সোমবার, ৩০ আগস্ট, ২০২১

সম্পাদকের কথা


 

গত বছর ঠিক এরকমই একটা দিনে কাঁপা কাঁপা হাতে প্রথম সাহিত্যের বেলাভূমি ব্লগজিন-এর পাবলিশ অপশনে আঙুল রেখেছিলাম। ভার্চুয়াল মাধ্যমে পত্রিকা প্রকাশ করার মধ্যে বেশ উত্তেজনা ছিল। তারপর কীভাবে যে একটা বছর কেটে গেল টের পাইনি। প্রত্যেক মাসে পত্রিকা প্রকাশ করার জন্য বহু বন্ধুকে বার বার বিরক্ত করেছি। অনেক বন্ধুই মনে মনে বিরক্ত হয়েছেন। স্বাভাবিক। এই পত্রিকা থেকে কেউই কখনও অর্থ-যশ-খ্যাতি-পুরস্কার পাননি। নিতান্ত বন্ধুত্বের স্বার্থে নিজেদের প্রজ্ঞা-পরিশ্রম-মেধা দিয়ে গেছেন দিনের পর দিন। আমি প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে তাদের জন্য গর্ব করে গৌরবান্বিত হয়েছি। এতদিন সাহিত্যের বেলাভূমি-তে লেখার জন্য আমি সেইসব কবি লেখকের কাছে কৃতজ্ঞ। মাঝে-মধ্যে মনেও হয়েছে অনেক তো হল। এবার ক্ষান্ত দিলে কেমন হয়। কিন্তু পরক্ষণেই নতুন করে তাগিদ আসে। মনের সব জড়তা দূর করে বলি ' তোমার শঙ্খ ধুলায় পড়ে /  কেমন করে সইব'। আবার লেগে পড়ি। এভাবেই চলছে। এত কিছু না না সত্ত্বেও যে সব বন্ধু ও লেখক এখনও এই পত্রিকার সঙ্গে লেগে পড়ে আছেন তাদের অন্তর থেকে সম্মান ও শ্রদ্ধা জানাই। বিশ্বাস করুন এছাড়া আমার দেওয়ার কিছু নেই। আমার পরম শ্রদ্ধেয় বিশিষ্ট শিল্পী বিধান দেব তাঁর মূল্যবান ছবিগুলো আমাকে ব্যবহার করার অনুমতি দিয়েছেন। তাঁকে শ্রদ্ধা জানাই। এই সময়ের বিশিষ্ট শিল্পী দেবাশিস সাহা সমস্ত ব্যস্ততার মধ্যেও সাহিত্যের বেলাভূমির জন্য যে সব আর্ট ওয়ার্ক করে দেন তাতে আমরা বারবার সমৃদ্ধ হই। মাঝে কেউ কেউ আমাদের কাজে নানাভাবে ছন্দোপতন আনতে চেয়েছেন। কিন্ত তাতে পা সামান্য ব্যথা হলেও আমরা দিব্য চলেছি। রাস্তায় নামার আগে আকাশপাতাল ভাবি। চলতে পারব তো? কিন্তু একবার নেমে গেলে কত কিছু অর্জন হয়। জীবনের যা কিছু পাওয়া তা এই পথেই।  চলতে চলতে। থেমে গেলে পাওয়াও ফুরায়। কী পেয়েছি? খ্যাতিমানের উদ্ধত বাহবা? ফেসবুকে থাকা হাজার হাজার বন্ধুর পাশে থাকার কোমল প্রতিশ্রুতি? কোনোটিই নয়। পেয়েছি আত্মিক উন্নতির দিশা। পেয়েছি কাজ করার অসীম তৃপ্তি। ভালোবাসা, বিশ্বাস,আস্থা আর অদম্য আত্মশক্তিতে ভরপুর হয়ে আছি। আগামী সংখ্যা শারদীয় সংখ্যা। নিশ্চয়ই সুন্দরতম হবে। কবি এবং কবিতার জয় হোক।

মুক্ত গদ্য ।। সায়ন রায়


 

ভাবনারা গাছ হয়ে ভেসে যায় দূর এক অরণ্যের দিকে


After the torchlight red on sweaty faces

After the frosty silence in the gardens

After the agony in stony places

The shouting and the crying

Prison and palace and reverberation

Of thunder of spring over distant mountains

He who was living is now dead

We who were living are now dying

With a little patience  

                          ( The Waste Land : T.S.Eliot ) 


মানুষ।একা মানুষ তার বোধ ও স্বজ্ঞা নিয়ে কি পারে না কোনো গুহায় কিংবা কোনো নির্জন উপত্যকায় বা শহরের কোনো উঁচু বাড়ির চিলেকোঠায় বা কোনো বেসমেন্টের খুপরি ঘরে একটা জীবন কাটিয়ে দিতে।তাহলে সুবিধা হত এই : প্রতি মুহূর্তের সকল নেগেটিভ শক্তিগুলি যা রচিত হয় তার আশপাশ,জগৎ,জীবন ও তার কুশীলবদের সাথে তার প্রত্যক্ষ আদানপ্রদান এবং অপ্রত্যক্ষ চাওয়া পাওয়াকে ঘিরে,যা ঘুরে ঘুরে বারেবারেই তার আত্মাকে ফালাফালা, রক্তাক্ত করার জন্য বদ্ধপরিকর,যা উঁচিয়ে রাখে সর্বদাই তার দুদিক-ধারালো লম্বা মসৃণ ছুরিটি; সেটি থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া যেত।হ্যা,এসকেপিজম।অবশ্যই এসকেপিজম। কেন নয়? কিন্তু হায়! মানুষ তা পারে না।অনেক ব্যর্থ চেষ্টার পর তাকে ঘুরে ঘুরে আসতেই হয় তার প্রবল শত্রু বা প্রকৃত প্রস্তাবে বন্ধুই—সেই মানুষেরই কাছে।কারণ এ কম্ম তার যোগ্যতার অনেক উর্ধ্বে। এ যে সাধকের কাজ! কিন্তু সাধকও কি পারেন ? বহুদিন,বহুমাস,বহুবছর একাকী নির্জন বাসের পর যখন মীমাংসা হয়ে আসে সকল প্রশ্নমালা,যখন দূর হয় তাঁর সকল অস্থিরতা, যখন তাঁর ভিতরে জেগে ওঠে এক পদ্ম যার শত পাপড়ি বিকশিত হয়েছে,তিনিও তখন ফিরে আসেন।তাকে ফিরতেই হয় কারণ সেই পদ্ম তখন সুঘ্রাণ ছড়াতে চাইছে শুধু তার নিজের ভিতরেই নয়,ক্লিন্ন হয়ে আসা,কর্দমে ভরা অসংখ্য মানুষের জীবনে।এই তার নিয়তি। তাকে ফিরতেই হয় মানুষের কাছে যাদের সে স্বেচ্ছায় ত্যাগ করেছিল একদিন।যোগাযোগ স্থাপন করতেই হয়।না করে উপায় নেই।

~~

১৯৩৬ সালে  জাঁ-পল সার্ত্র রচনা করেন তার ' ইরোসট্রেটাস' গল্পটি যেটি ১৯৩৯ সালে আরো চারটি গল্পের সাথে প্রকাশিত হয় তার 'লে মুর' গল্প-সংকলনে ( ইংরেজিতে The Wall and Other Stories বা পরবর্তীতে Intimacy and Other Stories নামে প্রকাশিত হয় )।উত্তম পুরুষে লেখা এই গল্পের নায়ক পল হিলবার্ট নিজেকে বন্দী করে রাখে সাততলার একটি ফ্ল্যাটে।সাততলার এই ব্যালকনিটিই তার বাইরের পৃথিবীকে দেখার একমাত্র জায়গা।ঘরের আলো নিভিয়ে সে জানলার কাছ ঘেষে দাঁড়ায়।নীচে বাজারের সমবেত ভিড় দেখে তার মনে হয়: মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রু এই 'ভার্টিকাল পারস্পেক্টিভ'।এত উঁচু থেকে মানুষকে মনে হয় পিঁপড়ের মত।মানুষের সাথে মেলামেশা এড়াতে সে গভীর রাতে ঘর ছেড়ে বেরোয়।গল্পের অন্য একটি চরিত্র মেসি তাকে বলে সে ইরোসট্রেটাসের মত।এই সূত্রে এসে পড়ে খ্রীস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীর কুখ্যাত ব্যক্তি ইরোসট্রেটাসের কথা যে তার অস্তিত্ব খুঁজে পেতে,বিখ্যাত(?) হতে গ্রীকদেবী আর্টেমিসের মন্দির জ্বালিয়ে দেয়, যে মন্দিরটি ছিল সপ্তম আশ্চর্যের একটি। 

~~

'তোমার কাছে আর ফিরবো না'—এই বলে বেরিয়েছিল সেই কোন সকালে।তারপর থেকেই বেপাত্তা।সারা দুপুর,সারা বিকেল এ গাঁয়ে ও গাঁয়ে খুঁজে খুঁজে সারা।কোথাও কোনো চিহ্নমাত্র নেই।তারপর যখন দুঃখে ও ক্লান্তিতে বুজে আসছে চোখ। মন যখন দিয়ে দিয়েছে জবাব।আর বোধহয় কোনোদিনই দেখা হবে না।ঠিক তখনই,যখন সন্ধ্যার ঝুপসি অন্ধকারে চারপাশের গাছপালা বোবা ও নিথর,ঠিক তখনই যখন ঝিঁঝিপোকার কোরাস জানান দিতে শুরু করেছে ভবিষ্যতের কোনো গূঢ় কূটাভাস,ঠিক তখনই যখন এক কালো বেড়াল ততোধিক কালো এক অন্ধকার গর্তে অদৃশ্য হয়ে গেল আশু কোনো সমাধানের আশা না রেখেই, গুটি গুটি পায়ে সে ফিরে এলো।এর মধ্যে কোনো আশ্চর্য ছিল না,কোনো রহস্য ছিল না।সবটাই যেন পূর্বে পরিকল্পিত।

~~

কলকাতা দূরদর্শনের এক সাক্ষাৎকারে প্রশ্নকর্তা নাটককার মোহিত চট্টোপাধ্যায়কে প্রশ্ন করেছিলেন : আপনি নাটক না লিখে থাকতে পারবেন? অত্যন্ত মায়াময় ভঙ্গিতে মোহিতবাবু উত্তর দিয়েছিলেন : নাটক না লিখলে কি আমি মরে যাব?আমার খাওয়া-দাওয়া, শোওয়া-বসা সবই তো চলবে।কিন্তু নাটক আমার কাছে এই চশমাটার মত।এটা না থাকলে আমার কোনো কাজই আটকাবে না।কিন্তু সবকিছুর মধ্যে এক অস্পষ্টতা, এক অস্বচ্ছতা ঘিরে থাকবে।

~~

বৃষ্টি পড়ছে।কয়েকদিন ধরে।লাগাতার।ঝমঝম শব্দে ঢেকে যাচ্ছে নিত্যদিনের পরিচিত প্রিয় শব্দগুলি।ঘন এক দেওয়াল রচিত হয়েছে সামনে,পাশে,ধারে—সর্বত্র।আর এই দেওয়ালের অস্বচ্ছতায়,অনচ্ছতায় দিগবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়ছে মন।এইখানে এক অস্থায়ী কূপের ভিতর ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে খসে পড়ছে একে একে সবকটি পালক।দূরাগত কোনো ধ্বনি,কোনো মন্দিরের প্রাচীন ঘন্টার,নিশ্বাসের শব্দের সাথে মিশে সৃজন করছে আধিভৌতিক চেতনার বিস্ফার।দরজার কপাটগুলি ভাঙা।জানলার নড়বড়ে কলকব্জা।সেইসব ঠেলে খনির পেটের মধ্যে জেগে থাকা কয়েকশ বছরের পুরোনো এক অন্ধকার এইমাত্র প্রবেশ করলো।আর তার সেই ঠান্ডা কালো কুচকুচে জলে সাঁতরাতে সাঁতরাতে ভেসে যাচ্ছে জীবন সম্পর্কিত কয়েকটি গূঢ় প্রশ্ন। যাদের গায়ের ক্ষতগুলিকে দূর থেকে আজও চিনে নেওয়া যায়।

~~

১৯৮৬ সালে প্যারিসে ক্যান্সার আক্রান্ত হয়ে মারা যান আন্দ্রেই তারকোভস্কি।তার অনেক আগেই ১৯৭৯তে ক্রমাগত স্টেট ফিল্ম অথরিটির সঙ্গে দ্বন্দ্বের জেরে রাশিয়া ছাড়েন তিনি।শেষের দুটি ছবি 'নস্টালজিয়া'(১৯৮৩) এবং 'দ্য স্যাক্রিফাইস'(১৯৮৬) তৈরি করেন যথাক্রমে ইতালি ও সুইডেনে।মৃত্যুর কিছুদিন  আগে প্রকাশিত হয় তার লেখা বই 'স্কাল্পটিং ইন টাইম'(১৯৮৫) প্রথমে জার্মান ভাষায়, পরে ইতালীয় ভাষায়। ১৯৮৭ তে তার ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হয়।সারা পৃথিবীতে চলচ্চিত্র বিষয়ক যেকটি বই প্রথম সারিতে থাকার অধিকার অর্জন করেছে,এটি তার অন্যতম। সিনেমা এবং সামগ্রিক ভাবে শিল্পের উদ্দেশ্য, অভিপ্রায় সম্বন্ধে তারকোভস্কি তার গভীর অনুভব ও উপলব্ধিকে ব্যক্ত করেছেন এই বইয়ে।এই বইয়ের একটি অধ্যায় 'আর্ট—আ ইয়ারনিং ফর অ্যান আইডিয়াল'-এ তিনি এই ভাবনা ব্যক্ত করেছেন : শিল্পের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হল ঐক্যবন্ধন স্থাপন করা।শৈল্পিক সৃষ্টির এক গুরুত্বপূর্ণ দিক হল সংযোগের চেতনা। শিল্প এক বিশেষ ভাষা যার সাহায্যে মানুষ পরস্পরকে জানতে চায়,নিজেদের সম্পর্কে জ্ঞাতব্য বিষয় জানিয়ে অন্যদের অভিজ্ঞতা আত্মস্থ করতে চায়।আর এ কাজটা ব্যবহারিক লাভ-ক্ষতির হিসেব কষে করা যায় না।ভালোবাসার ধারণাকে উপলব্ধি করেই তা করা সম্ভব। ভালোবাসার মর্ম নিহিত আছে আত্মত্যাগের মধ্যে।আর এই ত্যাগই হল প্রয়োজনবাদের বিরুদ্ধ প্রবণতা। 

~~

একটা মালসায় রক্ত রাখা আছে।শিল্পের বেদীটি ধুয়ে নিতে হবে নিজের শেষ রক্তটুকু দিয়ে।গোটাকতক জলজ লিলি আর চূর্ণ চূর্ণ মায়া দিয়ে সাজিয়ে নিচ্ছ তোমার আরাধ্য।কিছু দূরে জড়ো হয়েছে গ্রাম্য কিছু শিশু। তাদের কৌতুহলী চোখে তুমি লাগিয়ে দাও রামধনুর রঙ।হাতে হাতে বাঁশপাতার বাঁশি।দিনশেষে সূর্যাস্তের অলৌকিক বিভায় যখন গুছিয়ে নিচ্ছ স্বপ্ন ও সবকটি ভ্রম, হাতে-হাত শিশুগুলি হাঁস হয়ে উড়ে গেল পশ্চিমাকাশে ।

~~

১৯৭৫ সালে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত ইতালীয় কবি ইউজেনিও মনতালের বিখ্যাত গদ্যগ্রন্থ 'Poet in Our Time'-এ কবি এই ভাবনাটি রেখেছেন : ‘Only the isolated communicate. The others—the men of mass communication—repeat,echo,vulgarize the works of the poets'.


ছবি : বিধান দেব 





নয়া বৃহদারণ্যক ।। দেবাশিস দাশ


 


||১|| 


৩. সমতার গান

অসুর ও দেব— প্রজাপতির সন্তান

উভয়েই। কিন্তু তারা জোরদার স্লোগান 

হেঁকে যুদ্ধ জারি করল। প্রাচীন ইরাকে 

আসিরীয় জাতি ছিল। তারাই ঘোড়াকে 

বশ করেছিল, যুদ্ধরথ ও চাকার 

আবিষ্কর্তা তারা, কিংবা লোহা ব্যবহার 

করতে শিখেছিল বেশ। তাদেরই মন্দিরে 

অসুরের পুজো হত। হয়তো ধীরে-ধীরে 

সে সব কাহিনি, জ্ঞান, বিচিত্র সভ্যতা 

সুদূরে ছড়িয়ে পড়ে। সেইসব প্রথা 

ধর্মগ্রন্থে মিশে আছে। রাজা আখ্নাতন 

মিশরে করেছিলেন পুজো-প্রবর্তন 

একেশ্বর অতনুর— অর্কদেব যিনি, 

তিনিই জেহোভা (জিহ্বা?)— মোজেস-বাহিনী 

যাঁকে মান্য ক'রে প্যালেস্টাইনে পৌঁছায়।  

তিনি ব্রহ্ম-পরমেশ হিন্দুর প্রজ্ঞায়। 

হিব্রু-সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ নায়ক ডেভিড 

প্রতিষ্ঠা করেন জিহ্বা মন্দিরের ভিত। 

এ-সমস্ত ইতিহাস। ইহুদি জাতির 

একেশ্বরবাদ ক্রমে পেয়েছে খাতির 

সারা পৃথিবীর ধর্মে। অসুর ও দেব— 

আদি উৎসজাত দুটি জাতি অতএব।

 

প্রত্ন-উইকিপিডিয়ায় সিন্ধুদেশিগণ 

মুখে-মুখে করেছেন সমস্ত বর্ণন। 

সব জাতি মিশ্র জাতি আজ পৃথিবীতে।

বিশুদ্ধ কে আর আছে ধর্মের প্রেক্ষিতে?


তবু ভ্রাতৃ হিংসা জমে,— 'সেল্ফ' ও 'আদার'!

ইজ়রায়েলে, নন্দীগ্রামে ছায়া দেখি তার।

দেবতা-অসুর— ভাল-মন্দেরই প্রতীক 

এভাবে ভাবাই আজ সিম্পল লজিক।


ক্ষুদ্র অভিমানই হল জীবত্ব। জীবের 

জন্মকাল খুঁড়ে খোঁজ পাব অমৃতের। 

ভোগের আকাঙ্ক্ষা থেকে শুরু পাপবোধ 

ইন্দ্রিয়ে ও মনে জাগে আত্মপ্রতিরোধ। 

চোখ, কান, বাক, মন স্বার্থপরতায় 

ফেঁসে গিয়ে অসুরের হাতে হেরে যায়। 

মুখ্যপ্রাণ স্বার্থহীন— প্রতীকী দেবতা

যজ্ঞে মন্ত্রগান গেয়ে পেল সফলতা।

বাক, ঘ্রাণেন্দ্রিয়, চোখ, কান কিংবা মন 

এখনও যা কিছু করে কুচর্যা গ্রহণ—

অশালীন আলাপন, পূতিগন্ধ শোঁকা,

অপ্রিয় শ্রবণ, কিংবা মতলব ছকা—

সে-সবই আদিম সেই আসুরিক পাপ। 

শুধু প্রাণ দেবশ্রেষ্ঠ। নিঃস্বার্থ স্বভাব।


প্রাণ এল কোথা থেকে?— প্রশ্নের উত্তরে 

শাস্ত্র বলে, সে তো ছিল আস্যের ভেতরে। 

'আস্য' মানে মুখ, তাই অয়াস্য নামেও 

ডাকা যায় তাকে, অন্যদিকে ডাকে কেউ 

'আঙ্গিরস' নামে— অঙ্গপ্রত্যঙ্গ প্রাণের 

অভাবে যেহেতু শুষ্ক হয়ে যায় ফের।

প্রাণের অনেক নাম, কেউ ডাকে 'দূঃ', 

মৃত্যু থাকে তার থেকে দূরত্বে যেহেতু।

পাপ-রূপ মৃত্যু থেকে সব ইন্দ্রিয়কে 

বাঁচিয়ে সীমান্তে আনে, যেখানে না ঢোকে 

কোনও পাপাচার, যেন লাইন অভ্ কন্ট্রোলে 

জীবন পবিত্র থাকে, পাপে পা না টলে। 

সমস্ত ইন্দ্রিয় পঞ্চপাণ্ডবের মতো 

ভয়ংকর সিম্বলিক, তাদের আহত 

শরীর বহন ক'রে প্রাণের দেবতা 

মৃত্যুর অতীতদেশে এনেছে কোথাও— 

যেখানে প্রণম্য অগ্নিরূপে জ্বলে বাক্, 

বায়ুরূপে প্রবাহিত হতে থাকল নাক। 

মৃত্যু পার করে চোখ আদিত্য হল হে, 

কান হল নানা দিক, অক্ষয় এ-গ্রহে। 

মরণ পেরিয়ে মন ঝলমলে জ্যোৎস্নায় 

পরিণত হল, যাকে আজও দেখা যায়। 

এসব প্রকৃতিতত্ত্ব দেহের কোটরে 

ভরা থাক চিরকাল অক্ষরে-অক্ষরে। 


প্রাণের প্রচুর নাম— সে-ই বৃহস্পতি 

(বাক্যের পতি সে, আর বাক্যই বৃহতী)। 

আবার যেহেতু বাক্য ব্রহ্ম, তাই প্রাণ 

ব্রহ্মণস্পতি নামেও পরিচিতি পান। 

আবার প্রাণই সাম,— সমান জীবিত— 

ভাইরাসে, মশকে কিংবা হস্তীতে নিহিত। 

প্রাণ 'উৎ', বাক্য 'গীথা'— সুস্বর 'উদ্গীথ'

যে গায়, সে 'সুবর্ণ' পায়,— বর্ণ ও সংগীত 

এইভাবে মিলেমিশে গায়কের জিভে 

অমৃত সঞ্চার করে, মৃত্যুময় জীবে 

প্রতিষ্ঠা— অন্ন বা সোনা, ধন— বর্ণ-ধ্বনি 

সমস্ত সমান— সারেগামা সামা ধানি। 

এভাবে গানের মধ্যে অমৃতের কথা 

বলাই প্রাণের ধর্ম, জ্ঞানীর দক্ষতা।


পবমান মন্ত্র— অভ্যারোহ (দেবত্বে আরোহন): সামের প্রস্তাব-গীতি

'আমিই কর্মের কর্তা'— এই অভিমান 

ছেড়েছুড়ে পাওয়া যাবে সত্যের সন্ধান। 

সমস্ত কাজের মূলে অহং-পুরুষ 

তিনিই আসলে আত্মা, জীবিতের হুঁশ। 

তাঁরই ইচ্ছায় চলে দুনিয়া-সংসার

এই জ্ঞানজ্যোতিতেই ঘোচে অন্ধকার। 

আঁধারই অসুর। জৈব মৃত্যু পার ক'রে 

অমৃতলোকের শ্রুতি বাজুক অন্তরে: 

"অসত্যে জড়িয়ে আছি, সত্যে নিয়ে যাও 

অজ্ঞান আঁধারদেশে আলো পৌঁছে দাও 

মৃত্যু পার ক'রে প্রাণ অমৃতে ধাওয়াও..."।



[প্রথম অধ্যায় তৃতীয় ব্রাহ্মণ শেষ। চতুর্থ ব্রাহ্মণ ]


                                            (ক্রমশ...)


রবিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২১

সাধনপর্বের নির্জনতা ।। অভিজিৎ দাশগুপ্ত


 


২৩.

খুব সহজ তোমার সঙ্গে আচমকা দেখা হওয়া
দু দণ্ড দাঁড়িয়ে কথা, তোমার আমার কথা, দুঃখসুখ অর্ধেক না শুনে আরও যা সহজ, নিছক সান্ত্বনা
                                                             দেওয়া
বিষণ্ণ দু চোখে চোখ, বিধ্বস্ত দু কাঁধে হাত রেখে
                                             অকৃত্রিম ছোঁয়া

যদিও দুজনে জানি কিছুই হবে না ঠিক, বরং সহজ
                                                                       ভাবা
এর চেয়ে আরও বেশি দুর্দিন সামনে আছে,
                                                   আগামীর দিনে।

যা খুব সহজ নয়, এই যে ক্রমশ ডুবে যাচ্ছি, খাচ্ছি
                                                              হাবুডুবু
বাইরে সমুদ্র-ঢেউ, ভিতরেও অস্থিরতা, এলোমেলো
                                                                     ধাক্কা
                                                             দেয় বুকে

আমরা সান্ত্বনা দিই পরস্পর, চোখে চোখ, কাঁধ ছুঁয়ে
                                                                      যাই
অথচ বুঝি না জল বোকা করে রাখে আমাদের,
                                                              রেখেছে
                                                                  এভাবে

যখন হাত পা ছুঁড়ি হয়ে যাই একা, কেউ কারু হাত
                                                                   ধরি না
কখনও—

জানলার ঘষা কাঁচে ওপাশে কুয়াশা, ভোররাতে টেলিফোন ডাকে,
বেয়ারিং হয় চিঠি, রাস্তা থেকে উড়ে আসে আর্ত
                                                              চিৎকার...
সমস্ত মিলিয়ে শুধু শুনি নিজের গলার স্বর, আর্তনাদ নাভি থেকে উঠে আসা শব্দের তরঙ্গ, ভয়, চেনা ও
                                                               অচেনা।

খুব সহজ তোমার সঙ্গে আচমকা রাস্তায় দেখা হওয়া ভাল নেই, তবু দেখো পরস্পর সহজেই বলতে
                                                       পারি  না, ভাল
                                                                       নেই।

ইচ্ছে ছিল কবিতাটি সম্পূর্ণ তুলে দেব । তা দেওয়াই যথেষ্ট হবে। তাহলে  এত লেখার আর প্রয়োজন থাকত না । কিন্তু তা তো হবার নয় । তাই ভাবনাকে দীর্ঘায়িত করতেই হল ।

এ কবিতার প্রতিটি অক্ষর শব্দ বাক্যে সেই ধাক্কা আছে , যা অমোঘ অথচ যার টান  অস্বীকার করবার ক্ষমতা নেই কারো ।  প্রদীপচন্দ্র বসুর 'ভালো আছি' পড়তে পড়তে ফেলে আসা জীবনের প্রেম পর্যায় ঘনিষ্ঠ হতে চায় ।  জীবন সবসময় যে সুখপাঠ্য তা তো নয় ।  মধ্যে মধ্যে প্রতিফলনেও রক্তক্ষরণ হয় । সে যদি আজ আমাকে জিজ্ঞেস করে, কেমন ?তাহলে সত্যিই কি বলতে পারব 'ভালো আছি '! নাকি ওই বলার টুকুর ভেতরে সমগ্র অতীত একবার ফণা তুলে হিস্  হিস্  শব্দ করে উঠবে ।  অন্তরঙ্গ হয়েও যে মুখ ফেরানো থাকে বিতর্কিত কৌশলে।

প্রত্যেকে এভাবেই নিজের জীবনকে কাটাছেঁড়া করতে পারেন কবিতাটি পড়ার সময় ।  অথচ কবি চিরাচরিত যন্ত্রণাকে বাঙ্ময়  করেছেন পংক্তিতে পংক্তিতে ।  তিনি আজ বিষণ্ণ, বিধ্বস্ত ।  সান্ত্বনার মত সর্বতাপহারী ভাষা নেই দুজনের কারো কাছে । তবু ওই যে ' দু দন্ড দাঁড়িয়ে কথা ', ' দুঃখ সুখ ' ইত্যাদি ইত্যাদিরাও চেনা অচেনার মত আচমকাই আমাদের এলোমেলো করে দেয় । আবেগকে তখন বাধা দেবার কেউ থাকেনা ।  সে মৃদুভাষী থেকেও সর্বোচ্চ ডেসিবেলে ঘোরাফেরা  করে।

এই যে ডুবে যাওয়া , অথবা ডুবে যাওয়ার অস্থিরতা ব্যক্তি মানবকে এলোমেলো করে দেয় ।  তার মধ্যে থাকে অকৃত্রিম সহজ ভাষা ।  যে ভাষা বুকে চেপে ঈষৎ পক্ককেশ প্রেমিক পথ  হাঁটে প্রতিদিন। যে ভাষা আত্মার পরিব্যাপ্তে আটকে নিয়ে উদাসীন পথ অতিক্রম করে ছিন্ন ডানা পক্ষিণী।  দুজনের জীবন জানালার ঘষা কাচ আর ওপাশে থাকা কুয়াশার মতো।

কবির  এই নস্টালজিক ভালোবাসা ভাবতেও ভালো লাগে আমাদের মত কিছু অভাগার ।  আমরা যারা কৃত্রিম ছোঁয়ায় একদিন ক্ষত করেছি নিজস্ব চলাকে। শুধু আর্তনাদ আর নাভি থেকে উঠে আসা ঘৃণার তরঙ্গ ----  যখন শরীর অবশ করে দিয়েছে বসন্ত উৎসবে ।  এ কবিতা তাই আমাদের নয় ।  যারা রক্ত নিয়ে এক বেলা দুবেলা তিনবেলা হেঁটে গেছি প্রেমের ইপ্সিত সিংহাসনের দিকে ।  তারপর ---

  " ঝর্ণার জল দেখে তারপর হৃদয়ে তাকিয়ে
দেখেছি প্রথম জল নিহত প্রাণীর রক্তে লাল
হ'য়ে আছে ব'লে বাঘ হরিণের পিছু আজো ধায়;...। "

খুব সহজ অথচ সহজ নয় এই উচ্চারণ । সৃজনের পরতে পরতে জড়িয়ে থাকে ভালবাসার বিষদাঁত!

২৪.

আমি আছি এক বস্তা সিমেন্টের মধ্যে, আর
তুমি এক ড্রাম চুনের ভেতর

ক্ষয়ে যাওয়া চোখ
ক্ষয়ে যাওয়া নাক

ব্লিচিং-পাউডারের প্যাকেটের মধ্যে কান
তাকে সিমেন্টের স্বরে, চুনের ভাষায়
আমরা বলতে চাই
সেই সব ক্ষয়ের কথা, বলি—
থ্যাতলানো ফুল, থেঁতলে যাওয়া ফল

' ভালো আছি '  কবিতাটির আলোচনা যেখানে শেষ করেছি , তার পর থেকেই শুরু হবে 'জবানবন্দি'। সমর রায়চৌধুরীর লেখা  এই কবিতার ভাষা আধুনিক, ইমেজ আরো আধুনিক ।  আর যন্ত্রণা---- সে মনের অসূয়া  নিয়ে তার প্রত্যাখ্যানকে বিশ্বাসের স্টেজে দাঁড় করাতে চেষ্টা করবে সর্বদা।

দুজনেই কষ্টে আছে । কিছু যন্ত্রণা যেমন তাকে ঘিরে আছে তেমনই যন্ত্রণার অবশিষ্টাংশ আটকে আছে এ পক্ষেও ।  সিমেন্ট আর চুনের ড্রাম ---- দুটি বস্তুই উচ্চারণ-গুণে  মানবিক সত্তায় পরিণত ।  অথচ প্রেম
বা  তা থেকে বিচ্ছেদ ইত্যাদির  চিত্রকল্প সৃষ্টিতে এমন  উপমা অগ্নিময় হয়ে ওঠে পাঠকের দরবারে। স্বাভাবিক  ভাবেই যন্ত্রণা থেকে মনে আসে এক ধরনের নিষ্ঠুরতা ।  তা থেকে প্রতিপক্ষের প্রতি নির্বিকার পরিস্থিতি । চুন  অথবা সিমেন্টের ক্ষয় গুণে চোখ নাক  আজ যেতে বসেছে ।  এমন এক সংক্রমণের কাছে শুধু টিকে আছে কান ।  ব্লিচিং- পাউডারের মধ্যে প্রবেশ করেও  যার এখনো শোনার ক্ষমতা হারিয়ে যায়নি ।  হতে পারে সেই পাউডার সিমেন্ট বা চুনের মত এতটা প্রভাবশালী নয় । আবার এও হতে পারে , ব্লীচিং-এ  মেশানো হয়েছে সামাজিক প্রতারণা ।  মানুষের সঙ্গে স্বঘোষিত  এই লড়াই  আজ  রাষ্ট্রের  মূলে।

অথচ এমন এক অন্যায় না ঘটলে আমরা  শ্রুতিযন্ত্র অক্ষত পেতাম না । অক্ষত অর্থে শোনার যোগ্য । চোখ  নাকের মত অথর্ব নয় সে ।  শুনতে পাওয়ার খানিক ধৈর্য তার বেঁচে আছে। টিকে আছে পুরানো বন্ধুত্বকে স্বীকার করে নিয়ে আজকের পৃথিবীতে চলার  কিছু ইচ্ছা। তারপরেও...

তারপরেও সেই ক্ষয়ের  কথাই আসছে । এমন এক ক্ষয়, যেখানে ফুল ও ফল থ্যাঁতলানো ।  দুটোই প্রতীকী ।  অথবা প্রতীকী নয় ।  সৌন্দর্য যেমন চাই;  ঠিক সে ভাবে দরকার খাদ্যের ।  দুয়ের অভাবে মানুষ খুনি হতে পারে , হতে পারে ধর্ষক -ডাকাত- সমাজদাহ্য  কোন মানুষ ।  কিন্তু কবি দেখছেন, তাঁর সেই আশা সুদূর পরাহত ! সেখানে ক্রমশই ' দুঃস্বপ্ন আর দীর্ঘশ্বাসের ' অন্তর্দৃশ্য।

আমাদের সমস্ত কাটাছেঁড়া নিজেকে নিয়ে । ওই সিমেন্টের বস্তা ,  ওই চুনের ড্রামে যেমন আমাদেরও ঢুকে পড়তে হয় সময়ে সময়ে ;  ঠিক সেভাবেই ব্লিচিং- পাউডারের ভেতরেও ' আমারেই পাবে তুমি ইহাদের ভিড়ে ' !

ছবি : বিধান দেব 

                                                          (ক্রমশ...)
     



 

ভিনদেশি তারা ।। অরিন্দম রায়


 

ছেলেটির শৈশব কেটেছিল এক নদীর ধারে , ছোট এক জনপদে। যেখানে মাত্র দশহাজার লোক বসবাস করত। নদীটি বছরের বেশিরভাগ সময়ে শান্তই থাকত। সেই নদীর বুকে নেমে ছেলেটি রত্ন খুঁজে বেড়াত। রঙিন পাথরকেই সে ভাবত মূল্যবান রত্ন। ছেলেটি লুকোচুরি খেলত, আর খেলত যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা! ভালবাসত খেলাঘর বানাতে। এমনিতে শান্তশিষ্ট সেই নদীতে যখন বান আসত তখন তার আবার অন্যরূপ! প্রকৃতির রুদ্ররূপ কাকে বলে তখনই জানা হয়ে গিয়েছিল তার। ছেলেটির বাবা ছিলেন কৃষিখামারের শ্রমিক। একইসঙ্গে দুটি খামারে কাজ করতে হত তাঁকে। দেখভাল করতে হত এক বিশেষ প্রজাতির গরু, যাদের দেহের রং বাদামি কিন্তু মুখের রং সাদা! কাঠের তৈরি কুটিরে বসবাস করত ছেলেটির পরিবার। তারপর একদিন ছেলেটির বাবার পেটে ক্যানসার ধরা পড়ল। ফলে আগের কাজ ছেড়ে নতুন জায়গায় একইরকম ছোট,পাতলা কাঠের কুটিরে শুরু হল তাদের বসবাস। তবে বাবার সঙ্গে ছেলেটির সম্পর্ক যে সবসময় মধুর ছিল তা-ও নয়। ‘পুরুষা্লী’ পিতার শাসন , মারধোর লেগেই থাকত। একাদশ শ্রেণিতে পড়ার সময় সেই ছেলেটি ,তখন কিশোর, এক অদ্ভুত কাণ্ড ঘটালো, ইংরেজি প্রজেক্টের বিষয় ছিল ‘স্বাধীনতা’ , কিশোরটি তার মাস্টারমশাইকে জিগ্যেস করল সে কি এই বিষয়ে রচনা লেখার পরিবর্তে একটি কবিতা লিখতে পারে? মাস্টারমশাই সম্মতি দিলে সে লিখে ফেলল আস্ত একখানা কবিতা। স্কুল ম্যাগাজিনে ছাপাও হয়ে গেল সেই লেখা। শুধু তা-ই নয় ,  টানা একবছর দ্বাদশ শ্রেণিতে ইংরেজির শিক্ষক সেই কবিতাটি পাঠ করে শোনাতেন ছাত্রছাত্রীদের। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হল এই যে, সেবার প্রজেক্টে দশের মধ্যে নয় নম্বর পেয়ে তাক লাগিয়ে দিল ছেলেটি। আর এই একটিমাত্র কবিতা লেখার সুবাদে তার সৌভাগ্য হল অস্ট্রেলিয়ান কবিতার প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ব ব্রুস ড-এর সঙ্গে দেখা করার।  

আশ্চর্যের নয় যে ভবিষ্যতে কবিতা লেখাই ছেলেটির নিয়তি হয়ে উঠবে। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ফাদারল্যান্ড’ -এ ছায়া পড়বে নিজের পিতার , নিজের শৈশবের। কিভাবে পিতার অকালমৃত্যুর পরে পরিবারের একমাত্র পুরুষ সদস্য হওয়ার , ‘পুরুষালী’ হওয়ার সামাজিক প্রত্যাশার চাপ তাকে সহ্য করতে হয়েছিল ছায়া ফেলবে সেইসব প্রসঙ্গও। অস্ট্রেলিয়ার কবিতায় ‘স্থান’ আর ‘প্রাকৃতিক দৃশ্যের’ মধ্যে যে দ্বন্দ্ব , তাঁর মতে ‘পুরুষত্ব’ সেই সমস্যারই দূর সম্পর্কের খুড়তুতো ভাই বা বোন , বিশেষত গ্রামের প্রেক্ষাপটে যেখানে প্রকৃতির বিরুদ্ধে সংঘর্ষ এবং শ্রেণি সংগ্রাম পরিচিতির ক্ষেত্রটিতে সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করে। 

তিনি ব্রেট ডায়নিসিয়াস ,অস্ট্রেলিয়ার তরুণতম কবি-প্রজন্মের একজন। তিনি কবি , সম্পাদক ,শিক্ষাবিদ। তাঁর কাব্যগ্রন্থগুলির মধ্যে কয়েকটি হল: Fatherlands (2000), Bacchanalia (2002), Universal Andalusia (2006), The negativity bin (2010),The curious noise of history: and other poems (2011),  Bowra (2013) প্রভৃতি। এর মধ্যে ‘ইউনিভার্সাল আন্দুলেসিয়া’ একটি কাব্যোপন্যাস। 


কবির একটি সিরিজ কবিতা থাকল সাহিত্যের বেলাভূমির এই সংখ্যায়। আশা করি পাঠকের পছন্দ হবে এই প্রয়াস।  


ব্রেট ডায়নিসিয়াস 

সময় এবং পুরুষাঙ্গ  


Neal, we’ll be real heroes now

in a war between our cocks and time:

let’s be the angels of the world’s desire 

and take the world to bed with us before 

we die. 

Allen Ginsberg 

১.

আমার মনে হয় সময় আমার লিঙ্গ আর আমার অণ্ডকোষ

শুকিয়ে দিয়েছে ,এগুলো এখন ভোঁতা অস্ত্র যেগুলো 

পৃথিবীর কিনারে ঝুলছে আর পাসেয়াক নদীখাতের ওপর  

ঝকমকে পেন্ডুলামের মতো দুলছে; 

আমার গর্ভাশয়ের জল আমাকে বাড়িতে স্বাগত জানাচ্ছে। 

আমি কি আপনাদের বলেছি যে আমি কখনও বেছে নিই নি

সেই দেবদূতকে যে কোনদিন এর খোঁজ করেনি।


২. 

সবকটা জলের পাইপ ঠাণ্ডায় জমে শক্ত হয়ে গেছে

আর আমাকে আবার জানলা দিয়ে পেচ্ছাপ করতে হবে।

আমি আমার হলুদ পেচ্ছাপকে ওয়েল্ডিং করার আগুনের শিখার মতো

বরফের মধ্যে গর্ত করতে দেখি।  

আমি পেচ্ছাপের সাহায্যে বরফের গায়ে নিজের নাম লেখার চেষ্টা করি , কিন্তু তার ভাপ

সবকিছু অস্পষ্ট করে দেয়, নিয়ন আলো, তুষারকণা,

তারাদের।  

৩.

আমার শুক্রাণুগুলো সাঁতার কাটার পক্ষে খুবই কুঁড়ে।

তারা অনেকটা জলহস্তীদের মতো 

নলখাগড়ার ঝোপ আর ওয়াটার লিলির মধ্যে 

তাদের চকচকে, ধূসর ভারী দেহের মতো;

বয়সের বাড়ার সঙ্গে তারা মোটা হতে থাকে, 

আর কুকুরের মতো স্রোত বরাবর সাঁতার কাটায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ে

আর ট্যুরিস্ট দেখলে 

মাঝেমাঝে মস্ত বড়ো হাঁ করে দেখায়।


৪.

আমি আর পৃথিবীকে বিছানায় নিয়ে যেতে পারি না।

বছরখানেক আগে পায়োনিয়ার ১০ এবং কার্ল সাগানের সঙ্গে

সে রেগে কাঁই হয়েছিল। তারা প্রথমবারের জন্য 

আন্তছায়াপথ নগ্নতার অনুমোদন দিয়েছিল এবং নাসা-কে অনুমতি দিয়েছিল

মহাবিশ্বে আদম এবং ইভের ঠিকানা ছড়িয়ে দিতে।

শেষ পর্যন্ত আমরা যুদ্ধটা হারি, হাঁটুগেড়ে বসি, কিন্তু 

আমাদের ইচ্ছাপূরণ হয় ____ আমরা সারা দুনিয়ার চাহিদাপূরণের দেবদূতে রূপান্তরিত হই 

যেভাবে তরুণ মার্কিনীরা ভিয়েতনামের সর্বত্র পৌঁছে ছিল , 

আর সকলে মিলে পৃথিবীর পোঁদ মেরেছিল।


                                                         (ক্রমশ...)


জন্মের আগের মুখ ।। চন্দন মিত্র


 

জন্মের আগের মুখ : জেন তত্ত্ব ও জেন কোয়ানের অমায়িক ভুবন     

 

 

দশম পর্ব

দক্ষিণ ঘরানার বিবর্তন : আচার্য হুইনেং ও পঞ্চ-চ্যান সম্প্রদায়

 

ষষ্ঠ আচার্য হুইনেং দেখেছিলেন, পরম্পরিত আচার্য-পদের দখল নেওয়ার জন্য কীভাবে সতীর্থরা অশ্লীল প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠেন। সম্ভবত এই কারণেই তিনি কাউকে সপ্তম আচার্য হিসাবে  মনোনয়ন দিয়ে যাননি। ফলে ৭১৩ খ্রিস্টাব্দে তাঁর মৃত্যুর পর বোধিধর্ম থেকে বাহিত চ্যানধারাটির একক-আচার্য-পরম্পরায় ছেদ পড়ে। আচার্য-পরম্পরা ছিন্ন হলেও হুইনেং-এর হঠাৎ-বোধির মতাদর্শ চিনের বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়ে চ্যান-অনুরাগী তরুণেরা হুইনেং-কে পথপ্রদর্শক মেনে  চ্যান-পথে এগোতে থাকেন। প্রসঙ্গত শেং-হুই-এর নাম করতেই হয়। আচার্য হুইনেং-কে নিয়ে তাঁর একক সংগ্রাম চ্যান-ইতিহাসের এক স্মরণীয় অধ্যায়। তিনিই তা-ফান মঠের ধর্ম-মহাসভায় অকাট্য যুক্তি বিস্তার করে হুইনেং-কে ষষ্ঠ আচার্য হিসাবে প্রতিষ্ঠা দেন। শুধু তাই নয়, প্রভাবশালী উত্তর ঘরানার বিপরীতে দাঁড়িয়ে তিনি হুইনেং-অনুসারীদের পক্ষ নিয়ে দক্ষিণ ঘরানার প্রবর্তন করেন। তাঁর এই সাড়া জাগানো লড়াই থমকে যাওয়া চ্যানধারাকে পুনরায় গতিশীল করে তোলে। চৈনিক কিশোর-যুবারা হুইনেং-এর আদর্শ-পতাকা হাতে তুলে নেন। আন-লুশান বিদ্রোহ তাং যুগের স্থিতাবস্থায় চিড় ধরিয়ে দিয়েছিল। তাওবাদ, কনফুসীয় মতবাদ ও প্রচলিত মহাযান বৌদ্ধ মতের বাইরে বের হওয়ার তাগিদ থেকে সন্ধানী তরুণেরা আঁকড়ে ধরতে চাইছিলেন নতুন কিছু, যা তাঁদের নিয়মের কড়াকড়িতে না-বেঁধেও আত্মজ্ঞানের পথে এগিয়ে দেবে। শেং-হুই-এর বদান্যতায় তাঁরা পেয়েও যান পরম্পরিত এক আশ্চর্য ধারা, আচার্য বোধিধর্ম থেকে যা বাহিত হয়ে হুইনেং পর্যন্ত প্রবাহিত হয়েছে অকুলীন নিরক্ষর দক্ষিণ দেশীয় কাঠুরে হুইনেং জেগে উঠলেন নতুন করে। পিছনে পড়ে থাকলেন তাঁর তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বী রাজন্যপোষিত নীলরক্তের শেং-শিউ ও তাঁর উত্তর ঘরানা। মহাকালের স্রোতে হারিয়ে গেল শেং-শিউ-এর উত্তর-ঘরানা ও নিউতউ ফারং-এর ষণ্ডমুণ্ড-ঘরানা। দক্ষিণ-ঘরানাই টিকিয়ে রাখল চ্যানধারার প্রাণপ্রবাহ। মূলত হুইনেং-এর পাঁচজন প্রত্যক্ষ শিষ্য শেং-হুই ( ৬৭০-৭৬২ খ্রি:), নান-ইয়াং হুই-চুং (মৃত্যু, ৭৭৫ খ্রি:), ইয়ুং-চিয়া হুয়ান-চুয়ে (৬৬৫-৭১৩ খ্রি:), নান-উয়ে হুয়াই-জাং (৬৭৭-৭৪৪ খ্রি:), এবং চিং-য়ুয়ান সিং-সু (মৃত্যু, ৭৪০ খ্রি:)-এর শিষ্য-প্রশিষ্যরাই দক্ষিণ ঘরানাকে বিকশিত ও বিবর্তিত করেন। তাঁদের তন্নিষ্ঠ চ্যানচর্চা  থেকে জন্ম নেয় প্রসিদ্ধ পঞ্চ-চ্যান-সম্প্রদায়  কুয়েই-ইয়াং বা ইগেয়ো সম্প্রদায়, লিন-চি বা  রিনজাই সম্প্রদায়, সাও-তুং বা সোতো সম্প্রদায়, ইয়ুনমেন বা উম্মন সম্প্রদায় ও ফা-ইয়েন সম্প্রদায়। 

  

 

কুয়েই-ইয়াং সম্প্রদায় (Kuei-yang House)

 

চিনের ইতিহাসে তখন সিয়েন-থিয়েন যুগ, চলছে তাং-বংশীয় সম্রাট সুই-তাং–এর শাসন, খ্রিস্টাব্দের হিসাবে ৭১৩ ;  হুইনেং-এর মহাপরিনির্বাণের বছর। হুয়াই জাং (জাপানি উচ্চারণে এজো), দীর্ঘ পনেরো বছর হুইনেং-এর কাছে অধ্যবসায়ে কাটিয়েছেন। এখন তিনি চললেন হাং পর্বত অভিমুখে জাপানি ভাষায় যার উচ্চারণ নাননাকু। সেখানে তিনি পো-জো মঠে থাকতে শুরু করেন। তাঁর শিষ্য মা-ৎসু দাও-ই (জাপানি, বাসো দোইৎসু ৭০৯-৭৮৮ খ্রি:) ভাবতেন, বেশি বেশি ধ্যান করে তাড়াতাড়ি বুদ্ধত্ব লাভ করবেন।  প্রজ্ঞার গুরুত্ব তখন তিনি বুঝতেন না। তাঁকে প্রায় সবসময় ধ্যানস্থ দেখা যেত।  গুরু হুয়াই জাং-এর সঙ্গে মাৎসু-র এক চমকপ্রদ কথোপকথনের কথা জানা যায়। একদা মাৎ-সু ধ্যানে বসেছেন এমন সময় হুয়াই জাং সেখানে উপস্থিত হলেন। শুরু হল কথাবার্তা।  

   এই যে ছোকরা, ধ্যানে বসে কী হাসিল করতে চাইছ বলো তো ?     

   আমি বুদ্ধত্ব লাভ করতে চাইছি।

হুয়াই জাং একটি পাথরের ফলক হাতে নিয়ে তার উপর একটি পাথর খণ্ড বেশ জোরে জোরে ঘষতে শুরু করলেন। এবার মাৎ-সু কৌতূহলী হয়ে উঠলেন।  

   আপনি আবার এটা কী শুরু করলেন ?

   আমি এই পাথুরে ফলকটিকে আয়না বানাচ্ছি।

   একটা পাথুরে ফলককে এইভাবে আপনি আয়না বানাবেন কী করে ?

   তুমি যদি নিছক ধ্যানে বসেই বুদ্ধত্ব হাসিল করতে পার, তাহলে এটাও সম্ভব!  

এখানে স্পষ্টত উত্তর-ঘরানার ক্রমবোধির ধারণাকে নস্যাৎ করে ষষ্ঠ আচার্য হুইনেং তথা দক্ষিণ ঘরানার হঠাৎ-বোধির ধারণাকেই প্রতিষ্ঠা দেওয়া হয়েছে।

 

    মাৎসু-ই প্রথম চ্যানসাধক যিনি শিষ্যদের সম্বিত ফেরানোর জন্য আচমকা উচ্চকণ্ঠে চিৎকার  করে ওঠা, নাক মুচড়ে দেওয়া, হঠাৎ আঘাত করা ইত্যাদি উদ্ভট আচরণকে কাজে লাগান। তাঁর সম্পর্কে এমন কথা প্রচলিত আছে, তিনি হাঁটতেন ষাঁড়ের মতো আর তাকাতেন বাঘের মতো। তাঁর জিভ এমন লম্বা ছিল যা অনায়াসে তাঁর নাক ছুঁয়ে ফেলত। বলা হয় তাঁর আত্মার পায়ের ছাপ নেওয়া গেলে তা অবশ্যই গোলাকার হত। ‘ল্যাম্প রেকর্ড’-এ শিষ্যদের উদ্দ্যেশ্যে কথিত মাৎ-সু-র  বক্তব্যের অংশবিশেষ পাওয়া যায়। সেখানে তাঁর উক্তি এইরকম  যাঁরা সত্যের সন্ধানে ফেরেন   তাঁরা শেষমেশ এই সত্যে উপনীত হন, আসলে সন্ধান করার মতো তেমন কিছু নেই। মন ছাড়া কোনো বুদ্ধ নেই ; বুদ্ধ ছাড়াও কোনো মন নেই। ভালোকে গ্রহণ, মন্দকে বর্জন এই বিচারে যেয়ো না। পবিত্রতা-অপবিত্রতার ধারণা থেকে মনকে মুক্ত করো ; অচিরেই বুঝবে পাপপুণ্যের অন্তঃসারশূন্যতা।

ষষ্ঠ আচার্য হুইনেং বলতেন, নিজের প্রকৃতির দিকে তাকাও ও বুদ্ধ হয়ে ওঠো। মাৎসুর কথায়ও সেই আদর্শ প্রতিফলিত হয়েছে।

 

    মাৎসু-র বিখ্যাত শিষ্যরা হলেন  বাও-চাং হুয়াইহাই (জাপানি, হিয়াকুজো একাই ৭২০-৮১৪ খ্রি:), নান-চুয়ান পিয়াও উয়েন (জাপানি, নানসেন ফুঙা ৭৪৮-৮৩৪ খ্রি:),  হুয়াং-পো সি-ইয়ুন (জাপানি, ওবাকু কিউন মৃত্যু ৮৫০ খ্রি:) ও কুয়েই শাং চি চাং (জাপানি, কিছু চিজো) বাও-চাং হুয়াইহাই অর্থাৎ হিয়াকুজো প্রথম মাৎ-সু-র কাছে যান ২০ বছর বয়সে। কিছুদিন মাৎ-সু কাছে শিক্ষা গ্রহণের পর তিনি ফিরে যান। পরে দ্বিতীয় বার যখন তিনি মঠে আসেন তখন তাঁকে দেখে হিয়াকুজো ‘কাৎজ’ বলে এমন এক পিলে-চমকানো চিৎকার করেন যে, হিয়াকুজো তিনদিনের জন্য বধির হয়ে যান। চতুর্থ দিনে হিয়াকুজো যখন গুরুর সামনে উপস্থিত হন, ঠিক সেই সময় এক ঝাঁক বুনোহাঁস মাথার উপর দিয়ে উড়ে যায়   

গুরু বললেন, ওগুলো কী পাখি ?

— বুনো হাঁস।

— হাঁসগুলি কোথায় যাচ্ছে ?

   ওরা তো এতক্ষণে চলে গেছে।

এই উত্তর শুনে মাৎ-সু রেগেমেগে আচমকা হিয়াকুজোর নাকটা ধরে এত জোরে মুচড়ে দিলেন যে   তিনি যন্ত্রণায় ককিয়ে উঠলেন। মাৎসু তাঁকে ধমক দিয়ে বললেন, মূর্খের মতো বলে কিনা হাঁসগুলো উড়ে গেছে। ওরা কোথাও যায়নি, এখানেই আছে। মাৎসু-র এই কথা শুনে যন্ত্রণার মধ্যেই হিয়াকুজো বোধি লাভ করলেন।    

 

    হিয়াকুজো-র অন্যতম শিষ্য কুয়েই-শান লিংয়ু (জাপানি, ইসান রেইয়ু ৭৭১-৮৫৩ খ্রি:) জন্মেছিলেন ফুজিয়েন প্রদেশের জাংসি নামক জায়গায় তিনি পনেরো বছর বয়সে বাড়ি  ছেড়েছিলেন। প্রথমে কিছুদিন তিনি স্থানীয় জিয়েনশান মঠে নবিশ হিসাবে কাটান। তারপর তিনি হাংজউ-এর লংশিং মঠে থেকে হীনযান ও মহাযান মতের সূত্রগুলি চর্চা করেন। হিয়াকুজো-র কাছে   তিনি পৌঁছান ৭৯৩ খ্রিষ্টাব্দে ; তখন তিনি বাইশ বছরে উপনীত হয়েছেন। হিয়াকুজো প্রথম  দর্শনেই বুঝে নেন লিংয়ু নিছক শৌখিন সন্ন্যাসী নয়। তিনি তাঁকে শিষ্য হিসাবে সাদরে গ্রহণ করেন। ক্রমে লিংয়ু হয়ে ওঠেন অধ্যক্ষ হিয়াকুজো-র সহায়ক একদিন হিয়াকুজো তাঁকে বললেন, যাও পাকশালার চুল্লি থেকে একটু আগুন আনো। লিংয়ু ভাবেন, সেই তো কোনকালে রান্না শেষ হয়েছে এখন আগুনের ছিটেফোঁটাও চুল্লিতে থাকা সম্ভব নয়। তবুও তিনি গেলেন একটা কাঠি দিয়ে অনেক খোঁচাখুঁচি করেও ব্যর্থ হলেন। ছাইটাই মেখে হিয়াকুজো-র সামনে এসে বললেন, নিভে যাওয়া চুল্লিতে খোঁচাখুঁচিই সার হল। এবার চললেন স্বয়ং হিয়াকুজো, তাঁকে নীরবে অনুসরণ করলেন লিংয়ু। হিয়াকুজো অসীম ধৈর্য সহকারে চুল্লির ছাই ঘাঁটতে লাগলেন। আর ঘটে গেল এক আশ্চর্য ব্যাপার, যা চমকে দিল লিংয়ু-কে। হিয়াকুজো সেই ছাইয়ের স্তূপ থেকে খুঁজে বের করেছেন এক টুকরো আগুন। তিনি সেই আগুনটুকু দেখিয়ে বললেন, তবে যে তুমি বললে আগুন নেই ! এটা তাহলে কী ? এই জিজ্ঞাসায় লিংয়ু-র জাগরণ ঘটে, তিনি নতুন মানুষ হয়ে ওঠেন। তিনি বোঝেন পূর্ণতা অর্জনের জন্য এখনও তাঁকে বহু পথ হাঁটতে হবে। তিনি হিয়াকুজোকে তাঁর উপলব্ধির কথা জানান। পরের দিন লিংয়ু, পাহাড়ি পথে হিয়াকুজোর সঙ্গে ছিলেন। হিয়াকুজোর জিজ্ঞাসার পরিপ্রেক্ষিতে উভয়ের কথোপকথন শুরু হল

   আগুন এনেছ ?

   হ্যাঁ অবশ্যই।

   কোথায় দেখি ?

লিংয়ু, মাটি থেকে একটি কাঠের টুকরো তুলে নিয়ে দুবার শিস দিলেন।   

হিয়াকুজো বললেন  কাঠখেকো উইপোকা।

এই যে হেঁয়ালিপূর্ণ অদ্ভুত কথোপকথন, চ্যান-ঐতিহ্যে এর নাম কোয়ান (Koan)। পরবর্তীকালে  বোধিলাভের সঙ্গে কোয়ানচর্চা ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়বে। আপাতদৃষ্টিতে এই ধরণের কথাবার্তাকে প্রলাপ বলে মনে হলেও আদতে এগুলি কূটাভাস, প্রণিধানযোগ্য অর্থ সম্বলিত। 

 

    ৮১০ খ্রিস্টাব্দের কথা, শিমা নামের জনৈক সন্ন্যাসী এলেন হিয়াকুজো-র কাছে। মঠের শান্ত নৈঃশব্দ্যের ভিতর তাঁদের কথাবার্তা শুরু হল।  

শিমা আমি হুনান প্রদেশের কুয়েই পর্বতের তংশিং মঠ থেকে আসছি। ঠিক এইসময়ে আমাদের মঠে আবাসিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা,পনেরোশো    

হিয়াকুজো আমাকে কী যেতে হবে ?

শিমা না, না অবস্থা এমন নয় যে, স্বয়ং হিয়াকুজোকে যেতে হবে !

হিয়াকুজো আপনার কেন এমন মনে হচ্ছে ?

শিমা আপনি হলেন অস্থি-মজ্জার অধ্যাপক, আর আমাদের কাজকর্ম রক্তমাংস নিয়ে।

হিয়াকুজো আমাদের মঠের কেউ কি এবিষয়ে আপনাকে সাহায্য করতে পারে ?

শিমা আমাকে একটু পরীক্ষা করে দেখে নিতে হবে !

 

    হিয়াকুজো, মঠের প্রধান সন্ন্যাসী হুয়া-লিং চুয়ে-কে ডেকে শিমা-র সঙ্গে পরিচয় করিয়ে  দিলেন। শিমা তাঁকে কিছুটা দূরে ডেকে নিয়ে কয়েকটি বিষয় জানতে চাইলেন, তারপর তাঁকে  প্রস্থান করতে বললেন। লিংয়ু, তখন পাকশালার প্রধান পাচক। হিয়াকুজো, তাঁকে ডেকে পাঠালেন। শিমা তাঁকে এক ঝলক দেখেই বললেন, এই মুহূর্তেই আপনি আমাদের তংশিং মঠের মঠাধ্যক্ষ পদে নিযুক্ত হলেন। সেদিন রাতে লিংয়ু-কে ডেকে অধ্যক্ষ হিয়াকুজো বললেন, তুমি আমাদের মঠ থেকে তংশিং মঠে অধ্যক্ষের পদ নিয়ে যাচ্ছ ; আমার গুরুর শিক্ষা যা ইতিমধ্যে তোমার মধ্যে সঞ্চারিত হয়েছে তাকে পরবর্তী প্রজন্মের হাতে সযত্নে তুলে দিয়ো। পরের দিন সব শুনে হুয়া-লিং চুয়ে-র মাৎসর্য উথলে উঠল। তিনি হিয়াকুজো-র কাছে অনুযোগ জানালেন, আমি এই মঠের সন্ন্যাসীদের প্রধান ; আমাকে বাতিল করে লিংয়ু-কে অধ্যক্ষ করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, যে কিনা একজন পাচক ! হিয়াকুজো বললেন, ঠিক আছে তুমি যদি প্রজ্ঞার পরিচয় দিতে পার, তাহলে আমি তোমাকে অধ্যক্ষের পদে নিয়োগ দেব। তিনি একটি কলসিকে রেখে হুয়া-লিং-চুয়ে-কে বললেন, কলসি বা এর সমার্থক কোনও শব্দ উচ্চারণ না-করে বল দেখি এটা কী ? হুয়া-লিং চুয়ে সপ্রতিভভাবে বললেন, এটাকে আপনি কাঠের চৌকি বলতে পারেন না। এরপর লিংয়ু-কে ডেকে হিয়াকুজো একই কথা জিজ্ঞাসা করলেন। লিংয়ু, কিছু না-বলে এক লাথিতে কলসিটা উলটে দিয়ে  সেখান থেকে চলে গেলেন। হিয়াকুজো হেসে বললেন, আমাদের প্রধান সন্ন্যাসী পরাস্ত  হলেন। এক প্রাজ্ঞ চ্যানগুরু এই ঘটনার কথা শুনে প্রশংসা করে বললেন, লিংয়ু সত্যিই বিরল-বালক, এক  লাথিতে সে হিয়াকুজো-র সব বিধিনিষেধ ঘুচিয়ে দিয়েছে।

 

    লিংয়ু, তংশিং মঠে পেয়ে গেলেন তাঁর ধর্মসূরী ইয়াং-শান হুই-চি (জাপানি, কিয়োজান এজাকু ৮০৭-৮৮৩)-কে। উত্তর কোয়াংতুং প্রদেশের হুয়াই-হুয়া অঞ্চলের বাসিন্দা ছিলেন এই হুই-চি। তাঁর সন্ন্যাস গ্রহণের সিদ্ধান্তকে বাড়ির লোকজন প্রথমে মেনে নেননি। শেষে একদিন তিনি খেপে উঠে ছুরি দিয়ে নিজের দুটি আঙুল কেটে ফেলেন। বাধ্য হয়ে বাড়ির লোকজন তাঁর সিদ্ধান্ত মেনে নেন। তখন হুই-চি-র বয়স সতেরো বছর। প্রথমে তিনি যান নান-হুয়া মঠে। পরে সেখান থেকে যান তংশিং মঠে অধ্যক্ষ লিংয়ু-র কাছে। মঠে আগন্তুক কেউ গেলে যেমন জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হয় এক্ষেত্রেও তেমনটা শুরু হল।

লিংয়ু  আপনি কি নিজেই নিজের প্রভু ?

হুই-চি হ্যাঁ। আমি তাই মনে করি।   

লিংয়ু  তোমার প্রভু কোথায় ?

হুই-চি ধ্যানকক্ষের পশ্চিম দিক থেকে পূর্ব দিকে কিছুটা হেঁটে গিয়ে নির্বাক অবস্থায় দাঁড়িয়ে পড়লেন। লিংয়ু-এর মনে আর কোনও সন্দেহই থাকল না। তিনি বুঝে গেলেন এ ছেলে বোধির জন্যই জীবন  বাজি রেখেছে !  

 

    লিংয়ু এবং তাঁর ধর্মসূরী হুই-চি-র অনেক কথোপকথন বিভিন্ন চ্যান-নথিতে ধরা আছে। চা-বাগানের কথোপকথনটি বেশ চমকপ্রদ।

লিংয়ু সারাদিন চা-পাতা তুলতে তুলতে তোমার কথাবার্তা শুনতে পাচ্ছি। কিন্তু তোমাকে যথাযথভাবে দেখতেই পাচ্ছি না। তোমার যথার্থ স্বরূপ প্রদর্শন করো।

ইয়াং-শান এই কথা শুনে একটি চা-গাছ ধরে ঝাঁকিয়ে দিলেন।

লিংয়ু  বুঝেছি তুমি কর্মটাই বুঝেছ কিন্তু এর মর্ম উপলব্ধি করে উঠতে পারনি।

ইয়াং-শান আপনি কী বললেন ?

গুরু নীরব থেকে গেলেন। শিষ্য কিন্তু ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নন।

ইয়াং-শান আপনি মর্ম বুঝেছেন কিন্তু কর্ম বোঝেননি।

লিংয়ু তিরিশ-ঘা বেত পাওনা হল।

ইয়াং-শান আমি যদি আপনার কাছ থেকে তিরিশ-ঘা বেত পাই। সেই প্রাপ্ত তিরিশ-ঘা বেত আমি কাকে প্রদান করব ?

লিংয়ু  তোমার পাওনা তিরিশ-ঘা বেত এই মুহূর্তে রদ হয়ে গেল।

 

 

 

    কুয়েই-ইয়াং সম্প্রদায়ের নামটি এসেছে হুনান প্রদেশের কুয়েই-শান ও চিয়াংশি প্রদেশের ইয়াং-শান এই দুই পর্বতের নাম মিলিয়ে। প্রথম পর্বতের ঠে থাকতেন গুরু কুয়েই-শান লিংয়ু  এবং দ্বিতীয় পর্বতের মঠে থাকতেন শিষ্য ইয়াং-শান হুই-চি। দুজনের নামের আগে পর্বতদুটির নামও সংযুক্ত হয়ে গেছে। গুরু-শিষ্য পরম্পরার হাত ধরেই কুয়েই-ইয়াং সম্প্রদায় বিস্তার লাভ করে। কুয়েই-ইয়াং সম্প্রদায়ের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য বিভিন্ন রূপক-প্রতীক ও আকারের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ধারণা দান। বিশেষত বৃত্ত ব্যবহারের জন্য তাদের প্রসিদ্ধি আছে। গুরু-শিষ্যের কথোপকথনে বৃত্ত কখনও বোধি, কখনও অসীম, কখনও দেহ, কখনও বুদ্ধ-প্রকৃতি, কখনও শূন্যতার প্রতীক হিসাবে এসেছে। মহাযান বা তার অন্যতম শাখা বজ্রযানে বৃত্ত বা মণ্ডলা একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। চ্যান-ধারায় সম্ভবত বৃত্তের প্রসঙ্গ প্রথম পাওয়া যায় ষষ্ঠ আচার্য হুইনেং-এর অন্যতম শিষ্য নান-ইয়াং হুই-চুং-কেন্দ্রিক একটি আখ্যানে। একদা তীর্থযাত্রা থেকে ফিরে এক শিষ্য এলেন গুরু নান-ইয়াং হুই-চুং-এর সঙ্গে দেখা করতে। তিনি গুরুর সামনে মাটিতে একটি বৃত্ত এঁকে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকলেন। কথা শুরু করলেন গুরু।

 

নান-ইয়াং তুমি কি বুদ্ধ হতে চাও ?

শিষ্য  আমি তো আমার চোখ মুছতে পারি না।

নান-ইয়াং আমি এখনও তোমার সমান হতে পারিনি।

 

এই কথোপকথনে গুরু-শিষ্য উভয়ের অসামান্য বিনয় প্রকাশ পেয়েছে। শিষ্য বলছেন তিনি এখনও চোখ থেকে মায়া মুছে ফেলতে পারেননি। সুতরাং তাঁর বুদ্ধত্ব লাভ সেই মুহূর্তে সম্ভব নয়। শিষ্যের এই অকপট উক্তি শুনে গুরুও তাঁর উচ্চতা থেকে নেমে এসেছেন শিষ্যের সমতলে। সবই হয়েছে একটি বৃত্তকে কেন্দ্রে রেখে

 

   

    লিংয়ু-কে নিয়েও একটি বৃত্ত-কেন্দ্রিক আখ্যান পাওয়া যায়। তংশিং মঠে এলেন এক নতুন সন্ন্যাসী। তিনি লিংয়ু-এর সঙ্গে দেখা করতে গেলেন। যথারীতি কথাবার্তা শুরু হল।

 

লিংয়ু  আপনার নাম ?

সন্ন্যাসী ইয়ে লুয়েন। ( চিনা ভাষায় ইয়ে লুয়েন মানে পূর্ণচন্দ্র )

লিংয়ু, আঙুল দিয়ে বাতাসে একটি বৃত্ত আঁকলেন। তারপর বললেন, এটার সঙ্গে আপনি কীভাবে   তুলনা করবেন ?

সন্ন্যাসী আপনি যদি এই পদ্ধতিতে আমার কাছে কিছু জানতে চান, তাহলে অধিকাংশ মানুষই আপনার এই পদ্ধতিকে পছন্দ করবে না।

লিংয়ু  এটাই আমার পদ্ধতি। আর আপনার ?

সন্ন্যাসী আপনি কি এখনও পূর্ণচন্দ্র দেখছেন ?

লিংয়ু  আপনি এই পদ্ধতিতে কথা বলতেই পারেন, কিন্তু অধিকাংশ মানুষই আপনার এই পদ্ধতিকে পছন্দ করবে না।

লিংয়ু-এর কাছে বৃত্ত বা পূর্ণচন্দ্র পূর্ণ জাগরণের প্রতীক। নবাগত সন্ন্যাসী এই প্রতীকী তাৎপর্যে  ঢুকতে পারেননি। পরবর্তীকালে চ্যানচর্চায় বৃত্ত (চিনা ভাষায়, ইআই সিয়াং এবং জাপানি ভাষায় এনসো) একটি অবশ্যম্ভাবী প্রতীক হয়ে ওঠে। 

 

 

     অধ্যক্ষ লিংয়ু, কুয়েই-শান পর্বতের তংশিং মঠে আমৃত্যু বাস করেছেন। তাঁর কাছে শিক্ষা নেওয়ার জন্য দূরদূরান্তর থেকে শিক্ষার্থীরা আসতেন। তাঁর তৎপরতায় চ্যানচর্চার কেন্দ্রবিন্দু হিসাবে তংশিং মঠের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে দেশময় তাং-বংশীয় সম্রাট উ-জোঙ (রাজত্বকাল ৮৪০-৮৪৬ খ্রি:   ) ৮৪৫ খ্রিস্টাব্দে বৌদ্ধ-পীড়ন সুরু করলে তার আঁচ তংশিং মঠেও পৌঁছে যায়। মঠ দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অধ্যক্ষ লিংয়ু সাধারণ নাগরিকের ছদ্মবেশে রাজকর্মচারীদের চোখে ধুলো দিতে সক্ষম হন। পরবর্তী সম্রাট সুয়েন-জোঙ (রাজত্বকাল, ৮৪৬-৮৫৯ খ্রি:) বৌদ্ধ-পীড়ন রদ করে দেন। অধ্যক্ষ লিংয়ু আবার ফিরে আসেন তাঁর প্রিয় মঠে। সরবতা ও নীরবতার মেলবন্ধন, হেঁয়ালিপূর্ণ কথা তথা কোয়ান-এর ব্যবহার, বিভিন্ন প্রতীক বিশেষ করে বৃত্তের মাধ্যমে বোধি, শক্তি, শূন্যতা বা বুদ্ধ-প্রকৃতিকে প্রতিফলিত করা এবং বৌদ্ধতন্ত্রের তাত্ত্বিক চর্চা ইত্যাদি কুয়েই-ইয়াং সম্প্রদায়ের বৈশিষ্ট্য হিসাবে চিহ্নিত হয়ে আছে। সাং রাজতন্ত্র (৯৬০-১২৭৯ খ্রি:) সূচিত হওয়ার সময়েই এই অলপ্পেয়ে সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব ক্ষীণ হয়ে আসে এবং কালক্রমে তা লিন-চি বা রিনজাই সম্প্রদায়ে বিলীন হয়ে যায়। 

 

 

তথ্যসূত্র : 

1. ZEN CLASSICS : FORMATIVE TEXT IN THE HISTORY OF ZEN BUDDHISM, EDITED BY STEVEN HEINE AND DALES S. WRIGHT , OXFORD UNIVESITY PRESS 2006.

2. ZEN BUDDHISM :  A  HISTORY  INDIA  AND  CHINA  BY  HEINRICH  DUMOULIN  TRANSLATED BY  J. W. HEISIG AND PAUL KNITTER ; MACMILLAN PUBLISHERS COMPANY, 1988.

3. SEEING THROUGH ZEN BY JOHN R. MACRAE UNIVERSITY OF CALIFORNIA PRESS , 2003.

5. ZEN MASTERS OF CHINA : THE FIRST STEP EASTBY RECHARD BRYAN MC DANIEL; TUTTLE PUBLICATION, TOKYO/ VERMONT/ SINGAPORE.

6. THE ILLUSTRATED ENCYCLOPEDIA OF ZEN BUDDHISM BY HELEN J. BARONI ; THE ROSEN PUBLICATION GROUP , NEW YORK

7. ZENS CHINESE HERITAGE BY ANDY FERGUSON ; WISDOM PUBLICATION, BOSTON..

8. HISTORY OF ZEN BY YU-HISIU KU; SPRINGER, SINGAPORE.


ছবি:  বিধান দেব 

                                                                (ক্রমশ...)

 


আবহবিকার ।। রাজদীপ রায়




 শমীপোকা ও অর্জুনের বিষাদযোগ 


লাল, রেকসিনে বাঁধাই ছিল বইটা। ঠাকুরঘরে ঢুকে নকুলদানা খেলে কেউ কিছু বলত না, কিন্তু এই বইটায় হাত দেওয়া যাবে না। কেন? এমন কী আছে সেই বইতে? পাতাগুলো হলদে হয়ে বেরিয়ে-বেরিয়ে এসেছে মলাট পেরিয়ে। তার ওপর সামান্যতম লোহাচুরের আস্তরণও পড়ে না; পড়বে কী করে? রোজ এই বই বাবা ওল্টায়, পাঠ করে ঠাকুরঘরে। শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ কথামৃতর পাশে এই বইটা রাখা থাকে তাকে। এই বইকে প্রথম দেখেছিলাম ঠাকুমার চলে যাওয়ার সময়। দিদি কান্নাগলায় ঘুম থেকে ডেকে তুলেছিল, তারপর ঘুমচোখেই সেই মাঝরাতে দেখা একটি দৃশ্য আমার চোখে চিরকালীন: সাদা চাদর দিয়ে ঢাকা ঠাকুমার শরীর—প্রায় নিথর; সবাই ঘিরে দাঁড়িয়ে, কেউ পাশে বসে। কেউ আঁচল দিয়ে ঢেকেছে মুখ, কারোর চোখ থেকে সমুদ্রের স্বাদ গড়িয়ে নামছে। বাবা কাঁদছে না, একমনে পড়ে যাচ্ছে একটা বই থেকে। ওই লাল রেকসিনে মোড়া বই, তখন অপেক্ষাকৃত নতুন ছিল—তাকে আবিষ্কার করেছিলাম। ভোরের দিকে ঠাকুমা চলে যায়। পরে জেনেছিলাম মৃত্যুপথযাত্রীকে এই বই থেকে পড়ে শোনালে তার মৃত্যু-পরবর্তী যাত্রাপথ মসৃণ ও মধুর হয়। আজ এত বছর পরেও ঠাকুমার সেই চলে যাবার দৃশ্য আমার মনে স্পষ্ট—সম্ভবত মৃত্যুর আগে ভুলব না। এর আগে মৃত্যু কখনো এত সুস্পষ্ট ও সাকার হয়নি। 

শমীপোকা থেকেই যে শমীচণ্ডী ঠাকুরের নাম, সে-কথা জানিয়েছিল কে, তা আর মনে নেই। তবে এই প্রসঙ্গে, দীর্ঘদিন ভুল নাম বয়ে বেড়ানোর গ্লানি রয়ে গেছে মনে। শমীচণ্ডী বিস্তর বিকৃতি পেয়ে হয়ে গিয়েছিল সৌম্যচণ্ডী। আজকেও লোকমুখে, হ্যাণ্ডবিল, স্থানীয় ক্যালেণ্ডারে এই বিকৃত নাম পাওয়া যাবে। আমার দাদু যখন কেষ্ট খাঁয়ের থেকে বাড়ি তৈরির জন্যে জমি কিনেছিলেন, তখন এই এলাকা ছিল জলাজমি পরিপূর্ণ। চুরি-ডাকাতিও হামেশাই হত। আর হ্যাঁ, ছিল বিস্তীর্ণ পানবরজ। এই পানবরজের বিস্তার মাকড়দহ, ডোমজুড়, রানিহাটি, জয়নগর, নারিট, ডিভূরশুট হয়ে সেই আমতা পর্যন্ত। পানে পোকা না-ধরে--এই মনস্কামনা থেকে চণ্ডীর এই স্থানীয় পুজো শুরু হয়। সেই পানবরজেরও মৃত্যু হয়ে গেছে আমার জন্মের আগে। জীবিকা বদলেছে। পানবরজের মাটি বুজিয়ে তৈরি হয়েছে লেদ-মেশিনের কারখানা। শুধু দেবী রয়ে গেছেন পুরোনো বটগাছের মতো--স্মৃতির ভারবাহী হয়ে—যাত্রিকের নির্ভরতায়। 

একদিন সেই বইকে চিনলাম। শ্রীগীতা, জগদীশচন্দ্র ঘোষের টীকা ও ব্যাখ্যা সমৃদ্ধ। সেই বই—নতুন--আমার জন্যে এনে বাবা বলেছিল, দেখিস, এখানে-ওখানে ফেলে রাখবি না। যত্নে রাখিস—ছিঁড়ে না-যায়! কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে যখন দুই প্রতিপক্ষ পাণ্ডব এবং কৌরব মুখোমুখি, তখন ছোটবেলা থেকে যাদের সংসর্গে বেড়ে উঠেছেন, সেইসব গুরুজন, আত্মজন, ভাইদের সামনে পেয়ে হঠাত্‍ বিমর্ষ হয়ে পড়ছে অর্জুন। তার আর যুদ্ধ করতে মন চাইছে না। এই যে কোনো নিশ্চিত কর্মের মুখোমুখি হয়ে আমাদের যে হঠাত্‍ মনে হয়, এত কার্যকারণ পেরিয়ে, শেষমেশ কী প্রয়োজন এই জয়ের? সেই কর্মের পেছনে কতটা রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খল কাজ করে, আর কতটাই বা ব্যক্তির স্ব-ইচ্ছা? কাতর অর্জুন বলছেন: ‘স্বজন নিধনে, বলো, মঙ্গল কার কিবা হবে? / চাই না এ জয়, সুখ, রাজ্যপাট বাসনা করি না’। 

সেই দিনের কথা ভাবি, হুগলির কোনো প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে হাওড়ার বন্য জলাভূমিতে উঠে আসা বিস্ময়ে আপ্লুত কিশোর, পানবরজের ঝোপে বল কুড়তে এসে দেখছে, বল হাতে দেবী শমীচণ্ডী উঠে আসছেন জল থেকে। বলছেন, এখানেই  বাড়ি করতে হবে তোকে, থাকবি এখানে তুই। এরপর এই শেয়াল চড়ে-বেড়ানো ভূমিতে গড়ে উঠবে হাইস্কুল, পোস্ট-অফিস, শমীচণ্ডী-মন্দির, রেশনের দোকান। ছোট্ট জনপদ তার প্রসন্ন শরীর নিয়ে চলবে হেলেদুলে। কমলাময়ী মিষ্টান্ন ভান্ডারের পাশে কমল দর্জির দোকান। সেই কমল দর্জিকে শেষ কবে প্যান্ট পরতে দেখেছে ইছাপুরের লোকে, সে এক ভুলে-যাওয়ার বিষয়। কোমরের মাপ না-নিয়েই একের পর এক প্যান্ট তৈরি করা কমল দর্জি দোকানপাট গুটিয়ে কোথায় চলে গেল বৃদ্ধ বয়সে। শমীপোকার অভিশাপ এখনো শহরতলির ফুসফুসকে আক্রান্ত করে—কুরে কুরে খায়। জলাভূমি বুজিয়ে ক্রমশ ভিটে গড়ে উঠতে থাকে। টালির চালের দুটো মাত্র ঘর আর শ্রীরামপুরের মেয়ে আমার ঠাকুমা। ঠাকুমা যখন রাতে রান্না চাপাত, শেয়াল ডাকত অদূরে বাঁশঝাড় থেকে। রুটি করতে-করতে হঠাত্‍ ঠাকুমার মনে হল, একটা কালো মাথা সরে গেল জানলা থেকে। এমন তো কতবার হয়েছে। বেশি ঘরবাড়ি ছিল না এখানে। রাতের বেলায় প্রায়ই বিদ্যুত্‍ চলে গেলে তখন এইসব উঁকিঝুঁকি চলত। এসব থামাতে এমনকি পাড়ার ছেলেরা রাতপাহারা পর্যন্ত বসিয়েছে। তাদের উদ্যত সাবলের মধ্যিখান চিরে দেওয়াল বলতে কাস্তে-হাতুড়ি আর হাত। এই দুই দেওয়ালের পাশ দিয়ে যে-রাস্তা চলে গেছে ওই বড় পুকুর পর্যন্ত, সেখানেই বিপ্লবের বাড়ি। বিপ্লবদা টিউশনি করত, ভাল অঙ্কের টিচার। তার বাড়িতেও লাল বই ছিল, তবে তার প্রসঙ্গ আলাদা। 

গীতা পড়া মানে মহাভারতের কিনার ঘেঁষে চলা, প্রেক্ষাপটে যার যুদ্ধ, তার শুরু ঐরকম যুদ্ধবিরোধী ভূমিকা ভাবা যায় না। যুদ্ধ তো হবেই, অবশ্যম্ভাবী। ব্যক্তির দুঃখবোধকে উত্তীর্ণ করে কৃষ্ণের দার্শনিক, নৈর্ব্যক্তিক কথাবার্তা আবার বিষাদক্লিষ্ট অর্জুনকে গাণ্ডিব তুলে নিতে সাহায্য করবে। ফেরাবে রাষ্ট্রীয় পুনর্গঠনের বৃহত্তর স্বার্থে। তবু তার আগের ওই কষ্ট, প্রিয়জনদের বধ না-করতে-চাওয়ার মানবিক আকুতির তুলনা হয় না। কৃষ্ণ আত্মার নিত্যতার বুলি শুনিয়ে মাথা চিবচ্ছে অনিত্য অর্জুনের। বিবাদ তো সেই ক্ষমতা নিয়েই। কেউ পাবে, কেউ পাবে না। শুধু কিছু রক্তপাত হবে। যেন পৃথিবীকে শান্তিকামী রাখবার ট্যাক্স, এর বেশি কিছু না। ক্ষমতার জন্যে ব্যতিব্যস্ত হওয়া স্নেহ-প্রেম-বিরহ-ক্ষুধা-তৃপ্তি-যৌনতার মতোই স্বাভাবিক একটি বিষয়। সেই কারণে এ-নিয়ে সফল যুগান্তকারী মহাকাব্য সৃষ্টি হয়েছে। আর যারা তিল তিল করে বেঁচে থাকছে পোকামাকড়ের মতো? তাদের বুঝি মহাকাব্য নেই? পানবরজে ঢেকে-থাকা এই জলাভূমিতেই পরে একসময় জমি নিয়ে বিবাদ হয়েছে। খুন হয়েছে মানুষ। শীর্ণ পুকুরের পাড়ে উপুড় হয়ে পড়ে থেকেছে বছর বাইশের তাজা তরুণের মৃতদেহ। হাওড়ার শিল্পাঞ্চল বৃদ্ধি পেতে-পেতে এসে পৌঁছেছে ইছাপুর পর্যন্ত। শেফিল্ড শহরের অপরিসর গলিঘুঁজিতে সময় লেপে দিয়েছে বাম-কংগ্রেস রাজনীতি থেকে লোহাচুর-বাবরি নিয়ে বিস্তর মারামারি মায় খুনখুনি পর্যন্ত। কত-কত রাতের অজ্ঞাতে রাস্তায় রক্তের দাগ ধুয়ে নেমে গেছে ড্রেনে। পরের দিন ভোরবেলা দুধ আনতে বেরিয়ে হঠাত্‍ যদি চোখে পড়ে এই কালচে নদীর মরা সোঁতা—বুক শুকিয়ে আসে, হাত থেকে গাণ্ডিব ছিটকে পড়ে যায়। অপরিসর, নম্বর না থাকা রাস্তায় পুলিশের ভ্যান। এলাকায় অঘোষিত কারফিউ। এমনকি অজ্ঞাতে কেউ ছাদে উঠে পড়লেও ত্বরিতে নেমে যাবে সিঁড়ি বেয়ে। পাড়ার, কয়েক বাড়ির পরের ছেলেটাই যে মারা গেছে। মায়ের চাপা কান্নার কুয়াশা ভেদ করে সেই ছেলে বুঝি সাইকেল চালিয়ে,ক্রিকেট ব্যাট নিয়ে আবার ছুটে যাচ্ছে ডুমুরজলা স্টেডিয়ামে। শহরতলির এমন সব অবান্তর স্বপ্ন আছে, অবান্তর দুঃখ। রাতের আকাশে নক্ষত্র ফুটে উঠলে--ছায়াপথে সেইসব অভিনীত হয়। 


কৃতজ্ঞতা: এই লেখায় উদ্ধৃত গীতার বঙ্গানুবাদ নেওয়া হয়েছে বিশ্বদেব মুখোপাধ্যায় প্রণীত 'মহাপয়ারামৃতগীতা' (ভাষালিপি) থেকে।


ছবি : বিধান দেব 

                                                           (ক্রমশ...)




 



গুচ্ছ কবিতা ।। সৈকত পট্টনায়ক


 

ঈশ্বর : একটি ধারণা 

জলের উপর ভাসে একলা হাঁস |
তার অনেক উপরে সূর্যালোক 
         ক্রমে ছায়া নয় হংসবিম্ব জলে ধরা,
উত্তর আকাশে দৃষ্টি রেখে ধীর
আরও স্থির হয়ে আসে তার গতি 
স্থির হয় জলবিম্বের প্রতীকে;
দখিনা হাওয়ার স্পর্শে ক্রমে দুরে যেতে যেতে 
হংসমায়ায় নিশ্চল জলকাব্য নড়ে ওঠে ----
এই পূর্ণতার কোলাহলে আমাদের 
                 একক ঐশ্বরিক বোধ জাগে|




বোধিবৃক্ষের নিচে 


বোধিবৃক্ষের নিচে বসেছে বালক |
পিছনে পিছনে ছায়ারাও এসে জুটেছে তার পাশে 
সংসার ধর্ম বড় মায়াময় 
            কেবল মায়ের মত কাছে টানে!
বালক কিন্তু স্থির নিশ্চল ভাবে বসে থাকে 
মায়ের আঁচলের গভীরতার বিপরীতে 
সে স্বাধীন পুরুষ হয়ে ধ্যানস্থ হলো ----
ধ্যানে যাতে বিঘ্ন না ঘটে প্রকৃতি সজাগ হয়ে 
আলো দেয়, ডালপালায় স্নেহ করে 
হওয়ায় উড়িয়ে আনে হাজার বছরের ভৃগুকথা:
নিজের ভিতর আরও শূন্যে মিলিয়ে যেতে যেতে 
বালক অনুভব করে মায়ের টান ক্রমশ আলগা হয়ে আসে|
মহাশূন্যে মহাকবিতায় আলোহাওয়াবাতাস কিছু নেই 
                              কেবল ছায়া ছায়া ঘোর;
মাতৃস্নেহে পালিত বালক এককে হাঁপিয়ে ওঠে 
অসহনীয় নিজেকে প্রবোধ দিয়ে ধ্যানমুদ্রা ভঙ্গ করে 
প্রথম ভোরের মতো চোখ খুলে 
বালকের ধারণা --- বোধি চরাচরে একক বলে কিছু নেই,

ইহজন্মে এই অলৌকিক শিক্ষার আশায় 
পশুপাখি সমেত হাজির গোটা এক মানব প্রজাতি|



মাহাত বন্ধুর বিয়ে 


মাহাত বন্ধুর বিয়ে| পুরোহিতহীন শরৎ রাতের মতো 
শীতল বিবাহ পদ্ধতি ; মুগকলাইয়ের প্রদীপ 
মৌন উচ্চারণ যেন পারস্পরিক বোঝাপড়ার সারাৎসার !
অদূরে ক্ষয়াটে মলাটের চাঁদ 
                  শতচ্ছিন্ন মেঘ তেমনই নির্বিকার ,
ঘুমন্ত মাদুরের উপর ঘুমন্ত দম্পতি 
কারুশালার পাঠে কিশোর হরগৌরী: 
ছায়াময় অন্তরাল থেকে দয়া নেমে আসে 
স্নেহাশিস আরও ---- ; পূর্ণতম আগুনের সাক্ষাতে 
আমৃত্যু অপরের সাক্ষী হয়ে রইলো|



প্রতীতি

কিছুদূর হেঁটে চলি 
হেঁটে চলে প্রতিরূপ ছায়া আমার :
আলোর বিনাশে অন্ধকার ------ তমসায় ছায়া নেই 
অথবা আমি নিজেই ছায়ার প্রতিভূ হয়ে সর্বজ্ঞ 
                     নিরবতা রচনা করি |
কখনও হেঁটে চলি ইহজাগতিক পথে 
ইতিউতি ছায়াস্পর্শ ঘটে যায় --------
সম্মুখে আলোর উপমা হিসেবে কেউ স্থির 
ধীশক্তি নিয়ে জেগে ওঠেন আর 
জন্মের প্রান্তে আমার প্রকৃত দূরত্ব থেকে যায় -----


ছবি : বিধান দেব 


গুচ্ছ কবিতা : স্নেহাশিস মুখোপাধ্যায়


 

বর্ষাপ্রধান  


অটবী 

হঠাৎ কেন স্বর উঠে যায়?
কেন গিয়েছিলো,
জানি না তো? 
তোমার থেকে তোমার গৃহিণী 
আরও পরিচিতা!
না তো!
মনে হয়, যেন, আমাদেরই পদবী।
তাই কি স্বর উঠেছিলো
আহ্লাদে, অটবীর?


সাঁতারু 

সমস্ত ঋতুর গান এক লপ্ত মেহমান।
তাকে মনে রেখে যেভাবে সাজিয়েছো
সেভাবেই তারা ঋতুবন্ধনীর ভেতরে আছে তো?
পাড়ায় পাড়ায় বৃষ্টি নেমে এলে
পকেটের রুমাল জলে ভেজাও, 
নাকি, রুমাল জ্বলে... 
যেভাবে ঘরবাড়ি পোড়ে, মানুষের বাগানও
ভেতরের খানাখন্দে ভেঙে ভেঙে গুঁড়ো গুঁড়ো হয়? 
সেরকম পশলা গানে 
নিক্ষেপগুলো জেগে থাকে?
তীরের দু-দিকে ফলা - 
ছুঁড়বো কিভাবে?
যেভাবে মধ্যবর্তিনী হাঁটে - 
ক্ষমা ও তীব্রতায়? 


স্পঞ্জ 

ছোঁওয়ালেই তুমি সব শুষে নেবে
এমন নরম তুমি?
ভগীরথ- মনোভূমি?
মাথায় শিরায় জলগুলো কাঁদছে।
বেঁধে রাখো, তুমি বড়ো জলাধার...
এমন শক্ত তুমি।

ছোঁয়ালেই সব শুষে নেবে,
এমন নরম তুমি! 


বৃত্র 

তুমি আর আমি বৃত্র। 
বৃত্রাসুরের গর্ভে
আমরা খাবি খেতে খেতে হাঁটবো।
জন্মালে, সব-দশ দিক ফালা ফালা... 
তেমন জন্ম কোথায়?
দিন নেই কোনো রাত নেই, 
এমন কোনো সময়
শিশুপাঠ থেকে চুরি করো সব অস্ত্র।
শান দিয়ে দাঁড় করাও।
এসো, এবার সবাই মিলে 
নিজেদেরই মড়া পোড়াই।
মহাশঙ্খরা খুলির মেধায় নাচবে। 
আর তপ ও সাধনা মহাপীঠ ছেড়ে
খ্যাপার মতো কাঁদবে।
শান দিয়ে কাঠগড়ায়
অস্ত্র-শস্ত্র ভেঙে ফেলে এক নির্মম তানপুরায়
সবাই মিলে কি গাইবো... 

আমরা সবাই বৃত্রাসুরের বংশ! 


মহাশঙ্খ

শ্মশানের পথ -
কাঠচিতা বড়ো খোলা।
ডেডবডি তাই ওপর ওপর পুড়ছে।
খুলিতে বোধহয় ঘিলু কেঁদে ওঠে রাতে।
কাঠচিতা বড়ো খোলা।
শ্মশানের পথ
ছোটো জঙ্গলে ঘেরা।
সন্ন্যাসী শুধু খিলখিল করে হাসছে।
খুলিতে মদের যোগ ও যোগিনী কড়া।
ডেডবডি তাই ভেতরে ভেতরে জ্বলছে।





কৃষ্ণকান্ত 

নিশাচর বরফে জেগে আছে প্রেমিক।
নিশাচর, সমস্ত ধার্মিক!
দাউ দাউ করে জ্বলে গেছে লোকালয়গুলো,
গভীর স্বপ্ন মুছে গেছে, 
হুলোরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে আছে। 
সুমহান সিঙ্গাপুর,
নিশাচর প্রেমিক জেগে আছে। 




ভরপেট

গর্বে বুক ভরে যায়
সমঝে কথা বলো
আরক খেলে হজম হয়
বানান করে চলো।

এখানে খুব মশা
মশারি টাঙাই রাতে
বাইরে যদি কেউটে ঘোরে
অ্যাসিড ছড়াই পাতে।

গর্বে বুক ভরে যায়
পরীক্ষাতে ফেল করেছি বলে। 
আমার কিছু হবার ছিলো...
কেউকেটা নয়, তুচ্ছ এলেবেলে।

গর্বে বুক ফেটে যায়...
মায়ের দুটো কিডনি ফেল করেছে।
মা-মরা ছেলে বিড়ি খেয়ে
শ্রাদ্ধের আগে হবিষ্যি-পেট মেরেছে।

বলিনি তো মা খিদে পায়
আমার খুব খিদে পায়! 
মা শোনেন ওই চূড়ার থেকে, 
তাই গর্বে বুক ফেটে যায়! 


বাঁশ 

কিভাবে যেতে, কিভাবে যেতে বাঁশ?
বাঘ পালায়, জলেতে কেউ নেই।
সেভাবে ছিলো বনের কাঠুরিয়া
ফলতঃ তার চিৎপটাং-ই সই।

আমিও আছি, সেভাবে বেঁচে আছি
সকাল আর বিকেল সিনোনিমাস। 
মুখ বুজলেই পিছলে যাওয়া পড়ি
চোখ বুজলেই কিশোর অমনিবাস।



সুগন্ধ 

আমার চাওয়া না চাওয়ায়, 
কে তুমি এলে পুষ্প!
এলেই যখন আনন্দ হও,
ফুল ফোটে যে অল্প! 
আমি, দুঃখে পড়েই আছি
মন-ধাঁধানো স্বর্ণচাপার বুকে!
তোমার ইমেজ মন বসানো,
গন্ধরাজের স্বপ্ন গেছে চুকে। 


ছবি : বিধান দেব