জন্মের আগের মুখ : জেন তত্ত্ব ও জেন কোয়ানের অমায়িক ভুবন
পঞ্চদশ পর্ব
চ্যান > জেন : জাপান-পর্ব
একদা চিন থেকে চ্যান পৌঁছে যায় উদীয়মান সূর্যের দেশে। জাপানিদের উচ্চারণে চ্যান হয়ে যায় জেন। জাপান থেকেই জেন ছড়িয়ে পড়ে ইউরোপ-আমেরিকায়। ফলে চিন ছাড়া প্রায় সারা পৃথিবীতে চ্যান উচ্চারিত হতে থাকে জেন নামে। এখন থেকে আমরাও চ্যানকে জেন হিসাবেই জানব।
চিনের মতো জাপানেও জেনের ভিত্তিভূমি প্রস্তুত করেছিল মহাযান বৌদ্ধধর্ম ও সংশ্লিষ্ট সূত্রাবলি। কোরিয়ার একদল রাজ-প্রতিনিধির মাধ্যমে জাপানিরা প্রথম বৌদ্ধধর্ম ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হয়। ৫৫২ (মতান্তরে ৫৩৮) খ্রিস্টাব্দে কোরিয়ার পেকচে রাজ্যের রাজা সঙমিয়ঙ একদল কূটনৈতিক প্রতিনিধিকে জাপানে পাঠান। তাঁদের সঙ্গে উপহার স্বরূপ ছিল ধাতব বুদ্ধমূর্তি, বিভিন্ন বৌদ্ধসূত্র, পোশাকপরিচ্ছদ, অলংকার ইত্যাদি। জাপানের তৎকালীন সম্রাট কিমুমেই (৫৩২-৫৭১ খ্রিঃ) এই প্রতিনিধিদলকে সাদর অভ্যর্থনা জানান। কোরিয়ান প্রতিনিধিদলের মার্জিত আচার-ব্যবহার, পোশাকপরিচ্ছদ, ধর্মাদর্শ ইত্যাদি রাজসভা ও রাজধানীকেন্দ্রিক পরিমণ্ডলে এক অভূতপূর্ব আলোড়ন সৃষ্টি করে। সম্রাট কিমুমেই বৌদ্ধধর্মের অনুরাগী হয়ে ওঠেন। বহিরাগত একটি ধর্মের রাজসভায় এমন সমাদর জোটায় প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলির মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। নাকাতোমি গোষ্ঠী বৌদ্ধধর্মের বিরোধিতা শুরু করে। তাদের যুক্তি ছিল, জাপানের পরম্পরিত ধর্মকে ছেড়ে বিদেশি ধর্মকে প্রাধান্য দিলে দেশের সভ্যতা-সংস্কৃতি বিপন্ন হবে। তারা চেয়েছিল অন্যান্য দেশ থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন রেখে জাতিগত বিশুদ্ধতা রক্ষা করতে। প্রসঙ্গত জাপানের পরম্পরিত ধর্ম শিন্তো সম্পর্কে কিছু তথ্য জেনে রাখা সমীচীন। শিন্তো শব্দটি ‘শেন’ (শব্দটি আত্মা, ঈশ্বর, দেবতা ইত্যাদি অর্থে ব্যবহৃত হয়) ও ‘তাও’ (শব্দটির অর্থ পথ) এই দুই চিনা শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। সুতরাং শিন্তো শব্দটির অর্থ দাঁড়ায়— আত্মা বা দেবতার পথ। আগে জাপানিদের এই আদিধর্ম ‘কামি নো মিচি’ নামেই পরিচিত ছিল, যার অর্থ— কামির পথ। জাপানি ‘কামি’ শব্দটিকে বাংলায় আত্মা বা দেবতা বা ঈশ্বর বা প্রভু ইত্যাদি অর্থে অনুবাদ করা যায়। তবে ‘কামি’ কেবল স্বর্গীয় বা বায়বীয় বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন প্রাকৃতিক শক্তি, গাছগাছালি, পশুপাখি, পাহাড়-পর্বত ইত্যাদিও কামি-র অন্তর্ভুক্ত তথা উপাস্য। প্রাথমিক পর্যায়ে ‘আমাৎসুকামি’ (স্বর্গীয় কামি) ও ‘কুনিৎসুকামি’ (পার্থিব কামি) এই বিভাজন ছিল। পরবর্তীকালে এই বিভাজন গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে। বস্তুত পক্ষে শিন্তো তেমন কোনো পাকাপোক্ত প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম ছিল না। বিভিন্ন প্রাকৃতিক শক্তি ও পূর্বপুরুষদের আত্মাকে সন্তুষ্ট করার জন্য আদিম জনগোষ্ঠীর পালনীয় প্রথাসমূহই কালক্রমে একটি ধর্মের রূপ পায়। প্রাথমিক যুগে এই লোকধর্মে কোনো মূর্তি, মন্দির, ধর্মগ্রন্থ বা শাস্ত্রও ছিল না। কেবল ‘জিনজা’ নামে একটি উপাসনাস্থল থাকত। লোকেরা বিশ্বাস করত জিনজা আসলে এক বা একাধিক কামির অবস্থানস্থল। আদিকালে যা ছিল মূলত পাথুরে বেদি, পরবর্তীকালে তা সুদৃশ্য মন্দিরে রূপান্তরিত হয়। নাকাতোমি গোষ্ঠীর এই ঐতিহ্যপ্রীতির বিপরীতে সোগা গোষ্ঠী দৃঢ়ভাবে বৌদ্ধধর্মের পক্ষে দাঁড়ায়। তারা যুক্তি দেখায় বৌদ্ধধর্ম জাপানের সভ্যতা-সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করার মতো রসদে ভরপুর এবং তা বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বৈদেশিক সম্পর্ক স্থাপনের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। এই প্রগতিশীল গোষ্ঠী চেয়েছিল কোরিয়া ও চিনের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে জ্ঞানবিজ্ঞান তথা আধুনিকতার ছোঁয়া পেতে। শেষমেশ বৌদ্ধধর্মের দিকেই পাল্লা ভারি হয়ে ওঠে।
সম্রাট কিমুমেই মারা যাওয়ার পরে সিংহাসনে বসেন বিতাৎসু (৫৭১-৫৮৫ খ্রিঃ)। সিংহাসনে বসে তিনি শিন্তো ধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা শুরু করেন। ৫৮৫ খ্রিস্টাব্দে জাপানের সম্রাট হন ইয়োমেই। তিনি বৌদ্ধধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। ইয়োমেই- এর মৃত্যুর পরে সম্রাট সুশুন প্রায় ছয় বছর রাজত্ব করেন। তাঁর মৃত্যুর পরে ৫৯২ খ্রিস্টাব্দে সিংহাসনে বসেন সম্রাজ্ঞী সুইকো। তিনি ছিলেন সম্রাট কিমুমেই এর তৃতীয় কন্যা ও সম্রাট বিতাৎসু-র স্ত্রী। তাঁর শাসনকালে জাপানের নীতিনির্ধারক হিসাবে মনোনীত হন, সম্রাট ইয়োমেই-এর পুত্র রাজকুমার শোতোকু (৫৭৪-৬২২খ্রিঃ)। সম্রাজ্ঞী সুইকো ও রাজকুমার শোতোকু উভয়ে ছিলেন বৌদ্ধধর্মের একনিষ্ঠ পৃষ্ঠপোষক। তাঁদের প্রচেষ্টায় জাপানে বৌদ্ধধর্মের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়; বৌদ্ধধর্ম রাষ্ট্রধর্মের স্বীকৃতি লাভ করে। রাজকুমার শোতোকু ছিলেন চিনের তাং-রাজাদের অনুসৃত বৌদ্ধ ধর্ম ও সংস্কৃতির একান্ত অনুরাগী। চিনা সভ্যতা-সংস্কৃতি তথা জ্ঞানবিজ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে তিনি নিজের দেশকে আধুনিক তথা উন্নততর করে তোলার স্বপ্ন দেখতেন। এই উদ্দেশ্যে তিনি বেশ কয়েকবার চিনদেশে প্রতিনিধিদল পাঠিয়েছিলেন। জাপানি শিক্ষার্থীদেরও তিনি চিনদেশে পড়াশোনার জন্য পাঠাতেন। কেবল বৌদ্ধ ধর্ম ও সংস্কৃতির অনুসন্ধান নয়, কনফুসীয় দর্শন, চিকিৎসা বিদ্যা, শাসনসংক্রান্ত বিভিন্নদিকের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিভিন্ন তথ্য ও তত্ত্ব সংগ্রহ করে তিনি জাপানের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান, আইনকানুন, পঞ্জিকা, শিক্ষাব্যবস্থা ইত্যাদির আমূল সংস্কার সাধন করেন। তাঁর উদ্যোগেই প্রথম জাপানি সংবিধান প্রণীত হয়। মূলত কনফুসীয় নীতিতত্ত্বের দিকে তাকিয়ে সংবিধানের বিভিন্ন ধারা-উপধারাগুলি লিখিত হয়েছিল। এই সংবিধানে একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সরকার গঠনের কথা বলা হয় যার মধ্যমণি হবেন স্বয়ং সম্রাট। তাঁকে সাহায্য করার জন্য একদল আমলা নিয়োগের কথা বলা হয়। আসলে রাজকুমার শোতোকু চেয়েছিলেন বিভিন্ন গোষ্ঠীর সামন্তদের হাত থেকে শাসনক্ষমতা কেড়ে এক অখণ্ড শক্তিশালী দেশ গড়তে। ‘কাঞ্জি’ নামক চিনা লিখনপদ্ধতিকে জাপানি ভাষার লিখনে কাজে লাগান তিনি। এর ফলে একই চিনা অক্ষর দ্বারা গঠিত শব্দ চিনে ও জাপানে সমার্থবোধক হলেও উচ্চারণগত দিক থেকে পার্থক্য দেখা দেয়। যেমন, যে শব্দটি চিনা ভাষায় ‘হুইকে’ হিসাবে উচ্চারিত হয়, সেই শব্দটিই জাপানি ভাষায় ‘একা’ হিসাবে উচ্চারিত হয় ; এই পদ্ধতিতেই চিনা ‘চ্যান’ জাপানি উচ্চারণে হয়েছে ‘জেন’। রাজকুমার শোতোকু সমগ্র জাপানে বৌদ্ধধর্ম প্রচারের ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। তিনি বেশ কিছু বৌদ্ধ মঠ-মন্দির নির্মাণ করেন। সদ্ধর্মপুণ্ডরীক, বিমলাকীর্তি ও শ্রীমালাদেবী সিংহনাদ— এই তিন মহাযানী সূত্রের ভাষ্যও তিনি রচনা করেন। বৌদ্ধধর্মের প্রচার ও প্রসারে উল্লেখযোগ্য ভূমিকার জন্য তিনি ‘জাপানি বৌদ্ধধর্মের জনক’ হিসাবে খ্যাত হয়ে আছেন।
জাপানে প্রথম চ্যান তথা জেন-বিষয়ক ধারণা বহন করে নিয়ে যান, জনৈক বৌদ্ধ ভিক্ষু তোশো (৬২৯-৭০০ খ্রিঃ)। তিনি ৬৫৩ খ্রিস্টাব্দে চিনে গিয়ে প্রখ্যাত বৌদ্ধ পণ্ডিত হিউয়েন সাং (৬০২-৬৬৪ খ্রিঃ)-এর কাছে যোগাচার দর্শনের চর্চা করেন। হর্ষবর্ধনের রাজত্বকালে হিউয়েন সাং আমাদের দেশে এসেছিলেন। তিনি ভারত থেকে বহু বৌদ্ধপুথির প্রতিলিপি নিয়ে গিয়েছিলেন। হিউয়েন সাং, তোশোকে জনৈক চ্যানসাধুর শিষ্যত্ব গ্রহণের উপদেশ দেন। তোশো গুরুর আদেশ শিরোধার্য করে চ্যান-শিক্ষা গ্রহণ করেন। দেশে ফিরে তিনি গ্যাংগো মঠে একটি ধ্যানকক্ষ নির্মাণ করে জেনচর্চায় মনোনিবেশ করেন। তোশোই প্রথম জাপানি যাঁর দেহ সমাধিস্থ না-করে দাহ করা হয়। তাঁর অন্তিম ইচ্ছানুসারে অভিনব অন্ত্যেষ্টির বন্দোবস্ত করেছিলেন তাঁর অনুগামীরা। তোশোর মৃত্যুর পরে তাঁর প্রতিষ্ঠিত হোশো ঘরানাটি খুব বেশিদিন স্থায়িত্ব লাভ করেনি।
৭১০ খ্রিস্টাব্দে নারা শহরে রাজধানী স্থাপনের মাধ্যমে সম্রাজ্ঞী গেনমেই জাপানে নারা যুগ (৭১০-৭৮৪ খ্রিঃ) সূচিত করেন। চিনের তাং যুগের রাজধানী চাং-আন-এর স্থাপত্য ও নগর-পরিকল্পনার অনুকরণে এই রাজধানী শহরটিকে এমনভাবে নির্মাণ করা হয়, যেন শহরটি চাং-আন-এর একটি ক্ষুদ্র সংস্করণ। নারা যুগের প্রথমার্ধে শিন্তো অনুসারীদের প্রভাব বাড়তে থাকে। সামন্ততন্ত্র পোক্ত হয়ে ওঠে। রাজকুমার শোতোকুর আমলে যে আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থা সূচিত হয়, তা ক্রমশ বংশানুক্রমিক হয়ে পড়ে। চিনের তাং-শাসনের অনুকরণে এই আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থা জাপানে গৃহীত হলেও চিনের মতো কেন্দ্রীয় কমিটি নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষার দ্বারা এখানে আমলা নির্বাচন করা হত না। ফলে অচিরেই প্রভাবশালী গোষ্ঠীর স্বজনপোষণ শুরু হয় এবং অযোগ্য আমলাদের ভিড়ে যোগ্যজনেরা সংখ্যালঘু হয়ে পড়ে। জাপানের কৃষকেরা কঠোর পরিশ্রম করে জমিতে ধান, গম, জব, জোয়ার-বাজরা ফলিয়ে জনগণের মুখে খাদ্য তুলে বিনিময়ে পেত করের বোঝা আর তা পরিশোধ করতে না-পারায় সহ্য করত অসহ্য অত্যাচার। এর হাত থেকে বাঁচতে কোথাও কোথাও তারা হাতে অস্ত্রও তুলে নিতে শুরু করে। কেউ কেউ লড়াই করতে করতে অস্ত্রশস্ত্র চালনায় পারদর্শী হয়ে উঠে পেশা বদলে যোদ্ধা হয়ে ওঠে। তাদের কাজে লাগাতে শুরু করে গ্রামাঞ্চলের ভূস্বামীরা। এইভাবে সামুরাই নামক মহাযোদ্ধাদের আবির্ভাবের পটভূমি প্রস্তুত হতে থাকে।
রাজকুমার শোতোকুর মৃত্যুর পরে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে বৌদ্ধধর্মের প্রচারপ্রসারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন সম্রাট শোওমু (৭০১-৭৫৬ খ্রিঃ)। তাঁর উল্লেখযোগ্য কীর্তি নারা শহরে ‘দাইবৎসু’ (মহান বুদ্ধ) নামক বৃহদাকার ধাতব বুদ্ধমূর্তি নির্মাণ। এই বুদ্ধমূর্তির অভিষেক উপলক্ষে ৭৩৬ খ্রিস্টাব্দে নারা শহরে পদার্পণ করেন ভারতীয় ভিক্ষু বোধিসেনা (৭০৪-৭৬০ খ্রিঃ)। এই বৌদ্ধমূর্তি নির্মাণ নিয়ে শিন্তো অনুসারীদের আপত্তি ছিল প্রবল। তাদের অভিমত ছিল এই বিদেশি ধর্মগুরুর মূর্তি নির্মাণ করার অর্থ পরম্পরিত কামিদের অপমান করা। শেষমেশ হোশো ঘরানার বৌদ্ধ ভিক্ষু গয়োকি শিন্তোদের অন্যতম প্রধান উপাস্য স্বর্গীয়কামি সূর্যদেবী আমেতেরাসুর ‘জিনজা’য় হত্যে দিয়ে তাঁর দৈবাদেশ আদায় করে নেন। কালক্রমে শিন্তো ও বৌদ্ধদের মধ্যে সম্প্রীতির ভাব গড়ে ওঠে। অনেকেই একসঙ্গে শিন্তো ও বৌদ্ধমতে আস্থাজ্ঞাপন করতে থাকেন। শোওমু প্রত্যেক প্রদেশে বৌদ্ধ সন্ন্যাসী ও সন্ন্যাসিনীদের জন্য দুটি করে জাতীয় মঠ নির্মাণ করেন। সন্ন্যাসীদের মঠগুলির নাম ছিল ককুবুন-জি এবং সন্ন্যাসিনীদের মঠগুলির নাম ছিল ককুবুননি-জি। এই মঠগুলির সঙ্গে সংযোগ সাধনের জন্য তিনি নারা শহরে একটি কেন্দ্রীয় মঠ তোদাই-জি গড়ে তোলেন। এই মঠগুলি ছিল একাধারে বিদ্যালয়, অনাথআশ্রম, চিকিৎসালয়, ও বৈজ্ঞানিক পরীক্ষানিরীক্ষার জায়গা। নারা যুগের অন্তিম পর্যায়ে শ্যানরোন, হোশো, কেগান, রিৎশু, কুশা ও যোজিৎশু এই ছয়টি বৌদ্ধঘরানার সন্ধান পাওয়া যায়। তবে এই ঘরানাগুলির মধ্যে তেমন কোনো আদর্শিক বিরোধ ছিল না। এমনকি একই মঠে তাদের সহাবস্থানও ছিল। সকলের উদ্দেশ্য ছিল একটাই নবাগত ধর্মকে জাপানের মাটিতে পোক্ত ভিত্তি দেওয়া।
৭৯৪ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট কামমু তেননো (রাজত্বকাল ৭৮১-৮০৬ খ্রিঃ), হেইয়ান কিয়ো (বর্তমান, কিয়োতো) শহরে রাজধানী স্থানান্তরিত করেন। শুরু হয় হেইয়ান যুগ (৭৯৪-১১৮৫ খ্রিঃ)। নারা শহরের মতো হেইয়ানকেও চিনের রাজধানী চাং-আন-এর আদলে গড়ে তোলা হয়। হেইয়ান যুগে চিন থেকে তেন্দাই ও শিঙ্গন এই দুই বৌদ্ধঘরানা জাপানে পৌঁছায়। তেন্দাই ঘরানাকে জাপানে নিয়ে যান সাইচো (৭৬৭-৮২২ খ্রিঃ)। তিনি চিনে গিয়ে তিয়েনতাই বৌদ্ধধর্ম, গুহ্য বা তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্ম ও জেন সম্পর্কিত শিক্ষা গ্রহণ করেন। দেশে ফিরে তিনি কিয়োতো-র হিয়েয়ে পর্বতে একটি তেন্দাই মঠ স্থাপন করেন। তাঁর উদ্যোগে শ্যানরোন ও হোশো ঘরানা তেন্দাই সম্প্রদায়ের অঙ্গীভূত হয়। সাইচো, সদ্ধর্মপুণ্ডরীক সূত্রের ভিত্তিতে জাপানের সকল বৌদ্ধ মতাবলম্বীকে এক ছাতার তলায় নিয়ে আসতে সচেষ্ট হন, এমনকি শিন্তো অনুগামীরাও তাঁর সঙ্গে যোগ দেন। সাইচো-পরবর্তী সময়ে তাঁর দুই সুযোগ্য শিষ্য এননিন (৭৯৪-৮৬৪ খ্রিঃ) ও এনচিন (৮১৪-৮৯১ খ্রিঃ) তেন্দাই সম্প্রদায়কে দৃঢ়ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করেন।
সাইচো-র সমসাময়িক কোবো দাইশি (৭৭৪-৮৩৫ খ্রিঃ) চিনে গিয়ে তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্ম চর্চা করেন। জাপানে ফিরে তিনি কাওইয়ে পর্বতে শিঙ্গন মঠ নির্মাণ করেন। তিনি মহাযান মতের পাশাপাশি হীনযান মতেরও চর্চা করতেন। তিনি শিঙ্গন মতাদর্শকে গুহ্য ও প্রকাশ্য এই দুইভাগে বিভক্ত করেন। কোবো দাইশি সমকালীন জাপানি বৌদ্ধ ঘরানাগুলির একটি তালিকা প্রকাশ করে শিঙ্গনকে জাপানের শ্রেষ্ঠ বৌদ্ধ সম্প্রদায় হিসাবে ঘোষণা দেন।
তেন্দাই ও শিঙ্গন এই দুই বৌদ্ধ সম্প্রদায় জাপানে প্রচলিত ছয়টি বৌদ্ধ ঘরানাকে প্রায় সম্পূর্ণভাবে গ্রাস করে নেয়। রাজন্যবর্গ ও আমলাদের পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে এই দুই সম্প্রদায় নিজস্ব মঠ-মন্দির বানিয়ে বা পুরানো মঠ-মন্দিরের দখন নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিকতার ভিতকে বেশ মজবুত করে তোলে। ক্রমশ এই দুই সম্প্রদায়ের সন্ন্যাসীরা নিজ নিজ সম্প্রদায়ের সংখ্যাধিক্য তথা শক্তি সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে। তারা নতুন এক শক্তিশালী ধর্মীয় সম্প্রদায় হিসাবে মাথা তুলে দাঁড়াতে থাকে। ক্ষমতার আস্বাদ পাওয়ায় ক্রমশ সন্ন্যাসীদের আচারব্যবহার ও কার্যকলাপে অবক্ষয় লক্ষিত হতে থাকে। দুর্নীতি ও চারিত্রিক অধঃপতনের শিকার হয়ে সন্ন্যাসী বা ভিক্ষুদের কেউ কেউ সামাজিক মর্যাদা হারিয়ে ফেলে। সাধারণ মানুষ নতুন এক সমুন্নত আদর্শের সন্ধান পেয়ে বৌদ্ধ ধর্মকে আত্মস্থ করতে চেয়েছিল। কিন্তু মঠ-মন্দিরের এই অবক্ষয় দেখে তারা আশাহত হয়। আবার তারা নতুন কোনো ধর্মীয় বা দার্শনিক আদর্শের সন্ধান করতে থাকে, যা তাদের আত্মিক অবক্ষয়ের অন্ধকার থেকে মুক্ত করে মুক্তির প্রশস্ত পথ বাতলে দেবে। জেন, সাধারণ জাপানিদের কাছে সেই আত্মদীপ প্রজ্বলনের বার্তা বহন করে নিয়ে যায়।
তথ্যঋণ :
A Guide to Japanese Buddhism Published by Japan Buddhist Fedaration, 2004.
A New History of Shinto by John Been and Mark T. Ueen ; Wiley –Blackwell 2010.
Studies in Japanese Buddhism by A. K. Reischuer ; The Macmillan Company 1917.
A Brief History of Japan : Samurai, Shogun and Zen by : Tuttle Publication 2017.
A History of Japan by K. G. Henshall : Palgrave macmillan 1999.
ছবি : বিধান দেব
লেখক পরিচিতি
জন্ম ১৫ নভেম্বর ১৯৭৬, দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার ডায়মন্ড হারবার মহকুমার ভগবানপুর (হরিণডাঙা) গ্রামে। বাংলা ভাষা-সাহিত্যের শিক্ষক। কবিতা লেখার সূত্রে লেখালেখির জগতে প্রবেশ। লেখেন প্রবন্ধ ও গল্প ।
প্রকাশিত পুস্তক :
কাব্য পুস্তক : আমার আত্মার পায়ে বাঁধার ঘুঙুর, যাপনচিত্র, ২০১৯; সরলতা ক্রমশ গায়েব হইতেছে, সাহিত্যের বেলাভূমি ২০২০
প্রবন্ধ পুস্তক : জেন : রিপুতাড়িত মানবের নিকট সুসমাচার ও অন্যান্য প্রবন্ধ, কলিকাতা লেটার প্রেস, ২০১৯
সম্পাদিত পত্রিকা : পাড়ি
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন