২৩.
খুব সহজ তোমার সঙ্গে আচমকা দেখা হওয়া
দু দণ্ড দাঁড়িয়ে কথা, তোমার আমার কথা, দুঃখসুখ অর্ধেক না শুনে আরও যা সহজ, নিছক সান্ত্বনা
বিষণ্ণ দু চোখে চোখ, বিধ্বস্ত দু কাঁধে হাত রেখে
যদিও দুজনে জানি কিছুই হবে না ঠিক, বরং সহজ
এর চেয়ে আরও বেশি দুর্দিন সামনে আছে,
যা খুব সহজ নয়, এই যে ক্রমশ ডুবে যাচ্ছি, খাচ্ছি
বাইরে সমুদ্র-ঢেউ, ভিতরেও অস্থিরতা, এলোমেলো
আমরা সান্ত্বনা দিই পরস্পর, চোখে চোখ, কাঁধ ছুঁয়ে
অথচ বুঝি না জল বোকা করে রাখে আমাদের,
যখন হাত পা ছুঁড়ি হয়ে যাই একা, কেউ কারু হাত
কখনও—
জানলার ঘষা কাঁচে ওপাশে কুয়াশা, ভোররাতে টেলিফোন ডাকে,
বেয়ারিং হয় চিঠি, রাস্তা থেকে উড়ে আসে আর্ত
সমস্ত মিলিয়ে শুধু শুনি নিজের গলার স্বর, আর্তনাদ নাভি থেকে উঠে আসা শব্দের তরঙ্গ, ভয়, চেনা ও
খুব সহজ তোমার সঙ্গে আচমকা রাস্তায় দেখা হওয়া ভাল নেই, তবু দেখো পরস্পর সহজেই বলতে
ইচ্ছে ছিল কবিতাটি সম্পূর্ণ তুলে দেব । তা দেওয়াই যথেষ্ট হবে। তাহলে এত লেখার আর প্রয়োজন থাকত না । কিন্তু তা তো হবার নয় । তাই ভাবনাকে দীর্ঘায়িত করতেই হল ।
এ কবিতার প্রতিটি অক্ষর শব্দ বাক্যে সেই ধাক্কা আছে , যা অমোঘ অথচ যার টান অস্বীকার করবার ক্ষমতা নেই কারো । প্রদীপচন্দ্র বসুর 'ভালো আছি' পড়তে পড়তে ফেলে আসা জীবনের প্রেম পর্যায় ঘনিষ্ঠ হতে চায় । জীবন সবসময় যে সুখপাঠ্য তা তো নয় । মধ্যে মধ্যে প্রতিফলনেও রক্তক্ষরণ হয় । সে যদি আজ আমাকে জিজ্ঞেস করে, কেমন ?তাহলে সত্যিই কি বলতে পারব 'ভালো আছি '! নাকি ওই বলার টুকুর ভেতরে সমগ্র অতীত একবার ফণা তুলে হিস্ হিস্ শব্দ করে উঠবে । অন্তরঙ্গ হয়েও যে মুখ ফেরানো থাকে বিতর্কিত কৌশলে।
প্রত্যেকে এভাবেই নিজের জীবনকে কাটাছেঁড়া করতে পারেন কবিতাটি পড়ার সময় । অথচ কবি চিরাচরিত যন্ত্রণাকে বাঙ্ময় করেছেন পংক্তিতে পংক্তিতে । তিনি আজ বিষণ্ণ, বিধ্বস্ত । সান্ত্বনার মত সর্বতাপহারী ভাষা নেই দুজনের কারো কাছে । তবু ওই যে ' দু দন্ড দাঁড়িয়ে কথা ', ' দুঃখ সুখ ' ইত্যাদি ইত্যাদিরাও চেনা অচেনার মত আচমকাই আমাদের এলোমেলো করে দেয় । আবেগকে তখন বাধা দেবার কেউ থাকেনা । সে মৃদুভাষী থেকেও সর্বোচ্চ ডেসিবেলে ঘোরাফেরা করে।
এই যে ডুবে যাওয়া , অথবা ডুবে যাওয়ার অস্থিরতা ব্যক্তি মানবকে এলোমেলো করে দেয় । তার মধ্যে থাকে অকৃত্রিম সহজ ভাষা । যে ভাষা বুকে চেপে ঈষৎ পক্ককেশ প্রেমিক পথ হাঁটে প্রতিদিন। যে ভাষা আত্মার পরিব্যাপ্তে আটকে নিয়ে উদাসীন পথ অতিক্রম করে ছিন্ন ডানা পক্ষিণী। দুজনের জীবন জানালার ঘষা কাচ আর ওপাশে থাকা কুয়াশার মতো।
কবির এই নস্টালজিক ভালোবাসা ভাবতেও ভালো লাগে আমাদের মত কিছু অভাগার । আমরা যারা কৃত্রিম ছোঁয়ায় একদিন ক্ষত করেছি নিজস্ব চলাকে। শুধু আর্তনাদ আর নাভি থেকে উঠে আসা ঘৃণার তরঙ্গ ---- যখন শরীর অবশ করে দিয়েছে বসন্ত উৎসবে । এ কবিতা তাই আমাদের নয় । যারা রক্ত নিয়ে এক বেলা দুবেলা তিনবেলা হেঁটে গেছি প্রেমের ইপ্সিত সিংহাসনের দিকে । তারপর ---
" ঝর্ণার জল দেখে তারপর হৃদয়ে তাকিয়ে
দেখেছি প্রথম জল নিহত প্রাণীর রক্তে লাল
হ'য়ে আছে ব'লে বাঘ হরিণের পিছু আজো ধায়;...। "
খুব সহজ অথচ সহজ নয় এই উচ্চারণ । সৃজনের পরতে পরতে জড়িয়ে থাকে ভালবাসার বিষদাঁত!
২৪.
আমি আছি এক বস্তা সিমেন্টের মধ্যে, আর
তুমি এক ড্রাম চুনের ভেতর
ক্ষয়ে যাওয়া চোখ
ক্ষয়ে যাওয়া নাক
ব্লিচিং-পাউডারের প্যাকেটের মধ্যে কান
তাকে সিমেন্টের স্বরে, চুনের ভাষায়
আমরা বলতে চাই
সেই সব ক্ষয়ের কথা, বলি—
থ্যাতলানো ফুল, থেঁতলে যাওয়া ফল
' ভালো আছি ' কবিতাটির আলোচনা যেখানে শেষ করেছি , তার পর থেকেই শুরু হবে 'জবানবন্দি'। সমর রায়চৌধুরীর লেখা এই কবিতার ভাষা আধুনিক, ইমেজ আরো আধুনিক । আর যন্ত্রণা---- সে মনের অসূয়া নিয়ে তার প্রত্যাখ্যানকে বিশ্বাসের স্টেজে দাঁড় করাতে চেষ্টা করবে সর্বদা।
দুজনেই কষ্টে আছে । কিছু যন্ত্রণা যেমন তাকে ঘিরে আছে তেমনই যন্ত্রণার অবশিষ্টাংশ আটকে আছে এ পক্ষেও । সিমেন্ট আর চুনের ড্রাম ---- দুটি বস্তুই উচ্চারণ-গুণে মানবিক সত্তায় পরিণত । অথচ প্রেম
বা তা থেকে বিচ্ছেদ ইত্যাদির চিত্রকল্প সৃষ্টিতে এমন উপমা অগ্নিময় হয়ে ওঠে পাঠকের দরবারে। স্বাভাবিক ভাবেই যন্ত্রণা থেকে মনে আসে এক ধরনের নিষ্ঠুরতা । তা থেকে প্রতিপক্ষের প্রতি নির্বিকার পরিস্থিতি । চুন অথবা সিমেন্টের ক্ষয় গুণে চোখ নাক আজ যেতে বসেছে । এমন এক সংক্রমণের কাছে শুধু টিকে আছে কান । ব্লিচিং- পাউডারের মধ্যে প্রবেশ করেও যার এখনো শোনার ক্ষমতা হারিয়ে যায়নি । হতে পারে সেই পাউডার সিমেন্ট বা চুনের মত এতটা প্রভাবশালী নয় । আবার এও হতে পারে , ব্লীচিং-এ মেশানো হয়েছে সামাজিক প্রতারণা । মানুষের সঙ্গে স্বঘোষিত এই লড়াই আজ রাষ্ট্রের মূলে।
অথচ এমন এক অন্যায় না ঘটলে আমরা শ্রুতিযন্ত্র অক্ষত পেতাম না । অক্ষত অর্থে শোনার যোগ্য । চোখ নাকের মত অথর্ব নয় সে । শুনতে পাওয়ার খানিক ধৈর্য তার বেঁচে আছে। টিকে আছে পুরানো বন্ধুত্বকে স্বীকার করে নিয়ে আজকের পৃথিবীতে চলার কিছু ইচ্ছা। তারপরেও...
তারপরেও সেই ক্ষয়ের কথাই আসছে । এমন এক ক্ষয়, যেখানে ফুল ও ফল থ্যাঁতলানো । দুটোই প্রতীকী । অথবা প্রতীকী নয় । সৌন্দর্য যেমন চাই; ঠিক সে ভাবে দরকার খাদ্যের । দুয়ের অভাবে মানুষ খুনি হতে পারে , হতে পারে ধর্ষক -ডাকাত- সমাজদাহ্য কোন মানুষ । কিন্তু কবি দেখছেন, তাঁর সেই আশা সুদূর পরাহত ! সেখানে ক্রমশই ' দুঃস্বপ্ন আর দীর্ঘশ্বাসের ' অন্তর্দৃশ্য।
আমাদের সমস্ত কাটাছেঁড়া নিজেকে নিয়ে । ওই সিমেন্টের বস্তা , ওই চুনের ড্রামে যেমন আমাদেরও ঢুকে পড়তে হয় সময়ে সময়ে ; ঠিক সেভাবেই ব্লিচিং- পাউডারের ভেতরেও ' আমারেই পাবে তুমি ইহাদের ভিড়ে ' !
ছবি : বিধান দেব
(ক্রমশ...)

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন