দ্বিতীয় বর্ষ ।। সপ্তম সংখ্যা ।। ফেব্রুয়ারি ২০২২
রবিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২২
সম্পাদকের কথা
দ্বিতীয় বর্ষ ।। সপ্তম সংখ্যা ।। ফেব্রুয়ারি ২০২২
গদ্য ।। সুরজিৎ প্রামাণিক
নৈরাজ্য ও অবক্ষয়ের কবি শামশের আনোয়ার
শামশের আনোয়ার গত শতাব্দীর ষাটের দশকের অন্যতম একজন বলিষ্ঠ কবি। ষাটের দশকের বাংলা কবিতায় উল্লিখিত আন্দোলন গুলির কোনটির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত না থেকেও, হাংরি আন্দোলনের প্রচ্ছন্ন প্রভাব তাঁকে চালিত করেছিল বলে মনে হয়। প্রবল নৈরাজ্য, নৈরাশ্য, আত্মক্ষয়, নৈতিক অবক্ষয়ের ক্লান্তি ঘিরে ধরেছিল কবি শামশেরকে। ষাটের সমাজ ও সময় সম্পর্কে অহ্নিক বসু তাঁর 'একটি হিমশীতল স্বীকারোক্তি : শামশের আনোয়ারের কবিতা' শীর্ষক প্রবন্ধে লিখেছেন ---
"বাইরে স্বাধীন ভারতের স্বপ্নের ধ্বংসস্তূপ, প্রত্যাশার লাশ, চীন- ভারত যুদ্ধ, কমিউনিস্ট পার্টির ভাঙ্গন, নকশাল আন্দোলন। আর ভেতরে মেধাজীবি মধ্যবিত্তের বিষন্ন একাকীত্ব। এই দশকেই সোমেশ নন্দীর নাটকে অ্যাবসার্ড চিন্তাধারার সাথে আমাদের পরিচয়, অন্তঃসারশূন্য ছকে বাঁধা জীবন নিয়ে প্রশ্ন এই প্রথম। এই দশকেই বাদল সরকারের 'এবং ইন্দ্রজিৎ', মোহিত চট্টোপাধ্যায়ের মৃত্যু সংবাদ। কবিতার ক্ষেত্রেও পাল্টে গেল অনেক কিছু।"
অর্থাৎ সমকালই শামশের আনোয়ারকে ভয়ঙ্কর নৈরাজ্যের দিকে ঠেলে দিয়েছিল তা বলাই যায়। ফলে শামশের আনোয়ারের কবিতা সমকালকে প্রেক্ষাপটে ধারণ করে হয়ে উঠেছিল তীব্র অস্বস্তিকর। তাই শামশেরের কবিতা নান্দনিক সহ্যের সীমাটিও পার হয়ে গেছে অনবরত। এই প্রসঙ্গে ব্যক্তি শামশের সম্পর্কে আমরা বিশেষ কিছু জানতে পারি দে'জ প্রকাশিত তাঁর শ্রেষ্ঠ কবিতার ভূমিকায় তাঁরই বন্ধু কবি ভাস্কর চক্রবর্তীর স্মৃতিচারণে---
"শামশেরের সঙ্গে বন্ধুত্বটাই ছিলো একটা বাঘের সঙ্গে বন্ধুত্বের মতো। এতটাই উদ্দামতা, সজীবতা, দুঃসাহসিকতা ছিল শামশেরের--- এতটাই আক্রমনাত্মক, বিষন্ন আর ক্ষুব্ধ--- এতটাই আন্তরিক ছিলো শামশের--- এতটাই আন্তরিক যে, প্রকৃত শামশেরকে খুঁজে পাওয়াই ছিলো মুশকিল।"
এবং সেইসঙ্গে কবি ভাস্কর চক্রবর্তী আরও বলেন---
"আমাদের ভাষায় এমন সশস্ত্র এক আধুনিক কবি, সত্যিই, খুঁজে পাওয়া ভার।"
অর্থাৎ শামশের আনোয়ার কবি হিসেবে একইসঙ্গে সশস্ত্র এবং আধুনিক। কারণ তিনি প্রকৃত অর্থেই একজন সময়ের যথার্থ সন্তান এবং তাঁর কবিতা প্রকৃতপক্ষে সময়েরই যথার্থ অর্জন হয়ে উঠেছে। তাই শামশেরের সমস্ত কবিতাই এক অর্থে আত্ম-জৈবনিক। মাত্র তিনটি কবিতার বই লিখেই বাংলা কবিতায় অনন্য নজির স্থাপন করে গেলেন তিনি। তাঁর কাব্যের বই---
'মা কিংবা প্রেমিকা স্মরণে',
'মূর্খ স্বপ্নের গান' এবং
'শিকল আমার গায়ের গন্ধে'।
তাঁর 'মা কিংবা প্রেমিকা স্মরণে' কাব্যগ্রন্থের নামকরণে আমরা এক অদ্ভুত চমক দেখি। সেখানে অন্যান্য জটিলতার সঙ্গে ইদিপাস কমপ্লেক্স- এর কি কোন সম্পর্ক আছে !
"আমি তোমার সবুজ তলপেট জরায়ু আর হৃদয় খুঁড়ে- খুঁড়ে
ফিরে পেতে চেয়েছিলাম স্মৃতির ধ্বংসাবশেষ।
কুসুমিত স্তনদুটির কাছে প্রার্থনা ছিলো
তোমার মায়ের কৈশোরিক গোলাপের ঘ্রাণ
অই সুড়ঙ্গেতে আছে তাঁর বালিকাবেলার অব্যবহৃত চোরাকুঠুরী
অথচ তুমি কোনোদিনই গর্ভধারণের মতো ঘনিষ্ঠ হলে না।"
---('মা কিংবা প্রেমিকা স্মরণে')
এই কবিতাংশে অবদমিত যৌনতার কাব্যিক রসাভাস মা এবং প্রেমিকাকে কোন বিচ্ছিন্ন বোধে পৃথক করে না। কারণ---
"তোমার শরীরের পাতায় পাতায় আমি খুঁজেছি তারই রক্তের দাগ
বুকের মধ্যাহ্ন আকাশে যৌবনের দীপ্ত জ্বালা
---(মা কিংবা প্রেমিকা স্মরণে)
যে প্রেমিকার মা পাগলিনী প্রায় হয়ে ব্যকুল বাঘিনীর মত কবিকে স্তন্যপান করিয়েছিলেন একদিন, কবির তৃষ্ণার কান্নায় যার শুকনো বুকে দুকুল ছাপিয়ে দুধের বান ডেকেছিল, কবি তাঁর উদ্দেশ্যেই বলেন---
"আমি তাঁর গর্ভের চোরা কুঠুরিতে ঘুনের মতো লুকিয়ে বেঁচেছি"
---(মা কিংবা প্রেমিকা স্মরণে)
যৌনতার এহেন সীমা লংঘনকারী বাস্তবতা তাঁর কবিতাকে অচিরেই সেই সময়ের কবিতার মধ্যে স্বাতন্ত্র্য এনে দিয়েছিল।
শামশের আনোয়ার তাঁর জীবন- যাপনে এবং কবিতায় এমনই এক আধুনিকতার সন্ধান করেছিলেন, যা অকৃত্রিম যুগ- পরিহাসের অনেক উপরে। তিনি লিখতে পারেন---
"তোমার শরীর ডাক্তারের চেম্বারের মতো
সুবিন্যস্ত, জটিল ও দ্যুতিময়
আমি ঐ শরীরের তীব্র ভেষজ গন্ধ, বক্রমুখ পিপাসু ছুরি
ও রক্তাক্ত ব্যান্ডেজ তুলো খুঁজে পাই
অথচ ওসব কিছুই আমার ভালো লাগে না
আমার বড়দিনে পিকনিক, কলকন্ঠ হাসি
কিংবা প্রচুর স্বাস্থ্য ভালো লাগেনা
ওষুধের গন্ধ-মাখা আধুনিকতা ভালো লাগে না আমার।"
---(তোমার গলার স্বর টেলিফোনের ওপাশে)
ওষুধের গন্ধমাখা আধুনিকতা অর্থাৎ মেকি স্মার্টনেস ও কৃত্রিমতাকে বর্জন করে তিনি হতে চেয়েছেন অকপট। সম্ভ্রান্তের সমস্ত ঐশ্বরিক শর্তকে নস্যাৎ করে তিনি নেমে আসতে চেয়েছিলেন ভনিতাহীন পৃথিবীর নিকৃষ্টতায়। কিন্তু সেখানেও যখন তিনি তাঁর ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষাকে স্পর্শ করতে পারেন না, তখন সেই আত্মিক অবদমন তাঁকে হতাশাগ্রস্ত করে। বৃথা রোমান্টিকতার তীব্রতম তরীটি ভাসিয়ে তিনি নতুন কোনো আশাবাদকে প্রতিষ্ঠা করতে চান না তার কাব্যিক বোধের বৈতরণীতে। তাই জীবনানন্দের মত বলিষ্ঠ কবির আশাবাদী উচ্চারণকে তিনি সরাসরি গ্রহণ না করে কখনও কখনও বরং ত্রিশের আর এক অন্যতম উল্লেখযোগ্য কবি সমর সেনের পথেই হাঁটতে ভালোবেসেছেন। জীবনানন্দের স্বপ্নরূপ পৃথিবীর ভেতর আরেক পৃথিবী নির্মাণের যে অতি-বাস্তব পংক্তিমালা ছড়ানো থাকে বাংলা কবিতায়, তাকে প্রকৃতপক্ষেই অধরা বলে মনে হয় শামশেরের। বরং কলকাতার আজন্ম নাগরিক কবিতার আবশ্যিক রোমান্টিকতাকে পরিহার করে পঙক্তির পর পংক্তিতে তিনি সমর সেনের মতো হতে চেয়েছেন কঠোর বাস্তববাদী এবং অবসেসিভ---
''কোনো বিদর্ভ নগরী আমার স্বপ্নের ভিতর জেগে ওঠে না
ইতিহাসে কোনো অর্থ নেই মূঢ়তাও ভ্রান্তি ছাড়া
যে নারী আমাকে পথে বসালো তার ক্রুর হাসির ছাপ
লেগে আছে ইতিহাসের পৃষ্ঠায়
আমি জানি মানুষের কোনো উত্তরণ ক্লিওর আঁচলে বাঁধা নেই
এই কলকাতা আর আমার নিঃসঙ্গ বিছানা ছাড়া কোনো সত্যের
অপেক্ষা আমি রাখিনা"
---(এই কলকাতা আর আমার নিঃসঙ্গ বিছানা)
তিরিশের দশকে পরাধীন ভারতে কবিতা লিখতে বসে জীবনানন্দ দাশ যখন জগতের নিঃসীম ভয়াবহতাকে উল্লেখ করেও, কলকাতা শহরের প্রাত্যহিক জীর্ণতা, মূঢ়তা ও ক্লীবত্বকে প্রকাশ করেও, আশাকে অক্ষুন্ন রেখে বলেন---
"কলকাতা একদিন কল্লোলিনী তিলোত্তমা হবে
তবুও তোমার কাছে আমার হৃদয়।"
---(সুচেতনা)
সেখানে কবি শামশের আনোয়ার কলকাতাকে নিঃসঙ্গ বিছানা বলে উল্লেখ করেন, স্বাধীন দেশের একজন নাগরিক হয়েও। আসলে উত্তর ঔপনিবেশিক কলকাতার নৈতিক নীচতাকে, নাগরিক জীবনের ক্লান্ত ঔদাস্যকে কুষ্ঠরোগীর জল চেটে খাওয়ার অধঃপতনের মতোই নগ্নভাবে প্রকাশ করেন শামশের। এই উত্তর-ঔপনিবেশিক নৈরাজ্যের ভার তাঁকে দিয়ে লিখিয়ে নেয়---
"প্রেম আর স্মৃতি আমি উড়িয়ে দিয়েছি সিগারেটের ধোঁয়ায়
জ্বর আসে নি তবুও আমি জ্বরের ঘোরেই বাঁচি
মদের ঘোরে ভাঁড়ামো ক'রে আমার দুপুর কাটে
মাড়ওয়ারি দম্পতির নির্লজ্জ সঙ্গম দেখে ছাদের ওপর
রাত্রির প্রহর পুড়ে যায়"
---(এই কলকাতা আর আমার নিঃসঙ্গ বিছানা)
এক্ষেত্রে কি বাংলা কবিতার পাঠকের স্মৃতিতে পূর্ব কবি সমর সেনকে মনে পরেনা ! যিনি শামশেরের থেকে বহুদিন বেশি বেঁচে থেকেও কয়েকটি মাত্র কাব্যগ্রন্থ লিখে কবিতা লেখা থেকে স্বেচ্ছা- অবসর নিয়েছিলেন। 'উর্বশী' কবিতায় সেই সময় দাঁড়িয়ে তিনি লিখেছিলেন---
"তুমি কি আসবে আমাদের মধ্যবিত্ত রক্তে
দিগন্তে দুরন্ত মেঘের মতো !
কিম্বা আমাদের ম্লান জীবনে তুমি কি আসবে,
হে ক্লান্ত উর্বশী,
চিত্তরঞ্জন সেবাসদনে যেমন বিষণ্নমুখে
উর্বর মেয়েরা আসে :
কত অতৃপ্ত রাত্রির ক্ষুধিত ক্লান্তি,
কত দীর্ঘশ্বাস,
কত সবুজ সকাল তিক্ত রাত্রির মতো,
আরো কতদিন !"
---(ঊর্বশী)
কিংবা---
"আমি নহি পুরুরবা হে উর্বশী'
মোটরে আর বারে
আর রবিবারে ডায়মন্ড হারবারে
কয়েক টাকার কয়েক প্রহরের আমার প্রেম,"
---(স্বর্গ হতে বিদায়)
কিন্তু সমর সেনের কবিতায় যে নার্ভাস স্ট্রংনেস পাওয়া যায়, পাওয়া যায় আভিজাত্যের সুউচ্চ টাওয়ার থেকে কলোনিয়াল কলকাতার নৈরাজ্য ও অধঃপতনের দর্শন, তারও তিক্ত ঐতিহাসিক দু'দশক পরে ফ্যাসিস্ট শাষিত কলকাতার নাগরিকদের একজন হয়েই শামশের কবিতা লিখেছেন। জীবনানন্দের অতি- বাস্তবতার রোমান্টিক স্বপ্নময়তা থেকে সরে এসে তাই শামশেরকে সমর সেনের রুক্ষ বাস্তবের পথ গ্রহণ করতে হয়েছে। যদিও সমসাময়িক সময়ে তাঁর কবি জীবন এবং কবিতার ফ্রম একত্রিত হয়ে তৈরি হয়েছিল তাঁর কাব্য প্রবণতা। সেই প্রবনতা থেকে নিজের জবানিতেই তিনি উদ্ধৃত করেন---
"ইনসমনিয়া নাইটমেয়ার, নার্ভাস ব্রেকডাউন, অর্থাৎ ফিয়ার অফ সাইকোসিস ছাড়া আমার পক্ষে সম্ভব হত না কবিতা লেখা"
আর এটাই প্রকাশ করে একজন প্রকৃত কবির লেখার অথেন্টিক প্রসেস। ফলোতো শামশেরের কবিতায় আছে এক চূড়ান্ত মর্বিডিটি। প্রথাগত মৃত্যু চেতনার সঙ্গে যার আকাশ পাতাল পার্থক্য। এ প্রসঙ্গে কতগুলি পংক্তি পরিলক্ষণ করলেই তা স্পষ্ট হবে পাঠকের কাছে----
১। "খোলা ব্লেড দেখলে তৃষ্ণায় আমার গলা জ্বলে
পাখার হুক দেখলে মনে পড়ে যায়।
সোনালী পাশের কথা"
---(এই কলকাতা আমার নিঃসঙ্গ বিছানা)
২। "হতাশার লোমে ভর্তি কদাকার হাত
আমার গলা চেপে ধরে"
---(জীর্ণ ছবি)
৩। "আজ আমি খুরপি নিয়ে শুয়েছি
কোপাবো নিজেকে"
---(পৌরাণিক)
৪। "নিজেকে আহার করো--- এসো
পান করো নিজের সমস্ত অনুতাপ ও বর্ষণমুখর বৃষ্টির ধারা"
---(বর্ষা)
আত্ম- পীড়নের এত এত উপাদান শামশের তাঁর কবিতায় উল্লেখ করেছেন যে, কখনও কখনও তিনি পাঠকের কাছে অস্বস্তিকরও হয়ে উঠেছেন। সময়ের ব্যর্থতম কদর্যতার উপর যারা ভদ্রতাকে কৃত্রিমভাবে বজায় রাখে সেই সুসভ্যতার প্রতিভূদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন---
"আমি তোমাদের মুখের ওপর ছড়িয়ে দিই থুতুর নক্ষত্রমালা।"
---(থুতু )
শামশেরের কবিতা উত্তম পুরুষে লেখা। সেখানে যে 'আমি' ব্যবহৃত তার একটি সময়ের যন্ত্রণাকে চিহ্নায়নের প্রতীক রূপে সমকালীন সমাজ থেকে সৃষ্ট হয়েছে। নিছক ব্যক্তি আমির মধ্যে তা আবদ্ধ নয়। শামশেরের এই 'আমি' ক্ষোভ, ক্রোধ ও বিবমিষার সংমিশ্রণ। যা তাঁর ব্যক্তি-জগৎ থেকে উঠে আসা, কিন্তু রাস্ট্র-প্রসূত।
প্রচলিত চিত্রকল্পময়তার এক বৈপরীত্য এবং পরাবাস্তবতার এক নতুন ভঙ্গি তাঁর কবিতায় দেখা গেছে। যা কেবল নিছক বর্ণনা হয়ে থাকে নি। তাঁর কবিতার ভাষাও পেলব নয়। যেমন---
১। "আক্রোশে চিবাই পাথর"
২। "আক্রোশে চিবাই জ্যোৎস্না"
৩। "অজন্তার পাথরে দেখি মাটি ও মলের বিপ্লব"
জীবনানন্দ উত্তর বাংলা কবিতায় এক নতুন প্রকাশ- ভঙ্গির কবি হিসাবে তাই শামশের চিহ্নিত হতে পারলেন। যে কারণে সুনীল গাঙ্গুলী তাঁর কবিতার স্বীকৃতি স্বরূপ প্রথম কৃত্তিবাস পুরস্কার কবি শামসের আনোয়ারকেই অর্পণ করেছিলেন।
তাঁর কবিতা নিজে ব্যক্তিজীবনের বেপরোয়া স্বভাবের মতোই রাগী ভাষায় নির্মিত। তিনি প্রতিনিয়ত নিজেকে ভেঙেছেন, চূর্ণ করেছেন তাঁর কবিতায়। এই ভাঙ্গন যেন "চোখের সুরঙ্গ দিয়ে উড়ে যায় মাথার জঙ্গলে"। পাশাপাশি তাঁর কবিতায় এক প্রবল অস্থিরতাবোধ পরিলক্ষিত হয়েছে বারবার। কাজেই প্রাবন্ধিক অধ্যাপক তপোধীর ভট্টাচার্যের একটি উক্তি শামশেরের কবিতা প্রসঙ্গে আমাদের কাছে ভীষনই প্রাসঙ্গিক মনে হবে---
"স্বদেশ সমাজ ও ইতিহাসের পালাবদলের দিনগুলিতে চরম বিচ্ছিন্নতার আগ্রাসী অন্ধকারই সেদিনের বহু তরুণ কবির কাছে সার্বভৌম ও অবিকল্প হয়েছিল। নাস্তির তিমির তখন এতই দুর্ভেদ্য যে, দান্তের নরকও সম্ভবত কাম্য তার চেয়ে।"
মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয় আর মানুষের বীভৎস উউন্মাদনায় উত্তাল নগরীর বুকে কবি শামশের আনোয়ার হতাশা ও ক্লান্তিতে দীর্ণ হয়েছেন নিরন্তর। কিন্তু প্রশ্ন হল--- তিলোত্তমা নগরী কি সবসময়ই কবিকে হতাশায় ভরিয়ে দিয়েছেন। সেখানে কি কখনই কোন মঙ্গলের বার্তা ছিল না ! নিশ্চিত ছিল। অথচ মঙ্গলের দিনেও প্রবল এক অমঙ্গলের আশঙ্কায় কবি থরথরিয়ে কেঁপে উঠেছেন বারবার। যখন শঙ্খের পবিত্র ধ্বনি উঠেছে আকাশে- বাতাসে, তখনই কবির শূন্য বুকের ভেতর জীর্ণ পাতা ঝরে পড়েছে অবিরল ধারায়। আসলে মানব জীবনের সংঘাত বিপন্নতায় কবি অসহায় বোধ করেছেন। শঙ্খ আর উলুধ্বনির শুদ্ধ স্রোতে তিনি তাই অবগাহন করার পরিবর্তে বরং তাঁর অসহায় চোখ হারিয়ে গেছে আসমুদ্র নিঃসঙ্গতার অতলে। কাজেই পৃথিবীর নির্জনতম দ্বীপের গভীরে যে শূন্যতা নিহিত আছে, সেই প্রকাণ্ড শুন্যতার মত কবি উপলব্ধি করেন মানুষের চৈতন্যের মড়ক। তাই বক্তব্যের বিন্যাসে, আঙ্গিকের তাৎক্ষণিক চমক সৃষ্টি করার পরিবর্তে কবি শামসের আনোয়ার আরও ভয়ংকর ভাবে দেখাতে পারেন পৃথিবীর গভীর গভীরতর অসুখ এর ইতিবৃত্তটি। ফলে খুব স্বাভাবিকভাবেই কবির আকাঙ্খার সমগ্রতা জুড়ে খেলা করে যায় এক বিদীর্ণ পৃথিবীর নিঃসঙ্গ আর্তনাদ। কবি লেখেন---
"আজ এই মঙ্গলের দিন কী এক ঘোর অমঙ্গলের ভয়ে
আমার সমস্ত আঙুল ভীতা জননীর মতো কেঁপে ওঠে
তোমাদের শঙ্খের ধ্বনি এই নিষ্পত্র বুকের ভিতর
করুন ফুঁ দিয়ে জীবনের শীতরিক্ত পাতাগুলো ঝরিয়ে দেয়।
যেন দূর দিগন্ত ভেঙে ছুটে আসে সন্ন্যাসীর আহ্বান
তোমাদের উলুধ্বনি আর চুলের কলরবের স্রোতে
আমার দুই অসহায় চোখ বারবার করুন পাক খেয়ে
হারিয়ে যায় ভীষণ নিঃসঙ্গ"
---(এই মঙ্গলের দিন )
প্রসঙ্গত লক্ষণীয় যে, 'এই মঙ্গলের দিন' শিরোনামটিকে কবিতায় ধারণ করলেও কবি আদতে মঙ্গলের শুভ মুহূর্তেও অশুভ অমঙ্গলের আশঙ্কায় জর্জরিত হয়ে যান। এক্ষেত্রে আমাদের মত সাধারণ পাঠকের মনে জাগতে পারে তিরিশের অন্যতম কবি জীবনানন্দের 'সুচেতনা' শীর্ষক কবিতাটির কথা। সেখানেও কবি, আলোকিত চেতনা স্বরূপিনী সুচেতনাকে কবিতার শিরোনামে স্থান দিলেও, আদতে সমগ্র কবিতাটির শরীর জুড়ে পৃথিবীর অসহায় আর্তনাদ আর মানুষের সামাজিক, মানবিক ভাঙনের ইতিকথাটিকেই যেন তুলে ধরতে চাইলেন। মানুষের চৈতন্য সত্তার জাগরণ হলে মুক্তির আলোর দীপ্তি উদ্ভাসিত হয়, কিন্তু যে চেতনায় নিরন্তর পাপের বিষ প্রবাহিত হয়, সেই চেতনাকে জাগ্রত করার পথ কে বা জানে। তাই আলোকিত চেতনা স্বরূপিনী সুচেতনা আমাদের লৌকিক পৃথিবী থেকে অনেক দূরে যেন কোন এক কল্পনাপ্রসূত জগতে চলে গেছে। কবির মনে হয়---
"কেবলি জাহাজ এসে আমাদের বন্দরের রোদে
দেখেছি ফসল নিয়ে উপনীত হয় ;
সেই শস্য অগণন মানুষের শব ;
শব থেকে উৎসারিত স্বর্ণের বিস্ময়
আমাদের পিতা বুদ্ধ কনফুসিয়াসের মতো আমাদেরও প্রাণ
মূক করে রাখে ; তবু চারিদিকে রক্তক্লান্ত কাজের আহ্বান।"
---('সুচেতনা'/ জীবনানন্দ দাশ)
কবি জীবনানন্দ যেখানে পৃথিবীর চারিদিকে রক্তমাখা কাজের আহ্বান শোনেন, সেখানে কবি শামশের আনোয়ার যুগের ক্লান্তি, বিষণ্ণতা ও বিতৃষ্ণার ছবিটি প্রত্যক্ষ করেন। তাই আমাদের পিতা- প্রপিতামহরা বুদ্ধ কিংবা কনফুসিয়াসের মত মহাজ্ঞানী হলেও, পিলসুচের তলার অন্ধকার ঘোচাতে পারেন না। কাজেই সময়ের ঘোর অন্ধকারে কদর্য সর্বনাশের রেড ক্রসিং কবি শামশের আনোয়ারকে ক্রমাগত ভীতসন্ত্রস্ত করে। তবুও কবি তো সমাজের মধ্যে বাস করে, সমাজেরই একজন রক্তমাংসের মানুষ ফলে পারিপার্শ্বিক বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মায়াজালেই কবি তাঁর মানব অস্তিত্বটিকে খুঁজে পেতে চান। অজ্ঞানতার নিবিড় অন্ধকারে বেঁচে থাকা মানুষের জীবনে কবি তাঁর ব্যক্তিজীবনের ঘোরালো সিঁড়িটি বেয়ে "নীরব আহুতির মত ঝ'রে পড়ে''-ন। সেখানে প্রেমিকার ললাট বিবাহের হোমাগ্নি স্পর্শ করলে, কবি তাঁর কাব্যিক বোধের সীমাটিতে দাঁড়িয়ে প্রত্যক্ষ করেন, তা যেন বিবাহের হোমের আগুন নয়, প্রকারান্তরে তা যেন প্রেমিকার চিতার দাউ দাউ আগুন। যে আগুনে প্রেমিকার মুখাগ্নি হয়, আর বিষন্ন যুবকেরা হতাশ ভঙ্গিতে বিষণ্ণতার গান গেয়ে চলে। আসলে কবি এখানে দেখাতে চান প্রতিটি মানুষই তার নিজের কাছে কী ভীষণ অসহায়, মানব সংসার ও মানব সভ্যতা তাদেরকে কি সাংঘাতিক বঞ্চনার শিকার করে। তাই কবি বলেন,---
"বিবাহের হোম ছুঁয়ে দেয় তোমার কপাল
আমি দেখি তোমারই চিতা ঘিরে কয়েকটি বিষন্ন যুবক
উদাস স্বরে গান গায়
আগুনের সাতটি শিখা (গম্ভীর স্বরে বলেছিলো পুরোহিত)
আমি দেখি আগুনের সাতটি শিখায় তোমার সাতটি
স্বপ্নের শরীর ওই অচেনা পুরুষের আঙুলের ফাঁক দিয়ে
নীরব আহুতির মতো ঝরে পড়ে"
---('এই মঙ্গলের দিন')
অবক্ষয়ের এই চূড়ান্ত বিকার কবি বিষ্ণু দে-র কবিতাতেও প্রবলভাবে রূপ লাভ করেছে। বিষ্ণু দে তাঁর 'স্মৃতি সত্তা ভবিষ্যত' কাব্যগ্রন্থে দেখিয়েছেন গ্লানির প্রগাঢ় অন্ধকারে ঢেকে গেছে মানুষের অতীত। মানুষের সত্তার বর্তমান অস্তিত্বটিও ক্লেদপঙ্কিল হয়ে উঠেছে। আর ভবিষ্যৎ জনজীবন ভয়াবহ এক রণসাজে কেমন সজ্জিত। আমাদের চেতনার আকাশ নির্বোধ অমানুষিক নিষ্ঠুর অভদ্রতার অপঘাতে দগ্ধ হয়ে গেছে। তাই বিবাহসভায় প্রচ্ছন্ন নরকে আজ বর না থাকলেও নানা রকম বরযাত্রীর ভিড় বাড়তে থাকে। যেখানে আমরা রয়েছি সেই মানবসভ্যতা নরকে পরিণত হয়ে গেছে। সেখানে বাঁচবার আসা আর বাঁচাবার ভাষা হারিয়ে যায়। সেখানে কান্নার সুর হয়ে যায় একঘেয়ে,---
"আজ শুধু একদিকে মুমূর্ষু বিকার
আর অন্যদিকে নাটুকে প্রলাপ নির্বোধ নিষ্ঠুর অমানুষিক অভদ্র।
কে দেবে ধিক্কার কাকে আঠারো তলায়
সারাদেশে চতুর্দিকে যত অবান্তর
উন্মাদ বিলাসী খেলা !"
---('স্মৃতি সত্তা ভবিষ্যত'/ বিষ্ণু দে)
দেশে দেশে এই বন্ধ্যা ক্ষেতরূপ সভ্যতায় সৃষ্টির সরস ফসল ফলানোর জন্য আর কোনো অবিরল বর্ষা নেই। আকাশের দিকে তাকিয়ে বৃষ্টির প্রার্থনা করলেও সকাল থেকে বিকাল অভাব- মৃত্যু- অনাহারে- অপঘাতে ভরে গেছে হৃদয়ের শুকানো দিঘী। তাই মৃত্যুর বিকারে নরকের ব্যঙ্গ চিত্র ফুটে ওঠে। আত্মার গ্লানিতে আমাদের অন্তর্গত রক্তক্ষরণের ভিতরে কেবলই অবসাদ আর বিপন্নতা। তাই কবি এই নরকের মানুষের টিকে থাকাকে দুঃস্বপ্নের মতো মনে করেন,---
"এ নরকে
মনে হয় আশা নেই জীবনের ভাষা নেই,
যেখানে রয়েছি আজ সে কোন গ্রামও নয়, শহরও তো নয়,
প্রান্তর পাহাড় নয়, নদী নয়, দুঃস্বপ্ন কেবল,"
---('স্মৃতি সত্তা ভবিষ্যত'/ বিষ্ণু দে)
একইভাবে কবি বুদ্ধদেব বসুও তাঁর কবিতায় দেখিয়েছেন দেশে দেশে পৃথিবীর উপকূলে লুব্ধতার লালা ঝরে। বর্বর রাক্ষস হাঁকে পৃথিবীতে সেই শ্রেষ্ঠ, সবচেয়ে বড়। উন্মত্ত জন্তুর মুখে জীবনের সোনার হরিণ কেঁপে ওঠে। কাজেই, আমরা পরিলক্ষণ করি শামশের আনোয়ার কিংবা তাঁর অগ্রজ কবিদের কাব্য অনুভূতিতে প্রবল এই নৈরাজ্য ও অবক্ষয়ের জঘন্য চিত্রটি। কিন্তু তবুও কবিরা তো আশাবাদী হন, ফলে তাঁদের আশাবাদের নিরিখে সভ্যতার মুক্তির আকাঙ্খাটিও ধ্বনিত হতে থাকে। তাঁরাএতসব কদর্য প্রলাপ প্রত্যক্ষ করার পরেও প্রেমে ফিরে যেতে পারেন। কারণ আমাদের রক্তের অসুখ প্রেমই সুস্থ করে দিতে পারে। সুতরাং শামশের আনোয়ারও সেই ভাবনার ব্যতিক্রমী নন। তাঁর কবিতায় এত রক্ত, এত হতাশা, এত ক্লান্তি, এত আত্মহননের গান থাকলেও, প্রেমকে তিনি অস্বীকার করতে পারেন না। বলা ভালো প্রেমের মহিমময় স্বরূপটিকে তিনি এড়িয়ে যেতে পারেন না। তাই 'ভালোবাসাহীনতার কষ্ট' কবিতায় কবি অপ্রেমের অসহায় যন্ত্রণাটি উপলব্ধি করতে পারেন,---
"একটা পতঙ্গভুক বৃক্ষের মতো ওর তৃষিত ডালপালাগুলো
আপ্রাণ চেপে ধরে আমার শরীর
নাভিমূলে তীব্র বঙ্কিম কুঠারের আঘাত হানে
শব্দ হয়
ভালোবাসাহীনতার শব্দে চারিপাশের দেয়াল ফেটে পড়ে"
---('ভালোবাসা হীনতার কষ্ট')
দিনের সূর্য অস্তমিত হলে নিস্তব্ধ সন্ধ্যা যেমন নেমে আসে শিশিরের শব্দের মতন। তখন সেই অন্ধকারে বনলতা সেনের মতো প্রেমিকার মুখোমুখি বাসার স্বাদ যেমন হয় কবির, ঠিক একইভাবে শামশের আনোয়ারও 'মূর্খ স্বপ্নের গান' কবিতায় প্রেমিক- প্রেমিকাকে মুখোমুখি বসান। কবি দেখাতে চান প্রেমের মহান অনুভূতিতে আত্মসমর্পণের সুখ এবং প্রেমহীনতায় বেঁচে থাকা কেমন অসম্ভব---
"একটি মেয়ে, একটি ছেলের চোখের ওপর চোখ রেখে, স্থির গলায় বলে :
'হ্যাঁ, অনেক ভেবে দেখেছি, কিন্তু বিশ্বাস করো, তোমাকে ছাড়া বাঁচা
অসম্ভব।'
একটি মেয়ে একটি ছেলের কোলের ওপর মাথা রেখে বলে :
'না, না, আজ আমার জন্মদিন নয়। যেদিন সব ছেড়ে, সব ফেলে তোমার
কাছে আসতে পারব, সেদিন, সেদিনই আমার জন্মদিন !"
---('মূর্খ স্বপ্নের গান')
তাই শামশের আনোয়ারের কবিতা শুধু শিল্প বা সাহিত্য হয়ে আবদ্ধ থাকে নি। একটা অস্ত্র হয়ে হাজির হয়েছে পাঠকের দরজায়। কবিতার প্রচলিত নন্দনতাত্ত্বিক উপরি-পরিকাঠামোকে সযত্নে উপেক্ষা করে, ভেতরের বয়ান টাকেই অধিক গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। কাজেই শামশেরের কবিতা এক অর্থে তাঁর নিজের অস্তিত্বের সারোৎসার এ কথা বলাই যায়। আর কবি বলেন,---
"সঙ্গমের ইচ্ছা হলে নিজেকে জড়িয়ে ধরে সঙ্গম করি।"
ফ্রয়েডীয় মনোবিকলন তত্ত্ব হয়তো এখানে ব্যাখ্যাত হতে পারে। কিন্তু তবুও, একই সঙ্গে তীব্র বিষাদ, তীব্র ক্রোধ ও অনির্দেশ্য এক ঈর্ষা শামশের আনোয়ারের কবিতার জগত নির্মাণ করেছে। হয়তো নার্ভাস ব্রেকডাউন, ইনসমনিয়া নাইটমেয়ার অথবা ফিয়ার অফ সাইকোসিস তাঁর অবদমিত ইচ্ছার বিরুদ্ধাচারণ করা পৃথিবীর পক্ষে তাঁকে নিরাপদ বলে মনে করেনি। তাই খুব কম বয়সেই আত্মঘাতী প্রতিভাবান এই কবির কাছে পড়ে থাকে আমাদের এক অজ্ঞাত প্রত্যাশা। আরো দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকলে হয়তো সেই প্রত্যাশা তিনি পূরণ করে যেতেন।
গ্রন্থঋণ :
১। শামশের আনোয়ারের শ্রেষ্ঠ কবিতা, দে'জ পাবলিশিং।
২।জীবনানন্দ দাশের শ্রেষ্ঠ কবিতা, দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত, দে'জ পাবলিশিং
৩। বিষ্ণু দে-র শ্রেষ্ঠ কবিতা, দে'জ পাবলিশিং
৪। https://sillypoint.co.in
ছবি : বিধান দেব
সুরজিৎ প্রামাণিক
জন্ম : ২২ আগস্ট ১৯৯৩, দঃ ২৪ পরগনার নীলা গ্রামে। প্রথম কবিতার বই 'শূন্য প্রতিধ্বনির অন্ধকারে' প্রকাশিত হয় সাহিত্যের বেলাভূমি প্রকাশনার দপ্তর থেকে ২০১৪ সালে। কবিতা বিষয়ক ষান্মাসিক সাহিত্যপত্র 'নিরক্ষরেখা'-র সম্পাদক। ২০১৭ সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বঙ্গভাষা ও সাহিত্য বিভাগে স্নাতকোত্তর। ২০২০ সালে পশ্চিমবঙ্গ সেট ও ন্যাশনাল ফেলোশিপ সহ ইউ.জি.সি নেট উত্তীর্ণ।
সুপুরি বনের ছায়ায় ছায়ায় ।। সুবীর সরকার
জন্মের আগের মুখ ।। চন্দন মিত্র
জন্মের আগের মুখ : জেন তত্ত্ব ও জেন কোয়ানের অমায়িক ভুবন
পঞ্চদশ পর্ব
চ্যান > জেন : জাপান-পর্ব
একদা চিন থেকে চ্যান পৌঁছে যায় উদীয়মান সূর্যের দেশে। জাপানিদের উচ্চারণে চ্যান হয়ে যায় জেন। জাপান থেকেই জেন ছড়িয়ে পড়ে ইউরোপ-আমেরিকায়। ফলে চিন ছাড়া প্রায় সারা পৃথিবীতে চ্যান উচ্চারিত হতে থাকে জেন নামে। এখন থেকে আমরাও চ্যানকে জেন হিসাবেই জানব।
চিনের মতো জাপানেও জেনের ভিত্তিভূমি প্রস্তুত করেছিল মহাযান বৌদ্ধধর্ম ও সংশ্লিষ্ট সূত্রাবলি। কোরিয়ার একদল রাজ-প্রতিনিধির মাধ্যমে জাপানিরা প্রথম বৌদ্ধধর্ম ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হয়। ৫৫২ (মতান্তরে ৫৩৮) খ্রিস্টাব্দে কোরিয়ার পেকচে রাজ্যের রাজা সঙমিয়ঙ একদল কূটনৈতিক প্রতিনিধিকে জাপানে পাঠান। তাঁদের সঙ্গে উপহার স্বরূপ ছিল ধাতব বুদ্ধমূর্তি, বিভিন্ন বৌদ্ধসূত্র, পোশাকপরিচ্ছদ, অলংকার ইত্যাদি। জাপানের তৎকালীন সম্রাট কিমুমেই (৫৩২-৫৭১ খ্রিঃ) এই প্রতিনিধিদলকে সাদর অভ্যর্থনা জানান। কোরিয়ান প্রতিনিধিদলের মার্জিত আচার-ব্যবহার, পোশাকপরিচ্ছদ, ধর্মাদর্শ ইত্যাদি রাজসভা ও রাজধানীকেন্দ্রিক পরিমণ্ডলে এক অভূতপূর্ব আলোড়ন সৃষ্টি করে। সম্রাট কিমুমেই বৌদ্ধধর্মের অনুরাগী হয়ে ওঠেন। বহিরাগত একটি ধর্মের রাজসভায় এমন সমাদর জোটায় প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলির মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। নাকাতোমি গোষ্ঠী বৌদ্ধধর্মের বিরোধিতা শুরু করে। তাদের যুক্তি ছিল, জাপানের পরম্পরিত ধর্মকে ছেড়ে বিদেশি ধর্মকে প্রাধান্য দিলে দেশের সভ্যতা-সংস্কৃতি বিপন্ন হবে। তারা চেয়েছিল অন্যান্য দেশ থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন রেখে জাতিগত বিশুদ্ধতা রক্ষা করতে। প্রসঙ্গত জাপানের পরম্পরিত ধর্ম শিন্তো সম্পর্কে কিছু তথ্য জেনে রাখা সমীচীন। শিন্তো শব্দটি ‘শেন’ (শব্দটি আত্মা, ঈশ্বর, দেবতা ইত্যাদি অর্থে ব্যবহৃত হয়) ও ‘তাও’ (শব্দটির অর্থ পথ) এই দুই চিনা শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। সুতরাং শিন্তো শব্দটির অর্থ দাঁড়ায়— আত্মা বা দেবতার পথ। আগে জাপানিদের এই আদিধর্ম ‘কামি নো মিচি’ নামেই পরিচিত ছিল, যার অর্থ— কামির পথ। জাপানি ‘কামি’ শব্দটিকে বাংলায় আত্মা বা দেবতা বা ঈশ্বর বা প্রভু ইত্যাদি অর্থে অনুবাদ করা যায়। তবে ‘কামি’ কেবল স্বর্গীয় বা বায়বীয় বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন প্রাকৃতিক শক্তি, গাছগাছালি, পশুপাখি, পাহাড়-পর্বত ইত্যাদিও কামি-র অন্তর্ভুক্ত তথা উপাস্য। প্রাথমিক পর্যায়ে ‘আমাৎসুকামি’ (স্বর্গীয় কামি) ও ‘কুনিৎসুকামি’ (পার্থিব কামি) এই বিভাজন ছিল। পরবর্তীকালে এই বিভাজন গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে। বস্তুত পক্ষে শিন্তো তেমন কোনো পাকাপোক্ত প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম ছিল না। বিভিন্ন প্রাকৃতিক শক্তি ও পূর্বপুরুষদের আত্মাকে সন্তুষ্ট করার জন্য আদিম জনগোষ্ঠীর পালনীয় প্রথাসমূহই কালক্রমে একটি ধর্মের রূপ পায়। প্রাথমিক যুগে এই লোকধর্মে কোনো মূর্তি, মন্দির, ধর্মগ্রন্থ বা শাস্ত্রও ছিল না। কেবল ‘জিনজা’ নামে একটি উপাসনাস্থল থাকত। লোকেরা বিশ্বাস করত জিনজা আসলে এক বা একাধিক কামির অবস্থানস্থল। আদিকালে যা ছিল মূলত পাথুরে বেদি, পরবর্তীকালে তা সুদৃশ্য মন্দিরে রূপান্তরিত হয়। নাকাতোমি গোষ্ঠীর এই ঐতিহ্যপ্রীতির বিপরীতে সোগা গোষ্ঠী দৃঢ়ভাবে বৌদ্ধধর্মের পক্ষে দাঁড়ায়। তারা যুক্তি দেখায় বৌদ্ধধর্ম জাপানের সভ্যতা-সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করার মতো রসদে ভরপুর এবং তা বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বৈদেশিক সম্পর্ক স্থাপনের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। এই প্রগতিশীল গোষ্ঠী চেয়েছিল কোরিয়া ও চিনের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে জ্ঞানবিজ্ঞান তথা আধুনিকতার ছোঁয়া পেতে। শেষমেশ বৌদ্ধধর্মের দিকেই পাল্লা ভারি হয়ে ওঠে।
সম্রাট কিমুমেই মারা যাওয়ার পরে সিংহাসনে বসেন বিতাৎসু (৫৭১-৫৮৫ খ্রিঃ)। সিংহাসনে বসে তিনি শিন্তো ধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা শুরু করেন। ৫৮৫ খ্রিস্টাব্দে জাপানের সম্রাট হন ইয়োমেই। তিনি বৌদ্ধধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। ইয়োমেই- এর মৃত্যুর পরে সম্রাট সুশুন প্রায় ছয় বছর রাজত্ব করেন। তাঁর মৃত্যুর পরে ৫৯২ খ্রিস্টাব্দে সিংহাসনে বসেন সম্রাজ্ঞী সুইকো। তিনি ছিলেন সম্রাট কিমুমেই এর তৃতীয় কন্যা ও সম্রাট বিতাৎসু-র স্ত্রী। তাঁর শাসনকালে জাপানের নীতিনির্ধারক হিসাবে মনোনীত হন, সম্রাট ইয়োমেই-এর পুত্র রাজকুমার শোতোকু (৫৭৪-৬২২খ্রিঃ)। সম্রাজ্ঞী সুইকো ও রাজকুমার শোতোকু উভয়ে ছিলেন বৌদ্ধধর্মের একনিষ্ঠ পৃষ্ঠপোষক। তাঁদের প্রচেষ্টায় জাপানে বৌদ্ধধর্মের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়; বৌদ্ধধর্ম রাষ্ট্রধর্মের স্বীকৃতি লাভ করে। রাজকুমার শোতোকু ছিলেন চিনের তাং-রাজাদের অনুসৃত বৌদ্ধ ধর্ম ও সংস্কৃতির একান্ত অনুরাগী। চিনা সভ্যতা-সংস্কৃতি তথা জ্ঞানবিজ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে তিনি নিজের দেশকে আধুনিক তথা উন্নততর করে তোলার স্বপ্ন দেখতেন। এই উদ্দেশ্যে তিনি বেশ কয়েকবার চিনদেশে প্রতিনিধিদল পাঠিয়েছিলেন। জাপানি শিক্ষার্থীদেরও তিনি চিনদেশে পড়াশোনার জন্য পাঠাতেন। কেবল বৌদ্ধ ধর্ম ও সংস্কৃতির অনুসন্ধান নয়, কনফুসীয় দর্শন, চিকিৎসা বিদ্যা, শাসনসংক্রান্ত বিভিন্নদিকের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিভিন্ন তথ্য ও তত্ত্ব সংগ্রহ করে তিনি জাপানের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান, আইনকানুন, পঞ্জিকা, শিক্ষাব্যবস্থা ইত্যাদির আমূল সংস্কার সাধন করেন। তাঁর উদ্যোগেই প্রথম জাপানি সংবিধান প্রণীত হয়। মূলত কনফুসীয় নীতিতত্ত্বের দিকে তাকিয়ে সংবিধানের বিভিন্ন ধারা-উপধারাগুলি লিখিত হয়েছিল। এই সংবিধানে একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সরকার গঠনের কথা বলা হয় যার মধ্যমণি হবেন স্বয়ং সম্রাট। তাঁকে সাহায্য করার জন্য একদল আমলা নিয়োগের কথা বলা হয়। আসলে রাজকুমার শোতোকু চেয়েছিলেন বিভিন্ন গোষ্ঠীর সামন্তদের হাত থেকে শাসনক্ষমতা কেড়ে এক অখণ্ড শক্তিশালী দেশ গড়তে। ‘কাঞ্জি’ নামক চিনা লিখনপদ্ধতিকে জাপানি ভাষার লিখনে কাজে লাগান তিনি। এর ফলে একই চিনা অক্ষর দ্বারা গঠিত শব্দ চিনে ও জাপানে সমার্থবোধক হলেও উচ্চারণগত দিক থেকে পার্থক্য দেখা দেয়। যেমন, যে শব্দটি চিনা ভাষায় ‘হুইকে’ হিসাবে উচ্চারিত হয়, সেই শব্দটিই জাপানি ভাষায় ‘একা’ হিসাবে উচ্চারিত হয় ; এই পদ্ধতিতেই চিনা ‘চ্যান’ জাপানি উচ্চারণে হয়েছে ‘জেন’। রাজকুমার শোতোকু সমগ্র জাপানে বৌদ্ধধর্ম প্রচারের ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। তিনি বেশ কিছু বৌদ্ধ মঠ-মন্দির নির্মাণ করেন। সদ্ধর্মপুণ্ডরীক, বিমলাকীর্তি ও শ্রীমালাদেবী সিংহনাদ— এই তিন মহাযানী সূত্রের ভাষ্যও তিনি রচনা করেন। বৌদ্ধধর্মের প্রচার ও প্রসারে উল্লেখযোগ্য ভূমিকার জন্য তিনি ‘জাপানি বৌদ্ধধর্মের জনক’ হিসাবে খ্যাত হয়ে আছেন।
জাপানে প্রথম চ্যান তথা জেন-বিষয়ক ধারণা বহন করে নিয়ে যান, জনৈক বৌদ্ধ ভিক্ষু তোশো (৬২৯-৭০০ খ্রিঃ)। তিনি ৬৫৩ খ্রিস্টাব্দে চিনে গিয়ে প্রখ্যাত বৌদ্ধ পণ্ডিত হিউয়েন সাং (৬০২-৬৬৪ খ্রিঃ)-এর কাছে যোগাচার দর্শনের চর্চা করেন। হর্ষবর্ধনের রাজত্বকালে হিউয়েন সাং আমাদের দেশে এসেছিলেন। তিনি ভারত থেকে বহু বৌদ্ধপুথির প্রতিলিপি নিয়ে গিয়েছিলেন। হিউয়েন সাং, তোশোকে জনৈক চ্যানসাধুর শিষ্যত্ব গ্রহণের উপদেশ দেন। তোশো গুরুর আদেশ শিরোধার্য করে চ্যান-শিক্ষা গ্রহণ করেন। দেশে ফিরে তিনি গ্যাংগো মঠে একটি ধ্যানকক্ষ নির্মাণ করে জেনচর্চায় মনোনিবেশ করেন। তোশোই প্রথম জাপানি যাঁর দেহ সমাধিস্থ না-করে দাহ করা হয়। তাঁর অন্তিম ইচ্ছানুসারে অভিনব অন্ত্যেষ্টির বন্দোবস্ত করেছিলেন তাঁর অনুগামীরা। তোশোর মৃত্যুর পরে তাঁর প্রতিষ্ঠিত হোশো ঘরানাটি খুব বেশিদিন স্থায়িত্ব লাভ করেনি।
৭১০ খ্রিস্টাব্দে নারা শহরে রাজধানী স্থাপনের মাধ্যমে সম্রাজ্ঞী গেনমেই জাপানে নারা যুগ (৭১০-৭৮৪ খ্রিঃ) সূচিত করেন। চিনের তাং যুগের রাজধানী চাং-আন-এর স্থাপত্য ও নগর-পরিকল্পনার অনুকরণে এই রাজধানী শহরটিকে এমনভাবে নির্মাণ করা হয়, যেন শহরটি চাং-আন-এর একটি ক্ষুদ্র সংস্করণ। নারা যুগের প্রথমার্ধে শিন্তো অনুসারীদের প্রভাব বাড়তে থাকে। সামন্ততন্ত্র পোক্ত হয়ে ওঠে। রাজকুমার শোতোকুর আমলে যে আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থা সূচিত হয়, তা ক্রমশ বংশানুক্রমিক হয়ে পড়ে। চিনের তাং-শাসনের অনুকরণে এই আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থা জাপানে গৃহীত হলেও চিনের মতো কেন্দ্রীয় কমিটি নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষার দ্বারা এখানে আমলা নির্বাচন করা হত না। ফলে অচিরেই প্রভাবশালী গোষ্ঠীর স্বজনপোষণ শুরু হয় এবং অযোগ্য আমলাদের ভিড়ে যোগ্যজনেরা সংখ্যালঘু হয়ে পড়ে। জাপানের কৃষকেরা কঠোর পরিশ্রম করে জমিতে ধান, গম, জব, জোয়ার-বাজরা ফলিয়ে জনগণের মুখে খাদ্য তুলে বিনিময়ে পেত করের বোঝা আর তা পরিশোধ করতে না-পারায় সহ্য করত অসহ্য অত্যাচার। এর হাত থেকে বাঁচতে কোথাও কোথাও তারা হাতে অস্ত্রও তুলে নিতে শুরু করে। কেউ কেউ লড়াই করতে করতে অস্ত্রশস্ত্র চালনায় পারদর্শী হয়ে উঠে পেশা বদলে যোদ্ধা হয়ে ওঠে। তাদের কাজে লাগাতে শুরু করে গ্রামাঞ্চলের ভূস্বামীরা। এইভাবে সামুরাই নামক মহাযোদ্ধাদের আবির্ভাবের পটভূমি প্রস্তুত হতে থাকে।
রাজকুমার শোতোকুর মৃত্যুর পরে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে বৌদ্ধধর্মের প্রচারপ্রসারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন সম্রাট শোওমু (৭০১-৭৫৬ খ্রিঃ)। তাঁর উল্লেখযোগ্য কীর্তি নারা শহরে ‘দাইবৎসু’ (মহান বুদ্ধ) নামক বৃহদাকার ধাতব বুদ্ধমূর্তি নির্মাণ। এই বুদ্ধমূর্তির অভিষেক উপলক্ষে ৭৩৬ খ্রিস্টাব্দে নারা শহরে পদার্পণ করেন ভারতীয় ভিক্ষু বোধিসেনা (৭০৪-৭৬০ খ্রিঃ)। এই বৌদ্ধমূর্তি নির্মাণ নিয়ে শিন্তো অনুসারীদের আপত্তি ছিল প্রবল। তাদের অভিমত ছিল এই বিদেশি ধর্মগুরুর মূর্তি নির্মাণ করার অর্থ পরম্পরিত কামিদের অপমান করা। শেষমেশ হোশো ঘরানার বৌদ্ধ ভিক্ষু গয়োকি শিন্তোদের অন্যতম প্রধান উপাস্য স্বর্গীয়কামি সূর্যদেবী আমেতেরাসুর ‘জিনজা’য় হত্যে দিয়ে তাঁর দৈবাদেশ আদায় করে নেন। কালক্রমে শিন্তো ও বৌদ্ধদের মধ্যে সম্প্রীতির ভাব গড়ে ওঠে। অনেকেই একসঙ্গে শিন্তো ও বৌদ্ধমতে আস্থাজ্ঞাপন করতে থাকেন। শোওমু প্রত্যেক প্রদেশে বৌদ্ধ সন্ন্যাসী ও সন্ন্যাসিনীদের জন্য দুটি করে জাতীয় মঠ নির্মাণ করেন। সন্ন্যাসীদের মঠগুলির নাম ছিল ককুবুন-জি এবং সন্ন্যাসিনীদের মঠগুলির নাম ছিল ককুবুননি-জি। এই মঠগুলির সঙ্গে সংযোগ সাধনের জন্য তিনি নারা শহরে একটি কেন্দ্রীয় মঠ তোদাই-জি গড়ে তোলেন। এই মঠগুলি ছিল একাধারে বিদ্যালয়, অনাথআশ্রম, চিকিৎসালয়, ও বৈজ্ঞানিক পরীক্ষানিরীক্ষার জায়গা। নারা যুগের অন্তিম পর্যায়ে শ্যানরোন, হোশো, কেগান, রিৎশু, কুশা ও যোজিৎশু এই ছয়টি বৌদ্ধঘরানার সন্ধান পাওয়া যায়। তবে এই ঘরানাগুলির মধ্যে তেমন কোনো আদর্শিক বিরোধ ছিল না। এমনকি একই মঠে তাদের সহাবস্থানও ছিল। সকলের উদ্দেশ্য ছিল একটাই নবাগত ধর্মকে জাপানের মাটিতে পোক্ত ভিত্তি দেওয়া।
৭৯৪ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট কামমু তেননো (রাজত্বকাল ৭৮১-৮০৬ খ্রিঃ), হেইয়ান কিয়ো (বর্তমান, কিয়োতো) শহরে রাজধানী স্থানান্তরিত করেন। শুরু হয় হেইয়ান যুগ (৭৯৪-১১৮৫ খ্রিঃ)। নারা শহরের মতো হেইয়ানকেও চিনের রাজধানী চাং-আন-এর আদলে গড়ে তোলা হয়। হেইয়ান যুগে চিন থেকে তেন্দাই ও শিঙ্গন এই দুই বৌদ্ধঘরানা জাপানে পৌঁছায়। তেন্দাই ঘরানাকে জাপানে নিয়ে যান সাইচো (৭৬৭-৮২২ খ্রিঃ)। তিনি চিনে গিয়ে তিয়েনতাই বৌদ্ধধর্ম, গুহ্য বা তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্ম ও জেন সম্পর্কিত শিক্ষা গ্রহণ করেন। দেশে ফিরে তিনি কিয়োতো-র হিয়েয়ে পর্বতে একটি তেন্দাই মঠ স্থাপন করেন। তাঁর উদ্যোগে শ্যানরোন ও হোশো ঘরানা তেন্দাই সম্প্রদায়ের অঙ্গীভূত হয়। সাইচো, সদ্ধর্মপুণ্ডরীক সূত্রের ভিত্তিতে জাপানের সকল বৌদ্ধ মতাবলম্বীকে এক ছাতার তলায় নিয়ে আসতে সচেষ্ট হন, এমনকি শিন্তো অনুগামীরাও তাঁর সঙ্গে যোগ দেন। সাইচো-পরবর্তী সময়ে তাঁর দুই সুযোগ্য শিষ্য এননিন (৭৯৪-৮৬৪ খ্রিঃ) ও এনচিন (৮১৪-৮৯১ খ্রিঃ) তেন্দাই সম্প্রদায়কে দৃঢ়ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করেন।
সাইচো-র সমসাময়িক কোবো দাইশি (৭৭৪-৮৩৫ খ্রিঃ) চিনে গিয়ে তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্ম চর্চা করেন। জাপানে ফিরে তিনি কাওইয়ে পর্বতে শিঙ্গন মঠ নির্মাণ করেন। তিনি মহাযান মতের পাশাপাশি হীনযান মতেরও চর্চা করতেন। তিনি শিঙ্গন মতাদর্শকে গুহ্য ও প্রকাশ্য এই দুইভাগে বিভক্ত করেন। কোবো দাইশি সমকালীন জাপানি বৌদ্ধ ঘরানাগুলির একটি তালিকা প্রকাশ করে শিঙ্গনকে জাপানের শ্রেষ্ঠ বৌদ্ধ সম্প্রদায় হিসাবে ঘোষণা দেন।
তেন্দাই ও শিঙ্গন এই দুই বৌদ্ধ সম্প্রদায় জাপানে প্রচলিত ছয়টি বৌদ্ধ ঘরানাকে প্রায় সম্পূর্ণভাবে গ্রাস করে নেয়। রাজন্যবর্গ ও আমলাদের পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে এই দুই সম্প্রদায় নিজস্ব মঠ-মন্দির বানিয়ে বা পুরানো মঠ-মন্দিরের দখন নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিকতার ভিতকে বেশ মজবুত করে তোলে। ক্রমশ এই দুই সম্প্রদায়ের সন্ন্যাসীরা নিজ নিজ সম্প্রদায়ের সংখ্যাধিক্য তথা শক্তি সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে। তারা নতুন এক শক্তিশালী ধর্মীয় সম্প্রদায় হিসাবে মাথা তুলে দাঁড়াতে থাকে। ক্ষমতার আস্বাদ পাওয়ায় ক্রমশ সন্ন্যাসীদের আচারব্যবহার ও কার্যকলাপে অবক্ষয় লক্ষিত হতে থাকে। দুর্নীতি ও চারিত্রিক অধঃপতনের শিকার হয়ে সন্ন্যাসী বা ভিক্ষুদের কেউ কেউ সামাজিক মর্যাদা হারিয়ে ফেলে। সাধারণ মানুষ নতুন এক সমুন্নত আদর্শের সন্ধান পেয়ে বৌদ্ধ ধর্মকে আত্মস্থ করতে চেয়েছিল। কিন্তু মঠ-মন্দিরের এই অবক্ষয় দেখে তারা আশাহত হয়। আবার তারা নতুন কোনো ধর্মীয় বা দার্শনিক আদর্শের সন্ধান করতে থাকে, যা তাদের আত্মিক অবক্ষয়ের অন্ধকার থেকে মুক্ত করে মুক্তির প্রশস্ত পথ বাতলে দেবে। জেন, সাধারণ জাপানিদের কাছে সেই আত্মদীপ প্রজ্বলনের বার্তা বহন করে নিয়ে যায়।
তথ্যঋণ :
A Guide to Japanese Buddhism Published by Japan Buddhist Fedaration, 2004.
A New History of Shinto by John Been and Mark T. Ueen ; Wiley –Blackwell 2010.
Studies in Japanese Buddhism by A. K. Reischuer ; The Macmillan Company 1917.
A Brief History of Japan : Samurai, Shogun and Zen by : Tuttle Publication 2017.
A History of Japan by K. G. Henshall : Palgrave macmillan 1999.
ছবি : বিধান দেব
লেখক পরিচিতি
জন্ম ১৫ নভেম্বর ১৯৭৬, দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার ডায়মন্ড হারবার মহকুমার ভগবানপুর (হরিণডাঙা) গ্রামে। বাংলা ভাষা-সাহিত্যের শিক্ষক। কবিতা লেখার সূত্রে লেখালেখির জগতে প্রবেশ। লেখেন প্রবন্ধ ও গল্প ।
প্রকাশিত পুস্তক :
কাব্য পুস্তক : আমার আত্মার পায়ে বাঁধার ঘুঙুর, যাপনচিত্র, ২০১৯; সরলতা ক্রমশ গায়েব হইতেছে, সাহিত্যের বেলাভূমি ২০২০
প্রবন্ধ পুস্তক : জেন : রিপুতাড়িত মানবের নিকট সুসমাচার ও অন্যান্য প্রবন্ধ, কলিকাতা লেটার প্রেস, ২০১৯
সম্পাদিত পত্রিকা : পাড়ি
পাঠকের হাট ।। অরুণ পাঠক
প্রান্তরের আলোকচিত্রী
আমাদের প্রতিদিনের কথারা যখন ক্রমশ ভোঁতা হতে হতে তাদের তীক্ষ্ণতা হারিয়ে ফেলে, যখন শব্দের উচ্চারণে আর কোনও ম্যাজিক থাকে না কিংবা বলা কথাগুলো কেবলই লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়, তখন, তখনই খুঁজে নিতে হয় কথার নতুন কোনও আঙ্গিক। সেই নতুন আঙ্গিকের কথা কবিরাই আবিষ্কার করেন। যুগে যুগে, প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে। শিল্পের যে কোনও মাধ্যমকেই এই নতুন কথা বলার জন্য প্রস্তুত থাকতে হয়। কিন্তু কবির মাধ্যম যেহেতু মানুষেরই মুখের ভাষা তাই তার ক্ষেত্রে কাজটা আরও দুরূহ। সেই সঙ্গে একজন কবিকে এ সিদ্ধান্তও নিতে হয় যে জনগনেশের (অধিকাংশ সাধারণ পাঠকের) ভাবনা তরঙ্গের স্রোতে মিশে যায় এমন ভাষায় কবিতা লিখবেন নাকি তার নিজের ভাবনাতরঙ্গে কথা বলবেন এবং প্রতীক্ষা করবেন সারা জীবন নিজ ভাবনা তরঙ্গের সমান ভাবনাতরঙ্গে বাস করা পাঠকদের জন্য। বলা বাহুল্য এই দু ধরনের কবিই আছেন প্রত্যেক দেশের প্রত্যেক ভাষায়। আমি মূলত শেষোক্ত কবিদেরই পছন্দ করি। কারণ তারা পাঠকদের কাছে যান না। বরং পাঠকদের নিজের কাছে নিয়ে আসেন। যারা সাধারণ পাঠক সাধারণ পাঠক বলে চিৎকার করেন, সামাজিক দায়বদ্ধতার ফর্দ বানান তাদের বলব সাধারণকে অসাধারণ করে তোলাটাই কবির কাজ। আর কবি যখন নিজেই মূর্খ , কবি যখন নিজেই সামাজিক নন তখন কবির আবার সামাজিক দায়বদ্ধতা কী? কবি বরং সামাজিক ভাষ্যের পুনর্নবীকরণ করুন। নতুন ভাষাস্কেলে মানুষের অভ্যস্ত বেঁচে থাকাকে বদলে দিন। মানুষ নতুন হয়ে উঠুক বেঁচে থাকায়, বিশ্বাসে। প্রগতিশীল পৃথিবীর পরিবর্তিত মুখ মানেই নতুন কবিতা। যেমন—
'এক অরণ্য সন্ধ্যায় ঘুমন্ত নদীর বুকে চাঁদ নির্ভার ভাসে। দৃশ্য কুড়িয়ে ফেরে প্রান্তরের আলোকচিত্রী। মহাযজ্ঞের সমারোহে নৌকাযোনিতে ঢুকে যায় মহাজাগতিক শিশ্ন।'
কবিতাটির নাম 'প্রান্তরের আলোকচিত্রী'। কবি শীলা বিশ্বাস। শীলার সঙ্গে আমার প্রথম আলাপ হয় কোনও এক বকখালি কবিতা উৎসবে। প্রথম সাক্ষাতেই তার সাবলীল হাসি আর উপহার ' নেবুলা মেঘের মান্দাসে'। কবি হিসেবে সে আমারই সমসাময়িক। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় তার সাম্প্রতিক কবিতা আমার বোধিনন্দনকে প্রাণিত করেছে। এবার কাকদ্বীপে 'গদ্যপদ্যপ্রবন্ধ'-র অনুষ্ঠানে পেলাম উপহার 'নির্বাচিত শূন্য'। আর তাতেই এই মহাজাগতিক বিস্ময়। হ্যাঁ মহাজাগতিক বিস্ময় শুধু মহাকাশেই সংঘটিত হয় তা নয়। আমাদের ভেতরেও হয়। কারণ আমরা মহাকাশজাতক। শীলার কবিতায় পরিচিত শব্দ তার সংস্থান বদলে ফেলে এক অপরিচিত আলোর বুদ্বুদ মেখে আসে। মনে হয় যেন সদ্য জন্মালো। আর কবি হিসেবে শীলা খুবই নিরপেক্ষ। ওই প্রান্তরের আলোকচিত্রী। 'নির্বাচিত শূন্য'-র আয়োজন বেশ চমকপ্রদ। তিনভাগে বিভক্ত এর সূচির উপনামবিভাগগুলি হল— মিয়াঁওনামা, সম্পাদ্য ও স্বল্প দৈর্ঘ্যের ছায়াছবি। আবেগরহিত, নিরুদ্বেগ, সংযমী এবং আত্মবিশ্বাসী শীলা এই কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতায় লিখেছেন —
'কিছুদিন বাড়িতে থাকলে টের পাই আমার মনের মধ্যে অনেক বিড়াল বাস করে। বিড়ালের মধ্যে অনেক আমি। ফিরে এসে ঘরে ঢুকতেই দেখামাত্র আমার কোলে লাফ দিয়ে উঠবে কিনা তখন সেটাই বড় প্রশ্ন। কিছু কিছু প্রশ্ন আর উত্তর গা জড়াজড়ি করে থাকে। বিড়াল আদরের পর জামা আর লোমের সম্পর্কের মত অবিচ্ছেদ্য জেদী একগুঁয়ে। অন্তর্মহলের দৃষ্টি বিশ্বদর্শন বুঝে গেলে মাত্র সাতদিনেই বদলে যেতে পারে অভ্যাস। অভ্যাস বদলে দিতে পারে শ্রেণী। এরকম সময়েই তো জন্মবদলের খেলায় মেতে ওঠে একঘর নির্দোষ প্রাণী। অনায়াসে বদল করে নেয় ভূমিকা।'
কবিতাটির নাম 'বিড়াল জন্মের ভূমিকা'। এখানে 'অন্তর্মহলের দৃষ্টি', 'বিশ্বদর্শন' আর অভ্যাস বদলের যে ইঙ্গিত দিলেন শীলা সেটি একপ্রকার তার জীবন দর্শনও। সেই দর্শনে মানুষ থেকে মনুষ্যেতর প্রাণী , আপাততুচ্ছতা থেকে বিশ্বদর্শনের জাগতিকতা সহজ হয়ে যায়। আর সেখানেই শীলা নিজেরও ভূমিকা বদল করেন। দীর্ঘ কাল ধরে নানান সাংসারিক খুটিনাটি আর মেয়েজন্মের দুর্ভাগ্য নিয়ে মধুর-কষায় প্রেম ও বিপ্লবের কবিতা পড়তে পড়তে ক্লান্ত আমি শীলার এই দুঃসাহসিক অভ্যাস বদলের তড়িৎচাবুকের ঘা খেয়ে সোজা হয়ে বসলাম। আর আরও আরও শান্ত হলাম এই আশ্বাসে যে শীলা লিখেছেন—
'আমার শরীর পুনরায় প্রস্তর হইতে সজীব হইয়া উঠিল তখনই যখন এ যাবৎ চুপ করিয়া থাকা মার্জারটি মুখ ঘুরাইয়া স্তব্ধতাপূর্বক আমার কোলে আসিয়া বসিল। আমি তাহার মাথায় হাত রাখিতেই প্রিয় মার্জার মিউ শব্দে বুঝাইয়া দিল তাহাকে দীর্ঘ সময় অভুক্ত রাখিয়াছি। তাহার আহারের বন্দোবস্ত করিয়া ফিরিয়া আসলাম লেখায়। পাঠ্যক্রমের বাহিরে চোখ রাখিলে হৃদয়-তন্তুগুলি অধিক জাগরূক হয়। শব্দটা কেবল শব্দরূপ পায় তাহা নহে স্রষ্টা হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া নিজের অস্তিত্ব প্রমাণ দেয়। নিজের অস্তিত্ব ও স্বাক্ষর রাখিবার সুদীর্ঘ প্রয়াসের কোনও শর্টকাট থাকিতে পারে না। নিরন্তর আদান প্রদান তাহার চলনের একটি অঙ্গ।'
(একটি মার্জার ও ক্ষুধা—৩)
ভেঙে ফেলা অভ্যাসের এমন এক দ্বৈত কথন কবি যখন আত্মস্থ করেন তখন তার প্রতি একটা আস্থা তৈরী হয়।কারণ তিনি জানিয়ে দিচ্ছেন—'নিজের অস্তিত্ব ও স্বাক্ষর রাখিবার সুদীর্ঘ প্রয়াসের কোনও শর্টকাট থাকিতে পারে না।' আহাহা। আজকাল প্রতিমুহূর্তেই আমরা যখন নিগোসিয়েসানে ব্যস্ত তখন এই পর্যন্ত পড়ে নিরালায় নিদ্রা দেওয়া যায়। আসলে শীলার কবিতা যতখানি মহাজাগতিকতার কথা বলে তার থেকেও বেশি বলে বহুজাগতিকতার কথা। অর্থাৎ একই চেতনার মধ্যে একাধিক চেতনার ক্যালাইডোস্কোপ। কারণ একই জীবনের বহুময়তা আর রূপভেদ—
'মেঘের কোমল রূপভেদগুলির মধ্যে দেখি প্রত্নজিজ্ঞাসাময় করুণ মুখ। সম্পর্কের মধ্যেকার নন্দনতত্ত্বগুলিতে চোরা উজান ভাটায় ফুটে থাকে ক্যান্ডিফ্লস। নখে নখে বজ্র বিদ্যুৎ নাকি তরোয়াল। খোলা চুলে আঙুল চালিয়ে রবাহূত বিষাদ। জলের আলপনায় কে করে ঈশ্বরের আবাহন! কারা নেয় ছেঁড়া পুঁজির কিংবদন্তী সাক্ষাৎকার? কুশণ্ডিকা জ্বেলে রাখে সামান্য মোমদান। ত্রিকাল হাতের তালুর এক সমতলে এলে বুঝি বুকের গভীরেই মেঘেদের নিদারুণ সহবাস।'
(কোমল রূপভেদগুলি)
'রতিছড়ায় উঠোন লেপে ক্ষেত্র করেছি প্রস্তুত। বিভাজিকা বেয়ে নামে অশ্বকেশর। বৃন্তচ্যুত ফুল হস্তিনী রাগে উল্কি সনেট গাঁথে। চাঁদ ঘুমে গেলে তার নিশিআঁখি পল্লব একাকার নাভিকুণ্ডলিনী। মৎসগন্ধার জল ডুব ডুব দ্বাররক্ষী নন্দী কী করে জানে! রাত্রি বুঝি আড়াল দিলো জোছনা কোলে টেনে। আড়ালের ফাঁকে প্রহরী তবুও প্রহর গোনে। কলমের ডগা লাঙলের ফলা শাস্ত্রে সূত্র লেখে।'
(বৃন্তচ্যুত ফুল হস্তিনী রাগে—ই)
রতিমিলনের কথাই এখানে বলা হয়েছে। তবু তার ধার ও ভার আলাদা। এমন শাস্ত্রীয় অঙ্গরাগ যার জন্য কবি ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছেন তার নবাগত অভিজ্ঞতা নতুন শাস্ত্র সূত্র লিখছে।
কবিতা আসলে সেই কৌতুক আর মায়ার প্রভঞ্জন যা জেগে উঠলেই বিমোহিত করতে থাকে আমাদের তার অশেষ করুণায়। আর সেই করুণায় স্নাত হতে আমাদের চাই গতি। এই গতি নানান অভ্যস্ততার বাইরের এক সংবেদন। চিত্রশিল্পী চিত্রনিভা চৌধুরী তাঁর স্মৃতিকথা-য় লিখেছেন —
'অতৃপ্তি আর অসন্তোষ থাক জীবন জোড়া, থাক নিবিড় নৈরাশ্য আর অসীম কালের বিরহ বেদনা, থাক অনন্ত-লাভের প্রবল ব্যাকুলতা— এরা তীর্থযাত্রার পাথেয়, কোথায় পৌঁছিবে সঠিক জানা নাই। কিন্তু অশান্ত গতি কামনা করি। যে গতি গঙ্গার, যে গতি সৃষ্টি লোকের সেই গতি জীবনের। এই কথাটি জেনেছি— গতিহীনতাই অপমৃত্যু।'
অর্থাৎ, সৃষ্টির গতি জীবনের গতি। জীবনের গতি সৃষ্টির গতি নয়। এই সূক্ষ্মতার অভাবেই আমাদের এত ঢাক, এত কেত্তন। অন্তরালের আবহাওয়া দিয়ে জীবনের আকাশকে সাজানোর অভিপ্রায়ে শীলার কবিতাযাত্রা। তাই প্রকৃতির কাছে আত্মসমর্পণ করে তাকে নিজের আখ্যান করে তোলার অভিধায় বিশ্বাসী তিনি।
'জানালা গলে মেঝেতে পড়ে থাকা রোদ আমাকে পরম কৌতুকে বাজিয়ে নেয়। নদীর সোঁতায় পড়ে আছে প্রেম একলা। শিস দিয়ে জানিয়ে যায় গান্ধর্ব মেঘ। খাদের কিনারে এসে নীচু হয়ে মিশে যায় সবুজমহলে। ধোঁয়া ওঠে নিঃশ্বাসে। চায়ের পেয়ালা আমারই মতো ঘুম জড়ানো চোখে টুং টাং আড়মোড়া ভাঙে। জানালার ফ্রেমে আটকে থাকা দলে দলে মহিষের মতো দূরের পাহাড়ের দিকে চেয়ে আছে নাম না জানা অর্কিড। আমি তাদের নাম দিয়েছি খিলখিল আর কানাকানি। ব্যস্ত-ক্লান্ত শহর তুমি এসে কুড়িয়ে নিও পথের দুপাশে দুখানি বিশ্রামফুল।'
(স্বল্প দৈর্ঘ্যের ছায়াছবি—ঝ)
কোনও কোনও কবির কাছে কবিতা কেবল শব্দ শব্দ খেলা নয়। তার শ্বাস-প্রশ্বাস। শীলা বিশ্বাসের কবিতাও তেমন। তার কবিতা পড়তে পড়তে আমি তার শ্বাস-প্রশ্বাসের নৈঃশব্দ্য কে প্রত্যক্ষ করি। শীলা কথার কাছে অঙ্গাবরণ খোলেন। স্বপ্ন ডানায় মাখেন ল্যাভেন্ডার। তার সন্ধ্যাভাষায় পথ হারাতে হারাতে আমি তাকে খুঁজে পেয়েছি। খুঁজে পেয়েছি তার পাথুরে চার্চ ও হৃদয় ভাষা। যা অবলীলাক্রমে আমাদের হয়ে ওঠে।
নির্বাচিত শূন্য ।। শীলা বিশ্বাস ।। সুতরাং ।। একশো টাকা
শিক্ষক শিক্ষণ ডিগ্রিপ্রাপ্ত। পেশা শিক্ষকতা। এই শতাব্দীর সূচনা (শূন্য) দশকের কবি। কবিতা ও কবিতা বিষয়ক সাহিত্যপত্র 'সাহিত্যের বেলাভূমি ' পত্রিকার সম্পাদক। স্যাক সাহিত্য সম্মাননা, বনানী পুরস্কার, সামসুল হক স্মৃতি পুরস্কার প্রভৃতি একাধিক পুরস্কারে সম্মানিত। কবিতা পড়তে একাধিকবার বাংলাদেশে গিয়েছেন। বাংলাদেশে প্রকাশিত হয়েছে কাব্যগ্রন্থ 'দ্বিতীয় বার একা'। কবিতাই তাঁর প্রথম এবং একমাত্র আশ্রয়।
কবিতা ।। তাজিমুর রহমান
ফেব্রুয়ারির কবিতা
১.
পরজন্ম থাকে এই বিশ্বাস নিয়ে হেঁটে যাওয়া দিন। কবর শব্দের মাধুরী দীক্ষিত করে জরা ও শিল্প
নতুন জন্মের আগেই পার হয়ে যেতে হয় দক্ষিণকোণ
২.
মধ্যমা ঘিরে রেখেছে পাহাড়পুরের নিবিড় আলেয়া হাতের ভেতর মাকড়সার প্রবল প্রলোভন
বাতিঘরে কে যেন শুয়ে রয়েছে তন্দ্রাহীন !
৩.
কুঠার শানিয়ে রাখো দয়াময়,পৃষ্ঠা জুড়ে লেখো আয়ু মুদ্রিত জোছনাও নিরাময়হীন
তবে কি পাষাণপাথর বর্ণপরিচয়ের ডায়রী চিনে নিল!
ছবি : বিধান দেব
তাজিমুর রহমান।জন্ম-২৫ ডিসেম্বর,১৯৭০ -এ দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলার ডায়মন্ড হারবার রেডক্রস হাসপাতালে। বাল্যকাল কেটেছে ‘বাংলা’ নামে গ্রামে। দশক হিসেবে নব্বইয়ের কবি । দীর্ঘদিন 'নৌবত' নামে একটি পত্রিকা সম্পাদনা করে চলেছেন। লিখেছেন দেশ -বিদেশের উল্লেখযোগ্য বহু পত্র-পত্রিকায়। গ্রিক ভাষায় অনুবাদ হয়েছে তাঁর কবিতা।
কবিতা ।। অনির্বাণ দাশ
সেদিন
প্রথম জন্মদিনে বোধহয়
বাবা আমায় সন্ধ্যেবেলা কোলে নিয়ে আকাশের তারা কুড়িয়ে আনছিলেন
সাতটি দিনের শেষে
নিজেই তারাদের দেশে গেলেন চলে
সেদিন
একুশের জন্মদিনের ভোরে
তার ঠোঁট মিশে গেল ঠোঁটে
বলে গেল শরীরই শ্রেষ্ঠ উপহার
আর ফিরে এলো না কখনও
সেদিন
অফিস থেকে ফিরেছি
বউ বল্লে ওঘরে ঢুকোনা
সেই ঘরে
রাত্তিরে কেক কাটা হলো
বেলুন ফেটে ছড়ালো চকোলেট
হাতে দিলে কবিতার বই
দুপুরে সব কাজ সেরে
অ্যাকলা সাইকেলে বাজারে গেছিল
মধ্যরাতে পদ্যখাতায় এসব লিখি চুপিচুপি
কেননা মরণের পানে এককদম বাড়ালাম পা
ছবি : বিধান দেব
জন্ম ১৯৭৬।
দু'দশক যাবৎ বাংলা ভাষা-সাহিত্যের শিক্ষকতা। কবিতাবির্ভাব শূন্য দশকে। বহু কবিতা 'শুধু বিঘে দুই', 'ক্লেদজ কুসুম', 'একদিন'-এর 'নব পত্রিকা' সহ বহু পত্র-পত্রিকায়, 'বাক্'-সহ অন্যান্য ব্লগজিনে, স্বকৃত স্বহস্তাক্ষরে কবিতার প্যামফ্লেট প্রকাশিত। কিছু আঞ্চলিক কবিতা-সংগঠন থেকে পুরষ্কার লাভ। সম্পাদনা - 'আবৃত্তিলোক','চেতনা'।
দুটি কবিতা ।। শুভ পাত্র
দুটি কবিতা ।। শর্বরী চৌধুরী
খাঁচা
গুচ্ছ কবিতা ।। সৌমিত বসু
মায়া বৌ-১৩৩
এসো অন্ধকার লিখি। যে অন্ধকারে পরস্পরের মুখ দেখা যায়। যে অন্ধকার এতোকাল জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আমাদের প্রশ্রয় দিয়ে এসেছে, পাতাকুড়ানীর ঢঙে সাইকেলে বয়ে এনেছে সবুজ সন্ধ্যাটিকে, পেটের ভেতরের চাপচাপ অন্ধকার কথা টেবিলের ওপর চশমার মত শুইয়ে রেখেছে বালির চড়ায়। এসো দু-হাতে অন্ধকার মাখি, হাত ধুয়ে ধুয়ে কালো করে তুলি নিজেদের বেসিনের রং। ঠোঁটের ওপর জড়ো হোক মাছের চোখের মতো অন্ধকার, নাকছাবি ভেঙে বেরোনো অন্ধকার, আলপথ ধ'রে তোমার একলা হেঁটে যাওয়া অন্ধকার। এসো বন্ধু, মুখোমুখি বসে আজ আলগোছে লিখে রাখি আমাদের জড়ো করা পাথরকুচি অন্ধকার।
ছাই
ডাকছি । আর ডাকগুলো বাতাস লেগে একটু একটু করে ফিতে হয়ে যাচ্ছে । উড়ছে ঘুড়ির মতো।এক হাত বাঁধা । অন্যহাতে একবার মাটি একবার আকাশ । একবার বাবা একবার ভাই । কুলকুচো করে ছিটিয়ে দেওয়া জলে ভেসে উঠছে অবিকল তার মুখ , রামধনুর মতো নিরপরাধ।একটি দোলনা যেন ক্রমাগত ঘুরে বেড়াচ্ছে স্মৃতি বরাবর। আর ডাকগুলো ফড়িংএর মতো উড়ে এসে বসছে স্মৃতির ওপরে । একটি শ্মশান হেঁটে চলেছে একলা গ্রামের আলপথ ধরে । সব দেখাই তাহলে একদিন ভুল হয়ে যায় ? সব ভালোবাসার গুঁড়োই একদিন--
সংসার
তোমার ভল্ল আমার বুক ফুঁড়ে বেরিয়ে গেছে
চতুর্দিকে গরম কুমকুম
আমি ক্রমশ নিস্তেজ হয়ে পড়ছি দেখে হেসে উঠছে মানুষজন
ভাবছে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ শেষ হলো
এবার তালুতে আসবে সমস্ত বিধবারা
যারা আমার পাশের চেয়ারে বসতে গিয়ে
হোঁচট খেয়েছে বারবার তারাও খুশি
সর্বোপরি আমি নেই ভেবে যারা রাস্তা ফাঁকা ভেবেছিল তারাও আজ গল্পে গল্পে রাস্তার মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে।সাজিয়ে দিচ্ছে আনন্দময় সন্ধ্যা ,তোমার প্রশংসায়।
আমার তলোয়ার ঠিক তোমার দুটো বুকের মাঝে।রক্ত নয়,থোকা থোকা চেরিফল আর আনন্দ।
জোৎস্না এসে পেতে দিয়েছে উঠোন তাতে গায়ে গা লাগিয়ে বসে আছে তোমার স্থাবকেরা।
সমস্ত নিন্দামুখ দিয়ে বেরিয়ে আসছে টার্কিস ব্লু রঙের স্রোত
সেই রং দুহাতে মেখে কারা যেন নেমে যাচ্ছে খাঁড়ির গভীরে।তুমি মৃত্যুঘুমে।
গুটিয়ে রাখা পর্দা কার্টেন কল এর আগেই টানটান হয়ে উঠছে
যেন দুটো মৃত মানুষ উঠে বসে জড়িয়ে ধরছে পরস্পর।আর
হাততালি দেওয়া হাতগুলো ক্রমশ নীল হয়ে আসছে।
অন্ধকারে বসে হঠাৎ ফুটোর ভেতর দিয়ে চাঁদ দেখে প্রথমবার নিজেদের বোকা বলে আবিষ্কার করছে মানুষজন।
ঋতুস্নান
কতদূর যেতে পারো তুমি?কতদূর?যেদিন জোৎস্না ও সমুদ্রের শঙ্খ লাগবে, তুমি জড়িয়ে ধরবে আমায় লেজ দিয়ে পাকে পাকে, মেঘ ভেবে পাবেনা কোথায় জল ঝরাতে হয়, ঠিক কোথায় থামাতে হয় আবর্তনের সেতুবন্ধন।তুমি রোদ হয়ে ওঠার আগেই আমি কপাল থেকে সরিয়ে নেবো সমস্ত নৌকো।সমস্ত জলপ্রপাত ঈর্ষা হয়ে তাকিয়ে থাকবে আমাদের বরফশীতল দেহদুটোর দিকে।তখন শৃঙ্গারের রঙ বাদামি, যৌনতার রঙ আদিম তামাটে।আমরা হাত ঘষে ঘষে বের করে আনবো পালঙ্কের নিচে লুকিয়ে রাখা বাক্স তোরঙ্গ যার ভাঁজে ভাঁজে গোপনতার কারুলিপি।তোমার ঠোঁট তখন আর কোনো ঠোঁট নয়, যেন উঠোন জুড়ে ধান খুঁটে বেড়াচ্ছে একটা চড়াই,আমার দেহ থেকে সমস্ত শুষে নেওয়া ঘাম তুমি ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিচ্ছ রোদের বিপরীতে আর তার ভেতর থেকে উঠে আসছে বিচিত্র রঙের ওলট পালট।দুটো দেহ যেন পিষে যাচ্ছে পোরসেলিনের বাটিতে।সবাইকে অবাক করে জন্ম নিচ্ছে আমাদের মেয়ে, তরল আগুনে ভর দিয়ে উঠে বসছেন ঋষ্যশৃঙ্গ মুনি।একটি মুহূর্ত জন্ম নিচ্ছে শেষ হবার আগেই।
ছবি : বিধান দেব
সৌমিত বসু ।। জন্ম : ২৬ নভেম্বর ১৯৬৩ দক্ষিণ ২৪ পরগনার কাকদ্বীপে। পেশা: শিক্ষকতা। গত শতাব্দীর আশির দশকের সুপরিচিত কবি। বাংলাদেশেও সমান জনপ্রিয়। পঁচিশটির বেশি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত। পেয়েছেন একাধিক পুরস্কার।গুচ্ছ কবিতা ।। প্রসূন মজুমদার
কাম
মনুষ্য - সংজ্ঞায় ব্রহ্ম প্রাণপূর্ণ বহ্বারম্ভ
যখনই লিখেছে ভাবীকালে
দ্রিমিকি দ্রিমিকি ধা ধা তখনই অপরা ধাঁধা
প্রজ্ঞালোকে যজ্ঞালোক জ্বালে।
পাক লাগল যন্ত্রঅঙ্গে তোমার ও নাভির সঙ্গে
রতিকলা আরতি তখনই
দুর্মোহের দ্বন্দ্বদীর্ণ মণিকুম্ভ অবতীর্ণ
ভলকে ঝলকে ওঠে ধ্বনি।
ব্রহ্মধন্দ ধ্বনিধর্ম সংজ্ঞায় অনঙ্গ কর্ম
অশ্বপৃষ্ঠে সওয়ারি সরল
ভস্মীভূত নিজে অগ্নি দগ্ধ করে অর্থলগ্নি
নিরর্থের নর্মযোনিজল।
জলজন্ম সার্থকতা প্রজ্ঞাপথে গূহ্যকথা
কামতত্ত্ব হ্লাদিনীনন্দন
তত্ত্বহীনা অর্থরতি নীরবে তোমারই প্রতি
অপরূপা রূপার্থ বন্দন।
অত:পর এই গূহ্যক্রিয়া নিষ্কামের সকাম স্পৃহা
দ্বন্দ্বে দোলে দ্যুলোকের দ্যুতি
কূপনিম্নে চুপশব্দ স্তব্ধতার ধ্বনিলব্ধ
অগ্নিমধ্যে অগ্নিরই বিভূতি।
চক্রচলন
অশথ গাছের মাথার ওপর চক্রচলন হাওয়া
আমার চক্র ধরেই যাওয়া
গোপন চক্র ধরেই যাওয়া
দুইটি পাতার দুইদিকে টান যেমন দোলায় আলো
আমার দুই বিপরীত তুলির আঁচড়
সশব্দে চমকালো
তবে দ্বন্দ্বে মধুর হবে ?
হোক বা না হোক বৃত্ত অশেষ উদ্ভবে উদ্ভবে
হাওয়ার দোলায় দোলায়
সময় ভোলায় উৎসাহবৈভবে।
প্রখর সময়হীনা অমায়
তোমায় স্পর্শ করুক স্পর্শকাতর
নিবিড় পরিক্রমায়।
জাগরণ
অর্থহীনা সন্ধ্যা আসে। শান্ত হয় স্নায়ু।
মন্দমধু বয় শব্দ। ভাসে পঞ্চবায়ু।
ভাসতে ভাসতে রন্ধ্রপথে রক্তে মিশে যেতে
চন্দ্রদোষ জাগে জন্মে মৃত্যু খেতে খেতে।
আরও নিম্নে গাঢ় স্বপ্ন তারও নিম্নে যোনি
ব্যাঘ্রিনীর তুল্য যেন অথবা সে ফণী।
মনসা মানসকন্যা জন্ম নেয় রেতে
সেই রেতঃ খায় ব্রহ্ম। জেগে ওঠে প্রেতে।
প্রেতিনী আঁচড় চলে। নিশ্চুপের ডাকে
পরতে পরতে শ্বাসে শূন্য লেগে থাকে।
বন্ধ থেকে মুক্তি ঝরে। মুক্তি থেকে বুধ
দেহভাণ্ডে চন্দ্র ঝরে যেন ধান্যদুধ।
এমত চলার পথে শনি আসে যায়
আঁচড়ে কামড়ে জাগে। আমাকে জাগায়।
আয়না
গাছ কি কেবল একলা থাকে?
গাছ ফোটে না অন্য ফুলে?
প্রশ্ন জাগে তীক্ষ্ণ সময়
হুল ফোটালে মর্মমূলে।
চুপ করে বয় একলা হাওয়া
কেউ কি তাকে বুঝতে পারে?
রেণু কেবল বাহন বানায়
পরক্ষণেই আছড়ে মারে।
হাওয়া কী পায়? কেবল যাওয়া
আর কিছু নয়? দুর্নামও তো
অন্যভাবে বইলে নাকি
অন্যরকম ফুল ফোটাত!
গাছ কী ভীষণ একলা থাকে!
রেণুর হাওয়াও হারিয়ে গেলে।
মুহূর্তকাল ঝলসে দেবেই
আয়নাবাড়ির খবর পেলে।
ছবি : বিধান দেব
পরিচিতি : জন্ম - ২০ শে মার্চ, ১৯৭৮ পেশা - বিদ্যালয় শিক্ষকতা পূর্বপ্রকাশিত কবিতাপ্রচেষ্টার সংকলগ্রন্থ। ১) অসুখ ও আরোগ্য ( সপ্তর্ষি) ২) অধরে গোখুরদন্ত ( সপ্তর্ষি) ৩ রাত্রিচর বুনোচাঁদ ( রাবণ) ৪) নিস্ফলতা প্রিয় ফুল ( রাবণ) প্রবন্ধের বই - ১) অপরাপর কবিতাসফর ( দি সী বুক এজেন্সি) ২) বাংলা কবিতার জয়, শংসা ও সংশয় ( ক্রৌঞ্চদ্বীপ) রম্যরচনা - কবিসঙ্গে এই বঙ্গে ( শব্দযান)
গুচ্ছ কবিতা ।। শান্তনু পাত্র
শরীরে দ্যাখো অনন্ত আকাশ
স্পন্দন
শাম্ভবী মুদ্রায় স্থির দৃষ্টি রাখি ভ্রূসন্ধির মাঝে,
রিল-ভিডিওর মতো দৃশ্যপট চলে যায় দ্রুত...
আকাশগঙ্গার ওই নীল ছায়াপথে ঢেউ ওঠে
শূন্যতার বুক ফেটে ওড়ে মনখারাপের তুলো।
সময় হলেই জানি, গ্রন্থির বন্ধন যত ছিন্ন হবে ধীরে
নুনের পুতুল আমি, মিশে যাব দুরূহ সমুদ্রে।
তৃষিত পাখির মতো ডানা মেলে পঞ্চভূত এসে
তীক্ষ্ণ চঞ্চু দিয়ে তুলে নেবে ঠিক, অবশিষ্ট আলো।
যত্ন করে আকাঙ্ক্ষার মায়া-দীপ জ্বেলে
তবুও কেন যে বড় বাঁচতে ইচ্ছে করে?
হলুদ শাড়িটি পরে যখন প্রবেশ করো তুমি,
হেঁটে যাও আনমনে, উজ্জ্বল স্মৃতির করিডরে...
ইউফোরিয়া
আসবে বলেছিলে, পেরিয়ে যায় দিন,
রয়েছি কতকাল অপেক্ষায়...
আকাশে চোখ মেলে, তোমাকে খুঁজে মরে
অল্প বিস্তর সবাই প্রায়।
বিষাদ বাসা বাঁধে মনের অগোচরে
মাঘের শীত তবু, তপ্ত প্রাণ...
একলা হয়ে যাই, তোমাকে যত লিখি,
রাত্রি বেড়ে চলে, ডিপ্রেশান।
পেশার দাবি আছে, মনকে ভালো রেখে
চরম হতে হবে ইউফোরিক...
তবুও কেন আমি লেখায় হাত দিয়ে
ধাক্কা খেয়ে বলি― স্থির তড়িৎ!
কলম ছেড়ে দিয়ে আবার ধরে নিই
এ নেশা পুরোপুরি খতরনাক।
ভেবেই চলি শুধু, বিপথে ঘোরা ফেরা?
রাস্তা এক আছে, চক্রপাক।
দিব্যি কেটে বলি, কবিতা ছুঁয়ে বলি
তুমিই দিয়ে গেছ হাতের যশ।
জেনেই গেছি কবে, নিখুঁত সার্জারি
আসলে সেও এক কাব্যরস।
দেনা
সংসারী হতে পেরেছি কি আমি? সন্ন্যাসী! তাও নয়...
মাঝখানে শুধু আয়ুটুকু যেন তিরতিরে এক রেখা।
জীবন! তোমাকে বুঝতে বুঝতে প্রজ্ঞার অপচয়,
দুর্জ্ঞেয় কত তোমার কাব্য ম্যাজিক কালিতে লেখা।
পারবে কি তুমি হেঁটে যেতে ওই সময়ের বিপরীতে?
হাওয়া ওঠে জোরে, আল্পনা আঁকে সুবর্ণরেখা চর
স্কুলব্যাগ এক খেলা করে দ্যাখো সোনাঝুরি ধানক্ষেতে...
সম্পদ যত উপচে পড়ছে, তৃপ্ত হৃদয়গড়।
রাস্তা যেটুকু পেরিয়ে এসেছি ফিরবে না কোনওদিন,
তবুও বলছি শোধ করে যাবো তোমার গভীর ঋণ...
ভুলে গেছি শুধু...
ভুলিনি এখনও সেই অনাহার-দিন
ভুলতে পারিনি আমি দুর্ভিক্ষের খিদে
ভুলতে পারিনি শীর্ণ ঠাকুমার মুখ
ভুলিনি ভুলিনি সেই শ্মশানের রাত।
ভুলিনি পশ্চিমি হাওয়া, অকাল বৈশাখী
উড়ে যাওয়া চিলেকোঠা, ডানাভাঙা পাখি
ভোলা কি এতই সোজা কলকাতা যাওয়া...
ভুলিনি কিছুতে আমি জয়েন্ট এন্ট্রান্স।
ভুলতে কি পারা যায় প্রথম মাইনে!
ভুলিনি প্রথম কেনা মায়ের শাড়িটি
ভুলিনি তোমাকে ওগো শালুক পুকুর
ভুলিনি এখনও আমি উচ্ছ্বাস-সাঁতার...
ভুলিনি প্রথম কেনা গিফটের দাম
ভুলে গেছি শুধু, মস্ত প্রেমিক ছিলাম
যে নদীর কাছে আমি...
মনের গোপন থেকে মেঘ উড়ে এসে
নির্দ্বিধায় গুঁড়ো হয়ে মিশেছে বৃষ্টিতে...
বিপদসীমার কাছে জলরাশি এসে
স্রোত হয়ে বয়ে যায় প্রতিটি শিরায়
তোমার উশ্রীর ঢেউ ভাসায় আমাকে...
ভেজা গায়ে হাবুডুবু তীব্র-সন্তরণে
বিজাতীয় স্পর্শ এসে জ্বেলে দেয় আলো।
রোমাঞ্চ সাঁতার শেষে ফিরে গেছি ঘরে
ঝুঁকেছে পশ্চিমে সূর্য কালের নিয়মে
অদৃশ্য আভায় লেখা মৃত্যুর ঠিকানা।
দিন শেষে জল যত বাষ্প হয়ে ওড়ে
ধারাপথে জেগে ওঠে বালির বিছানা
যে নদীর কাছে আমি রোজ রোজ গেছি
তারই শুকনো চরে পুড়তে এসেছি।
দেবীপক্ষ
আশ্বিনের আলো-ধোয়া তোমার পায়ের পাতা―
সে তো,আমার পড়া শ্রেষ্ঠ বিভাব-কবিতা।
পাশ ফিরে,চোখে চোখ রেখে
পরম নিশ্চিন্তে হাত রেখেছি অক্ষরে...
অদ্ভুত পাগল তুমি ! একথা বলেই পা সরিয়ে
দুহাত রাখলে শুধু আমার কপালে।
সাথে সাথে ধূ ধূ প্রান্তরের শূন্য বুকে
জেগে উঠল কাশফুল কিছু,
শরতের মেঘ এল আমার আকাশে।
তোমার ভ্রুভঙ্গি ইশারায় দেখি, বরাভয় মুদ্রা...
আজন্ম বন্ধনহীন, নিরাসক্ত আমি।
তবুও দুদিক থেকে লতার বাঁধন
আর আগমনী-স্রোত এসে আষ্টেপৃষ্ঠে
দ্রুত বেঁধে ফেলেছে আমাকে।
চশমা
'আপনি তো চোখের ডাক্তার
রোজ কত মানুষের দু'চোখ দ্যাখেন!
দেখব কি আজ একটু আপনার চোখ?'
এই বলে তাকিয়েছে অচেনা মেয়েটি
নামিয়ে নিয়েছি চোখ, শিওর হয়েছি
সুশিক্ষা পায়নি এই বেয়াদপ মেয়ে।
এগারো বছর আগে এ ঘটনা চুঁচুড়ার
জেলা হাসপাতালে,
গঙ্গার অতলে সেই ছবি....
মিলিয়ে যায়নি স্মৃতি তাড়া করে আজও
গভীর ঘুমের মাঝে কার যে আঙুল
খুলে দেয় চশমা আমার, দুচোখের
পাতা টেনে কী যে দ্যাখে বুঝতে পারি না।
মোবাইলে কাব্যগাথা, রাত বেড়ে চলে
ঘুম ভাঙে জুঁইয়ের সুগন্ধে, খুঁজে দেখি...
সযত্নে চশমা রাখা বালিশের ধারে,
বাইরে অঝোরে বৃষ্টি, আবছা সকাল
মেঘলা দিনের হাওয়া ঘোরে চক্রাকারে...
স্বাস্থ্য-শ্রমিক
বুকের ভেতরে জমে দীর্ঘশ্বাস কত!
ফেসশিল্ড ভিজে যায় দু চোখের জলে...
কে তার খবর রাখে বলো!
পড়ন্ত বিকেলে ঠাণ্ডা ভাতের থালায়
মাছিও বসে না, তবু খেয়ে নিতে হয়।
স্পিরিটের গন্ধমাখা নিদ্রাহীন রাত―
একান্তে বাজিয়ে চলে গহীণ শূন্যতা।
কেউ বোঝে, কেউ বা বোঝে না অতশত।
গাউনের নিচে জমা রক্ত আর ঘাম
নিভৃতে সঞ্চিত হয় কালের গহ্বরে...
পথ পাঁচালি
ইচ্ছে হয় শিলাবতীর পাড়ে ওই শুনশান আশ্রমে গিয়ে শাকান্ন খেয়ে সারাদিন মৃদঙ্গ পেটাই, কিম্বা ফেকোঘাটের আঁধারজঙ্গলে কুঁড়েঘর বেঁধে থাকি, নির্বস্ত্র হয়ে যোগাভ্যাস করি। ইচ্ছে হয় মোষের মতো নাকটুকু বার করে মগ্ন-মৈনাক হয়ে রায়ডাকের টলটলে জলে ডুবে থাকি অনন্তকাল...
বড়ো ইচ্ছে করে― প্রতাপ পাহাড়ির মতো সাইকেলে সবজির পশরা সাজিয়ে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ঘুরি।
ইচ্ছে তো হয়ই, সনাতন মাহারের মতো কল্কে নিয়ে বসে পড়ি অশ্বত্থ গাছের শিকড়ে, দম নিয়ে পাড়ি দিই সপ্তর্ষিমণ্ডলে...
অবাক হই। সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে অবচেতন মনও কেমন সেয়ানা হয়ে উঠেছে। বেছে বেছে এমন সব জায়গায় ঘুর ঘুর করছে যেখানে আউটডোরের ভিড় নেই, জনসমাগম নেই,ভাইরাস নেই, মৃত্যুর গন্ধ নেই...
পাতালের ডায়েরি
কেন যে ঘুরে ফিরে, অকাল মহামারী
স্তব্ধ করে দেয় জনজীবন।
শ্মশানে ধোঁয়া ওড়ে, মানুষ কেঁদে ওঠে
দুঃখ রোগ শোক চিরন্তন।
ক্ষুদ্র ভাইরাস শক্তি কী-অসীম
দাপায় অলিগলি দুনিয়াময়,
বিষের কণাটুকু আঘাত হেনে যায়,
আটকে থাকে ওই নীল সময়।
শুদ্ধ বিজ্ঞান দমন করে গেছে
অজানা বীজ আর কতক্ষণ!
কলেরা মুছে গেছে, প্লেগও পালিয়েছে
তুমিও হাওয়া হবে ওমিক্রন।
সময় নেই আর, আমাকে যেতে হবে
রয়েছে কত রোগী অপেক্ষায়...
যেখানে আকুলতা লাইন দিয়ে আছে
পাখিরা বসে আছে গাছের গায়।
বৃক্ষ হতে আমি পারিনি কিছুতেই
ক্ষুদ্র ছায়াটুকু সঙ্কুলান...
আবছা বাতিঘর জ্বলছে ধিকিধিকি
স্নিগ্ধ আলো দেবো, যদিও ম্লান।
অপারেটিং চোখ
প্রবল শৈত্য, ঘূর্ণি তুলছে ছিন্নভিন্ন হাওয়া...
কেঁপে ওঠে দ্যাখো পারদস্তম্ভ, এপিডেমিকের থাবা।
দুর্দিনে যত কবিতারা সব, ও.টি'র বাইরে থাকে,
আঁটোসাঁটো রুল, প্রবেশ নিষেধ ডেটলের ঘ্রাণ শুধু...
বিকেল ঘনায়, ছুরির ডগায় স্নিগ্ধ রক্ত ফোঁটা
আঁধার সরিয়ে চোখের ভেতর দীপ জ্বেলে দেবে বলে―
পর্ব মাত্রা উপমার দল, সার্জারি শেষ করে
নিভৃতে দ্যাখো, মিশে যায় ওই কবির অশ্রুজলে।
অনিকেত
কালো মেঘ এসে জমেছে আকাশে, ফিরে যায় ঘরে পায়রার দল
স্তব্ধ বাতাসে কবিতার কুচি স্থির হয়ে ভাসে লক্ষ্যে অটল।
সুযোগ পেলেই প্রাণঘাতী বাজ নিমেষেই নেমে বিষটুকু ঢালে
মেঘের ভেতরে বিদ্যুৎ যত, ঘন হয় ক্রমে শ্রাবণ-বিকেলে।
ফিরে আসে ঘরে লোকজন যত, অফিসযাত্রী কিম্বা কৃষক
সময়ের সাথে বেড়ে চলে দ্যাখো! নির্মম ওই ঝড়ের দমক
সবাই ফিরেছে, শুধু একজন প্রান্তরে বসে দেখছে আকাশ।
ঘরদোর-হীন আত্মমগ্ন গলায় জড়ানো শব্দের ফাঁস...
জেগে থাকে শুধু আধখানা চাঁদ, আলো টুকু তার ভেজায় কপাল
ফেরার জায়গা হারিয়ে কবেই, বৃষ্টিতে ভেজে
কবি-মহাকাল...
জ্বলন্ত ফানুস
পড়ন্ত বিকেলে এসে কেন তুমি করে দিলে
চরিত্র খারাপ
জানোই তো কত পথ পার করে আমি এক
নিঃসঙ্গ শ্রমণ
ঝোলায় রেখেছি শুধু, চেনা ও অচেনা কত
সম্পর্কের ঢেউ ...
জেনে রাখো, সঙ্গীহীন মানুষের মন বড়ো কবিতা-প্রবণ।
পলাশ কলির ঠোঁটে শরতের ভোরে আমি
দেখেছি শিশির...
চুম্বনে নিয়েছি শুষে মুহূর্তেই লালা-ভেজা
ওষ্ঠের পরাগ
শ্রোণীর রোমের মতো শৌখিন শৈবালে ছাওয়া রহস্য-মোহানা।
পেলব উরুর ঘ্রাণ লেগে আছে জলে জলে
প্রতিটি কণায়...
ডুবে মরি ভেসে মরি, সাঁতার শিখেছি কবে
নিশ্চিত জানি না
এ যেন দাবার দান, শরীরের হাতি ঘোড়া এগোয় পিছোয়
অনিকেত পোড় খাওয়া সেয়ানা শ্রমণ আমি
ভালো ভাবে জানি―
ক্ষণস্থায়ী সব কিছু। বাঁক নিলে নদী, কারু কিছু
এসে যায়?
টেকে না এসব দৃশ্য, এই আছে এই নেই
জ্বলন্ত ফানুস...
থেমে গেলে স্পন্দন, যেভাবে পুড়ে যায় দ্রুত
নির্বস্ত্র মানুষ।
স্পর্শ
মন, সে তো দিশাহীন সমুদ্রের মতো
ওখানে সাঁতার খুব বিপদসঙ্কুল
সিদ্ধান্ত তোমার, তবু কেন এই ভুল?
ভেসে চলে যায় দ্যাখো দুঃখ সুখ ক্ষত...
দিনান্তে বলো তো কেন, স্পর্শ পেতে চাও!
আত্মাতে মেলাবে নাকি জীবনের সুর
সে পথ কন্টকাকীর্ণ, রাস্তা বহুদূর...
হৃদয় অবধ্য, আগে নিজেকে বাঁচাও..
তার চেয়ে ছুঁতে পারো সহজিয়া দেহ
মেঘের পোশাক ছেড়ে দাঁড়ালাম পাশে
শতাব্দীতে ধূমকেতু একবারই আসে
মন ও হৃদয় বড়ো অলৌকিক মোহ।
ছোঁয়াটাই সব নয়, আটকে নিঃশ্বাস―
আমার শরীরে দ্যাখো, অনন্ত আকাশ।
স্মারক লিপি
ঝরতে ঝরতে বর্ষা প্রায় শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে। শালগাছের কচি শাখাতে গজিয়েছে তুলতুলে কত পাতা।
দু'মাইল ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে এক মনকেমন করা হাওয়া। ক্লান্ত বকের দল ঘাড় উঁচিয়ে ভেসে চলেছে বিন্ধ্যাচলের দিকে। পশ্চিম আকাশে ছুটে আসা দুটো বেগুনি রঙের মেঘ ধীরে ধীরে মিশে গিয়ে নিমেষেই ধূসর সরোবর।মাঝখানের জলটুকু যেন সৃষ্টির প্রথম তৃষ্ণা।
সুবর্ণরেখার জলে সুর্য্য ডুব দিতেই মোহবর্ণের সন্ধ্যা এসে এলাকার দখল নিল। অনেকদিন পর ভাঙা মন্দিরে টিমটিমে মাটির প্রদীপ।
বিগ্রহের সামনে জ্বলতে থাকা ধূপ আর অচেনা ফুলের গন্ধে অবশ হয়ে যায় সহস্র বছরের অহং...
স্নেহভরা ভূমির পবিত্র বুকে পা রাখতেও সংকোচ হয়। শুধু এখানকার মাটিটুকু কাগজে মুড়ে কপালে ঠেকিয়ে বুকপকেটে রেখে দেওয়া...
ইনিয়ে বিনিয়ে প্রকাশ নয়, এ'সব দৃশ্য তো শুধু হৃদয়ে ধারণ করে জীবন সার্থক করার..
কৃত্রিম শব্দের চোখে ফুটে ওঠে অপারগ ও অসহায় দৃষ্টি।
আর বুকপকেটে রাখা ওই মাটির গন্ধভরা কাগজটুকু পৃথিবীর সব মেকি কবিতার বিরুদ্ধে এক স্মারকলিপি....
ছবি : বিধান দেব
শান্তনু পাত্র।জন্ম ১৯৭৭ সাল। পেশায় চক্ষু শল্য চিকিৎসক। দুটি কাব্যগ্রন্থ আছে 'স্টেথোর বৃত্তে শিশির পড়ে' ও 'হৃদয়গড়ের হাসপাতাল'গুচ্ছ কবিতা ।। প্রশান্ত হালদার
শৌখিন লোকেরাও পড়ে দেখতে পারেন
৩৩
দুঃখিত মানুষের পাশে কীভাবে বসতে হয় এখনও কি জানি?
কীভাবে হাসব রাগী মুখের সামনে? কীভাবে দাঁড়ালে ঠিকঠাক, তোমার কি জানা আছে?
মৃত্যুশোক কীভাবে প্রকাশ করলে সম্মান থাকবে—তোমাকেও কি ফেলে না ভাবনায়? প্রস্তুতি থাকে না মনে মনে?
এমন নরম ভাবে কখনও শোনোনি বলে আশ্চর্য লাগছে
বদলেও বিপত্তি কমে না
সোজা কথা শোনো
ভান ছাড়া তোমাকেও দেখিনি কখনও
৩৪
যে আশাবাদ নিয়ে বেঁচেছি, পথে তার ভেঙে পড়বার হাজার কারণ, ভেঙেও পড়েছি
গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে, শরীরী লোভে তারপরও টেনে হিঁচড়ে এগিয়েছি, বা নিয়ে গেছো
আকাশ দেখার লোভে ফাঁকা মাঠে
এত এত খাদ্যাদি, বিনোদন, আসঙ্গলিপ্সা
মুহূর্ত ছাড়া রইলো না কিছু আর, এই তো, এটুকুই
৪১
শান্ত প্রকৃতির কোলে চেয়েছি ঘুরতে যেতে
আর দরজা খুললেই যেন কোলাহল, ব্যস্ততাই থাকে
বারান্দা থেকে একটা অপছন্দের দুনিয়া যদি না দেখতে পাই
যদি না গাছের সঙ্গে ইলেকট্রিক খুঁটির এই লড়াইটাই উপভোগ করতে পারি
তবে তো আসল কনফ্লিক্ট থেকেই পালিয়ে বেড়ানো,
কী বলো, স্কলার বান্ধবী?
তাছাড়া এখন তো ইঁট পেতে হাগাও শুনেছি নাপসন্দ তোমাদের
ঘটনাবিহীন জীবন চাইনি বলেই এই লাইভ কনসার্টে দাঁড়িয়ে
হেঁড়ে গলায় চিৎকার করে বলতে চাইছি,
(থামো বোকাচোদা)
শান্ত প্রকৃতির কোল শুধু ঘুরতে যাওয়ার;
বসত গড়ার জন্য রইলো আমার ডিস্টার্বড এরিয়া, বাজারসভ্যতা, জানলার পাশে বেড়ে ওঠা হাজার জানলা
৪২
সম্পর্ক আমাকে মধ্যবিত্ত জীবনের দিকে ঠেলে দিয়েছে
পরিবার রোজ পোঁদ মারে বলেই এক অদ্ভুত বেদনাদায়ক ভালোবাসা ঘাই তোলে বুকের ভিতরে
আর আমি কাছা তুলে ঝাঁপিয়ে পড়ি মধ্যবিত্ত জীবনের ভোগ-বিলাসী অসন্তোষে
"ভালোবাসা ওরফে সম্পর্কের কাছে আমি ঋণী"--বাক্যবন্ধের অর্থ এখন অনেকটা পরিষ্কার
ছাগলের শিনা ছাড়াওতো সময় করে অসময়ের কাছাকাছি হওয়ার এক দারুণ ব্যস্ততা
বাণিজ্যতাড়িত জীবন আর তার গায়ে যেটুকু ফুল ফোটে
পাখি এসে ঠুকরে দেয় কাচের দেওয়ালে,
তারও যে খরচা আছে, বুঝি; ক্লাসরুমে প্রীতিদি যে বুঝিয়েছিলো ‘প্রকৃতির দান’, হাড়ে হাড়ে টের পাই ডাহা মিথ্যে
মিথ্যে ছাড়া কীইবা দেওয়ার আছে স্কুল-কলেজের
হয়ত আছে--
টোটাল ধেবড়ে যাওয়া মধ্যবিত্ত জীবন;
আমি বলি যৌন ফ্রাস্ট্রেশানের উৎসব, জেলাসি-হাব, হিংসের অতলান্ত কাতরানি
তাও কেউ চাইছে না লোনলি মৈথুন-প্লেজার, হারমোনিয়াম ছাড়া গান
মাঝরাতে কিছুটা অস্বস্তি দিয়ে তোমাকে জাগিয়ে রাখা
সকালে পুনরায় রেওয়াজে বোসো, তবলা সঙ্গতে
এখন সময় আমার মধ্যবিত্ত জামাকাপড় খুলে নিজের সঙ্গে বেইমানির, মদে, হরিধ্বণিতে, মন্দির-গাত্রে গুরুপত্নীকে সাপ্টে চুমু খাওয়ার
সম্পর্ক আমাকে জীবনের দিকে ঠেলেছে, আই মিন তুমি যাকে জীবন ভেবেছো
ছবি : বিধান দেব
কবিতা
সম্পাদকের কথা
দ্বিতীয় বর্ষ ।। অষ্টম সংখ্যা ।। মার্চ ২০২২ খুব অসহায় লাগছে এবার। আমাদের ডান পাশে ধস। বায়ে গিরিখাত। মাথায় বোমারু। পায়ে পায়ে হিমানীর ব...
-
চণ্ডী কথা ১ সুরথ সমাধি আখ্যান রাজ্যহারা রাজা সুরথ ঘুরতে ঘুরতে মেধামুনির আশ্রমে এলেন । ভাগ্যহারা বিষণ্ণ রাজা । কিন্তু ফেলে আসা রাজ্য ...
-
দোলায় আছে ছ'পণ কড়ি এক হেমন্তের গোধূলি আর সন্ধ্যার ভেতরে তেমন তো কোনও ফারাক থাকে না। ১৭ নভেম্বর ২০২০ হির্শবার্গের সন্ধ্যা আর কলকা...
-
শমীপোকা ও অর্জুনের বিষাদযোগ লাল, রেকসিনে বাঁধাই ছিল বইটা। ঠাকুরঘরে ঢুকে নকুলদানা খেলে কেউ কিছু বলত না, কিন্তু এই বইটায় হাত দেওয়া যাবে না...