ভাবনারা গাছ হয়ে ভেসে যায় দূর এক অরণ্যের দিকে
After the torchlight red on sweaty faces
After the frosty silence in the gardens
After the agony in stony places
The shouting and the crying
Prison and palace and reverberation
Of thunder of spring over distant mountains
He who was living is now dead
We who were living are now dying
With a little patience
( The Waste Land : T.S.Eliot )
মানুষ।একা মানুষ তার বোধ ও স্বজ্ঞা নিয়ে কি পারে না কোনো গুহায় কিংবা কোনো নির্জন উপত্যকায় বা শহরের কোনো উঁচু বাড়ির চিলেকোঠায় বা কোনো বেসমেন্টের খুপরি ঘরে একটা জীবন কাটিয়ে দিতে।তাহলে সুবিধা হত এই : প্রতি মুহূর্তের সকল নেগেটিভ শক্তিগুলি যা রচিত হয় তার আশপাশ,জগৎ,জীবন ও তার কুশীলবদের সাথে তার প্রত্যক্ষ আদানপ্রদান এবং অপ্রত্যক্ষ চাওয়া পাওয়াকে ঘিরে,যা ঘুরে ঘুরে বারেবারেই তার আত্মাকে ফালাফালা, রক্তাক্ত করার জন্য বদ্ধপরিকর,যা উঁচিয়ে রাখে সর্বদাই তার দুদিক-ধারালো লম্বা মসৃণ ছুরিটি; সেটি থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া যেত।হ্যা,এসকেপিজম।অবশ্যই এসকেপিজম। কেন নয়? কিন্তু হায়! মানুষ তা পারে না।অনেক ব্যর্থ চেষ্টার পর তাকে ঘুরে ঘুরে আসতেই হয় তার প্রবল শত্রু বা প্রকৃত প্রস্তাবে বন্ধুই—সেই মানুষেরই কাছে।কারণ এ কম্ম তার যোগ্যতার অনেক উর্ধ্বে। এ যে সাধকের কাজ! কিন্তু সাধকও কি পারেন ? বহুদিন,বহুমাস,বহুবছর একাকী নির্জন বাসের পর যখন মীমাংসা হয়ে আসে সকল প্রশ্নমালা,যখন দূর হয় তাঁর সকল অস্থিরতা, যখন তাঁর ভিতরে জেগে ওঠে এক পদ্ম যার শত পাপড়ি বিকশিত হয়েছে,তিনিও তখন ফিরে আসেন।তাকে ফিরতেই হয় কারণ সেই পদ্ম তখন সুঘ্রাণ ছড়াতে চাইছে শুধু তার নিজের ভিতরেই নয়,ক্লিন্ন হয়ে আসা,কর্দমে ভরা অসংখ্য মানুষের জীবনে।এই তার নিয়তি। তাকে ফিরতেই হয় মানুষের কাছে যাদের সে স্বেচ্ছায় ত্যাগ করেছিল একদিন।যোগাযোগ স্থাপন করতেই হয়।না করে উপায় নেই।
~~
১৯৩৬ সালে জাঁ-পল সার্ত্র রচনা করেন তার ' ইরোসট্রেটাস' গল্পটি যেটি ১৯৩৯ সালে আরো চারটি গল্পের সাথে প্রকাশিত হয় তার 'লে মুর' গল্প-সংকলনে ( ইংরেজিতে The Wall and Other Stories বা পরবর্তীতে Intimacy and Other Stories নামে প্রকাশিত হয় )।উত্তম পুরুষে লেখা এই গল্পের নায়ক পল হিলবার্ট নিজেকে বন্দী করে রাখে সাততলার একটি ফ্ল্যাটে।সাততলার এই ব্যালকনিটিই তার বাইরের পৃথিবীকে দেখার একমাত্র জায়গা।ঘরের আলো নিভিয়ে সে জানলার কাছ ঘেষে দাঁড়ায়।নীচে বাজারের সমবেত ভিড় দেখে তার মনে হয়: মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রু এই 'ভার্টিকাল পারস্পেক্টিভ'।এত উঁচু থেকে মানুষকে মনে হয় পিঁপড়ের মত।মানুষের সাথে মেলামেশা এড়াতে সে গভীর রাতে ঘর ছেড়ে বেরোয়।গল্পের অন্য একটি চরিত্র মেসি তাকে বলে সে ইরোসট্রেটাসের মত।এই সূত্রে এসে পড়ে খ্রীস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীর কুখ্যাত ব্যক্তি ইরোসট্রেটাসের কথা যে তার অস্তিত্ব খুঁজে পেতে,বিখ্যাত(?) হতে গ্রীকদেবী আর্টেমিসের মন্দির জ্বালিয়ে দেয়, যে মন্দিরটি ছিল সপ্তম আশ্চর্যের একটি।
~~
'তোমার কাছে আর ফিরবো না'—এই বলে বেরিয়েছিল সেই কোন সকালে।তারপর থেকেই বেপাত্তা।সারা দুপুর,সারা বিকেল এ গাঁয়ে ও গাঁয়ে খুঁজে খুঁজে সারা।কোথাও কোনো চিহ্নমাত্র নেই।তারপর যখন দুঃখে ও ক্লান্তিতে বুজে আসছে চোখ। মন যখন দিয়ে দিয়েছে জবাব।আর বোধহয় কোনোদিনই দেখা হবে না।ঠিক তখনই,যখন সন্ধ্যার ঝুপসি অন্ধকারে চারপাশের গাছপালা বোবা ও নিথর,ঠিক তখনই যখন ঝিঁঝিপোকার কোরাস জানান দিতে শুরু করেছে ভবিষ্যতের কোনো গূঢ় কূটাভাস,ঠিক তখনই যখন এক কালো বেড়াল ততোধিক কালো এক অন্ধকার গর্তে অদৃশ্য হয়ে গেল আশু কোনো সমাধানের আশা না রেখেই, গুটি গুটি পায়ে সে ফিরে এলো।এর মধ্যে কোনো আশ্চর্য ছিল না,কোনো রহস্য ছিল না।সবটাই যেন পূর্বে পরিকল্পিত।
~~
কলকাতা দূরদর্শনের এক সাক্ষাৎকারে প্রশ্নকর্তা নাটককার মোহিত চট্টোপাধ্যায়কে প্রশ্ন করেছিলেন : আপনি নাটক না লিখে থাকতে পারবেন? অত্যন্ত মায়াময় ভঙ্গিতে মোহিতবাবু উত্তর দিয়েছিলেন : নাটক না লিখলে কি আমি মরে যাব?আমার খাওয়া-দাওয়া, শোওয়া-বসা সবই তো চলবে।কিন্তু নাটক আমার কাছে এই চশমাটার মত।এটা না থাকলে আমার কোনো কাজই আটকাবে না।কিন্তু সবকিছুর মধ্যে এক অস্পষ্টতা, এক অস্বচ্ছতা ঘিরে থাকবে।
~~
বৃষ্টি পড়ছে।কয়েকদিন ধরে।লাগাতার।ঝমঝম শব্দে ঢেকে যাচ্ছে নিত্যদিনের পরিচিত প্রিয় শব্দগুলি।ঘন এক দেওয়াল রচিত হয়েছে সামনে,পাশে,ধারে—সর্বত্র।আর এই দেওয়ালের অস্বচ্ছতায়,অনচ্ছতায় দিগবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়ছে মন।এইখানে এক অস্থায়ী কূপের ভিতর ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে খসে পড়ছে একে একে সবকটি পালক।দূরাগত কোনো ধ্বনি,কোনো মন্দিরের প্রাচীন ঘন্টার,নিশ্বাসের শব্দের সাথে মিশে সৃজন করছে আধিভৌতিক চেতনার বিস্ফার।দরজার কপাটগুলি ভাঙা।জানলার নড়বড়ে কলকব্জা।সেইসব ঠেলে খনির পেটের মধ্যে জেগে থাকা কয়েকশ বছরের পুরোনো এক অন্ধকার এইমাত্র প্রবেশ করলো।আর তার সেই ঠান্ডা কালো কুচকুচে জলে সাঁতরাতে সাঁতরাতে ভেসে যাচ্ছে জীবন সম্পর্কিত কয়েকটি গূঢ় প্রশ্ন। যাদের গায়ের ক্ষতগুলিকে দূর থেকে আজও চিনে নেওয়া যায়।
~~
১৯৮৬ সালে প্যারিসে ক্যান্সার আক্রান্ত হয়ে মারা যান আন্দ্রেই তারকোভস্কি।তার অনেক আগেই ১৯৭৯তে ক্রমাগত স্টেট ফিল্ম অথরিটির সঙ্গে দ্বন্দ্বের জেরে রাশিয়া ছাড়েন তিনি।শেষের দুটি ছবি 'নস্টালজিয়া'(১৯৮৩) এবং 'দ্য স্যাক্রিফাইস'(১৯৮৬) তৈরি করেন যথাক্রমে ইতালি ও সুইডেনে।মৃত্যুর কিছুদিন আগে প্রকাশিত হয় তার লেখা বই 'স্কাল্পটিং ইন টাইম'(১৯৮৫) প্রথমে জার্মান ভাষায়, পরে ইতালীয় ভাষায়। ১৯৮৭ তে তার ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হয়।সারা পৃথিবীতে চলচ্চিত্র বিষয়ক যেকটি বই প্রথম সারিতে থাকার অধিকার অর্জন করেছে,এটি তার অন্যতম। সিনেমা এবং সামগ্রিক ভাবে শিল্পের উদ্দেশ্য, অভিপ্রায় সম্বন্ধে তারকোভস্কি তার গভীর অনুভব ও উপলব্ধিকে ব্যক্ত করেছেন এই বইয়ে।এই বইয়ের একটি অধ্যায় 'আর্ট—আ ইয়ারনিং ফর অ্যান আইডিয়াল'-এ তিনি এই ভাবনা ব্যক্ত করেছেন : শিল্পের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হল ঐক্যবন্ধন স্থাপন করা।শৈল্পিক সৃষ্টির এক গুরুত্বপূর্ণ দিক হল সংযোগের চেতনা। শিল্প এক বিশেষ ভাষা যার সাহায্যে মানুষ পরস্পরকে জানতে চায়,নিজেদের সম্পর্কে জ্ঞাতব্য বিষয় জানিয়ে অন্যদের অভিজ্ঞতা আত্মস্থ করতে চায়।আর এ কাজটা ব্যবহারিক লাভ-ক্ষতির হিসেব কষে করা যায় না।ভালোবাসার ধারণাকে উপলব্ধি করেই তা করা সম্ভব। ভালোবাসার মর্ম নিহিত আছে আত্মত্যাগের মধ্যে।আর এই ত্যাগই হল প্রয়োজনবাদের বিরুদ্ধ প্রবণতা।
~~
একটা মালসায় রক্ত রাখা আছে।শিল্পের বেদীটি ধুয়ে নিতে হবে নিজের শেষ রক্তটুকু দিয়ে।গোটাকতক জলজ লিলি আর চূর্ণ চূর্ণ মায়া দিয়ে সাজিয়ে নিচ্ছ তোমার আরাধ্য।কিছু দূরে জড়ো হয়েছে গ্রাম্য কিছু শিশু। তাদের কৌতুহলী চোখে তুমি লাগিয়ে দাও রামধনুর রঙ।হাতে হাতে বাঁশপাতার বাঁশি।দিনশেষে সূর্যাস্তের অলৌকিক বিভায় যখন গুছিয়ে নিচ্ছ স্বপ্ন ও সবকটি ভ্রম, হাতে-হাত শিশুগুলি হাঁস হয়ে উড়ে গেল পশ্চিমাকাশে ।
~~
১৯৭৫ সালে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত ইতালীয় কবি ইউজেনিও মনতালের বিখ্যাত গদ্যগ্রন্থ 'Poet in Our Time'-এ কবি এই ভাবনাটি রেখেছেন : ‘Only the isolated communicate. The others—the men of mass communication—repeat,echo,vulgarize the works of the poets'.
ছবি : বিধান দেব

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন