||১||
৩. সমতার গান
অসুর ও দেব— প্রজাপতির সন্তান
উভয়েই। কিন্তু তারা জোরদার স্লোগান
হেঁকে যুদ্ধ জারি করল। প্রাচীন ইরাকে
আসিরীয় জাতি ছিল। তারাই ঘোড়াকে
বশ করেছিল, যুদ্ধরথ ও চাকার
আবিষ্কর্তা তারা, কিংবা লোহা ব্যবহার
করতে শিখেছিল বেশ। তাদেরই মন্দিরে
অসুরের পুজো হত। হয়তো ধীরে-ধীরে
সে সব কাহিনি, জ্ঞান, বিচিত্র সভ্যতা
সুদূরে ছড়িয়ে পড়ে। সেইসব প্রথা
ধর্মগ্রন্থে মিশে আছে। রাজা আখ্নাতন
মিশরে করেছিলেন পুজো-প্রবর্তন
একেশ্বর অতনুর— অর্কদেব যিনি,
তিনিই জেহোভা (জিহ্বা?)— মোজেস-বাহিনী
যাঁকে মান্য ক'রে প্যালেস্টাইনে পৌঁছায়।
তিনি ব্রহ্ম-পরমেশ হিন্দুর প্রজ্ঞায়।
হিব্রু-সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ নায়ক ডেভিড
প্রতিষ্ঠা করেন জিহ্বা মন্দিরের ভিত।
এ-সমস্ত ইতিহাস। ইহুদি জাতির
একেশ্বরবাদ ক্রমে পেয়েছে খাতির
সারা পৃথিবীর ধর্মে। অসুর ও দেব—
আদি উৎসজাত দুটি জাতি অতএব।
প্রত্ন-উইকিপিডিয়ায় সিন্ধুদেশিগণ
মুখে-মুখে করেছেন সমস্ত বর্ণন।
সব জাতি মিশ্র জাতি আজ পৃথিবীতে।
বিশুদ্ধ কে আর আছে ধর্মের প্রেক্ষিতে?
তবু ভ্রাতৃ হিংসা জমে,— 'সেল্ফ' ও 'আদার'!
ইজ়রায়েলে, নন্দীগ্রামে ছায়া দেখি তার।
দেবতা-অসুর— ভাল-মন্দেরই প্রতীক
এভাবে ভাবাই আজ সিম্পল লজিক।
ক্ষুদ্র অভিমানই হল জীবত্ব। জীবের
জন্মকাল খুঁড়ে খোঁজ পাব অমৃতের।
ভোগের আকাঙ্ক্ষা থেকে শুরু পাপবোধ
ইন্দ্রিয়ে ও মনে জাগে আত্মপ্রতিরোধ।
চোখ, কান, বাক, মন স্বার্থপরতায়
ফেঁসে গিয়ে অসুরের হাতে হেরে যায়।
মুখ্যপ্রাণ স্বার্থহীন— প্রতীকী দেবতা
যজ্ঞে মন্ত্রগান গেয়ে পেল সফলতা।
বাক, ঘ্রাণেন্দ্রিয়, চোখ, কান কিংবা মন
এখনও যা কিছু করে কুচর্যা গ্রহণ—
অশালীন আলাপন, পূতিগন্ধ শোঁকা,
অপ্রিয় শ্রবণ, কিংবা মতলব ছকা—
সে-সবই আদিম সেই আসুরিক পাপ।
শুধু প্রাণ দেবশ্রেষ্ঠ। নিঃস্বার্থ স্বভাব।
প্রাণ এল কোথা থেকে?— প্রশ্নের উত্তরে
শাস্ত্র বলে, সে তো ছিল আস্যের ভেতরে।
'আস্য' মানে মুখ, তাই অয়াস্য নামেও
ডাকা যায় তাকে, অন্যদিকে ডাকে কেউ
'আঙ্গিরস' নামে— অঙ্গপ্রত্যঙ্গ প্রাণের
অভাবে যেহেতু শুষ্ক হয়ে যায় ফের।
প্রাণের অনেক নাম, কেউ ডাকে 'দূঃ',
মৃত্যু থাকে তার থেকে দূরত্বে যেহেতু।
পাপ-রূপ মৃত্যু থেকে সব ইন্দ্রিয়কে
বাঁচিয়ে সীমান্তে আনে, যেখানে না ঢোকে
কোনও পাপাচার, যেন লাইন অভ্ কন্ট্রোলে
জীবন পবিত্র থাকে, পাপে পা না টলে।
সমস্ত ইন্দ্রিয় পঞ্চপাণ্ডবের মতো
ভয়ংকর সিম্বলিক, তাদের আহত
শরীর বহন ক'রে প্রাণের দেবতা
মৃত্যুর অতীতদেশে এনেছে কোথাও—
যেখানে প্রণম্য অগ্নিরূপে জ্বলে বাক্,
বায়ুরূপে প্রবাহিত হতে থাকল নাক।
মৃত্যু পার করে চোখ আদিত্য হল হে,
কান হল নানা দিক, অক্ষয় এ-গ্রহে।
মরণ পেরিয়ে মন ঝলমলে জ্যোৎস্নায়
পরিণত হল, যাকে আজও দেখা যায়।
এসব প্রকৃতিতত্ত্ব দেহের কোটরে
ভরা থাক চিরকাল অক্ষরে-অক্ষরে।
প্রাণের প্রচুর নাম— সে-ই বৃহস্পতি
(বাক্যের পতি সে, আর বাক্যই বৃহতী)।
আবার যেহেতু বাক্য ব্রহ্ম, তাই প্রাণ
ব্রহ্মণস্পতি নামেও পরিচিতি পান।
আবার প্রাণই সাম,— সমান জীবিত—
ভাইরাসে, মশকে কিংবা হস্তীতে নিহিত।
প্রাণ 'উৎ', বাক্য 'গীথা'— সুস্বর 'উদ্গীথ'
যে গায়, সে 'সুবর্ণ' পায়,— বর্ণ ও সংগীত
এইভাবে মিলেমিশে গায়কের জিভে
অমৃত সঞ্চার করে, মৃত্যুময় জীবে
প্রতিষ্ঠা— অন্ন বা সোনা, ধন— বর্ণ-ধ্বনি
সমস্ত সমান— সারেগামা সামা ধানি।
এভাবে গানের মধ্যে অমৃতের কথা
বলাই প্রাণের ধর্ম, জ্ঞানীর দক্ষতা।
পবমান মন্ত্র— অভ্যারোহ (দেবত্বে আরোহন): সামের প্রস্তাব-গীতি
'আমিই কর্মের কর্তা'— এই অভিমান
ছেড়েছুড়ে পাওয়া যাবে সত্যের সন্ধান।
সমস্ত কাজের মূলে অহং-পুরুষ
তিনিই আসলে আত্মা, জীবিতের হুঁশ।
তাঁরই ইচ্ছায় চলে দুনিয়া-সংসার
এই জ্ঞানজ্যোতিতেই ঘোচে অন্ধকার।
আঁধারই অসুর। জৈব মৃত্যু পার ক'রে
অমৃতলোকের শ্রুতি বাজুক অন্তরে:
"অসত্যে জড়িয়ে আছি, সত্যে নিয়ে যাও
অজ্ঞান আঁধারদেশে আলো পৌঁছে দাও
মৃত্যু পার ক'রে প্রাণ অমৃতে ধাওয়াও..."।
[প্রথম অধ্যায় তৃতীয় ব্রাহ্মণ শেষ। চতুর্থ ব্রাহ্মণ ]
(ক্রমশ...)

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন