বৃহস্পতিবার, ৩০ ডিসেম্বর, ২০২১

জন্মের আগের মুখ ।। চন্দন মিত্র


 

জন্মের আগের মুখ : জেন তত্ত্ব ও জেন কোয়ানের      অমায়িক ভুবন     

 

 

ত্রয়োদশ পর্ব

শাও-তুং/সোতো সম্প্রদায়  

 

লিয়াংচিয়ে (৮০৭-৮৬৯ খ্রিঃ) জন্মেছিলেন চিনের জেজিয়াং প্রদেশের হুই চি নামক স্থানের এক অভিজাত পরিবারে। বাল্যকালেই তিনি স্থানীয় এক মঠে বৌদ্ধশাস্ত্র অধ্যয়ন শুরু করেন। মঠের অধ্যক্ষ ছিলেন নিতান্ত সাদামাটা একজন বৌদ্ধভিক্ষু। বিভিন্ন শাস্ত্র মুখস্থ করানোই ছিল তাঁর কাজ, কিন্তু ব্যাখ্যা বা বুঝিয়ে দেওয়ার সামর্থ্য তাঁর ছিল না। মহাযান বৌদ্ধ তত্ত্ব তথা চ্যান ঘরানা সম্পর্কে তিনি বিশেষ কিছু জানতেনও না। একদিন তিনি শিক্ষার্থীদের প্রজ্ঞাপারমিতাহৃদয় সূত্র  পড়াচ্ছিলেন। ছেলেরা তাঁর কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে সমস্বরে পাঠ করছিল— 


ধর্ম শূন্য সব শূন্য মহী শূন্যময়।  

না নেয় জনম কেহ নাহি পায় লয়।।

বিশুদ্ধ কিছুই নাই, অশুদ্ধও নাই।

বৃদ্ধি বা ক্ষয় মায়া যা দেখিতে পাই।।

 

এ সকল শূন্যতার নিছক দ্যোতনা।

রূপ অনুভূতি চিন্তা রুচি বা চেতনা।।

নাহি চক্ষু কর্ণ জিহ্বা অথবা নাসিকা।

দেহ নাই মন নাই সবই মরীচিকা ।।


শেষ দুই চরণ উচ্চারণ করার সময় বালক লিয়াংচিয়ে-র মনে অনুসন্ধিৎসা জাগ্রত হল। সে সহসা  দাঁড়িয়ে উঠে আচার্যকে জিজ্ঞাসা করল— আচার্য, এখানে পড়ছি চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা, ত্বক, দেহ, মন কিছুই নেই। কিন্তু বাস্তবে এগুলির সবই তো আমাদের আছে ! তাহলে পুথিতে  এমন মিথ্যা কথা লেখা আছে কেন ?

লিয়াংচিয়ে-র জিজ্ঞাসায় আচার্য বেকায়দায় পড়লেন। তিনি দিনের পর দিন এইসূত্র পড়িয়ে চলেছেন। পড়িয়ে পড়িয়ে মুখস্থ হয়ে গেছে। কিন্তু কখনও ভেবে দেখেননি সূত্রটিতে ঠিক কোন কথা বলতে চাওয়া হয়েছে তাঁর দীর্ঘ ভিক্ষু জীবনে কোনো শিক্ষার্থীই এই ধরণের জিজ্ঞাসা উত্থাপন করে তাঁকে বিড়ম্বনায় ফেলেনি। তিনি স্বীকার করলেন— এর উত্তর আমার জানা নেই। সত্যি কথা বলতে কী, আমি তোমার শিক্ষক হওয়ার যোগ্য নই ! আমার বিশ্বাস এমন কেউ আছেন, যিনি তোমার জিজ্ঞাসার যথার্থ উত্তর দিতে পারবেন। তুমি বরং উ শিয়ে পার্বত্য মঠে যাও। সেখানে গিয়ে আচার্য লিং মো-র সঙ্গে দেখা করো।  


    বাড়ির সঙ্গে সম্পর্ক চুকিয়ে লিয়াংচিয়ে চললেন, উ শিয়ে পর্বত অভিমুখে। মঠে পৌঁছে তিনি মস্তক মুণ্ডন করে হলুদ চীবর ধারণ করে রীতিমতো সন্ন্যাসী হয়ে ওঠেন। আচার্য লিং মো-র কাছে কয়েক বছর থাকার পর তিনি গিয়ে পৌঁছালেন আচার্য বোধিধর্মের স্মৃতি বিজড়িত প্রসিদ্ধ শাওলিন মঠে। তখন তাঁর বয়স একুশ। অতঃপর তিনি মাজু তাওই-র ধর্মসূরি ন্যানচুয়ান পু ইউয়ান        (জাপানি, নানসেন ফুঙান : ৭৪৯- ৮৩৫ খ্রিঃ)-এর সঙ্গে দেখা করতে তাঁর মঠে যান। ন্যানচুয়ান তখন গুরু মাজু-র মৃত্যুবার্ষিকী পালন নিয়ে বেশ ব্যস্ত ছিলেন। কাজের ফাঁকে তিনি শিষ্যদের উদ্দেশে বললেন— আগামীকাল আচার্য মাজুর স্মরণ অনুষ্ঠান, আমি ভাবছি তিনি আদৌ আসবেন কি না ?  শিষ্যদের মুখে কোনো কথা নেই। তাঁরা ভাবছেন উত্তর দেওয়া কতটা সমীচীন হবে অথবা যথার্থ উত্তর কী হতে পারে ! উত্তর দিলেন লিয়াংচিয়ে— যথার্থ সঙ্গ পেলে অবশ্যই তিনি  আসবেন।  এমন উত্তর শুনে ন্যানচুয়ান অবাক হয়ে গেলেন। লিয়াংচিয়েকে কাছে ডেকে তিনি বললেন— এই নবীন সন্ন্যাসীকে ঠিক মতো  মাজাঘষা করলে একদিন রত্ন হয়ে উঠবে। প্রত্যুত্তরে লিয়াংচিয়ে বলেছিলেন— মাজাঘষা করলে আসল বস্তুটি চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যেতে পারে। এহেন প্রত্যুত্তর পেয়ে প্রাজ্ঞ আচার্য ন্যানচুয়ান মুগ্ধ হয়েছিলেন। মাজু-র আগমন সম্পর্কিত লিয়াংচিয়ে-এর মন্তব্যটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি ধর্মে মৃতব্যক্তির স্মরণে অনুষ্ঠানের প্রথা আছে। অনেকের জিজ্ঞাসা সত্যিই কী স্মরণ অনুষ্ঠানে মৃতদের উপস্থিতি সম্ভব ! জীবনানন্দ দাশ তাঁর সাতটি তারার তিমির  কাব্যগ্রন্থের ১৯৪৬-৪৭ কবিতায় এমন জিজ্ঞাসার সুন্দর ও সন্তোষজনক উত্তর দিয়েছেন। তিনি বলছেন —


মৃতেরা কোথাও নেইআছে?
কোনো-কোনো অঘ্রাণের পথে পায়চারি-করা শান্ত মানুষের
হৃদয়ের পথে ছাড়া মৃতের কোথাও নেই বলে মনে হয়;


অর্থাৎ মানুষের হৃদয়ের পথ ছাড়া মৃতদের অস্তিত্ব আর কোথাও নেই। সোজা কথা হল জীবিতরা স্মরণ না-করলে মৃতদের পৃথিবীতে ফেরা অসম্ভব। লিয়াংচিয়ে এই সহজ সত্যটাকেই তুলে  ধরেছেন তাঁর বক্তব্যে। মাজুকে কেউ সঙ্গ দিতে চাইলে অর্থাৎ আন্তরিকভাবে তাঁর স্মৃতিচারণ করলে তবেই তিনি আসবেন স্মরণ অনুষ্ঠানে।


    ন্যানচুয়ানকে বিদায় জানিয়ে লিয়াংচিয়ে চললেন, আচার্য মাজু-র অন্য এক শিষ্য কুয়েই শান-এর কাছে। একদা জাতীয় শিক্ষক আচার্য নানইয়াং হাইজ্যাং (জাপানি, নানইয়ো এচচো : ৬৭৫-৭৭৫ খ্রিঃ) একটি সূত্র ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছিলেন, নির্জীব বস্তুরাও সতত ধর্ম প্রচার করে চলেছে। লিয়াংচিয়ে নানইয়াং-এর এই ভাষ্যের কথা শুনেছিলেন। কিন্তু বুঝে উঠতে পারেননি  কীভাবে নির্জীব বস্তু সমূহ ধর্মের প্রতিফলন ঘটিয়ে চলেছে প্রতি নিয়ত ! তিনি কুয়েই শানকে ধরে  বসলেন, বিষয়টা ভালো করে বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য।


লিয়াংচিয়ে— আচার্য আমার একটা জিজ্ঞাসা আছে। জাতীয় শিক্ষক নানইয়াং বলেছিলেন দেয়াল, পাথর ইত্যাদি নির্জীব পদার্থও সর্বদা ধর্মের কথা বলে চলেছে। যদি একথা সত্য হয়, তাহলে তাদের ভাষ্য কারা শুনতে পান ?

কুয়েই শান— নানইয়াং সত্য বলেছিলেন। তবে নির্জীব বস্তুদের ধর্মোপদেশ বোঝার ক্ষমতা খুব  কম লোকেরই আছে।

লিয়াংচিয়ে— আমি আপনার কথা ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না। আমাকে আরও সহজ করে বলুন।

কুয়েই শান তাঁর হাতের ছড়িটিকে সোজাসুজি উপরে তুলে ধরলেন। লিয়াংচিয়ে সেদিকে কিছুক্ষণ  তাকিয়ে থাকলেন। তারপর বললেন— সত্যি বলতে কী আমি এখনও বুঝে উঠতে পারিনি !   

লিয়াংচিয়ে-র হতভম্ব দশা দেখে কুয়েই শান বললেন—  আমার বাবা-মায়ের দেওয়া মুখে এর বেশি আর বোঝানো সম্ভব নয়। আপনি বরং আচার্য ইয়ানইয়েন তানশেং (জাপানি, উঙগান দোনজো ৭৮০-৮৪১ খ্রিঃ)-এর কাছে যান। এ ব্যাপারে নিশ্চয় তিনি আপনাকে সাহায্য করতে পারবেন। 

 

     লিয়াংচিয়েকুয়েই শান-এর কথামতো চললেন আচার্য ইয়ানইয়েন-এর সঙ্গে দেখা করতে। ইয়ানইয়েন স্বাগত জানালেন নবীন সন্ন্যাসীকে। সৌজন্যমূলক আলাপচারিতার পরেই শুরু হল কথোপকথন।

লিয়াংচিয়ে— জাতীয় শিক্ষক আচার্য নানইয়াং বলেছিলেন দেয়াল, পাথর ইত্যাদি নির্জীব পদার্থও সর্বদা ধর্মের কথা বলে চলেছে। কারা তাঁদের ধর্মকথা শুনতে সক্ষম ?  

ইয়ানইয়েন— নির্জীব পদার্থেরাই শুনতে পান।       

লিয়াংচিয়ে— আপনি কি শুনতে পান ?

ইয়ানইয়েন— যদি আমি তাদের উপদেশ শুনতে পেতাম, তাহলে আপনি আমার কথা শুনতে  পেতেন না।

লিয়াংচিয়ে— আমি কেন নির্জীবদের ধর্মোপদেশ শুনতে পাচ্ছি না ?  

কুয়েই শান যেমনটা করেছিলেন, ইয়ানইয়েনও ঠিক তেমন করেই তাঁর হাতের ছড়িটি উপরে তুলে ধরলেন।

ইয়ানইয়েন— আপনি কি কিছু শুনতে পাচ্ছেন ?

লিয়াংচিয়ে— না। কিছুই শুনতে পাচ্ছি না। 

ইয়ানইয়েন— আপনি আমার উপদেশ শুনতে পাচ্ছেন না। তাহলে কীভাবে নির্জীবদের উপদেশ শুনতে পাবেন?  আপনি কি অমিতাভ বুদ্ধ সূত্র পড়েছেন ? সেই সূত্রে বলা হয়েছে গাছ, বন, পাখি, ঝরনা সবাই বুদ্ধের নাম জপছে।

এই আশ্চর্য কথা শুনে লিয়াংচিয়ে-র বোধিচিত্ত জাগ্রত হয়। তিনি তাঁর এই জাগরণকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য একটি শ্লোক রচনা করেন। শ্লোকটি এইরকম—

 

অতি বিস্ময়কর আহা মহা বিস্ময়কর ।

নিষ্প্রাণেরাও ধর্মকথা শোনায় নিরন্তর।।

এখন জানি সেই সুবচন কর্ণে শোনার নয়। 

চোখ দিয়ে তা শুনতে চাইলে তবেই শ্রুত হয়।। 

 

    লিয়াংচিয়ে-র কী এমন হল যে, তিনি বুঝে গেলেন নিষ্প্রাণেদের ধর্মকথার রহস্য ! এটা বুঝতে গেলে তথাকথিত ধর্মানুসারীদের একটি সার্বিক ভ্রান্তির বিষয়ে আলোকপাত করতে হয়। এই ভ্রান্তিটি হল, আধ্যাত্মিকতার উপর অলৌকিকতার আরোপ। ধর্মের আদিযুগে রূপক-প্রতীক বা ইঙ্গিতের মাধ্যমে অনেক গূঢ় তত্ত্বকথা বলা হয়েছিল। উত্তরসূরিরা সেই আলংকারিক প্রয়োগ না- বুঝে অন্ধের মতো এক জায়গায় স্থির থেকে কেবল বাইরের খোলসটাকে পালিশ করে গেছেন প্রাণপণ। পরম্পরিত ধারণার শিকার লিয়াংচিয়েও অলৌকিকতার মোহে পড়ে ভাবতে শুরু  করেছিলেন নির্জীব পদার্থেরা বোধহয় কথা বলতে পারে। তাদের সেই কথা তথা ধর্মবাণী কেবল সিদ্ধপুরুষই শুনতে পান ! তাই তিনি তেমন একজন অলৌকিক ক্ষমতাধর সিদ্ধপুরুষের সন্ধান করছিলেন। ইয়ানইয়েন যখন কুয়েই শান-এর মতো একইভাবে হাতের ছড়িটি উপরে তুলে ধরলেন, তখন তিনি কিছুটা অনুমান করলেন। পরে অমিতাভ বুদ্ধ সূত্র শুনে বিষয়টা যথাযথভাবে অনুধাবন করলেন। হস্তধৃত ছড়ি উপরে তুলে ধরার অর্থ জাগতিক বন্ধন ছিন্ন করে বোধি-জাগরণের পথে মাথা তুলে দাঁড়ানো।  নির্জীব ছড়িটি লিয়াংচিয়েকে এই উপদেশই দিয়েছিল। কিন্তু প্রচলিত ধর্মজ্ঞান দ্বারা চালিত হয়ে তিনি ছড়িটির দিকে তাকিয়ে ছিলেন তার কথা শোনার জন্য। পরে ইয়ানইয়েন যখন সূত্র উদ্ধৃত করে বললেন গাছ, বন, পাখি, ঝরনা সবাই বুদ্ধের নাম জপছে, তখন লিয়াংচিয়ে অলৌকিকতার মোহ ছিন্ন করে যুক্তিনিষ্ঠ হলেন। তিনি বুঝলেন বুদ্ধ এখানে শাক্যবংশীয় গৌতম নয়, বুদ্ধ এখানে প্রত্যেক বস্তুর অন্তর্নিহিত সত্তা। জগতের প্রতিটি বস্তুই তার অন্তর্নিহিত সত্তাকে বাইরের রূপ দিয়ে প্রতিভাত করছে। প্রতিটি বস্তুই তার এই বাহ্যিক রূপ দিয়ে আমাদের কিছু ধারণা বা শিক্ষা দিয়ে চলেছে। তখন তিনি উপলব্ধি করলেন নিষ্প্রাণেদের ধর্মকথা  কানে শোনার নয় ; চোখে শোনার বিষয় অর্থাৎ তাদের পর্যবেক্ষণ করে বুঝে নিতে হয়। লিয়াংচিয়ে নিজের নির্বুদ্ধিতায় নিজেই লজ্জিত হন। বস্তুত এমনটাই ঘটে, পাখির পালকের মতো নির্ভার  আধ্যাত্মিকতাকে আমরা গুরুভার গন্ধমাদন জ্ঞান করে আমৃত্যু অজ্ঞানতার দাসত্ব করি। বিষয়টা সহজে বোঝার জন্য আমরা সুনির্মল বসুর লেখা সবার আমি ছাত্র  নামক চমৎকার ছড়াটির দ্বারস্থ হতে পারি। এই ছড়ায় কবি যথাক্রমে আকাশ, বাতাস, পাহাড়, খোলা-মাঠ, সূর্য, চন্দ্র, সাগর, নদী, মাটি, পাষাণ, ঝরনা ও শ্যাম বনানীর কাছে ভিন্ন ভিন্ন শিক্ষা গ্রহণের কথা জানিয়েছেন। ছড়াটির  উপসংহারে তিনি বলেছেন—


এই পৃথিবীর বিরাট খাতায়

পাঠ্য যে-সব পাতায় পাতায়,

শিখছি সে-সব কৌতূহলে

       সন্দেহ নাই মাত্র।


এই ছড়াটির দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে কেউ যদি পৃথিবীর বিরাট খাতা কোন জাদুঘরে রাখা আছে তা খুঁজতে বের হন, তার দশা হবে ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়া লিয়াংচিয়ে-এর মতো।

      

    লিয়াংচিয়ে, বেশ কিছুকাল ইয়ানইয়েন-এর সঙ্গ করেন। একদা তিনি অন্য কোনো মঠে যাওয়ার জন্য মনস্থির করেন। তবে ঠিক কোন দিকে বা কোন মঠে যাবেন তা ভেবে ওঠেননি। পা যে দিকে চলবে সে দিকেই যাবেন, এরকম একটা ভাব তাঁর মনে। ইয়ানইয়েন-এর কাছে গেলেন বিদায় নিতে।

ইয়ানইয়েন— তা কোনদিকে যাওয়া হচ্ছে শুনি ?

লিয়াংচিয়ে— ভেবে দেখিনি।       

ইয়ানইয়েন— হুনানের দিকে যাওয়ার ইচ্ছা আছে নাকি ?             

লিয়াংচিয়ে— না।

ইয়ানইয়েন— নাকি বাড়ির দিকে যাওয়া ইচ্ছে ?

লিয়াংচিয়ে— না।

ইয়ানইয়েন— খুব তাড়াতাড়ি ফেরার ইচ্ছা আছে, নাকি ফিরতে দেরি হবে ?

লিয়াংচিয়ে— আপনার নতুন মঠ হওয়ার সময় ফিরব।

ইয়ানইয়েন— একবার বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর, পুনরায় দেখা হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম।

লিয়াংচিয়ে— না-দেখা হওয়ার সম্ভাবনাও কম।

কিছুটা বিরতি নিয়ে লিয়াংচিয়ে পুনরায় বলেন— ভবিষ্যতে কেউ যদি জিজ্ঞেস করে আপনার কাছে আমি কী শিখেছি, তখন কী উত্তর দেব ?

ইয়ানইয়েন বেশ কিছুটা সময় অতিবাহিত করলেন, অতঃপর বললেন— এটুকু বললেই হবে।

তারপর কিছুক্ষণের বিরতি নিয়ে বললেন— এক মহান দায়িত্ব এখন আপনার মাথায়। বিষয়টা বিশেষ বিবেচনায় রাখবেন।

এইভাবে লিয়াংচিয়ে হয়ে ওঠেন আচার্য ইয়ানইয়েন-এর সুযোগ্য ধর্মসূরি। ফেরার পথে লিয়াংচিয়ে ইয়ানইয়েন-এর শেষ সংলাপটুকু নিয়ে ভাবতে থাকেন। পথে একটি স্রোত পার হওয়ার সময় জলে  নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে তিনি বোধি লাভ করেন। একটি পদ্যে তিনি তাঁর এই অভিজ্ঞতাকে ধরে রেখেছেন। পদ্যটি এইরকম—  

 

খুঁজেছি যখন অন্যের দোরে দোরে,  

পাইনি তাকে সরে গেছে বহু দূরে।  

খোঁজ নিয়ে আজ নিজস্ব অন্দরে,

পাই তাকে আমি বিদেশ-বিভূঁই ঘুরে। 

 

আমার থেকে সে আদৌ ভিন্ন নয়,   

যদিও সে আর আমি এক নই মোটে।

যখন  নিগূঢ় তত্ত্বটা জ্ঞাত হয়,

বুদ্ধ তখন অন্তরে জেগে ওঠে।    

 

    ৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে প্রায় বাহান্ন বছর বয়সে লিয়াংচিয়ে পোঁছান চিয়াংশি প্রদেশের কাও-আন নগরের  শাও তুং পর্বতে। সেখানে তিনি অনুসারীদের নিয়ে একটি মঠ নির্মাণ করেন। ক্রমশ লিয়াংচিয়ে নামের পরিবর্তে তিনি শাও তুং বা শাও তুং লিয়াংচিয়ে নামে পরিচিত হন। তিনি অনুসারীদের নিয়ে বুদ্ধের অষ্টাঙ্গিক মার্গের অনুশীলন শুরু করেন। বিশেষত সম্যক সমাধির অন্তর্গত সম্যক  স্মৃতিকে তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। সম্যক স্মৃতির মূল কথাই হল, মন ও দৈহিক অবস্থা সমূহের পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যবেক্ষণ এবং আমাদের অস্তিত্ত্ব ও জগৎ সংসারের অস্তিত্ত্বের অনিত্যতাকে স্মৃতিতে ধারণ। লিয়াংচিয়ে কবিতাও লিখতেন। তিনি ক্রমানুবর্তী পাঁচটি কবিতার মাধ্যমে ধ্যান-অনুশীলনের পাঁচটি স্তর বা পর্যায়কে চিহ্নিত করেছেন।


প্রথম স্তর চেন চং পিয়েন । এই প্রাথমিক স্তরে বুদ্ধ-প্রকৃতি সম্পর্কে অনুসন্ধিৎসা জাগরিত হয়। সাধক ধ্যানে আগ্রহী হয়ে ওঠেন।


দ্বিতীয় স্তর পিয়েন চং চেন । এই স্তরে সাধক উপলব্ধি করেন তিনি জগৎ সংসারের সমস্ত কিছুর সঙ্গে এক ঐক্যের সূত্রে আবদ্ধ।


তৃতীয় স্তর চেন চং লাই ।  এই স্তরে সাধক শূন্যতাকে অনুধাবন করেন।


চতুর্থ স্তর পিয়েন চং চি । এই স্তরে সাধক আবার জাগতিক হয়ে ওঠেন। তিনি জগতের সমস্ত কিছুর মধ্যে নিজেকে খুঁজে পান। তবে কোনো বিকারই তাঁকে স্পর্শ করতে পারে না।


পঞ্চম স্তর চিয়েন চং তাও  এই স্তরে সাধক এক সাম্যদৃষ্টির অধিকারী হন। তাঁর কাছে জ্ঞান-অজ্ঞান, ভালো-মন্দ এসবের দ্বৈততা ঘুচে যায়। তিনি তখন স্বাধীন, নির্বিকার, নিরাসক্ত।


    তাং আমলের অন্যান্য অনেক চ্যান-আচার্যের মতো লিয়াংচিয়ে-এর তিরোধান নিয়েও কিংবদন্তী আছে। লিয়াংচিয়ে তখন বাষট্টি বছর বয়স্ক। একদিন তিনি শিষ্যদের ডেকে তিরোধানের দিনটি নির্দিষ্ট করেন। নির্ধারিত দিনে মস্তক মুণ্ডন ও স্নানাদির পর তাঁকে নতুন চীবর পরিধান করানো  হয়। উপবিষ্ট অবস্থায় তিনি প্রাণত্যাগ করেন। শিষ্যেরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। লিয়াংচিয়ে চোখ খুলে সবাইকে কাঁদতে নিষেধ করেন। তারপর বলেন—


বুদ্ধ-পথের পথিক হয়ে যাঁরা অনিকেত জীবন বেছে নেন, তাঁদের এমন আচরণ অনভিপ্রেত। সমস্ত বস্তুই পরিবর্তিত বা লয়প্রাপ্ত হয়। দুঃখ করে লাভ কী ! 

এটাই ছিল তাঁর শেষ কথা।


    লিয়াংচিয়ে-এর ধর্মসূরি পেন চি (জাপানি, সোজান হোনজাকু : ৮৪০-৯০১ খ্রিঃ)। তিনি ছিলেন বর্তমান চিনের ফুচিয়েন প্রদেশের পু-তিয়েন অঞ্চলের বাসিন্দা। উনিশ বছর বয়সে তিনি গৃহত্যাগ করে ফুচৌ-এর লিং-শি পর্বতের এক মঠে গিয়ে ওঠেন। তেইশ বছর বয়সে তিনি সন্ন্যাস গ্রহণ  করেন। লিয়াংচিয়ে-এর সঙ্গে পেন-চি-র প্রথম সাক্ষাতের কথোপকথনটি চ্যান-ইতিহাসে স্মরণীয়  হয়ে আছে।

লিয়াংচিয়ে— আপনার নাম কী ?

পেন-চি— আমার নাম পেন-চি।

লিয়াংচিয়ে— আপনি বুদ্ধ-প্রকৃতি সম্পর্কে কিছু বলুন।

পেন-চি— আমি কোনো কথাই বলব না।

লিয়াংচিয়ে— কেন আপনি কথা বলবেন না ?

পেন-চি— তাহলে আমাকে আর কেউ পেন-চি (নামটির অর্থ প্রকৃত নীরব ) নামে ডাকবে না।

লিয়াংচিয়ে পেন-চি-র এই বুদ্ধিমত্তার পরিচয় পেয়ে চমকিত হন।


    পেন-চি, আচার্য লিয়াংচিয়ে-এর পঞ্চস্তরীয় সাধন-পর্যায়কে শক্তপোক্ত ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করেন। এছাড়া তাঁর অন্য একটি উল্লেখযোগ্য কাজের সন্ধান পাওয়া যায় চ্যাননথিতে। তিনি তাং যুগের প্রাজ্ঞ কবি হানশান-এর পদ্যসংকলন হানশানশি-র অন্যতম সংকলক ও ভাষ্যকার। যদিও তাঁর এই সংকলনটি আবিষ্কৃত হয়নি। পেন-চি তাঁর নিজস্ব মঠ গড়ে তোলেন শাও-শান নামক  পর্বতে। পর্বতের নামানুসারে তিনি শাও-শান বা শাও-শান পেন-চি নামে খ্যাত হন।  তুং-শান    লিয়াংচিয়ে এবং  শাও-শান পেন-চি এই দুই আচার্যের নামের প্রথমাংশ জুড়ে শাও-তুং নামটি তৈরি হয়, যা নবগঠিত চ্যান সম্প্রদায়কে চিহ্নিত করে।  

    পেন-চি-র মৃত্যু সম্পর্কে একটি চমকপ্রদ গল্প আছে। একদা পেন-চি, মঠের এক সন্ন্যাসীকে ডেকে  বলেন— আপনি বলতে পারেন আজ কোন মাসের কত তারিখ ? 

সন্ন্যাসী— আচার্য, আজ জুন মাসের পনেরো তারিখ।

পুনশ্চ পেন-চি বললেন— আগামীকাল আমি যাবজ্জীবনের জন্য তীর্থযাত্রায় বেরোব। মঠের সবাইকে বলে দেবেন। 

পরের দিন পেন-চি দেহত্যাগ করেন তখন তাঁর বয়স হয়েছিল বাষট্টি বছর।


    পেন-চি-র মৃত্যুর পর তাও-ইন, ফু-জিৎ, চিয়াং-শান প্রমুখের হাত ধরে শাও-তুং সম্প্রদায় সমগ্র  চিনে ছড়িয়ে পড়ে। ত্রয়োদশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে আচার্য দোগেন জেনজি (১২০০-১২৫৩ খ্রিঃ) শাও-তুং সম্প্রদায়কে জাপানে বহন করে নিয়ে যান। লিয়াংচিয়ে (জাপানি নাম, সোজান) ও  পেন-চি (জাপানি নাম তোজান ) — শাও-তুং সম্প্রদায়ের এই দুই প্রতিষ্ঠাতার জাপানি নামের প্রথমাংশ থেকে জাপানে এই সম্প্রদায় সোতো নামে পরিচিতি পায়। বর্তমান সময়ে প্রাণবন্ত চ্যান-সম্প্রদায়গুলির মধ্যে সোতো অন্যতম।             

     

 

তথ্যঋণ :

1. ZEN BUDDHISM :  A  HISTORY  INDIA  AND  CHINA  BY  HEINRICH  DUMOULIN  TRANSLATED BY  J. W. HEISIG AND PAUL KNITTER ; MACMILLAN PUBLISHERS COMPANY, 1988.

 

 2.ZEN MASTERS OF CHINA : THE FIRST STEP EASTBY RECHARD BRYAN MC DANIEL; TUTTLE PUBLICATION, TOKYO/ VERMONT/ SINGAPORE.  

 

 

3. ZENS CHINESE HERITAGE BY ANDY FERGUSON ; WISDOM PUBLICATION, BOSTON.

 

 

4. HISTORY OF ZEN BY YU-HISIU KU; SPRINGER, SINGAPORE.


ছবি: বিধান দেব 

লেখক পরিচিতি ।। জন্ম ১৫ নভেম্বর ১৯৭৬, দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার ডায়মন্ড হারবার মহকুমার ভগবানপুর (হরিণডাঙা) গ্রামে। বাংলা ভাষা-সাহিত্যের শিক্ষক। কবিতা লেখার সূত্রে লেখালেখির জগতে প্রবেশ। লেখেন প্রবন্ধ ও গল্প । 

প্রকাশিত পুস্তক   : 

কাব্য পুস্তক : আমার আত্মার পায়ে বাঁধার ঘুঙুর, যাপনচিত্র, ২০১৯; সরলতা ক্রমশ গায়েব হইতেছে, সাহিত্যের বেলাভূমি ২০২০

প্রবন্ধ পুস্তক : জেন : রিপুতাড়িত মানবের নিকট সুসমাচার ও অন্যান্য প্রবন্ধ, কলিকাতা লেটার প্রেস, ২০১৯ 

সম্পাদিত পত্রিকা : পাড়ি

 

 

 


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

কবিতা

সম্পাদকের কথা

দ্বিতীয় বর্ষ  ।। অষ্টম সংখ্যা ।। মার্চ ২০২২   খুব অসহায় লাগছে এবার। আমাদের ডান পাশে ধস। বায়ে গিরিখাত। মাথায় বোমারু। পায়ে পায়ে হিমানীর ব...