আপনি জিজ্ঞেস করবেন না মানুষকে ভালোবাসার ঠিকানা

কারণ এর নিজেরই কোনো ঠিকানা নাই 

এ কখনও লুকিয়ে থাকে মসজিদে কখনও মন্দিরে 

কখনও গির্জায় কখনও বা গুরুদ্বারে।


দৈত্যটার খোঁজে কোথাও যেতে হয় না

শিকারের সন্ধানে সে নিজেই চলে আসবে-

মানুষের ঘর ফসলে ভরা মাঠ শান্তির শোভাযাত্রা 

আর উগড়ে রেখে যেতে পারে সমস্ত ঘৃণা।

সে ক্ষণিকের মধ্যে লাল করে দিতে পারে শান্তির জলাধার

ফসলে ভরা মাঠে নামিয়ে আনতে পারে খরার কারুণ্য।

নির্জন রাতে আপনার দরজায় টোকা দিয়ে 

দৈত্যটা ছিনিয়ে আনতে পারে আপনার প্রেম

মুছে দিতে পারে প্রিয়ার শিরের সিঁদূর চোখের রং

কেড়ে নিতে পারে সন্তানের মুখের ভাত আত্মীয়ের মুখের কথা। 

গভীর রাতে আপনি ঘুমিয়ে থাকলেও দৈত্যটা ঘুমিয়ে থাকে না 

আপনি জ্যোৎস্না দেখতে চাইলে সে অন্ধকার নামিয়ে আনে

তার হাতের মুঠিতে থাকে চারটে বিষের পুঁটলি।

মন্দিরের মঙ্গল ধ্বনিকে সে মৃত্যুধ্বনিতে রূপান্তরিত করতে পারে 

মসজিদের আজানের সুরগুলি কে সে বেসুরো করে দিতে পারে

গির্জা-গুরুদ্বারে নামিয়ে আনতে পারে শীতল নীরবতা।

এই দৈত্যটার বিরুদ্ধে আপনার দেশ আমার দেশ আর সংসদ

এই দৈত্যটার বিরুদ্ধে আপনি আমি আর আমাদের সংবিধান

এই দৈত্যটার বিরুদ্ধে ধর্ম বিবেক বিজ্ঞান আর সমাজ 

এই দৈত্যটার বিরুদ্ধে আপনার প্রতিবেশী আর আত্মীয়-স্বজন।


কী হতে পারে দৈত্যটার নাম 

বিচ্ছিন্নতাবাদ না সন্ত্রাসবাদ

সাম্প্রদায়িকতা না গোষ্ঠীবাদ

অথবা অন্য কোনো সর্বনাম?



আসুন আমরা আরম্ভ করি দৈত্যটার হত্যার অভিযান

হাতে হাত ধরে হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ ইহুদি খ্রিস্টান 

সবাই মিলে তৈরি করি একটি কফিন দৈত্যের কফিন।।


ইসমাইল হোসেন : ১৯৬৫ সনে অসমের বরপেটে জেলার কয়াকুছিতে জন্মগ্রহণ করেন ইসমাাইল হোসেন। পেশায় ইলেক্ট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারের অধ্যাপক।অসমিয়া সাহিত্য সংস্কৃতির একজন গবেষ্ক।‘জীবন আরু মানুহ বিষয়ক’,’বিজ্ঞাপন’,’নৈপরীয়া’বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ।



ছবি বিধান দেব।


আগা শাহিদ আলি।। অনুবাদ: সায়ন রায়


 

বিদায়

একটা সময় আমি তোমার হদিস হারিয়ে ফেলি।

ওরা,উচ্ছেদ নিয়ে আসে আর একে নাম দেয় শান্তি।

যখন তুমি চলে যাও এমনকি পাথরদেরও কবর দেওয়া হয়েছিল :

অসহায়দের কোনো অস্ত্র ছিল না।


যখন বন্য পাহাড়ি ছাগল পাথরের গায়ে শরীর ঘষে,পাহাড়ের ঢালে ঝরে পড়া

তার পশমগুলি কে জড়ো করে রাখে?

ও তাঁতি,যার ফোঁড়গুলো পুরোপুরি লুপ্ত হয়ে গেছে,কে চুলের ওজন 

চাপাবে স্বর্ণকারের দাঁড়িপাল্লায়?

ওরা উচ্ছেদ নিয়ে আসে আর একে নাম দেয় শান্তি।  

স্বর্গোদ্যানের দরজায় কে আজ রাতের অভিভাবক? 


আমার স্মৃতি পুনর্বার তোমার ইতিহাসের মুখোমুখি।

মরুর ক্যারাভানের মত সেনাদের গাড়িগুলি টহল দেয় সারারাত :

মৃদু হেডলাইটগুলোর ধোঁয়া ওঠা তেলে সময় গলে যায় –-সারা শীত

জুড়ে -–তছনছ করে মৌরিফুলের গাছ।

আমরা ওদের প্রশ্ন করতে পারি না : পৃথিবীকে শেষ করা কি তোমাদের সম্পূর্ণ হয়েছে?


হ্রদের জলে মন্দির ও মসজিদের হাতগুলি পরস্পরের প্রতিচ্ছবিতে 

আষ্টেপৃষ্ঠে আটকে আছে।

তুমি কি গেরুয়া জাফরান শুষে নিয়েছ ওদের ওপর ঢেলে দেবার জন্য,

বহু শতাব্দী পর যখন তাদের এমনভাবেই দেখা যাবে এই দেশে,

যে দেশকে আমি তোমার ছায়ার সাথে সেলাই করেছি?

এই দেশে আমরা ঘর হতে বার হই দরজাগুলো হাতে নিয়ে।

শিশুরা ঘর হতে দৌড়ে যায় জানলাগুলো হাতে নিয়ে।

তুমি তোমার পিছনে তা টেনে আনো আলোকিত করিডরে।

যদি সুইচের হাতলে পড়ে টান,তুমি ছিঁড়ে যাবে সবকিছু থেকে।


একটা সময় তোমার হদিস আমি হারিয়ে ফেলি।

আমাকে তোমার প্রয়োজন ছিল।তোমার প্রয়োজন ছিল আমাকে নিখুঁত করার :

তোমার অনুপস্থিতিতে আমাকে তুমি মেজে ঘষে শত্রু করে তুলেছ।

তোমার ইতিহাস আমার স্মৃতির মুখোমুখি। 

আমিই সেই সবকিছু যা তুমি হারিয়েছ।আমায় তুমি ক্ষমা করতে পার না।

আমিই সেই সবকিছু যা তুমি হারিয়েছ। তোমার প্রকৃত শত্রু।

তোমার স্মৃতি আমার স্মৃতির মুখোমুখি :


স্বর্গোদ্যানের মধ্যে দিয়ে নরকের এক নদীর বুকে আমি নৌকো বাইছি :

অসাধারণ এক প্রেত,এখন রাত্রি।

বইঠা এক হৃদয় ;তা,ভেঙে দিচ্ছে পোর্সিলিন ঢেউগুলিকে :

এখনও রাত্রিকাল। বইঠাটি এক পদ্ম :

তা যত শুকিয়ে যাচ্ছে,আমি দাঁড় বেয়ে চলেছি মৃদুমন্দ বাতাসের দিকে

তা নরম ও কোমল যেন সে আমার প্রতি সহানুভূতিশীল। 


যদি তুমি কোনোভাবে আমার হতে পারতে,তাহলে এই পৃথিবীতে 

কোনো কিছু ঘটা বাকি থাকতো কি?

আমিই সেই সবকিছু যা তুমি হারিয়েছ। তুমি আমায় ক্ষমা করনি।

আমার স্মৃতি তোমার ইতিহাসের মুখোমুখি হয়েই চলেছে।

এখানে ক্ষমার কিছু নেই।তুমি আমায় ক্ষমা করনি।

আমার বেদনাকে এমনকি নিজের কাছেও লুকিয়ে রাখি;আমার বেদনাকে

কেবল নিজের কাছেই প্রকাশ করি।

এখানে সবকিছুই ক্ষমার যোগ্য।তুমি আমায় ক্ষমা করতে পার না।

যদি কোনোভাবে তুমি আমার হতে পারতে, 

এই পৃথিবীতে কোনো কিছুই অসম্ভব হত কি?


( প্যাট্রিসিয়া ও' নিল- এর জন্য) 



মৃত্যুর সারি


কোনো একজন এই পৃথিবীতে তোমার কথা বলে চলেছে,


জড়ো করছে খবর,বিষয় অনুযায়ী সাজিয়ে নিচ্ছে তোমার জীবন 

একটা নথির জন্য যা তুমি কখনোই দেখতে পাবে না।সে ইতিমধ্যে জানে


কোন জন্মে তুমি খুঁজে পাওনি সেই বস্তু যা আবার 

এই জন্মে তুমি হারাবে।


সে হদিস রেখেছে তোমার প্রত্যেকটা 

মৃত্যুর। তোমার এখন তাকে দরকার, কিন্তু সে এখনও তোমায় প্রশ্ন


করে যাচ্ছে,আর তার প্রত্যেকটা প্রশ্নে শেষ হয়ে যাচ্ছে তাকে খুঁজে 

পাবার তোমার শেষ সম্ভাবনা। তিনিই সেই


যাকে তুমি হারিয়েছ গত রাতে

গত জন্মের জীবনে : তিনি প্রবেশ করেছিলেন 


তোমার ঘরে আর ওই রাতের জন্য তুমি পুনরায় জন্ম

নিয়েছিলে সেই রূপে যা তিনি চান : একজন নারী 


যখন তিনি চাইলেন নারীর ভালবাসা। 


( হালা মদেলমগ-এর জন্য)


গজল

( মখদুম মহিউদ্দিন -এর লেখা থেকে গৃহীত ) 

গুজব বসন্তের --- তারা টিকে থাকে ভোর হতে গোধূলি---

সব চোখ শাখা-প্রশাখাকে ফুল ভেবে ভুল করে।


তোমার কাহিনি হয়ে ওঠে সমতুল আমাদের তৃষ্ণার, প্রিয়—

তোমার কথারা ছড়িয়ে পড়েছে ভেঙে পড়া দেশ জুড়ে। 


প্রতি রাতে আমি যখনই নিজেতে গুটিয়ে যাই,

আমার কাছে শোনে তারা তার কথা--- একা নির্জন দেশ।


ফুরিয়েছে আশা,এখন বাকি নেই তো আর কিছুই ---

যন্ত্রণার রাত শুধুই, এই ফ্যাকাশে হলদে ভোর। 


বাগানের চোখ খুলে যায়,ফুলের হৃদয়ে স্পন্দন 

যখন আমরা কথা বলি,শুধু কথা বলি হায়!চিরদিনের।


তা ছিল এবং চিরকাল তা থাকবে নিশ্চিত ---

প্রিয় তোমার এই গুজব ভাগ করে নেয় আমাদের দুঃখ।


কাশ্মীরি কবি আগা শাহিদ আলির কবিতা



আগা শাহিদ আলি (১৯৪৯-২০০১):  নিজেকে কাশ্মীরি আমেরিকান কবি হিসেবে পরিচয় দিতেন। শ্রীনগরের উচ্চশিক্ষিত সম্ভ্রান্ত আগা  পরিবারে তার জন্ম।বাবা আগা আশরফ আলি ছিলেন জম্মু ও কাশ্মীরের একজন খ্যাতনামা শিক্ষাবিদ। তার ঠাকুমা বেগম জাফর আলি কাশ্মীরের প্রথম মহিলা ম্যাট্রিকুলেট।দিল্লিতে জন্মগ্রহণ করলেও শাহিদ বড় হয়ে ওঠেন শ্রীনগরে।পরে উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি দেন আমেরিকায়। সেখানেই বসবাস শুরু করেন।অধ্যাপনা করেছেন আমেরিকার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে।পরে ব্রেণ ক্যানসারে মারাও যান সেখানে।সত্তর দশকের গোড়া থেকেই লেখা প্রকাশিত হতে থাকলেও ১৯৮৭ তে প্রকাশিত A Walk Through the Yellow pages – এই বইটি-ই তাকে প্রথম ব্যাপকভাবে পরিচিত করে তোলে।এরপর একে একে প্রকাশ পেয়েছে : A Nostalgist's Map of America (1991), The Country Without a Post Office (1997), Rooms Are Never Finished (2001), Call Me Ishmael Tonight : A Book of Ghazals (2003)।মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয় তার নির্বাচিত কবিতা : The Veiled Suite (2009)।এই বইটির সম্পাদনা ও ভূমিকা লেখেন বিশিষ্ট কবি ডোনাল্ড হল।প্রখ্যাত সমালোচক ব্রুস কিং বলেছেন : আলির কবিতা আবর্তিত হয় নিরাপত্তাহীনতা,স্মৃতিকাতরতা,মৃত্যু,ইতিহাস,পারিবারিক পূর্বসূরি,অতীতচারিতা,স্বপ্ন,বন্ধুত্ব এবং তার কবিসত্তাকে নিয়ে এক আত্মচেতনাকে ঘিরে।তিনি প্রভাবিত হয়েছেন উর্দু কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের কবিতার দ্বারা।ফয়েজের কবিতা ইংরেজিতে অনুবাদও করেন : The Rebel's Silhouette  (1992)।গজলের একটি সংকলনও তিনি সম্পাদনা করেন : Ravishing DisUnities :Real Ghazals in English (2000)।সমালোচক অমরদীপ সিং শাহিদ আলির শৈলিটিকে সাধারণ ভাবে ‘ghazalesque' বলে চিহ্নিত করেছেন।তার মতে গজলের মত ইন্দো-ইসলামিক  ঐতিহ্যের এই আঙ্গিকটিকে তিনি সার্থকভাবে  মিশিয়েছেন গল্পবলার আমেরিকান ধরনটির সঙ্গে।এখানে অনুদিত কবিতাগুলি তার The Country Without a Post Office বইয়ের অন্তর্ভুক্ত।




আওয়াদিফো ওলগা কিলি।। অনুবাদ: মাসুদুল হক


 

অনাহারী আফ্রিকান

উদ্বাস্তু শিবিরে অনাহারী আফ্রিকান মানুষগুলো 
ত্রাণের অপেক্ষায় নির্বিকার দাঁড়িয়ে আছে। 
ক্ষুধা,কৃমি ও জখমে ক্ষত-বিক্ষত ওদের শরীর;
শরীরের দগদগে ক্ষতগুলোতে
 ডুমো মাছি উড়ে উড়ে বসছে 
দুঃখ ওদের মুখ থেকে আনন্দ কেড়ে নিয়েছে। 

অনাহারী আফ্রিকান মানুষগুলো দুর্দশায় আবদ্ধ।
 কামারের তৈরি ওদের প্রদীপগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে 
এবং  তরোয়ালগুলো মরিচা পড়তে পড়তে 
ভেঙে পড়া কুটিরের কোণায় পড়ে আছে। 

পেঁচা আফ্রিকানদের মাটির ঘরের মাথায় গান গায় 
আর, বন্যা এসে ওদের ঘরগুলো বিলীন করে দেয়।
ওরা কেবল চিতার চামড়া পড়ে থাকে 
ঘন বনের ভিতর নিরাপদে ঘুমিয়ে পড়ার আশায়।

 



একজন অনুগত দাস 

মনিবের অনুগত দাস
শুভেচ্ছাযুক্ত একটু তালি পেলেই 
পুলকিত হয়ে ওঠে উষ্ণ হৃদয়ে। 

আবর্জনার স্তূপ পরিষ্কার করে নিমিষেই 
সে তার মনিবের পা মোছে।
মাটির হাঁড়ি ও ঢাকনার সম্পর্কের মতোই 
সে তার মনিবের সাথে সীলমোহরে আবদ্ধ।
 
সে তার মনিবের ভুট্টার খেত দেখে 
আর পরম যত্নে তাদের ভাঙা বর্শা মেরামত করে। 
সে এক অনুগত দাস বাড়িতে ভুট্টার ভাণ্ডার এনে পশ্চিম আফ্রিকার তাজা মদের মতোই নিজ হাতে 
চোলাই মদ বানায়। 
সে এক বিশ্বস্ত দাস এবং নীল নদের শক্ত 
নলখাগড়ার মতোই তার শক্তি অপ্রতিরোধ্য।

আফ্রিকান শিশু

আমি এক আফ্রিকান শিশু।
কোমল, শান্ত আর নরম।
প্রতি সকালে আমি জেগে উঠি 
আমার নলখাগড়ার তৈরি বিছানা থেকে
এবং আমার আশার কুটির থেকে
আমি প্রসারিত করি;আমি প্রসারিত করি 
আমার অমিত সম্ভাবনাগুলো ।

ভোরের প্রথম সূর্যশিখার সাথে আকাশ ছড়িয়ে পড়ে
এবং এটিই আমার চোখে প্রথম উদ্ভাসিত বিষয়।
আমার কান সমুদ্রের শিস শোনে 
এবং গাছের গানগুলো বাতাসে বাতাসে উড়ে চলে। 
পাহাড়ের শীর্ষ প্রদেশ আমার খেলার মাঠ 
তা যেন মার্গারিটার রসের উপরে তুষারের মতো ঠান্ডা
এবং স্বর্গের মতো শান্ত।

আমি এক আফ্রিকান শিশু
ক্রেস্ট ক্রেইন সারসে মতো নিষ্পাপ;
বিষধর মুখরা মহিলার মতো ঘৃণ্য ন‌ই।
তবুও মাঝে মাঝে আমি  মারাত্মক হয়ে উঠি 
সেরেঙ্গেটির সক্ষম সিংহের মতো।
আমি আফ্রিকাকে নিয়ে  লজ্জিত ন‌ই।
আমার পূর্বপুরুষেরা আদিম জীবনসত্তা নিয়ে 
এখনো নড়েচড়ে ওঠেন; 
তারা আমাকে নরোঙ্গোরো পশুচারণ ক্ষেত্রের মতো 
 সম্পদের প্রাচুর্যতা দিয়ে আশীর্বাদ করে গেছেন।


আওয়াদিফো ওলগা কিলি ১৯৯৮ : সালে আফ্রিকার উগান্ডায় জন্মগ্রহণ করেন। মূলত কবি;তবে লেখক,মানবাধিকার কর্মী ও সোস্যাল একটিভিস্ট হিসেবে তার ভূমিকা অনন্য। বর্তমানে উগান্ডার পেনটেকোস্টাল বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনশাস্ত্রে পড়াশুনা করছেন। 

মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২০

দুটি কবিতা: শিমুল আজাদ




বৈদিক যুগে

ব্রোঞ্চযুগ মাত্রা  পেল গতির বিজ্ঞানে,
মৌর্যযুগের সম্রাট অশোকের কালে-
দেখি  লৌহের উত্থান;
যুদ্ধাস্ত্রে প্রস্তর,  ব্রোঞ্চ কৃষি ব্যবস্থায়।
ধর্মবিশ্বাসে, শিল্পকলায় তার ছাপ-
ভারত ভূমির সমগ্র উত্তরে,
বিবর্তন, অগ্রশীলতার।
জ্ঞানপিপাসুর চিন্তারশ্মি-
কৃষকের ঘরে ঘরে  জেগেছে  জোয়ার।
কর্মস্রোতে, রাজ্য বিস্তারে-
যুদ্ধের  জোগার।
প্রতিভূমে দুর্গের  দেয়ালে-
জনে জনে শানিত তরবার।






উজ্জয়নী পুরাণ

উজ্জয়নীর শাসক যখন স্বয়ং শিব
শান্ত-স্থির, প্রদর্শনে রাজা চন্দ্রসেন।
উৎসাহে কৃষক বালক শ্রীখর 
শুনি শিবমন্ত্র, তন্ময় প্রাণনে-
পৌঁছিলো মন্দিরে; আর উচ্চারিল জ্ঞাত মন্ত্র।
গ্রাম্য বালকের এই দুঃসাহস!
প্রহরীগণ  হেঁচকা টানে শিপ্রাতীরে-
তাকে দিল  ফেলে।
পার্শ্ববর্তী দুই শত্রুরাজ্য-
শাসক রিপুদমন, সিংহাদিত্য
উজ্জয়নী লুণ্ঠনে, 'দূষণ'  দৈত্যের
প্রবল সহায়তায় ভাঙিল-চূরিল;
শিব ভক্তদের পিষিল দুস্তর।
কিন্তু পুরোহিত বৃধি ও বালক শ্রীখরের ডাকে
উজ্জয়নী  প্রেমিক শিব-
স্বয়ং জাগিলো, রক্ষিলো নগর।
রুদ্রসাগর হ্রদের তীরে স্বয়ম্ভুমূর্তি
স্থাপনে পার্বতী আসিলো;
সেই দক্ষিণা মূর্তিতে- বিস্তর ক্ষণ-অনুক্ষণ।



ছবি: বিধান দেব 

দুটি কবিতা: শাহীন রেজা


 সম্পর্ক


ছায়ার ক্লিপ দিয়ে আটকে রেখেছি মেঘ

সুতোর সাথে সুতো জোড়া দিয়ে তৈরি করেছি

সম্পর্ক সেতু


তুমি কাঁদলেই ঝরে পড়বো আমি

আমার হাসিতে খোঁপা খুলবে তোমার জল-কবুতর


ইচ্ছেরা প্রগাঢ় হলে ঘ্রাণহীন জবা'ও হয়ে উঠতে পারে কামিনীর বোন 

আর রাত্রির চোয়াল খুলে নেমে আসতে পারে আদমসুরাত পল্টন মাঠে 

যেন কোনো আরেক সুভাস


তুমি চাইলেই আমি এক নদীর-কাজল

আমি ডাকলেই তুমি রতিক্লান্ত চাঁদ ।



তর্জনী


কে লিখেছে মহাকাব্য এমন, কোন কায়কোবাদ

কালের প্রান্তে এসে শুনিয়েছে হ্যামিলন বাঁশি

সাহস দোলায় তার দুলিয়েছে সেগুন পলাশ, পদ্মার জল 

আর মাঠভরা ধানের শরীর?

কে সে রাখাল রাজ, কার হাতে আলোময়

এই কাল মহাকাল ; দোজখের নিকষ কাফেলা।


একটি মন্ত্র সে তো মৃতদের জিয়ন কাঠি

একটি তর্জনী শুধু ফিরে আসা যুদ্ধের মাঠে।



ছবি: বিধান দেব 


সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২০

দুটি কবিতা: মজিদ মাহমুদ


 


নিষ্কামী


তুমি ঠিকই জানো, তোমার তো জানারই কথা

আজ অনেক লিঙ্গের মাঝে বিপন্ন আমি

অথচ এই লৈঙ্গিক পরিচয় ছিল আমাদের খেলা

আমরা যখন পানির পিচ্ছিল ঘাটলায় জেগে উঠছিলাম

যখন আমাদের ছিল প্রোটোজোয়া কাল

তখনো হয়নি শুরু আমাদের হ্যাপ্লয়েড বিভাজন

শরীরের মেয়োসিসগুলো তখনো ছিল মাইটোসিসের সাথে

আপন কোষের আড়ালে আমরা তখন স্বমেহনরত

সেই তো ছিল আমাদের সম্পূর্ণ আনন্দের কাল

তুমি বা আমি; আমি বা তুমি- এর কোনো লিঙ্গান্তর ছিল না

তখন আমরা ছিলাম, সম-বিষম-উভকামী

আমাদের শয়ন, উপবেশন কিংবা পদব্রজ

হিমালয়শৃঙ্গের গলিত তুষার-তরঙ্গের সাথে

পতিত হয়ে তোমাকে তুলে নিচ্ছিলাম কোলে

কখনো তুমি নিচে, কখনো আমি 

শরীরের ভারে নুব্জ, আবার জরায়ুতে গেছি মিশে

হয়তো এসব তুমুল উত্তুঙ্গু মিলনের কালে

আমার সুপ্ত অহংকার তোমকে হারিয়ে ফেলেছিল

যদিও চন্দ্রিমা রাতে আমরা কাছে এসেছিলাম

যদিও আমরা হারিয়ে ফেলেছিলাম অন্ধকার গুহায়

তবু দিনের আলো আমাদের মিলতে দেয়নি

অথচ এখনো যারা তাদের লিঙ্গকে পারে চিনতে

তারা হয়তো সমকামী, তারা হয়তো এখনো আছে

ঈশ্বরের উদ্যানে

তাদের অযৌনজনন, পক্ষপাতহীন মিলন

কেবল মিলনের আনন্দের তরে

কিন্তু যে আমি তোমাকে হারিয়ে ফেলেছিলাম

হয়তো শরীরের চিহ্ন রেখায় ছিল দৃশ্যত অমিল

সেই তুমি যখন আমার সঙ্গে মিলিত হও

তখনই তো আমি হয়ে উঠি অভিন্ন পূর্ণ মানুষ

তখন আমরা পরিণত হই নিষ্কাম কর্মে

তখন দৃশ্যত কামের আড়ালে পারে না দেখতে

আমাদের বিভাজন রেখা




লাশ নামাবার গল্প


প্রথমে আমার দেহ কবরস্থ করেছিলেন আমার পিতা

নিজের আনন্দে রেখে এসেছিলেন কোনো এক মহিলার প্রকোষ্ঠে

সে নারীও বেশিদিন পারেননি করতে বহনের যন্ত্রণা

অসংখ্য লাশের সঙ্গে আমাকে করলেন সমাহিত

একদিন সেইসব মৃতদেহ আবার আমায় ধরাধরি করে

 শুইয়ে দিলেন মৃত্তিকার গর্ভে

একটি গর্ভ থেকে আরেকটি গর্ভে, একটি কবর থেকে আরেকটি কবরে

পিতাদের অনুগামী হয়ে পুত্রদের আগেই আমি কবরে ভ্রমণবিলাসী

আমার হাতে ধরা কবিতার পাণ্ডুলিপি, ভ্যান-ভিঞ্চিদের চিত্রকর্ম

বিশ্বখ্যাত স্থপতিদের সমাধিস্থল সাজাবার কলা

আর আমাদের ঈর্ষা, খ্যাতিমান হওয়ার কৌশল 

কিংবা রূপবদলের তাড়না

গিলোটিনে যেসব শরীর হয়েছিল দু’ভাগ

ফাঁসির উদ্বন্ধন নিয়েছিল কেড়ে যাদের বাতাস

অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার পর- তারা এখন হেঁটে যাচ্ছে

আরেকটি কবরের দিকে

বলাৎকার কিংবা প্রেমের প্রস্তাবনা তো একটি কবরের 

অনুসন্ধান ভিন্ন নয়

আমাদের পৃথিবী কেবল লাশ নামাবার গল্প।



ছবি: বিধান দেব 


দুটি কবিতা: মাহমুদ কামাল


 

নতুন মুখোশ



আদর্শও বিক্রি হয় নানা দরে
আদরে আদরে
আদর্শহীনতা থেকে
বিচ্যুতির মালা গেঁথে
বীরদর্পে হেঁটে যায়
নতুন মুখোশ
আদর্শ সস্তা হয়ে গেলে
বিপদ বেড়ে যায় আমজনতার
আদর্শ ফেরি করে
নপুংসকও বীর্যবান হয়ে ওঠে
নষ্ট সময়ে।





অস্বীকার



তুমি শুধু জন্মই দিয়েছ
শুধুমাত্র বাবা
শুধুমাত্র পাঠদান
ততটুকুই শিক্ষক
এভাবে বন্ধু ও স্বজন
প্রতিবেশী .....
তুমি কপালকুণ্ডলা লিখেছ
তাতে কি?
গীতাঞ্জলী? ধুর
পথের দাবী কিংবা রূপসী বাংলা
পুতুলনাচের ইতিকথা
পথের পাঁচালী কিংবা
হাঁসুলীবাঁকের ইতিকথা
পঞ্চপাণ্ডব  আর
নীরেন, সুনীল, শক্তি ও শঙ্খ
পানসে পানসে
সোনালী কাবিন আর
উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ
আমরাও এর চেয়ে ভালো লিখতে পারি
আমরা একুশ শতকের কবি ও লেখক
বুড়ো সব বাদ।
হায় আল্লা, আমিওতো বুড়ো হয়ে গেছি
আমার অচঞ্চল মন চঞ্চল হয়ে গেল
অস্বীকারের কাছে



ছবি: বিধান দেব 

কবিতা: অঞ্জলি দাশ


 


শবরী


আমার তো ঝরাপাতাদের সঙ্গে দুঃখ ভাগাভাগি

আমার ত সামান্য সুখের ভাগে 

দশ জন বনচারী অন্ন বাটে।

তবু ভরা পূর্ণিমার রাত সাজাই গোপনে,

এ আমার নিভৃত সুখের অভিসন্ধি ভরা কুঞ্জবন।


বসন্তের সমাগম দ্বিধাগ্রস্ত, আনত চোখের নিচে বৃষ্টি এলো।

দেখি আমার শূন্য ডাল দুলে উঠছে

প্রস্ফুটন আকাঙ্খায়।


তৃষ্ণাপীড়িত পত্রে মঞ্জরীতে লুটিয়ে পড়ছে চাঁদ......

 ঘুম এলো একাকী শয্যায়।


স্বপ্নে পাওয়া উত্থান ও পতনের ঢেউ ঘুম মুছে দেয়,

তুমি দূর, আমি অপেক্ষায়।



ছবি: বিধান দেব 


কবিতা: সোমেন মুখোপাধ্যায়




 ভাসান

বেশ বড় একটা পুকুর। বেঘাটে হেলে থাকে পুরোনো খড়ের প্রতিমা। স্নানে এলে কেউই আর খেয়াল করেনা সেটিকে। মাঝে মাঝে পানকৌড়িরা খড়ের হাতে বা কাঁধে বসে একটু ফুরসৎ নেয়। পরস্পরের পিঠে সাবান ঘসে দেওয়া মেয়েদের ঘাট থেকে গল্পসল্প খুব মন্থর হয়ে প্রতিমার কাছাকাছি পৌছায়।


মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে ক'দিন। বৃষ্টির ফোঁটা ও জলের ফেনায় জলজরা মেতেছে খেলায়। পাড়ের মাটি কাদা মাখামাখি করে, জলেই নামছে আবার। এই অবসরে খড়ের প্রতিমাটি গলাজলে নিজেকে ভাসান দিয়েছে। তার মুণ্ডহীন ঘাড়ের কাঠামোটি শুধু জেগে আছে জলের ওপর। শিরদাঁড়ার গল্প এবার শুরু হবে বলে... 


ছবি:  বিধান দেব 


             

কবিতা: অরুণাভ রাহারায়

 



জল 

তোমার কবিতা সব পরিশিষ্টে ঢকে।
আপেল বাগান থেকে তাই তুলে খাই!

বিকেলে জলের ধারে দোতরা বাজাই!

ক্লান্ত রোদ নুয়ে পড়ে নদীর শরীরে
সূর্য মাথা হেলে দেয় নদীর শরীরে...

জল থেকে কাদা পায়ে উঠে যাচ্ছে আমারই তো ভাই!



ছবি: বিধান দেব 



কবিতা: সুদীপ্ত মাজি


 


অসমাপ্ত গানের খাতা : ৩



অবেলায় আলো জাগে । হারমোনিয়াম 

কাঠের বাক্স থেকে মাথা তোলে 

হঠাৎ একদিন ! 


মুছে যাওয়া আলো থেকে অতিপরিচিত এক 

গন্ধ ভেসে আসে... 


সে আলো কস্তুরীগন্ধ, সেই আলো 

নিদ্রানির্বাপক 


জাগি সারা রাত 

আর 

হারানো গানের গল্প 

লিখি !  



ছবি: বিধান দেব 


কবিতা: শৌভিক দে সরকার


 লেখার দেওয়াল 


থম মেরে দাঁড়িয়ে থাকে প্রস্তুতির ভোরবেলা


এই একটি চাদর, এই একটি বিছানা, আঁশ, আস্তর

বাতিল আলোরেখা, আলোর কামড়ের স্বাদু দাঁত হয়ে ওঠে 

সামান্য রোদ ঘষে দেয় পায়ের ঝিঁ ঝিঁ

সারাঘর জুড়ে ঘুরে বেড়াবে পারদ

রোদ গড়িয়ে আরও কিছুটা ফিকে হয়ে যাবে পারদ 

একটি সামান্য অগোচর দেওয়াল 


ব্রীদ হোল্ড  রিলিজ  



ছবি: বিধান দেব 


         


কবিতা: মেঘ বসু



ডুবুরি 

হৃদয়ের নিচে নেমে, টেনে ধরি তাকে 
পাতালে নেমেছে আজ প্রাচীন ডুবুরি 
প্রতিটি বিন্দুর মনে সাড়া পড়ে যায় 
অথচ,  ডুবুরি জানে, মায়া ও মাটির নিচে 
শুয়ে থাকে   প্রেম, তাকে তুলে আনা 
দূরুহ, কঠিন অতি !একটি জন্মের কাছে 
সম্মতিসূচক কোনো বার্তাই আসেনি তার... 

অতঃপর ডুবুরির হাত থেকে ঝরে পরে 
আলো, তারাদের ছায়া, 
চাঁদের বুড়ির দাঁত, শ্যাওলাধরা হাসি....



ছবি: বিধান দেব 

রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২০

কবিতা: অয়ন বন্দ্যোপাধ্যায়


 হনন 


ফ্লাইওভারের পিচ-ভাসিয়ে মিলিয়ে গেল পাতা

তলায় নালা, কেন্নো-গলি, মুরগি কাটে কারা


বিকেল-হাওয়ায় আলো, তখন ছাওয়ায় পেঁজা পালক;

চিৎকার-নিশ্চুপে কেবল বঁটিরসমান ফারাক


নর্দমার ওই পাতাল থেকে সদ্য উঠে এলাম

দুই দশকের বন্দী পচা গো-ভূত


পরত পরত পাঁকের শেষে বিষিয়ে আছে গোটা,

লিঙ্গ-ফোলা... চর্মরোগের ওষুধ


ব্রিজের মেরুদণ্ড বেয়ে মোটর-লরি চলে

তলায় ভীষণ ঘনিয়ে-থাকে ছায়া


ছিটিয়ে আছে লালচে-ঝুঁটি, টুকরো-হওয়া-আঙুল—

আর্তিভেজা-বঁটি এবং টায়ার...  



ছবি: বিধান দেব 


কবিতা: দুর্গাদাস মিদ্যা


 

কাঁহাতক

হো! কি অশান্তি । আর কত  ছুটি ভোগ করতে পারে মানুষ।
দমবন্ধ!, ভয়ে ভয়ে  আর কাঁহাতক
ঘরে বসে থাকা যায়, অসহায় ।
এই যে প্রতিদিন ভোরে
খিলখিল হাসি হেসে
দরজা-জানালায় আলোর বার্তা জানিয়ে যায়
সে কি শুধু বন্দিত্বের জয়গানে?
প্রাণে প্রাণে যে তরঙ্গ
তার প্রকাশের অবকাশ তো চাই।
তাই মাঝে মাঝে মনে হয় ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ি রাস্তায় ।
দমবন্ধ হয়ে আর কাঁহাতক বাড়িতে বসে থাকা যায়।  



ছবি: বিধান দেব 

কবিতা: অনুপ মণ্ডল


 


প্রসব 

ঝুল বারান্দার কাঁটা-কম্পাসে আটকে ছিল
শেষে ছায়া প্রসব করে
স্কেল ও দিগভ্রমের মায়া কাটিয়ে
স্খলিত পায়ে চলে গেল রোদ
কলতলার শেওলাধরা পাঁচিলে

ওখানে সদ‍্য বাচ্চা বিয়োনো বেড়াল আছে
কাজের মাসি আছে
মাসির সঙ্গে রোদের রোজ কথা হয়
বাচ্চাগুলোর সঙ্গে  
ধর্ষণ ও ধর্ষক বাপের গল্প বলে মা-বেড়াল

রোদের কাছ থেকে মাসি জেনে নেয়
পাঁচটা বেয়াল্লিশের লোকাল
কত মিনিট দেরী করে আসছে আজ




ছবি:  বিধান দেব 

কবিতা: ফিরোজ শাহ



 চক্র




একটি কালো ছাগল

ঘাস খেতে খেতে পুরা বিকেলটাই খেয়ে বসে আছে
পাকস্থলীতে 
সন্ধ্যা নেমে রাত আসে

পরদিন
মলদ্বার দিয়ে বের হয় হওয়া উজ্জ্বল ভোরের ঘ্রাণে

দুপুরের পেটে ঢুকে যাচ্ছে কালো ছাগল ।




ছবি:  বিধান দেব 

কবিতা: প্রাণজি বসাক


  

যদি কেউ নাম ধরে ডাকে 


কখনও কেউ যদি নাম ধরে ডাকে
তাকেই খুঁজি বিমূঢ় স্মৃতির খাঁজে
হাত বাড়িয়ে ছুঁয়েছি নিভৃত আগুন
চোখ বুঁজেও বুঝেছ নিঃশব্দ চরণ

উল্লাসে সহমরণ সমগ্র রচনা তোমার
সময় কেটে কেটে খুঁজি আধোআঁধার
বাতাস তুলে রাখে নীরব ধ্বনি ও কান্না
এই যে এলো জুলাই ভেজা শরীর জ্বলে

মোবাইলের আলো ফেলে খুঁজি যন্ত্রণাবোধ
দুপুরেও নেমেছে মূঢ় আঁধার রচিত শিবিরে
মেঘের পিছুটানে যাদুমন্ত্রে চিতাবাঘ জাগে
খুলে রাখি বর্ম - যদি কেউ নাম ধরে ডাকে



ছবি:  বিধান দেব 

কবিতা:গৌতম হাজরা

আসলে কিছুই হয় না


আসলে কিছুই হয় না। আসলে কিছুই হয় কি?
খসড়া বানাতে বানাতে লিখে যাচ্ছি
                               কেবলই তোমার প্রতিলিপি।

এভাবেই ভ্রূণহত্যা করি।

সুঠাম শরীর নিয়ে উঠে তো আসেনা আর কেউ? দেখিনাতো ঝড় কিংবা তেমন দুদা'ন্ত কোনো অরণ্যপ্রকৃতি !

আসলে কিছুই হয় না। চারিদিক বড় শুনশান।
ভেঙে যায়, ভেঙে যায় ঠিক এইভাবে
যেভাবে কবিতার স্ট্রাকচারে পাইনা খুঁজে সেই চনমনে প্রোটিন সমৃদ্ধি !


ছবি:  বিধান দেব 



কবিতা: রঞ্জন চক্রবর্তী


 শিলালিপি



মেঘ কেটে যাওয়ার পর ঠিক কী হয়েছিল তখন

সেটাই জানার জন্য বেরিয়েছি

একেবারে একা

সহযাত্রীরা, সহকর্মীরা সকলে নিজ নিজ লক্ষ্যে পৌঁছালে


সুতরাং আর একটু এগিয়ে গিয়ে নির্জলা সত্যিটাই বলি

জনপ্রাণীর দেখা মেলেনি সেখানে, মানুষের কথা যদি নাও ধরি

যদিও চলে গিয়েছিলাম আগ্রহের বশে, সব পিছুটান ছেড়ে

রয়েছে কিনা অথবা দেখা পাওয়া যায় কিনা জানা নেই

লোকমুখে শুনি কত কথা


সে কোথায় দৃশ্যমান হয় - মনে জিজ্ঞাসা নিয়ে

পড়ার চেষ্টা করি শিলালিপি

ছুঁয়ে দেখি পাথর যার গায়ে কারা যেন সাজিয়েছে অজানা অক্ষর

বুঝি না সাংকেতিক ভাষা – ফলে

আকাশের বুক চিরে ক্রোধবহ্নি ঝলসে ওঠে বিদ্যুতের শিখায়


অতএব ঢেকে রাখি অভিমান দিয়ে, একবুক তৃষ্ণা দিয়ে

যেন সে আবার পশ্চিম-আকাশে জমা কালো মেঘ হয়ে

ঝরে পড়ে বৃষ্টির ফোঁটায়-ফোঁটায়



ছবি: বিধান দেব 


কবিতা: তৈমুর খান


 

গার্হস্থ্য 



হঠাৎ এর ৎ শিস দিচ্ছে 

শব্দ-মোরগের ভোর 

এবার উঠে পড়ার সান্ত্বনা 


নদীটি হাসছে 

তার রমণজলে বাল্মীকির ঢেউ 

যদিও পূর্ব জীবনে রত্নাকর 


ফুলের সোহাগে বীর্যবারুদ 

সন্ততির গুনগুন আভাস 

সূর্য না উঠলেও অধরে চাঁদ 


বিষাদচুম্বনে তার ঘরকন্না ছোঁবে



ছবি: বিধান দেব

কবিতা: পলাশ দে


 

হরতাল



রাস্তা কোথাও যাচ্ছে না বলে কোলে তুলে আনি 
ছাদ দেখে মজা পায় খুব
সিঁড়িকে হাঁটতে বলে 
চিলেকোঠা, জানলা, ঘুলঘুলি, ঝুল বারান্দা ...
এত ইশারায় অবাক নাচতে থাকে
আচমকা দু হাত তুলে বাঁশি বাজায়
ট্রাফিক ট্রাফিক সিগন্যাল দেখে পেরোও প্লিজ

ওপর থেকে দেখতে এমন লাগে! 
ঘাড় এবং শিরদাঁড়ার টনটন এতদিনে খানিক আরাম হচ্ছে

রাস্তা, আর কোথাও কখনো যাবে না বলে
আমাকে কোলে নিয়ে অ্যাকসিডেন্ট সারিয়ে তুলছে



ছবি: বিধান দেব 

কবিতা: দেবাশিস মুখোপাধ্যায়

 


পাগলাগারদ কোথায় আছে


১.

ভোরের দরজা খুলতেই বেজে ওঠে সরোদ 

মাটির কাছাকাছি পিঁপড়ের বাসা

ঘাম ঝরানো

পা - কে চিতায় পেয়েছে


একটা শনিবার আসলেই মাংসের

গন্ধ আমোদিত

প্রাচীর ভাঙার পর দাঁত কেটে নেয়

আগুন ফেরত সেইসব স্মৃতি

কোনো গল্পই শেষ পর্যন্ত বিশ্রাম পায় না 

প্রাচীন সভ্যতা এখনও লালন শেখায়



২.

একটা বিছানা কখনো নিমগাছ 

রাত্রি টুকে নেয় 

মুখোশের ইতিকথা

দেয়াল সামলাতে পারে না 

চুনসুরকির খসে পড়ার ভিতর

একটি অসামান্য চিত্র ঢুকে পড়ে

আর একটা জানালা খোলা জামায়

চাঁদ লেগে যায় 

কিছু ফোটা দৃশ্যের ভিতর তুমি 

খেলে যাও জোনাকি জীবনে

আসলে অন্ধকার কিছুক্ষণ থমকে দাঁড়ানো তারপর ফিরে যায় ভোরের চাহিদায় 

প্রাথমিক তিক্ততা সরে কখন মধুর

ধুন বাজতে থাকে 

নিজের ভিতর সোনা কখন উথলে ওঠে বাহবা পাতানোর পর




৩.

জানালা শ্রাবণ হলে চোখের অসুখ সেরে যায়

সারাদিন নূপুর পরে নেয় 

না বেরনো কথাগুলো কখন সংগীত

কানের অভ্যাস গড়ে ওঠে ক্রমশ

অশ্রু লিখতে ভুলে গেলে গড়িয়ে নামে হাসি

সিনেমার মতো অমলিন

একটি দীর্ঘ কবিতা কখন এলাকার দখল নেয়

তারপর ডাকবাক্স শীৎকার তোলে

রাখালের ঘুম ভিজে যায় 

বাঁশিটিও

শহর ছাড়িয়ে এই পৃথিবী 

মৃত্তিকার রূপ ছড়িয়ে পড়তে দেখে



ছবি: বিধান দেব 




কবিতা: পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়


সমদর্শী


ইচ্ছামৃত্যু হলেও স্নেহ ভালোবাসা আচ্ছন্নতা কিছুই যেন তার

ইচ্ছার অধীন নয়, ছিলও না কখনো

ভালোই হয়েছে শরশয্যা লাভ করে, 

উদয়-অস্ত প্রীতি-অপ্রীতি কোনোদিকেই 

আর পাশ ফেরার দায় নেই

মাথার ওপর সারাদিন শুধু নিরপেক্ষ আকাশ

একদিন দেখবেন, জঙ্গম বলাকাদলের ক্ষীণ বক্ররেখাটি হঠাৎই 

থেমে গেছে এক জায়গায়, মাটির তলা থেকে উঠে আসা 

ভৌমজলের মালাও মুখের কাছে বেঁকে এসে, স্তব্ধ


সময়কে সচল দেখার দায় নিয়ে   

আমাদেরই তারপর পিতামহ থেকে বৃদ্ধপ্রপিতামহ হয়ে 

চিরকাল প্রতিজ্ঞা রক্ষা করে যেতে হবে  



ছবি:  বিধান দেব 




কবিতা: মধুছন্দা মিত্র ঘোষ


 খসড়া 


উহ‍্য কথাগুলো,

কখনও রাত্রি নামিয়ে লিখে রাখছে,

অসাম‍ান‍্য কবিতাকথা

বহুরৈখিক ঘুমে, স্বপ্নরা ঢুকে পড়ে

গোপন  পেলবতায় ডুব দিচ্ছে চুপিসার

সার্বিক নির্লিপ্ততায় সমগ্র চরাচর


নুয়ে থাকা অকুলান মগজে তখন

বিস্তর টানা ও পোড়েন ...



ছবি:  বিধান দেব 





কবিতা: স্বপন শর্মা



    অলস দুপুর

                                     

                

    অলস দুপুর দেখে মুহূর্তের মৃত্যু

     শোকাচ্ছন্ন, তবু ভাবনার ভ্রূণের পূর্ণতা পেতে 

     পোয়াতির মতো মস্তিষ্কের বিশ্রাম ।


      অলস দুপুর ফিসফিস বলে,

      ঘুমের ভেতর ঘুমহীণ ভ্রূণের লালন করো ।

      সুষুপ্তিপর্ব শেষে জন্ম দাও

       মৃত্যুহীন মহাকাল।

 

       অলস দুপুর মৃত মুহূর্তের জন্য শোকাচ্ছন্ন  

       তবু ভ্রূণের পূর্ণতা পেতে

        যন্ত্রণাকাতর  ধৈর্য অপেক্ষায় ।


ছবি: বিধান দেব 


                           

                         

                   


কবিতা: সুমন দিন্ডা


 


প্রতিটি মনখারাপের নাম হোক সাঁঝবাতি সন্ধ্যা


স্নানভারে রোজ একটু একটু করে ডুবে যাচ্ছে 

গামছা আর রুমালে বাঁধা মধ্যবিত্ত রোজনামচা, 

কার হাত কতটা হলুদ, কে কোথায় রেখেছে ছাপ

এসব মাপার কোনো একক কেউ দেখেছে কি?

সুতরাং জল গড়িয়ে যায় বিছানার এপাশ ওপাশ,

এক একদিন এক এক বালিশের ভেজার পালা।

সকালে আবারও সূর্য ওঠে, দিন পুরানো হয়

মাথার ওপর টাচ করে আলতো গোধূলি বাতাস,

নিপুণ কৌশলে জাদুকর খুঁজে নেয় সরঞ্জাম 

দীর্ঘশ্বাস বদলে যায় জলে নামার ডাকে,

কচুরিপানার ভেতর ডাহুক ঠিক বেছে নেয় 

নরম মাছের আদর আর স্নেহ দিনকাল। 

সম্ভাবনা জেগে ওঠে সংসারের মায়াচরে

সমস্ত কষ্টের ভেতর জেগে ওঠে সাঁঝবাতি রং।


ছবি: বিধান দেব 



কবিতা: পিয়ালি মিত্র চন্দ্র

 



বৃষ্টি যাপন


বৃষ্টির ছাট এসে চৌকাঠে ঠেকলে

সম্ভাবনার আলো বজ্রে পতিত হয়

আর কিছুই বলতে চাইনি আমি

কেবল দূরত্ব গোধূলি হল দিনান্তে ...

এক অন্ধ ঘুঘুর অমানিশা যাপন

প্রকাশ্য নিঃসঙ্গতায় ,

বর্ণময় উৎসবের মায়া মেঘের ফাঁকে ফাঁকে

শেষ রাতে বৃষ্টির ছাট 

শোকের মত চোখের পাতায় লাগে

অজস্র চুম্বনে সেজে ওঠে কল্পনার ভোর

তোমায় দেবো বলে যত্নে লুকিয়ে রাখি

আমার সব উদাসীনতা ...


ছবি: বিধান দেব 

শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২০

কবিতা: অচিন্ত্য মাজি




যাত্রা
 
ইসরো থেকে খবর এল আর মাত্র কয়েক মিনিট পরেই
চন্দ্রযান মঙ্গলের মাটিতে পা রাখবে।
কম্পিউটার স্ক্রিনে চোখ রেখে নিবিষ্ট হয়ে দেখছ
ছাগলের কলিজার মতো সেই ছোট্ট যান
মহাস্পেস ছিঁড়ে তীব্র গতিতে উড়ে যাচ্ছে,
দূর গ্রহের আজব প্রাণীরা ছোট্ট কালো পুতুলটিকে
ছোখ ছানাবড়া  করে দেখছে।
এদিক্ব সারাবিশ্ব আনন্দে ঘোর 
পাতাল থেকে অন্ধ শাবকেরা লাথি মারছে 
শত সহস্র হরিণীর ঘাইয়ে কেঁপে উঠছে বলিষ্ঠ পাটাতন 
কোনো আজব দৃষ্টিতে তুমি জেনে গেছ
কীভাবে ভাঙতে হয় প্রসবের কাঁপ
ভূগোলের প্রচণ্ড জটা ছিঁড়ে ব্রহ্মাণ্ডের শাঁস খেতে হয়
লুকানো সমুদ্রগর্ভ থেকে কাছিমের ডিম।
চূড়ান্ত তছনছ জানো, জানো বিন্দুপতন
চূর্ণ উন্মাদ উচ্ছৃঙ্খল হাসিতে বন্ধ্যা জরায়ু জ্বলে
জ্বালাও প্রবল পাকে নৃমুণ্ডের গলিত আঠাল ধী
তুলকালাম ধ্বংসের আগে দারুহরিদ্রার দেশে পৌঁছে
অচেনা ফুলের পাশে পাখি হয়ে গান গাও
অন্ধকারে ডেকে যাও সঙ্গিনীকে


ছবি: বিধান দেব 

কবিতা

সম্পাদকের কথা

দ্বিতীয় বর্ষ  ।। অষ্টম সংখ্যা ।। মার্চ ২০২২   খুব অসহায় লাগছে এবার। আমাদের ডান পাশে ধস। বায়ে গিরিখাত। মাথায় বোমারু। পায়ে পায়ে হিমানীর ব...