রবিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২১

জন্মের আগের মুখ ।। চন্দন মিত্র


 

জন্মের আগের মুখ : জেন তত্ত্ব ও জেন কোয়ানের অমায়িক ভুবন     

 

 

দশম পর্ব

দক্ষিণ ঘরানার বিবর্তন : আচার্য হুইনেং ও পঞ্চ-চ্যান সম্প্রদায়

 

ষষ্ঠ আচার্য হুইনেং দেখেছিলেন, পরম্পরিত আচার্য-পদের দখল নেওয়ার জন্য কীভাবে সতীর্থরা অশ্লীল প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠেন। সম্ভবত এই কারণেই তিনি কাউকে সপ্তম আচার্য হিসাবে  মনোনয়ন দিয়ে যাননি। ফলে ৭১৩ খ্রিস্টাব্দে তাঁর মৃত্যুর পর বোধিধর্ম থেকে বাহিত চ্যানধারাটির একক-আচার্য-পরম্পরায় ছেদ পড়ে। আচার্য-পরম্পরা ছিন্ন হলেও হুইনেং-এর হঠাৎ-বোধির মতাদর্শ চিনের বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়ে চ্যান-অনুরাগী তরুণেরা হুইনেং-কে পথপ্রদর্শক মেনে  চ্যান-পথে এগোতে থাকেন। প্রসঙ্গত শেং-হুই-এর নাম করতেই হয়। আচার্য হুইনেং-কে নিয়ে তাঁর একক সংগ্রাম চ্যান-ইতিহাসের এক স্মরণীয় অধ্যায়। তিনিই তা-ফান মঠের ধর্ম-মহাসভায় অকাট্য যুক্তি বিস্তার করে হুইনেং-কে ষষ্ঠ আচার্য হিসাবে প্রতিষ্ঠা দেন। শুধু তাই নয়, প্রভাবশালী উত্তর ঘরানার বিপরীতে দাঁড়িয়ে তিনি হুইনেং-অনুসারীদের পক্ষ নিয়ে দক্ষিণ ঘরানার প্রবর্তন করেন। তাঁর এই সাড়া জাগানো লড়াই থমকে যাওয়া চ্যানধারাকে পুনরায় গতিশীল করে তোলে। চৈনিক কিশোর-যুবারা হুইনেং-এর আদর্শ-পতাকা হাতে তুলে নেন। আন-লুশান বিদ্রোহ তাং যুগের স্থিতাবস্থায় চিড় ধরিয়ে দিয়েছিল। তাওবাদ, কনফুসীয় মতবাদ ও প্রচলিত মহাযান বৌদ্ধ মতের বাইরে বের হওয়ার তাগিদ থেকে সন্ধানী তরুণেরা আঁকড়ে ধরতে চাইছিলেন নতুন কিছু, যা তাঁদের নিয়মের কড়াকড়িতে না-বেঁধেও আত্মজ্ঞানের পথে এগিয়ে দেবে। শেং-হুই-এর বদান্যতায় তাঁরা পেয়েও যান পরম্পরিত এক আশ্চর্য ধারা, আচার্য বোধিধর্ম থেকে যা বাহিত হয়ে হুইনেং পর্যন্ত প্রবাহিত হয়েছে অকুলীন নিরক্ষর দক্ষিণ দেশীয় কাঠুরে হুইনেং জেগে উঠলেন নতুন করে। পিছনে পড়ে থাকলেন তাঁর তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বী রাজন্যপোষিত নীলরক্তের শেং-শিউ ও তাঁর উত্তর ঘরানা। মহাকালের স্রোতে হারিয়ে গেল শেং-শিউ-এর উত্তর-ঘরানা ও নিউতউ ফারং-এর ষণ্ডমুণ্ড-ঘরানা। দক্ষিণ-ঘরানাই টিকিয়ে রাখল চ্যানধারার প্রাণপ্রবাহ। মূলত হুইনেং-এর পাঁচজন প্রত্যক্ষ শিষ্য শেং-হুই ( ৬৭০-৭৬২ খ্রি:), নান-ইয়াং হুই-চুং (মৃত্যু, ৭৭৫ খ্রি:), ইয়ুং-চিয়া হুয়ান-চুয়ে (৬৬৫-৭১৩ খ্রি:), নান-উয়ে হুয়াই-জাং (৬৭৭-৭৪৪ খ্রি:), এবং চিং-য়ুয়ান সিং-সু (মৃত্যু, ৭৪০ খ্রি:)-এর শিষ্য-প্রশিষ্যরাই দক্ষিণ ঘরানাকে বিকশিত ও বিবর্তিত করেন। তাঁদের তন্নিষ্ঠ চ্যানচর্চা  থেকে জন্ম নেয় প্রসিদ্ধ পঞ্চ-চ্যান-সম্প্রদায়  কুয়েই-ইয়াং বা ইগেয়ো সম্প্রদায়, লিন-চি বা  রিনজাই সম্প্রদায়, সাও-তুং বা সোতো সম্প্রদায়, ইয়ুনমেন বা উম্মন সম্প্রদায় ও ফা-ইয়েন সম্প্রদায়। 

  

 

কুয়েই-ইয়াং সম্প্রদায় (Kuei-yang House)

 

চিনের ইতিহাসে তখন সিয়েন-থিয়েন যুগ, চলছে তাং-বংশীয় সম্রাট সুই-তাং–এর শাসন, খ্রিস্টাব্দের হিসাবে ৭১৩ ;  হুইনেং-এর মহাপরিনির্বাণের বছর। হুয়াই জাং (জাপানি উচ্চারণে এজো), দীর্ঘ পনেরো বছর হুইনেং-এর কাছে অধ্যবসায়ে কাটিয়েছেন। এখন তিনি চললেন হাং পর্বত অভিমুখে জাপানি ভাষায় যার উচ্চারণ নাননাকু। সেখানে তিনি পো-জো মঠে থাকতে শুরু করেন। তাঁর শিষ্য মা-ৎসু দাও-ই (জাপানি, বাসো দোইৎসু ৭০৯-৭৮৮ খ্রি:) ভাবতেন, বেশি বেশি ধ্যান করে তাড়াতাড়ি বুদ্ধত্ব লাভ করবেন।  প্রজ্ঞার গুরুত্ব তখন তিনি বুঝতেন না। তাঁকে প্রায় সবসময় ধ্যানস্থ দেখা যেত।  গুরু হুয়াই জাং-এর সঙ্গে মাৎসু-র এক চমকপ্রদ কথোপকথনের কথা জানা যায়। একদা মাৎ-সু ধ্যানে বসেছেন এমন সময় হুয়াই জাং সেখানে উপস্থিত হলেন। শুরু হল কথাবার্তা।  

   এই যে ছোকরা, ধ্যানে বসে কী হাসিল করতে চাইছ বলো তো ?     

   আমি বুদ্ধত্ব লাভ করতে চাইছি।

হুয়াই জাং একটি পাথরের ফলক হাতে নিয়ে তার উপর একটি পাথর খণ্ড বেশ জোরে জোরে ঘষতে শুরু করলেন। এবার মাৎ-সু কৌতূহলী হয়ে উঠলেন।  

   আপনি আবার এটা কী শুরু করলেন ?

   আমি এই পাথুরে ফলকটিকে আয়না বানাচ্ছি।

   একটা পাথুরে ফলককে এইভাবে আপনি আয়না বানাবেন কী করে ?

   তুমি যদি নিছক ধ্যানে বসেই বুদ্ধত্ব হাসিল করতে পার, তাহলে এটাও সম্ভব!  

