মঙ্গলবার, ২৯ জুন, ২০২১

ধারাবাহিক গদ্য : অভিজিৎ দাশগুপ্ত


 

সাধনপর্বের নির্জনতা



১৯.

৩৪.
মাঝখানে নদী গিরি, মাঝখানে তুমুল সভ্যতা।

তবু আজ সারা রাত তোমার জন্যই জেগে আছি।
তুমি কি কোথাও আছ,সত্যি-সত্যি কোনো বন্ধ 
                                                                ফ্ল্যাটে?
ঘুম ভেঙে ব্যালকনিতে দাঁড়ালে কি
                                  একটি বার
                 রক্তলাল টেলিফোন দেখে লোভ হল?

--- সবই তো নিয়েছ, নাও। নিরঙ্কুশ এই শূন্য,
একেও কি নেবে ?

দিলীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'ভোররাতের দেবী ' বইটির '৩৪'  সংখ্যক কবিতা পড়তে পড়তে দুটো ছবি ভেসে ওঠে । যতবার পড়ি ততবারই ওই ছবি দুটি দেখতে পাই ।  কোনভাবে তাদের সরাতে পারি না ।  বা অন্য কোনো দৃশ্যে যে পৌঁছে যাব , তাও সম্ভব হয় না। তাহলে এখন প্রশ্ন ; কি সে ছবি!

যদি প্রথম ছবির কথায় আসি , সেখানে প্রকৃতির এক বিরাট বিপর্যয় চোখের ওপর ভেসে ওঠে । ২০১৩  সালে উত্তরাখণ্ডের সেই ভয়ঙ্কর বিপর্যয়। হিমবাহ ভাঙার কারণে চামোলি জেলা সম্পূর্ণ প্লাবিত হয় । ধৌলিগঙ্গার জলের স্তর বেড়ে যায়। তারপর তার যে ভয়ঙ্কর রূপ --- সে সমস্ত আমাদের এতদিনে জানা হয়ে গেছে ।  কিন্তু প্রশ্ন ;  এই কবিতার সঙ্গে তার সম্পর্ক সূত্র কোথায় ? কোন পংক্তিতে ধরা আছে অমোঘ সেই বিপর্যয়ের দৃশ্য!

কবিতার প্রথম দুটি পংক্তি ! কতবার পড়েছি। তবু প্রাকৃতিক বিপর্যয় ছাড়া আর কোন ছবি ভাবনায় আসেনি ।  গিরি কন্দরের  মধ্য দিয়ে বেরিয়ে আসা নদী তৈরি করেছে তুমুল সভ্যতা ।  তাকে কেন্দ্র করেই মানুষের এত আয়োজন ।  কিন্তু সেই সভ্যতার বিষটুকু একসময় গিলতে শুরু করে মানুষকে । তাই যার জন্য মানবের সভ্যতা প্রাণ পেয়েছে, সেই প্রকৃতির রোষেই সারারাত জেগে থাকতে হয় মানুষকে ।  অসহায় , শঙ্কিত , মৃত্যুভয়ে দীর্ণ মানুষ জেগে থাকে শুধুই নিজের কৃতকর্মের জন্য।

প্রকৃতির এমন অনুষঙ্গই তৃতীয় পংক্তিতে এসে মোড় নেয় । নিতে হয়। নদী, গিরি, তুমুল সভ্যতা মাঝখানে অবস্থান করে বুঝিয়ে দেয় তার প্রকৃত  আশ্রয় প্রেম ।  এবং সে প্রেম বহুদিন আগে চলে যাওয়া সম্পর্কের অসহনীয়তা ।  অতীতকে মুছে ফেলতে চেয়েও যা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে বিভিন্ন ভাবে ।  তৃতীয় পংক্তি থেকে কবিতাটি আমার কাছে অন্য এক কৃষ্ণগহ্বর ছুঁয়ে থাকে। একান্তই ব্যক্তিগত ; তবু এমন অভিজ্ঞতা অথবা প্রতীকী ভাষা আরো অনেকের জীবনেই ঘটে। এই আটপৌরে জীবনে প্রেম-ই বাঁচিয়ে রাখে ভোরের শিশির ।  সে প্রেম নতুন হতে পারে , অথবা পুরোনো। কখনো তা বর্তমান , তো কখনো অতীত।

মোবাইল ছিলো না । হোয়াটসঅ্যাপ , ফেসবুক কল্পনারও অতীত ।  শুধু ওই লাল অথবা ধূসর টেলিফোনটুকুই ভরসা । সেই চলে যাওয়া প্রেম কি তাকে দেখে লোভাতুর হয় ! নাকি রক্তক্ষরণ ! সেও তো একই অসুখে আচ্ছন্ন । অস্তিত্বের সঙ্গে লড়াই করে আমাদের বেঁচে থাকা ।  অঙ্গারকে ধুয়ে-মুছে রাখি বিশল্যকরণী ভেবে ।  নিরঙ্কুশ শূন্যতাও একসময় ভালো লাগতে শুরু করে । জারিত হই বিশ্বাসের স্তরায়ণে।

এই কবিতা শেষ পর্যন্ত একটা প্রসন্নতার দিকে নিয়ে যায় আমাদের ।  বাতাস -রোদ -আলোর মিলিত উদ্ভাস যেন সে । শুধু তার মুখোমুখি  হতে হবে। হতে হবে কষ্টসহিষ্ণু । কবির ব্যক্তি-উচ্চারণ পরিসীমা ছেড়ে চলে আসে পাঠকের নিবিড় আলপথে । সে তখন একা ; একাকী ! তার হেঁটে যাওয়ার মধ্যে ধ্বনিত হয় হাজার বছর ধরে লেখা বাংলা কবিতার ম্যাজিক । কবি এবং পাঠক --- দুজনেই আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে সেই ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যতায়।

২০.

রসায়ন

তোর ডান হাত ধরি পিতার মতন নির্ভয়ে
বাঁ-হাতটি যদিদং স্বামীদের।
প্রপিতামহের মতো স্নেহশীল তুই,
ঘর-গেরস্থালি ঠিক মায়ের মতন।

রোজ রাতে নীল ফানুসের মতো ফাঁপা গোল
                        আলো তৈরি হয়।
তার নীচে নির্ভয়ে ঢুকে যাস
রং চমকানো শ্বেতপাথরের
খুব ছোটো গম্বুজ খিলানে
ঘষটানো বকুলের তীব্র ঝাঁঝ ওঠে।
হাতে তোর সোনার গোলক থাকে দু-রকম
                   নরম কামনা বল।
দু-পায়ের মাঝখানে কালো ঘাসে পোঁতা
সোনার মশাল জ্বালিয়ে নারীত্ব পুড়িয়ে দিস।

লালচে ফলের বোঁটা দাঁতে কামড়ে
তারপর তুই হোস আমার সন্তান।

তোর ডান হাত ধরি পিতার মতন নির্ভয়ে।

কবিতাটির নাম ' রসায়ন ' ।  কবি দেবাঞ্জলি মুখোপাধ্যায় । যিনি জন্মেছিলেন এই কলকাতায় ১৯৫৫ সালে । আর চলে গেলেন ১৯৯৬ । মাত্র ৪০ বছরের আয়ু নিয়ে এসেছিলেন । ভৌগোলিক আর নৈসর্গিক চেতনা তাঁর কবিতায় আলোজ্বলা হয়ে দেখা দিত ।  জীবন চর্চাই ছিল দেবাঞ্জলির
অভিজ্ঞান ।  কিন্তু ওই নদী পাহাড় অরণ্য বা সমুদ্র সৈকত --- এতেই কি সব বিস্ময়ের অবসান ঘটাতেন তিনি ।  তা হয়তো নয় । নইলে 'রসায়ন '( 'পাতার মানবী ') নামে যে কবিতাটি এইমাত্র পড়লাম, তার অন্তঃস্থল অনুসন্ধান করব  কীভাবে!

বেটি ফ্রিডান  ১৯৬৩ সালে একটি বই লেখেন।
' দি ফেমিনিন মিস্টিক '। আলোড়ন ওঠে । বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে মার্কিন নারীদের অসুস্থতা, অস্থিরতা, ব্যাকুলতার  কথা তিনি তুলে ধরেন সেই গ্রন্থে । নারীদের এ সমস্ত সমস্যা ছিল নামহীন । নারীরা মনে করত তাদের কোনো অস্তিত্ব নেই , তারা যেন বেঁচে মরে  আছেন ।

এটা কি শুধুই মার্কিন নারীদের সমস্যা ! নাকি পৃথিবীর সব দেশের সব নারীদেরই এই সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় প্রতিনিয়ত।

'রসায়ন ' কবিতাটি যতবার পড়বেন , ভিন্ন ভিন্ন ইমেজ সামনে আসবে ।  কখনো নারী, কখনো সন্তান , কখনো পুরুষ ।  কিন্তু সামগ্রিকতা দিয়ে যদি দেখি তাহলে অবশ্যই একে নারীর জীবন- ইতিহাস বলা চলে অনায়াসে ।  পিতা-স্বামী-প্রপিতামহ এবং মা --- এরাই ঘিরে থাকে একটি মেয়ের জীবন। সেখানেই পুরুষশাসিত সমাজের কাঠামো।

একটা নীল ফানুস , যার গোলাকৃতির ভেতর শুধুই শূন্যতা । তার মধ্যে নির্ভয়ে  বসবাস করতে চায় সকলে ।  কিন্তু " খুব ছোটো গম্বুজ খিলানে / ঘষটানো বকুলের তীব্র ঝড় ওঠে " । আসলে , মেনে নেওয়াই ধর্ম , না মানাটাই বিদ্রোহ ।  সোনার দু'রকম গোলক আর কাল ঘাস --- এই যেন পুরুষের চোখে নারী ।  এমন সাহসী উচ্চারণে-ই এই কবি তাঁর প্রতিবাদ জানিয়েছেন ।  অথবা জানাতে পারেননি। অবস্থার বর্ণনাটুকু দিয়েছেন মাত্র।

প্রতিদিন খবরের কাগজে নারী নির্যাতনের হাজার একটা খবর । ৮ মাস থেকে ৮০  বছর সকলেই তাতে পুড়ে যাচ্ছে ।  অথচ সমাজ অবিচলিত । কেউ বলছে জিন্স প্যান্ট আর টিশার্ট- এর দোষ , কেউ বলছে অতিরিক্ত মেলামেশা , আবার কারো চোখে মোবাইল- ল্যাপটপ ইত্যাদি ইত্যাদি । তাহলে মোদ্দা কথাটা কি দাঁড়ালো ! নিষ্ক্রিয় এক সত্তার অধিকারিণী করো তাকে । সংসারের সমস্ত কাজের দায়িত্ব ফেলে দাও তার কাঁধে ।  সে যেন মাথা তুলতে না পারে। আপন ভাগ্য জয় করবার মতো সাহস তাকে দিও
না ।  তাতেই মৃত্যু ঘনাবে সমাজের । বেটি ফ্রিডান তাঁর সংগীতে নারীর সেই মুক্তির কথাই বলেছিলেন। ---

" মুক্তি, মুক্তি এখন ---
ক্ষোভ আর ক্রোধের খাঁচা ভেঙে বেরিয়ে আসছি
                                                           আমরা ,
মুক্তি এখন।

নারীত্ব – নারীত্ব কাকে বলে ?
পুরুষত্ব  --- সেটা কি ?
আমরা দু’জন সমান অংশীদার মানবতার।

মুক্তি, মুক্তি এখন ---
সময় এসেছে আমাদের সঠিক পরিচয় দেবার, আমরা মানুষ – নই শুধু নারী
মুক্তি এখন।

[ পাশ্চাত্যে নারীর ভোটাধিকারের ৫০ তম বার্ষিকী উপলক্ষে নারী আন্দোলনের জন্য বেটি ফ্রিডান রচিত সঙ্গীত। ভাষান্তর : সাগর চৌধুরী ]

তৃতীয় বিশ্বের মানুষ হয়ে অনেককাল কাটালাম। এবার সময় এসেছে সামাজিকভাবে অন্তত সঙ্গীকে কাছে ডেকে নেওয়ার । তার হাত ধরেই অর্থনীতিতে ঢেউ আসবে । আর তা না হলে ---- পশ্চাতে রেখেছ যারে সে তোমারে পশ্চাতে টানিছে । কবির সেই নির্মম সত্য উচ্চারণ মনে আছে তো ! শুধু কবিতার পংক্তি বলে কণ্ঠস্থ করার নয় এ ; একে মন্ত্রের মতো মাদুলি করে কন্ঠে ধারণ করার সময় এসেছে ।
       

ছবি : বিধান দেব 




 

৩টি মন্তব্য:

কবিতা

সম্পাদকের কথা

দ্বিতীয় বর্ষ  ।। অষ্টম সংখ্যা ।। মার্চ ২০২২   খুব অসহায় লাগছে এবার। আমাদের ডান পাশে ধস। বায়ে গিরিখাত। মাথায় বোমারু। পায়ে পায়ে হিমানীর ব...