এখানে স্পষ্টত উত্তর-ঘরানার ক্রমবোধির ধারণাকে নস্যাৎ করে ষষ্ঠ আচার্য হুইনেং তথা দক্ষিণ ঘরানার হঠাৎ-বোধির ধারণাকেই প্রতিষ্ঠা দেওয়া হয়েছে।

 

    মাৎসু-ই প্রথম চ্যানসাধক যিনি শিষ্যদের সম্বিত ফেরানোর জন্য আচমকা উচ্চকণ্ঠে চিৎকার  করে ওঠা, নাক মুচড়ে দেওয়া, হঠাৎ আঘাত করা ইত্যাদি উদ্ভট আচরণকে কাজে লাগান। তাঁর সম্পর্কে এমন কথা প্রচলিত আছে, তিনি হাঁটতেন ষাঁড়ের মতো আর তাকাতেন বাঘের মতো। তাঁর জিভ এমন লম্বা ছিল যা অনায়াসে তাঁর নাক ছুঁয়ে ফেলত। বলা হয় তাঁর আত্মার পায়ের ছাপ নেওয়া গেলে তা অবশ্যই গোলাকার হত। ‘ল্যাম্প রেকর্ড’-এ শিষ্যদের উদ্দ্যেশ্যে কথিত মাৎ-সু-র  বক্তব্যের অংশবিশেষ পাওয়া যায়। সেখানে তাঁর উক্তি এইরকম  যাঁরা সত্যের সন্ধানে ফেরেন   তাঁরা শেষমেশ এই সত্যে উপনীত হন, আসলে সন্ধান করার মতো তেমন কিছু নেই। মন ছাড়া কোনো বুদ্ধ নেই ; বুদ্ধ ছাড়াও কোনো মন নেই। ভালোকে গ্রহণ, মন্দকে বর্জন এই বিচারে যেয়ো না। পবিত্রতা-অপবিত্রতার ধারণা থেকে মনকে মুক্ত করো ; অচিরেই বুঝবে পাপপুণ্যের অন্তঃসারশূন্যতা।

ষষ্ঠ আচার্য হুইনেং বলতেন, নিজের প্রকৃতির দিকে তাকাও ও বুদ্ধ হয়ে ওঠো। মাৎসুর কথায়ও সেই আদর্শ প্রতিফলিত হয়েছে।

 

    মাৎসু-র বিখ্যাত শিষ্যরা হলেন  বাও-চাং হুয়াইহাই (জাপানি, হিয়াকুজো একাই ৭২০-৮১৪ খ্রি:), নান-চুয়ান পিয়াও উয়েন (জাপানি, নানসেন ফুঙা ৭৪৮-৮৩৪ খ্রি:),  হুয়াং-পো সি-ইয়ুন (জাপানি, ওবাকু কিউন মৃত্যু ৮৫০ খ্রি:) ও কুয়েই শাং চি চাং (জাপানি, কিছু চিজো) বাও-চাং হুয়াইহাই অর্থাৎ হিয়াকুজো প্রথম মাৎ-সু-র কাছে যান ২০ বছর বয়সে। কিছুদিন মাৎ-সু কাছে শিক্ষা গ্রহণের পর তিনি ফিরে যান। পরে দ্বিতীয় বার যখন তিনি মঠে আসেন তখন তাঁকে দেখে হিয়াকুজো ‘কাৎজ’ বলে এমন এক পিলে-চমকানো চিৎকার করেন যে, হিয়াকুজো তিনদিনের জন্য বধির হয়ে যান। চতুর্থ দিনে হিয়াকুজো যখন গুরুর সামনে উপস্থিত হন, ঠিক সেই সময় এক ঝাঁক বুনোহাঁস মাথার উপর দিয়ে উড়ে যায়   

গুরু বললেন, ওগুলো কী পাখি ?

— বুনো হাঁস।

— হাঁসগুলি কোথায় যাচ্ছে ?

   ওরা তো এতক্ষণে চলে গেছে।

এই উত্তর শুনে মাৎ-সু রেগেমেগে আচমকা হিয়াকুজোর নাকটা ধরে এত জোরে মুচড়ে দিলেন যে   তিনি যন্ত্রণায় ককিয়ে উঠলেন। মাৎসু তাঁকে ধমক দিয়ে বললেন, মূর্খের মতো বলে কিনা হাঁসগুলো উড়ে গেছে। ওরা কোথাও যায়নি, এখানেই আছে। মাৎসু-র এই কথা শুনে যন্ত্রণার মধ্যেই হিয়াকুজো বোধি লাভ করলেন।    

 

    হিয়াকুজো-র অন্যতম শিষ্য কুয়েই-শান লিংয়ু (জাপানি, ইসান রেইয়ু ৭৭১-৮৫৩ খ্রি:) জন্মেছিলেন ফুজিয়েন প্রদেশের জাংসি নামক জায়গায় তিনি পনেরো বছর বয়সে বাড়ি  ছেড়েছিলেন। প্রথমে কিছুদিন তিনি স্থানীয় জিয়েনশান মঠে নবিশ হিসাবে কাটান। তারপর তিনি হাংজউ-এর লংশিং মঠে থেকে হীনযান ও মহাযান মতের সূত্রগুলি চর্চা করেন। হিয়াকুজো-র কাছে   তিনি পৌঁছান ৭৯৩ খ্রিষ্টাব্দে ; তখন তিনি বাইশ বছরে উপনীত হয়েছেন। হিয়াকুজো প্রথম  দর্শনেই বুঝে নেন লিংয়ু নিছক শৌখিন সন্ন্যাসী নয়। তিনি তাঁকে শিষ্য হিসাবে সাদরে গ্রহণ করেন। ক্রমে লিংয়ু হয়ে ওঠেন অধ্যক্ষ হিয়াকুজো-র সহায়ক একদিন হিয়াকুজো তাঁকে বললেন, যাও পাকশালার চুল্লি থেকে একটু আগুন আনো। লিংয়ু ভাবেন, সেই তো কোনকালে রান্না শেষ হয়েছে এখন আগুনের ছিটেফোঁটাও চুল্লিতে থাকা সম্ভব নয়। তবুও তিনি গেলেন একটা কাঠি দিয়ে অনেক খোঁচাখুঁচি করেও ব্যর্থ হলেন। ছাইটাই মেখে হিয়াকুজো-র সামনে এসে বললেন, নিভে যাওয়া চুল্লিতে খোঁচাখুঁচিই সার হল। এবার চললেন স্বয়ং হিয়াকুজো, তাঁকে নীরবে অনুসরণ করলেন লিংয়ু। হিয়াকুজো অসীম ধৈর্য সহকারে চুল্লির ছাই ঘাঁটতে লাগলেন। আর ঘটে গেল এক আশ্চর্য ব্যাপার, যা চমকে দিল লিংয়ু-কে। হিয়াকুজো সেই ছাইয়ের স্তূপ থেকে খুঁজে বের করেছেন এক টুকরো আগুন। তিনি সেই আগুনটুকু দেখিয়ে বললেন, তবে যে তুমি বললে আগুন নেই ! এটা তাহলে কী ? এই জিজ্ঞাসায় লিংয়ু-র জাগরণ ঘটে, তিনি নতুন মানুষ হয়ে ওঠেন। তিনি বোঝেন পূর্ণতা অর্জনের জন্য এখনও তাঁকে বহু পথ হাঁটতে হবে। তিনি হিয়াকুজোকে তাঁর উপলব্ধির কথা জানান। পরের দিন লিংয়ু, পাহাড়ি পথে হিয়াকুজোর সঙ্গে ছিলেন। হিয়াকুজোর জিজ্ঞাসার পরিপ্রেক্ষিতে উভয়ের কথোপকথন শুরু হল

   আগুন এনেছ ?

   হ্যাঁ অবশ্যই।

   কোথায় দেখি ?

লিংয়ু, মাটি থেকে একটি কাঠের টুকরো তুলে নিয়ে দুবার শিস দিলেন।   

হিয়াকুজো বললেন  কাঠখেকো উইপোকা।

এই যে হেঁয়ালিপূর্ণ অদ্ভুত কথোপকথন, চ্যান-ঐতিহ্যে এর নাম কোয়ান (Koan)। পরবর্তীকালে  বোধিলাভের সঙ্গে কোয়ানচর্চা ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়বে। আপাতদৃষ্টিতে এই ধরণের কথাবার্তাকে প্রলাপ বলে মনে হলেও আদতে এগুলি কূটাভাস, প্রণিধানযোগ্য অর্থ সম্বলিত। 

 

    ৮১০ খ্রিস্টাব্দের কথা, শিমা নামের জনৈক সন্ন্যাসী এলেন হিয়াকুজো-র কাছে। মঠের শান্ত নৈঃশব্দ্যের ভিতর তাঁদের কথাবার্তা শুরু হল।  

শিমা আমি হুনান প্রদেশের কুয়েই পর্বতের তংশিং মঠ থেকে আসছি। ঠিক এইসময়ে আমাদের মঠে আবাসিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা,পনেরোশো    

হিয়াকুজো আমাকে কী যেতে হবে ?

শিমা না, না অবস্থা এমন নয় যে, স্বয়ং হিয়াকুজোকে যেতে হবে !

হিয়াকুজো আপনার কেন এমন মনে হচ্ছে ?

শিমা আপনি হলেন অস্থি-মজ্জার অধ্যাপক, আর আমাদের কাজকর্ম রক্তমাংস নিয়ে।

হিয়াকুজো আমাদের মঠের কেউ কি এবিষয়ে আপনাকে সাহায্য করতে পারে ?

শিমা আমাকে একটু পরীক্ষা করে দেখে নিতে হবে !

 

    হিয়াকুজো, মঠের প্রধান সন্ন্যাসী হুয়া-লিং চুয়ে-কে ডেকে শিমা-র সঙ্গে পরিচয় করিয়ে  দিলেন। শিমা তাঁকে কিছুটা দূরে ডেকে নিয়ে কয়েকটি বিষয় জানতে চাইলেন, তারপর তাঁকে  প্রস্থান করতে বললেন। লিংয়ু, তখন পাকশালার প্রধান পাচক। হিয়াকুজো, তাঁকে ডেকে পাঠালেন। শিমা তাঁকে এক ঝলক দেখেই বললেন, এই মুহূর্তেই আপনি আমাদের তংশিং মঠের মঠাধ্যক্ষ পদে নিযুক্ত হলেন। সেদিন রাতে লিংয়ু-কে ডেকে অধ্যক্ষ হিয়াকুজো বললেন, তুমি আমাদের মঠ থেকে তংশিং মঠে অধ্যক্ষের পদ নিয়ে যাচ্ছ ; আমার গুরুর শিক্ষা যা ইতিমধ্যে তোমার মধ্যে সঞ্চারিত হয়েছে তাকে পরবর্তী প্রজন্মের হাতে সযত্নে তুলে দিয়ো। পরের দিন সব শুনে হুয়া-লিং চুয়ে-র মাৎসর্য উথলে উঠল। তিনি হিয়াকুজো-র কাছে অনুযোগ জানালেন, আমি এই মঠের সন্ন্যাসীদের প্রধান ; আমাকে বাতিল করে লিংয়ু-কে অধ্যক্ষ করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, যে কিনা একজন পাচক ! হিয়াকুজো বললেন, ঠিক আছে তুমি যদি প্রজ্ঞার পরিচয় দিতে পার, তাহলে আমি তোমাকে অধ্যক্ষের পদে নিয়োগ দেব। তিনি একটি কলসিকে রেখে হুয়া-লিং-চুয়ে-কে বললেন, কলসি বা এর সমার্থক কোনও শব্দ উচ্চারণ না-করে বল দেখি এটা কী ? হুয়া-লিং চুয়ে সপ্রতিভভাবে বললেন, এটাকে আপনি কাঠের চৌকি বলতে পারেন না। এরপর লিংয়ু-কে ডেকে হিয়াকুজো একই কথা জিজ্ঞাসা করলেন। লিংয়ু, কিছু না-বলে এক লাথিতে কলসিটা উলটে দিয়ে  সেখান থেকে চলে গেলেন। হিয়াকুজো হেসে বললেন, আমাদের প্রধান সন্ন্যাসী পরাস্ত  হলেন। এক প্রাজ্ঞ চ্যানগুরু এই ঘটনার কথা শুনে প্রশংসা করে বললেন, লিংয়ু সত্যিই বিরল-বালক, এক  লাথিতে সে হিয়াকুজো-র সব বিধিনিষেধ ঘুচিয়ে দিয়েছে।

 

    লিংয়ু, তংশিং মঠে পেয়ে গেলেন তাঁর ধর্মসূরী ইয়াং-শান হুই-চি (জাপানি, কিয়োজান এজাকু ৮০৭-৮৮৩)-কে। উত্তর কোয়াংতুং প্রদেশের হুয়াই-হুয়া অঞ্চলের বাসিন্দা ছিলেন এই হুই-চি। তাঁর সন্ন্যাস গ্রহণের সিদ্ধান্তকে বাড়ির লোকজন প্রথমে মেনে নেননি। শেষে একদিন তিনি খেপে উঠে ছুরি দিয়ে নিজের দুটি আঙুল কেটে ফেলেন। বাধ্য হয়ে বাড়ির লোকজন তাঁর সিদ্ধান্ত মেনে নেন। তখন হুই-চি-র বয়স সতেরো বছর। প্রথমে তিনি যান নান-হুয়া মঠে। পরে সেখান থেকে যান তংশিং মঠে অধ্যক্ষ লিংয়ু-র কাছে। মঠে আগন্তুক কেউ গেলে যেমন জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হয় এক্ষেত্রেও তেমনটা শুরু হল।

লিংয়ু  আপনি কি নিজেই নিজের প্রভু ?

হুই-চি হ্যাঁ। আমি তাই মনে করি।   

লিংয়ু  তোমার প্রভু কোথায় ?

হুই-চি ধ্যানকক্ষের পশ্চিম দিক থেকে পূর্ব দিকে কিছুটা হেঁটে গিয়ে নির্বাক অবস্থায় দাঁড়িয়ে পড়লেন। লিংয়ু-এর মনে আর কোনও সন্দেহই থাকল না। তিনি বুঝে গেলেন এ ছেলে বোধির জন্যই জীবন  বাজি রেখেছে !  

 

    লিংয়ু এবং তাঁর ধর্মসূরী হুই-চি-র অনেক কথোপকথন বিভিন্ন চ্যান-নথিতে ধরা আছে। চা-বাগানের কথোপকথনটি বেশ চমকপ্রদ।

লিংয়ু সারাদিন চা-পাতা তুলতে তুলতে তোমার কথাবার্তা শুনতে পাচ্ছি। কিন্তু তোমাকে যথাযথভাবে দেখতেই পাচ্ছি না। তোমার যথার্থ স্বরূপ প্রদর্শন করো।

ইয়াং-শান এই কথা শুনে একটি চা-গাছ ধরে ঝাঁকিয়ে দিলেন।

লিংয়ু  বুঝেছি তুমি কর্মটাই বুঝেছ কিন্তু এর মর্ম উপলব্ধি করে উঠতে পারনি।

ইয়াং-শান আপনি কী বললেন ?

গুরু নীরব থেকে গেলেন। শিষ্য কিন্তু ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নন।

ইয়াং-শান আপনি মর্ম বুঝেছেন কিন্তু কর্ম বোঝেননি।

লিংয়ু তিরিশ-ঘা বেত পাওনা হল।

ইয়াং-শান আমি যদি আপনার কাছ থেকে তিরিশ-ঘা বেত পাই। সেই প্রাপ্ত তিরিশ-ঘা বেত আমি কাকে প্রদান করব ?

লিংয়ু  তোমার পাওনা তিরিশ-ঘা বেত এই মুহূর্তে রদ হয়ে গেল।

 

 

 

    কুয়েই-ইয়াং সম্প্রদায়ের নামটি এসেছে হুনান প্রদেশের কুয়েই-শান ও চিয়াংশি প্রদেশের ইয়াং-শান এই দুই পর্বতের নাম মিলিয়ে। প্রথম পর্বতের ঠে থাকতেন গুরু কুয়েই-শান লিংয়ু  এবং দ্বিতীয় পর্বতের মঠে থাকতেন শিষ্য ইয়াং-শান হুই-চি। দুজনের নামের আগে পর্বতদুটির নামও সংযুক্ত হয়ে গেছে। গুরু-শিষ্য পরম্পরার হাত ধরেই কুয়েই-ইয়াং সম্প্রদায় বিস্তার লাভ করে। কুয়েই-ইয়াং সম্প্রদায়ের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য বিভিন্ন রূপক-প্রতীক ও আকারের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ধারণা দান। বিশেষত বৃত্ত ব্যবহারের জন্য তাদের প্রসিদ্ধি আছে। গুরু-শিষ্যের কথোপকথনে বৃত্ত কখনও বোধি, কখনও অসীম, কখনও দেহ, কখনও বুদ্ধ-প্রকৃতি, কখনও শূন্যতার প্রতীক হিসাবে এসেছে। মহাযান বা তার অন্যতম শাখা বজ্রযানে বৃত্ত বা মণ্ডলা একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। চ্যান-ধারায় সম্ভবত বৃত্তের প্রসঙ্গ প্রথম পাওয়া যায় ষষ্ঠ আচার্য হুইনেং-এর অন্যতম শিষ্য নান-ইয়াং হুই-চুং-কেন্দ্রিক একটি আখ্যানে। একদা তীর্থযাত্রা থেকে ফিরে এক শিষ্য এলেন গুরু নান-ইয়াং হুই-চুং-এর সঙ্গে দেখা করতে। তিনি গুরুর সামনে মাটিতে একটি বৃত্ত এঁকে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকলেন। কথা শুরু করলেন গুরু।

 

নান-ইয়াং তুমি কি বুদ্ধ হতে চাও ?

শিষ্য  আমি তো আমার চোখ মুছতে পারি না।

নান-ইয়াং আমি এখনও তোমার সমান হতে পারিনি।

 

এই কথোপকথনে গুরু-শিষ্য উভয়ের অসামান্য বিনয় প্রকাশ পেয়েছে। শিষ্য বলছেন তিনি এখনও চোখ থেকে মায়া মুছে ফেলতে পারেননি। সুতরাং তাঁর বুদ্ধত্ব লাভ সেই মুহূর্তে সম্ভব নয়। শিষ্যের এই অকপট উক্তি শুনে গুরুও তাঁর উচ্চতা থেকে নেমে এসেছেন শিষ্যের সমতলে। সবই হয়েছে একটি বৃত্তকে কেন্দ্রে রেখে

 

   

    লিংয়ু-কে নিয়েও একটি বৃত্ত-কেন্দ্রিক আখ্যান পাওয়া যায়। তংশিং মঠে এলেন এক নতুন সন্ন্যাসী। তিনি লিংয়ু-এর সঙ্গে দেখা করতে গেলেন। যথারীতি কথাবার্তা শুরু হল।

 

লিংয়ু  আপনার নাম ?

সন্ন্যাসী ইয়ে লুয়েন। ( চিনা ভাষায় ইয়ে লুয়েন মানে পূর্ণচন্দ্র )

লিংয়ু, আঙুল দিয়ে বাতাসে একটি বৃত্ত আঁকলেন। তারপর বললেন, এটার সঙ্গে আপনি কীভাবে   তুলনা করবেন ?

সন্ন্যাসী আপনি যদি এই পদ্ধতিতে আমার কাছে কিছু জানতে চান, তাহলে অধিকাংশ মানুষই আপনার এই পদ্ধতিকে পছন্দ করবে না।

লিংয়ু  এটাই আমার পদ্ধতি। আর আপনার ?

সন্ন্যাসী আপনি কি এখনও পূর্ণচন্দ্র দেখছেন ?

লিংয়ু  আপনি এই পদ্ধতিতে কথা বলতেই পারেন, কিন্তু অধিকাংশ মানুষই আপনার এই পদ্ধতিকে পছন্দ করবে না।

লিংয়ু-এর কাছে বৃত্ত বা পূর্ণচন্দ্র পূর্ণ জাগরণের প্রতীক। নবাগত সন্ন্যাসী এই প্রতীকী তাৎপর্যে  ঢুকতে পারেননি। পরবর্তীকালে চ্যানচর্চায় বৃত্ত (চিনা ভাষায়, ইআই সিয়াং এবং জাপানি ভাষায় এনসো) একটি অবশ্যম্ভাবী প্রতীক হয়ে ওঠে। 

 

 

     অধ্যক্ষ লিংয়ু, কুয়েই-শান পর্বতের তংশিং মঠে আমৃত্যু বাস করেছেন। তাঁর কাছে শিক্ষা নেওয়ার জন্য দূরদূরান্তর থেকে শিক্ষার্থীরা আসতেন। তাঁর তৎপরতায় চ্যানচর্চার কেন্দ্রবিন্দু হিসাবে তংশিং মঠের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে দেশময় তাং-বংশীয় সম্রাট উ-জোঙ (রাজত্বকাল ৮৪০-৮৪৬ খ্রি:   ) ৮৪৫ খ্রিস্টাব্দে বৌদ্ধ-পীড়ন সুরু করলে তার আঁচ তংশিং মঠেও পৌঁছে যায়। মঠ দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অধ্যক্ষ লিংয়ু সাধারণ নাগরিকের ছদ্মবেশে রাজকর্মচারীদের চোখে ধুলো দিতে সক্ষম হন। পরবর্তী সম্রাট সুয়েন-জোঙ (রাজত্বকাল, ৮৪৬-৮৫৯ খ্রি:) বৌদ্ধ-পীড়ন রদ করে দেন। অধ্যক্ষ লিংয়ু আবার ফিরে আসেন তাঁর প্রিয় মঠে। সরবতা ও নীরবতার মেলবন্ধন, হেঁয়ালিপূর্ণ কথা তথা কোয়ান-এর ব্যবহার, বিভিন্ন প্রতীক বিশেষ করে বৃত্তের মাধ্যমে বোধি, শক্তি, শূন্যতা বা বুদ্ধ-প্রকৃতিকে প্রতিফলিত করা এবং বৌদ্ধতন্ত্রের তাত্ত্বিক চর্চা ইত্যাদি কুয়েই-ইয়াং সম্প্রদায়ের বৈশিষ্ট্য হিসাবে চিহ্নিত হয়ে আছে। সাং রাজতন্ত্র (৯৬০-১২৭৯ খ্রি:) সূচিত হওয়ার সময়েই এই অলপ্পেয়ে সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব ক্ষীণ হয়ে আসে এবং কালক্রমে তা লিন-চি বা রিনজাই সম্প্রদায়ে বিলীন হয়ে যায়। 

 

 

তথ্যসূত্র : 

1. ZEN CLASSICS : FORMATIVE TEXT IN THE HISTORY OF ZEN BUDDHISM, EDITED BY STEVEN HEINE AND DALES S. WRIGHT , OXFORD UNIVESITY PRESS 2006.

2. ZEN BUDDHISM :  A  HISTORY  INDIA  AND  CHINA  BY  HEINRICH  DUMOULIN  TRANSLATED BY  J. W. HEISIG AND PAUL KNITTER ; MACMILLAN PUBLISHERS COMPANY, 1988.

3. SEEING THROUGH ZEN BY JOHN R. MACRAE UNIVERSITY OF CALIFORNIA PRESS , 2003.

5. ZEN MASTERS OF CHINA : THE FIRST STEP EASTBY RECHARD BRYAN MC DANIEL; TUTTLE PUBLICATION, TOKYO/ VERMONT/ SINGAPORE.

6. THE ILLUSTRATED ENCYCLOPEDIA OF ZEN BUDDHISM BY HELEN J. BARONI ; THE ROSEN PUBLICATION GROUP , NEW YORK

7. ZENS CHINESE HERITAGE BY ANDY FERGUSON ; WISDOM PUBLICATION, BOSTON..

8. HISTORY OF ZEN BY YU-HISIU KU; SPRINGER, SINGAPORE.


ছবি:  বিধান দেব 

                                                                (ক্রমশ...)

 


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন